📄 ফেরাউনের দেহ
ফেরাউনের দেহ
وَجَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودَةً بَغْيًا وَعَدُوا حَتَّى إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ قَالَ أَمَنْتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُوا إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ التَّنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ.
We took the Bani Isreal across the sea, pharaoh and his hosts followed them in insolence and spite. At length, when overwhelemd with the flood, he said, I believe that there is no God except Allah whom the Bani Israel believe in. I am of those who submit to Allah" It was said to him, Ah, now! But a little while before was you in rebellion and you did mischief and violence!
আমরা বনি ইসরাইলদের নদী পার করে দিলাম এবং ফেরাউন ও তার বাহিনী বিদ্বেষ প্রসূত ঔদ্ধত্য নিয়ে তাদেরকে পশ্চাদ্ধাবন করছিল। অবশেষে যখন সে নিমজ্জিত হল তখন বলল "আমি ঈমান আনলাম সে-ই আল্লাহর উপর যিনি ছাড়া আর (কোন প্রভু) নেই, যার উপর বনি ইসরাইলগণ বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত। তাকে বলা হল, এখন কেন! পূর্বে তুমি তো অমান্যকারী ছিলে এবং অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে!
প্রায় তিন হাজার বৎসর পূর্বে, মিশর রাজ্যের শাসক ছিল ফারাও। কোরআনে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে ফেরাউন। মিশর প্রত্নতত্ত্ববিদ ও গবেষকগণ সে সময়কার ফেরাউনের নাম মারনেপতাহ বলে উল্লেখ করেছেন। শাসক হিসেবে ফেরাউন ছিল দুর্দণ্ড প্রতাপ সমৃদ্ধ স্বৈরাচার (Autocrat)। দম্ভ, অহংকার আর ঔদ্ধত্য মনোভাব তার কথা ও কাজে প্রকাশ পেত। এমন কি মানবীয় বৈশিষ্ট্যের সীমা অতিক্রম করে একদিন নিজেকে সে রব (انا الرب) ঘোষণা করে বসল। এ অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশিষ্ট নবী মুছা (আঃ) কে নির্দেশ দেন, ফেরাউনের দরবারে গিয়ে তাওহীদের দাওয়াত পেশ করার জন্য,
إِذْهَبَ إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى.
Now, go you to pharaoh, for he has indeed transgressed all bounds.
এখন তুমি (মুছা-আঃ) ফেরাউনের কাছে যাও, সে বড় অহংকারী সীমালঙ্ঘনকারী হয়েছে। (ত্বাহা-২৪)
কিন্তু ফেরাউন তাওহীদের দাওয়াত তো গ্রহণ করলই না। বরং মুছা (আঃ) ও তাঁর উম্মতদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে পশ্চাদ্ধাবন করে তাদেরকে নিয়ে গেল নীল নদের তীরে। আল্লাহ পাকের নির্দেশে সাথে সাথে নদের পানি দু'ভাগ হয়ে রাস্তা তৈরী হয়ে গেল। মুছা (আঃ) এবং তাঁর সাথী সঙ্গীরা সে রাস্তা বেয়ে নদের ওপার চলে গেলেন। ফেরাউন এবং তার সৈন্যবাহিনী একই রাস্তা অনুসরণ করে যে-ই মাত্র নদের মাঝখানে আসল, অমনি তরঙ্গের প্রচন্ড ঝাপটা এসে তাদেরকে নিমজ্জিত করে নিল। এমতাবস্থায় ফেরাউন বলল, "আমি মুছা (আঃ)-এর রবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম।" তখন আল্লাহপাক বললেন, "তোমাকে অনেক বার তাওহীদের দাওয়াত পেশ করা হয়েছিল, তুমি বরং বার বার ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিলে।
ফেরাউনের মৃতদেহ এখনো সংরক্ষিত আছে কায়রো শহরের তাজবীরে অবস্থিত জাতীয় যাদুঘরের 'রয়াল মমিজ' কক্ষে। মিশরীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ লরেট কর্তৃক ১৮৯৮ সালে এটি আবিষ্কৃত হয় এবং দেহটি ফেরাউন মারনেপতাহর বলে শনাক্ত করা হয়। কোরআন যখন অবতীর্ণ হয় তখন ফেরাউন মারনেপতাহর মরদেহ সংরক্ষিত ছিল নীল নদের পাড়ে অবস্থিত থিবিসের নেক্রোপলিস সমাধি ভূমিতে এবং তা মমি করা ছিল। রসায়নবিদ বিস্ময়বোধ করেন এ জন্য যে, কোন রাসায়নিক উপাদানে ফেরাউনের মরদেহ মমি করা হয়েছে যা হাজার হাজার বছর ধরে মৃতদেহটিকে অক্ষত রেখেছে? এ প্রসঙ্গে কোন কোন রসায়ন বিজ্ঞানী বলেছেন, হয়ত তখন ফেরাউনের সাথে জন্ম নিয়েছিল একদল রসায়নবিদ যাদের বিশিষ্ট আবিষ্কারের নিরিখে ফেরাউনের নিষ্প্রাণ অস্তিত্ব এখনো ঠিক আছে। প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ আল-কোরআনে ঘোষণা দিয়েছেন, ফেরাউনের লাশ রক্ষা করা হবে চিরকাল, যাতে সীমালঙ্ঘনকারী শাসক সম্প্রদায় শিক্ষা নিতে পারে।
فَالْيَوْمَ نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُوْنَ لِمَنْ خَلْفَكَ آيَةً وَإِنَّ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ عَنْ أَيْتِنَا لَغْفِلُونَ.
This day shall we save you (Feraun) in your very body so that you may be a sign to those who come after you. But indeed many among mankind are heedless to our signs.
আজ আমরা কেবল তোমার (ফেরাউন) মৃতদেহকেই রক্ষা করব যাতে তুমি পরবর্তীদের জন্য একটি নিদর্শন হয়ে থাকতে পার। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ আমাদের নিদর্শনের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন। (ইউনুছ-৯২)
📄 হযরত নূহ (আঃ) এর কিস্তি
হযরত নূহ (আঃ) এর কিস্তি
وَحَمَلْتُهُ عَلَى ذَاتِ الْوَاحِ وَدُسُرٍ. تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا جَزَاءً لِمَنْ كَانَ كُفِرَ وَلَقَدْ تَرَكْنَهَا آيَةً فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ.
But We bore him (Hazrat Nuh-A) on an ark made of planks and spikes. It floated under Our eyes, a reward for him who was rejected by them. And We left it (the Ark) as a sign for the coming generations. But is there anyone to receive lesson from it?
আমরা নূহকে কাষ্ঠ ও পেরেক নির্মিত নৌযানে আরোহণ করিয়েছি, যা চলত আমাদের দৃষ্টির সামনে। এটা ছিল তাঁর জন্য প্রতিদান, যাকে তারা (কাফেররা) প্রত্যাখ্যান করেছিল। আমরা একে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিদর্শন করে রেখেছি। অতএব, কেউ কি আছে যে, এ নিদর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে? (কমর-১৩-১৫)
১৯৫০ সালের ঘটনা। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার (NASA) স্থাপিত স্যাটেলাইট তুরস্কের একটি পর্বতের কাছাকাছি স্থান থেকে আসা মানব চক্ষুর আকৃতি বিশিষ্ট একটি বস্তুর ছবি প্রেরণ করে। ছবিটি দেখে বিজ্ঞানীদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায় এ জন্য যে, মানব চক্ষুর ন্যায় বিশাল এ ছবিটি কিসের হতে পারে? স্যাটেলাইট যে স্থান থেকে চিত্রটি তুলেছে তা হচ্ছে তুরস্কের জুদী পর্বতের কাছাকাছি স্থান। এ নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান ও গবেষণা চালিয়ে দীর্ঘদিনেও কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি।
অবশেষে মার্কিন তরুণ ভূ-তত্ত্ববিদ ডঃ ভান্দিল জোনস সফলকাম হলেন। তার প্রবল আগ্রহ এবং অনুসন্ধিৎসু মন তাকে নিয়ে গেল জুদী পর্বতের চূড়ায়। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন থেকে তিনি একটি তথ্য পেয়ে স্যাটেলাইট কর্তৃক প্রেরিত ছবির বাস্তবতা উপলব্ধি করে নিলেন। কোরআনে বর্ণিত তথ্যটি হচ্ছে, হাজার হাজার বৎসর পূর্বে আল্লাহর নবী নূহ (আঃ) মহাপ্লাবন থেকে আত্মরক্ষার জন্য একটি কিস্তি নির্মাণ করেছিলেন। প্লাবন শেষে কিস্তিটি জুদী পর্বতের চূড়ায় এসে ভিড়েছিল। ডঃ জোনস এ অনুসন্ধানের প্রথম পর্যায়ে তিনি তুরস্কে গিয়ে স্থানীয় প্রবীণ লোকজনের কাছ থেকে হযরত নূহ (আঃ) এবং তাঁর নির্মিত নৌকা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে কোরআনে বর্ণিত মহাপ্লাবন সম্পর্কে তথ্য লাভ করে জুদী পর্বতের চূড়ায় আরোহণ করেন এবং বহু কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি পেয়ে যান। সেটি হযরত নূহ (আঃ) এর কিস্তি। আবিষ্কৃত নৌকাটি ৫০ ফুটেরও অধিক চওড়া এবং দীর্ঘদিন পাহাড়ের অভ্যন্তরে থাকায় এর মূল আকারের বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছে। এখন আল-কোরআন বলছে,
وَقُضِيَ الْأَمْرُ وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِي وَقِيلَ بُعْدًا لِلْقَوْمِ الظَّلِمِينَ.
And the matter was ended. The Ark rested on the mount Judi.
এবং কাজ সমাপ্ত হল। আর নৌকাটি জুদী পর্বতের নিকট এসে ভিড়ল। (হুদ-৪৪)
📄 ইরাম শহর
ইরাম শহর
১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর সংস্করণে 'ন্যাশনাল জিওগ্রাফি' একটি তথ্য পরিবেশন করে, যাতে উল্লেখ করা হয় ১৯৭৩ সালে সিরিয়ায় 'ইবলা' শহর খনন করে আবিষ্কার করা হয়েছে। শহরটি ৩৪ শতাব্দীর পুরাতন এবং এতদিন যাবৎ মাটির নিচে চাপা পড়েছিল। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে আবিষ্কারকগণ ইবলা শহরের গ্রন্থাগারে একটি নথি খুঁজে পান, যাতে ইবলা শহরের লোকেরা যেসব শহরের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করতো তার সবকটির নাম লেখা রয়েছে। উক্ত তালিকায় 'ইরাম' শহরের নামটি ছিল। ইবলা শহরের লোকেরা ইরাম (স্তম্ভের শহর) শহরের ব্যবসায়ীদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছে, লেনদেন করেছে। মহান গ্রন্থ আল-কোরআন এ ইরাম শহরের নাম উল্লেখ করে বলেছে, সে-ই শহরের প্রথম আ'দ জাতি, যাদের দৈহিক গঠন ও শক্তি-সাহসে সব জাতি থেকে স্বতন্ত্র ছিল। এত দীর্ঘকায় জাতি আল্লাহ তা'আলা ইতিপূর্বে সৃষ্টি করেননি। কিন্তু তাদের অন্যায় কর্মের দরুন তাদেরকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছিল।
কোরআনের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে প্রত্নতত্ত্ববিদগণ ইরাম শহর সম্পর্কে কিছুই জানত না। এমন কি কোনো প্রাচীন ইতিহাসেও এ বিষয়ে কিছুই লিপিবদ্ধ ছিল না। জ্ঞানের মহান উৎস আল-কোরআন প্রত্নতত্ত্ববিদ্যার তথ্যসমূহ প্রকাশ করে বিজ্ঞানের এ শাখাটিকে বর্তমানে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে।
اَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ . إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ . الَّتِي لَمْ يُخْلَقُ مِثْلُهَا فِي الْبَلَادِ .
See you not how your Lord dealt with 'Ad of the city of Iram, with lofty pillars.
আপনি কি লক্ষ্য করেন না আপনার প্রভু আ'দ গোত্রের ইরামবাসীদের সাথে কী আচরণ করেছেন, যাদের দৈহিক গঠন ছিল স্তম্ভের ন্যায় দীর্ঘ। (ফজর-৬-৭)
কোনো কোনো তাফসীরবিদ বলেছেন, ইরাম আ'দ-তনয় শাদ্দাদ নির্মিত বেহেশতের নাম। কেননা এ অনুপম প্রাসাদটি বহু স্তম্ভের উপর দণ্ডায়মান এবং স্বর্ণ-রৌপ্য দ্বারা নির্মিত ছিল, যাতে মানুষ পরকালের বেহেশতের পরিবর্তে এ নগদ বেহেশতটির প্রতি আকৃষ্ট হয়। তাই এ বিরাট প্রাসাদের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর যখন শাদ্দাদ সভাসদসহ এ নকল বেহেশতে প্রবেশ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে, অমনি আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে কঠিন শাস্তি উপস্থিত হয়। ফলে সবাই আযাবে নিপতিত হয় এবং কৃত্রিম বেহেশতটিও মাটির গভীরে তলিয়ে যায়।
📄 Fate of those who rejected the truth
Fate of Those Who Rejected the Truth
قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِكُمْ سُنَنٌ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ.
Many were the ways of life that have passed away before you; travel through the earth and see what was the end of those who rejected truth.
জীবনের বহু পথ তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে। তোমরা পৃথিবী ভ্রমণ কর এবং তাদের পরিণতি দেখ যারা সত্যকে বর্জন করেছে। (আলে ইমরান-১৩৭)
অতীত কালের মানুষদের জীবন ধারণের বিভিন্ন পথের কথা পবিত্র কোরআন এ আয়াতে ব্যক্ত করেছে। এখানে আরো উল্লেখ করা হয়েছে মানবজাতিকে পৃথিবী ভ্রমণ করে ঐ সমস্ত লোকের কৃতকর্মের ফলাফল দেখার জন্য যারা আল্লাহর নির্ধারিত আইন-কানুন অস্বীকার করে নানা ধরনের পথ আর মত অবলম্বন করেছে।
আল কোরআনে বহু আয়াত আছে যেখানে আল্লাহপাক বিশ্বাসী লোকদের উল্লেখিত ভ্রমণের কথা বলেছেন। ঐসব আয়াতের উদ্দেশ্য অতীতকে জানা এবং ঐ সমস্ত মানুষের কৃতকর্মের ফল সম্পর্কে অবহিত হওয়া যারা আল্লাহ পাকের বাণীকে হয় মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে নতুবা ঐসব বাণী একেবারে অনুসরণ করে চলেনি।
এটা খুব লক্ষ্যণীয় ব্যাপার যে, ফারটাইল ক্রিসেন্ট (Fertile Crescent) নামে পরিচিত ভূ-খণ্ডটি বহু সভ্যতার উত্থান-পতন দেখেছে। এসব উত্থান-পতনের কিছু কিছু বিবরণ পবিত্র কোরআনে বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে যা দৃষ্টান্ত স্বরূপ তুলে ধরা হয়েছে। আরবের লোকেরা এসব দৃষ্টান্তের মর্ম সহজে অনুধাবন করতে পারে। উপরে যে Fertile Crescent এর উল্লেখ করা হয়েছে তা মিশর থেকে শুরু হয়ে ভূ-মধ্যসাগর, প্যালেস্টাইন এবং সিরিয়ার স্থলভূমির মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়ে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর পাড় ধরে মেসোপটোমিয়ার বুক মাড়িয়ে পারস্য উপসাগরে এসে ঐ ফারটাইল ক্রিসেন্ট বা বাঁকাচাঁদ সৃষ্টি করেছে। প্রায় ৮০০০ বছর আগে আরব মরুভূমি ঘিরে যে বিশাল অর্ধবৃত্ত বিদ্যমান সেই অর্ধবৃত্তকে বলা হয় ফারটাইল ক্রিসেন্ট। এ ফারটাইল ক্রিসেন্ট বহু সভ্যতার উত্থান-পতন প্রত্যক্ষ করেছে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এখানে নিহিত রয়েছে বহু সভ্যতার কেন্দ্রস্থল। এ কেন্দ্রস্থলে ঐসব সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল প্রস্তর যুগ থেকে গ্রীক-রোমীয় যুগ পর্যন্ত সময়ে। মিশরের বিশাল পিরামিড এবং স্টেজড টাওয়ারসহ (staged towers) মেসোপটোমিয়ার বিরাট মন্দির জিগুরাস (zigguras) এখানকার প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতার দৃষ্টান্ত বহন করে। প্রাচীন মিশরে রাজত্ব করতো ফারাও গোষ্ঠী (ফেরাউনরা)। আর মেসোপটোমিয়ায় রাজত্ব করতো সুমের ও আক্কাদ নরপতিরা।
পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, আল্লাহপাক পৃথিবীর সকল জাতির কাছে নবী পাঠিয়েছেন এবং তাদের সঠিক সংখ্যা এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। নবীদের দায়িত্ব ছিল একক আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা এবং আল্লাহর বাণী মানুষের সামনে পেশ করা। আল্লাহপাকের নবী কর্তৃক প্রচারিত ঐশীবাণী যারা অগ্রাহ্য করেছিল তাদের পরিণতি কি হয়েছিল তা জানার জন্য আল কোরআন বিশ্বাসীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু প্রাচীনকালের ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান খুব সীমিত ও অসম্পূর্ণ। সেই কারণে আমরা সকল বিষয় ও ঘটনাবলী সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণার অধিকারী নই। কেবল একটা বিষয় স্পষ্ট করে জানা যায়, নবীরা তাদের জাতিকে শিরক তথা দেবদেবীর পূজার বিরুদ্ধে আল্লাহর বাণী প্রচার করেছেন এবং সকল প্রকার পাপাচার থেকে মানুষকে বিরত রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। যারা প্রচারিত আল্লাহর দ্বীন অমান্য করেছে তাদের পরিচয় নিতে গিয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত যেসব জাতির কথা জানা যায় সেগুলো হলো হযরত নূহ (আঃ) এর জাতি, হযরত লূত (আঃ) এর জাতি, আদ জাতি এবং মাদিয়ান জাতি। এ জাতিগুলো বহু দেব-দেবীতে যেমন বিশ্বাসী ছিল তেমনি নানাবিধ পাপাচারে লিপ্ত ছিল। সুতরাং আল্লাহপাকের সাথে অংশী স্থাপন, পাপাচার ও নৈতিক অধঃপতনের ফলশ্রুতিই ছিল বহু জাতির ধ্বংসের কারণ।
অতীত জাতি সম্পর্কে কিছু জানতে হলে ইতিহাসের সাহায্য একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু খৃষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ৩০০০ বছর পূর্বের ইতিহাস কদাচিৎ পাওয়া যায়। অর্থাৎ ঐ সময়ের পূর্ববর্তী ঘটনাবলী ইতিহাসে তেমন উল্লেখ নাই বললেই চলে। তাই তখনকার কোনকিছু কোনভাবে জানতে হলে প্রত্নতত্ত্বের সাহায্য ছাড়া আর কোন উপায় নেই। প্রত্নতত্ত্বের (Archaeology) উদ্দেশ্য হলো মানুষের অতীত কালের বিষয় বস্তুর গবেষণা এবং ধ্বংস পরবর্তী রক্ষা পাওয়া বস্তুগুলোকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ধরে রাখা। যাতে ঐগুলো সেই সমস্ত বস্তুর সম্পূরক হিসেবে কাজ করতে পারে যে বস্তুগুলোর কথা অন্যান্য উৎস অর্থাৎ লিখিত দলীল এবং অন্যান্য বস্তুসমূহ থেকে জানা যায়।
বর্তমানে আমেরিকা, ব্রিটিশ এবং জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদগণ এক শতাব্দী ধরে 'ফারটাইল ক্রিসেন্ট' এর দেশে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন এ উদ্দেশ্যে যে এখানে প্রাপ্ত বস্তুগুলো কত জোরালোভাবে পবিত্র কোরআনের বর্ণনাতে স্পষ্ট হয়েছে। এ অনুসন্ধান কর্ম থেকে যে সুফল পাওয়া গেছে তা কোরআনের বর্ণনাকে তার যথাযথ পটভূমিতে ভালভাবে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির সহায়তায় আরো অধিক অনুসন্ধান চালালে সত্য ও সঠিক তথ্য যে উদ্ঘাটিত হবে তাতে কোন সংশয় নেই।
আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের অনুসন্ধান কাজে প্রকৃতি বিজ্ঞান ও পদার্থ বিজ্ঞানের নানাবিধ শাখার তথ্য-প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন, পদার্থ বিজ্ঞানের তেজস্ক্রিয় রশ্মির (Radio active rays) সহায়তায় প্রাপ্ত বস্তুর বয়স নির্ণয় ও এরিয়াল ফটো উঠানো, রসায়ন বিজ্ঞানের সাহায্যে বয়স নির্ধারণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক কাজে রসায়ন সুবিধা, মৃত্তিকা বিজ্ঞান, আবহাওয়া বিজ্ঞান ও প্রত্ন উদ্ভিদ বিজ্ঞান, জীবাশ্ম বিজ্ঞান (paleontology), খনিজ বিজ্ঞান (Mineralogy), Geochronology, Dendrochronology এবং অন্যান্য। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের সময় যেসব বস্তু মাটির নীচে পাওয়া যায় সেসব বস্তুর সঠিক বয়স নির্ণয়ের জন্য উল্লেখিত বিজ্ঞান বিষয়গুলোকে কাজে লাগানো হয়।
রেডিও এ্যাকটিভ কার্বন বয়স নির্ণয় পদ্ধতিতে প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় প্রাপ্ত হাড়, কাঠ ও ছাইয়ের মধ্যে যে রেডিও এ্যাকটিভ কার্বন বিদ্যমান থাকে তা হিসেব করে ঐ সবের যুগকাল প্রায় সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়। এ রেডিও এ্যাকটিভ কার্বন ডেইটিং পদ্ধতিটি আনবিক পদার্থ বিজ্ঞান গবেষণার একটি বাই প্রোডাক্ট (by product)। এ বাই প্রোডাক্টটি প্রত্নতাত্ত্বিক যুগকাল নির্ণয়ে একটি বৈপ্লবিক অবদান রেখেছে। যদিও এটা সম্পূর্ণভাবে সঠিক সময় নির্ধারণ করতে পারে না তবুও এটা প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় একটি নতুন দিক সংযোজন করেছে। এখন এ পদ্ধতির মাধ্যমে ৪০,০০০ বছর আগেকার সময়কাল নির্ধারণ করা যায়। বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিক যুগকাল নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আরও যেসব পদ্ধতি কাজে লাগানো হয় তাহলো পটাসিয়াম আরগন (potassium argon) পদ্ধতি এবং থার্মোলোমিনিসেন্স (thermoluminiscence) পদ্ধতি। পূর্ব আফ্রিকায় দুই মিলিয়ন কিংবা তারও বেশী সময় পূর্বের মানুষের দেহাবশেষের হিসেব দিয়েছে পটাসিয়াম আরগন পদ্ধতি। হাড়ের ফ্লোরিন উপাদান বিশ্লেষণের মাধ্যমেও হাড়ের যুগকাল নির্ণয়ে সহায়তা লাভ করা সম্ভব হয়েছে।
সম্প্রতি মিশর ও ইরাকের মত মুসলিম অধ্যুষিত দেশে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার কাজ গ্রহণ করা হয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগেও এ ধরনের কার্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। খলিফা মাবিয়া (৬৬১-৬৮০) সাদ্দাদের রাজপ্রাসাদ অনুসন্ধান করার জন্য বেশ কয়েক দফা প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন বলে কথিত আছে। আল কোরআনে সাদ্দাদের রাজ প্রাসাদ সম্পর্কে যে ইঙ্গিত (ফজর-৭) আছে সেখানে এ রাজপ্রাসাদকে বলা হয়েছে উচ্চ স্তম্ভের উপর স্থাপিত ইরাম শহর।
এটা খুবই দুঃখজনক যে, পবিত্র কোরআনে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান কাজে তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। অতীতকে জানা পবিত্র কোরআনেরই নির্দেশ। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে মুসলমানদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে তারা অবশ্যই অতীতকে অনুসন্ধান করবে। এ কাজ তারা বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে কিংবা প্রত্নতাত্বিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে সমাধা করতে পারে।
Say (O Mohammad-s:), "Travel in the land and see what was the end of those who rejected the truth."
বলুন (হে মুহাম্মদ-সাঃ), 'তোমরা পৃথিবী ভ্রমণ কর এবং দেখ তাদের পরিণতি যারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে। (আনআম-১১)
Have they not seen how many a generation before them we have destroyed whom We have established on the earth such as we have not established you? And We poured out on them rain from the sky in abundance and made the revers flow under them. Yet We destroyed them for their sins and We created after them other generations.
তারা কি দেখেনি যে আমরা তাদের পূর্বে কত সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দিয়েছি যাদেরকে আমরা পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যা তোমাদেরকে করিনি। আমরা আকাশ থেকে তাদের উপর পর্যাপ্ত বৃষ্টি বর্ষণ করেছি এবং তাদের তলদেশে নদী সৃষ্টি করে দিয়েছি। তবুও আমরা তাদেরকে তাদের পাপাচারের কারণে ধ্বংস করে দিয়েছি এবং তাদের পরে অন্য সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছি। (আনআম-৬)
And We sent not before you (as Apostles) any but men unto whom we revealed, from among the people ot the townships. Have they not travelled in the land and seen what was the end of those who were before them? And verily, the home of the Hereafter is the best for those who fear Allah and obey Him. Do you not then understand?
আর আমরা আপনার পূর্বে (রাসূল হিসেবে) জনপদবাসীদের মধ্য থেকে যতজনকে পাঠিয়েছি তারা সবাই মানুষ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। যাদের নিকট ওহী প্রেরণ করতাম। তারা কি ভূ-পৃষ্ঠে ভ্রমণ করে না যাতে দেখে নিতে পারত কি পরিণতি হয়েছে তাদের পূর্বে যারা এসেছিল। প্রকৃতপক্ষে পরকালের আবাসই উত্তম তাদের জন্য যারা আল্লাহপাককে ভয় করে। তারপরেও কি তারা বুঝে না? (ইউসুফ-১০৯)