📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বিক্রয়ের শর্তাবলী

📄 বিক্রয়ের শর্তাবলী


বিক্রয়ের শর্তাবলী দু ধরনের: এক, শুদ্ধ ও বাধ্যতামূলক, দুই, চুক্তি বাতিলকারী। প্রথমটি হলো, যা চুক্তির সাথে সংগতিপূর্ণ। এটি আবার তিন প্রকার:
১. যে শর্ত বিক্রয়ের অনিবার্য দাবি, যেমন পণ্য হস্তান্তর ও মূল্য পরিশোধ করা শর্ত।
২. বিক্রয় চুক্তির কল্যাণার্থে যে শর্ত আরোপিত হয়, যেমন মূল্য বাকি রাখা, কিংবা মূল্যের অংশ বিশেষ বাকি রাখা অথবা বিক্রীত পণ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো বৈশিষ্ট্য থাকা চাই মর্মে শর্ত আরোপ, যেমন জন্তুটি দুধেল বা গর্ভবতী হওয়া চাই, অথবা পাখিটি শিকারী হওয়া চাই ইত্যাদি। শর্ত পাওয়া গেলে বিক্রয় অনিবার্য হয়ে যাবে। আর শর্ত পূরণ না হলে ক্রেতা চুক্তি বাতিল করতে পারবে শর্ত পুরণ না হওয়ার কারণে। রসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: 'মুসলমানরা তাদের শর্তের অনুগত থাকবে।' ক্রেতার এ অধিকারও থাকবে যে, যে বৈশিষ্ট্যটি থাকা চাই মর্মে শর্ত আরোপ করা হয়েছে, তা যে পরিমাণে অনুপস্থিত, সে অনুপাতে পণ্যের মূল্য কম দিতে পারবে।
৩. এমন কোনো শর্ত আরোপ করা, যাতে ক্রেতা বা বিক্রেতার কোনো উপকারিতা বা স্বার্থ সংরক্ষিত হয়, যেমন বাড়ি বিক্রয় করার চুক্তিতে এরূপ শর্ত আরোপ করা যে, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মালেক তা দ্বারা উপকৃত হতে পারবে, যথা একমাস বা দু'মাস তাতে বসবাস করতে পারবে। অনুরূপ, কোনো জন্তু এই শর্তে বিক্রয় করা যে, একটা নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত বিক্রেতা তাতে আরোহণ করে যেতে পারবে। কেননা বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন: জাবির রা. রসূলুল্লাহ্ সা. এর নিকট একটা উট বিক্রয় করেন এবং
মদিনা পর্যন্ত তার উপর আরোহণ করার শর্ত আরোপ করেন। অনুরূপ, ক্রেতাও বিক্রেতার নিকট সুনির্দিষ্ট উপকারিতা লাভের শর্ত আরোপ করতে পারে। যেমন একটা নির্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত তার বিক্রীত পণ্য বিক্রেতার বাহনে করে পৌঁছে দেয়া ইত্যাদি। স্থান নির্দিষ্ট না হলে শর্ত শুদ্ধ হবে না, যেমন ক্রেতার বাড়িতে পণ্য পৌঁছানোর শর্ত আরোপ করা হলো। কিন্তু বিক্রেতা তার বাড়ি চেনে না। তা হলে এরূপ শর্ত শুদ্ধ হবে না। মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা জনৈক নারীর কাছ থেকে এক আঁটি জ্বালানী কাঠ এই শর্তে কেনে যে, সে তা বহন করে পৌঁছে দেবে। শর্তটি প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু বিক্রেতা তাতে আপত্তি করে নি। এটা ইমাম আহমদ, আওযায়ি, আবু সাওর, ইসহাক ও ইবনুল মুনযিরের অভিমত। ইমাম শাফেয়ি ও হানাফি মযহাবের মতে এ বিক্রয় শুদ্ধ হবেনা। কেননা রসূলুল্লাহ্ সা. শর্ত সাপেক্ষে বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু এ মতটি সঠিক নয়। কেননা রসূল সা. একাধিক শর্ত সাপেক্ষে বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 দ্বিতীয় প্রকার শর্ত : অতথ্য শর্ত

📄 দ্বিতীয় প্রকার শর্ত : অতথ্য শর্ত


দ্বিতীয় প্রকার শর্ত: অশুদ্ধ শর্ত: এ ধরনের শর্ত আবার কয়েক শ্রেণীতে বিভক্ত। যথা:
১. যা গোটা চুক্তিকেই বাতিল করে দেয়, যেমন এক পক্ষ কর্তৃক অপর পক্ষের নিকট অন্য একটি চুক্তি সম্পাদনের শর্ত আরোপ করা। উদাহরণ স্বরূপ, বিক্রেতা কর্তৃক ক্রেতাকে বলা: 'তোমার নিকট বিক্রয় করলাম এই শর্তে যে, তুমি আমার নিকট অমুক জিনিসটি বিক্রয় করবে বা ধার দেবে।' এ ধরনের শর্ত আরোপ যে অবৈধ, তার প্রমাণ: রসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: পূর্বশর্ত আরোপ করে বিক্রয় বা একাধিক শর্তে বিক্রয় জায়েয নেই।' (তিরমিযি কর্তৃক বর্ণিত ও সহীহ আখ্যায়িত) ইমাম আহমদ বলেন: অনুরূপ অর্থবোধক যে কোনো শর্ত অবৈধ, যথা কেউ যদি বলে: 'তোমার নিকট বিক্রয় করলাম এই শর্তে যে, তুমি তোমার মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দেবে বা তোমার সাথে আমার মেয়েকে বিয়ে দেব। এ জাতীয় সকল শর্ত অশুদ্ধ। এটা ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ি ও অধিকাংশ ফকিহের অভিমত। ইমাম মালেক এ ধরনের শর্ত আরোপিত বিক্রয়কে অনুমোদন করেছেন, কিন্তু আরোপিত শর্তকে বাতিল গণ্য করেছেন। তিনি বলেছেন: বিক্রয় যখন বৈধ, তখন যে অশুদ্ধ বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে তার প্রতি আমি ভ্রূক্ষেপ করি না।
২. যে শর্ত আরোপ করা সত্ত্বেও বিক্রয় শুদ্ধ হয়, কিন্তু শর্ত বাতিল হয়। এটা হচ্ছে এমন শর্ত, যা বিক্রয় চুক্তির পরিপন্থী, যেমন বিক্রেতা ক্রেতার নিকট শর্ত আরোপ করবে যে, সে এই পণ্য আর কারো নিকট বিক্রয় বা দান করতে পারবে না। কেননা রসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: 'আল্লাহ্ কিতাবের পরিপন্থী যে কোনো শর্ত বাতিল, চাই তা একশো শর্তই হোক না কেন।' (বুখারি ও মুসলিম) এটা ইমাম আহমদ, হাসান, শাবী, নাসায়ি, ইবনে আবি লায়লা ও সাওরের মত। কিন্তু আবু হানিফা ও শাফেয়ি বলেন: বিক্রয় বাতিল।
৩. যে শর্ত দ্বারা আদৌ বিক্রয় সম্পন্ন হয় না। যেমন বিক্রেতা যদি বলে: 'অমুকের সম্মতি সাপেক্ষে বিক্রয় করবো, অথবা তুমি অমুক জিনিস এনে দিলে বিক্রয় করবো।' অনুরূপ, ভবিষ্যতের কোনো শর্তের উপর নির্ভরশীল যে কোনো বিক্রয় অবৈধ ও অচল।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বায়না বিক্রয়

📄 বায়না বিক্রয়


বায়না বিক্রয়: বায়না বিক্রয় হলো, ক্রেতা কর্তৃক মূল্যের একাংশ বিক্রেতাকে প্রদান করা। অত:পর বিক্রয় সম্পন্ন হলে মোট মূল্য থেকে প্রদত্ত অংশ বাদ যাবে। নচেৎ বিক্রেতা প্রদত্ত অংশকে ক্রেতার উপহার হিসাবে গ্রহণ করবে। অধিকাংশ ফকিহের মতে এ ধরনের বিক্রয় অশুদ্ধ ও অচল। কেননা ইবনে মাজা বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বায়না বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন। ইমাম আহমদ এ হাদিসকে দুর্বল আখ্যায়িত ও বায়না বিক্রয়কে বৈধ বলে রায় দিয়েছেন। তিনি এর প্রমাণ স্বরূপ নাফে' ইবনে আব্দুল হারিস থেকে বর্ণনা করেন যে, নাফে' সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার নিকট থেকে উমর রা. এর জন্য কারাগৃহ খরিদ করেন চার হাজার দিরহামের বিনিময়ে। উমর রা. সম্মত হলে বিক্রয় সম্পন্ন হবে, নচেৎ সাফওয়ান চারশো দিরহাম পাবে। ইবনে সিরীন ও ইবনুল মুসাইয়্যব বলেন: ক্রেতা যদি পণ্যটি অপছন্দ করে তবে তা যদি ফেরত দেয় এবং সেই সাথে আরো কিছু ফেরত দেয়, তবে দিতে পারে। ইবনে উমর রা. এ বিক্রয় বৈধ বলে রায় দিয়েছেন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সকল দোষ সম্পর্কে দায়মুক্ত হওয়ার শর্তে বিক্রয়

📄 সকল দোষ সম্পর্কে দায়মুক্ত হওয়ার শর্তে বিক্রয়


যে কোনো অজানা দোষত্রুটি সম্পর্কে বিক্রেতা দায়মুক্ত-এই শর্তে বিক্রয় করলেও বিক্রেতা দায়মুক্ত হবে না। ক্রেতা পণ্যে খুঁত পেলেই তা
ফেরত দিতে পারবে। কেননা কোনো খুঁত বা ত্রুটি আছে কিনা তা বিক্রয়ের পরেই প্রমাণিত হয়। কাজেই পূর্বাহ্নে দায়মুক্তি দেয়া সম্ভব নয়, তবে বিক্রেতা যদি পূর্বাহ্নে পণ্যের দোষ-ত্রুটি উল্লেখ করে কিংবা চুক্তির পর ক্রেতা তাকে দায়মুক্ত করে তা হলে বিক্রেতা দায়মুক্ত হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. যায়েদ ইবনে সাবিতের নিকট দায়মুক্তির শর্তে আটশো দিরহামের বিনিময়ে একটি দাস বিক্রয় করেন। পরে যায়েদ দেখতে পান তার মধ্যে একটা খুঁত রয়েছে। তাই তিনি ইবনে উমরকে দাসটি ফেরত দিতে চান। কিন্তু ইবনে উমর ফেরত নিতে অসম্মতি প্রকাশ করেন। ফলে উভয়ে উসমান রা. এর নিকট বিচার প্রার্থী হন। উসমান রা. ইবনে উমরকে বললেন: আপনি কি শপথ করতে পারবেন যে, এই খুঁত আপনার জানা ছিলনা? তিনি বললেন: না। তখন তিনি ইবনে উমরকে দাসটি ফেরত দিলেন। অত:পর ইবনে উমর সেটি এক হাজার দিরহামে বিক্রয় করেন। ইমাম আহমদ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন।
ইবনুল কাইয়্যিম বলেন: এ দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, তারা এই বিক্রয়ের বিশুদ্ধতা ও দায়মুক্তির শর্তের বৈধতার ব্যাপারে একমত ছিলেন। আর উসমান ও যায়েদ এই মর্মে একমত ছিলেন যে, বিক্রেতা যদি পূর্বাহ্নে খুঁত সম্পর্কে অবহিত থাকে তাহলে দায়মুক্তির শর্ত তাকে দায়মুক্তি দেবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00