📄 মান্না ও সাল্ভয়া
মান্না ও সালওয়া
وَظَلَّلْنَا عَلَيْكُمُ الْغَمَامَ وَأَنْزَلْنَا عَلَيْهِمُ الْمَنَّ وَالسَّلَى كُلُوا مِنْ طَيِّبَتِ مَا رَزَقْنَهُمْ وَمَا ظَلَمُونَا وَلكن كانوا انفسهم يظلمون
We caused the white clouds to overshadow you and sent down on you manna and salwa (quails), (saying): Eat of the good lawful things wherewith We have provided you. To Us they did no harm, but they harmed their ownselves.
আমরা তোমাদের ছায়াদান করার জন্য শুভ্র-মেঘ সৃষ্টি করেছি এবং মান্না ও সালওয়া (কোয়েল) পাঠিয়েছি। আমরা যে উত্তম পবিত্র খাদ্যদ্রব্য তোমাদের জন্য সরবরাহ করেছি তা থেকে ভক্ষণ কর। তারা আমাদের ক্ষতি করেনি। বরং নিজেরাই নিজেদের ক্ষতিসাধন করেছে। (বাকারা-৫৭)
শুভ্র-মেঘের ছায়া (The shade of white clouds)
উন্মুক্ত মরু প্রান্তরে সূর্যের কিরণ প্রত্যক্ষভাবে বালুকণার উপরে পড়ে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বালুকণা সহসা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উত্তপ্ত বালুকণা পরবর্তীতে তাপ বিকিরণ করে সংশ্লিষ্ট বাতাসকে অত্যন্ত উষ্ণ করে তোলে এবং এ উষ্ণ বাতাস উপরের দিকে উঠে যায়। যখন কোন নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্দ্র বায়ু উত্তপ্ত হয়ে উপরের দিকে ওঠে তখন তা আয়তনে বৃদ্ধি পায় (কারণ উপরে বায়ুর চাপ কম) এবং শীতল হয়। খুব বেশী শীতল হলে ঐ বায়ু সম্পৃক্ত হয় এবং জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হয়। তাই মেঘের ছায়া বরাবর নিচের বালুময় এলাকা তাপ হারিয়ে শীতল হয়ে যায়। তখন মেঘে ঢাকা মরুপ্রান্তর আর যন্ত্রণাদায়ক মনে হয় না।
সুতরাং শুভ্র-মেঘের ছায়াকে মরুবাসীদের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ বলা যায়। এ বিশেষ অনুগ্রহের কথা আলোচ্য আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে অনুগ্রহ দেখানো হয়েছিল মরুপ্রান্তরে ভ্রাম্যমান বনি ইসরাঈলীদের প্রতি।
মান্নাঃ আবদুল্লাহ ইউছুপ আলী উল্লেখ করেছেন, মান্না এটি হিব্রু শব্দ। যা হিব্রু ভাষার 'মানহু' শব্দ থেকে গৃহীত হয়েছে অথবা আরবী মান-হুয়া থেকে। মান হুয়া অর্থ "What is this?" এটা কি? বনী ইসরাঈলীরা যখন অনুর্বর মরুভূমিতে খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল তখন মেহেরবান আল্লাহপাক তাদের প্রতি মান্না ও সালওয়া নামের দু'প্রকার খাদ্যবস্তু সরবরাহ করেছিলেন। তারা এ খাদ্য বস্তু দু'টি অপ্রত্যাসিতভাবে হঠাৎ মাটির উপর দেখে হয়ত আশ্চর্য হয়ে 'মান্না' (من) এ প্রশ্নবোধক শব্দটি উচ্চারণ করেছিল। পবিত্র কোরআনের ভাষ্যকারগণ (commentators) বলেছেন, ঐ সময়ে সিনাই উপদ্বীপে প্রচুর পরিমাণ মান্না উৎপন্ন হতো এবং এটি অত্যধিক পুষ্টিমান সমৃদ্ধ ব্যতিক্রমধর্মী একটি উদ্ভিদ গ্রুপের নাম যাকে লাইকেন (Lichens) বলা হয়। প্রতিটি লাইকেন গঠিত হয় একটি শৈবাল ও একটি ছত্রাক প্রজাতির একত্রে মিথোজীবিতা (Symbiosis) পদ্ধতিতে বৃদ্ধির ফলে। একে তাই দ্বৈত উদ্ভিদ সত্তা (Dual organism) বলা হয় এবং তাদের এ দ্বৈত সত্তা খুবই অদ্ভুত ধরনের। শৈবাল ও ছত্রাক যৌথভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন আকার ও আকৃতির অঙ্গ তৈরী করে মিলে মিশে সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে।
লাইকেনের আবাসিক অবস্থান ও বিস্তৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। এরা পাথর, ইটের দেয়াল, বৃক্ষের কাণ্ড, ডাল, পাতা, পাহাড়-পর্বত, মাটি ইত্যাদি বিভিন্ন বস্তুর উপর ধূসর বর্ণের শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে বেড়ে ওঠে। তবে এরা সরাসরি পানিতে জন্মায় না। কিছু প্রজাতি ভেজা স্যাঁতসেঁতে স্থানে জন্মাতে পারে। উত্তর আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়ার বহু অঞ্চলে, পাহাড় ও অনুর্বর মরুভূমির বিশাল এলাকা জুড়ে এগুলো উৎপন্ন হয়। রহস্যজনকভাবে ঐগুলো যখন বাতাসের তোড়ে উড়ে এসে হাহাকার মরুভূমিতে পড়ে তখন মরুভূমির যাযাবর গোষ্ঠী খুব বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে প্রকাশ করে "এগুলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য বিশেষ রিযিক ব্যবস্থা"। ১৮৫৪ সনে ইরানে যখন দারুণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল তখন ঐ লাইকেন সেদেশে বৃষ্টির মত বর্ষিত হয়েছিল। এর ফলে দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষেরা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে মহান আল্লাহর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিলেন। বর্তমানে ইরানের মরুভূমি অঞ্চলে এবং কিরগিজস্তানের তৃণভূমি অঞ্চলে, মিশর, আলজেরিয়া, মরক্কো এবং আটলাস পর্বতের ঢালু এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির লাইকেন দেখা যায়। মান্না জাতীয় লাইকেন এখন আর সিনাই উপদ্বীপে পরিদৃষ্ট হয় না। কিন্তু হযরত মুছা (আঃ)-এর আমলে ঐ উপদ্বীপে বিদ্যমান ছিল, যা সেই সময়ে বিতাড়িত বনি ইসরাঈলীদের জন্য আল্লাহপাকের অনুগ্রহের নির্দেশনা বলেই প্রতীয়মান হয়।
সালওয়াঃ সালওয়া আরবী শব্দ। এ শব্দ দ্বারা কোয়েল (Quail) পাখিকে বুঝানো হয়। কোয়েল একটি পরিযায়ী পাখি (Migratory birds)। এটি ফ্যাস্যান্ট (Pheasant), পার্ট্রিজ (Partridge) ও টার্কী (Turkey) পাখির গোত্রভুক্ত। এ পাখির একটি প্রজাতির নাম *coturnis vulgaris*। এ প্রজাতির পাখি হাজার হাজার মাইল একটানা ভ্রমণ করতে পারে এবং এদের এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সর্বত্র দেখা যায়।
এটা একটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, মাইগ্রেটরি পাখিরা দীর্ঘ উড়ান যাত্রায় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে। সম্প্রতি তাদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আবিষ্কৃত হয়েছে। এ বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে তাই তাদের নাম দেয়া হয়েছে গণিতবিদ পাখি (Mathematician birds)। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে স্বদেশত্যাগী পাখিরা হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করার সময় তাদের গন্তব্যস্থল খুঁজে পাবার জন্য যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করে তার মধ্যে একটি হলো ভূতলস্থ দৃশ্যমান প্রাকৃতিক দৃশ্য যেমন, পর্বতমালা, উপকূলের অবস্থান ও আকৃতি, নদ-নদীর অবস্থান ও গতিপথ ইত্যাদির সাহায্য নেয়া।
অনেক পরিযায়ী পাখি দিক নির্ণয়ের জন্য সূর্যকে ব্যবহার করে। কিন্তু দিনটা যদি মেঘাচ্ছন্ন হয় তাহলে তারা দিক নির্ণয় কিভাবে করে! একজন পথিক যেমন দিক নির্ণয়ের জন্য যাত্রাপথে কম্পাস ব্যবহার করে। মাইগ্রেটরি পাখিরাও কি যাত্রাপথে তেমন কিছু ব্যবহার করে! হ্যাঁ, এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে কবুতর, কোয়েল অথবা মেরু টার্ন (Arctic Tern) প্রভৃতি পাখিদের মাথার খুলির ভেতরে একটা ছোট্ট চৌম্বক দানা (Pod of magnetic grain) আছে। সেজন্য এরা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সাথে নিজেদের সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে উড়ে চলে যা দিকনির্ণায়ক কম্পাসের মত কাজ করে। আবার রাতে ভ্রমণের সময় এরা আকাশের তারকারাজির মাধ্যমে দিক নির্ণয় করে। বিভিন্ন নক্ষত্রের অবস্থান দেখে কোন নির্দিষ্ট তারাকে অনুসরণ করে এরা পরিযান করে থাকে।
আরও একটি উপায় আছে তাহলো মাইগ্রেটরি পাখিরা সূর্যালোকের মেরুকরণ (Polarization Pattern) প্রবণতা উপলব্ধি করতে পারে। সূর্যরশ্মি বায়ুস্তর ভেদ করার সময় ক্ষুদ্র বায়ু কণার মধ্য দিয়ে আলোক তরঙ্গকে একটি নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত করে। সূর্যাস্তের সময় আকাশের তাকালে আলোর মেরুকরণ প্রবণতার (Resulting polarisation of the light) ব্যাপারটি আমরা চিহ্নিত করতে পারি। কিছু কিছু মাইগ্রেটরি পাখি আলোর মেরুপ্রবণতাকে আকাশে একটা বড় কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু যে কোন নাবিক বলতে পারে যে, একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাওয়ার জন্য যা প্রয়োজন তাহলো উত্তর দিক কোনটা জেনে নেয়া। এক্ষেত্রে মানুষের দরকার হয় এলিমেন্টারি ত্রিকোণমিতির (Elementary Trigonometry) এবং উচ্চতর ত্রিকোণমিতির মাধ্যমে একটা ম্যাপ অঙ্কন করা। পাখিরাও কি মানুষের মত ত্রিকোণমিতি সমাধান করতে পারে? নিঃসন্দেহে না। তবে পাখিদের পরিযান কৌশলকে যখন গণিতের ভাষায় রূপান্তর করা হয় তখনই কেবল হাজার হাজার মাইল ভ্রমণকারী পরিযায়ী পাখিদের গাণিতিক কার্যকলাপ আমাদের সামনে প্রতিভাত হয়। পরিযায়ী পাখির উপর সরল বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে পরিশিষ্ট ৯-এ।
প্রজ্ঞাময় আল্লাহপাক এরূপ মাইগ্রেটরি পাখি সালওয়া, অসহায় বনি ইসরাঈলীদের কাছে অনুগ্রহ পূর্বক পাঠিয়েছিলেন। পুষ্টিকর সালওয়া পাখির মাংসে মান্নার অনুরূপ কার্বোহাইড্রেট থাকায় এর মাংস সুষম খাদ্য তৈরী করতে পারে। কঠিন মরু প্রান্তরে খাদ্য সংকটের সময় বনি ইসরাঈলীদের নিকট আল্লাহপাক নির্দেশ দেন মান্না ও সালওয়া পবিত্র খাদ্যদ্বয় গ্রহণ করার জন্য। স্বাভাবিকভাবে তাদের উচিত ছিল সুমহান আল্লাহ তাআলার দরবারে সিজদাবনত হয়ে তাঁর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। অথচ তারা তার বিপরীত কাজটুকুই করেছে। এভাবে আল্লাহর করুণা লাভ করার পর যারা সারাজীবন তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞের মত আচরণ করে তাদের অবস্থা সেই ইসরাঈলীদের মত হয়ে থাকে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা লাঞ্ছনা, অপমান ও অপদস্ত করে পৃথিবীর বুকে যাযাবরের জীবন দান করেছেন। আর পরমুখাপেক্ষী করে রেখেছেন।
আল কোরআনের আরও দুইটি আয়াতে মান্না ও সালওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্নে তা পেশ করা হলো
وَظَلَّلْنَا عَلَيْهِمُ الْغَمَامَ وَأَنْزَلْنَا عَلَيْهِمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوى كُلُوا مِنْ طَيِّبَتِ مَا رَزَقْنكُمْ وَمَا ظَلَمُونَا وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ.
We gave them the shade of clouds and sent down to them manna and salwa. (Saying) "Eat of the good lawful things We have provided for you. To Us they did no harm but they harmed their own souls.
আমরা তাদেরকে মেঘমালার ছায়াদান করেছিলাম এবং তাদের কাছে মান্না ও সালওয়া পাঠিয়েছিলাম। এসব পবিত্র খাদ্যবস্তু তোমরা আহার কর। তারা আমাদের কোন ক্ষতি করেনি বরং নিজেদের ক্ষতিসাধন করেছে।" (আ'রাফ-১৬০)
يُبَنِي إِسْرَائِيلَ قَدْ أَنجَيْنكُمْ مِنْ عَدُوِّكُمْ وَوَعَدْنكُمْ جَانِبَ الطُّورِ الْأَيْمَنِ وَنَزَّلْنَا عَلَيْكُمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوى.
O children of Israel! We deliverd you from your enemy and We made a covenant with you on the holy mountain's side and sent down on you the manna and salwa.
হে ইসরাঈলের সন্তানেরা! আমরা তোমাদের শত্রুর কবল থেকে তোমাদের রক্ষা করেছি এবং পবিত্র পর্বতের পাদদেশে তোমাদের চুক্তিনামায় আবদ্ধ করেছি। আর তোমাদের খাদ্য হিসেবে মান্না ও সালওয়া প্রেরণ করেছি। (ত্বোয়াহা-৮০)
📄 What the Earth Grows
وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَىٰ لَنْ نَصْبِرَ عَلَىٰ طَعَامٍ وَاحِدٍ فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجْ لَنَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ مِنْ بَقْلِهَا وَقِثَّائِهَا وَفُومِهَا وَعَدَسِهَا وَبَصَلِهَا ۚ قَالَ أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَىٰ بِالَّذِي هُوَ خَيْرٌ ۚ اهْبِطُوا مِصْرًا فَإِنَّ لَكُمْ مَا سَأَلْتُمْ ۖ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ
And (remember) when you said, "O Moses! We cannot endure one kind of food (always): So beseech your Lord for us to produce for us of what the earth grows, its pot herbs and cucumbers, its wheat, lentils and onions." He said, "Will you exchange the better for the worse? Go you down to any town and you shall find what you want!" They were covered with humiliation and misery; and they drew on themselves the wrath of Allah.
আর (স্মরণ কর) যখন তোমরা বলেছ, "হে মূসা (আঃ)! আমরা তো একই রকম খাদ্য খেয়ে থাকতে পারব না। তাই আপনার প্রভুর নিকট আমাদের পক্ষে মিনতি পেশ করুন ভূ-পৃষ্ঠে যেসব খাদ্য জন্মে যেমন, সুগন্ধি সবজি, শশা, গম, মসুর ও পিঁয়াজ প্রভৃতি দেয়ার জন্য।" প্রতিউত্তরে তিনি (মূসা আঃ) বললেন, "তোমরা কি উত্তম খাদ্যের বিনিময়ে নিম্নমানের খাদ্য চাও? তাহলে যে কোন শহরে চলে যাও। তোমরা যা কামনা করছ সেখানে তা পাবে। আর তাদের উপর আরোপিত হলো লাঞ্ছনা ও দুর্গতি। তারা আল্লাহর রোষানলে পতিত হয়ে ঘুরতে লাগল। (বাকারাঃ৬১)
মান্না ও সালওয়া খাদ্য দু'টি সুষমভাবে একত্রিত করা হলে প্রয়োজনীয় ক্যালরি পাওয়া যায়। এ মিশ্রিত খাদ্য বস্তু সহজে হজম হয়ে প্রোটিন (Protein) ভিটামিন এবং অতি প্রয়োজনীয় অ্যামিনো এসিডের চাহিদা মেটায়। তাই অত্যধিক পুষ্টিমান সমৃদ্ধ মান্না ও সালওয়া আল্লাহপাক মেহেরবানী করে পাঠিয়েছিলেন বিতাড়িত বনী ইসরাঈলীদের প্রতি। তারা এ খাদ্য বস্তু দু'টির প্রতি সন্তুষ্ট না থেকে কিংবা আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন না করে ঐসব খাদ্যদ্রব্য (শাক-সবজি, গম, ডাল, পিঁয়াজ) দাবী করলো যেগুলো পুষ্টির দিক থেকে মান্না ও সালওয়ার স্থান দখল করতে পারে না। তাই আয়াতে বলা হয়েছে, "Will you exchange the better for the worse?"
আলোচ্য আয়াতে উদ্ভিদ গোত্রভুক্ত পাঁচ প্রকার খাদ্যবৃক্ষের উল্লেখ করা হয়েছে এবং এসব খাদ্যবৃক্ষ (Food plants) সেই সময়ে মিশরে বিদ্যমান ছিল যখন হযরত মূসা (আঃ) নেতৃত্বে বনী ইসরাঈলীরা মিশর ত্যাগ করেছিল। খাদ্যবস্তুগুলোর পুষ্টিমানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে পেশ করা হলো যাতে করে মান্না ও সালওয়ার পুষ্টিমূল্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়।
সুগন্ধি সবজি (Pot herbs)
ইউসুফ আলী আরবি বাকুলুন (بَقْل) শব্দের অনুবাদ করেছে Pot-herb শব্দ প্রয়োগ করে। যার অর্থ খাদ্যাদি সুগন্ধ ও সুস্বাদু করণার্থ লতাপাতা। যেমন, ধনেপাতা, পেঁয়াজ ও রসুনের সবুজপাতা ইত্যাদি। এ শব্দ দ্বারা ব্যাপক অর্থে শাক-সবজি জাতীয় খাদ্যকেও বুঝানো হয় যেগুলো রান্না করে তৃপ্তি সহকারে আহার করা যায়। যেমন, বাঁধাকপি, শালগম, সরিষা ও পালং শাক। এসব সবজির পাতা রসালু ও সুস্বাদু। ধনেপাতা কিংবা অন্যকোন সুগন্ধিযুক্ত লতাপাতা উল্লেখিত শাক-সবজীর সাথে মিশ্রিত করা হলে সেসবের স্বাদ আরও বেশী বৃদ্ধি পায়। বিতাড়িত বনী ইসরাঈলীরা হয়তো বা এ ধরনের খাদ্য সামগ্রীর আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু এ জাতীয় খাদ্যের পুষ্টিমান মান্নার সমকক্ষ কখনো হবে না।
শশা (Cucumbers)
আরবি শব্দ কিস্সাআ (قِثَّاء) অর্থ শশা। শশা গ্রীষ্মকালীন এক বর্ষজীবী Cucumis sativus সবজি এবং উদ্ভিদ বর্গ ক্যাম্পানিউলেলিস (Campanulales) এর অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীর প্রায় সবদেশে শশা জন্মায়। এমনকি শীত প্রধান দেশে কাচঘরের নিয়ন্ত্রণ তাপ ও আর্দ্রতায় এর চাষ করা হয়। মিশরে এটার চাষ শুরু হয়েছিল দ্বাদশ রাজবংশের আমলে। শশার খাদ্যমান প্রধানত শর্করা (Carbohydrate) ও ভিটামিনের মধ্যে পরিব্যাপ্ত। এতে পানির পরিমাণ ৯৫%, প্রোটিন ০.৭%, চর্বি ০.১% শর্করা ৩.৪% এবং ছিলকা ০.৪%। কচি অবস্থায় শশাকে সালাদ হিসেবে এবং রান্না করে তরকারী হিসেবে খাওয়া হয়। এটি বাংলাদেশের একটি প্রধান সবজি।
ইউসুফ আলী আরবি 'ফুম' (فُوم) শব্দের অনুবাদ করেছেন Garlic বা রসুন। কোরআনের অভিধানে এ শব্দের আরো দু'টি অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হলো গম (Wheat) অপরটি মটরশুঁটি। এখানে তিনটি অর্থই ধরে নিয়ে নিম্নে তার বিশ্লেষণ দেয়া হলো,
রসুন (Garlic)
রসুনের বৈজ্ঞানিক নাম Allium sativum, এটি বহু হাজার বছর ধরে একমাত্র আবাদি শস্য হিসেবেই পরিচিত। রসুনের উৎপত্তিস্থল মধ্য এশিয়ায় বলে মনে করা হয় এবং অতি প্রাচীনকালে সেখান থেকে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় বিস্তার লাভ করে। মিশরে আজ থেকে ৫০০০ বছর পূর্বে (ফেরাউনের রাজত্বকালে) খাদ্যরূপে এটি পরিচিত ছিল।
প্রাচীনকাল থেকে নানা অসুখে রসুনকে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। যেমন রসুনকে সব ধরনের বিষাক্ত দ্রব্যের প্রতিষেধক ঔষধ মনে করা হতো। রসুনের Allicin দ্রব্যে ব্যাকটেরিয়া নাশক গুণ বর্তমান। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে রসুনকে সর্দি কাশি সহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমাতে এবং হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়াতে রসুন বেশ কার্যকর বলে মনে করা হয়। রসুনে ৬৩% পানি, ৭% প্রোটিন, ২৮% শর্করা, সামান্য পরিমাণ ফ্যাট, আঁশ ও ১% ছাই থাকে। এর মধ্যে Allionin নামে অ্যামিনো অ্যাসিড ভেঙ্গে Allicin তৈরী হয় যার প্রধান উপকরণ হচ্ছে Diallyl disulphide যা রসুনের তীব্র গন্ধের জন্য দায়ী।
বনী ইসরাঈলীদের যারা এ খাদ্যের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল, খাদ্যের স্বাদ ও সুগন্ধি বৃদ্ধি করার জন্য এরা রসুন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতো।
গম (Wheat)
গমের বৈজ্ঞানিক নাম Triticum decoccum। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে গমের চাষ চলে আসছে। গমের ১২টি প্রজাতি আছে। এদের মধ্যে এমের (Emmer) প্রজাতির গম প্রাচীনতম। জানা গেছে প্রাচীন মিশরে এমের গমের চাষ প্রথম শুরু হয়েছিল। গমের দানা থেকে আজকাল নানা ধরনের খাদ্য তৈরী হয়। শিশু খাদ্য, গমের রুটি, পিঠা এবং গম থেকে বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট প্রস্তুত করা হয়। গমের পুষ্টিমান থাকার কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটাকে প্রধান খাদ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একটি গমের দানায় পানির পরিমাণ ১৩%, প্রোটিন ১২%, ফ্যাট ২% শর্করা ৭০% এবং ফাইবার ২% বর্তমান থাকে। গম বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য।
মসুর (Lentil)
আরবি 'আদাস' (عَدَس) শব্দের অর্থ মসুর ডাল। এর বৈজ্ঞানিক নাম Lens culinaris Medik। ধারণা করা হয় যে, মসুরের প্রথম উৎপত্তি তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে। পরে এটি গ্রীস, মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপ, মিশর, ইথিওপিয়া, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও চীনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটি শীতপ্রধান অঞ্চলের শস্য হলেও প্রায় গ্রীষ্মমন্ডল অঞ্চলে শীতকালে এবং গ্রীষ্মমন্ডলে অধিক উচ্চতায় ঠান্ডা ঋতুতে জন্মে। মসুর ছোট্ট দানাদার সিম জাতীয় ডাল। মসুর ডালের দানাতে পানি থাকে ১১.২%, প্রোটিন ২৫%, চর্বি ১% শর্করা ৫৬% এবং ফাইবার ৩% বিদ্যমান।
পিঁয়াজ (Onion)
আরবি 'বাসাল' (بَصَل) অর্থ পিঁয়াজ। পিঁয়াজের বৈজ্ঞানিক নাম Allium cepa। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, পিঁয়াজের উৎপত্তি ইরান, পাকিস্তান এবং ঐ দেশগুলির উত্তরবর্তী পাহাড়ী অঞ্চলে। অতি প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষে এবং মধ্যপ্রাচ্যে পিঁয়াজের চাষ হয়ে আসছে। প্রাচীন মিশরে পিঁয়াজ ছিল একটি জনপ্রিয় খাদ্য। একটি পরিপক্ক পিঁয়াজে পানি থাকে ৮৬%, প্রোটিন ১.৪০%, চর্বি ০.২%, শর্করা ১১% এবং ফাইবার (Fiber) ০.৪%। পিঁয়াজ এমন একটি শস্য যা মাছ, মাংস, শাক-সবজি এবং সালাদ তৈরী করে খাওয়া হয়। পিঁয়াজের সবুজ পাতা খাদ্যের স্বাদ ও সুগন্ধ বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হয়।
অতএব, উল্লেখিত শাক-সবজি ও শস্যদানা বিশ্বময় জনপ্রিয় ও অপরিহার্য খাদ্যবস্তু হিসেবে সমাদৃত। প্রজ্ঞাময় আল্লাহতাআলা মাটিতে উর্বরা শক্তি দান করার দরুন এসব খাদ্যবস্তু উৎপন্ন হয়। মিশর থেকে বিতাড়িত বনী ইসরাঈলীরা পূর্বে এসব খাদ্যদ্রব্যের স্বাদ উপভোগ করেছিল। তাই উন্মুক্ত মরুভূমির যাযাবর জীবনে পতিত হয়ে এসবের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল মান্না ও সালওয়ার পরিবর্তে। কিন্তু মানুষের অধিক পুষ্টির জন্য কিছু বিশেষ ধরনের খাদ্যপ্রাণের প্রয়োজন হয়। অ্যামিনো এসিড একটি বিশেষ জৈব উপাদান যা শাক সবজি জাত প্রোটিনের মধ্যে পাওয়া যায় না। মান্না শর্করা জাতীয় (carbohydrate) খাদ্য যার মধ্যে আছে সুক্রোজ (sucrose), লেভুলোজ (Levulose), গ্লুকোজ (glucose) এবং ডেক্সট্রিন (dextrin)। এগুলো খাওয়ার সাথে সাথে মানুষের শরীরে শক্তি সঞ্চারিত হয়। কিন্তু গম তা পারে না। কারণ গমে (wheat) যে স্টার্চ থাকে খাওয়ার পর প্রথমে সেটা গ্লুকোজে পরিণত হয়। তাই সে সরাসরি শক্তির যোগান দিতে পারে না। ডালজাত প্রোটিনের পুষ্টিমান কিছুটা বেশী (২০%)। কিন্তু যে প্রোটিন কোয়েল পাখির (সালওয়া) মাংস থেকে পাওয়া যায় তার মান আরও অধিক এবং তা সহজে হজম হয়ে শরীরে absorb হয়ে যায়। তাই মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা অধিক পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্যের পরিবর্তে নিম্নপুষ্টির খাদ্য চাও? তাহলে যে কোন শহরে প্রবেশ কর। ঐসব খাদ্য সর্বত্র সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু মান্না ও সালওয়া সর্বত্র সহজে পাওয়া যায় না।
References: 1. The meaning of the Glorious Quran; Text, Translation and Commentary; Abdullah Yusuf Ali 2. Science Encyclopedia; Vol-2; Bangla Academy, Dhaka.
সালোক সংশ্লেষণ (Photosynthesis)
H₂O + CO₂ = C₆H₁₂O₆ + O₂
সবুজ বৃক্ষ এবং ফসল সূর্যালোক থেকে শক্তি গ্রহণ করে পানি ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের রাসায়নিক বিক্রিয়া দ্বারা শর্করা (carbohydrate) নামক খাদ্য তৈরী করে। এ প্রক্রিয়াকে সালোক সংশ্লেষণ বলা হয়।
সালোক সংশ্লেষণ সংগঠিত হওয়ার জন্য পানি (H₂O), কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂), সূর্যের আলো এবং ক্লোরোফিল প্রয়োজন। উদ্ভিদ ও ফসল মূল রোমের সাহায্যে মাটি থেকে পানি শোষণ করে তা পাতা ও অন্যান্য অঙ্গে পৌঁছে দেয়। বায়ু থেকে CO₂ গ্রহণ করে। উদ্ভিদের পাতায় ক্লোরোফিল অণু থাকে। ক্লোরোফিল সূর্যালোক থেকে ফোটন (Photon) নামক আলোক কণা ধারণ করে উত্তেজিত হয়। যার ফলে একটি জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া দ্বারা শর্করা প্রস্তুত হয়।
H₂O + CO₂ ──────→ C₆H₁₂O₆ + O₂
ক্লোরোফিল শর্করা
উদ্ভিদ ছাড়া আর কোন প্রাণী নিজের খাদ্য (শর্করা) নিজে তৈরী করতে পারে না। অনন্ত অসীম করুণাময় প্রভু সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে কোরআন মজিদে তত্ত্ব পেশ করেছেন,
وَجَعَلْنَا سِرَاجًا وَهَاجًا
And We have made the sun a bright lamp.
আর আমরা সূর্যকে উজ্জ্বল প্রদীপ করেছি। (নাবা-১৩)
هُوَ الَّذِي يُرِيكُمُ آيَاتِهِ وَيُنَزِّلُ لَكُم مِّنَ السَّمَاءِ رِزْقًا
It is He Who shows you His Ayat and sends down provision for you from the sky.
তিনি-ই সে সত্ত্বা, যিনি ইঙ্গিত সমূহ প্রদর্শন করেন এবং তোমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্য সম্ভার সরবরাহ করেন (মু'মিন-১৩)
এখানে আকাশ থেকে খাদ্য সম্ভার সরবরাহ করার অর্থ হচ্ছে সূর্যের আলো থেকে বৃক্ষরাজি ও ফসল সালোক সংশ্লেষণ (Photosynthesis) প্রক্রিয়ায় নিজেদের খাদ্য (শর্করা) তৈরী করে পরিপুষ্ট হয়। অতঃপর মানুষের জন্য খাদ্য-শস্য উৎপন্ন করে।
আধুনিক বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন যে, প্রাকৃতিক প্রতিকূল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অন্ধকার পর্যায়েও সালোক সংশ্লেষণ ঘটতে পারে। উদ্ভিদ সূর্যের আলো থেকে এডিনোসিন ট্রাইফসফেট (ATP) নামক এক ধরনের অণু দেহের মধ্যে রিজার্ভ করে রাখে। সূর্যের আলো যখন থাকে না তখন ATP-র সহায়তায় H₂ অণুর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় CO₂ বিজারণের মাধ্যমে শর্করা (Carbohydrate) তৈরী করে নেয়।
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِى خَلَقَ السَّمُوتِ وَالْأَرْضَ وَجَعَلَ الظُّلُمَتِ وَالنُّورُ
All the Praises be to Allah Who created the heavens and the earth and made the darkness and the light.
মহিমাদীপ্ত আল্লাহ, যিনি নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আলো-আঁধার সৃষ্টি করেছেন। (আনআম-১)
অতএব, সালোক সংশ্লেষণ বিক্রিয়ায় উদ্ভিদ ও ফসল বাতাসে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন (O₂) ছেড়ে দেয় এবং বাতাস থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) গ্রহণ করে নেয়। পক্ষান্তরে মানুষ শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে বায়ু থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে। আর কার্বন ডাইঅক্সাইড ত্যাগ করে। সৃষ্টির এ প্রক্রিয়াটি মহানুভব আল্লাহর অসংখ্য রহমতের মধ্যে একটি।
Fear and Hope
وَمِنْ أَيْتِهِ يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنَزِّلُ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَيُحْيِ بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَتٍ لِقَوْمٍ تَعْقِلُونَ.
And among His signs is that He shows you the lightning by way both of fear and of hope and He sends down rain from the sky and therewith gives life to the earth after it is dead. Verily in that are indeed signs for those who are wise.
আল্লাহ তা'আলার অসংখ্য নিদর্শনের মধ্যে একটি হচ্ছে আকাশে বিদ্যুৎ চমক, যার মধ্যে ভয়ও আছে আশাও আছে এবং তিনি আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করে নির্জীব জমিনকে সজীব করেন। অবশ্যই এ সবের মধ্যে প্রকৃত সংকেত রয়েছে তাদের জন্য যারা জ্ঞান রাখে। (রূম-২৪)
আকাশে যখন বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ হয় তখন কোরআন বলছে, এ ঘটনায় ভয় এবং আশা উভয়ই বিদ্যমান। ভয় কিসের?
ভয় হচ্ছে, বজ্রপাতের দরুন জীবন সংহারের ভয়। সম্পদ ধ্বংস হওয়ার ভয়। বিকট শব্দে শ্রবণশক্তি নষ্ট হওয়ার ভয়। কিন্তু আশাটা কি!
আশার কথা বলে জ্ঞানী লোকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। কারণ জ্ঞান ব্যতীত আল্লাহর আয়াত অনুধাবন করা অসম্ভব।
বায়ুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেন। (N₂-78%) এবং (O₂-21%)। মেঘে ঢাকা আকাশে যখন বিদ্যুৎ চমকায় তখন বায়ুর O₂ এবং N₂ এর মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া সংগঠিত হয়ে নাইট্রেট (NO₃) নামক যৌগমূলক সৃষ্টি হয়। বৃষ্টিধারার সাথে উক্ত NO₃ মাটিতে নেমে আসে। মাটিতে অবস্থিত সোডিয়াম (Na), ক্যালসিয়াম (Ca), ম্যাগনেসিয়াম (Mg₂) ইত্যাদি উপাদানের সাথে নাইট্রেটের বিক্রিয়া ঘটে, যার ফলে সৃষ্টি হয় সোডিয়াম নাইট্রেট (NaNO₃), ক্যালসিয়াম নাইট্রেট (Ca₂NO₃), ম্যাগনেসিয়াম নাইট্রেট (Mg₂NO₃) ইত্যাদি। আর এসব রাসায়নিক পদার্থ বৃক্ষ এবং ফসলের খাদ্য। আকাশে যতবেশী বিজলি চমকায় ততবেশী এসব খাদ্য তৈরী হয়। ফলে রাতারাতি ফসলের চেহারা পাল্টে যায় এবং অধিক পরিমাণে ফল আর ফসল উৎপন্ন হয়।
অতএব, উপরোক্ত প্রক্রিয়ায় ফসলের খাদ্য তৈরি হয় কেবল আকাশে বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ হলে। তা না হলে তো নয়। তাই আয়াতে আল্লাহ তাআলা যে আশার কথা বলেছেন তা এখন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থেকে বুঝা গেল।
هُوَ الَّذِي يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنْشِئُ السَّحَابَ الثَّقَالَ.
He It is Who shows you the lightning as a fear and as a hope and raises the heavy clouds with rain.
তিনি আল্লাহ যিনি বিজলি প্রদর্শন করেন। যা ভয় এবং আশার সঞ্চার করে। আর বৃষ্টি কণা সহ মেঘমালাকে উর্ধ্বে ওঠান। (রাদ-১২)
পরাগায়ণ (Pollination)
سُبْحْنَ الَّذِي خَلَقَ الْأَزْوَاجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ وَمِنْ أَنْفُسِهِمْ وَمِمَّا لَا يَعْلَمُونَ.
Glory be to Him Who created all the pairs of that which the earth grows and in their own kind and in other things about which they have no knowledge.
মহামহিম প্রভু তিনি, যিনি মাটি থেকে উৎপন্ন সর্বকিছু এবং তাদের নিজেদের মধ্যে আর তারা জানেনা এমন বস্তু সমূহের মধ্যে জোড়া সৃষ্টি করেছেন। (ইয়াসীন-৩৬)
মহান আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টি জগতের সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে জোড়া ভিত্তিক ব্যবস্থা বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন। পদার্থ জগত, প্রাণীজগত এবং উদ্ভিদ জগতে বিপরীত জোড়া যেমন আছে তেমনি পরমাণুর মধ্যে রয়েছে জোড়া। পরাগরেণু, Sperm, Ovum, ক্রোমোজোম, জিন, DNA, RNA, প্রভৃতি জৈবিক উপাদানের মধ্যেও জোড়া ভিত্তিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। সমগ্র সৃষ্টি জুড়ে জোড়া ব্যবস্থা না থাকলে পদার্থ জগতের সম্প্রসারণ ঘটতো না। উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের বংশ বিস্তারের ধারা থেমে যেত। গোটা সৃষ্টি প্রাণহীন আড়ষ্টতায় পর্যবসিত হয়ে যেত।
উদ্ভিদ মাটি বিদীর্ণ করে ওঠে এবং অনড় দাঁড়িয়ে থাকে। তাহলে এদের মিলন ঘটবে কিভাবে। হ্যাঁ, মিলন ঘটবার কৌশলগত ব্যবস্থা রয়েছে। বৃক্ষ ও তরুবীথির যে ফুল সৃষ্টি হয়, তার পরাগধানীতে থাকে পুষ্পরেণু বা পরাগরেণু। পরাগরেণু দু'প্রকার। পুংরেণু এবং স্ত্রী রেণু। উভয় রেণুর মিলন হলেই ফল সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে পুংরেণু, স্ত্রীরেণু পর্যন্ত পৌঁছার জন্য দু'টি মাধ্যম কাজ করে। একটি হচ্ছে বায়ু প্রবাহ অপরটি কীটপতঙ্গ।
বায়ু প্রবাহের মাধ্যমে পরাগরেণু উড়ে উড়ে চার পাশের ফুলের উপর গিয়ে পড়ে। ফলে পুংরেণু দ্বারা স্ত্রীরেণু নিষিক্ত হয় এবং ফল সৃষ্টি হয়। আবার প্রজাপতি, ভ্রমর, মৌমাছি প্রভৃতি যখন ফুলের উপর বসে তখন পরাগরেণু তাদের পা গুলো জড়িয়ে ধরে। পরক্ষণে ওরা যখন অন্য ফুলের উপর গিয়ে বসে, তাদের পায়ে জড়ানো রেণু বিপরীত রেণুর সাথে মিলিত হয়ে নিষেক (fertilization) ঘটায়। ফুলে ফুলে মিলনের এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় পরাগায়ন (Pollination)।
এখন, পরাগায়ণ সম্পর্কে আল-কোরআনের ঐশী বাণী,
وَأَرْسَلْنَا الرِّيَاحَ لَوَاقِحَ.
And We send the fecundating wind.
আর আমরা ফলদানকারী (গর্ভ দানকারী) বাতাস প্রেরণ করি। (হিজর-২২)
وَمِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ جَعَلَ فِيهَا زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ.
And fruit of every kind He made in pairs two and two.
আর তিনি প্রত্যেক ফল দুই-দুই জোড়া থেকে সৃষ্টি করেছেন। (রাআদ-৩)
উক্ত আয়াতে 'জাওজাইনিস্নাইন' (زوجين اثنين) শব্দ দ্বারা পুংরেণু (Male stamens) এবং স্ত্রীরেণু (Female pistils) কে বুঝানো হয়েছে। কেননা উভয়ের মিলনের দরুন ফল উৎপন্ন হয়।
কোন কোন ফুলে পুংকেশর ও স্ত্রীকেশর উভয়ই থাকে। বায়ু প্রবাহের প্রভাবে এরা যখন দোল খায় তখন পারস্পরিক মিলন ঘটে। যেমন, খেজুর ফল, পেঁপে ইত্যাদি।
মিরাকল ফুড
তৎকালীন রাজা বাদশারা বলতেন মিরাকল ফুড বা আশ্চর্য খাবার। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে ডাক্তারী চিকিৎসায় এর ব্যবহার ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখনো একই গুরুত্ব বহন করে। মোগল আমলে রাজা বাদশারা তাদের যৌবন ধরে রাখার জন্য খাদ্যটি নিয়মিত গ্রহণ করতেন। বর্তমানে বিশ্বখ্যাত খেলোয়াড়েরা (Sportsmen) স্ট্যামিনা বৃদ্ধির জন্য এটি গ্রহণ করে। সাহিত্যের ভাষায় এটিকে রোমান্টিক খাদ্য বলা হয়। কেননা জীবনের সকল অপূর্ব মুহূর্তে এর নামটি উচ্চারিত হয়ে থাকে। খাদ্যটির নাম-মধু (Honey)।
ফুলের মধু গ্রন্থি থেকে মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে। আর তা সংরক্ষণ করে এমন কতগুলো প্রকোষ্ঠে (Cell) যা সুকৌশলে নির্মিত। মৌমাছির বাসা এতই শিল্প নৈপুণ্যতায় মন্ডিত যা রীতিমত বিস্ময়কর। সমগ্র বাসা (Nest) অসংখ্য ষড়ভুজের (Hexagon) সমষ্টি। অর্থাৎ এক একটি প্রকোষ্ঠ ৬টি বাহু দ্বারা সীমাবদ্ধ। ২টি বাহু খাড়াভাবে এবং চারটি বাহু তির্যকভাবে সংযুক্ত। বাহুগুলো মোমের তৈরী এবং একটি বাসায় পরস্পর সংযুক্ত অসংখ্য প্রকোষ্ঠ থাকে। যেখানে মধু জমা রাখা হয়। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে মৌমাছি বাসা নির্মাণের জন্য তিনটি স্থান সবচেয়ে বেশী পছন্দ করে থাকে। (১) পাহাড়ের কোল (২) বৃক্ষ ডাল (৩) বাড়ী ঘরের ছাদ। একটি বাসায় কেবল একজন রাণী মৌmaছি থাকে এবং হাজার হাজার কর্মী মৌমাছি (স্ত্রী) কঠোর পরিশ্রম স্বীকার করে মধু সংগ্রহ করে। এ কাজে কেউ এতটুকু অলসতা প্রদর্শন করেছে কিনা সে বিষয়ে সবাই রাণীর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। মৌমাছির এ শিক্ষা আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মৌমাছির বাসায় মধু সংরক্ষণ প্রকোষ্ঠ
মধুতে দু'রকম শর্করা পাওয়া যায়। গ্লুকোজ এবং ফ্রুক্টোজ। এ দু'টি উপাদান মধুর প্রধান উপকরণ। এতে সামান্য পরিমাণে সুক্রোজ ও মল্টোজ রয়েছে।
মধুতে কার্বোহাইড্রেট ৭৯.৫%, প্রোটিন ০.৩%, আয়রন-০.৭% হারে বিদ্যমান। ডাক্তারী ভাষায় মধুকে বলা হয় ডিটারজেন্ট টু আলসার। মেডিসিন হিসেবে মধু ব্যাকটেরিয়ার এক নম্বর শত্রু। অর্থাৎ এটি অ্যান্টিবায়োটিকের মত কাজ করে। ওরাল ডিহাইড্রেশনে মধুকে চিনির পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়। যা ডায়রিয়া প্রতিকারে বিশেষ কার্যকর। কণ্ঠস্বর সবল করার জন্য মধুর শরবত অত্যন্ত উপকারী। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে, মধু রোগজীবাণু খুব কার্যকর ভাবে ধ্বংস করে।
وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِى مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا وَمِنَ الشَّجَرِ وَمِمَّا يَعْرِشُونَ . ثُمَّ كُلِى مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكِ ذُلُلًا يَخْرُجُ مِنْ بُطُونِهَا شَرَابٌ مُخْتَلِفُ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءُ لِلنَّاسِ، إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
And your Lord inspired the bees, saying: "Take your habitations in the hills, and on the trees and in what they erect. Then eat of all the fruits and follow the paths of your Lord made tractable for you; there issues forth from their bellies, a drink of varying colours, wherein is healing for men; Verily in this is indeed a sign for people who thought.
আপনার প্রভু মধুমক্ষিকাকে এ মর্মে ওহী করেছেন, তোমরা গাছের ডালে, পাহাড়ে এবং ঘরবাড়ীর ছাদে বাসা (মৌচাক) নির্মাণ কর। অতঃপর সর্বপ্রকার ফল থেকে ভক্ষণ কর এবং আপন প্রভুর পথে চল যা অতি সরল। তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙ্গের পানীয় (মধু) নির্গত হয়। তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নির্দেশনা। (নাহাল-৬৮-৬৯)
References: 1. The Holy Quran; Abdullah Yusuf Ali 2. Scientific Indications in the Holy Quran; 2nd Edn. M. Shamsher Ali & others: Islamic Foundation Bangladesh. 3. Science Encyclopedia; first published Nov. 99 Bangla Academy; Dhaka. 4. Text Books of Botany for Colleges. 5. The Birds, Time-Life International, Nederland, R.T. Peterson.
📄 সুগন্ধি সবজি, শশা, রসুন, গম, মসুর, পিঁয়াজ
আলোচ্য আয়াতে উদ্ভিদ গোত্রভুক্ত পাঁচ প্রকার খাদ্যবৃক্ষের উল্লেখ করা হয়েছে এবং এসব খাদ্যবৃক্ষ (Food plants) সেই সময়ে মিশরে বিদ্যমান ছিল যখন হযরত মূসা (আঃ) নেতৃত্বে বনী ইসরাঈলীরা মিশর ত্যাগ করেছিল। খাদ্যবস্তুগুলোর পুষ্টিমানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে পেশ করা হলো যাতে করে মান্না ও সালওয়ার পুষ্টিমূল্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়।
**সুগন্ধি সবজি (Pot herbs)**
ইউসুফ আলী আরবী বাকুলুন (بقل) শব্দের অনুবাদ করেছে Pot-herb শব্দ প্রয়োগ করে। যার অর্থ খাদ্যাদি সুগন্ধ ও সুস্বাদু করণার্থ লতাপাতা। যেমন, ধনেপাতা, পিঁয়াজ ও রসুনের সবুজপাতা ইত্যাদি। এ শব্দ দ্বারা ব্যাপক অর্থে শাক-সবজি জাতীয় খাদ্যকেও বুঝানো হয় যেগুলো রান্না করে তৃপ্তি সহকারে আহার করা যায়। যেমন, বাঁধাকপি, শালগম, সরিষা ও পালং শাক। এসব সবজির পাতা রসালু ও সুস্বাদু। ধনেপাতা কিংবা অন্যকোন সুগন্ধিযুক্ত লতাপাতা উল্লেখিত শাক-সবজীর সাথে মিশ্রিত করা হলে সেসবের স্বাদ আরও বেশী বৃদ্ধি পায়। বিতাড়িত বনী ইসরাঈলীরা হয়তো বা এ ধরনের খাদ্য সামগ্রীর আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু এ জাতীয় খাদ্যের পুষ্টিমান মান্নার সমকক্ষ কখনো হবে না।
**শশা (Cucumbers)**
আরবী শব্দ কিস্সাআ (قثاء) অর্থ শশা। শশা গ্রীষ্মকালীন এক বর্ষজীবী Cucumis sativus সবজি এবং উদ্ভিদ বর্গ ক্যাম্পানিউলেলিস (Campanulales) এর অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীর প্রায় সবদেশে শশা জন্মায়। এমনকি শীত প্রধান দেশে কাচঘরের নিয়ন্ত্রণ তাপ ও আর্দ্রতায় এর চাষ করা হয়। মিশরে এটার চাষ শুরু হয়েছিল দ্বাদশ রাজবংশের আমলে। শশার খাদ্যমান প্রধানত শর্করা (Carbohydrate) ও ভিটামিনের মধ্যে পরিব্যাপ্ত। এতে পানির পরিমান ৯৫%, প্রোটিন ০.৭%, চর্বি ০.১% শর্করা ৩.৪% এবং ফাইবার ০.৪%। কচি অবস্থায় শশাকে সালাদ হিসেবে এবং রান্না করে তরকারী হিসেবে খাওয়া হয়। এটি বাংলাদেশের একটি প্রধান সবজি।
**রসুন (Garlic)**
রসুনের বৈজ্ঞানিক নাম Allium sativum, এটি বহু হাজার বছর ধরে একমাত্র আবাদি শস্য হিসেবেই পরিচিত। রসুনের উৎপত্তিস্থল মধ্য এশিয়ায় বলে মনে করা হয় এবং অতি প্রাচীনকালে সেখান থেকে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় বিস্তার লাভ করে। মিশরে আজ থেকে ৫০০০ বছর পূর্বে (ফেরাউনের রাজত্বকালে) খাদ্যরূপে এটি পরিচিত ছিল।
প্রাচীনকাল থেকে নানা অসুখে রসুনকে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। যেমন রসুনকে সব ধরনের বিষাক্ত দ্রব্যের প্রতিষেধক ঔষধ মনে করা হতো। রসুনের Allicin দ্রব্যে ব্যাকটেরিয়া নাশক গুণ বর্তমান। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে রসুনকে সর্দি কাশি সহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমাতে এবং হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়াতে রসুন বেশ কার্যকর বলে মনে করা হয়। রসুনে ৬৩% পানি, ৭% প্রোটিন, ২৮% শর্করা, সামান্য পরিমাণ ফ্যাট, আঁশ ও ১% ছাই থাকে। এর মধ্যে Alliin নামে অ্যামিনো অ্যাসিড ভেঙ্গে Allicin তৈরী হয় যার প্রধান উপকরণ হচ্ছে Diallyl disulphide যা রসুনের তীব্র গন্ধের জন্য দায়ী।
বনী ইসরাঈলীদের যারা এ খাদ্যের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল, খাদ্যের স্বাদ ও সুগন্ধি বৃদ্ধি করার জন্য এরা রসুন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতো।
**গম (Wheat)**
গমের বৈজ্ঞানিক নাম Triticum dicoccum। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে গমের চাষ চলে আসছে। গমের ১২টি প্রজাতি আছে। এদের মধ্যে এমার (Emmer) প্রজাতির গম প্রাচীনতম। জানা গেছে প্রাচীন মিশরে এমার গমের চাষ প্রথম শুরু হয়েছিল। গমের দানা থেকে আজকাল নানা ধরনের খাদ্য তৈরী হয়। শিশু খাদ্য, গমের রুটি, পিঠা এবং গম থেকে বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট প্রস্তুত করা হয়। গমের পুষ্টিমান থাকার কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটাকে প্রধান খাদ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একটি গমের দানায় পানির পরিমাণ ১৩%, প্রোটিন ১২%, ফ্যাট ২% শর্করা ৭০% এবং ফাইবার ২% বর্তমান থাকে। গম বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য।
**মসুর (Lentil)**
আরবী ‘আদাস’ শব্দের অর্থ মসুর ডাল। এর বৈজ্ঞানিক নাম Lens culinaris Medik। ধারণা করা হয় যে, মসুরের প্রথম উৎপত্তি তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে। পরে এটি গ্রীস, মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপ, মিশর, ইথিওপিয়া, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও চীনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটি শীতপ্রধান অঞ্চলের শস্য হলেও প্রায় গ্রীষ্মমন্ডল অঞ্চলে শীতকালে এবং গ্রীষ্মমন্ডলে অধিক উচ্চতায় ঠান্ডা ঋতুতে জন্মে। মসুর ছোট্ট দানাদার সিম জাতীয় ডাল। মসুর ডালের দানাতে পানি থাকে ১১.২%, প্রোটিন ২৫%, চর্বি ১% শর্করা ৫৬% এবং ফাইবার ৩% বিদ্যমান।
**পিঁয়াজ (Onion)**
আরবী ‘বাসাল’ (بصل) অর্থ পিঁয়াজ। পিঁয়াজের বৈজ্ঞানিক নাম Allium cepa। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, পিঁয়াজের উৎপত্তি ইরান, পাকিস্তান এবং ঐ দেশগুলির উত্তরবর্তী পাহাড়ী অঞ্চলে। অতি প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষে এবং মধ্যপ্রাচ্যে পিঁয়াজের চাষ হয়ে আসছে। প্রাচীন মিশরে পিঁয়াজ ছিল একটি জনপ্রিয় খাদ্য। একটি পরিপক্ব পিঁয়াজে পানি থাকে ৮৬%, প্রোটিন ১.৪০%, চর্বি ০.২%, শর্করা ১১% এবং ফাইবার ০.৪%। পিঁয়াজ এমন একটি শস্য যা মাছ, মাংস, শাক-সবজি এবং সালাদ তৈরী করে খাওয়া হয়। পিঁয়াজের সবুজ পাতা খাদ্যের স্বাদ ও সুগন্ধ বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হয়।
অতএব, উল্লেখিত শাক-সবজি ও শস্যদানা বিশ্বময় জনপ্রিয় ও অপরিহার্য খাদ্যবস্তু হিসেবে সমাদৃত। প্রজ্ঞাময় আল্লাহতাআলা মাটিতে উর্বরা শক্তি দান করার দরুন এসব খাদ্যবস্তু উৎপন্ন হয়। মিশর থেকে বিতাড়িত বনী ইসরাঈলীরা পূর্বে এসব খাদ্যদ্রব্যের স্বাদ উপভোগ করেছিল। তাই উন্মুক্ত মরুভূমির যাযাবর জীবনে পতিত হয়ে এসবের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল মান্না ও সালওয়ার পরিবর্তে। কিন্তু মানুষের অধিক পুষ্টির জন্য কিছু বিশেষ ধরনের খাদ্যপ্রাণের প্রয়োজন হয়। অ্যামিনো এসিড একটি বিশেষ জৈব উপাদান যা শাক সবজি জাত প্রোটিনের মধ্যে পাওয়া যায় না। মান্না শর্করা জাতীয় (carbohydrate) খাদ্য যার মধ্যে আছে সুক্রোজ (sucrose), লেভুলোস (Levulose), গ্লুকোজ (glucose) এবং ডেক্সট্রিন (dextrin)। এগুলো খাওয়ার সাথে সাথে মানুষের শরীরে শক্তি সঞ্চারিত হয়। কিন্তু গম তা পারে না। কারণ গমে (wheat) যে স্টার্চ থাকে খাওয়ার পর প্রথমে সেটা গ্লুকোজে পরিণত হয়। তাই সে সরাসরি শক্তির যোগান দিতে পারে না। ডালজাত প্রোটিনের পুষ্টিমান কিছুটা বেশী (২০%)। কিন্তু যে প্রোটিন কোয়েল পাখির (সালওয়া) মাংস থেকে পাওয়া যায় তার মান আরও অধিক এবং তা সহজে হজম হয়ে শরীরে absorb হয়ে যায়। তাই মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা অধিক পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্যের পরিবর্তে নিম্নপুষ্টির খাদ্য চাও? তাহলে যে কোন শহরে প্রবেশ কর। ঐসব খাদ্য সর্বত্র সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু মান্না ও সালওয়া সর্বত্র সহজে পাওয়া যায় না।
📄 সালোক সংশ্লেষণ
সালোক সংশ্লেষণ (Photosynthesis)
H₂O + CO₂ = C₆H₁₂O₆ + O₂
সবুজ বৃক্ষ এবং ফসল সূর্যালোক থেকে শক্তি গ্রহণ করে পানি ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের রাসায়নিক বিক্রিয়া দ্বারা শর্করা (carbohydrate) নামক খাদ্য তৈরী করে। এ প্রক্রিয়াকে সালোক সংশ্লেষণ বলা হয়।
সালোক সংশ্লেষণ সংগঠিত হওয়ার জন্য পানি-(H₂O) কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂), সূর্যের আলো এবং ক্লোরোফিল প্রয়োজন। উদ্ভিদ ও ফসল মূল রোমের সাহায্যে মাটি থেকে পানি শোষণ করে তা পাতা ও অন্যান্য অঙ্গে পৌঁছে দেয়। বাতাস থেকে CO₂ গ্রহণ করে। উদ্ভিদের পাতায় ক্লোরোফিল অণু থাকে। ক্লোরোফিল সূর্যালোক থেকে ফোটন (Photon) নামক আলোক কণা ধারণ করে উত্তেজিত হয়। যার ফলে একটি জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া দ্বারা শর্করা প্রস্তুত হয়।
আলো
H₂O + CO₂ ──────→ C₆H₁₂O₆ + O₂
ক্লোরোফিল শর্করা
উদ্ভিদ ছাড়া আর কোন প্রাণী নিজের খাদ্য (শর্করা) নিজে তৈরী করতে পারে না। অনন্ত অসীম করুণাময় প্রভু সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে কোরআন মজিদে তত্ত্ব পেশ করেছেন,
وَجَعَلْنَا سِرَاجًا وَهَاجًا
And We have made the sun a bright lamp.
আর আমরা সূর্যকে উজ্জ্বল প্রদীপ করেছি। (নাবা-১৩)
هُوَ الَّذِي يُرِيكُمُ آيَاتِهِ وَيُنَزِّلُ لَكُم مِّنَ السَّمَاءِ رِزْقًا
It is He Who shows you His Ayat and sends down provision for you from the sky.
তিনি-ই সে সত্ত্বা, যিনি ইঙ্গিত সমূহ প্রদর্শন করেন এবং তোমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্য সম্ভার সরবরাহ করেন (মু'মিন-১৩)
এখানে আকাশ থেকে খাদ্য সম্ভার সরবরাহ করার অর্থ হচ্ছে সূর্যের আলো থেকে বৃক্ষরাজি ও ফসল সালোক সংশ্লেষণ (Photosynthesis) প্রক্রিয়ায় নিজেদের খাদ্য (শর্করা) তৈরী করে পরিপুষ্ট হয়। অতঃপর মানুষের জন্য খাদ্য-শস্য উৎপন্ন করে।
আধুনিক বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন যে, প্রাকৃতিক প্রতিকূল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অন্ধকার পর্যায়েও সালোক সংশ্লেষণ ঘটতে পারে। উদ্ভিদ সূর্যের আলো থেকে অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেট (ATP) নামক এক ধরনের অণু দেহের মধ্যে রিজার্ভ করে রাখে। সূর্যের আলো যখন থাকে না তখন ATP-র সহায়তায় H₂ অণুর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় CO₂ বিজারণের মাধ্যমে শর্করা (Carbohydrate) তৈরী করে নেয়।
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِى خَلَقَ السَّمُوتِ وَالْأَرْضَ وَجَعَلَ الظُّلُمَتِ وَالنُّورُ
All the Praises be to Allah Who created the heavens and the earth and made the darkness and the light.
মহিমাদীপ্ত আল্লাহ, যিনি নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আলো-আঁধার সৃষ্টি করেছেন। (আনআম-১)
অতএব, সালোক সংশ্লেষণ বিক্রিয়ায় উদ্ভিদ ও ফসল বাতাসে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন (O₂) ছেড়ে দেয় এবং বাতাস থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) গ্রহণ করে নেয়। পক্ষান্তরে মানুষ শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে। আর কার্বন ডাইঅক্সাইড ত্যাগ করে। সৃষ্টির এ প্রক্রিয়াটি মহানুভব আল্লাহর অসংখ্য রহমতের মধ্যে একটি।