📄 সুগন্ধি সবজি, শশা, রসুন, গম, মসুর, পিঁয়াজ
আলোচ্য আয়াতে উদ্ভিদ গোত্রভুক্ত পাঁচ প্রকার খাদ্যবৃক্ষের উল্লেখ করা হয়েছে এবং এসব খাদ্যবৃক্ষ (Food plants) সেই সময়ে মিশরে বিদ্যমান ছিল যখন হযরত মূসা (আঃ) নেতৃত্বে বনী ইসরাঈলীরা মিশর ত্যাগ করেছিল। খাদ্যবস্তুগুলোর পুষ্টিমানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে পেশ করা হলো যাতে করে মান্না ও সালওয়ার পুষ্টিমূল্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়।
**সুগন্ধি সবজি (Pot herbs)**
ইউসুফ আলী আরবী বাকুলুন (بقل) শব্দের অনুবাদ করেছে Pot-herb শব্দ প্রয়োগ করে। যার অর্থ খাদ্যাদি সুগন্ধ ও সুস্বাদু করণার্থ লতাপাতা। যেমন, ধনেপাতা, পিঁয়াজ ও রসুনের সবুজপাতা ইত্যাদি। এ শব্দ দ্বারা ব্যাপক অর্থে শাক-সবজি জাতীয় খাদ্যকেও বুঝানো হয় যেগুলো রান্না করে তৃপ্তি সহকারে আহার করা যায়। যেমন, বাঁধাকপি, শালগম, সরিষা ও পালং শাক। এসব সবজির পাতা রসালু ও সুস্বাদু। ধনেপাতা কিংবা অন্যকোন সুগন্ধিযুক্ত লতাপাতা উল্লেখিত শাক-সবজীর সাথে মিশ্রিত করা হলে সেসবের স্বাদ আরও বেশী বৃদ্ধি পায়। বিতাড়িত বনী ইসরাঈলীরা হয়তো বা এ ধরনের খাদ্য সামগ্রীর আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু এ জাতীয় খাদ্যের পুষ্টিমান মান্নার সমকক্ষ কখনো হবে না।
**শশা (Cucumbers)**
আরবী শব্দ কিস্সাআ (قثاء) অর্থ শশা। শশা গ্রীষ্মকালীন এক বর্ষজীবী Cucumis sativus সবজি এবং উদ্ভিদ বর্গ ক্যাম্পানিউলেলিস (Campanulales) এর অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীর প্রায় সবদেশে শশা জন্মায়। এমনকি শীত প্রধান দেশে কাচঘরের নিয়ন্ত্রণ তাপ ও আর্দ্রতায় এর চাষ করা হয়। মিশরে এটার চাষ শুরু হয়েছিল দ্বাদশ রাজবংশের আমলে। শশার খাদ্যমান প্রধানত শর্করা (Carbohydrate) ও ভিটামিনের মধ্যে পরিব্যাপ্ত। এতে পানির পরিমান ৯৫%, প্রোটিন ০.৭%, চর্বি ০.১% শর্করা ৩.৪% এবং ফাইবার ০.৪%। কচি অবস্থায় শশাকে সালাদ হিসেবে এবং রান্না করে তরকারী হিসেবে খাওয়া হয়। এটি বাংলাদেশের একটি প্রধান সবজি।
**রসুন (Garlic)**
রসুনের বৈজ্ঞানিক নাম Allium sativum, এটি বহু হাজার বছর ধরে একমাত্র আবাদি শস্য হিসেবেই পরিচিত। রসুনের উৎপত্তিস্থল মধ্য এশিয়ায় বলে মনে করা হয় এবং অতি প্রাচীনকালে সেখান থেকে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় বিস্তার লাভ করে। মিশরে আজ থেকে ৫০০০ বছর পূর্বে (ফেরাউনের রাজত্বকালে) খাদ্যরূপে এটি পরিচিত ছিল।
প্রাচীনকাল থেকে নানা অসুখে রসুনকে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। যেমন রসুনকে সব ধরনের বিষাক্ত দ্রব্যের প্রতিষেধক ঔষধ মনে করা হতো। রসুনের Allicin দ্রব্যে ব্যাকটেরিয়া নাশক গুণ বর্তমান। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে রসুনকে সর্দি কাশি সহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমাতে এবং হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়াতে রসুন বেশ কার্যকর বলে মনে করা হয়। রসুনে ৬৩% পানি, ৭% প্রোটিন, ২৮% শর্করা, সামান্য পরিমাণ ফ্যাট, আঁশ ও ১% ছাই থাকে। এর মধ্যে Alliin নামে অ্যামিনো অ্যাসিড ভেঙ্গে Allicin তৈরী হয় যার প্রধান উপকরণ হচ্ছে Diallyl disulphide যা রসুনের তীব্র গন্ধের জন্য দায়ী।
বনী ইসরাঈলীদের যারা এ খাদ্যের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল, খাদ্যের স্বাদ ও সুগন্ধি বৃদ্ধি করার জন্য এরা রসুন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতো।
**গম (Wheat)**
গমের বৈজ্ঞানিক নাম Triticum dicoccum। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে গমের চাষ চলে আসছে। গমের ১২টি প্রজাতি আছে। এদের মধ্যে এমার (Emmer) প্রজাতির গম প্রাচীনতম। জানা গেছে প্রাচীন মিশরে এমার গমের চাষ প্রথম শুরু হয়েছিল। গমের দানা থেকে আজকাল নানা ধরনের খাদ্য তৈরী হয়। শিশু খাদ্য, গমের রুটি, পিঠা এবং গম থেকে বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট প্রস্তুত করা হয়। গমের পুষ্টিমান থাকার কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটাকে প্রধান খাদ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একটি গমের দানায় পানির পরিমাণ ১৩%, প্রোটিন ১২%, ফ্যাট ২% শর্করা ৭০% এবং ফাইবার ২% বর্তমান থাকে। গম বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য।
**মসুর (Lentil)**
আরবী ‘আদাস’ শব্দের অর্থ মসুর ডাল। এর বৈজ্ঞানিক নাম Lens culinaris Medik। ধারণা করা হয় যে, মসুরের প্রথম উৎপত্তি তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে। পরে এটি গ্রীস, মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপ, মিশর, ইথিওপিয়া, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও চীনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটি শীতপ্রধান অঞ্চলের শস্য হলেও প্রায় গ্রীষ্মমন্ডল অঞ্চলে শীতকালে এবং গ্রীষ্মমন্ডলে অধিক উচ্চতায় ঠান্ডা ঋতুতে জন্মে। মসুর ছোট্ট দানাদার সিম জাতীয় ডাল। মসুর ডালের দানাতে পানি থাকে ১১.২%, প্রোটিন ২৫%, চর্বি ১% শর্করা ৫৬% এবং ফাইবার ৩% বিদ্যমান।
**পিঁয়াজ (Onion)**
আরবী ‘বাসাল’ (بصل) অর্থ পিঁয়াজ। পিঁয়াজের বৈজ্ঞানিক নাম Allium cepa। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, পিঁয়াজের উৎপত্তি ইরান, পাকিস্তান এবং ঐ দেশগুলির উত্তরবর্তী পাহাড়ী অঞ্চলে। অতি প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষে এবং মধ্যপ্রাচ্যে পিঁয়াজের চাষ হয়ে আসছে। প্রাচীন মিশরে পিঁয়াজ ছিল একটি জনপ্রিয় খাদ্য। একটি পরিপক্ব পিঁয়াজে পানি থাকে ৮৬%, প্রোটিন ১.৪০%, চর্বি ০.২%, শর্করা ১১% এবং ফাইবার ০.৪%। পিঁয়াজ এমন একটি শস্য যা মাছ, মাংস, শাক-সবজি এবং সালাদ তৈরী করে খাওয়া হয়। পিঁয়াজের সবুজ পাতা খাদ্যের স্বাদ ও সুগন্ধ বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হয়।
অতএব, উল্লেখিত শাক-সবজি ও শস্যদানা বিশ্বময় জনপ্রিয় ও অপরিহার্য খাদ্যবস্তু হিসেবে সমাদৃত। প্রজ্ঞাময় আল্লাহতাআলা মাটিতে উর্বরা শক্তি দান করার দরুন এসব খাদ্যবস্তু উৎপন্ন হয়। মিশর থেকে বিতাড়িত বনী ইসরাঈলীরা পূর্বে এসব খাদ্যদ্রব্যের স্বাদ উপভোগ করেছিল। তাই উন্মুক্ত মরুভূমির যাযাবর জীবনে পতিত হয়ে এসবের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল মান্না ও সালওয়ার পরিবর্তে। কিন্তু মানুষের অধিক পুষ্টির জন্য কিছু বিশেষ ধরনের খাদ্যপ্রাণের প্রয়োজন হয়। অ্যামিনো এসিড একটি বিশেষ জৈব উপাদান যা শাক সবজি জাত প্রোটিনের মধ্যে পাওয়া যায় না। মান্না শর্করা জাতীয় (carbohydrate) খাদ্য যার মধ্যে আছে সুক্রোজ (sucrose), লেভুলোস (Levulose), গ্লুকোজ (glucose) এবং ডেক্সট্রিন (dextrin)। এগুলো খাওয়ার সাথে সাথে মানুষের শরীরে শক্তি সঞ্চারিত হয়। কিন্তু গম তা পারে না। কারণ গমে (wheat) যে স্টার্চ থাকে খাওয়ার পর প্রথমে সেটা গ্লুকোজে পরিণত হয়। তাই সে সরাসরি শক্তির যোগান দিতে পারে না। ডালজাত প্রোটিনের পুষ্টিমান কিছুটা বেশী (২০%)। কিন্তু যে প্রোটিন কোয়েল পাখির (সালওয়া) মাংস থেকে পাওয়া যায় তার মান আরও অধিক এবং তা সহজে হজম হয়ে শরীরে absorb হয়ে যায়। তাই মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা অধিক পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্যের পরিবর্তে নিম্নপুষ্টির খাদ্য চাও? তাহলে যে কোন শহরে প্রবেশ কর। ঐসব খাদ্য সর্বত্র সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু মান্না ও সালওয়া সর্বত্র সহজে পাওয়া যায় না।
📄 সালোক সংশ্লেষণ
সালোক সংশ্লেষণ (Photosynthesis)
H₂O + CO₂ = C₆H₁₂O₆ + O₂
সবুজ বৃক্ষ এবং ফসল সূর্যালোক থেকে শক্তি গ্রহণ করে পানি ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের রাসায়নিক বিক্রিয়া দ্বারা শর্করা (carbohydrate) নামক খাদ্য তৈরী করে। এ প্রক্রিয়াকে সালোক সংশ্লেষণ বলা হয়।
সালোক সংশ্লেষণ সংগঠিত হওয়ার জন্য পানি-(H₂O) কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂), সূর্যের আলো এবং ক্লোরোফিল প্রয়োজন। উদ্ভিদ ও ফসল মূল রোমের সাহায্যে মাটি থেকে পানি শোষণ করে তা পাতা ও অন্যান্য অঙ্গে পৌঁছে দেয়। বাতাস থেকে CO₂ গ্রহণ করে। উদ্ভিদের পাতায় ক্লোরোফিল অণু থাকে। ক্লোরোফিল সূর্যালোক থেকে ফোটন (Photon) নামক আলোক কণা ধারণ করে উত্তেজিত হয়। যার ফলে একটি জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া দ্বারা শর্করা প্রস্তুত হয়।
আলো
H₂O + CO₂ ──────→ C₆H₁₂O₆ + O₂
ক্লোরোফিল শর্করা
উদ্ভিদ ছাড়া আর কোন প্রাণী নিজের খাদ্য (শর্করা) নিজে তৈরী করতে পারে না। অনন্ত অসীম করুণাময় প্রভু সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে কোরআন মজিদে তত্ত্ব পেশ করেছেন,
وَجَعَلْنَا سِرَاجًا وَهَاجًا
And We have made the sun a bright lamp.
আর আমরা সূর্যকে উজ্জ্বল প্রদীপ করেছি। (নাবা-১৩)
هُوَ الَّذِي يُرِيكُمُ آيَاتِهِ وَيُنَزِّلُ لَكُم مِّنَ السَّمَاءِ رِزْقًا
It is He Who shows you His Ayat and sends down provision for you from the sky.
তিনি-ই সে সত্ত্বা, যিনি ইঙ্গিত সমূহ প্রদর্শন করেন এবং তোমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্য সম্ভার সরবরাহ করেন (মু'মিন-১৩)
এখানে আকাশ থেকে খাদ্য সম্ভার সরবরাহ করার অর্থ হচ্ছে সূর্যের আলো থেকে বৃক্ষরাজি ও ফসল সালোক সংশ্লেষণ (Photosynthesis) প্রক্রিয়ায় নিজেদের খাদ্য (শর্করা) তৈরী করে পরিপুষ্ট হয়। অতঃপর মানুষের জন্য খাদ্য-শস্য উৎপন্ন করে।
আধুনিক বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন যে, প্রাকৃতিক প্রতিকূল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অন্ধকার পর্যায়েও সালোক সংশ্লেষণ ঘটতে পারে। উদ্ভিদ সূর্যের আলো থেকে অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেট (ATP) নামক এক ধরনের অণু দেহের মধ্যে রিজার্ভ করে রাখে। সূর্যের আলো যখন থাকে না তখন ATP-র সহায়তায় H₂ অণুর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় CO₂ বিজারণের মাধ্যমে শর্করা (Carbohydrate) তৈরী করে নেয়।
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِى خَلَقَ السَّمُوتِ وَالْأَرْضَ وَجَعَلَ الظُّلُمَتِ وَالنُّورُ
All the Praises be to Allah Who created the heavens and the earth and made the darkness and the light.
মহিমাদীপ্ত আল্লাহ, যিনি নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আলো-আঁধার সৃষ্টি করেছেন। (আনআম-১)
অতএব, সালোক সংশ্লেষণ বিক্রিয়ায় উদ্ভিদ ও ফসল বাতাসে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন (O₂) ছেড়ে দেয় এবং বাতাস থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) গ্রহণ করে নেয়। পক্ষান্তরে মানুষ শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে। আর কার্বন ডাইঅক্সাইড ত্যাগ করে। সৃষ্টির এ প্রক্রিয়াটি মহানুভব আল্লাহর অসংখ্য রহমতের মধ্যে একটি।
📄 Fear and Hope
**Fear and Hope**
وَمِنْ أَيْتِهِ يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنَزِّلُ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَيُحْيِ بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَتٍ لِقَوْمٍ تَعْقِلُونَ.
And among His signs is that He shows you the lightning by way both of fear and of hope and He sends down rain from the sky and therewith gives life to the earth after it is dead. Verily in that are indeed signs for those who are wise.
আল্লাহ তা'আলার অসংখ্য নিদর্শনের মধ্যে একটি হচ্ছে আকাশে বিদ্যুৎ চমকে, যার মধ্যে ভয়ও আছে আশাও আছে এবং তিনি আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করে নির্জীব জমিনকে সজীব করেন। অবশ্যই এ সবের মধ্যে প্রকৃত সংকেত রয়েছে তাদের জন্য যারা জ্ঞান রাখে। (রূম-২৪)
আকাশে যখন বিদ্যুৎ স্পার্কিং হয় তখন কোরআন বলছে, এ ঘটনায় ভয় এবং আশা উভয়ই বিদ্যমান। ভয় কিসের?
ভয় হচ্ছে, বজ্রপাতের দরুন জীবন সংহারের ভয়। সম্পদ ধ্বংস হওয়ার ভয়। বিকট শব্দে শ্রবণশক্তি নষ্ট হওয়ার ভয়। কিন্তু আশাটা কি!
আশার কথা বলে জ্ঞানী লোকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। কারণ জ্ঞান ব্যতীত আল্লাহর আয়াত অনুধাবন করা অসম্ভব।
বায়ুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন (N₂-78%) এবং অক্সিজেন (O₂-21%)। মেঘে ঢাকা আকাশে যখন বিদ্যুৎ চমকে তখন বায়ুর O₂ এবং N₂ এর মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া সংগঠিত হয়ে নাইট্রেট (NO₃) নামক যৌগমূলক সৃষ্টি হয়। বৃষ্টিধারার সাথে উক্ত NO₃ মাটিতে নেমে আসে। মাটিতে অবস্থিত সোডিয়াম (Na), ক্যালসিয়াম (Ca), ম্যাগনেসিয়াম (Mg) ইত্যাদি উপাদানের সাথে নাইট্রেটের বিক্রিয়া ঘটে, যার ফলে সৃষ্টি হয় সোডিয়াম নাইট্রেট (NaNO₃), ক্যালসিয়াম নাইট্রেট (Ca(NO₃)₂), ম্যাগনেসিয়াম নাইট্রেট (Mg(NO₃)₂) ইত্যাদি। আর এসব রাসায়নিক পদার্থ বৃক্ষ এবং ফসলের খাদ্য। আকাশে যতবেশী বিজলী চমকে ততবেশী এসব খাদ্য তৈরী হয়। ফলে রাতারাতি ফসলের চেহারা পাল্টে যায় এবং অধিক পরিমাণে ফল আর ফসল উৎপন্ন হয়।
অতএব, উপরোক্ত প্রক্রিয়ায় ফসলের খাদ্য তৈরি হয় কেবল আকাশে বিদ্যুৎ স্পার্কিং হলে। তা না হলে তো নয়। তাই আয়াতে আল্লাহ তাআলা যে আশার কথা বলেছেন তা এখন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থেকে বুঝা গেল।
هُوَ الَّذِي يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنْشِئُ السَّحَابَ الثَّقَالَ.
He It is Who shows you the lightning as a fear and as a hope and raises the heavy clouds with rain.
তিনি আল্লাহ যিনি বিজলী প্রদর্শন করেন। যা ভয় এবং আশার সঞ্চার করে। আর বৃষ্টি কণা সহ মেঘমালাকে উর্ধ্বে ওঠান। (রাদ-১২)
📄 পরাগায়ণ
পরাগায়ণ (Pollination)
سُبْحْنَ الَّذِي خَلَقَ الْأَزْوَاجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ وَمِنْ أَنْفُسِهِمْ وَمِمَّا لَا يَعْلَمُونَ.
Glory be to Him Who created all the pairs of that which the earth grows and in their own kind and in other things about which they have no knowledge.
মহামহিম প্রভু তিনি, যিনি মাটি থেকে উৎপন্ন সর্বকিছু এবং তাদের নিজেদের মধ্যে আর তারা জানে না এমন বস্তুসমূহের মধ্যে জোড়া সৃষ্টি করেছেন। (ইয়াসীন-৩৬)
মহান আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টিজগতের সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে জোড়া ভিত্তিক ব্যবস্থা বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন। পদার্থ জগত, প্রাণীজগত এবং উদ্ভিদ জগতে বিপরীত জোড়া যেমন আছে তেমনি পরমাণুর মধ্যে রয়েছে জোড়া। পুলিন, Sperm, Ovum, ক্রোমোজোম, জিন, DNA, RNA, প্রভৃতি জৈবিক উপাদানের মধ্যেও জোড়া ভিত্তিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। সমগ্র সৃষ্টি জুড়ে জোড়া ব্যবস্থা না থাকলে পদার্থ জগতের সম্প্রসারণ ঘটতো না। উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের বংশ বিস্তারের ধারা থেমে যেত। গোটা সৃষ্টি প্রাণহীন আড়ষ্টতায় পর্যবসিত হয়ে যেত।
উদ্ভিদ মাটি বিদীর্ণ করে ওঠে এবং অনড় দাঁড়িয়ে থাকে। তাহলে এদের মিলন ঘটবে কিভাবে? হ্যাঁ, মিলন ঘটবার কৌশলগত ব্যবস্থা রয়েছে। বৃক্ষ ও তরুবীথির যে ফুল সৃষ্টি হয়, তার পরাগধানীতে থাকে পুষ্পরেণু বা পুলিন। পুলিন দু'প্রকার। পুংরেণু এবং স্ত্রী রেণু। উভয় রেণুর মিলন হলেই ফল সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে পুংরেণু, স্ত্রীরেণু পর্যন্ত পৌঁছার জন্য দু'টি মাধ্যম কাজ করে। একটি হচ্ছে বায়ু প্রবাহ অপরটি কীটপতঙ্গ।
বায়ু প্রবাহের মাধ্যমে পুলিন উড়ে উড়ে চারপাশের ফুলের উপর গিয়ে পড়ে। ফলে পুংরেণু দ্বারা স্ত্রীরেণু নিষিক্ত হয় এবং ফল সৃষ্টি হয়। আবার প্রজাপতি, ভ্রমর, মৌমাছি প্রভৃতি যখন ফুলের উপর বসে তখন পুলিন তাদের পা গুলো জড়িয়ে ধরে। পরক্ষণে ওরা যখন অন্য ফুলের উপর গিয়ে বসে, তাদের পায়ে জড়ানো রেণু বিপরীত রেণুর সাথে মিলিত হয়ে নিষেক (fertilization) ঘটায়। ফুলে ফুলে মিলনের এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় পরাগায়ন (Pollination)।
এখন, পরাগায়ণ সম্পর্কে আল-কোরআনের ঐশী বাণী,
وَأَرْسَلْنَا الرِّيَاحَ لَوَاقِحَ.
And We send the fecundating wind.
আর আমরা ফলদানকারী (গর্ভ দানকারী) বাতাস প্রেরণ করি। (হিজর-২২)
وَمِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ جَعَلَ فِيهَا زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ.
And fruit of every kind He made in pairs two and two.
আর তিনি প্রত্যেক ফল দুই-দুই জোড়া থেকে সৃষ্টি করেছেন। (রাআদ-৩)
উক্ত আয়াতে 'জাওয়াইনিস্নাইন' (زوجين اثنين) শব্দ দ্বারা পুংরেণু (Male stamens) এবং স্ত্রীরেণু (Female pistils) কে বোঝানো হয়েছে। কেননা উভয়ের মিলনের দরুন ফল উৎপন্ন হয়।
কোন কোন ফুলে পুংকেশর ও স্ত্রীকেশর উভয়ই থাকে। বায়ু প্রবাহের প্রভাবে এরা যখন দোল খায় তখন পারস্পরিক মিলন ঘটে। যেমন, খেজুর ফল, পেঁপে ইত্যাদি।