📄 পরিপক্কয়ে পরিপক্কতা অগ্রকারী ফল বিক্রয়
পর্যায়ক্রমে পরিপক্কতা অর্জনকারী ফল বিক্রয়: ফল বা শস্যের একাংশ পরিপক্ক হলে পরিপক্ক ও অপরিপক্ক উভয় অংশ একত্রে বিক্রয় করার চুক্তি হয়ে থাকলে একত্রে বিক্রয় বৈধ। অনুরূপ পৃথক পৃথকভাবে বিক্রয় করার চুক্তি হয়ে থাকলেও পরিপক্ক হওয়ার পর এক সাথে সমগ্র ফল বা শস্য বিক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিলে তা করা বৈধ। এ অবস্থাটা কল্পনা করা যায় সে ক্ষেত্রে, যখন গাছ এমন শ্রেণীর হয়, যা পর্যায়ক্রমে ফল উৎপাদন করে। যেমন ফলের মধ্যে আম, সবজির মধ্যে শসা, এবং ফুলের মধ্যে গোলাপ ইত্যাদি। এ অভিমত সকল মালেকি ফকিহের এবং হানাফি ও হাম্বলি ফকিহদের একাংশের। তাদের যুক্তি-প্রমাণ নিম্নে দেয়া গেল:
১. পরিপক্কতা দৃশ্যমান হয়েছে এমন ফল বিক্রয়ের বৈধতা শরিয়তে প্রমাণিত। কাজেই যার পরিপক্কতা দৃশ্যমান হয়নি তা পরিপক্ক ফলের আওতাধীন হবে এটাই স্বাভাবিক। তদ্রূপ যা বর্তমানে বিদ্যমান তার উপর যে চুক্তি হবে, সে চুক্তি অবিদ্যমান বস্তুকেও তার আওতায় নিয়ে আসবে। যখন সমগ্র ক্ষেত বা বাগানের ফসল বিক্রয়ের চুক্তি হবে তখনকার জন্য এ বিধি প্রযোজ্য। অংশ বিশেষের জন্য চুক্তি হলে প্রত্যেক অংশের বিধি স্বতন্ত্র।
২. এই প্রকারের বিক্রয় যদি অবৈধ হয় তবে তা দুটো নিষিদ্ধ জিনিষকে অনিবার্য করে তুলবে: ক. বিতর্কের সৃষ্টি হওয়া। খ. দ্রব্যাদি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা।
বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার কারণ এই যে, প্রায়শ: বিশালায়তন বাগান বা খামারের উপরই চুক্তি সম্পাদিত হয়ে থাকে। এরূপ ক্ষেত্রে ক্রেতা প্রথম পর্যায়ের উৎপন্ন ফসল এমন এক সময়ে কিনতে বাধ্য হয়, যা এতটা দীর্ঘায়িত হয় যে, দ্বিতীয় পর্যায়ের ফসলও তখন বিক্রয়যোগ্য হয়ে যায় এবং তাকে প্রথম পর্যায়ের ফসল থেকে পৃথক করা সম্ভব হয়না। ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং তাদের একজন অন্য জনের পণ্য আত্মসাৎ করে।
আর দ্বিতীয় নিষিদ্ধ জিনিসটার উদ্ভব হয় এভাবে যে, বিক্রেতা সব সময় এমন ক্রেতা খুঁজে পায় না যে, প্রথম পর্যায়ের উৎপন্ন ফসল কিনবে। তাই এর ফলে তার পণ্য নষ্ট হওয়া অনিবার্য হয়ে উঠে। সুতরাং এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিক্রয় বৈধ। একে অবৈধ বলে রায় দেয়া হলে তা কঠোরতা ও অচলাবস্থা সৃষ্টি করবে, যা নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে: وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٌ 'তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোনো কঠোরতা আরোপ করেননি।' (সূরা হজ্জ: ৭৮)
ইবনে আবেদীন এই বক্তব্যকে অগ্রগণ্যরূপে গ্রহণ করেছেন এবং তদনুসারে শরিয়তের বিধান প্রণয়ন করেছেন। অধিকাংশ ফকিহের মতে এরূপ ক্ষেত্রে চুক্তি অবৈধ এবং প্রত্যেক পর্যায়ের ফসল পৃথকভাবে বিক্রয় করা বাধ্যতামূলক।
📄 গাছে থাকা অবস্থায় ফল বিক্রয় করা
শীষে থাকা অবস্থায় গম বিক্রয় করা: শীষে থাকা অবস্থায় গম, খোসার ভেতরে থাকা তরকারী, সবজি এবং সরিষা, চাল, নারিকেল, বাদাম ইত্যাদি বিক্রয় করা বৈধ। কেননা এর প্রত্যেকটি শস্য বিশেষ। কাজেই এটা শীষে থাকা অবস্থায় বিক্রয় করা সম্পূর্ণ বৈধ। তবে মনে রাখতে হবে, রসূলুল্লাহ্ সা. শীষ পেকে না যাওয়া ও দুর্যোগমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন। যেহেতু এ ধরনের ক্রয়-বিক্রয় অনিবার্য প্রয়োজনেই করা হয়, তাই কিছুটা অস্বচ্ছতা থাকা সত্ত্বেও একে অব্যাহতি দেয়া হয়। এটা হানাফি ও মালেকি মযহাবের অভিমত।
📄 দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতির দায় রহিত করা
খরা, ঠান্ডা ও পানির অভাব ইত্যাকার যে সব দুর্যোগের শিকার হয়ে ফসলাদি নষ্ট হয়ে থাকে এবং যেগুলিতে মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তার ব্যাপারে শরিয়তে কিছু নির্দিষ্ট বিধিমালা রয়েছে। যখন পরিপক্কতা দৃশ্যমান হওয়ার পর ফল বা ফসল বিক্রয় করা হয় এবং বিক্রেতা তা ক্রেতার নিকট এভাবে হস্তান্তর করে যে, ফসল ক্ষেতেই থাকবে এবং ক্রেতা যখন যেভাবে ইচ্ছা তা কেটে বা পেড়ে নিতে পারবে, অত:পর কাটা বা পাড়ার সময় সমাগত হওয়ার আগেই ঐ
ফসল দুর্যোগে নষ্ট হয়ে যায়, তখন তা বিক্রেতার দায় হিসাবে গণ্য হবে, ক্রেতার উপর তার মূল্য পরিশোধের দায় বর্তাবে না। কেননা রসূলুল্লাহ্ সা. দুর্যোগের দায় রহিত করার আদেশ দিয়েছেন। (মুসলিম কর্তৃক জাবের রা. থেকে বর্ণিত।) অন্য বর্ণনা মোতাবেক রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: 'যদি তুমি তোমার ভাই এর নিকট কোনো ফল বিক্রয় কর, অত:পর তা দুর্যোগের শিকার হয়, তবে তার মূল্য বাবদ কিছু গ্রহণ করা তোমার জন্য হালাল হবেনা। করলে তুমি তোমার ভাই এর সম্পদ অন্যায় ভাবে গ্রহণের দায়ে দোষী হবে।'
তবে মনে রাখতে হবে, এ বিধান শুধু সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যখন বিক্রেতা ফল বা ফসলের মূল উৎস বাদে বিক্রয় করে বা মূলের মালেক ব্যতীত অন্য কারো নিকট বিক্রয় করে অথবা ক্রেতা পণ্য হস্তগত করতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বিলম্ব করে। নচেৎ এ সব ক্ষেত্রে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির দায় ক্রেতাকে বহন করতে হবে। আর যদি ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দুর্যোগের কারণে না হয় বরং মানুষের কর্মদোষে সংঘটিত হয়, তাহলে ক্রেতা ইচ্ছা করলে ক্রয় বাতিল করে বিক্রেতার নিকট থেকে মূল্য ফেরত চাইতে পারবে, অথবা যে ব্যক্তির কর্মদোষে ক্ষতি হয়েছে তার নিকট মূল্য দাবি করতে পারবে। এ মতটি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, আবু উবাইদ এবং মুহাদ্দিসগণের একটি দলের। ইবনুল কাইয়েম এ মতটিকে অগ্রগণ্য বলে গ্রহণ করেছেন। 'তাহযীবে সুনানে আবুদাউদ' নামক গ্রন্থে বলেন: 'অধিকাংশ আলিমের অভিমত এই যে, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির দায় রহিত করার আদেশটি মুস্তাহাব অর্থে গ্রহীত এবং মহানুভবতা সূচক, বাধ্যতামূলক অর্থে নয়। ইমাম মালেক বলেন: একতৃতীয়াংশ বা তার বেশি ক্ষতি হলে তা রহিত করা হবে, তার কম হলে রহিত করা হবেনা। ইমাম মালিকের শিষ্যগণ বলেন: দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি একতৃতীয়াংশের কম হলে তা ক্রেতার দায় গণ্য হবে, এর বেশি হলে বিক্রেতার।
হাদিসটির আদেশকে মুস্তাহাব অর্থে গ্রহণের প্রমাণ হিসেবে বলা হয়েছে যে, দুর্যোগটি সংঘটিত হয়েছে পণ্যের উপর ক্রেতার স্বত্বাধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। কেননা এখন সে যদি পণ্যটি বিক্রয় বা দান করতে চায় তবে তা তার জন্য বৈধ হবে।
রসূলুল্লাহ্ সা. যে পণ্যের দায় স্বীকৃত হয়নি, তা থেকে মুনাফা অর্জন করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং ঐ পণ্য বিক্রয় করা যখন শুদ্ধ, তখন প্রমাণিত হলো যে, ওটা তার দায়ভুক্ত। ইতিপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ্ সা. কোনো ফল বা ফসলের পরিপক্কতা দৃশ্যমান হওয়ার আগে বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং পরিপক্কতা দৃশ্যমান হওয়ার পর দুর্যোগের ক্ষতি যদি বিক্রেতার দায়ভুক্ত হতো, তাহলে এ নিষেধাজ্ঞা নিরর্থক হতো।
📄 বিক্রয়ের শর্তাবলী
বিক্রয়ের শর্তাবলী দু ধরনের: এক, শুদ্ধ ও বাধ্যতামূলক, দুই, চুক্তি বাতিলকারী। প্রথমটি হলো, যা চুক্তির সাথে সংগতিপূর্ণ। এটি আবার তিন প্রকার:
১. যে শর্ত বিক্রয়ের অনিবার্য দাবি, যেমন পণ্য হস্তান্তর ও মূল্য পরিশোধ করা শর্ত।
২. বিক্রয় চুক্তির কল্যাণার্থে যে শর্ত আরোপিত হয়, যেমন মূল্য বাকি রাখা, কিংবা মূল্যের অংশ বিশেষ বাকি রাখা অথবা বিক্রীত পণ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো বৈশিষ্ট্য থাকা চাই মর্মে শর্ত আরোপ, যেমন জন্তুটি দুধেল বা গর্ভবতী হওয়া চাই, অথবা পাখিটি শিকারী হওয়া চাই ইত্যাদি। শর্ত পাওয়া গেলে বিক্রয় অনিবার্য হয়ে যাবে। আর শর্ত পূরণ না হলে ক্রেতা চুক্তি বাতিল করতে পারবে শর্ত পুরণ না হওয়ার কারণে। রসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: 'মুসলমানরা তাদের শর্তের অনুগত থাকবে।' ক্রেতার এ অধিকারও থাকবে যে, যে বৈশিষ্ট্যটি থাকা চাই মর্মে শর্ত আরোপ করা হয়েছে, তা যে পরিমাণে অনুপস্থিত, সে অনুপাতে পণ্যের মূল্য কম দিতে পারবে।
৩. এমন কোনো শর্ত আরোপ করা, যাতে ক্রেতা বা বিক্রেতার কোনো উপকারিতা বা স্বার্থ সংরক্ষিত হয়, যেমন বাড়ি বিক্রয় করার চুক্তিতে এরূপ শর্ত আরোপ করা যে, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মালেক তা দ্বারা উপকৃত হতে পারবে, যথা একমাস বা দু'মাস তাতে বসবাস করতে পারবে। অনুরূপ, কোনো জন্তু এই শর্তে বিক্রয় করা যে, একটা নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত বিক্রেতা তাতে আরোহণ করে যেতে পারবে। কেননা বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন: জাবির রা. রসূলুল্লাহ্ সা. এর নিকট একটা উট বিক্রয় করেন এবং
মদিনা পর্যন্ত তার উপর আরোহণ করার শর্ত আরোপ করেন। অনুরূপ, ক্রেতাও বিক্রেতার নিকট সুনির্দিষ্ট উপকারিতা লাভের শর্ত আরোপ করতে পারে। যেমন একটা নির্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত তার বিক্রীত পণ্য বিক্রেতার বাহনে করে পৌঁছে দেয়া ইত্যাদি। স্থান নির্দিষ্ট না হলে শর্ত শুদ্ধ হবে না, যেমন ক্রেতার বাড়িতে পণ্য পৌঁছানোর শর্ত আরোপ করা হলো। কিন্তু বিক্রেতা তার বাড়ি চেনে না। তা হলে এরূপ শর্ত শুদ্ধ হবে না। মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা জনৈক নারীর কাছ থেকে এক আঁটি জ্বালানী কাঠ এই শর্তে কেনে যে, সে তা বহন করে পৌঁছে দেবে। শর্তটি প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু বিক্রেতা তাতে আপত্তি করে নি। এটা ইমাম আহমদ, আওযায়ি, আবু সাওর, ইসহাক ও ইবনুল মুনযিরের অভিমত। ইমাম শাফেয়ি ও হানাফি মযহাবের মতে এ বিক্রয় শুদ্ধ হবেনা। কেননা রসূলুল্লাহ্ সা. শর্ত সাপেক্ষে বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু এ মতটি সঠিক নয়। কেননা রসূল সা. একাধিক শর্ত সাপেক্ষে বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন।