📄 ঘন সন্নিবেশিত শস্যকণা
এ আয়াতে যেসব ফল ও শস্যকণা উদাহরণ স্বরূপ পেশ করা হয়েছে তা নিম্নে সংক্ষেপে বর্ণনা দেয়া হলো,
ঘন সন্নিবেশিত শস্যকণা (Clustered grains)
শস্যকণার চারা বা খাদ্যশস্য ঘাসের গোত্রভুক্ত (Grass family)। এগুলো মানুষ ও গৃহপালিত পশু-পাখিদের শাক জাতীয় খাদ্য শস্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এসব খাদ্যে মিশে আছে স্টার্চ (starch), প্রোটিন, কিছু খনিজদ্রব্য এবং বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন। খাদ্য শস্যের শ্রেণী বিভাগের মধ্যে পড়ে অসংখ্য রকমের খাদ্যশস্য। পৃথিবীর প্রধান খাদ্য শস্যগুলো হলো- ধান (paddy), গম (wheat), বার্লি (barley), জেয়ার/ভুট্টা (millet), যব (maize) এবং রাই (rye)। এগুলো সব একবীজ পত্রী শস্য দানা। দ্বিবীজ পত্রী বা যুগ্ম শস্য দানা হলো, শিম, মটর, শুটি, ডাল ইত্যাদি।
এসব খাদ্যের মধ্যে গম ও যব ইসলামের প্রাথমিক যুগে আরবদের কাছে পরিচিত ছিল। এগুলো শস্য ঘন সন্নিবিষ্ট। অর্থাৎ এদের মঞ্জুরিতে থাকে দুই সারি দানার ঠাসা বুননি। এ আয়াতে খাদ্য শস্যের যে ঘন সন্নিবিষ্ট ঠাসা-বুননির কথা তুলে ধরা হয়েছে তা খুবই সঙ্গত। কারণ খাদ্য শস্যের শিষে সাজানো থাকে খাদ্য দানার সঘন সমাহার।
📄 খেজুর, আঙ্গুর, যাইতুন, আনার, পাকা ফল
খেজুর (Dates):
আরব ভূ-খন্ডে খেজুর বৃক্ষের চাষ অতি প্রাচীন ঘটনা। বলতে গেলে হযরত আদম (আঃ) এর আবির্ভাবের পরেই খেজুর ফলের বাগান গড়ে ওঠে। আর পার্থিব জমিতে সর্ব প্রথম কৃষি কাজ শুরু করেন পৃথিবীর প্রথম মানব আদম (আঃ)। খেজুর বাগান সমূহ এমন সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে থাকে যেগুলো দেখলে মনে হব যেন ধূসর মরুতে সবুজের আনন্দ সম্মিলন। বৃক্ষগুলিতে যখন ফল ধরে তা নীচের দিকে ঝুলে পড়ে এবং খেজুর ফল শর্করা, ক্যালসিয়াম আর ভিটামিন A1, B1, B2 তে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ভেজা খেজুরে শর্করা থাকে ৬০% এবং শুকনা খেজুরে শর্করার পরিমাণ ৭০%। প্রাচীন আমলে খেজুরই ছিল আরব, পারস্য এবং উত্তর আফ্রিকার অধিবাসীদের প্রদান খাদ্য। মুহাম্মদ (সঃ) এর যুগেও খেজুর ছিল প্রধান খাদ্য (Staple food)।
আঙ্গুর (Grapes):
প্রায় ৬৫০০ বছর পূর্বে আঙ্গুরের চাষ শুরু হয় প্রাচীন মিশরে। অতপর এর চাষ ছড়িয়ে পড়ে আরব ভূ-খন্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে, পারস্যে (ইরান) এবং এশিয়া ও ইউরোপে। সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় এর চাহিদা এবং বারতার বেড়েই চলেছে। আঙ্গুর ফলের চাষের ঐতিহ্য অতি প্রাচীন হলেও বর্তমানে জিন প্রযুক্তির মাধ্যমে এর উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাংলাদেশেও এখন প্রচুর পরিমাণে আঙ্গুর ফল উৎপন্ন হয়। অতি সুস্বাদু ফল হিসাবে আঙ্গুর সর্বসাধারণের কাছে অতি প্রিয় ফল। মানব দেহের পুষ্টি সাধনের প্রয়োজনীয় উপাদান যথা-আয়রন, কার্বোহাইড্রেট, সাইট্রিক এসিড, ভিটামিন A,B প্রচুর পরিমাণে এতে রয়েছে।
যাইতুন (olives):
মানব সভ্যতার উন্নয়ন মানুষের ইতিহাসের সাথে যাইতুন বৃক্ষ ও যাইতুন ফল নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। যাইতুনের চেয়ে অতি প্রাচীন ঐতিহাসিক বৃক্ষ দ্বিতীয়টি নেই। সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে এটি শান্তি, সমৃদ্ধি, সৌন্দর্য ও শক্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এটি শুধু খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়না। এর তৈল ব্যবহৃত হয় নানা কাজে। যেমন, ঔষধ তৈরীতে, কসমেটিক প্রস্তুত করার জন্য, মেশিনারী এবং সাবান প্রস্তুত কার্যে। যাইতুন বৃক্ষ প্রায় এক হাজার বৎসর বাঁচে। আল্লাহ তা'আলা কোরআনে যাইতুনের শপথ করেছেন এর উপকারিতা ও ঐতিহ্য উপলব্ধি করার জন্য।
আনার (Pomegranates):
আনার ফলের চাষ শুরু হয়েছিল সর্বপ্রথম মিশর এবং মেসোপটেমিয়ায়। হযরত সোলায়মান (আঃ) সেই যুগে আনারের একটি বিরাট বাগান গড়ে তোলেছিলেন বলে জানা যায়। এ ফলটির গঠন প্রকৃতি অত্যন্ত নৈপুণ্যমন্ডিত। উপরে মোটা শক্ত আবরণ আর ভেতরে থাকে গুটি গুটি দানা। দানাগুলো গুচ্ছাকারে বিভিন্ন চেম্বারে বিভক্ত থাকে। অত্যন্ত পুষ্টিকর ফল, যার মধ্যে রয়েছে প্রচুর আয়রন, ভিটামিন, মিনারেল সল্ট, শর্করা ইত্যাদি।
পাকা ফল (Ripe fruits):
পাকা ফলের মধ্যে যে আকর্ষণীয় রঙের সমাহার দেখা যায় তা নির্ভর করে বিভিন্ন গাছের রঙের উপর কিংবা গাছের প্রাণরসবাহী কোষে যে রঙের উপাদান আছে তার আনুপাতিক উপস্থিতির উপর। ক্লোরোফিল (Chlorophyll) হচ্ছে মূল রং যা তার সবুজ রংকে বৃক্ষের পাতা ও ফলের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। এ সবুজ রং ফলের প্রাথমিক গ্রুপ হিসেবে বিবেচিত। রঙের দ্বিতীয় গ্রুপটির ৬০টির মত গঠন বস্তুর মধ্যে পাওয়া যায়। এদের রঙের ব্যাপ্তি হচ্ছে কমলা হলুদ থেকে টমেটো রাঙা লাল পর্যন্ত সীমিত। রঙের তৃতীয় পরিবারটি এ্যান্থোসাইয়ানীন (Anthocyanin) রং থেকে উদ্ভূত। মৃদু গোলাপী আস্তরণের ব্যাপ্তি থেকে রক্তিম গোলাপী রঙ পর্যন্ত বিস্তৃত। এ্যান্থোসাইয়ানীন নিয়ন্ত্রিত হয় কোষের অম্লত্বের সাহায্যে। সকল পাকা ফলের গায়ে যে লাল রং ফুটে ওঠে তা এ্যান্থোসাইয়ানীন অম্লত্বের মাধ্যমে প্রকাশ পায় এবং এ ইঙ্গিত দেয় যে এ ফল এখন খাবার পক্ষে উপযোগী। তখন পাখি, অন্যান্য প্রাণী ও মানুষ ফল খেয়ে ফলের বীজ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে বৃক্ষের বিস্তার ঘটে।
কোরআনের আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা কয়েকটি মূল্যবান বৃক্ষের নাম উল্লেখ করেছেন তাঁর অসীম রহমতের প্রতীক হিসেবে। এরূপ হাজার হাজার ফলের বৃক্ষ গোটা প্রকৃতি জুড়ে রয়েছে যা গুনে শেষ করা যাবে না।
তবে উদ্ভিদ জগত অতিশয় বিশাল। এর প্রজাতি সংখ্যা প্রায় ৩,৫০,০০০ (তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার)। এ প্রজাতিগুলোকে বিস্তৃতভাবে শ্রেণী বিন্যাস করা হয়ে থাকে। এর একটি শ্রেণী হলো সপুষ্পক গাছপালা। আর অন্য শ্রেণী ভুক্ত গাছপালাগুলো হলো অপুষ্পক। অপুষ্পক বৃক্ষরাজির ফুল হয় না। এদের বংশবৃদ্ধি ঘটে অন্যান্য বিবিধ পন্থায়। পরাগায়ন পদ্ধতিতে নয়।
وَايَةٌ لَّهُمُ الْأَرْضُ الْمَيْتَةُ أَحْيَيْنَهَا وَأَخْرَجْنَا مِنْهَا حَبًّا فَمِنْهُ يَأْكُلُونَ.
A Sign for them is the dead land. We give it life and produce grains therefrom so that they eat thereof.
তাদের জন্য একটি সংকেত হলো নিষ্প্রাণ জমি, আমরা উহাকে সজীব করি এবং তাতে শস্য উৎপন্ন করি। যেন তারা ঐগুলো ভক্ষণ করতে পারে। (ইয়াসিন-৩৩)
وَنَزَّلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً مُبَارَكًا فَأَنْبَتْنَا بِهِ جَنَّاتٍ وَحَبَّ الْحَصِيدِ.
And We send down from the sky rain which is full of blessings and We produce therewith gardens and grains for harvest.
আর আমরা আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করি যা অতি বরকতময়, অতপর তা দিয়ে বাগান রচি এবং তোলার জন্য খাদ্য শস্য উৎপন্ন করি। (ক্বাফ-৯)
وَالْأَرْضَ مَدَدْنَهَا وَأَلْقَيْنَا فِيهَا رَوَاسِيَ وَأَنْبَتْنَا فِيهَا مِنْ كُلِّ شَيْءٍ مَوْزُونِ وَجَعَلْنَا فِيهَا مَعَايِشَ وَمَنْ لَسْتُمْ لَهُ بِرَازِقِينَ.
And the earth We have spread out and have set thereon mountains firm and immovable and produced therein all kinds of things in due propotion. And We have provided for you therein means of living and also for those for whose (moving creatures, cattle, beasts and other animals) sustenance you are not responsible.
আমরা ভূ-পৃষ্ঠকে বিস্তৃত করেছি এবং তার উপর সুদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং তাতে প্রত্যেক বস্তু আনুপাতিক হারে উৎপন্ন করেছি। আমরা তোমাদের জন্য জীবিকার উপকরণ সৃষ্টি করেছি এবং তাদের জন্যও (কীট-পতঙ্গ, গবাদি পশু, বন্য প্রাণী ও অন্যান্য প্রাণী) যাদের প্রতি তোমাদের কোন দায়িত্ব নেই। (হিজর-১৯-২০)
يأَيُّهَا النَّاسُ اذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ.
O Mankind! remember the favours of Allah towards you. Is there any creator other than Allah who provides for you from the sky and the earth?
হে মানবজাতি! আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর। আল্লাহ ভিন্ন এমন কোন স্রষ্টা আছে, যে আকাশ ও জমিন থেকে তোমাদের রিজিক সরবরাহ করতে পারে? (ফাতির-৩)
এখানে আকাশ ও জমিন থেকে রিজিক দেওয়ার অর্থ হচ্ছে বৃক্ষ এবং ফসল বায়ুমণ্ডল আর জমিন থেকে পুষ্টি গ্রহণের মাধ্যমে খাদ্য উৎপন্ন করে। অনন্তর মানুষ এ খাদ্য খেয়ে জীবন রক্ষা করে। অধিকন্তু রিজিক শব্দের অর্থ জীবন ও জড় জগতের "তাবৎ চাহিদা" যা সরবরাহ করে থাকেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন।
📄 শয্যার মত বসুন্ধরা চাঁদোয়ার মত আকাশ
শয্যার মত বসুন্ধরা চাঁদোয়ার মত আকাশ
الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءُ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ فَلَا تَجْعَلُو لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ.
Who has made for you the earth as a bed and the heavens your canopy and sent down rain from the sky and brought forth therewith sustenance for you from fruits, then do not set up rivals to Allah when you know.
যিনি তোমাদের জন্য ভূ-পৃষ্ঠকে শয্যার মত করে তৈরী করেছেন। চাঁদোয়ার মত করে আকাশসমূহ নির্মাণ করেছেন। আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করেছেন এবং তা দ্বারা তোমাদের খাদ্য হিসেবে ফলমূল উৎপন্ন করেছেন। এসব তথ্য যেহেতু তোমরা জান, তাই আল্লাহপাকের বিরুদ্ধে কোন প্রতিপক্ষ দাঁড় করিও না। (বাক্বারা-২২)
শয্যার মত বসুন্ধরা (The earth as a bed)
এ বিষয়টি সবার কাছে পরিদৃষ্ট হয়েছে যে, ভূ-পৃষ্ঠের বিস্তৃর্ণ প্রান্তর জুড়ে কে যেন সবুজ শয্যা কিংবা সবুজ গালিচা পেতে রেখেছেন। যেখানে কোমল সবুজ ঘাসের উপর পথ চলতে কতই না ভাল লাগে! আরামপ্রিয় বিশ্রামের ফলে হৃদয়ে মধুর প্রশান্তি জাগে। মানুষ পৃথিবী পৃষ্ঠের উপর চাষাবাদ করে। ঘরবাড়ি নির্মাণ করে। সড়ক-মহাসড়ক তৈরি করে। আরও অনেক কাজ সম্পন্ন করে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একথা বলা যায় যে, ভূ-পৃষ্ঠ বিছানার মত নমনীয়।
মহাশূন্য থেকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে, পৃথিবী একটি গোলাকার বস্তুর মত। তাই বিজ্ঞান বলে থাকে পৃথিবী গোলাকার। জ্যামিতি শাস্ত্রের আলোকে এ অবস্থার একটি ব্যাখ্যা দেয়া যায়। যেমন কোন গোলাকার বস্তু যত বড় হবে তার উপরি ভাগের বক্রতা তত কম হবে। পৃথিবী একটি বিরাট আকারের গোলক। তবে এটি সুষম গোলক নয়। দুই মেরু অঞ্চল ঈষৎ চাপা এবং বিষুবীয় অঞ্চল ঈষৎ স্ফীত। বিষুবীয় অঞ্চলে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ ৬৩৭৮.১৬০ কিঃ মিঃ এবং মেরু অঞ্চলের ব্যাসার্ধ ৬৩৫৭.৭৭৫ কিঃ মিঃ। পৃথিবীর যে অংশের উপর আমরা বাস করি তা আমাদের দৃষ্টিতে শয্যার মত সমতল মনে হয়। এ অংশের বিস্তৃত বক্রতা সম্পর্কে ধারণা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এমনকি উপরিভাগে ২ কিঃ মিঃ দীর্ঘ দূরত্ব পৃথিবীর কেন্দ্রে যে কোণ উৎপন্ন করে সে কোণটির পরিমাণ অতি সামান্য, এক ডিগ্রীর সত্তর ভাগের এক ভাগ।
সুতরাং একটি সমতল ভূমির উপরিভাগকে একটি গোলকের উপরিভাগ হিসেবে ধরে নেয়া যায়, যে গোলকের ব্যাসার্ধ অসীমের দিকে যেতে চায়। আলোচ্য আয়াতে এরূপ গোলাকার পৃথিবীর সমতল ভূমিকে 'পরাশ' বলা হয়েছে। আল কোরআনের আরও দু'টি আয়াতে একই ধারণার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে:
الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ مَهْدًا وَسَلَكَ لَكُمْ فِيْهَا سُبُلًا.
He Who has made for you the earth like a carpet spread out; has enabled you to go about therein by roads (and channels).
তিনি আল্লাহ, যিনি ভূ-পৃষ্ঠকে বিছানো কার্পেটের মত করে তৈরী করেছেন; তোমাকে সামর্থ দিয়েছেন তার উপর যাতায়ত করার, স্থলপথে (কিংবা জল পথে)। (ত্বোয়াহা-৫৩)
الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ مَهْدًا وَجَعَلَ لَكُمْ فِيهَا سُبُلًا لَعَلَّهُمْ تَهْتَدُو.
He has made for you the earth like a carpet spread out; and has made for you roads therein, in order that you may find guidance on the way.
তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবী-পৃষ্ঠকে কার্পেটের মত পেতে রেখেছেন এবং এর উপর তৈরী করে রেখেছেন রাস্তা-ঘাট যাতে করে তোমরা চলার পথে পথ নির্দেশনা পাও। (যুখরুফ-১০)
চাঁদোয়ার মত আকাশ (The Heavens as a canopy)
কোন স্থানে মাথার উপর চাঁদোয়া বা সামিয়ানা টাঙ্গানো হলে সে স্থানের সৌন্দর্য্য যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি বায়ুমন্ডলীয় ক্ষতিকারক অণুকণা ও সূর্যের তেজদীপ্ত রোদ-রশ্মি থেকে নিজেদের আত্মরক্ষা করা যায়। প্রতিকূল অবস্থার মর্মার্থ উপলব্ধি করার জন্য মহানুভব আল্লাহপাক এ আয়াতাংশে ইঙ্গিত করেছেন। মহাশূন্য এবং সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকর (Harmful) রশ্মি ও অণুকণা থেকে তোমাদের রক্ষা করার জন্য প্রতিরক্ষামূলক কতগুলি বায়ুমন্ডলীয় স্তর তোমাদেরকে বেষ্টন করে রেখেছে।
বায়ুমন্ডলকে 'Sky Acts' নামে অভিহিত করা হয়। বায়ুমন্ডলে বেশ কয়েকটি স্তর রয়েছে যা ছাতাওয়ার হিসেবে কাজ করে। প্রথম স্তরের নাম ট্রপোস্ফিয়ার (Troposphere)। রাত্রিবেলা পৃথিবী যে তাপ পুনঃ বিকিরণ (re-radiation) করে সে তাপের তরঙ্গ দৈর্ঘ্যকে এ স্তর রোধ করে। এ প্রক্রিয়াকে গ্রীণ হাউজ ইফেক্ট (Green House effect) বলা হয়। অর্থাৎ ক্লোরোফ্লোরো কার্বনের তীব্রতা এ স্তর প্রতিরোধ করে।
এর পরের স্তরের নাম স্ট্রাটোস্ফিয়ার (Stratosphere)। এখানে রয়েছে ৩০ কিঃমিঃ পুরু ওজন (O₃) স্তর। সূর্যের অতি-বেগুনী রশ্মি ও এক্স-রে যদি পৃথিবী পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছতে পারতো তাহলে সমস্ত প্রাণী জগৎ ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যেত। ওজন স্তর অতি বেগুনী রশ্মি ও এক্স-রে প্রতিরোধ করে জীবজগতকে রক্ষা করে।
বায়ুমন্ডলের উপরে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে। তার নাম হলো ম্যাগনেটোস্ফিয়ার (Magnetosphere)। এটির কাজ হলো চৌম্বক শক্তির প্রভাব বিস্তার করে সংরক্ষণ কাজ সম্পন্ন করা। যেমন সূর্য থেকে নির্গত ইলেকট্রন ও প্রোটন এ স্তর বন্দী করে রাখে। এ ম্যাগনেটোস্ফিয়ার ব্যতিরেকে আমাদের পৃথিবীর উপর পতিত পটভূমি বিকিরণ (Background radiation) বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রাণী জগৎ সহ সবকিছুর ব্যাপক বিনাশ সাধন করতো।
সুতরাং 'Sky Acts' এর যে কয়টি স্তরের কথা উল্লেখ করা হলো তা সূর্য এবং তার বাইরের পরিমন্ডল থেকে আগত মারাত্মক বিকিরণ ও ক্ষতিকর অণুকণা থেকে আমাদের রক্ষা করার ফিল্টারিং ব্যবস্থা। যা দয়াময় আল্লাহপাক ছাতাওয়ার মত করে আমাদের মাথার উপর বিস্তৃত করে রেখেছেন। এসব কল্যাণকর স্তর (Layers) মহান আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি তাঁর সীমাহীন মহত্ত্বের কথা ঘোষণা করে।
আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করেন (Sent down rain from the sky)
আকাশ থেকে যে বৃষ্টিধারা নামে তা দিয়ে উৎপন্ন হয় ফলমূল। যা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে জীবন রক্ষা করে মানব জাতি ও বহুসংখ্যক পশু-পাখি। পানির অন্যতম নাম জীবন। এ তথ্যটি নিশ্চিতভাবে জানা গেছে যে, পৃথিবীর বুকে জীবনের প্রাচীনতম নিদর্শনের প্রথম হলো উদ্ভিদজগৎ। তখন থেকেই সকল উদ্ভিদ তাদের পুষ্টি, বৃদ্ধি, প্রজনন এবং অস্তিত্বের জন্য পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে রয়েছে। উদ্ভিদ কোষে পুষ্টিজনিত বিপাক (Metabolism) ক্রিয়া সংঘটিত হয় পানির মাধ্যমে এবং পানির সাহায্যে মাটি থেকে গাছপালা বহুরকম পুষ্টিকর উপাদান চুষে নেয়।
মানুষের জীবন নির্বাহের জন্য এবং শরীরে পুষ্টিজনিত ঘাটতি পূরণের জন্য শাক-সবজি ও ফলমূলের প্রয়োজনীয়তা অত্যধিক। এ আয়াতে ‘ছামারাত’ (ثمرة) শব্দ প্রয়োগ করে আল্লাহপাক সেসব খাদ্যদ্রব্যের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। ছামারাত বা ফলমূল পরিপক্ক হওয়া পর্যন্ত যে প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল তা কয়েকটি বিস্ময়কর জটিল পর্বের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়।
মাটির নিচে পানির যে বিশাল সঞ্চয় রয়েছে তার সাথে মিলিত হয় বৃষ্টির পানির একটি অংশ। পানির এ অংশ মাটির ছিদ্রপথ ধরে নিচে চলে যায়। বৃক্ষরাজির শিকড়গুলো তাদের নিচের অংশে যেখানে পানি সঞ্চিত থাকে সেখান পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। নিচের পানির সাথে মিশে থাকে সোডিয়াম (Na), ক্যালসিয়াম (Ca), পটাসিয়াম (K), আয়রণ (Fe), সালফার (S), ফসফরাস (P), ম্যাগনেসিয়াম (Mg) প্রভৃতি উপাদান। অসমোসিস (Osmosis) পদ্ধতির সাহায্যে গাছপালা ঐসব উপাদান ও পানি মূল-রোমের মাধ্যমে চুষে নেয়। এভাবে চুষিত পানি ও অন্যান্য খনিজ পদার্থ সূক্ষ্ম শিরা-উপশিরার জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে উদ্ভিদের সকল অংশে সঞ্চারিত হয়। মাটি থেকে চুষে নেয়া পানির কিছু অংশ তারা শর্করা (Carbohydrate) উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করে। শর্করা উৎপাদনের এ পদ্ধতিকে বলা হয় সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া (Photosynthesis)। এটি একটি জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া সংঘটিত হওয়ার জন্য পানির সাথে প্রয়োজন হয় কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂), আলোক শক্তি বহনকারী ফোটন (Photon) কণা। উদ্ভিদের সবুজ পাতায় যে ক্লোরোফিল অণু থাকে তা সূর্যের আলো থেকে ফোটন কণা ধারণ করে উত্তেজিত হয়। যার ফলে একটি জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া দ্বারা শর্করা প্রস্তুত হয়।
এ বিক্রিয়ায় পাতার ছিদ্র পথে প্রচুর পরিমাণ অক্সিজেন বাতাসে মিশে যায়। করুণাময় আল্লাহপাক গাছপালার মাধ্যমে এভাবে আমাদের জন্য অক্সিজেন প্রস্তুত করেন।
গাছ-পালার মধ্যে এমন কিছু গাছ আছে যাদের ক্লোরোফিল নেই। সেজন্য কার্বোহাইড্রেট উৎপন্ন করতে পারে না। এরা জীবন ধারণের জন্য মৃত এবং ক্ষয়িষ্ণু জৈব পদার্থের উপর নির্ভর করে। অথবা পঙ্গপালের মত জীবন্ত জীবকোষের উপর বসে তার রস চুষে নিয়ে বেঁচে থাকে। এসব অসবুজ গাছপালার বৃদ্ধিও নির্ভর করে আর্দ্রতার উপর। যে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায় বৃষ্টিপাতের কারণে।
Agronomy অনুযায়ী 'ফল' এর সাধারণ সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে সকল ভোজ্য খাদ্যদ্রব্য, চাল, গম, যব, খেজুর, আম, কাঁঠাল, আপেল, আনারস, এমনকি বাদাম, ডাল, শিম, মটরশুঁটি ইত্যাদি। এসব খাদ্যদ্রব্য আমাদের দৈহিক বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য গঠনের জন্য একান্ত অপরিহার্য।
অতএব, আলোচ্য আয়াতে মহামহিম আল্লাহপাক শয্যার মত ভূ-মন্ডল, চাঁদোয়ার মত নভোমন্ডল এবং বৃষ্টিপাতের ফলে ফলমূল উৎপাদনের যে তথ্যাবলী আমাদের অবহিত করেছেন তা থেকে এ সত্য প্রতিভাত হয় যে, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির প্রতি অত্যন্ত রহমশীল এবং সৃষ্টিকে পরিপক্কতা দানে খুবই সুদক্ষ। তাই এরূপ শক্তিধর প্রশংসিত আল্লাহপাকের প্রতি অংশী স্থাপন করা কিংবা তার বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ দাঁড় করা কতই না বোকামী।
📄 মান্না ও সাল্ভয়া
মান্না ও সালওয়া
وَظَلَّلْنَا عَلَيْكُمُ الْغَمَامَ وَأَنْزَلْنَا عَلَيْهِمُ الْمَنَّ وَالسَّلَى كُلُوا مِنْ طَيِّبَتِ مَا رَزَقْنَهُمْ وَمَا ظَلَمُونَا وَلكن كانوا انفسهم يظلمون
We caused the white clouds to overshadow you and sent down on you manna and salwa (quails), (saying): Eat of the good lawful things wherewith We have provided you. To Us they did no harm, but they harmed their ownselves.
আমরা তোমাদের ছায়াদান করার জন্য শুভ্র-মেঘ সৃষ্টি করেছি এবং মান্না ও সালওয়া (কোয়েল) পাঠিয়েছি। আমরা যে উত্তম পবিত্র খাদ্যদ্রব্য তোমাদের জন্য সরবরাহ করেছি তা থেকে ভক্ষণ কর। তারা আমাদের ক্ষতি করেনি। বরং নিজেরাই নিজেদের ক্ষতিসাধন করেছে। (বাকারা-৫৭)
শুভ্র-মেঘের ছায়া (The shade of white clouds)
উন্মুক্ত মরু প্রান্তরে সূর্যের কিরণ প্রত্যক্ষভাবে বালুকণার উপরে পড়ে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বালুকণা সহসা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উত্তপ্ত বালুকণা পরবর্তীতে তাপ বিকিরণ করে সংশ্লিষ্ট বাতাসকে অত্যন্ত উষ্ণ করে তোলে এবং এ উষ্ণ বাতাস উপরের দিকে উঠে যায়। যখন কোন নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্দ্র বায়ু উত্তপ্ত হয়ে উপরের দিকে ওঠে তখন তা আয়তনে বৃদ্ধি পায় (কারণ উপরে বায়ুর চাপ কম) এবং শীতল হয়। খুব বেশী শীতল হলে ঐ বায়ু সম্পৃক্ত হয় এবং জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হয়। তাই মেঘের ছায়া বরাবর নিচের বালুময় এলাকা তাপ হারিয়ে শীতল হয়ে যায়। তখন মেঘে ঢাকা মরুপ্রান্তর আর যন্ত্রণাদায়ক মনে হয় না।
সুতরাং শুভ্র-মেঘের ছায়াকে মরুবাসীদের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ বলা যায়। এ বিশেষ অনুগ্রহের কথা আলোচ্য আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে অনুগ্রহ দেখানো হয়েছিল মরুপ্রান্তরে ভ্রাম্যমান বনি ইসরাঈলীদের প্রতি।
মান্নাঃ আবদুল্লাহ ইউছুপ আলী উল্লেখ করেছেন, মান্না এটি হিব্রু শব্দ। যা হিব্রু ভাষার 'মানহু' শব্দ থেকে গৃহীত হয়েছে অথবা আরবী মান-হুয়া থেকে। মান হুয়া অর্থ "What is this?" এটা কি? বনী ইসরাঈলীরা যখন অনুর্বর মরুভূমিতে খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল তখন মেহেরবান আল্লাহপাক তাদের প্রতি মান্না ও সালওয়া নামের দু'প্রকার খাদ্যবস্তু সরবরাহ করেছিলেন। তারা এ খাদ্য বস্তু দু'টি অপ্রত্যাসিতভাবে হঠাৎ মাটির উপর দেখে হয়ত আশ্চর্য হয়ে 'মান্না' (من) এ প্রশ্নবোধক শব্দটি উচ্চারণ করেছিল। পবিত্র কোরআনের ভাষ্যকারগণ (commentators) বলেছেন, ঐ সময়ে সিনাই উপদ্বীপে প্রচুর পরিমাণ মান্না উৎপন্ন হতো এবং এটি অত্যধিক পুষ্টিমান সমৃদ্ধ ব্যতিক্রমধর্মী একটি উদ্ভিদ গ্রুপের নাম যাকে লাইকেন (Lichens) বলা হয়। প্রতিটি লাইকেন গঠিত হয় একটি শৈবাল ও একটি ছত্রাক প্রজাতির একত্রে মিথোজীবিতা (Symbiosis) পদ্ধতিতে বৃদ্ধির ফলে। একে তাই দ্বৈত উদ্ভিদ সত্তা (Dual organism) বলা হয় এবং তাদের এ দ্বৈত সত্তা খুবই অদ্ভুত ধরনের। শৈবাল ও ছত্রাক যৌথভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন আকার ও আকৃতির অঙ্গ তৈরী করে মিলে মিশে সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে।
লাইকেনের আবাসিক অবস্থান ও বিস্তৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। এরা পাথর, ইটের দেয়াল, বৃক্ষের কাণ্ড, ডাল, পাতা, পাহাড়-পর্বত, মাটি ইত্যাদি বিভিন্ন বস্তুর উপর ধূসর বর্ণের শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে বেড়ে ওঠে। তবে এরা সরাসরি পানিতে জন্মায় না। কিছু প্রজাতি ভেজা স্যাঁতসেঁতে স্থানে জন্মাতে পারে। উত্তর আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়ার বহু অঞ্চলে, পাহাড় ও অনুর্বর মরুভূমির বিশাল এলাকা জুড়ে এগুলো উৎপন্ন হয়। রহস্যজনকভাবে ঐগুলো যখন বাতাসের তোড়ে উড়ে এসে হাহাকার মরুভূমিতে পড়ে তখন মরুভূমির যাযাবর গোষ্ঠী খুব বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে প্রকাশ করে "এগুলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য বিশেষ রিযিক ব্যবস্থা"। ১৮৫৪ সনে ইরানে যখন দারুণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল তখন ঐ লাইকেন সেদেশে বৃষ্টির মত বর্ষিত হয়েছিল। এর ফলে দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষেরা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে মহান আল্লাহর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিলেন। বর্তমানে ইরানের মরুভূমি অঞ্চলে এবং কিরগিজস্তানের তৃণভূমি অঞ্চলে, মিশর, আলজেরিয়া, মরক্কো এবং আটলাস পর্বতের ঢালু এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির লাইকেন দেখা যায়। মান্না জাতীয় লাইকেন এখন আর সিনাই উপদ্বীপে পরিদৃষ্ট হয় না। কিন্তু হযরত মুছা (আঃ)-এর আমলে ঐ উপদ্বীপে বিদ্যমান ছিল, যা সেই সময়ে বিতাড়িত বনি ইসরাঈলীদের জন্য আল্লাহপাকের অনুগ্রহের নির্দেশনা বলেই প্রতীয়মান হয়।
সালওয়াঃ সালওয়া আরবী শব্দ। এ শব্দ দ্বারা কোয়েল (Quail) পাখিকে বুঝানো হয়। কোয়েল একটি পরিযায়ী পাখি (Migratory birds)। এটি ফ্যাস্যান্ট (Pheasant), পার্ট্রিজ (Partridge) ও টার্কী (Turkey) পাখির গোত্রভুক্ত। এ পাখির একটি প্রজাতির নাম *coturnis vulgaris*। এ প্রজাতির পাখি হাজার হাজার মাইল একটানা ভ্রমণ করতে পারে এবং এদের এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সর্বত্র দেখা যায়।
এটা একটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, মাইগ্রেটরি পাখিরা দীর্ঘ উড়ান যাত্রায় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে। সম্প্রতি তাদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আবিষ্কৃত হয়েছে। এ বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে তাই তাদের নাম দেয়া হয়েছে গণিতবিদ পাখি (Mathematician birds)। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে স্বদেশত্যাগী পাখিরা হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করার সময় তাদের গন্তব্যস্থল খুঁজে পাবার জন্য যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করে তার মধ্যে একটি হলো ভূতলস্থ দৃশ্যমান প্রাকৃতিক দৃশ্য যেমন, পর্বতমালা, উপকূলের অবস্থান ও আকৃতি, নদ-নদীর অবস্থান ও গতিপথ ইত্যাদির সাহায্য নেয়া।
অনেক পরিযায়ী পাখি দিক নির্ণয়ের জন্য সূর্যকে ব্যবহার করে। কিন্তু দিনটা যদি মেঘাচ্ছন্ন হয় তাহলে তারা দিক নির্ণয় কিভাবে করে! একজন পথিক যেমন দিক নির্ণয়ের জন্য যাত্রাপথে কম্পাস ব্যবহার করে। মাইগ্রেটরি পাখিরাও কি যাত্রাপথে তেমন কিছু ব্যবহার করে! হ্যাঁ, এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে কবুতর, কোয়েল অথবা মেরু টার্ন (Arctic Tern) প্রভৃতি পাখিদের মাথার খুলির ভেতরে একটা ছোট্ট চৌম্বক দানা (Pod of magnetic grain) আছে। সেজন্য এরা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সাথে নিজেদের সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে উড়ে চলে যা দিকনির্ণায়ক কম্পাসের মত কাজ করে। আবার রাতে ভ্রমণের সময় এরা আকাশের তারকারাজির মাধ্যমে দিক নির্ণয় করে। বিভিন্ন নক্ষত্রের অবস্থান দেখে কোন নির্দিষ্ট তারাকে অনুসরণ করে এরা পরিযান করে থাকে।
আরও একটি উপায় আছে তাহলো মাইগ্রেটরি পাখিরা সূর্যালোকের মেরুকরণ (Polarization Pattern) প্রবণতা উপলব্ধি করতে পারে। সূর্যরশ্মি বায়ুস্তর ভেদ করার সময় ক্ষুদ্র বায়ু কণার মধ্য দিয়ে আলোক তরঙ্গকে একটি নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত করে। সূর্যাস্তের সময় আকাশের তাকালে আলোর মেরুকরণ প্রবণতার (Resulting polarisation of the light) ব্যাপারটি আমরা চিহ্নিত করতে পারি। কিছু কিছু মাইগ্রেটরি পাখি আলোর মেরুপ্রবণতাকে আকাশে একটা বড় কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু যে কোন নাবিক বলতে পারে যে, একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাওয়ার জন্য যা প্রয়োজন তাহলো উত্তর দিক কোনটা জেনে নেয়া। এক্ষেত্রে মানুষের দরকার হয় এলিমেন্টারি ত্রিকোণমিতির (Elementary Trigonometry) এবং উচ্চতর ত্রিকোণমিতির মাধ্যমে একটা ম্যাপ অঙ্কন করা। পাখিরাও কি মানুষের মত ত্রিকোণমিতি সমাধান করতে পারে? নিঃসন্দেহে না। তবে পাখিদের পরিযান কৌশলকে যখন গণিতের ভাষায় রূপান্তর করা হয় তখনই কেবল হাজার হাজার মাইল ভ্রমণকারী পরিযায়ী পাখিদের গাণিতিক কার্যকলাপ আমাদের সামনে প্রতিভাত হয়। পরিযায়ী পাখির উপর সরল বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে পরিশিষ্ট ৯-এ।
প্রজ্ঞাময় আল্লাহপাক এরূপ মাইগ্রেটরি পাখি সালওয়া, অসহায় বনি ইসরাঈলীদের কাছে অনুগ্রহ পূর্বক পাঠিয়েছিলেন। পুষ্টিকর সালওয়া পাখির মাংসে মান্নার অনুরূপ কার্বোহাইড্রেট থাকায় এর মাংস সুষম খাদ্য তৈরী করতে পারে। কঠিন মরু প্রান্তরে খাদ্য সংকটের সময় বনি ইসরাঈলীদের নিকট আল্লাহপাক নির্দেশ দেন মান্না ও সালওয়া পবিত্র খাদ্যদ্বয় গ্রহণ করার জন্য। স্বাভাবিকভাবে তাদের উচিত ছিল সুমহান আল্লাহ তাআলার দরবারে সিজদাবনত হয়ে তাঁর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। অথচ তারা তার বিপরীত কাজটুকুই করেছে। এভাবে আল্লাহর করুণা লাভ করার পর যারা সারাজীবন তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞের মত আচরণ করে তাদের অবস্থা সেই ইসরাঈলীদের মত হয়ে থাকে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা লাঞ্ছনা, অপমান ও অপদস্ত করে পৃথিবীর বুকে যাযাবরের জীবন দান করেছেন। আর পরমুখাপেক্ষী করে রেখেছেন।
আল কোরআনের আরও দুইটি আয়াতে মান্না ও সালওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্নে তা পেশ করা হলো
وَظَلَّلْنَا عَلَيْهِمُ الْغَمَامَ وَأَنْزَلْنَا عَلَيْهِمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوى كُلُوا مِنْ طَيِّبَتِ مَا رَزَقْنكُمْ وَمَا ظَلَمُونَا وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ.
We gave them the shade of clouds and sent down to them manna and salwa. (Saying) "Eat of the good lawful things We have provided for you. To Us they did no harm but they harmed their own souls.
আমরা তাদেরকে মেঘমালার ছায়াদান করেছিলাম এবং তাদের কাছে মান্না ও সালওয়া পাঠিয়েছিলাম। এসব পবিত্র খাদ্যবস্তু তোমরা আহার কর। তারা আমাদের কোন ক্ষতি করেনি বরং নিজেদের ক্ষতিসাধন করেছে।" (আ'রাফ-১৬০)
يُبَنِي إِسْرَائِيلَ قَدْ أَنجَيْنكُمْ مِنْ عَدُوِّكُمْ وَوَعَدْنكُمْ جَانِبَ الطُّورِ الْأَيْمَنِ وَنَزَّلْنَا عَلَيْكُمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوى.
O children of Israel! We deliverd you from your enemy and We made a covenant with you on the holy mountain's side and sent down on you the manna and salwa.
হে ইসরাঈলের সন্তানেরা! আমরা তোমাদের শত্রুর কবল থেকে তোমাদের রক্ষা করেছি এবং পবিত্র পর্বতের পাদদেশে তোমাদের চুক্তিনামায় আবদ্ধ করেছি। আর তোমাদের খাদ্য হিসেবে মান্না ও সালওয়া প্রেরণ করেছি। (ত্বোয়াহা-৮০)