📘 Biggan moy quran > 📄 ভূ-পৃষ্ঠের গঠন

📄 ভূ-পৃষ্ঠের গঠন


সৃষ্টির পর পৃথিবী প্রথমে ছিল গ্যাসীয় অবস্থায়। তারপর তরল অবস্থায়। ক্রমান্বয়ে তাপমাত্রা হ্রাস পেতে পেতে পৃথিবী আজকের অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। ভূ-পৃষ্ঠের মাটির গঠন প্রকৃতি এমন, যা সহজে ম্যানেজ করা যায়। অর্থাৎ খনন করা যায়। সমতল করে পথ তৈরি করা যায়। মাটি পানিতে গলে নরম হয়। আবার শুকালে শক্ত হয়। মাটি সহজে ভাঙা যায়। মাটির এ প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের কারণ মাটিতে অনেকগুলো রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ। অক্সিজেন, সিলিকন, আয়রন, অ্যালুমিনিয়াম, ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, মলিবডেনাম, বোরন, প্রভৃতি রাসায়নিক পদার্থ মাটিতে বিদ্যমান থাকায় মাটির নমনীয় বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়েছে। এর উর্বরতা যেমন তৈরি হয়েছে তেমনি মাটিকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করে মানুষ প্রয়োজনীয় সুবিধা গ্রহণ করছে। মাটি বিদীর্ণ করে ওঠা বৃক্ষ, তরুলতা আর ক্ষেতের ফসল নানা রকম খাদ্য উৎপন্ন করে। একই মাটি থেকে উদগত বৃক্ষ ফল দেয় কোনটা মিষ্টি, কোনটা টক, কোনটা তিক্ত, আবার কোনটা স্বাদ-গন্ধহীন। সৃষ্টির এ বৈচিত্র্য কোন বৈশিষ্ট্যের দরুন সৃষ্টি হয়েছে বিজ্ঞানীদের কাছে তা এখনো রহস্যময়। সৃষ্টিকুলে এ বৈচিত্র্য এনেছেন মহান আল্লাহ তা'আলা, তাঁর সৃষ্টি নৈপুণ্যতার আলোকে।
هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُوْلًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رزْقِهِ وَالَيْهِ النُّشُورُ.
It is He Who has made the earth manageable for you, so traverse you through its tracts and enjoy of His sustenance which He furnishes.
তিনি তোমাদের জন্য ভূ-পৃষ্ঠকে নমনীয় করেছেন। অতএব, তোমরা তার উপর বিচরণ কর এবং তাঁরই প্রদত্ত খাদ্য উপভোগ কর। (মুলক-১৫)
الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ مَهْدًا وَسَلَكَ لَكُمْ فِيْهَا سُبُلًا.
He Who has made the earth for you like a carpet spread out and He has caused pathways for you to travel through it.
আল্লাহ তা'আলা ভূ-পৃষ্ঠকে গালিচার মতো সৃষ্টি করেছেন এবং তার উপর তোমাদের জন্য পথ তৈরি করে দিয়েছেন যেন তোমরা চলাচল করতে পার। (ত্বোয়াহা-৫৩)
وَالْقَى فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ وَانْهُرًا وَسُبُلًا لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ.
And He has set upon the earth mountains standing firm lest it should shake with you and rivers and roads that you may take right way.
আর তিনি ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সুদৃঢ় পাহাড় যেন তা তোমাদেরকে নিয়ে হেলে দুলে না পড়ে এবং নদী ও পথ তৈরি করেছেন যাতে তোমরা সঠিক পথ লাভ করতে পার। (নাহল-১৫)
ثُمَّ شَقَقْنَا الْأَرْضَ شَقًّا فَأَنْبَتْنَا فِيهَا حَبًّا وَعِنَبًا وَقَضْبًا وَزَيْتُونًا وَنَخْلاً. حَدَائِقَ غُلُبًا . وَفَاكِهَةً وَأَعْشَابًا. مَتَاعًا لَكُمْ وَلِأَنْعَامِكُمْ.
And we split the earth in fragments.
And produce therein crops.
And grapes and green fodder.
And olives and dates.
And enclosed gardens of thick foliage.
And fruits and forage.
provision for you and your cattle.
আমরা ভূমিকে বিদীর্ণ করেছি,
এরপর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্য,
আর আঙ্গুর শাক-সবজি,
আর যাইতুন, খেজুর,
আর ঘন উদ্যান,
আর ফল ও তৃণ,
তোমাদের জন্য এবং তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুদের জন্য। (আবছা-২৬-৩২)

📘 Biggan moy quran > 📄 ভূ-পৃষ্ঠের খিল

📄 ভূ-পৃষ্ঠের খিল


ভূ-পৃষ্ঠের খিল (The earth's pegs)

আধুনিক ভূ-বিজ্ঞানীরা বলেছেন। প্রায় ২৫ কোটি বৎসর পূর্বে ভূ-পৃষ্ঠ বর্তমান অবস্থার মত স্থির ছিল না। সে সময়ে ভূ-গর্ভে চলছিল ভূমি ধস, ভূমিকম্প এবং ভাঙ্গা গড়ার খেলা। ফলে অখন্ড ভূমির পৃথিবী ভাঙ্গা গড়ায় পড়ে খন্ড বিখন্ড হয়ে যায়। আর সংকোচন ও প্রসারণের ফলে ভূ-পৃষ্ঠে উচু-নিচু ভাঁজ পড়ে যায়। একটা বড় কাগজ হাতে নিয়ে, সেটাকে কয়েকবার ভাঁজ করলে যেমন কাগজের উপর কতগুলি ঢেউ সৃষ্টি হয়, বিশাল ভূ-পৃষ্ঠ জুড়ে সেরকম কোথাও পাহাড়ের ঢেউ গড়ে ওঠে, কোথাও সমতল ভূমি, কোথাও সাগর, মহাসাগর এবং নদ-নদী সৃষ্টি হয়। এরপর পর্বতগুলো ভূ-পৃষ্ঠের খিলের (pegs) মত বা পেরেকের মত গ্রথিত হয়ে বসে। যার ভূমিকম্প বন্ধ হয় এবং ভূ-পৃষ্ঠে স্থিরতা (stability) প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথিবী পৃষ্ঠের পরিবর্তনের এ সময়কে বলা হয় মধ্যজীবীয় অধিযুগ (mesozoic cosmological era)

ভূ-বিজ্ঞানে পর্বত সৃষ্টির আর একটি তত্ত্ব উল্লেখ আছে। তত্ত্বটির নাম Contraction theory বা সংকোচন তত্ত্ব। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, জন্মের সময় পৃথিবী ছিল ফুটন্ত তরল গোলাকার বলের মত। ক্রমে সেই উত্তপ্ত তরল বলটি ঠান্ডা হতে হতে তার উপরে তৈরী হয় ফলের খোসার মত ভূ-ত্বক। ভূ-ত্বক তৈরী হলেও ভূ-ত্বকের নিচে তরল শিলারাশির ঠান্ডা হওয়া থামেনি। সেগুলি জুড়িয়ে ঠান্ডা হয়ে ক্রমেই আকারে ছোট হয়ে আসে। এ ছোট হওয়া বা সংকোচনের ফলে বাইরের ভূ-ত্বক কুঁচকে গিয়ে পর্বতের ভাঁজ তৈরী হয়েছে।

আধুনিক ভূ-বিজ্ঞানীরা গবেষণা দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, ভূমির উপর পাহাড়গুলি কীলকের মত প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ভূ-পৃষ্ঠে ভারসাম্য সৃষ্টি হয়েছে। এবং ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে পৃথিবীবাসী অনেকখানি রক্ষা পেয়েছে। সেজন্য পৃথিবীময় ধ্বনি উঠেছে পাহাড় যেন না কাটা হয়। এ প্রসঙ্গে আল-কোরআনের ঐশী বাণী, وَالْجِبَالَ أَوْتَادًا . And We have created the mountains as pegs. আমরা পর্বতমালাকে পেরেক হিসেবে সৃষ্টি করেছি। (নাবা-৭) وَالْقَى فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ وَانْهُرًا وَسُبُلًا لَّعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ. And He has set up on the earth mountains standing firm, lest it should shake with you. And rivers and roads that you may take the right way. এবং তিনি পৃথিবীর উপর সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন যেন তোমাদেরকে নিয়ে হেলে না পড়ে এবং নদীপথ ও স্থলপথ তৈরী করেছি যাতে তোমরা পথ প্রদর্শিত হও। (নাহল-১৫) وَجَعَلْنَا فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِهِمْ وَجَعَلْنَا فِيهَا فِجَاجًا سُبُلًا لَعَلَّهُمْ يَهْتَدُونَ. And We have placed on the earth mountains standing firm, lest it should shake with them and We have made therein broad highways for them to pass through, that they may receive guidance. আমরা পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছি যাতে তাদেরকে নিয়ে পৃথিবী ঝুঁকে না পড়ে এবং তাতে প্রশস্ত পথ রেখেছি যাতে তারা পথ প্রাপ্ত হয়। (আম্বিয়া-৩১)

অতএব, উপরোক্ত আয়াত সমূহ থেকে স্পষ্টত প্রতীয়মান হচ্ছে পর্বতগুলি ভূ-পৃষ্ঠকে ব্যালেন্স পজিশনে রেখেছে যা আধুনিক বিজ্ঞানীরা গবেষণা দ্বারা কোরআনের তথ্যগুলির যথার্থতা প্রমাণ করেছেন। ভূ-পৃষ্ঠে প্রতিষ্ঠিত পাহাড় সমূহকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এবং প্রত্যেক শ্রেণীর পাহাড়ের আলাদা বৈশিষ্ট্য ও কার্যকারণ রয়েছে।
১. Fold mountain (ভঙ্গিল পর্বত): এ ধরণের পর্বত সৃষ্টি হয়েছে সমুদ্রের নিচে পলি জমে জমে যে পাললিক শিলাস্তর গড়ে ওঠে। দামাল প্রকৃতির নানা শক্তির চাপে সেই শিলাস্তরে ভাঁজ পড়ে ক্রমেই তা পাহাড়ে রূপ নেয়। যেমন, হিমালয়, আল্পস পর্বত, Fold mountain তৈরী হতে অন্তত ২-৩ কোটি বছর সময় লেগেছে।
২. Block mountain (স্তূপ পর্বত): সমতল ভূমি থেকে কোন পাথুরে অংশ ফাটল বরাবর ঠেলে বেরিয়ে এসে কিংবা নীচে ধসে গিয়ে তৈরী হয়েছে এ ধরনের পর্বত। সিয়েরা নেভাদা পর্বত এ জাতের।
৩. Dome mountain (গম্বুজ পর্বত): এ ধরণের পর্বত গম্বুজ চেহারার মত জমকালো। গম্বুজ পাহাড়ের ঢাল কেন্দ্রবিন্দু থেকে সবদিকে ছড়ানো। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে এ ধরণের পাহাড় রয়েছে।
৪. Volcanic mountain (আগ্নেয় পর্বত): এ ধরণের পাহাড়ের জন্ম আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত থেকে। গলন্ত লাভা ঠান্ডা হয়ে এ পাহাড় তৈরী হয়েছে। ইতালীর ভেসুভিয়াস কিংবা জাপানের ফুজিয়ামা পাহাড় এ জাতের।
৫. Residual mountain (ক্ষয়জাত পাহাড়): উঁচু মালভূমি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে নানা রকম প্রাকৃতিক শক্তি জল-হাওয়া-রোদ ইত্যাদির একটানা প্রবাহে ক্ষয়ে যায়। যার ফলে জন্ম হয় ক্ষয়জাত পাহাড়। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটে এ ধরণের অনেক পাহাড় রয়েছে।

ভূ-বিজ্ঞানীরা বলেছেন, পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে অধিক পরিমাণে পাহাড়-পর্বত সৃষ্টি হওয়ায় যে অতিরিক্ত ভরের সৃষ্টি হয়েছে তার ভারসাম্য রক্ষার্থে পৃথিবী উত্তর মেরুতে ২৩.৫ ডিগ্রী কাত হয়ে রয়েছে। না হয় কক্ষপথে ঘুরার সময় পৃথিবী এদিক ওদিক ঢলে পড়তো। وَالْقَى فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ. And He has placed in the earth firm mountains, lest it should quake along with you. তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা, যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে। (লোকমান-১০)

📘 Biggan moy quran > 📄 সাগর-মহাসাগর

📄 সাগর-মহাসাগর


সাগর-মহাসাগর
পৃথিবীর মানচিত্রটা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে পাঁচটি মহাসাগর আর ছয়ষট্টিটি সাগর মিলিয়ে পৃথিবীর প্রায় একাত্তর ভাগ অংশই জলে ঢাকা। আর বাদ বাকীটা ডাঙ্গা। অর্থাৎ মহাদেশ। সাগর যে কত বৃহৎ (৩৬২,০০০,০০০ বর্গ কিঃ মিঃ) তা অনেকটা অনুমান করা যায় সমুদ্রের পাড়ে বসে চোখ দু'টো সামনে মেলে দিলে। শুধু আকারে বৃহৎ নয়, গভীরতাও অনেক। কোথাও কোথাও এত গভীর যে, সেখানে সবচেয়ে উচু পাহাড় হিমালয়কে ছেড়ে দিলে তার কিছুই আর দেখতে পাওয়া যাবেনা। তাই মনে স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন জাগতে পারে, এত গভীর সমুদ্র কিভাবে সৃষ্টি হল!

এ প্রশ্নটা শুধু সাধারণ মানুষের মনকেই নয়, ভূ-বিজ্ঞানীদের চিন্তাকেও নাড়া দিয়েছে। ১৯১২ সালে জার্মান ভূ-বিজ্ঞানী ওয়েগনার, তার "চলমান মহাদেশ" তত্ত্বটিতে সাগর মহাসাগর সৃষ্টির কথা উল্লেখ করেন। উক্ত তত্ত্বে তিনি বলেন, আজ থেকে প্রায় ২৫ কোটি বছর আগে পৃথিবীর মহাদেশ আর মহাসমুদ্রের চেহারা এ রকম ছিল না। তখন পৃথিবীর সব মহাদেশ মিলে একটিই মহাদেশ ছিল। মেসোজয়িক (mesozoic) যুগের প্রথম দিকে ভূ-পৃষ্ঠের প্রাকৃতিক সংকোচনের (Contraction) ফলে মহাদেশটি ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে একে অন্যের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। আর তাদের মাঝখানে জন্ম নেয় আজকের মহাসমুদ্রগুলো। সে সময় অবিরাম ভাবে আকাশ থেকে বৃষ্টি নামে যা সাগর মহাসাগরের পেট পূর্ণ করে দেয়।

এখন এ সাগর মহাসাগরগুলি পৃথিবীর একদেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য সামগ্রী পারাপারের জন্য অত্যন্ত সহায়ক জলপথ। যাত্রীবাহী নৌকা, স্টীমার, জাহাজ সাগরের উপর দিয়ে যেমন চলে তেমনি সামরিক গান বোট, ফ্রীগেট, জঙ্গী বিমানবাহী নৌবহর প্রভৃতি দুর্দণ্ড প্রতাপে চলছে। অধিকন্তু সাগরের তলদেশ দিয়ে চলছে পারমাণবিক সাবমেরিন।

وَتَرَى الْفُلْكَ مَوَاخِرَ فِيهِ وَلَتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ।
And you see the ships ploughing through the seas, that you may seek of His Bounty and be grateful to Him.
আর তোমরা জলযানগুলিকে সমুদ্রের বুক চিরে চলতে দেখবে যাতে তোমরা আল্লাহর কৃপা অন্বেষণ করতে পার এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাক। (নাহল-১৪)

الَمْ تَرَ أَنَّ الْفُلْكَ تَجْرِي فِي الْبَحْرِ بِنِعْمَتِ اللَّهِ لِيُرِيَكُمْ مِنْ أَيْتِهِ إِنَّ فِي ذُلِكَ لَآيَةٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ।
See you not that the ships sail through the ocean by the Grace of Allah that He may show you of his signs? Verily in these are signs for all who constantly persevere and give thanks.
তোমরা কি দেখনা যে, আল্লাহর অনুগ্রহে জাহাজগুলি মহাসমুদ্রে চলাচল করে, যাতে তিনি তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শন সমূহ প্রদর্শন করেন? নিশ্চয়ই এতে প্রত্যেক সহনশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য অনেক ইঙ্গিত রয়েছে। (লোকমান-৩১)

وَمِنْ آيَتِهِ الْجَوَارِ فِي الْبَحْرِ كَالْأَعْلَامِ।
And among His signs are the ships, smooth running through the ocean as mountains.
এবং তাঁর অন্যতম নিদর্শন সমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে পর্বতসম জাহাজগুলি সমুদ্রের উপর স্বাচ্ছন্দে চলে। (শুরা-৩২)

পবিত্র কোরআনের উপরোক্ত আয়াত সমূহে সাধারণভাবে জাহাজের কথা বলা হয়েছে। যে জাহাজগুলো লোহা কিংবা ইস্পাতের তৈরী এবং সাগর বা মহাসাগরের উপর দিয়ে চলাচল করে।

সমুদ্র বা মহাসমুদ্রে জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ নির্ভর করে তাদের পানিতে ভেসে থাকার ক্ষমতার উপর। কোন কঠিন পদার্থ পানিতে ভেসে থাকার ক্ষমতা তার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্যের নিরিখে কোন কঠিন ভারী বস্তু অন্য কোন আকার ধারণ করলে তা পানি কিংবা বায়বীয় পদার্থের উপর ভাসতে পারে। যেমন এক খণ্ড লোহা পানিতে ডুবে যায় কিন্তু ঐ লৌহখণ্ড থেকে নির্মিত একটি পাত্র পানিতে ভেসে থাকে। পদার্থের এ গুণকে বলা হয় প্লবতা (buoyancy)। অর্থাৎ কোন তরল কিংবা বায়বীয় পদার্থে কোন কঠিন বস্তু নিমজ্জিত করলে কঠিন বস্তুর উপর খাড়া যে বল ঊর্ধ্বমুখে ক্রিয়া করে তাকে প্লবতা বলে। তরল বা বায়বীয় পদার্থের মধ্যে এ প্লবতা গুণ দান করে আল্লাহপাক জাহাজ ও নৌকাকে সাগর জলে ভেসে চলার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

গ্রীক দার্শনিক আর্কিমিডিস সর্বপ্রথম তরল পদার্থের প্লবতা গুণ আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, পানিতে কোন কঠিন পদার্থ ভাসলে তার ভারে যতটুকু পানি অপসারিত হয় সে অপসারিত পানির ওজন ভাসমান বস্তুর নিমজ্জিত অংশের ওজনের সমান। এ তথ্যটি আর্কিমিডিসের সূত্র নামে পরিচিত। প্লবতা বল কঠিন পদার্থের ভারকেন্দ্র বরাবর খাড়া উপর দিকে ক্রিয়া করে। সুতরাং প্লবতা বল কাজ করে পদার্থের ওজনের ঠিক বিপরীত দিকে এবং এ বল পানির গভীরতা দ্বারা প্রভাবিত। যে গভীরতা পর্যন্ত একটি জাহাজ ডুবে গিয়ে সেখান থেকে পানিকে সরিয়ে দেয়। পানির এ অপসারণ নির্ভর করে বস্তুর আকার ও ওজনের উপর।

একটি জাহাজের কাঠামোর উপর অনেকগুলো বল ক্রিয়া করে। এসব বল কোনটা স্থিতিশীল আবার কোনটা গতিশীল। স্থিতিশীল শক্তির উদ্ভব ঘটে যখন ওজন ও সহায়ক বলের মধ্যে পার্থক্য ঘটে যা সমগ্র জাহাজের মধ্যে বিদ্যমান থাকে। জাহাজের মধ্যে পানির আঘাতের দ্বারা গতিশীল শক্তির উদ্ভব ঘটে। এ গতিশক্তি জাহাজের আশেপাশে ঢেউয়ের প্রবাহ এবং ইঞ্জিন চালনার ফলেও সৃষ্টি হয়। যখন একটা জাহাজ ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে তখন ঢেউয়ের উঠা নামার কারণে প্লবতা শক্তিতে যে রদবদল হয় সে রদবদল জাহাজের গতিশীল অবস্থায় ঘটে। সবচেয়ে বড় পার্থক্য ঘটে তখন যখন জাহাজ ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে চলে। এসব ঢেউয়ের দৈর্ঘ্য কখনো জাহাজের দৈর্ঘ্যের সমান আবার কখনো কম-বেশী হয়।

বিশেষভাবে জাহাজ ভেসে থাকার গুরুত্বপূর্ণ দিকটি স্থিরমাত্রার উপর নির্ভরশীল যদি প্লবতা বল অভিকর্ষ কেন্দ্রের (Centre of gravity) মধ্য দিয়ে কাজ করে তাহলে বস্তুটি স্থিতিতাবস্থার মধ্যে থাকবে। তরল পদার্থে নিমজ্জিত কোন কঠিন পদার্থ সরাসরি স্থির অবস্থায় আসতে পারে না। এর কারণ হলো তরল পদার্থের ঊর্ধ্বমুখী বলের প্রভাব। আর প্লবতা কাজ করে পদার্থের ওজনের বিপরীত দিকে। জাহাজের ভারকেন্দ্র অপসারিত পানির কেন্দ্র-শীর্ষে থাকে। যদি এ ভারকেন্দ্র প্লবতা শক্তি থেকে উচ্চতর হয় তাহলে জাহাজটি পানির উপর স্থির অবস্থায় থাকে। আর যদি প্লবতা শক্তি উচ্চতর হয় তাহলে জাহাজ কখনো সুস্থির অবস্থায় থাকতে পারে না।

নদী ও সমুদ্রে জাহাজ বা নৌকা চলাচল ছিল বিভিন্ন পদ্ধতির। কয়েক শতাব্দী ধরে জাহাজ কিংবা নৌকা চলাচল করেছেন দাঁড়ের সাহায্যে অথবা পালে বাতাসের প্রবাহ লাগিয়ে। উনবিংশ শতাব্দীতে বেশ সাফল্যের সাথে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ব্যবহার পরিদৃষ্ট হয়েছে। পরে ডিজেল ইঞ্জিন চালু করার ফলে উভয় পদ্ধতি অনেক বছর ধরে বহু উৎকর্ষতা অর্জনের পথে এগিয়ে গেছে। বর্তমান নৌযানে পারমাণবিক শক্তির ইঞ্জিন ব্যবহারের ফলে এ উৎকর্ষতা অভাবনীয় মাত্রায় উন্নীত হয়েছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে সমুদ্রে জাহাজ চলাচলের সময় যে সমস্যা বড় হয়ে দেখা দিত সেটা হচ্ছে গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর জন্য সঠিক দিক নির্ণয় করা। জানা যায় প্রাচীন কালে নাবিকরা জাহাজ চালনা করতেন সূর্য ও নক্ষত্রের দিক লক্ষ্য রেখে। আরব নাবিকরা ভারত মহাসাগরে এ পদ্ধতি অবলম্বন করে দিক নির্ণয় করতো। একই পদ্ধতি-কৌশল বহু শতাব্দী ধরে আরবরা মরুভূমি যাত্রা কালেও ব্যবহার করতো। এখন নৌযান ও উড়োজাহাজ চালনার ক্ষেত্রে দিক নির্ণয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। যেমন কম্পাস দেখে, ম্যাপ পড়ে এবং দীর্ঘ যাত্রায় রেডিও সাথে রেখে দিক নির্ণয়ের কাজ চলে। রাডার আবিষ্কারের ফলে নাবিকরা কুয়াশা এবং অন্ধকারের মধ্যেও দূরের জায়গা স্পষ্টভাবে দেখতে পায়।

বিংশ শতাব্দীর সাত দশক থেকে পৃথিবীর কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপন করে কম্পিউটারের সাহায্যে জাহাজের অবস্থান হিসেব করা হয়।

নদীর জল মিষ্টি কিন্তু সমুদ্রের জল নোনতা। অথচ দু'টোই এ পৃথিবীরই জল। আর নদীর জল গিয়ে মিশছে সেই সমুদ্রের জলে। কিন্তু নদীর জলে একেবারে লবণ নেই তা নয়। তবে সামুদ্রিক জলের পরিমাণে অনেক কম। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সমুদ্রের জলে সোডিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইডের পরিমাণ নদীর জলের তুলনায় অন্তত ১৭ গুণ বেশী। এ সব সত্ত্বেও নিজস্ব প্রক্রিয়ায় সমুদ্রজল তার নোনতা ভাব একই জায়গায় ধরে রাখে। এ লবণ সহ সমুদ্রজলে নানা রকম রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ দেখা যায়।

সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) ২৩.৪৮%
ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড (MgCl₂) ৮.৯৮%
সোডিয়াম সালফেট (Na₂SO₄) ৩.৬২%
ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড (CaCl₂) ০.১০%
পটাসিয়াম ক্লোরাইড (KCl) ০.৬৬%
হাইড্রোজেন বোরেট (H₃BO₃) ০.০২৬%
সোডিয়াম বাইকার্বনেট (NaHCO₃) ০.১৯২%
পটাসিয়াম ব্রোমাইড (KBr) ০.০৩৮%
স্ট্রন্টিয়াম ক্লোরাইড (SrCl₂) ০.০২৪%
সোডিয়াম ফ্লোরাইড (NaF) ০.০০৩%

وَمَا يَسْتَوِى الْبَحْرُنِ هَذَا عَذْبٌ فُرَاتٌ سَائِعُ شَرَابُهُ وَهُذَا مِلْحٌ أُجَاجٌ. Nor are the two bodies of the flowing water alike,-the one palatable, sweet and pleasant to drink and the other, salt and bitter.
দু'টি সমুদ্রের প্রবাহমান জল সমান নয়, একটি মিষ্টি এবং তৃষ্ণা নিবারক, অপরটি নোনা এবং তিক্ত। (ফাতির-১২)

وَهُوَ الَّذِي مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ هَذَا عَذْبٌ فُرَاتٌ وَهُذَا مِلْحٌ أُجَاجٌ وَجَعَلَ بَيْنَهُمَا بَرْزَخًا وَحِجْرًا مَّحْجُورًا. He It is who has let free the two bodies of flowing water, one palatable and sweet and the other saltish and bitter; yet has He made a barrier between them, a partition that is forbidden to be passed.
তিনি-ই সমান্তরালে দু-ই সমুদ্রের জলরাশি প্রবাহিত করেন। একটি মিষ্টি ও তৃষ্ণা নিবারক এবং অপরটি লবণাক্ত ও বিস্বাদ। উভয় প্রবাহের মাঝখানে রেখেছেন একটি অন্তরায়, একটি দুর্ভেদ্য আড়াল। (ফোরকান-৫৩)

এটা সবাই জানে যে, পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের টানে পানি উপর দিক থেকে নিচের দিকে নেমে আসে। এ পদ্ধতিতে পানির দু'টি পৃথক ধারা সৃষ্টি হয়েছে। একটি ধারা স্থলভূমির উচ্চ এলাকায় এবং আর একটি ধারা পৃথিবীর নিম্ন এলাকায় প্রবাহমান। পানি সাধারণত ভূমি থেকে সাগরে বয়ে যায়। জোয়ারের সময় কিংবা অস্বাভাবিক আবহাওয়া অবস্থায় যেমন জলোচ্ছ্বাসের সময় সাগরের পানি ওভার-ফ্লো (over flow) হয়ে স্থল অঞ্চলের দিকে সবেগে ধেয়ে আসে। কিন্তু পুনরায় স্বাভাবিকতা ফিরে আসলে ফুলে ওঠা জলরাশি সাগরের বুকে ফিরে যায়। ভূ-পৃষ্ঠের উপরিভাগের ৭০% অংশ পানি দ্বারা আবৃত। এ পানি ধারণ করে রেখেছে সাগর-মহাসাগরগুলো। মহাসাগরের পানি লবণাক্ত এবং এ পানি ৩.৫% লবণ ধারণ করে রেখেছে এবং পূর্বে উল্লেখিত সকল রাসায়নিক উপাদান এ দ্রবণে বিদ্যমান।

মিষ্টি পানি অপেক্ষা লবণ পানি অধিক ঘন। কিন্তু যখন তাদের একই সমতায় রাখা হয় তখন তারা পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়। উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ে তাদের মধ্যে যে পৃথকীকরণ অন্তরায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার কারণ হচ্ছে তাদের উপর অভিকর্ষ শক্তির প্রভাব। মিষ্টি জল ও লবণাক্ত জলের চৌহদ্দীর মধ্যে ঘনত্বের একটি মধ্যবর্তী পার্টিশন সৃষ্টি হয়। এ পার্টিশন বা বিভাজনরেখা উভয়ের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মিশ্রিত হওয়ার প্রবণতা রোধ করে এবং উভয় জলে ঘনত্বের পার্থক্য থাকার দরুন মাধ্যাকর্ষণ বল বিভক্ত অবস্থাকে প্রভাবিত করে।

📘 Biggan moy quran > 📄 Life of Earth

📄 Life of Earth


Life of Earth

وَآيَةٌ لَّهُمُ الْأَرْضُ الْمَيْتَةُ أَحْيَيْنَاهَا
And the dead earth is a sign for them, We give life to it
তাদের জন্য একটি নিদর্শন মৃত ভূমি, আমরা তাকে জীবন দান করি। (ইয়াসিন-৩৩)

পানির এক নাম জীবন (Life)। জীবন বলতে আমরা বুঝি যার প্রাণ আছে; কাজ করার ক্ষমতা আছে; খাদ্য গ্রহণ করে এবং বর্ধিত হয়। মানুষ, পশু-পাখি, জীব-জন্তু, কীট-পতঙ্গ, বৃক্ষ-তরুবৃক্ষ প্রভৃতি জীবনধারী সৃষ্টি, যাদের প্রাণ আছে। খাদ্য গ্রহণ করে, কাজ করার ক্ষমতা রাখে এবং বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু মাটিরও কি জীবন আছে?

সূর্যের তীব্র তেজোদীপ্ত রোদে মাটির শেষ জলবিন্দু যখন বাষ্পীভূত হয়ে উবে যায় তখন যমীন থেকে একটি খাঁ খাঁ হাহাকার ধ্বনি উত্থিত হয়। এ সময়ে বীজ বপন করলে অঙ্কুরোদগম ঘটে না। বৃক্ষ ও ক্ষেতের ফসলে সতেজ ভাব থাকে না। বায়ু প্রবাহে সন্তাপ বিরাজ করে। ভূ-পৃষ্ঠে কান লাগিয়ে শুনলে উপলব্ধি করা যায় মাটির প্রাণহীন আড়ষ্টতা। এহেন অবস্থায় যখন আকাশ থেকে বৃষ্টি নামে, পৃথিবী নবজীবন ফিরে পায়। তার চেহারায় সতেজ ভাব ফুটে ওঠে। চারিদিকে বৃক্ষ, তরুলতা নব উদ্দীপনায় ঝলমল করে। কারণ বৃষ্টিধারার সাথে নেমে আসে অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, নাইট্রেট। মাটির উপাদান সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, প্রভৃতির সাথে মিশে প্রস্তুত করে বৃক্ষরাজি ও ফসলের খাবার। ফলে ভূপৃষ্ঠের জীবনী শক্তি, তার উর্বরতা পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে। এ বিষয়টি সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করতে না পারলেও ভূ-বিজ্ঞানীরা ও জ্ঞানী লোকেরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। তাই আল্লাহ পাক বলছেন,

وَأَنْزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً طَهُورًا لِّتُحْيِيَ بِهِ بَلْدَةً مَّيْتَةً وَنُسْقِيَهُ مِمَّا خَلَقْنَا أَنْعَامًا وَأَنَاسِيَ كَثِيرًا
And We send down pure water from the sky so that We may thereby give life to a dead land and give it for drink to our creations,-- cattle and men in great numbers.
আমরা আকাশ থেকে বিশুদ্ধ বারি বর্ষণ করি যাতে নির্জীব ভূমি সজীব হয়ে উঠে এবং আমাদের সৃষ্ট বহুসংখ্যক প্রাণী ও মানুষ তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারে। (ফোরকান-৪৮,৪৯)

وَمِنْ آيَتِهِ أَنَّكَ تَرَى الْأَرْضَ خَاشِعَةً فَإِذَا أَنْزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ إِنَّ الَّذِي أَحْيَاهَا لَمُحْيِ الْمَوْتَى إِنَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
Among His signs in this, that you see the earth withered but when We send down water on it, it stirs and swells. Surely He Who gives life to the dead earth, can surely give life to men who are dead. truly He has power over everything.
তাঁর বিধানের মধ্যে একটি নিদর্শন এ যে, তোমরা ভূমিকে দেখবে অনুর্বর পড়ে আছে। অতঃপর আমরা যখন তার উপর বৃষ্টি বর্ষণ করি তখন সে শস্যশ্যামল ও স্ফীত হয়। নিশ্চয়ই যিনি একে জীবিত করেন তিনি জীবিত করবেন মৃতদেরকেও। আসল কথা হচ্ছে, তিনি প্রত্যেক বিষয়ের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। (হামীম-৩৯)

وَمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنَ السَّمَاءِ مِنْ رِزْقِ فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا .
And the provision that Allah sends from the sky to enliven the earth after its death.
আল্লাহ তাআলা আকাশ থেকে যে রিযিক (বৃষ্টি) সরবরাহ করেন তাতে মৃত ভূ-পৃষ্ঠ জীবন লাভ করে। (জাসিয়া-৫)

فَانْظُرْ إِلَى أَثْرِ رَحْمَتِ اللَّهِ كَيْفَ يُحْيِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا .
Look therefore at the marks of Allah's mercy how He enlivens the earth after it is dead.
অতএব, আল্লাহর করুণার ফলাফল দেখ কিভাবে তিনি মৃত্তিকার মৃত্যুর পর তাকে জীবিত করেন। (রোম-৫০)

আকাশ থেকে আল্লাহপাক যে বৃষ্টি বর্ষণ করেন সে বর্ষণ একটানা বেশ কিছু ঘটনার উদ্ভব ঘটায়। কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্তের সাহায্যে সেগুলোকে তুলে ধরা যায়।

একটানা পানি সরবরাহ না থাকার কারণে যে খরার সৃষ্টি হয় সে খরার ফলে ভূমি ও গাছ-পালা পানিশূন্য হয়ে পড়ে। আয়াতসমূহে পানির অণুশূন্য জমিনকে বলা হয়েছে মৃত পৃথিবী (dead earth)। আর যখন বৃষ্টিধারা নেমে আসে তখন বীজের অঙ্কুরোদগম শুরু হয়। ফলে মৃত্তিকার মধ্যে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। আর একেই বলা হয় পৃথিবীর নতুন জীবন লাভ। বীজের ফলশ্রুতিতে গাছপালা জন্মায় এবং পরিশেষে বৃক্ষরাজি ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে ওঠে। মৃত্তিকার প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর উপর বৃষ্টির পানি গভীর প্রভাব ফেলে। মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্যগুলো যথা, PH (a measure of hydrogen ion concentration), মৃত্তিকার কার্যাবলী, পশু-পাখি ও ফল-মূল, মাটির মিশ্রণ ও গঠন এবং মাটির সূক্ষ্ম ছিদ্রপথ। এ ছিদ্রপথ গাছপালার শিকড়ের তলদেশে প্রবেশের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ প্রদান করে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে মাটিতে গাছপালা জন্মানোর পক্ষে সহায়ক উপাদানগুলোর মধ্যে পানি একটি অপরিহার্য বেসিক-উপাদান। পৃথিবীর বৃষ্টিপাতের পরিসংখ্যান তালিকায় দেখা যায় ক্রান্তীয় আদ্র অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে এ অঞ্চলে গভীর সবুজ বনাঞ্চল গড়ে ওঠেছে। যে অঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টিপাত হয় কিংবা কয়েক বছর ধরে বৃষ্টিপাত হয় না সেখানে খাঁ খাঁ খরা দেখা দেয়। যে-ই মাত্র বৃষ্টিধারা নেমে আসে অমনি বন্ধ্যা মরুভূমির বুকে জীবন জেগে ওঠে। কারণ এ সময় দীর্ঘ ঘুমে ঘুমন্ত বীজগুলো অঙ্কুরিত হয়ে ওঠে এবং শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে ফুলে ফুলে ভরে ওঠে।

শুষ্ক মরুভূমির বুকে নতুন বীজের জন্ম হয় এবং বীজগুলো মাটির বুকে নেতিয়ে থাকে। আর গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে পরবর্তী বৃষ্টিপাতের জন্য। ঐ বীজগুলো তাদের শক্ত কঠিন আবরণের সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখে যতদিন না বাইরের আবহাওয়া তাদের বেড়ে ওঠার মত যথাযথ অবস্থার সৃষ্টি করে। অর্থাৎ বৃষ্টিধারার সঞ্চার হয়। বীজপত্রগুলো বৃষ্টির পানি পান করার পর প্রোটোপ্লাজম পুনঃকর্মক্ষম হয়ে ওঠে। পানির সমন্বয় ও কার্যকারিতা এবং এনজাইমের কারণে বীজের মধ্যে যে খাদ্য উপাদানগুলো সঞ্চিত থাকে সেগুলো ভেঙ্গে গিয়ে শক্তি উদ্‌গীরণ করে এবং ভ্রূণের মধ্যকার কোষগুলো বড় হতে থাকে এবং বিভক্ত হয়ে পড়ে। চারাগাছের প্রথম অংশ হলো মূল। মূল মাটির নিচে পানির সন্ধান করে। মাটিতে পানির অভাবহেতু অঙ্কুরোদগম ক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে কিংবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ভূমির উপর পতিত বৃষ্টিকণার সাথে মৃত্তিকার গাঠনিক বিক্রিয়া বড় ধরনের উলট-পালট রূপান্তর ঘটায় যার ফলে কিছু বীজ নিচ থেকে উপরের স্তরে ওঠে আসে এবং এখানে এরা প্রচুর অক্সিজেন পায়। এর ফলে অতি অল্প সময়ে অঙ্কুরোদগম সম্ভবপর হয়। এভাবে ঘন বৃষ্টিপাত ঐ বীজগুলোকে জাগিয়ে তোলে যেগুলো শুষ্ক মৌসুমে ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে। জেগে ওঠা বীজের বুক থেকে বেরিয়ে আসে অসংখ্য চারাগাছ। বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার সাথে সাথে আর একটি অবিচ্ছিন্ন ঘটনার জয়যাত্রা শুরু হয়। তাহলো পাহাড়ের কোলে ও উপত্যকায় সবুজ সতেজ ঘাস সমৃদ্ধ চারণভূমির উদ্ভব। এ চারণভূমিগুলো গরু, মহিষ, ছাগল, মেষ প্রভৃতি গবাদি পশুদের ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। এর ফলে খাদ্যের সন্ধানে তাদের দলবদ্ধ অভিযাত্রা শুরু হয়। অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণীদের ক্ষেত্রেও এ অবস্থা ঘটে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই প্রকৃতির দৃশ্যপটের দ্রুত পরিবর্তন সাধিত হয়। মৃত-আড়ষ্ট ধরণী নবীন সবুজ ঘাসে সজীব হয়ে জেগে ওঠে। যদি আমাদের বোধশক্তি থাকে তাহলে আমরা উপলব্ধি করতে পারবো যে, এসব কর্মের মধ্যে সুমহান আল্লাহ তাআলার অসীম জ্ঞানের সুস্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00