📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 পরিপক্কতা কিভাবে চেনা যাবে?

📄 পরিপক্কতা কিভাবে চেনা যাবে?


খেজুরের পরিপক্কতা লাল হওয়া ও হলুদ হওয়া দ্বারা চেনা যায়। ইমাম বুখারি ও মুসলিম আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ সা. পরিপক্ক হওয়ার আগে ফল বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন। আনাস রা. কে জিজ্ঞাসা করা হলো, ফলের পরিপক্কতা কী? তিনি বললেন: লাল হওয়া ও হলুদ হওয়া।
আঙ্গুরের পরিপক্কতা চেনা যাবে নরম হওয়া, মিষ্টি পানি বের হওয়া ও হলুদ হওয়া দ্বারা। কালো আঙ্গুরের ক্ষেত্রে কালো হওয়া দ্বারা অন্য সমস্ত ফলের পরিপক্কতার আলামত হলো খেতে সুস্বাদু হওয়া ও পরিপক্কতা
দৃশ্যমান হওয়া। জাবির রা. থেকে ইমাম বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. সুস্বাদু না হওয়া পর্যন্ত ফল বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন। শস্যাদির পরিপক্কতা দানা বা আঁটি শক্ত হওয়া দ্বারা চেনা যায়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 পরিপক্কয়ে পরিপক্কতা অগ্রকারী ফল বিক্রয়

📄 পরিপক্কয়ে পরিপক্কতা অগ্রকারী ফল বিক্রয়


পর্যায়ক্রমে পরিপক্কতা অর্জনকারী ফল বিক্রয়: ফল বা শস্যের একাংশ পরিপক্ক হলে পরিপক্ক ও অপরিপক্ক উভয় অংশ একত্রে বিক্রয় করার চুক্তি হয়ে থাকলে একত্রে বিক্রয় বৈধ। অনুরূপ পৃথক পৃথকভাবে বিক্রয় করার চুক্তি হয়ে থাকলেও পরিপক্ক হওয়ার পর এক সাথে সমগ্র ফল বা শস্য বিক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিলে তা করা বৈধ। এ অবস্থাটা কল্পনা করা যায় সে ক্ষেত্রে, যখন গাছ এমন শ্রেণীর হয়, যা পর্যায়ক্রমে ফল উৎপাদন করে। যেমন ফলের মধ্যে আম, সবজির মধ্যে শসা, এবং ফুলের মধ্যে গোলাপ ইত্যাদি। এ অভিমত সকল মালেকি ফকিহের এবং হানাফি ও হাম্বলি ফকিহদের একাংশের। তাদের যুক্তি-প্রমাণ নিম্নে দেয়া গেল:
১. পরিপক্কতা দৃশ্যমান হয়েছে এমন ফল বিক্রয়ের বৈধতা শরিয়তে প্রমাণিত। কাজেই যার পরিপক্কতা দৃশ্যমান হয়নি তা পরিপক্ক ফলের আওতাধীন হবে এটাই স্বাভাবিক। তদ্রূপ যা বর্তমানে বিদ্যমান তার উপর যে চুক্তি হবে, সে চুক্তি অবিদ্যমান বস্তুকেও তার আওতায় নিয়ে আসবে। যখন সমগ্র ক্ষেত বা বাগানের ফসল বিক্রয়ের চুক্তি হবে তখনকার জন্য এ বিধি প্রযোজ্য। অংশ বিশেষের জন্য চুক্তি হলে প্রত্যেক অংশের বিধি স্বতন্ত্র।
২. এই প্রকারের বিক্রয় যদি অবৈধ হয় তবে তা দুটো নিষিদ্ধ জিনিষকে অনিবার্য করে তুলবে: ক. বিতর্কের সৃষ্টি হওয়া। খ. দ্রব্যাদি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা।
বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার কারণ এই যে, প্রায়শ: বিশালায়তন বাগান বা খামারের উপরই চুক্তি সম্পাদিত হয়ে থাকে। এরূপ ক্ষেত্রে ক্রেতা প্রথম পর্যায়ের উৎপন্ন ফসল এমন এক সময়ে কিনতে বাধ্য হয়, যা এতটা দীর্ঘায়িত হয় যে, দ্বিতীয় পর্যায়ের ফসলও তখন বিক্রয়যোগ্য হয়ে যায় এবং তাকে প্রথম পর্যায়ের ফসল থেকে পৃথক করা সম্ভব হয়না। ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং তাদের একজন অন্য জনের পণ্য আত্মসাৎ করে।
আর দ্বিতীয় নিষিদ্ধ জিনিসটার উদ্ভব হয় এভাবে যে, বিক্রেতা সব সময় এমন ক্রেতা খুঁজে পায় না যে, প্রথম পর্যায়ের উৎপন্ন ফসল কিনবে। তাই এর ফলে তার পণ্য নষ্ট হওয়া অনিবার্য হয়ে উঠে। সুতরাং এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিক্রয় বৈধ। একে অবৈধ বলে রায় দেয়া হলে তা কঠোরতা ও অচলাবস্থা সৃষ্টি করবে, যা নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে: وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٌ 'তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোনো কঠোরতা আরোপ করেননি।' (সূরা হজ্জ: ৭৮)
ইবনে আবেদীন এই বক্তব্যকে অগ্রগণ্যরূপে গ্রহণ করেছেন এবং তদনুসারে শরিয়তের বিধান প্রণয়ন করেছেন। অধিকাংশ ফকিহের মতে এরূপ ক্ষেত্রে চুক্তি অবৈধ এবং প্রত্যেক পর্যায়ের ফসল পৃথকভাবে বিক্রয় করা বাধ্যতামূলক।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 গাছে থাকা অবস্থায় ফল বিক্রয় করা

📄 গাছে থাকা অবস্থায় ফল বিক্রয় করা


শীষে থাকা অবস্থায় গম বিক্রয় করা: শীষে থাকা অবস্থায় গম, খোসার ভেতরে থাকা তরকারী, সবজি এবং সরিষা, চাল, নারিকেল, বাদাম ইত্যাদি বিক্রয় করা বৈধ। কেননা এর প্রত্যেকটি শস্য বিশেষ। কাজেই এটা শীষে থাকা অবস্থায় বিক্রয় করা সম্পূর্ণ বৈধ। তবে মনে রাখতে হবে, রসূলুল্লাহ্ সা. শীষ পেকে না যাওয়া ও দুর্যোগমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন। যেহেতু এ ধরনের ক্রয়-বিক্রয় অনিবার্য প্রয়োজনেই করা হয়, তাই কিছুটা অস্বচ্ছতা থাকা সত্ত্বেও একে অব্যাহতি দেয়া হয়। এটা হানাফি ও মালেকি মযহাবের অভিমত।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতির দায় রহিত করা

📄 দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতির দায় রহিত করা


খরা, ঠান্ডা ও পানির অভাব ইত্যাকার যে সব দুর্যোগের শিকার হয়ে ফসলাদি নষ্ট হয়ে থাকে এবং যেগুলিতে মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তার ব্যাপারে শরিয়তে কিছু নির্দিষ্ট বিধিমালা রয়েছে। যখন পরিপক্কতা দৃশ্যমান হওয়ার পর ফল বা ফসল বিক্রয় করা হয় এবং বিক্রেতা তা ক্রেতার নিকট এভাবে হস্তান্তর করে যে, ফসল ক্ষেতেই থাকবে এবং ক্রেতা যখন যেভাবে ইচ্ছা তা কেটে বা পেড়ে নিতে পারবে, অত:পর কাটা বা পাড়ার সময় সমাগত হওয়ার আগেই ঐ
ফসল দুর্যোগে নষ্ট হয়ে যায়, তখন তা বিক্রেতার দায় হিসাবে গণ্য হবে, ক্রেতার উপর তার মূল্য পরিশোধের দায় বর্তাবে না। কেননা রসূলুল্লাহ্ সা. দুর্যোগের দায় রহিত করার আদেশ দিয়েছেন। (মুসলিম কর্তৃক জাবের রা. থেকে বর্ণিত।) অন্য বর্ণনা মোতাবেক রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: 'যদি তুমি তোমার ভাই এর নিকট কোনো ফল বিক্রয় কর, অত:পর তা দুর্যোগের শিকার হয়, তবে তার মূল্য বাবদ কিছু গ্রহণ করা তোমার জন্য হালাল হবেনা। করলে তুমি তোমার ভাই এর সম্পদ অন্যায় ভাবে গ্রহণের দায়ে দোষী হবে।'
তবে মনে রাখতে হবে, এ বিধান শুধু সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যখন বিক্রেতা ফল বা ফসলের মূল উৎস বাদে বিক্রয় করে বা মূলের মালেক ব্যতীত অন্য কারো নিকট বিক্রয় করে অথবা ক্রেতা পণ্য হস্তগত করতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বিলম্ব করে। নচেৎ এ সব ক্ষেত্রে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির দায় ক্রেতাকে বহন করতে হবে। আর যদি ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দুর্যোগের কারণে না হয় বরং মানুষের কর্মদোষে সংঘটিত হয়, তাহলে ক্রেতা ইচ্ছা করলে ক্রয় বাতিল করে বিক্রেতার নিকট থেকে মূল্য ফেরত চাইতে পারবে, অথবা যে ব্যক্তির কর্মদোষে ক্ষতি হয়েছে তার নিকট মূল্য দাবি করতে পারবে। এ মতটি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, আবু উবাইদ এবং মুহাদ্দিসগণের একটি দলের। ইবনুল কাইয়েম এ মতটিকে অগ্রগণ্য বলে গ্রহণ করেছেন। 'তাহযীবে সুনানে আবুদাউদ' নামক গ্রন্থে বলেন: 'অধিকাংশ আলিমের অভিমত এই যে, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির দায় রহিত করার আদেশটি মুস্তাহাব অর্থে গ্রহীত এবং মহানুভবতা সূচক, বাধ্যতামূলক অর্থে নয়। ইমাম মালেক বলেন: একতৃতীয়াংশ বা তার বেশি ক্ষতি হলে তা রহিত করা হবে, তার কম হলে রহিত করা হবেনা। ইমাম মালিকের শিষ্যগণ বলেন: দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি একতৃতীয়াংশের কম হলে তা ক্রেতার দায় গণ্য হবে, এর বেশি হলে বিক্রেতার।
হাদিসটির আদেশকে মুস্তাহাব অর্থে গ্রহণের প্রমাণ হিসেবে বলা হয়েছে যে, দুর্যোগটি সংঘটিত হয়েছে পণ্যের উপর ক্রেতার স্বত্বাধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। কেননা এখন সে যদি পণ্যটি বিক্রয় বা দান করতে চায় তবে তা তার জন্য বৈধ হবে।
রসূলুল্লাহ্ সা. যে পণ্যের দায় স্বীকৃত হয়নি, তা থেকে মুনাফা অর্জন করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং ঐ পণ্য বিক্রয় করা যখন শুদ্ধ, তখন প্রমাণিত হলো যে, ওটা তার দায়ভুক্ত। ইতিপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ্ সা. কোনো ফল বা ফসলের পরিপক্কতা দৃশ্যমান হওয়ার আগে বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং পরিপক্কতা দৃশ্যমান হওয়ার পর দুর্যোগের ক্ষতি যদি বিক্রেতার দায়ভুক্ত হতো, তাহলে এ নিষেধাজ্ঞা নিরর্থক হতো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00