📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ক্রেতা-বিক্রেতার শর্ত

📄 ক্রেতা-বিক্রেতার শর্ত


ক্রেতা বা বিক্রেতা হওয়ার শর্ত হলো প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া ও সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া। সুতরাং পাগল, মাতাল ও অপ্রাপ্তবয়স্কের ক্রয়বিক্রয় বা ব্যবসা সংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদন বৈধ নয়। যে পাগল মাঝে মাঝে সুস্থমস্তিষ্ক হয় এবং মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়, তার সুস্থাবস্থায় সম্পাদিত চুক্তি শুদ্ধ এবং অসুস্থাবস্থার চুক্তি অশুদ্ধ। তবে যে বালক বা কিশোর ভালোমন্দ বুঝে, তার সম্পাদিত চুক্তি অভিভাবকের অনুমোদন সাপেক্ষে বৈধ। অভিভাবক অনুমোদন করলে তা আইনত গ্রহণযোগ্য।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 পণ্য সংক্রান্ত শর্ত

📄 পণ্য সংক্রান্ত শর্ত


পণ্যের বৈধতার জন্য ছয়টি শর্ত রয়েছে: ১. পবিত্র হওয়া ২. উপকারী হওয়া ৩. ক্রেতা বা বিক্রেতার তার উপর মালেকানা স্বত্ব থাকা। ৪. হস্তান্তরযোগ্য হওয়া। ৫. পরিচিত হওয়া ৬. বিক্রীত পণ্য হস্তান্তরিত হওয়া। শর্ত কয়টির বিশদ বিবরণ নিম্নে দেয়া গেল:
প্রথম শর্ত: পণ্যের পবিত্র হওয়া জরুরি। কেননা জাবির রা. বলেন, রসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: আল্লাহ্ মদ, মৃত জন্তু, শূকর ও মূর্তির বিক্রয় হারাম ঘোষণা করেছেন। লোকেরা বললো: হে রসূলুল্লাহ্ 'মৃত জন্তুর
চর্বির কথা কি ভেবে দেখেছেন? তা দ্বারা তো নৌকায় ও চামড়ায় রং দেয়া হয় এবং লোকেরা তা দ্বারা বাতি জ্বালায়।' রসূলুল্লাহ্ সা. বললেন: না, ওটা হারাম। অর্থাৎ এর বেচাকেনা হারাম। কেননা রসূলুল্লাহ্ সা. একই হাদিসে জনৈক ইহুদী কর্তৃক তা বিক্রয়ের নিন্দা করেছেন। এ কারণে ক্রয়বিক্রয় ব্যতীত মৃত জন্তুর চর্বির এমন ব্যবহার বৈধ, যা আহারের পর্যায়ে পড়েনা এবং মানুষের শরীরে প্রবেশ করেনা। সুতরাং এ দ্বারা চামড়ায় রং দেয়া ও বাতি জ্বালানো বৈধ। এ হাদিসের ব্যাখ্যা প্রসংগে আল্লামা ইবনুল কাইয়িম 'আলামুল মুওয়াক্কিঈন' নামক গ্রন্থে বলেন:
'মৃত জন্তুর চর্বি সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সা. এর উক্তি 'ওটা হারাম' সম্পর্কে দুটি বক্তব্য পাওয়া যায়: কেউ কেউ বলেন, এর অর্থ এ সব কাজ হারাম। অন্যরা বলেন: এর অর্থ এটা বিক্রয় করা হারাম যদিও ক্রেতা তা এ সব কাজে ব্যবহারের জন্যেই আয় করে। এ দুটি বক্তব্য এ প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করতে হবে যে, প্রশ্নটা কি উল্লেখিত উপকারিতার জন্য বিক্রয় করা সংক্রান্ত, না উল্লিখিত উপকারিতা সংক্রান্ত? প্রথমেই চর্বির এ সকল উপকারিতাকে নিষিদ্ধ করার তথ্য জানাননি, যার পরিপ্রেক্ষিতে তারা এ প্রয়োজনীয়তা তাঁকে জানিয়েছে। বরং তিনি তাদেরকে শুধু এ কথাই জানিয়েছেন যে, চর্বি বিক্রি নিষিদ্ধ। আর এর ফলে তারা তাঁকে জানিয়েছে যে, তারা এ সব উপকারিতার জন্যই চর্বি বিক্রি করে থাকে। ফলে রসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে চর্বি বিক্রয় করার অনুমতি দেননি। কিন্তু তাদেরকে এ সব কাজে চর্বি ব্যবহার করতেও নিষেধ করেননি। কেননা কোনো জিনিসের বিক্রয় অবৈধ হলেও তার উপকারিতা গ্রহণ করা বৈধ হতেও পারে। এরপর রসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: 'আল্লাহ্ ইহুদিদেরকে অভিসম্পাত করুন, আল্লাহ্ যখন মৃত জন্তুর চর্বি হারাম করলেন, তখন তারা তাকে দ্রবীভূত করে বিক্রয় করলো এবং তার মূল্য ভোগ করলো।'
প্রথমোক্ত তিনটি জিনিস অর্থাৎ মদ, মৃত জন্তু ও শূকরের বিক্রয় নিষিদ্ধ করার কারণ অধিকাংশ আলিমের মতে এগুলো অপবিত্র। এ থেকে প্রত্যেক অপবিত্র জিনিসই বিক্রয় করা হারাম সাব্যস্ত হয়। তবে হানাফি ও যাহেরি মাযহাবের ফকিহগণ যে সব জিনিসে শরিয়ত সম্মত উপকারিতা আছে, তার বিক্রয় বৈধ বলে মত দিয়েছেন। তারা বলেন: যে সকল গোবর ও বর্জ্য ক্ষেতখামারে ব্যবহার করা জরুরী এবং যা জ্বালানী বা সার হিসাবে উপকারী, তা বিক্রয় করা জায়িয।
তদ্রূপ, অন্য যে সব নাপাক জিনিস পানাহার ব্যতীত অন্যান্য কাজে ব্যবহারযোগ্য, তার বিক্রয় বৈধ, যেমন নাপাক তেল, যা দ্বারা বাতি জ্বালানো যায়, এবং রং দেয়া যায়। রং যদি কোনো কোনো কারণে নাপাক হয়ে যায়, তবে তা রং দেয়ার জন্য বিক্রয় করা যায়। বায়হাকি সহিহ সনদ সহকারে বর্ণনা করেছেন, ইবনে উমর রা. কে জিজ্ঞাসা করা হলো: তেলে ইঁদুর পড়লে কি করা যাবে? তিনি বললেন: 'তা দ্বারা বাতি জ্বালাও ও চামড়ায় রং কর।' একবার রসূলুল্লাহ সা. মাইমুনা রা. এর একটা মৃত ছাগল দেখতে পেলেন। দেখেই বললেন: তোমরা এর চামড়া খুলে পাকিয়ে কাজে লাগাতে পারনি? লোকেরা বললো: হে রসূল, ওটা তো মৃত জন্তু। রসূলুল্লাহ্ সা. বললেন: আল্লাহ্ তো শুধু ওটা খাওয়া নিষিদ্ধ করেছেন। অর্থাৎ খাওয়া ব্যতীত অন্যান্যভাবে তা দ্বারা উপকৃত হওয়া বৈধ। যতক্ষণ খাওয়া ব্যতীত অন্যান্য কাজে এ দ্বারা উপকৃত হওয়া বৈধ থাকবে, ততোক্ষণ তা বিক্রয় করা বৈধ থাকবে, যদি তা বিক্রয়ের উদ্দেশ্য হয় বৈধ উপকার গ্রহণ করা।
তবে জাবির রা. বর্ণিত হাদিসের জবাব এই যে, ঐ নিষেধাজ্ঞা ছিলো প্রাথমিক যুগে। পরে যখন ইসলাম মুসলমানদের মনে বদ্ধমূল হয়েছে, তখন খাওয়া ব্যতীত অন্যান্য কাজে তার ব্যবহার অনুমোদিত হয়েছে। প্রসংগত উল্লেখ্য, ফিকহুস সুন্নাহর প্রথম খন্ডে মদের অপবিত্রতা সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে। মদ বিক্রয় নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ সম্ভবত এই যে, মদ মানুষকে দেয়া আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নিয়ামত বিবেক- বুদ্ধি ছিনিয়ে নেয়। এ ছাড়া এর অন্যান্য ক্ষতি তো রয়েছেই, যা আমরা দ্বিতীয় খন্ডে আলোচনা করেছি। আর শূকর একে তো অপবিত্র, উপরন্তু তা এমন সব ক্ষতিকর রোগজীবাণু বহন করে, যা আগুনে ফুটালেও মরে না। এছাড়া শূকর লম্বা ক্রিমিও বহন করে, যা মানবদেহ থেকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খাদ্য চুষে খায়। আর মৃত জন্তুর বিক্রয় নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো অধিকাংশ জন্তুই কোনো না কোনো রোগেই মারা যায়। সুতরাং তার গোশত খাওয়া স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর। উপরন্তু এগুলোর প্রতি প্রত্যেক মানুষেরই মনে স্বাভাবিক ঘৃণা
ও বিতৃষ্ণার প্রবণতা তো রয়েছেই। আর যে সব জন্তুর আকস্মিক মৃত্যু ঘটে, সেগুলো অতি দ্রুত বিকৃত হয়ে যায়। কারণ তাতে রক্ত আটকে থাকে। রক্ত আগুনে ফুটালেও মরে না, এমন রোগজীবাণুর জন্ম ও লালনের উৎকৃষ্টতম উৎস। একই কারণে প্রবাহমান রক্ত খাওয়া ও বিক্রয় করা হারাম।
দ্বিতীয় শর্ত: পণ্যটি উপকারী হওয়া চাই। সাপ, ইঁদুর ও কীটপতংগ, যার কোন উপকারিতা নেই, বিক্রয় করা জায়েয নেই। তবে বিড়াল, মৌমাছি, বাঘ, সিংহ ও শিকার করার যোগ্য এবং চামড়া দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এমন জন্তু বিক্রয় করা জায়েয। পরিবহনের জন্যে হাতি বিক্রয় করা জায়েয। অনুরূপ ময়ূর, তোতা ও সুদর্শন পাখিগুলো বিক্রয় করা বৈধ, চাই তার গোশত হালাল হোক বা না হোক। কেননা কিছু কিছু পাখির ডাক শোনা আনন্দ দায়ক। আবার কতক পাখি দেখে এ আনন্দ পাওয়া যায় এবং বৈধ বিনোদন হয়। শিকারের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যতীত কুকুর বিক্রয় করা নিষিদ্ধ। কেননা রসূলুল্লাহ সা. এটা বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন। তবে যে সকল কুকুরকে পোষ মানানো সম্ভব, যেমন পাহারার কুকুর ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত কুকুর, সেগুলোর বিক্রয় ইমাম আবু হানিফার মতে জায়েয। কিন্তু আতা ও নাখয়ির মতে, শিকারী কুকুর ব্যতীত আর কোনো কুকুর বিক্রয় জায়েয নেই। যে কুকুর বিক্রয় করা অবৈধ, তা যদি কেউ হত্যা করে তবে ইমাম শওকানি বলেছেন: যে সকল ফকিহ কুকুর বিক্রয় করা অবৈধ বলেন, তাদের মতে, তার মূল্য দিতে সে বাধ্য নয়। আর যারা বিক্রয় করা বৈধ মনে করেন, তাদের মতে মূল্য দিতে বাধ্য। ইমাম মালিকের মতে কুকুর বিক্রয় করা অবৈধ, কিন্তু তার হত্যাকারী তার মূল্য দিতে বাধ্য। কোনো কোনো বর্ণনা মতে ইমাম মালেক কুকুর বিক্রয় করা মাকরূহ মনে করেন। ইমাম আবু হানিফা বলেন: কুকুর বিক্রয় করা জায়েয এবং তার হত্যাকারী তার মূল্য দিতে বাধ্য।
গানের যন্ত্র বিক্রয় করা: সংগীত ক্ষেত্রবিশেষে বৈধ। যে সংগীতের উদ্দেশ্য কোনো বৈধ উপকার অর্জন করা, তা গাওয়াও হালাল, শোনাও হালাল। এভাবে তা একটা বৈধ উপকারিতায় রূপান্তরিত হয় ও তার সাজসরঞ্জামের ক্রয়বিক্রয়ও জায়েয। এর সুনির্দিষ্ট কার্যকারিতা রয়েছে। বৈধ সংগীতের উদাহরণ: ১. শিশুদের সান্ত্বনা ও মন ভোলানোর জন্য গাওয়া মায়েদের গান। ২. বিভিন্ন পেশায় কর্মরতদের কাজের সময়ে গাওয়া গান, যাতে তাদের শ্রমের কষ্ট লাঘব হয় এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় বৃদ্ধি পায়। ৩. আনন্দোৎসবের প্রচার বৃদ্ধির লক্ষ্যে গাওয়া গান। ৪. উৎসবাদিতে আনন্দ প্রকাশের লক্ষ্যে গাওয়া গান। ৫. জিহাদে উদ্দীপনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গাওয়া গান।
অনুরূপ প্রত্যেক ইবাদতের জন্য প্রেরণা ও কর্মোদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য গাওয়া গান। গান বা সংগীত কথা ছাড়া কিছু নয়। সংগীতের কথা ভালো হলে সংগীত ভালো। আর কথা খারাপ হলে সংগীত খারাপ। সংগীতে অশ্লীল, পাপ ও অনৈতিক কাজের প্ররোচনা থাকলে, ইবাদত থেকে উদাসীন করে দেয় এমন কথা থাকলে সে সংগীত হালাল থাকবেনা।
সংগীত মূলত হালাল। কেবল পাপ ও অশ্লীলতার প্ররোচক কথাই তাকে হালালের গণ্ডীর বাইরে নিক্ষেপ করে। যেসব হাদিসে সংগীত নিষিদ্ধ বলা হয়েছে, সেগুলিকে এই প্রেক্ষাপটেই বিবেচনা করতে হবে। সংগীত যে মূলত হালাল, তার প্রমাণ হলো: ১. ইমাম বুখারি ও মুসলিম আয়েশা রা. সূত্রে বর্ণনা করেন: একবার ঈদের দিন আয়েশার রা. নিকট দু'জন দাসী গান গাইছিল ও ঢোল বাজাচ্ছিল। রসূলুল্লাহ সা. কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিলেন। এ সময় আবু বকর রা. সেখানে এসেই দাসীদ্বয়কে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলেন। সংগে সংগে রসূলুল্লাহ্ সা. মুখ খুললেন এবং বললেন: 'হে আবু বকর, ওদেরকে গাইতে দাও। এখন ঈদের দিন।' ২. ইমাম আহমদ ও তিরমিযি বিশুদ্ধ সনদ-সহকারে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ সা. একটি যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর জনৈকা কৃষ্ণাংগ দাসী এসে বললো; 'হে রসূলুল্লাহ্, আমি মান্নত করেছি যে, আল্লাহ্ আপনাকে অক্ষতভাবে ফিরিয়ে আনলে আপনার সামনে বসে ঢোল বাজাবো ও গান গাইবো।' রসূলুল্লাহ্ সা. বললেন: মান্নত মেনে থাকলে বাজাও। অমনি সে ঢোল বাজাতে লাগলো।'
৩. বহু সংখ্যক সাহাবী ও তাবেয়ী সম্পর্কে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁরা গান ও বাজনা শুনতেন। সাহাবীদের মধ্যে আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবায়ের ও আব্দুল্লাহ্ ইবনে জা'ফর এবং তাবেয়ীদের মধ্য থেকে উমর ইবনে আব্দুল আযীয, বিচারপতি শুরাইহ ও মদিনার মুফতি আব্দুল আযীয ইবনে মুসলিমার নাম উল্লেখযোগ্য।
তৃতীয় শর্ত: পণ্যটি বিক্রেতার মালেকানাভুক্ত অথবা মালিকের অনুমতিপ্রাপ্ত হওয়া চাই, যাতে তার উপর ক্রয়বিক্রয়ের চুক্তি সম্পাদিত হতে পারে। অনুমতি পাওয়ার পূর্বে ক্রয়বিক্রয় হলে তা হবে 'ফুযুলি' ব্যবসা।
ফুযুলি ব্যবসা: ফুযুলি ব্যবসা হলো, যার নামে পণ্য ক্রয় বা বিক্রয় করা হয়, তার অনুমতি ছাড়া ক্রয় বা বিক্রয় করা। যেমন স্ত্রীর মালেকানাধীন পণ্য তার অনুমতি ব্যতীত বিক্রয় করা অথবা স্ত্রীর পণ্য তার অনুমতি ছাড়াই কোনো পণ্য ক্রয় করা, কিংবা কোনো অনুপস্থিত ব্যক্তির মালেকানাভুক্ত জিনিস তার অনুমতি ছাড়া বিক্রয় করা বা তার জন্যে তার অনুমতি ব্যতীত কিছু ক্রয় করা, যেমন সচরাচর হয়ে থাকে। ফুফুলি ব্যবসার চুক্তি বৈধ। তবে তার কার্যকারীতা মালেক বা তার বৈধ অভিভাবক বা উত্তরাধিকারীর অনুমতির উপর নির্ভরশীল ও অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। অনুমতি দিলে কার্যকরী হবে, না দিলে বাতিল হবে। উরওয়া বারেকী থেকে ইমাম বুখারি বর্ণিত এ হাদিসটি এর প্রমাণ: 'রসূলুল্লাহ্ সা. আমাকে এক দিনার দিয়ে তাঁর জন্য একটা ছাগল কিনতে পাঠালেন। আমি তাঁর জন্যে ঐ এক দিনার দিয়ে দুটো ছাগল কিনলাম। একটা এক দিনারে বিক্রয় করে রসূলুল্লাহ্ সা. এর নিকট একটা ছাগল ও এক দিনার নিয়ে ফিরে এলাম। রসূলুল্লাহ্ সা. বললেন: 'তোমার ব্যবসায়ে আল্লাহ্ বরকত দিন।'
ইমাম আবুদাউদ ও তিরমিযি হাকিম ইবনে হিযাম রা. থেকে বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ্ সা. তাঁকে (হাকিমকে) এক দিনার দিয়ে একটা কুরবানীর জন্তু ক্রয় করতে পাঠালেন। হাকিম একটা কুরবানীর জন্তু এক দিনার দিয়ে কিনে তা দুই দিনারে বিক্রয় করলেন। পুনরায় এক দিনার দিয়ে অন্য একটা জন্তু কিনে রসূলুল্লাহ্ সা. এর কাছে জন্তু ও দিনারটি নিয়ে ফিরে এলেন এবং এভাবে এক দিনার মুনাফা করলেন। রসূলুল্লাহ্ সা. বললেন: 'আল্লাহ তোমার ব্যবসায় বরকত দিন।'
প্রথম হাদিসটিতে বলা হয়েছে, উরওয়া রসূলুল্লাহ্ সা. এর অনুমতি ব্যতিরেকে তাঁর জন্য দ্বিতীয় ছাগলটি কিনলেন এবং তার অনুমতি ব্যতিরেকেই সেটি আবার বিক্রয় করলেন। পরে তিনি যখন রসূলুল্লাহ্ সা. এর কাছে ফিরে গেলেন এবং তাকে ব্যাপারটা জানালেন, তখন রসূলুল্লাহ্ সা. তার এ কাজ সঠিক হয়েছে বলে মত দিলেন এবং তার জন্যে দোয়া করলেন। এ থেকে প্রমাণিত হলো যে, দ্বিতীয় ছাগলটি কেনা ও তা বিক্রয় করা বৈধ হয়েছে। এ থেকে এও প্রমাণিত হয় যে, বিনা অনুমতিতে অন্যের জিনিস ক্রয় ও বিক্রয় করা জায়েয। কেবল মালিকের অনুমতির উপর তার কার্যকারিতা নির্ভর করে যাতে তার এ কাজ ছাড়া মালিকের কোনো ক্ষতি না হয়।
আর দ্বিতীয় হাদিসে বলা হয়েছে যে, হাকিম ইবনে হিযাম প্রথমে একটি ছাগল কিনে তা বিক্রয় করেন এবং তা রসূলুল্লাহ্ সা. এর মালেকানাভুক্ত হলো। তারপর রসূলুল্লাহ্ সা. এর অনুমতি ব্যতিরেকে তাঁর জন্য আরেকটি ছাগল কিনলেন। তাঁর এ কাজ রসূলুল্লাহ সা. অনুমোদন করলেন, তার নিয়ে আসা ছাগল কুরবানী করার আদেশ দিলেন এবং তার জন্যে দোয়া করলেন। এ থেকে জানা গেল যে, তাঁর প্রথম ছাগল বিক্রয় ও দ্বিতীয় ছাগল ক্রয় বৈধ হয়েছে। বৈধ না হলে তিনি তার কাজটির স্বীকৃতি দিতেন না এবং তাকে তার চুক্তি বাতিল করার আদেশ দিতেন।
চতুর্থ শর্ত: বিক্রীত বা ক্রীত পণ্যটি আইনত ও কার্যত হস্তান্তরযোগ্য হওয়া চাই। কার্যত হস্তান্তরযোগ্য নয়, এমন পণ্য বিক্রয় করা বৈধ নয়, যেমন পানিতে বিচরণরত মাছ। ইবনে মাসউদ রা. থেকে ইমাম আহমদ বর্ণনা করেন, তোমরা পানিতে থাকা মাছ ক্রয় করো না। কেননা এটা একটা ধোঁকা। হাদিসটি ইমরান ইবনুল হুছাইন রা. কর্তৃকও রসূলুল্লাহ্ সা. থেকে বর্ণিত হয়েছে।
ডুবুরীর সম্ভাব্য অর্জন ক্রয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন: একজন পেশাদার ডুবুরী বললো, এইবার ডুব দিয়ে যা পাবো তা তোমাকে এত টাকার বিনিময়ে দেব। মায়ের গর্ভে থাকা বাচ্চার ব্যাপারাটিও তদ্রূপ। অনুরূপ ছুটে যাওয়া যে পাখি তার আবাস স্থলে ফিরে আসতে অভ্যস্ত নয়, তার ক্রয়বিক্রয়ও অবৈধ। আর যদি ফিরে আসতে অভ্যস্ত হয়, চাই রাতের বেলায়ই আসুক না কেন, তাহলেও অধিকাংশ
আলেমের মতে মৌমাছি ছাড়া অন্য কোনো পাখি ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। কেননা রসূলুল্লাহ্ সা. মানুষের কাছে যা নেই তার ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন। ইমাম আবু হানিফা ব্যতীত অন্য তিন ইমামের মতে, বাসা থেকে বিচ্ছিন্ন রেশম কীট ও মৌমাছির ক্রয়-বিক্রয় জায়েয। যদি তা তার বাসায় আটক অবস্থায় থাকে এবং ক্রেতা ও বিক্রেতা তাকে দেখতে পায়।
হানাফিদের মতে মৌমাছি ব্যতীত অন্যান্য পাখি ক্রয়-বিক্রয় বৈধ। কেননা তা হস্তান্তর করা সম্ভব। ষাঁড়, পাঁঠা, এবং উট, ঘোড়া ও অন্যান্য পুরুষ প্রাণীর বীর্য বিক্রয় করাও অবৈধ। ইমাম বুখারি প্রমুখ বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সা. এটি নিষিদ্ধ করেছেন। কেননা এর কোন আকার-আয়তন, পরিমাণ ও মূল্য নির্দিষ্ট করা বা জানা যায় না, এবং হস্তান্তর করাও সম্ভব নয়। অধিকাংশ আলেমের মতে, প্রজনন কাজে পুরুষ জন্তু বিক্রয় ও ভাড়া দেয়া হারাম। তবে শর্ত আরোপ ব্যতীত পুরুষ প্রাণীর দ্বারা প্রজননের জন্যে স্বেচ্ছায় যা দেয়া হয়, তাতে আপত্তি নেই। ইমাম মালেক, হাম্বলী ও শাফেয়িদের একটি দল এবং ইমাম হাসান ও ইবনে সিরীনের মতানুসারে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্যে যৌন সংগমের উদ্দেশ্যে ষাঁড় ভাড়া দেয়া জায়েয আছে। অপর দিকে অজ্ঞতা ও অস্বচ্ছতার কারণে গাভীর ওলানে থাকা দুধ দোহনের আগে বিক্রয় করা জায়েয নয়।
ইমাম শওকানী বলেছেন: অবশ্য কেউ যদি নির্দিষ্ট পরিমাণে বিক্রয় করে তবে তা বৈধ। যেমন বিক্রেতা যদি বলে: 'আমার গাভীর দুধ থেকে তোমার নিকট এক সা' বিক্রয় করলাম। এ ধরনের বিক্রয় জায়েয হওয়ার পক্ষে হাদিস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। কেননা এখানে অজ্ঞতা, অস্বচ্ছতা ও প্রবঞ্চনার অবকাশ থাকেনা। অণুরূপ, ধাত্রীর স্তনের দুধও প্রয়োজনে বিক্রয় করা জায়েয আছে। কিন্তু পশুর পিঠে থাকা অবস্থায় পশম বিক্রয় করা জায়েয নেই। কেননা এখানে বিক্রীত পণ্য ও অবিক্রীত পণ্য মিশ্রিত থাকায় পণ্য হস্তান্তর সম্ভব নয়।
এক বর্ণনা অনুযায়ী কেটে দেয়ার শর্তে পশুর পিঠের পশম বিক্রয় করা জায়েয আছে। কেননা এতে বিক্রীত পশমের পরিমাণও জানা থাকে এবং তা হস্তান্তর করাও সম্ভব।
ইবনে আব্বাস রা. সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সা. স্বাদ আস্বাদন করা বা চেখে দেখার পূর্ব পর্যন্ত খোর্মা বিক্রয়, পিঠের উপর থাকা অবস্থায় পশম বিক্রয় এবং দুধের ভেতরে থাকা অবস্থায় ঘি বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন। (দারা কুতনি) আর যে পণ্য আইনত হস্তান্তর করা সম্ভব নয়, যেমন বন্ধকী ও ওয়াকফকৃত বস্তু, তা বিক্রয় বৈধ নয়। পশু ও তার শিশু সন্তানের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দুটোর একটি বিক্রয় করাও বৈধ নয়। কেননা রসূলুল্লাহ সা. পশুকে নির্যাতন করতে নিষেধ করেছেন। তবে কোনো কোনো আলেমের মতে এটা জায়েয, যেমন পশুকে যবাই করা জায়েয। এই মতটিই অগ্রগণ্য। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ঋণ বিক্রয় করা অধিকাংশ ফকিহের মতে জায়েয। তবে ঋণগ্রস্ত নয় এমন ব্যক্তির নিকট বিক্রয় করা হানাফি, হাম্বলি ও যাহেরি মযহাব অনুসারে জায়েয নয়। কেননা বিক্রেতা বিক্রীত ঋণ ক্রেতার নিকট হস্তান্তর করতে সক্ষম নয়। ঋণগ্রস্তের উপর হস্তান্তরের শর্ত আরোপ করা হলে তা-ও জায়েয নয়। কেননা এটা অবিক্রেতার উপর শর্ত আরোপের শামিল। এ ধরনের শর্ত অবৈধ এবং অবৈধতার কারণে বিক্রয়ও অবৈধ হতে বাধ্য।
পঞ্চম শর্ত: পণ্য ও তার মূল্য জ্ঞাত হওয়া চাই। দুটোই যদি অজ্ঞাত হয় অথবা দুটোর একটা অজ্ঞাত হয়, তাহলে বিক্রয় বৈধ হবেনা। কেননা এতে অস্বচ্ছতা ও প্রবঞ্চনার অবকাশ রয়েছে। নির্দিষ্ট পণ্যকে চাক্ষুস দর্শন করাই পণ্য সম্পর্কে অবগতির জন্য যথেষ্ট হবে, চাই তার পরিমাণ জানা হোক বা না হোক, যেমন গুচ্ছ বিক্রয় বা নিলাম বিক্রয়ে হয়ে থাকে। তবে যে পণ্য কারো দায়িত্বে রক্ষিত আছে, তার মান ও পরিমাণ ক্রেতা ও বিক্রেতার জানা অপরিহার্য। আর মূল্যের মান কেমন, পরিমাণ কতো ও তা প্রদানের মেয়াদ কি, জানা জরুরি। যে পণ্য চুক্তি সম্পাদনের বৈঠকে অনুপস্থিত, যে পণ্য দর্শন করা কষ্টকর বা ক্ষতির ঝুকিপূর্ণ এবং যে পণ্য গুচ্ছ ধরে বিক্রয় হয়, সে পণ্যের বেচাকেনা সম্পর্কে আলাদা আলাদা বিধিমালা রয়েছে। এই বিধিমালা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
যে পণ্য চুক্তি সম্পাদনের বৈঠকে অনুপস্থিত: চুক্তি সম্পাদনের বৈঠকে অনুপস্থিত এমন পণ্যের বিক্রয় এ শর্তে জায়েয যে, তার সম্পর্কে যথাযথ তথ্য জ্ঞাত হওয়া যায় এমন বিবরণ প্রদত্ত হওয়া চাই।
পরে যদি দেখা যায়, বিবরণের সাথে পণ্যের মিল রয়েছে, তা হলে ক্রয়বিক্রয়ের চুক্তি বাধ্যতামূলক হবে। আর যদি গরমিল পাওয়া যায় তবে ক্রেতা বা বিক্রেতা উভয়েরই চুক্তি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতা থাকবে। ইমাম বুখারি প্রমুখ বর্ণনা করেছেন, ইবনে উমর রা. বলেন: আমি আমীরুল মুমিনীন উসমান এর নিকট ওয়াদিতে একটা জমি তার খয়বরের একটা জমির বিনিময় বিক্রয় করেছি।' আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি কোনো জিনিস না দেখে খরিদ করে, দেখার পর সে তা ফেরত দিতে পারবে। (দারা কুতনি, বায়হাকি)
দেখায় ক্ষতির সম্ভাবনা আছে বা কষ্টকর, এমন পণ্যের বিক্রয়: যে পণ্যের বিবরণ দেয়া হয় অথবা প্রথাসিদ্ধভাবে গুণাগুণ জানা যায়, সে পণ্যের বিক্রয় বৈধ। যেমন সংরক্ষিত খাদ্য, বোতলজাত ওষুধ, অক্সিজেন, বেনজিন বা গ্যাসের সিলিন্ডার ইত্যাদি, যা ব্যবহারের সময় ব্যতীত খোলা হয়না, কেননা তা খুললে ক্ষতি বা কষ্টের ঝুঁকি আছে। যে সকল শস্যের দানা বা ফল মাটির নীচে অদৃশ্য অবস্থায় থাকে যেমন আলু, পিঁয়াজ, ওল ইত্যাদি, এ সবও তদ্রূপ। কেননা এসব পণ্য এক সাথে সমস্তটা বের করে বিক্রয় করাও সম্ভব নয়, খুচরো খুচরোভাবেও বিক্রয় করা সম্ভব নয়। কেননা এটা একদিকে যেমন কষ্টসাধ্য, অন্যদিকে তেমনি এতে পণ্য নষ্ট ও ব্যবহারের অযোগ্য হয়েও যেতে পারে। সাধারণত এ সব পণ্য সুপ্রশস্ত ক্ষেতের উপর চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে বিক্রয় হয়ে থাকে। কারণ ক্ষেতের যে ফসল মাটির নীচে অদৃশ্যভাবে বিরাজ করে, তা যেখানে যেমন আছে সেভাবে ছাড়া বিক্রয় করা সম্ভবপর হয়না। আর যখন দেখা যায় যে, বিক্রীত পণ্যের নমুনার সাথে তার এত বেশি গরমিল রয়েছে যে, দু'পক্ষের যে কোনো এক পক্ষের ক্ষতির শিকার হতে হয়, তবে সে ইচ্ছা করলে চুক্তি বহাল রাখতেও পারবে, বাতিলও করতে পারবে। যেমন কেউ ডিম কিনে যদি দেখতে পায় তা নষ্ট তবে সে তা রাখতেও পারবে, ফেরতও দিতে পারবে।
এটা মালেকি মাযহাবের মত। আল্লামা ইবনুল কাইয়েম 'আলামুল মুওয়া ক্কিইন' গ্রন্থে এ মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে এরূপ ক্ষেত্রে বিক্রয় বাতিল হয়ে যাবে। কারণ এতে ধোঁকা ও অস্বচ্ছতা রয়েছে, যা নিষিদ্ধ। হানাফি মযহাব অনুসারে বিক্রয় বৈধ; কিন্তু দেখার পর বাতিল করা যাবে।
গুচ্ছ বিক্রয়: অজ্ঞাত পরিমাণ পণ্যের আনুমানিক বিক্রয় রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে সাহাবীদের মধ্যে প্রচলিত ছিলো। ক্রেতা ও বিক্রেতা একটা পণ্য চাক্ষুসভাবে প্রত্যক্ষ করার পর ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পদন করতো। পণ্যের সঠিক পরিমাণ জানা না থাকলেও অভিজ্ঞ লোকেরা এমনভাবে অনুমান করতো যে, খুব কমই ভুল করতো। কিছুটা ঠকার ঝুঁকি থাকলেও তা এত সামান্য যে, সাধারণত তার প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন করা হতো। ইবনে উমর রা. বলেন: লোকেরা বাজারের কেন্দ্র স্থলে খাদ্যদ্রব্য অনুমানের ভিত্তিতে ক্রয়-বিক্রয় করতো। রসূলুল্লাহ সা. তা ক্রেতাদের কাছে না আনা পর্যন্ত বিক্রয় করতে নিষেধ করেন। সুতরাং জানা গেল, রসূলুল্লাহ্ সা. আনুমানিকভাবে গুচ্ছ বিক্রয় অনুমোদন করেছেন, কেবল বাজারে নিয়ে আসার আগে বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন। ইবনে কুদামার মতে, ঝুঁড়ি ধরে বিক্রয় করা সর্বসম্মতভাবে বৈধ, পরিমাণ জানা থাক বা না থাক।
৬ষ্ঠ শর্ত: বিক্রীত পণ্য যদি কোনো কিছুর বিনিময়ে বিক্রেতার ব্যবহারাধীন এসে থাকে, তবে তা তার দখলেও আসা চাই। নচেত বিক্রয় বৈধ হবেনা। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। যা নিম্নরূপ: উত্তরাধিকার ও ওছিয়ত সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ, গচ্ছিত সম্পদ এবং কোনো বিনিময় ব্যতীত অর্জিত হয়েছে এমন সম্পদ দখলে আসার আগে ও পরে বিক্রয় করা জায়েয আছে। অনুরূপ, যে ব্যক্তি কোনো জিনিস ক্রয় করেছে, তা তার দখলে আসার পর বিক্রয় করা, দান করা কিংবা তাতে অন্য যে কোনো আইনানুগ হস্তক্ষেপ বৈধ। আর দখলে আসার আগে বিক্রয় ব্যতীত অন্য সব হস্তক্ষেপ বৈধ। বিক্রয় ব্যতীত অন্য সব হস্তক্ষেপ বৈধ হওয়ার কারণ এই যে, ক্রেতা কেবল চুক্তির মাধ্যমে তার মালেকানা অর্জন করেছে এবং সে তার মালেকানাভুক্ত সম্পত্তিতে যা ইচ্ছা করতে পারে। ইবনে উমর রা. বলেছেন: সামগ্রিকভাবে যা কিছু ক্রয় চুক্তির আওতায় আসে, তা ক্রেতার সম্পত্তি এটাই প্রচলিত রীতি। (বুখারি)।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সবলে আনার শর্ত

📄 সবলে আনার শর্ত


দখলে আসার আগে বিক্রয় বৈধ না হওয়ার কারণ হলো, প্রথম বিক্রেতার নিকট পণ্যটি নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকতে পারে। তেমন কিছু সংঘটিত হয়ে থাকলে বিক্রয়টা হবে প্রবঞ্চনামূলক। আর প্রবঞ্চনামূলক বিক্রয় সব সময়ই অবৈধ। চাই পণ্য স্থাবর সম্পত্তি হোক বা অস্থাবর সম্পত্তি হোক এবং চাই তার পরিমাণ নির্দিষ্ট হোক বা অনির্দিষ্ট হোক। কেননা ইমাম আহমদ ও বায়হাকি বর্ণনা করেছেন, হাকিম ইবনে হিযাম বলছেন: হে রসূল সা. আমি তো কত কিছুই খরিদ করি। তার মধ্যে আমার জন্য কি কি হারাম ও কি কি হালাল? তিনি বললেন: তুমি যখন কোনো জিনিস খরিদ করবে, তখন তা দখল না করা পর্যন্ত বিক্রয় করবেনা।' ইমাম বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ্ সা. এর আমলে লোকেরা গুচ্ছহারে খাদ্য-শস্য কিনলে তা নিজ কাফেলায় না নেয়া পর্যন্ত বিক্রয় বন্ধ রাখা হতো। তবে দখলে আসার আগে স্বর্ণ কিংবা রূপার একটি অপরটির বিনিময়ে বিক্রয়ের বৈধতা এই মূলনীতির ব্যতিক্রম। ইবনে উমর রা. রসূলুল্লাহ্ সা.কে দিনারের বিনিময়ে উট বিক্রয় করা এবং তার বদলে দিরহাম নেয়া যাবে কিনা জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাকে এর অনুমতি দিয়েছেন।
দখলে আনার অর্থ: স্থাবর সম্পত্তিতে দখল সম্পন্ন হয় তখনই, যখন যে ব্যক্তির নিকট মালেকানা হস্তান্তরিত হয়েছে তাকে উক্ত সম্পত্তি দ্বারা তার ইচ্ছামত উপকৃত হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়, যেমন সে যদি জমিতে চাষবাস, বাড়িতে বসবাস, বৃক্ষের ফল আহরণ ইত্যাদি করতে চায়, তবে তা যেন করতে পারে। আর স্থাবর সম্পত্তি, যথা খাদ্য, বস্ত্র, প্রাণী ইত্যাদিতে দখল সম্পন্ন হবে নিম্নোক্ত পন্থায়: ১. পণ্য যদি পরিমাণযোগ্য হয় তবে মাপ বা ওজন দ্বারা মেপে তার পরিমাণ নির্ধারণ। ২. পণ্যের পরিমাণ অজানা হলে তা যেন সে পরিমাণ নির্ধারণ ছাড়াই যেখানে ইচ্ছা স্থানান্তর করতে পারে। ৩. অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী দখল সম্পন্ন হবে। স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ নির্ধারণ করার মাধ্যমে যে দখল সম্পন্ন হয়, তার প্রমাণ বুখারি বর্ণিত হাদিস:
রসূলুল্লাহ সা. উম্মান ইবনে আফ্ফান রা. কে বললেন: 'তুমি যখন মেপে দেয়ার শর্ত আরোপ করেছ, তখন মেপে দাও।' এ থেকে প্রমাণিত হলো, মাপা বা ওজন করার মাধ্যমে পরিমাণ নির্ধারণের শর্ত করা থাকলে সেভাবে পরিমাণ নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক। সুতরাং খাদ্যদ্রব্য হোক বা অন্য কিছু হোক, মাপ বা ওজন দ্বারা পরিমাপ যোগ্য যে জিনিসে মালেকানা স্বত্ব প্রচলিত হয়, তাতে পরিমাণ নির্ধারণের মাধ্যমে দখল প্রতিষ্ঠা জরুরি। পণ্যের স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হয় ইবনে উমর রা. থেকে বুখারি ও মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত নিম্নের হাদিস দ্বারা:
'ইবনে উমর রা. বলেন: আমরা আরোহীদের কাছ থেকে পরিমাণ নির্ধারণ ছাড়াই খাদ্যদ্রব্য কিনতাম। সে খাদ্য অন্যত্র স্থানন্তরিত করার আগে বিক্রি করতে রসূলুল্লাহ্ সা. আমাদের নিষেধ করেছেন।' এ বিধি শুধু খাদ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অন্য যে সকল জিনিস পরিমাণ নির্ধারণ ছাড়া বিক্রয় হয়, সেগুলোতেও কার্যকর। এ ছাড়া অন্য যে সব জিনিস সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহর কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ নেই, সেগুলোতে দখল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সমাজে প্রচলিত রীতি অনুসৃত হবে। যেখানে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশ আছে, সেখানে সে নির্দেশ অনুসৃত হবে। আর যেখানে কুরআন ও সুন্নার নির্দেশ নেই, সেখানে প্রচলিত রীতি কার্যকর হবে।
এর যৌক্তিকতা: দখল সম্পন্ন হওয়ার আগে পণ্য বিক্রয় নিষিদ্ধ হওয়ার যুক্তি এই যে, বিক্রেতা পণ্য বিক্রয় করার পর ক্রেতা দখলে না নেয়া পর্যন্ত পণ্যটি বিক্রেতার দায়ভুক্ত থাকবে। এরপর পণ্যটি নষ্ট হয়ে গেলে ক্ষতির দায় পড়বে বিক্রেতার ঘাড়ে, ক্রেতার ঘাড়ে নয়। ক্রেতা যখন এই অবস্থায় পণ্যটি অন্যের নিকট বিক্রয় করে এবং তাতে মুনাফা পায়, তখন সে এমন একটি পণ্যে মুনাফা পায়, যাতে সে ক্ষতির দায় বহন করেনি। এ বিষয়ে আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি ও ইবনে মাজা বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সা. এমন মুনাফা গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন, যাতে ক্ষতির দায় বহন করা হয়নি। তাছাড়া যে ক্রেতা তার ক্রীত পণ্য দখলে নেয়ার আগে বিক্রয় করে, সে ঐ ব্যক্তির মত, যে অন্য একজনের নিকট কিছু সম্পদ এই উদ্দেশ্যে প্রদান করে, যাতে সে তার কাছ থেকে অনুরূপ অন্য একটি সম্পদ একটু অধিকতর পরিমাণে গ্রহণ করতে পারে। এ ক্রেতা একই পণ্যকে সুকৌশলে দুটো চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করে, যার
ফলে এটা সুদের সাথে অধিকতর সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যায়। ইবনে আব্বাস রা. এই চাতুরী উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তাকে দখলে না আসা পণ্যের বিক্রয় নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: 'এটা হলো দিরহামের বিনিময়ে দিরহাম, আর খাদ্য তো বিলম্বে পাওয়া যাবে।'

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বিক্রয় চুক্তিতে সাক্ষী রাখা

📄 বিক্রয় চুক্তিতে সাক্ষী রাখা


সূরা বাকারার ২৮২ নং আয়াতে আল্লাহ্ বিক্রয় চুক্তি সম্পাদনের সময় সাক্ষী রাখার আদেশ দিয়েছেন: وَأَشْهِدُوا إِذَا تَبَايَعْتُم مَن وَلَا يُضَارُّ كَاتِبٌ وَلَا شَهِيدٌ . 'তোমরা যখন পরস্পরের মধ্যে বেচাকেনা করো, তখন সাক্ষী রেখো, লেখক এবং সাক্ষী যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।'
কিছু সংখ্যক ফকিহের মতে সাক্ষী রাখার আদেশটি এখানে মুস্তাহাব ও মংগলজনক কাজে উদ্বুদ্ধ করার অর্থ সংবলিত, বাধ্যতামূলক অর্থ সংবলিত নয়।
তবে আতা এবং ইবরাহিম নাখয়ির মতে যতো ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ জিনিসই হোক না কেন, তার বিক্রয়ে সাক্ষী রাখতেই হবে। আবু জাফর তাবারীর মতে এ মতই অগ্রগণ্য।
ইমাম জাসসাস 'আহকামুল কুরআন' গ্রন্থে লিখেছেন: ফকিহদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোনোই মতভেদ নেই যে, এ আয়াতে চুক্তি লিপিবদ্ধ করা, সাক্ষী রাখা ও বন্ধক রাখার যে আদেশ দেয়া হয়েছে, তার সবই মুস্তাহাব অর্থ সংবলিত ও উপদেশমূলক এবং দীন ও দুনিয়ার স্বার্থে এগুলিকে কল্যাণকর, সতর্কতামূলক ও মংগলজনক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর কোনোটিই বাধ্যতামূলক নয়। মুসলিম শাসিত বহু অঞ্চলে প্রাচীন ও মধ্যযুগে বহু ক্রয়-বিক্রয় ও লেনদেন চুক্তি সাক্ষী না রেখেই সম্পাদিত হয়েছে বলে বর্ণিত হয়েছে। অথচ তাদের অঞ্চলের ফকিহগণ এ আদেশের কথা জেনেও এর প্রতিবাদ করেননি। সাক্ষী রাখা যদি বাধ্যতামূলক হতো তবে এটা বর্জনকারীর বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ না করে ছাড়তেননা। এদ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তারা এটিকে মুস্তাহাব মনে করতেন এবং এটা রসূলুল্লাহ সা. এর আমল থেকে আমাদের আমল পর্যন্ত ক্রমাগতভাবে চলে আসছে। সাহাবি ও তাবিইদের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর যদি সাক্ষী রাখা হতো, তবে তার বর্ণনা অবশ্যই ব্যাপকভাবে সর্বোচ্চ দৃঢ়তা ও বিশ্বস্ততার সাথে লিপিবদ্ধ হতো এবং তারা সাক্ষী না রেখে ক্রয়-বিক্রয়ের প্রতিবাদ ও নিন্দা করতেন। কাজেই তাদের মধ্যে সাক্ষী রাখার বর্ণনা যখন ব্যাপকভাবে পাওয়া যায় না এবং এটি বর্জনের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদও উচ্চারিত হয়েছে বলে জানা যায় না, তখন প্রমাণিত হয় যে, লেনদেনে ও ক্রয়-বিক্রয়ে সাক্ষী রাখা ও লেখা বধ্যতামূলক নয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00