📄 সবলে আনার শর্ত
দখলে আসার আগে বিক্রয় বৈধ না হওয়ার কারণ হলো, প্রথম বিক্রেতার নিকট পণ্যটি নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকতে পারে। তেমন কিছু সংঘটিত হয়ে থাকলে বিক্রয়টা হবে প্রবঞ্চনামূলক। আর প্রবঞ্চনামূলক বিক্রয় সব সময়ই অবৈধ। চাই পণ্য স্থাবর সম্পত্তি হোক বা অস্থাবর সম্পত্তি হোক এবং চাই তার পরিমাণ নির্দিষ্ট হোক বা অনির্দিষ্ট হোক। কেননা ইমাম আহমদ ও বায়হাকি বর্ণনা করেছেন, হাকিম ইবনে হিযাম বলছেন: হে রসূল সা. আমি তো কত কিছুই খরিদ করি। তার মধ্যে আমার জন্য কি কি হারাম ও কি কি হালাল? তিনি বললেন: তুমি যখন কোনো জিনিস খরিদ করবে, তখন তা দখল না করা পর্যন্ত বিক্রয় করবেনা।' ইমাম বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ্ সা. এর আমলে লোকেরা গুচ্ছহারে খাদ্য-শস্য কিনলে তা নিজ কাফেলায় না নেয়া পর্যন্ত বিক্রয় বন্ধ রাখা হতো। তবে দখলে আসার আগে স্বর্ণ কিংবা রূপার একটি অপরটির বিনিময়ে বিক্রয়ের বৈধতা এই মূলনীতির ব্যতিক্রম। ইবনে উমর রা. রসূলুল্লাহ্ সা.কে দিনারের বিনিময়ে উট বিক্রয় করা এবং তার বদলে দিরহাম নেয়া যাবে কিনা জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাকে এর অনুমতি দিয়েছেন।
দখলে আনার অর্থ: স্থাবর সম্পত্তিতে দখল সম্পন্ন হয় তখনই, যখন যে ব্যক্তির নিকট মালেকানা হস্তান্তরিত হয়েছে তাকে উক্ত সম্পত্তি দ্বারা তার ইচ্ছামত উপকৃত হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়, যেমন সে যদি জমিতে চাষবাস, বাড়িতে বসবাস, বৃক্ষের ফল আহরণ ইত্যাদি করতে চায়, তবে তা যেন করতে পারে। আর স্থাবর সম্পত্তি, যথা খাদ্য, বস্ত্র, প্রাণী ইত্যাদিতে দখল সম্পন্ন হবে নিম্নোক্ত পন্থায়: ১. পণ্য যদি পরিমাণযোগ্য হয় তবে মাপ বা ওজন দ্বারা মেপে তার পরিমাণ নির্ধারণ। ২. পণ্যের পরিমাণ অজানা হলে তা যেন সে পরিমাণ নির্ধারণ ছাড়াই যেখানে ইচ্ছা স্থানান্তর করতে পারে। ৩. অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী দখল সম্পন্ন হবে। স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ নির্ধারণ করার মাধ্যমে যে দখল সম্পন্ন হয়, তার প্রমাণ বুখারি বর্ণিত হাদিস:
রসূলুল্লাহ সা. উম্মান ইবনে আফ্ফান রা. কে বললেন: 'তুমি যখন মেপে দেয়ার শর্ত আরোপ করেছ, তখন মেপে দাও।' এ থেকে প্রমাণিত হলো, মাপা বা ওজন করার মাধ্যমে পরিমাণ নির্ধারণের শর্ত করা থাকলে সেভাবে পরিমাণ নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক। সুতরাং খাদ্যদ্রব্য হোক বা অন্য কিছু হোক, মাপ বা ওজন দ্বারা পরিমাপ যোগ্য যে জিনিসে মালেকানা স্বত্ব প্রচলিত হয়, তাতে পরিমাণ নির্ধারণের মাধ্যমে দখল প্রতিষ্ঠা জরুরি। পণ্যের স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হয় ইবনে উমর রা. থেকে বুখারি ও মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত নিম্নের হাদিস দ্বারা:
'ইবনে উমর রা. বলেন: আমরা আরোহীদের কাছ থেকে পরিমাণ নির্ধারণ ছাড়াই খাদ্যদ্রব্য কিনতাম। সে খাদ্য অন্যত্র স্থানন্তরিত করার আগে বিক্রি করতে রসূলুল্লাহ্ সা. আমাদের নিষেধ করেছেন।' এ বিধি শুধু খাদ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অন্য যে সকল জিনিস পরিমাণ নির্ধারণ ছাড়া বিক্রয় হয়, সেগুলোতেও কার্যকর। এ ছাড়া অন্য যে সব জিনিস সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহর কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ নেই, সেগুলোতে দখল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সমাজে প্রচলিত রীতি অনুসৃত হবে। যেখানে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশ আছে, সেখানে সে নির্দেশ অনুসৃত হবে। আর যেখানে কুরআন ও সুন্নার নির্দেশ নেই, সেখানে প্রচলিত রীতি কার্যকর হবে।
এর যৌক্তিকতা: দখল সম্পন্ন হওয়ার আগে পণ্য বিক্রয় নিষিদ্ধ হওয়ার যুক্তি এই যে, বিক্রেতা পণ্য বিক্রয় করার পর ক্রেতা দখলে না নেয়া পর্যন্ত পণ্যটি বিক্রেতার দায়ভুক্ত থাকবে। এরপর পণ্যটি নষ্ট হয়ে গেলে ক্ষতির দায় পড়বে বিক্রেতার ঘাড়ে, ক্রেতার ঘাড়ে নয়। ক্রেতা যখন এই অবস্থায় পণ্যটি অন্যের নিকট বিক্রয় করে এবং তাতে মুনাফা পায়, তখন সে এমন একটি পণ্যে মুনাফা পায়, যাতে সে ক্ষতির দায় বহন করেনি। এ বিষয়ে আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি ও ইবনে মাজা বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সা. এমন মুনাফা গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন, যাতে ক্ষতির দায় বহন করা হয়নি। তাছাড়া যে ক্রেতা তার ক্রীত পণ্য দখলে নেয়ার আগে বিক্রয় করে, সে ঐ ব্যক্তির মত, যে অন্য একজনের নিকট কিছু সম্পদ এই উদ্দেশ্যে প্রদান করে, যাতে সে তার কাছ থেকে অনুরূপ অন্য একটি সম্পদ একটু অধিকতর পরিমাণে গ্রহণ করতে পারে। এ ক্রেতা একই পণ্যকে সুকৌশলে দুটো চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করে, যার
ফলে এটা সুদের সাথে অধিকতর সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যায়। ইবনে আব্বাস রা. এই চাতুরী উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তাকে দখলে না আসা পণ্যের বিক্রয় নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: 'এটা হলো দিরহামের বিনিময়ে দিরহাম, আর খাদ্য তো বিলম্বে পাওয়া যাবে।'
📄 বিক্রয় চুক্তিতে সাক্ষী রাখা
সূরা বাকারার ২৮২ নং আয়াতে আল্লাহ্ বিক্রয় চুক্তি সম্পাদনের সময় সাক্ষী রাখার আদেশ দিয়েছেন: وَأَشْهِدُوا إِذَا تَبَايَعْتُم مَن وَلَا يُضَارُّ كَاتِبٌ وَلَا شَهِيدٌ . 'তোমরা যখন পরস্পরের মধ্যে বেচাকেনা করো, তখন সাক্ষী রেখো, লেখক এবং সাক্ষী যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।'
কিছু সংখ্যক ফকিহের মতে সাক্ষী রাখার আদেশটি এখানে মুস্তাহাব ও মংগলজনক কাজে উদ্বুদ্ধ করার অর্থ সংবলিত, বাধ্যতামূলক অর্থ সংবলিত নয়।
তবে আতা এবং ইবরাহিম নাখয়ির মতে যতো ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ জিনিসই হোক না কেন, তার বিক্রয়ে সাক্ষী রাখতেই হবে। আবু জাফর তাবারীর মতে এ মতই অগ্রগণ্য।
ইমাম জাসসাস 'আহকামুল কুরআন' গ্রন্থে লিখেছেন: ফকিহদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোনোই মতভেদ নেই যে, এ আয়াতে চুক্তি লিপিবদ্ধ করা, সাক্ষী রাখা ও বন্ধক রাখার যে আদেশ দেয়া হয়েছে, তার সবই মুস্তাহাব অর্থ সংবলিত ও উপদেশমূলক এবং দীন ও দুনিয়ার স্বার্থে এগুলিকে কল্যাণকর, সতর্কতামূলক ও মংগলজনক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর কোনোটিই বাধ্যতামূলক নয়। মুসলিম শাসিত বহু অঞ্চলে প্রাচীন ও মধ্যযুগে বহু ক্রয়-বিক্রয় ও লেনদেন চুক্তি সাক্ষী না রেখেই সম্পাদিত হয়েছে বলে বর্ণিত হয়েছে। অথচ তাদের অঞ্চলের ফকিহগণ এ আদেশের কথা জেনেও এর প্রতিবাদ করেননি। সাক্ষী রাখা যদি বাধ্যতামূলক হতো তবে এটা বর্জনকারীর বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ না করে ছাড়তেননা। এদ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তারা এটিকে মুস্তাহাব মনে করতেন এবং এটা রসূলুল্লাহ সা. এর আমল থেকে আমাদের আমল পর্যন্ত ক্রমাগতভাবে চলে আসছে। সাহাবি ও তাবিইদের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর যদি সাক্ষী রাখা হতো, তবে তার বর্ণনা অবশ্যই ব্যাপকভাবে সর্বোচ্চ দৃঢ়তা ও বিশ্বস্ততার সাথে লিপিবদ্ধ হতো এবং তারা সাক্ষী না রেখে ক্রয়-বিক্রয়ের প্রতিবাদ ও নিন্দা করতেন। কাজেই তাদের মধ্যে সাক্ষী রাখার বর্ণনা যখন ব্যাপকভাবে পাওয়া যায় না এবং এটি বর্জনের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদও উচ্চারিত হয়েছে বলে জানা যায় না, তখন প্রমাণিত হয় যে, লেনদেনে ও ক্রয়-বিক্রয়ে সাক্ষী রাখা ও লেখা বধ্যতামূলক নয়।
📄 বিক্রয়ের উপর বিক্রয়
বিক্রয়ের উপর বিক্রয় করা হারাম। কেননা ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: 'তোমাদের একজন তার অপর ভাইয়ের বিক্রয়ের উপর যেন বিক্রয় না করে।' (আহমদ, নাসায়ি)।
বুখারি ও মুসলিম আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: কোনো ব্যক্তি যেন তার অপর ভাইয়ের বিক্রয়ের উপর বিক্রয় না করে।' ইমাম আহমদ, নাসায়ি, আবু দাউদ ও তিরমিযি বর্ণনা করেন এবং তিরমিযি এ বর্ণনাকে হাসান আখ্যায়িত করেছেন: দুই ব্যক্তির নিকট একই জিনিস বিক্রয় করলে পণ্যটি প্রথমজনের প্রাপ্য হবে।'
ইমাম নববীর বিশ্লেষণে এর উদাহরণ এ রকম: 'কোনো ব্যক্তি কোনো পণ্য এই শর্তে বিক্রয় করবে যে, ক্রেতার পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকবে। অত:পর আরেকজন এসে তাকে অনুরোধ করবে যেন সে চুক্তি বাতিল করে, যাতে তা আরো কম মূল্যে বিক্রয় করে। আর অন্যের ক্রয়ের উপর ক্রয় করার উদাহরণ হলো, বিক্রেতার পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকবে, অত:পর কেউ এসে তাকে চুক্তি বাতিল করার অনুরোধ করবে, তার বিক্রীত পণ্য তার কাছ থেকে অধিকতর মূল্যে কিনতে পারে। ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এ আচরণ নিষিদ্ধ ও পাপ। তবে কেউ এ ধরনের ক্রয় ও বিক্রয় করলে তা কার্যকর হবে। এটা হানাফি, শাফেয়ি ও অন্যান্য ফকিহের মত। তবে যাহেরি মাযহাবের দাউদ ইবনে আলির মতে কার্যকর হবে না। ইমাম মালেক থেকে বর্ণিত দুটি মতের একটিতে কার্যকর এবং অপরটিতে অকার্যকর। তবে নিলাম
বিক্রয় এর ব্যতিক্রম। সে ক্ষেত্রে এটা জায়েয। কেননা সেখানে বিক্রয় স্থায়ী নয়। রসূলুল্লাহ্ সা. থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি কোনো পণ্য বিক্রয়ের জন্য উপস্থাপন করে বলতেন, কে বেশি মূল্য দেবে?
📄 গুদামের কাছে বিক্রয় করলে পণ্য প্রথম ক্রেতার প্রাপ্য
কেউ একটি পণ্য প্রথমে একজনের কাছে বিক্রয় করার পর পুনরায় আর একজনের কাছে বিক্রয় করলে শেষের বিক্রয় বাতিল হয়ে যাবে। কেননা বিক্রেতা যে পণ্য বিক্রয় করেছে, সে তার মালেক নয়। সেটি প্রথম ক্রেতার মালেকানায় চলে গেছে। এরূপ ঘটনায় দ্বিতীয় বিক্রয় পুণর্বিবেচনায় মেয়াদের মধ্যে বা তার পরে সম্পন্ন হোক, তাতে কিছু যায় আসেনা। কেননা পণ্য বিক্রয় করা মাত্রই তার মালেকানা থেকে বের হয়ে গেছে। সামুরা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: 'যে মহিলাকে দু'জন অভিভাবক বিয়ে দেয়, সে প্রথম অভিভাবকের। আর কেউ একই পণ্য দু'জনের কাছে বিক্রয় করলে তা প্রথম ক্রেতার।'