📄 বসুন্ধরা
বসুন্ধরা
বসুন্ধরার বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে উৎপন্ন হয় নানাবিধ ফসল। মাটি ভেদ করে উঠে সবুজ বৃক্ষ। সৃষ্টির পরে মানুষের আবির্ভাবের সময় গাছপালাই ছিল তার প্রথম বন্ধু। এখন বৃক্ষরাজির সাথে মানুষের বন্ধুত্ব আরো নিবিড় হয়েছে। কারণ এরাই মানুষের জন্য খাদ্য উৎপন্ন করে। অক্সিজেন উৎপন্ন করে। পরিবেশগত ভারসাম্য সৃষ্টি করে। ঘর সাজাবার আসবাবপত্র দান করে এবং আরো বিবিধ উপকার তো আছে।
কিন্তু আমরা কি চিন্তা করে দেখেছি উদ্ভিদ ও ফসলের বীজ বহন করলে কেন অঙ্কুরোদগম ঘটে? এর কারণ হচ্ছে মহান আল্লাহ মাটিতে উর্বরা শক্তি সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন। ফলে পানি আর উর্বরা শক্তির প্রভাবে বীজ অঙ্কুরিত হয় এবং মাটি ভেদ করে জেগে উঠে।
উদ্ভিদ ও ফসলের পুষ্টি সাধনের জন্য অন্তত ১০টি রাসায়নিক এবং ৪টি গ্যাসীয় পদার্থ অপরিহার্য। রাসায়নিক উপাদানগুলি হচ্ছে সোডিয়াম (Na), ক্যালসিয়াম (Ca), পটাশিয়াম (K), ম্যাগনেসিয়াম (Mg), সালফার (S), ফসফরাস (P), বোরন (B), ক্লোরিন (Cl₂), আয়রন (Fe) এবং পানি (H₂O), যা মাটির মধ্যে ধরা থাকে। এসব উপাদান উদ্ভিদ ও ফসল মূলের সাহায্যে মাটি থেকে চুষে নেয়। আর নাইট্রোজেন (N₂), অক্সিজেন (O₂), হাইড্রোজেন (H₂), কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) প্রভৃতি গ্যাসীয় পদার্থ বায়ুমণ্ডল থেকে গ্রহণ করে পুষ্টি পরিপূর্ণ করে। এরপর বৃক্ষ ফল দেয়। ক্ষেতে ফসল উৎপন্ন হয়। ফল আর ফসলগুলো মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে জীবন ধারণ করে।
অতএব, খাদ্য উৎপাদনের গোটা প্রক্রিয়াটি আল-কোরআন নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছে ৭ম শতাব্দীতে।
وَهُوَ الَّذِي أَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجْنَا بِهِ نَبَاتَ كُلِّ شَيْءٍ فَأَخْرَجْنَا مِنْهُ خَضِرًا نُخْرِجُ مِنْهُ حَبًّا مُتَرَاكِبًا ، وَمِنَ النَّخْلِ مِنْ طَلْعِهَا قِنْوَانٌ دَانِيَةً وَجَنَّتٍ مِّنْ أَعْنَابِ وَالزَّيْتُونَ وَالرُّمَّانَ مُشْتَبِهَا وَغَيْرَ مُتَشَابِهِ أَنْظُرُوا إِلَى ثَمَرِهِ إِذَا أَثْمَرَ وَيَنْعِهِ ، إِنَّ فِي ذَلِكُمْ لَآيَتِ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ.
He It is Who sends down rain from the sky; with it We produce vegetation of all kinds, from some we produce green crops where from We produce clustered grains and from date palms out of its sheaths come forth branches hanging down. And We produce gardens of grapes and the olives and the pomegranates, similar and dissimilar, when they begin to bear fruits, feast your eyes with the fruits and the ripeness thereof, Behold! in these things there are signs for people who believe.
তিনি সেই মহান প্রভু যিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন; এর দ্বারা আমরা সর্বপ্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করি; এবং তা থেকে সবুজ ফসল নির্গত করি যা যুগ্ম বীজও উৎপন্ন করে। আর খেজুর বৃক্ষের শীর্ষ থেকে ছড়া বের হয় যা নীচের দিকে ঝুলে পড়ে এবং আঙ্গুরের বাগানসমূহ, যায়তুন এবং আনার বৃক্ষ উৎপন্ন করি। সাদৃশ্য এবং অসাদৃশ্য প্রত্যেক বৃক্ষের প্রতি লক্ষ্য কর যখন তা ফলবান হয়। আরো লক্ষ্য কর পাকার সময়। এ সমুদয়ের মধ্যে অনেক নির্দেশনা রয়েছে সেসব লোকের জন্য যাদের রয়েছে বিশ্বাস। (আনআম-৯৯)
বৃষ্টির সহায়ক কার্যকারিতা গাছপালা জন্মানোর ক্ষেত্রে অবদান রাখে। আরবী 'নাবাত' শব্দের সাধারণ অর্থ গাছপালা। এ গাছপালার আওতায় পড়ে সকল ধরনের বৃক্ষরাজি। এসব বৃক্ষরাজির সবুজ রং ও ক্লোরোফিল তাদের খাদ্য কার্বোহাইড্রেট তৈরীর কাজে সাহায্য করে।
ক্লোরোফিল (chlorophyll)
ক্লোরোফিল গাঢ় সবুজ বর্ণের আলোকগ্রাহী রঞ্জক যা সালোক সংশ্লেষণে আলোক শক্তি গ্রহণ করে। উদ্ভিদ ও সবুজ ফসলে বিদ্যমান ক্লোরোফিল অণু সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় শর্করা তৈরীর সময় প্রথমত এরা সূর্যের আলো শোষণকারী এন্টেনা হিসেবে কাজ করে। দ্বিতীয়ত "রেজোন্যান্স ট্রান্সফার" প্রক্রিয়া দ্বারা সংগৃহীত শক্তি ক্লোরোফিলের এক অণু থেকে অন্য অণুতে স্থানান্তর করে এবং সর্বশেষে এ ক্লোরোফিল অণু এনজাইমের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় রাসায়নিক জারণ ক্রিয়া সম্পাদন করে। অর্থাৎ উচ্চ বিভব সম্পন্ন একটি ইলেকট্রন ক্লোরোফিল অণু থেকে উত্থিত হয়: এই ইলেকট্রন তখন রাসায়নিক কাজ করতে পারে অর্থাৎ অন্য যৌগকে বিজারিত করে। এভাবে আলোক শক্তি রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং এর রূপান্তর খুবই বিস্ময়কর। সুমহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর একমাত্র রূপকার যিনি বৃক্ষরাজি ও ফসলে ক্লোরোফিল অণু সৃষ্টি করে দিয়ে তাঁর রহমতের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।
CH₂ CH₃ CH 1 2 H H 8 I C Ca H₃C N 3 CH₃ H₂ 7 H IV N---Mg---N II CH₂ CH₂—CH₃ C O N 4 H₂C C O III β 7 C 5 H CH₃ 10 C₉ CH₃ H₃C HC C—CH₃ (CH₂)₃ HC—CH₃ (CH₂)₃ HC—CH₃ (CH₂)₃ HC H₃C CH₃
ক্লোরোফিলের গঠন
চিত্রে ক্লোরোফিলের গঠন প্রদর্শন করা হলো। এর বৈশিষ্ট্য হলো যে এটা একটি সাইক্লোপেন্টানোন বলয় (V) এর সঙ্গে ডাইহাইড্রোপোরফাইরিনের ম্যাগনেসিয়াম কিলেট (chelate) ও ফাইটোলের সঙ্গে এস্টারকৃত। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট অ্যালিসাইক্লিক বলয় V এর নবম অবস্থানে একটি কিটো (C=O) ধারণ করে যা ক্লোরোফিলের অনন্য বৈশিষ্ট্য।
বৃক্ষরাজির মধ্যে এমন কিছু গাছ আছে যাদের ক্লোরোফিল নেই। সেজন্য তারা কার্বোহাইড্রেট উৎপন্ন করতে পারে না। তারা তাদের জীবন ধারণের জন্য মৃত এবং ক্ষয়িষ্ণু জৈব পদার্থের উপর নির্ভরশীল থাকে বা পঙ্গপালের মত জীবন্ত জীবকোষের উপর বসে তার রস চুষে নিয়ে বেঁচে থাকে। এসব অসবুজ গাছপালার বৃদ্ধিও নির্ভর করে আর্দ্রতার উপর। যে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায় বৃষ্টিপাতের কারণে।
এ আয়াতে যেসব ফল ও শস্যকণা উদাহরণ স্বরূপ পেশ করা হয়েছে তা নিম্নে সংক্ষেপে বর্ণনা দেয়া হলো,
ঘন সন্নিবেশিত শস্যকণা (Clustered grains)
শস্যকণার চারা বা খাদ্যশস্য ঘাসের গোত্রভুক্ত (Grass family)। এগুলো মানুষ ও গৃহপালিত পশু-পাখিদের শাক জাতীয় খাদ্য শস্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এসব খাদ্যে মিশে আছে স্টার্চ (starch), প্রোটিন, কিছু খনিজদ্রব্য এবং বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন। খাদ্য শস্যের শ্রেণী বিভাগের মধ্যে পড়ে অসংখ্য রকমের খাদ্যশস্য। পৃথিবীর প্রধান খাদ্য শস্যগুলো হলো- ধান (paddy), গম (wheat), বার্লি (barley), জেয়ার/ভুট্টা (millet), যব (maize) এবং রাই (rye)। এগুলো সব একবীজ পত্রী শস্য দানা। দ্বিবীজ পত্রী বা যুগ্ম শস্য দানা হলো, শিম, মটর, শুটি, ডাল ইত্যাদি।
এসব খাদ্যের মধ্যে গম ও যব ইসলামের প্রাথমিক যুগে আরবদের কাছে পরিচিত ছিল। এগুলো শস্য ঘন সন্নিবিষ্ট। অর্থাৎ এদের মঞ্জুরীতে থাকে দুই সারি দানার ঠাসা বুনুনি। এ আয়াতে খাদ্য শস্যের যে ঘনসন্নিবিষ্ট ঠাসা-বুনুনির কথা তুলে ধরা হয়েছে তা খুবই সঙ্গত। কারণ খাদ্য শস্যের শিষে সাজানো থাকে খাদ্য দানার সঘন সমাহার।
খেজুর (Dates):
আরব ভূ-খন্ডে খেজুর বৃক্ষের চাষ অতি প্রাচীন ঘটনা। বলতে গেলে হযরত আদম (আঃ) এর আবির্ভাবের পরেই খেজুর ফলের বাগান গড়ে ওঠে। আর পার্থিব জমিতে সর্ব প্রথম কৃষি কাজ শুরু করেন পৃথিবীর প্রথম মানব আদম (আঃ)। খেজুর বাগান সমূহ এমন সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে থাকে যেগুলো দেখলে মনে হবে যেন ধূসর মরুতে সবুজের আনন্দ সম্মিলন। বৃক্ষগুলিতে যখন ফল ধরে তা নীচের দিকে ঝুলে পড়ে এবং খেজুর ফল শর্করা, ক্যালসিয়াম আর ভিটামিন A1, B1, B2 তে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ভেজা খেজুরে শর্করা থাকে ৬০% এবং শুকনা খেজুরে শর্করার পরিমাণ ৭০%। প্রাচীন আমলে খেজুরই ছিল আরব, পারস্য এবং উত্তর আফ্রিকার অধিবাসীদের প্রধান খাদ্য। মুহাম্মদ (সঃ) এর যুগেও খেজুর ছিল প্রধান খাদ্য (Staple food)।
আঙ্গুর (Grapes):
প্রায় ৬৫০০ বছর পূর্বে আঙ্গুরের চাষ শুরু হয় প্রাচীন মিশরে। অতপর এর চাষ ছড়িয়ে পড়ে আরব ভূ-খন্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে, পারস্যে (ইরান) এবং এশিয়া ও ইউরোপে। সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় এর চাহিদা এবং বারতার বেড়েই চলেছে। আঙ্গুর ফলের চাষের ঐতিহ্য অতি প্রাচীন হলেও বর্তমানে জিন প্রযুক্তির মাধ্যমে এর উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাংলাদেশেও এখন প্রচুর পরিমাণে আঙ্গুর ফল উৎপন্ন হয়। অতি সুস্বাদু ফল হিসাবে আঙ্গুর সর্বসাধারণের কাছে অতি প্রিয় ফল। মানব দেহের পুষ্টি সাধনের প্রয়োজনীয় উপাদান যথা-আয়রন, কার্বোহাইড্রেট, সাইট্রিক এসিড, ভিটামিন A,B প্রচুর পরিমাণে এতে রয়েছে।
যায়তুন (olives):
মানব সভ্যতার উন্নয়ন মানুষের ইতিহাসের সাথে যায়তুন বৃক্ষ ও যায়তুন ফল নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। যায়তুনের চেয়ে অতি প্রাচীন ঐতিহাসিক বৃক্ষ দ্বিতীয়টি নেই। সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে এটি শান্তি, সমৃদ্ধি, সৌন্দর্য ও শক্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এটি শুধু খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়না। এর তৈল ব্যবহৃত হয় নানা কাজে। যেমন, ঔষধ তৈরীতে, কসমেটিক প্রস্তুত করার জন্য, মেশিনারী এবং সাবান প্রস্তুত কার্যে। যায়তুন বৃক্ষ প্রায় এক হাজার বৎসর বাঁচে। আল্লাহ তা'আলা কোরআনে যায়তুনের শপথ করেছেন এর উপকারিতা ও ঐতিহ্য উপলব্ধি করার জন্য।
আনার (Pomegranates):
আনার ফলের চাষ শুরু হয়েছিল সর্বপ্রথম মিশর এবং মেসোপটেমিয়ায়। হযরত সোলায়মান (আঃ) সেই যুগে আনারের একটি বিরাট বাগান গড়ে তোলেছিলেন বলে জানা যায়। এ ফলটির গঠন প্রকৃতি অত্যন্ত নৈপুণ্যমন্ডিত। উপরে মোটা শক্ত আবরণ আর ভেতরে থাকে গুটি গুটি দানা। দানাগুলো গুচ্ছাকারে বিভিন্ন চেম্বারে বিভক্ত থাকে। অত্যন্ত পুষ্টিকর ফল, যার মধ্যে রয়েছে প্রচুর আয়রন, ভিটামিন, মিনারেল সল্ট, শর্করা ইত্যাদি।
পাকা ফল (Ripe fruits):
পাকা ফলের মধ্যে যে আকর্ষণীয় রঙের সমাহার দেখা যায় তা নির্ভর করে বিভিন্ন গাছের রঙের উপর কিংবা গাছের প্রাণরসবাহী কোষে যে রঙের উপাদান আছে তার আনুপাতিক উপস্থিতির উপর। ক্লোরোফিল (Chlorophyll) হচ্ছে মূল রং যা তার সবুজ রংকে বৃক্ষের পাতা ও ফলের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। এ সবুজ রং ফলের প্রাথমিক গ্রুপ হিসেবে বিবেচিত। রঙের দ্বিতীয় গ্রুপটির ৬০টির মত গঠন বস্তুর মধ্যে পাওয়া যায়। এদের রঙের ব্যাপ্তি হচ্ছে কমলা হলুদ থেকে টমেটো রাঙা লাল পর্যন্ত সীমিত। রঙের তৃতীয় পরিবারটি অ্যান্থোসাইয়ানীন (Anthocyanin) রং থেকে উদ্ভূত। মৃদু গোলাপী আস্তরণের ব্যাপ্তি থেকে রক্তিম গোলাপী রঙ পর্যন্ত বিস্তৃত। অ্যান্থোসাইয়ানীন নিয়ন্ত্রিত হয় কোষের অম্লত্বের সাহায্যে। সকল পাকা ফলের গায়ে যে লাল রং ফুটে ওঠে তা অ্যান্থোসাইয়ানীন অম্লত্বের মাধ্যমে প্রকাশ পায় এবং এ ইঙ্গিত দেয় যে এ ফল এখন খাবার পক্ষে উপযোগী। তখন পাখি, অন্যান্য প্রাণী ও মানুষ ফল খেয়ে ফলের বীজ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে বৃক্ষের বিস্তার ঘটে।
কোরআনের আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা কয়েকটি মূল্যবান বৃক্ষের নাম উল্লেখ করেছেন তাঁর অসীম রহমতের প্রতীক হিসেবে। এরূপ হাজার হাজার ফলের বৃক্ষ গোটা প্রকৃতি জুড়ে রয়েছে যা গুনে শেষ করা যাবে না।
তবে উদ্ভিদ জগত অতিশয় বিশাল। এর প্রজাতি সংখ্যা প্রায় ৩,৫০,০০০ (তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার)। এ প্রজাতিগুলোকে বিস্তৃতভাবে শ্রেণী বিন্যাস করা হয়ে থাকে। এর একটি শ্রেণী হলো সপুষ্পক গাছপালা। আর অন্য শ্রেণী ভুক্ত গাছপালাগুলো হলো অপুষ্পক। অপুষ্পক বৃক্ষরাজির ফুল হয় না। এদের বংশবৃদ্ধি ঘটে অন্যান্য বিবিধ পন্থায়। পরাগায়ন পদ্ধতিতে নয়।
وَايَةٌ لَّهُمُ الْأَرْضُ الْمَيْتَةُ أَحْيَيْنَا وَأَخْرَجْنَا مِنْهَا حَبًّا فَمِنْهُ يَأْكُلُونَ.
A Sign for them is the dead land. We give it life and produce grains therefrom so that they eat thereof.
তাদের জন্য একটি সংকেত হলো নিষ্প্রাণ জমি, আমরা উহাকে সজীব করি এবং তাতে শস্য উৎপন্ন করি। যেন তারা ঐগুলো ভক্ষণ করতে পারে। (ইয়াসিন-৩৩)
وَنَزَّلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً مُبَارَكًا فَأَنْبَتْنَا بِهِ جَنَّاتٍ وَحَبَّ الْحَصِيدِ.
And We send down from the sky rain which is full of blessings and We produce therewith gardens and grains for harvest.
আর আমরা আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করি যা অতি বরকতময়, অতপর তা দিয়ে বাগান রচি এবং তোলার জন্য খাদ্য শস্য উৎপন্ন করি। (ক্বাফ-৯)
وَالْأَرْضَ مَدَدْنَهَا وَأَلْقَيْنَا فِيهَا رَوَاسِيَ وَأَنْبَتْنَا فِيهَا مِنْ كُلِّ شَيْءٍ مَوْزُونِ وَجَعَلْنَا فِيهَا مَعَايِشَ وَمَنْ لَسْتُمْ لَهُ بِرَازِقِينَ.
And the earth We have spread out and have set thereon mountains firm and immovable and produced therein all kinds of things in due propotion. And We have provided for you therein means of living and also for those for whose (moving creatures, cattle, beasts and other animals) sustenance you are not responsible.
আমরা ভূ-পৃষ্ঠকে বিস্তৃত করেছি এবং তার উপর সুদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং তাতে প্রত্যেক বস্তু আনুপাতিক হারে উৎপন্ন করেছি। আমরা তোমাদের জন্য জীবিকার উপকরণ সৃষ্টি করেছি এবং তাদের জন্যও (কীট-পতঙ্গ, গবাদি পশু, বন্য প্রাণী ও অন্যান্য প্রাণী) যাদের প্রতি তোমাদের কোন দায়িত্ব নেই। (হিজর-১৯-২০)
يأَيُّهَا النَّاسُ اذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ.
O Mankind! remember the favours of Allah towards you. Is there any creator other than Allah who provides for you from the sky and the earth?
হে মানবজাতি! আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর। আল্লাহ ভিন্ন এমন কোন স্রষ্টা আছে, যে আকাশ ও জমিন থেকে তোমাদের রিযিক সরবরাহ করতে পারে? (ফাতির-৩)
এখানে আকাশ ও জমিন থেকে রিযিক দেওয়ার অর্থ হচ্ছে বৃক্ষ এবং ফসল বায়ুমণ্ডল আর জমিন থেকে পুষ্টি গ্রহণের মাধ্যমে খাদ্য উৎপন্ন করে। অনন্তর মানুষ এ খাদ্য খেয়ে জীবন রক্ষা করে। অধিকন্তু রিযিক শব্দের অর্থ জীবন ও জড় জগতের "তাবৎ চাহিদা" যা সরবরাহ করে থাকেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন।
শয্যার মত বসুন্ধরা চাঁদোয়ার মত আকাশ
الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءُ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ فَلَا تَجْعَلُو لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ.
Who has made for you the earth as a bed and the heavens your canopy and sent down rain from the sky and brought forth therewith sustenance for you from fruits, then do not set up rivals to Allah when you know.
যিনি তোমাদের জন্য ভূ-পৃষ্ঠকে শয্যার মত করে তৈরী করেছেন। চাঁদোয়ার মত করে আকাশসমূহ নির্মাণ করেছেন। আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করেছেন এবং তা দ্বারা তোমাদের খাদ্য হিসেবে ফলমূল উৎপন্ন করেছেন। এসব তথ্য যেহেতু তোমরা জান, তাই আল্লাহপাকের বিরুদ্ধে কোন প্রতিপক্ষ দাঁড় করিও না। (বাক্বারা-২২)
শয্যার মত বসুন্ধরা (The earth as a bed)
এ বিষয়টি সবার কাছে পরিদৃষ্ট হয়েছে যে, ভূ-পৃষ্ঠের বিস্তৃর্ণ প্রান্তর জুড়ে কে যেন সবুজ শয্যা কিংবা সবুজ গালিচা পেতে রেখেছেন। যেখানে কোমল সবুজ ঘাসের উপর পথ চলতে কতই না ভাল লাগে! আরামপ্রিয় বিশ্রামের ফলে হৃদয়ে মধুর প্রশান্তি জাগে। মানুষ পৃথিবী পৃষ্ঠের উপর চাষাবাদ করে। ঘরবাড়ি নির্মাণ করে। সড়ক-মহাসড়ক তৈরি করে। আরও অনেক কাজ সম্পন্ন করে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একথা বলা যায় যে, ভূ-পৃষ্ঠ বিছানার মত নমনীয়।
মহাশূন্য থেকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে, পৃথিবী একটি গোলাকার বস্তুর মত। তাই বিজ্ঞান বলে থাকে পৃথিবী গোলাকার। জ্যামিতি শাস্ত্রের আলোকে এ অবস্থার একটি ব্যাখ্যা দেয়া যায়। যেমন কোন গোলাকার বস্তু যত বড় হবে তার উপরি ভাগের বক্রতা তত কম হবে। পৃথিবী একটি বিরাট আকারের গোলক। তবে এটি সুষম গোলক নয়। দুই মেরু অঞ্চল ঈষৎ চাপা এবং বিষুবীয় অঞ্চল ঈষৎ স্ফীত। বিষুবীয় অঞ্চলে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ ৬৩৭৮.১৬০ কিঃ মিঃ এবং মেরু অঞ্চলের ব্যাসার্ধ ৬৩৫৭.৭৭৫ কিঃ মিঃ। পৃথিবীর যে অংশের উপর আমরা বাস করি তা আমাদের দৃষ্টিতে শয্যার মত সমতল মনে হয়। এ অংশের বিস্তৃত বক্রতা সম্পর্কে ধারণা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এমনকি উপরিভাগে ২ কিঃ মিঃ দীর্ঘ দূরত্ব পৃথিবীর কেন্দ্রে যে কোন উৎপন্ন করে সে কোনটির পরিমাণ অতি সামান্য, এক ডিগ্রীর সত্তর ভাগের এক ভাগ।
সুতরাং একটি সমতল ভূমির উপরিভাগকে একটি গোলকের উপরিভাগ হিসেবে ধরে নেয়া যায়, যে গোলকের ব্যাসার্ধ অসীমের দিকে যেতে চায়। আলোচ্য আয়াতে এরূপ গোলাকার পৃথিবীর সমতল ভূমিকে 'পরাশ' বলা হয়েছে। আল কোরআনের আরও দু'টি আয়াতে একই ধারণার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে,
الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ مَهْدًا وَسَلَكَ لَكُمْ فِيْهَا سُبُلًا.
He Who has made for you the earth like a carpet spread out; has enabled you to go about therein by roads (and channels).
তিনি আল্লাহ, যিনি ভূ-পৃষ্ঠকে বিছানো কার্পেটের মত করে তৈরী করেছেন; তোমাকে সামর্থ দিয়েছেন তার উপর যাতায়ত করার, স্থলপথে (কিংবা জল পথে)। [ত্বোয়াহা-৫৩]
الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ مَهْدًا وَجَعَلَ لَكُمْ فِيهَا سُبُلًا لَعَلَّهُمْ تَهْتَدُو.
He has made for you the earth like a carpet spread out; and has made for you roads therein, in order that you may find guidance on the way.
তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবী-পৃষ্ঠকে কার্পেটের মত পেতে রেখেছেন এবং এর উপর তৈরী করে রেখেছেন রাস্তা-ঘাট যাতে করে তোমরা চলার পথে পথ নির্দেশনা পাও। (যুখরুফ-১০)
চাঁদোয়ার মত আকাশ (The Heavens as a canopy)
কোন স্থানে মাথার উপর চাঁদোয়া বা সামিয়ানা টাঙ্গানো হলে সে স্থানের সৌন্দর্য্য যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি বায়ুমণ্ডলীয় ক্ষতিকারক অণু-কণা ও সূর্যের তেজদীপ্ত রশ্মি থেকে নিজেদের আত্মরক্ষা করা যায়। এক্ষণ প্রতিকূল অবস্থার মর্মার্থ উপলব্ধি করার জন্য মহানুভব আল্লাহপাক এ আয়াতাংশে ইঙ্গিত করেছেন। মহাশূন্য এবং সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকর (Harmful) রশ্মি ও অণু-কণা থেকে তোমাদের রক্ষা করার জন্য প্রতিরক্ষামূলক কতগুলি বায়ুমণ্ডলীয় স্তর তোমাদেরকে বেষ্টন করে রেখেছে।
বায়ুমণ্ডলকে Sky Acts নামে অভিহিত করা হয়। বায়ুমণ্ডলে বেশ কয়েকটি স্তর রয়েছে যা ছাতা হিসেবে কাজ করে। প্রথম স্তরের নাম ট্রপোস্ফিয়ার (Troposphere)। রাত্রিবেলা পৃথিবী যে তাপ পুনঃ বিকিরণ (re-radiation) করে সে তাপের তরঙ্গ দৈর্ঘ্যকে এ স্তর রোধ করে। এ প্রক্রিয়াকে গ্রীণ হাউজ ইফেক্ট (Green House effect) বলা হয়। অর্থাৎ ক্লোরোফ্লোরো কার্বনের তীব্রতা এ স্তর প্রতিরোধ করে।
এর পরের স্তরের নাম স্ট্রাটোস্ফিয়ার (stratosphere)। এখানে রয়েছে ৩০ কিঃমিঃ পুরু ওজন (O3) স্তর। সূর্যের অতি-বেগুনী রশ্মি ও এক্স-রে যদি পৃথিবী পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছতে পারতো তাহলে সমস্ত প্রাণী জগৎ ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যেত। ওজন স্তর অতি বেগুনী রশ্মি ও এক্স-রে প্রতিরোধ করে জীবজগতকে রক্ষা করে।
বায়ুমণ্ডলের উপরে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে। তার নাম হলো ম্যাগনেটোস্ফিয়ার (magnetosphere)। এটির কাজ হলো চৌম্বক শক্তির প্রভাব বিস্তার করে সংরক্ষণ কাজ সম্পন্ন করা। যেমন সূর্য থেকে নির্গত ইলেকট্রন ও প্রোটন এ স্তর বন্দী করে রাখে। এ ম্যাগনেটোস্ফিয়ার ব্যতিরেকে আমাদের পৃথিবীর উপর পতিত পটভূমি বিকিরণ (Background radiation) বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রাণী জগৎ সহ সবকিছুর ব্যাপক বিনাশ সাধন করতো।
সুতরাং Sky Acts এর যে কয়টি স্তরের কথা উল্লেখ করা হলো তা সূর্য এবং তার বাইরের পরিমন্ডল থেকে আগত মারাত্মক বিকিরণ ও ক্ষতিকর অণু-কণা থেকে আমাদের রক্ষা করার ফিল্টারিং ব্যবস্থা। যা দয়াময় আল্লাহপাক ছাতার মত করে আমাদের মাথার উপর বিস্তৃত করে রেখেছেন। এসব কল্যাণকর স্তর (Layers) মহান আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি তাঁর সীমাহীন মহত্ত্বের কথা ঘোষণা করে।
আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করেন (Sent down rain from the sky)
আকাশ থেকে যে বৃষ্টিধারা নামে তা দিয়ে উৎপন্ন হয় ফলমূল। যা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে জীবন রক্ষা করে মানব জাতি ও বহুসংখ্যক পশু-পাখি। পানির অন্যতম নাম জীবন। এ তথ্যটি নিশ্চিতভাবে জানা গেছে যে, পৃথিবীর বুকে জীবনের প্রাচীনতম নিদর্শনের প্রথম হলো উদ্ভিদজগৎ। তখন থেকেই সকল উদ্ভিদ তাদের পুষ্টি, বৃদ্ধি, প্রজনন এবং অস্তিত্বের জন্য পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে রয়েছে। উদ্ভিদ কোষে পুষ্টিজনিত বিপাক (metabolism) ক্রিয়া সংঘটিত হয় পানির মাধ্যমে এবং পানির সাহায্যে মাটি থেকে গাছপালা বহুরকম পুষ্টিকর উপাদান চুষে নেয়। মানুষের জীবন নির্বাহের জন্য এবং শরীরে পুষ্টিজনিত ঘাটতি পূরণের জন্য শাক-সবজি ও ফলমূলের প্রয়োজনীয়তা অত্যধিক। এ আয়াতে ‘সামারাত’ (ثمرة) শব্দ প্রয়োগ করে আল্লাহপাক সেসব খাদ্যদ্রব্যের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। সামারাত বা ফলমূল পরিপক্ক হওয়া পর্যন্ত যে প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল তা কয়েকটি বিস্ময়কর জটিল পর্বের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়।
মাটি নিচে পানির যে বিশাল সঞ্চয় রয়েছে তার সাথে মিলিত হয় বৃষ্টির পানির একটি অংশ। পানির এ অংশ মাটির ছিদ্রপথ ধরে নিচে চলে যায়। বৃক্ষরাজির শিকড়গুলো তাদের নিচের অংশে যেখানে পানি সঞ্চিত থাকে সেখান পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। নিচের পানির সাথে মিশে থাকে সোডিয়াম (Na), ক্যালসিয়াম (Ca), পটাশিয়াম (k), আয়রন (Fe), সালফার (s), ফসফরাস (p), ম্যাগনেসিয়াম (Mg) প্রভৃতি উপাদান। অসমোসিস (osmosis) পদ্ধতির সাহায্যে গাছপালা ঐসব উপাদান ও পানি মূল-রোমের মাধ্যমে চুষে নেয়। এভাবে চুষিত পানি ও অন্যান্য খনিজ পদার্থ সূক্ষ্ম শিরা-উপশিরার জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে উদ্ভিদের সকল অংশে সঞ্চারিত হয়। মাটি থেকে চুষে নেয়া পানির কিছু অংশ তারা শর্করা (carbohydrate) উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করে। শর্করা উৎপাদনের এ পদ্ধতিকে বলা হয় সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া (photosynthesis)। এটি একটি জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া সংঘটিত হওয়ার জন্য পানির সাথে প্রয়োজন হয় কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂), আলোক শক্তি বহনকারী ফোটন (photon) কণা। উদ্ভিদের সবুজ পাতায় যে ক্লোরোফিল অণু থাকে তা সূর্যের আলো থেকে ফোটন কণা ধারণ করে উত্তেজিত হয়। যার ফলে একটি জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া দ্বারা শর্করা প্রস্তুত হয়।
এ বিক্রিয়ায় পাতার ছিদ্র পথে প্রচুর পরিমাণ অক্সিজেন বাতাসে মিশে যায়। করুণাময় আল্লাহপাক গাছপালার মাধ্যমে এভাবে আমাদের জন্য অক্সিজেন প্রস্তুত করেন।
গাছ-পালার মধ্যে এমন কিছু গাছ আছে যাদের ক্লোরোফিল নেই। সেজন্য কার্বোহাইড্রেট উৎপন্ন করতে পারে না। এরা জীবন ধারণের জন্য মৃত এবং ক্ষয়িষ্ণু জৈব পদার্থের উপর নির্ভর করে। অথবা পঙ্গপালের মত জীবন্ত জীবকোষের উপর বসে তার রস চুষে নিয়ে বেঁচে থাকে। এসব অসবুজ গাছপালার বৃদ্ধিও নির্ভর করে আর্দ্রতার উপর। যে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায় বৃষ্টিপাতের কারণে।
Agronomy অনুযায়ী 'ফল' এর সাধারণ সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে সকল ভোজ্য খাদ্যদ্রব্য, চাল, গম, যব, খেজুর, আম, কাঁঠাল, আপেল, আনারস, এমনকি বাদাম, ডাল, শিম, মটরশুঁটি ইত্যাদি। এসব খাদ্যদ্রব্য আমাদের দৈহিক বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য গঠনের জন্য একান্ত অপরিহার্য।
অতএব, আলোচ্য আয়াতে মহামহিম আল্লাহপাক শয্যার মত ভূ-মন্ডল, চাঁদোয়ার মত নভোমন্ডল এবং বৃষ্টিপাতের ফলে ফলমূল উৎপাদনের যে তথ্যাবলী আমাদের অবহিত করেছেন তা থেকে এ সত্য প্রতিভাত হয় যে, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির প্রতি অত্যন্ত রহমশীল এবং সৃষ্টিকে পরিপক্কতা দানে খুবই সুদক্ষ। তাই এরূপ শক্তিধর প্রশংসিত আল্লাহপাকের প্রতি অংশী স্থাপন করা কিংবা তার বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ দাঁড় করা কতই না বোকামী।
মান্না ও সালওয়া
وَظَلَّلْنَا عَلَيْكُمُ الْغَمَامَ وَأَنْزَلْنَا عَلَيْهِمُ الْمَنَّ وَالسَّلَى كُلُوا مِنْ طَيِّبَتِ مَا رَزَقْنَهُمْ وَمَا ظَلَمُونَا وَلكن كانوا انفسهم يظلمون
We caused the white clouds to overshadow you and sent down on you manna and salwa (quails), (saying): Eat of the good lawful things wherewith We have provided you. To Us they did no harm, but they harmed their ownselves.
আমরা তোমাদের ছায়াদান করার জন্য শুভ্র-মেঘ সৃষ্টি করেছি এবং মান্না ও সালওয়া (কোয়েল) পাঠিয়েছি। আমরা যে উত্তম পবিত্র খাদ্যদ্রব্য তোমাদের জন্য সরবরাহ করেছি তা থেকে ভক্ষণ কর। তারা আমাদের ক্ষতি করেনি। বরং নিজেরাই নিজেদের ক্ষতিসাধন করেছে। (বাকারাঃ৫৭)
এ আয়াতে আল্লাহপাক সেই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন যখন বনি ইসরাঈলীরা মিশর থেকে বিতাড়িত হয়ে হযরত মুছা (আঃ)-এর তত্ত্বাবধানে অনুর্বর মরুভূমিতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। এরূপ প্রতিকূল অবস্থায় আল্লাহপাক তাদের প্রতি দু'টি বিশেষ অনুগ্রহের উপঢৌকন পাঠিয়েছিলেন যেন তারা তাঁর প্রতি যথার্থ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। একটি হলো উত্তপ্ত মরুভূমিতে শুভ্র-মেঘের ছায়াদান। অপরটি, পুষ্টিকর মান্না ও সালওয়া খাদ্যবস্তু সরবরাহ।
শুভ্র-মেঘের ছায়া (The shade of white clouds)
উন্মুক্ত মরু প্রান্তরে সূর্যের কিরণ প্রত্যক্ষভাবে বালুকণার উপরে পড়ে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বালুকণা সহসা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উত্তপ্ত বালুকণা পরবর্তীতে তাপ বিকিরণ করে সংশ্লিষ্ট বাতাসকে অত্যন্ত উষ্ণ করে তোলে এবং এ উষ্ণ বাতাস উপরের দিকে উঠে যায়। যখন কোন নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্দ্র বায়ু উত্তপ্ত হয়ে উপরের দিকে ওঠে তখন তা আয়তনে বৃদ্ধি পায় (কারণ উপরে বায়ুর চাপ কম) এবং শীতল হয়। খুব বেশী শীতল হলে ঐ বায়ু সম্পৃক্ত হয় এবং জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হয়। তাই মেঘের ছায়া বরাবর নিচের বালিময় এলাকা তাপ হারিয়ে শীতল হয়ে যায়। তখন মেঘে ঢাকা মরুপ্রান্তর আর যন্ত্রণাদায়ক মনে হয় না।
সুতরাং শুভ্র-মেঘের ছায়াকে মরুবাসীদের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ বলা যায়। এ বিশেষ অনুগ্রহের কথা আলোচ্য আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে অনুগ্রহ দেখানো হয়েছিল মরুপ্রান্তরে ভ্রাম্যমান বনি ইসরাঈলীদের প্রতি।
মান্নাঃ আবদুল্লাহ ইউসুফ আলী উল্লেখ করেছেন, মান্না এটি হিব্রু শব্দ। যা হিব্রু ভাষার 'মানহু' শব্দ থেকে গৃহিত হয়েছে অথবা আরবী মান-হুয়া থেকে। মান হুয়া অর্থ "What is this?" এটা কি? বনী ইসরাঈলীরা যখন অনুর্বর মরুভূমিতে খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল তখন মেহেরবান আল্লাহপাক তাদের প্রতি মান্না ও সালওয়া নামের দু'প্রকার খাদ্যবস্তু সরবরাহ করেছিলেন। তারা এ খাদ্য বস্তু দু'টি অপ্রত্যাসিতভাবে হঠাৎ মাটির উপর দেখে হয়ত আশ্চর্য হয়ে 'মান্না' (من) এ প্রশ্নবোধক শব্দটি উচ্চারণ করেছিল। পবিত্র কোরআনের ভাষ্যকারগণ (commentators) বলেছেন, ঐ সময়ে সিনাই উপদ্বীপে প্রচুর পরিমাণ মান্না উৎপন্ন হতো এবং এটি অত্যধিক পুষ্টিমান সমৃদ্ধ ব্যতিক্রমধর্মী একটি উদ্ভিদ গ্রুপের নাম যাকে লাইকেন (Lichens) বলা হয়। প্রতিটি লাইকেন গঠিত হয় একটি শৈবাল ও একটি ছত্রাক প্রজাতির একত্রে মিথোজীবিতা (Symbiosis) পদ্ধতিতে বৃদ্ধির ফলে। একে তাই দ্বৈত উদ্ভিদ সত্তা (Dual organism) বলা হয় এবং তাদের এ দ্বৈত সত্তা খুবই অদ্ভুত ধরনের। শৈবাল ও ছত্রাক যৌথভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন আকার ও আকৃতির অঙ্গ তৈরী করে মিলে মিশে সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে।
লাইকেনের আবাসিক অবস্থান ও বিস্তৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। এরা পাথর, ইটের দেয়াল, বৃক্ষের কান্ড, ডাল, পাতা, পাহাড়-পর্বত, মাটি ইত্যাদি বিভিন্ন বস্তুর উপর ধুসর বর্ণের শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে বেড়ে ওঠে। তবে এরা সরাসরি পানিতে জন্মায় না। কিছু প্রজাতি ভেজা স্যাঁতসেঁতে স্থানে জন্মাতে পারে। উত্তর আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়ার বহু অঞ্চলে, পাহাড় ও অনুর্বর মরুভূমির বিশাল এলাকা জুড়ে এগুলো উৎপন্ন হয়। রহস্যজনকভাবে ঐগুলো যখন বাতাসের তোড়ে উড়ে এসে হাহাকার মরুভূমিতে পড়ে তখন মরুভূমির যাযাবর গোষ্ঠী খুব বিশ্বাস যোগ্যতার সাথে প্রকাশ করে "এগুলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য বিশেষ রিযিক ব্যবস্থা"। ১৮৫৪ সনে ইরানে যখন দারুন দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল তখন ঐ লাইকেন সেদেশে বৃষ্টির মত বর্ষিত হয়েছিল। এর ফলে দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষেরা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে মহান আল্লাহর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিলেন। বর্তমানে ইরানের মরুভূমি অঞ্চলে এবং কিরগিজ স্থানের তৃণভূমি অঞ্চলে, মিশর, আলজেরিয়া, মরক্কো এবং এ্যাটলাস পর্বতের ঢালু এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির লাইকেন দেখা যায়। মান্না জাতীয় লাইকেন এখন আর সিনাই উপদ্বীপে পরিদৃষ্ট হয় না। কিন্তু হযরত মুছা (আঃ)-এর আমলে ঐ উপদ্বীপে বিদ্যমান ছিল, যা সেই সময়ে বিতাড়িত বনি ইসরাঈলীদের জন্য আল্লাহপাকের অনুগ্রহের নির্দেশনা বলেই প্রতীয়মান হয়।
সালওয়াঃ সালওয়া আরবী শব্দ। এ শব্দ দ্বারা কোয়েল (Quail) পাখিকে বুঝানো হয়। কোয়েল একটি পরিযায়ী পাখি (Migratory birds)। এটি ফ্যাস্যান্ট (Phaesant), পার্ট্রিজ (Partridge) ও টার্কী (Turkey) পাখির গোত্রভুক্ত। এ পাখির একটি প্রজাতির নাম *coturnis vulgaris*। এ প্রজাতির পাখি হাজার হাজার মাইল একটানা ভ্রমণ করতে পারে এবং এদের এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সর্বত্র দেখা যায়।
এটা একটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, মাইগ্রেটরি পাখিরা দীর্ঘ উড়ান যাত্রায় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে। সম্প্রতি তাদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আবিষ্কৃত হয়েছে। এ বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে তাই তাদের নাম দেয়া হয়েছে গণিতবিদ পাখি (Mathematician birds)। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে স্বদেশত্যাগী পাখিরা হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করার সময় তাদের গন্তব্যস্থল খুঁজে পাবার জন্য যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করে তার মধ্যে একটি হলো ভূতলস্থ দৃশ্যমান প্রাকৃতিক দৃশ্য যেমন, পর্বতমালা, উপকূলের অবস্থান ও আকৃতি, নদ-নদীর অবস্থান ও গতিপথ ইত্যাদির সাহায্য নেয়া।
অনেক পরিযায়ী পাখি দিক নির্ণয়ের জন্য সূর্যকে ব্যবহার করে। কিন্তু দিনটা যদি মেঘাচ্ছন্ন হয় তাহলে তারা দিক নির্ণয় কিভাবে করে! একজন পথিক যেমন দিক নির্ণয়ের জন্য যাত্রাপথে কম্পাস ব্যবহার করে। মাইগ্রেটরি পাখিরাও কি যাত্রাপথে তেমন কিছু ব্যবহার করে! হ্যাঁ, এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে কবুতর, কোয়েল অথবা পান পায়রা (Arctic Turn) প্রভৃতি পাখিদের মাথার খুলির ভেতরে একটা ছোট্ট চুম্বক দানা (Pod of magnetic grain) আছে। সেজন্য এরা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সাথে নিজেদের সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে উড়ে চলে যা দিক নির্ণায়ক কম্পাসের মত কাজ করে। আবার রাতে ভ্রমণের সময় এরা আকাশের তারকারাজির মাধ্যমে দিক নির্ণয় করে। বিভিন্ন নক্ষত্রের অবস্থান দেখে কোন নির্দিষ্ট তারাকে অনুসরণ করে এরা পরিযান করে থাকে।
আরও একটি উপায় আছে তাহলো মাইগ্রেটরি পাখিরা সূর্যালোকের মেরুকরণ (Polarisation Pattern) প্রবণতা উপলব্ধি করতে পারে। সূর্যরশ্মি বায়ুস্তর ভেদ করার সময় ক্ষুদ্র বায়ু কণার মধ্য দিয়ে আলোক তরঙ্গকে একটি নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত করে। সূর্যাস্তের সময় আকাশের দিকে তাকালে আলোর মেরুকরণ প্রবণতার (Resulting polarisation of the light) ব্যাপারটি আমরা চিহ্নিত করতে পারি। কিছু কিছু মাইগ্রেটরি পাখি আলোর মেরুপ্রবণতাকে আকাশে একটা বড় কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু যে কোন নাবিক বলতে পারে যে, একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাওয়ার জন্য যা প্রয়োজন তাহলো উত্তর দিক কোনটা জেনে নেয়া। এক্ষেত্রে মানুষের দরকার হয় এলিমেন্টারি ত্রিকোণমিতির (Elementary Trigonometry) এবং উচ্চতর ত্রিকোণমিতির মাধ্যমে একটা ম্যাপ অঙ্কন করা। পাখিরাও কি মানুষের মত ত্রিকোণমিতি সমাধান করতে পারে? নিঃসন্দেহে না। তবে পাখিদের পরিযান কৌশলকে যখন গণিতের ভাষায় রূপান্তর করা হয় তখনই কেবল হাজার হাজার মাইল ভ্রমণকারী পরিযায়ী পাখিদের গাণিতিক কার্যকলাপ আমাদের সামনে প্রতিভাত হয়। পরিযায়ী পাখির উপর সরল বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে পরিশিষ্ট ৯-এ।
প্রজ্ঞাময় আল্লাহপাক এরূপ মাইগ্রেটরি পাখি সালওয়া, অসহায় বনি ইসরাঈলীদের কাছে অনুগ্রহ পূর্বক পাঠিয়েছিলেন। পুষ্টিকর সালওয়া পাখির মাংসে মান্নার অনুরূপ কার্বোহাইড্রেট থাকায় এর মাংস সুষম খাদ্য তৈরী করতে পারে। কঠিন মরু প্রান্তরে খাদ্য সংকটের সময় বনি ইসরাঈলীদের নিকট আল্লাহপাক নির্দেশ দেন মান্না ও সালওয়া পবিত্র খাদ্যদ্বয় গ্রহণ করার জন্য। স্বাভাবিকভাবে তাদের উচিত ছিল সুমহান আল্লাহ তাআলার দরবারে সেজদাবনত হয়ে তাঁর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। অথচ তারা তার বিপরীত কাজটুকুই করেছে। এভাবে আল্লাহর করুণা লাভ করার পর যারা সারাজীবন তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞের মত আচরণ করে তাদের অবস্থা সেই ইসরাঈলীদের মত হয়ে থাকে যাদেরকে আল্লাহ তাআলা লাঞ্ছনা, অপমান ও অপদস্ত করে পৃথিবীর বুকে যাযাবরের জীবন দান করেছেন। আর পরমুখাপেক্ষী করে রেখেছেন।
আল কোরআনের আরও দুইটি আয়াতে মান্না ও সালওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্নে তা পেশ করা হলো
وَظَلَّلْنَا عَلَيْهِمُ الْغَمَامَ وَأَنْزَلْنَا عَلَيْهِمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوى كُلُوا مِنْ طَيِّبَتِ مَا رَزَقْنكُمْ وَمَا ظَلَمُونَا وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ.
We gave them the shade of clouds and sent down to them manna and salwa. (Saying) "Eat of the good lawful things We have provided for you. To Us they did no harm but they harmed their own souls.
আমরা তাদেরকে মেঘমালার ছায়াদান করেছিলাম এবং তাদের কাছে মান্না ও সালওয়া পাঠিয়েছিলাম। এসব পবিত্র খাদ্যবস্তু তোমরা আহার কর। তারা আমাদের কোন ক্ষতি করেনি বরং নিজেদের ক্ষতিসাধন করেছে।" (আ'রাফ-১৬০)
يُبَنِي إِسْرَائِيلَ قَدْ أَنجَيْنكُمْ مِنْ عَدُكُمْ وَوَعَدْنكُمْ جَانِبَ الطُّورِ الايمن وَنَزَّلْنَا عَلَيْكُمُ الْمَنَّ وَالسَّلْوى.
O children of Israel! We deliverd you from your enemy and We made a covenant with you on the holy mountain's side and sent down on you the manna and salwa.
হে ইসরাঈলের সন্তানেরা! আমরা তোমাদের শত্রুর কবল থেকে তোমাদের রক্ষা করেছি এবং পবিত্র পর্বতের পাদদেশে তোমাদের চুক্তিনামায় আবদ্ধ করেছি। আর তোমাদের খাদ্য হিসেবে মান্না ও সালওয়া প্রেরণ করেছি। (ত্বোয়াহা-৮০)
What the Earth Grows
وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَىٰ لَنْ نَصْبِرَ عَلَىٰ طَعَامٍ وَاحِدٍ فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجْ لَنَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ مِنْ بَقْلِهَا وَقِثَّائِهَا وَفُومِهَا وَعَدَسِهَا وَبَصَلِهَا ۚ قَالَ أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَىٰ بِالَّذِي هُوَ خَيْرٌ ۚ اهْبِطُوا مِصْرًا فَإِنَّ لَكُمْ مَا سَأَلْتُمْ ۖ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ
And (remember) when you said, "O Musa! We cannot endure one kind of food (always): So beseech your Lord for us to produce for us of what the earth grows, its pot herbs and cucumbers, its wheat, lentils and onions." He said, "Will you exchange the better for the worse? Go you down to any town and you shall find what you want!" They were covered with humiliation and misery; and they drew on themselves the wrath of Allah.
আর (স্মরণ কর) যখন তোমরা বলেছ, "হে মূসা (আঃ)! আমরা তো একই রকম খাদ্য খেয়ে থাকতে পারব না। তাই আপনার প্রভুর নিকট আমাদের পক্ষে মিনতি পেশ করুন ভূ-পৃষ্ঠে যেসব খাদ্য জন্মে যেমন, সুগন্ধি সবজি, শশা, গম, মসুর ও পেঁয়াজ প্রভৃতি দেয়ার জন্য।" প্রতিউত্তরে তিনি (মূসা আঃ) বললেন, "তোমরা কি উত্তম খাদ্যের বিনিময়ে নিম্নমানের খাদ্য চাও? তাহলে যে কোন শহরে চলে যাও। তোমরা যা কামনা করছ সেখানে তা পাবে। আর তাদের উপর আরোপিত হলো লাঞ্ছনা ও দুর্গতি। তারা আল্লাহর রোষানলে পতিত হয়ে ঘুরতে লাগল। (বাকারাঃ৬১)
মান্না ও সালওয়া খাদ্য দু'টি সুষমভাবে একত্রিত করা হলে প্রয়োজনীয় ক্যালরি পাওয়া যায়। এ মিশ্রিত খাদ্য বস্তু সহজে হজম হয়ে প্রোটিন (Protein) ভিটামিন এবং অতি প্রয়োজনীয় অ্যামিনো এসিডের চাহিদা মেটায়। তাই অত্যধিক পুষ্টিমান সমৃদ্ধ মান্না ও সালওয়া আল্লাহপাক মেহেরবানী করে পাঠিয়েছিলেন বিতাড়িত বনী ইসরাঈলীদের প্রতি। তারা এ খাদ্য বস্তু দু'টির প্রতি সন্তুষ্ট না থেকে কিংবা আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন না করে ঐসব খাদ্যদ্রব্য (শাক-সবজি, গম, ডাল, পেঁয়াজ) দাবী করলো যেগুলো পুষ্টির দিক থেকে মান্না ও সালওয়ার স্থান দখল করতে পারে না। তাই আয়াতে বলা হয়েছে, "Will you exchange the better for the worse?"
আলোচ্য আয়াতে উদ্ভিদ গোত্রভুক্ত পাঁচ প্রকার খাদ্যবৃক্ষের উল্লেখ করা হয়েছে এবং এসব খাদ্যবৃক্ষ (Food plants) সেই সময়ে মিশরে বিদ্যমান ছিল যখন হযরত মুছা (আঃ) নেতৃত্বে বনী ইসরাঈলীরা মিশর ত্যাগ করেছিল। খাদ্যবস্তুগুলোর পুষ্টিমানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে পেশ করা হলো যাতে করে মান্না ও সালওয়ার পুষ্টিমূল্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়।
সুগন্ধি সবজি (Pot herbs)
ইউসুফ আলী আরবী বাকুলুন (بقل ) শব্দের অনুবাদ করেছে Pot-herb শব্দ প্রয়োগ করে। যার অর্থ খাদ্যাদি সুগন্ধ ও সুস্বাদু করণার্থ লতাপাতা। যেমন, ধনেপাতা, পেঁয়াজ ও রসুনের সবুজপাতা ইত্যাদি। এ শব্দ দ্বারা ব্যাপক অর্থে শাক-সবজি জাতীয় খাদ্যকেও বুঝানো হয় যেগুলো রান্না করে তৃপ্তি সহকারে আহার করা যায়। যেমন, বাঁধাকপি, শালগম, সরিষা ও পালং শাক। এসব সবজির পাতা রসালু ও সুস্বাদু। ধনেপাতা কিংবা অন্যকোন সুগন্ধিযুক্ত লতাপাতা উল্লেখিত শাক-সবজীর সাথে মিশ্রিত করা হলে সেসবের স্বাদ আরও বেশী বৃদ্ধি পায়। বিতাড়িত বনী ইসরাঈলীরা হয়তো বা এ ধরনের খাদ্য সামগ্রীর আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু এ জাতীয় খাদ্যের পুষ্টিমান মান্নার সমকক্ষ কখনো হবে না।
শশা (Cucumbers)
আরবী শব্দ কিস্সাআ ( قثاء ) অর্থ শশা। শশা গ্রীষ্মকালীন এক বর্ষজীবি Cucumis sativus সবজি এবং উদ্ভিদ বর্গ ক্যামপেনিওলেলিস (Campanulales) এর অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীর প্রায় সবদেশে শশা জন্মায়। এমনকি শীত প্রধান দেশে কাচঘরের নিয়ন্ত্রণ তাপ ও আর্দ্রতায় এর চাষ করা হয়। মিশরে এটার চাষ শুরু হয়েছিল দ্বাদশ রাজবংশের আমলে। শশার খাদ্যমান প্রধানত শর্করা (Carbohydrate) ও ভিটামিনের মধ্যে পরিব্যাপ্ত। এতে পানির পরিমান ৯৫%, প্রোটিন ০.৭%, চর্বি ০.১% শর্করা ৩.৪% এবং ছিলকা ০.৪%। কচি অবস্থায় শশাকে সালাদ হিসেবে এবং রান্না করে তরকারী হিসেবে খাওয়া হয়। এটি বাংলাদেশের একটি প্রধান সবজি।
ইউসুফ আলী আরবী 'ফুম' (ثوم ) শব্দের অনুবাদ করেছেন Garlic বা রসুন। কোরআনের অভিধানে এ শব্দের আরো দু'টি অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হলো গম (Wheat) অপরটি মটরশুঁটি। এখানে তিনটি অর্থই ধরে নিয়ে নিম্নে তার বিশ্লেষণ দেয়া হলো,
রসুন (Garlic)
রসুনের বৈজ্ঞানিক নাম Allium sativum, এটি বহু হাজার বছর ধরে একমাত্র আবাদি শস্য হিসেবেই পরিচিত। রসুনের উৎপত্তিস্থল মধ্য এশিয়ায় বলে মনে করা হয় এবং অতি প্রাচীনকালে সেখান থেকে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় বিস্তার লাভ করে। মিশরে আজ থেকে ৫০০০ বছর পূর্বে (ফেরাউনের রাজত্বকালে) খাদ্যরূপে এটি পরিচিত ছিল।
প্রাচীনকাল থেকে নানা অসুখে রসুনকে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। যেমন রসুনকে সব ধরনের বিষাক্ত দ্রব্যের প্রতিষেধক ঔষধ মনে করা হতো। রসুনের Allicin দ্রব্যে ব্যাকটেরিয়া নাশক গুণ বর্তমান। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে রসুনকে সর্দি কাশি সহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমাতে এবং হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়াতে রসুন বেশ কার্যকর বলে মনে করা হয়। রসুনে ৬৩% পানি, ৭% প্রোটিন, ২৮% শর্করা, সামান্য পরিমাণ ফ্যাট, আঁশ ও ১% ছাই থাকে। এর মধ্যে Allionin নামে অ্যামিনো অ্যাসিড ভেঙ্গে Allicin তৈরী হয় যার প্রধান উপকরণ হচ্ছে Diallyl disulphide যা রসুনের তীব্র গন্ধের জন্য দায়ী।
বনী ইসরাঈলীদের যারা এ খাদ্যের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল, খাদ্যের স্বাদ ও সুগন্ধি বৃদ্ধি করার জন্য এরা রসুন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতো।
গম (Wheat)
গমের বৈজ্ঞানিক নাম Triticum dicoccum প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে গমের চাষ চলে আসছে। গমের ১২টি প্রজাতি আছে। এদের মধ্যে এমার (Emmer) প্রজাতির গম প্রাচীনতম। জানা গেছে প্রাচীন মিশরে এমার গমের চাষ প্রথম শুরু হয়েছিল। গমের দানা থেকে আজকাল নানা ধরনের খাদ্য তৈরী হয়। শিশু খাদ্য, গমের রুটি, পিঠা এবং গম থেকে বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট প্রস্তুত করা হয়। গমের পুষ্টিমান থাকার কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটাকে প্রধান খাদ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একটি গমের দানায় পানির পরিমাণ ১৩%, প্রোটিন ১২%, ফ্যাট ২% শর্করা ৭০% এবং ফাইবার ২% বর্তমান থাকে। গম বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য।
মসুর (Lentil)
আরবী আদাস'। শব্দের অর্থ মসুর ডাল। এর বৈজ্ঞানিক নাম Lens culinaris Medik। ধারণা করা হয় যে, মসুরের প্রথম উৎপত্তি তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে। পরে এটি গ্রীস, মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপ, মিশর, ইথিওপিয়া, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও চীনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটি শীতপ্রধান অঞ্চলের শস্য হলেও প্রায় গ্রীষ্মমন্ডল অঞ্চলে শীতকালে এবং গ্রীষ্মমন্ডলে অধিক উচ্চতায় ঠান্ডা ঋতুতে জন্মে। মসুর ছোট্ট দানাদার সিম জাতীয় ডাল। মসুর ডালের দানাতে পানি থাকে ১১.২%, প্রোটিন ২৫%, চর্বি ১% শর্করা ৫৬% এবং ফাইবার ৩% বিদ্যমান।
পেঁয়াজ (Onion)
আরবী ‘বাসাল’ (بصل ) অর্থ পেঁয়াজ। পেঁয়াজের বৈজ্ঞানিক নাম Allium cepa এটা বিশ্বাস করা হয় যে, পেঁয়াজের উৎপত্তি ইরান, পাকিস্তান এবং ঐ দেশগুলির উত্তরবর্তী পাহাড়ী অঞ্চলে। অতি প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষে এবং মধ্যপ্রাচ্যে পেঁয়াজের চাষ হয়ে আসছে। প্রাচীন মিশরে পেঁয়াজ ছিল একটি জনপ্রিয় খাদ্য। একটি পরিপক্ক পেঁয়াজে পানি থাকে ৮৬%, প্রোটিন ১.৪০%, চর্বি ০.২%, শর্করা ১১% এবং ফাইবার (Fiber) ০.৪%। পেঁয়াজ এমন একটি শস্য যা মাছ, মাংস, শাক-সবজি এবং সালাদ তৈরী করে খাওয়া হয়। পেঁয়াজের সবুজ পাতা খাদ্যের স্বাদ ও সুগন্ধ বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হয়।
অতএব, উল্লেখিত শাক-সবজি ও শস্যদানা বিশ্বময় জনপ্রিয় ও অপরিহার্য খাদ্যবস্তু হিসেবে সমাদৃত। প্রজ্ঞাময় আল্লাহতাআলা মাটিতে উর্বরা শক্তি দান করার দরুন এসব খাদ্যবস্তু উৎপন্ন হয়। মিশর থেকে বিতাড়িত বনী ইসরাঈলীরা পূর্বে এসব খাদ্যদ্রব্যের স্বাদ উপভোগ করেছিল। তাই উন্মুক্ত মরুভূমির যাযাবর জীবনে পতিত হয়ে এসবের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল মান্না ও সালওয়ার পরিবর্তে। কিন্তু মানুষের অধিক পুষ্টির জন্য কিছু বিশেষ ধরনের খাদ্যপ্রাণের প্রয়োজন হয়। অ্যামিনো এসিড একটি বিশেষ জৈব উপাদান যা শাক সবজি জাত প্রোটিনের মধ্যে পাওয়া যায় না। মান্না শর্করা জাতীয় (carbohydrate) খাদ্য যার মধ্যে আছে সুক্রোজ (sucrose), লেভুলোজ (Levulose), গ্লুকোজ (glucose) এবং ডেক্সট্রিন (dextrin)। এগুলো খাওয়ার সাথে সাথে মানুষের শরীরে শক্তি সঞ্চারিত হয়। কিন্তু গম তা পারে না। কারণ গমে (wheat) যে স্টার্চ থাকে খাওয়ার পর প্রথমে সেটা গ্লুকোজে পরিণত হয়। তাই সে সরাসরি শক্তির যোগান দিতে পারে না। ডালজাত প্রোটিনের পুষ্টিমান কিছুটা বেশী (২০%)। কিন্তু যে প্রোটিন কোয়েল পাখির (সালওয়া) মাংস থেকে পাওয়া যায় তার মান আরও অধিক এবং তা সহজে হজম হয়ে শরীরে absorb হয়ে যায়। তাই মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা অধিক পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্যের পরিবর্তে নিম্নপুষ্টির খাদ্য চাও? তাহলে যে কোন শহরে প্রবেশ কর। ঐসব খাদ্য সর্বত্র সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু মান্না ও সালওয়া সর্বত্র সহজে পাওয়া যায় না।
References: 1. The meaning of the Glorious Quran; Text, Translation and Commentary; Abdullah Yusuf Ali 2. Science Encyclopedia; Vol-2; Bangla Academy, Dhaka.
সালোক সংশ্লেষণ (Photosynthesis) H₂O + CO₂ = C₆H₁₂O₆ + O₂
সবুজ বৃক্ষ এবং ফসল সূর্যালোক থেকে শক্তি গ্রহণ করে পানি ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের রাসায়নিক বিক্রিয়া দ্বারা শর্করা (carbohydrate) নামক খাদ্য তৈরী করে। এ প্রক্রিয়াকে সালোক সংশ্লেষণ বলা হয়।
সালোক সংশ্লেষণ সংগঠিত হওয়ার জন্য পানি-(H₂O) কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂), সূর্যের আলো এবং ক্লোরোফিল প্রয়োজন। উদ্ভিদ ও ফসল মূল রোমের সাহায্যে মাটি থেকে পানি শোষণ করে তা পাতা ও অন্যান্য অঙ্গে পৌছে দেয়। বায়ু থেকে CO₂ গ্রহণ করে। উদ্ভিদের পাতায় ক্লোরোফিল অণু থাকে। ক্লোরোফিল সূর্যালোক থেকে ফোটন (Photon) নামক আলোক কণা ধারণ করে উত্তেজিত হয়। যার ফলে একটি জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া দ্বারা শর্করা প্রস্তুত হয়।
আলো H₂O + CO₂ ──────→ C₆H₁₂O₆ + O₂ ক্লোরোফিল শর্করা
উদ্ভিদ ছাড়া আর কোন প্রাণী নিজের খাদ্য (শর্করা) নিজে তৈরী করতে পারে না। অনন্ত অসীম করুণাময় প্রভু সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে কোরআন মজিদে তত্ত্ব পেশ করেছেন,
وَجَعَلْنَا سِرَاجًا وَهَاجًا
And We have made the sun a bright lamp.
আর আমরা সূর্যকে উজ্জ্বল প্রদীপ করেছি। (নাবা-১৩)
هُوَ الَّذِي يُرِيكُمُ آيَاتِهِ وَيُنَزِّلُ لَكُم مِّنَ السَّمَاءِ رِزْقًا
It is He Who shows you His Ayat and sends down provision for you from the sky.
তিনি-ই সে সত্ত্বা, যিনি ইঙ্গিত সমূহ প্রদর্শন করেন এবং তোমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্য সম্ভার সরবরাহ করেন (মু'মিন-১৩)
এখানে আকাশ থেকে খাদ্য সম্ভার সরবরাহ করার অর্থ হচ্ছে সূর্যের আলো থেকে বৃক্ষরাজি ও ফসল সালোক সংশ্লেষণ (Photosynthesis) প্রক্রিয়ায় নিজেদের খাদ্য (শর্করা) তৈরী করে পরিপুষ্ট হয়। অতপর মানুষের জন্য খাদ্য-শস্য উৎপন্ন করে।
আধুনিক বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন যে, প্রাকৃতিক প্রতিকূল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অন্ধকার পর্যায়েও সালোক সংশ্লেষণ ঘটতে পারে। উদ্ভিদ সূর্যের আলো থেকে অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেট (ATP) নামক এক ধরনের অণু দেহের মধ্যে রিজার্ভ করে রাখে। সূর্যের আলো যখন থাকে না তখন ATP র সহায়তায় H₂ অণুর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় CO₂ বিজারণের মাধ্যমে শর্করা (Carbohydrate) তৈরী করে নেয়।
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَجَعَلَ الظُّلُمَاتِ وَالنُّورَ
All the Praises be to Allah Who created the heavens and the earth and made the darkness and the light.
মহিমাদীপ্ত আল্লাহ, যিনি নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আলো-আঁধার সৃষ্টি করেছেন। (আনআম-১)
অতএব, সালোক সংশ্লেষণ বিক্রিয়ায় উদ্ভিদ ও ফসল বাতাসে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন (O₂) ছেড়ে দেয় এবং বাতাস থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) গ্রহণ করে নেয়। পক্ষান্তরে মানুষ শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে বায়ু থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে। আর কার্বন ডাইঅক্সাইড ত্যাগ করে। সৃষ্টির এ প্রক্রিয়াটি মহানুভব আল্লাহর অসংখ্য রহমতের মধ্যে একটি।
Fear and Hope
وَمِنْ أَيْتِهِ يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنَزِّلُ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَيُحْيِ بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَتٍ لِقَوْمٍ تَعْقِلُونَ.
And among His signs is that He shows you the lightning by way both of fear and of hope and He sends down rain from the sky and therewith gives life to the earth after it is dead. Verily in that are indeed signs for those who are wise.
আল্লাহ তা'আলার অসংখ্য নিদর্শনের মধ্যে একটি হচ্ছে আকাশে বিদ্যুৎ চমকে, যার মধ্যে ভয়ও আছে আশাও আছে এবং তিনি আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করে নির্জীব জমিনকে সজীব করেন। অবশ্যই এ সবের মধ্যে প্রকৃত সংকেত রয়েছে তাদের জন্য যারা জ্ঞান রাখে। (রূম-২৪)
আকাশে যখন বিদ্যুৎ স্পার্কিং হয় তখন কোরআন বলছে, এ ঘটনায় ভয় এবং আশা উভয়ই বিদ্যমান। ভয় কিসের? ভয় হচ্ছে, বজ্রপাতের দরুন জীবন সংহারের ভয়। সম্পদ ধ্বংস হওয়ার ভয়। বিকট শব্দে শ্রবণশক্তি নষ্ট হওয়ার ভয়। কিন্তু আশাটা কি!
আশার কথা বলে জ্ঞানী লোকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। কারণ জ্ঞান ব্যতীত আল্লাহর আয়াত অনুধাবন করা অসম্ভব।
বায়ুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেন। (N₂-78%) এবং (O₂-21%)। মেঘে ঢাকা আকাশে যখন বিদ্যুৎ চমকে তখন বায়ুর O₂ এবং N₂ এর মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া সংগঠিত হয়ে নাইট্রেট (NO₃) নামক যৌগমূলক সৃষ্টি হয়। বৃষ্টিধারার সাথে উক্ত NO₃ মাটিতে নেমে আসে। মাটিতে অবস্থিত সোডিয়াম (Na), ক্যালসিয়াম (Ca), ম্যাগনেসিয়াম (Mg) ইত্যাদি উপাদানের সাথে নাইট্রেটের বিক্রিয়া ঘটে, যার ফলে সৃষ্টি হয় সোডিয়াম নাইট্রেট (NaNO₃), ক্যালসিয়াম নাইট্রেট (Ca(NO₃)₂), ম্যাগনেসিয়াম নাইট্রেট (Mg(NO₃)₂) ইত্যাদি। আর এসব রাসায়নিক পদার্থ বৃক্ষ এবং ফসলের খাদ্য। আকাশে যতবেশী বিজলী চমকে ততবেশী এসব খাদ্য তৈরী হয়। ফলে রাতারাতি ফসলের চেহারা পাল্টে যায় এবং অধিক পরিমাণে ফল আর ফসল উৎপন্ন হয়।
অতএব, উপরোক্ত প্রক্রিয়ায় ফসলের খাদ্য তৈরি হয় কেবল আকাশে বিদ্যুৎ স্পার্কিং হলে। তা না হলে তো নয়। তাই আয়াতে আল্লাহ তাআলা যে আশার কথা বলেছেন তা এখন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থেকে বুঝা গেল।
هُوَ الَّذِي يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنْشِئُ السَّحَابَ الثَّقَالَ.
He It is Who shows you the lightning as a fear and as a hope and raises the heavy clouds with rain.
তিনি আল্লাহ যিনি বিজলী প্রদর্শন করেন। যা ভয় এবং আশার সঞ্চার করে। আর বৃষ্টি কণা সহ মেঘমালাকে উর্ধ্বে ওঠান। (রাদ-১২)
পরাগায়ণ (Pollination)
سُبْحْنَ الَّذِي خَلَقَ الْأَزْوَاجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ وَمِنْ أَنْفُسِهِمْ وَمِمَّا لَا يَعْلَمُونَ.
Glory be to Him Who created all the pairs of that which the earth grows and in their own kind and in other things about which they have no knowledge.
মহামহিম প্রভু তিনি, যিনি মাটি থেকে উৎপন্ন সর্বকিছু এবং তাদের নিজেদের মধ্যে আর তারা জানেনা এমন বস্তু সমূহের মধ্যে জোড়া সৃষ্টি করেছেন। (ইয়াসীন-৩৬)
মহান আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টি জগতের সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে জোড়া ভিত্তিক ব্যবস্থা বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন। পদার্থ জগত, প্রাণীজগত এবং উদ্ভিদ জগতে বিপরীত জোড়া যেমন আছে তেমনি পরমাণুর মধ্যে রয়েছে জোড়া। পুলিন, Sperm, Ovum, ক্রোমোজোম, জিন DNA, RNA, প্রভৃতি জৈবিক উপাদানের মধ্যেও জোড়া ভিত্তিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। সমগ্র সৃষ্টি জুড়ে জোড়া ব্যবস্থা না থাকলে পদার্থ জগতের সম্প্রসারণ ঘটতো না। উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের বংশ বিস্তারের ধারা থেমে যেত। গোটা সৃষ্টি প্রাণহীন আড়ষ্টতায় পর্যবসিত হয়ে যেত।
উদ্ভিদ মাটি বিদীর্ণ করে ওঠে এবং অনড় দাড়িয়ে থাকে। তাহলে এদের মিলন ঘটবে কিভাবে। হ্যাঁ, মিলন ঘটবার কৌশলগত ব্যবস্থা রয়েছে। বৃক্ষ ও তরুবীথির যে ফুল সৃষ্টি হয়, তার পরাগধানীতে থাকে পুষ্পরেণু বা পুলিন। পুলিন দু'প্রকার। পুংরেণু এবং স্ত্রী রেণু। উভয় রেণুর মিলন হলেই ফল সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে পুংরেণু, স্ত্রীরেণু পর্যন্ত পৌছার জন্য দু'টি মাধ্যম কাজ করে। একটি হচ্ছে বায়ু প্রবাহ অপরটি কীটপতঙ্গ।
বায়ু প্রবাহের মাধ্যমে পুলিন উড়ে উড়ে চার পাশের ফুলের উপর গিয়ে পড়ে। ফলে পুংরেণু দ্বারা স্ত্রীরেণু নিষিক্ত হয় এবং ফল সৃষ্টি হয়। আবার প্রজাপতি, ভ্রমর, মৌমাছি প্রভৃতি যখন ফুলের উপর বসে তখন পুলিন তাদের পা গুলো জড়িয়ে ধরে। পরক্ষণে ওরা যখন অন্য ফুলের উপর গিয়ে বসে, তাদের পায়ে জড়ানো রেণু বিপরীত রেণুর সাথে মিলিত হয়ে নিষেক (fertilization) ঘটায়। ফুলে ফুলে মিলনের এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় পরাগায়ন (Pollination) ।
এখন, পরাগায়ণ সম্পর্কে আল-কোরআনের ঐশী বাণী,
وَأَرْسَلْنَا الرِّيَاحَ لَوَاقِحَ.
And We send the fecundating wind.
আর আমরা ফলদানকারী (গর্ভ দানকারী) বাতাস প্রেরণ করি। (হিজর-২২)
وَمِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ جَعَلَ فِيهَا زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ.
And fruit of every kind He made in pairs two and two.
আর তিনি প্রত্যেক ফল দুই-দুই জোড়া থেকে সৃষ্টি করেছেন। (রাআদ-৩)
উক্ত আয়াতে 'যাওজাইনিস্নাইন' (زوجين اثنين) শব্দ দ্বারা পুংরেণু (Male stamens) এবং স্ত্রীরেণু (Female pistils) কে বুঝানো হয়েছে। কেননা উভয়ের মিলনের দরুন ফল উৎপন্ন হয়।
কোন কোন ফুলে পুংকেশর ও স্ত্রীকেশর উভয়ই থাকে। বায়ু প্রবাহের প্রভাবে এরা যখন দোল খায় তখন পারস্পরিক মিলন ঘটে। যেমন, খেজুর ফল, পাপিয়া ইত্যাদি।
মিরাকল ফুড
তৎকালীন রাজা বাদশারা বলতেন মিরাকল ফুড বা আশ্চর্য খাবার। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে ডাক্তারী চিকিৎসায় এর ব্যবহার ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখনো একই গুরুত্ব বহন করে। মোগল আমলে রাজা বাদশারা তাদের যৌবন ধরে রাখার জন্য খাদ্যটি নিয়মিত গ্রহণ করতেন। বর্তমানে বিশ্বখ্যাত খেলোয়াড়েরা (Sportsmen) স্ট্যামিনা বৃদ্ধির জন্য এটি গ্রহণ করে। সাহিত্যের ভাষায় এটিকে রোমান্টিক খাদ্য বলা হয়। কেননা জীবনের সকল অপূর্ব মুহূর্তে এর নামটি উচ্চারিত হয়ে থাকে। খাদ্যটির নাম-মধু (Honey)।
ফুলের মধু গ্রন্থি থেকে মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে। আর তা সংরক্ষণ করে এমন কতগুলো প্রকোষ্ঠে (cell) যা সুকৌশলে নির্মিত। মৌমাছির বাসা এতই শিল্প নৈপুণ্যতায় মন্ডিত যা রীতিমত বিস্ময়কর। সমগ্র বাসা (Nest) অসংখ্য ষড়ভুজের (Hexagon) সমষ্টি। অর্থাৎ এক একটি প্রকোষ্ঠ ৬টি বাহু দ্বারা সীমাবদ্ধ। ২টি বাহু খাড়াভাবে এবং চারটি বাহু তির্যকভাবে সংযুক্ত। বাহুগুলো মোমের তৈরী এবং একটি বাসায় পরস্পর সংযুক্ত অসংখ্য প্রকোষ্ঠ থাকে। যেখানে মধু জমা রাখা হয়। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে মৌমাছি বাসা নির্মাণের জন্য তিনটি স্থান সবচেয়ে বেশী পছন্দ করে থাকে। (১) পাহাড়ের কোল (২) বৃক্ষ ডাল (৩) বাড়ী ঘরের ছাদ। একটি বাসায় কেবল একজন রাণী মৌমাছি থাকে এবং হাজার হাজার কর্মী মৌমাছি (স্ত্রী) কঠোর পরিশ্রম স্বীকার করে মধু সংগ্রহ করে। এ কাজে কেউ এতটুকু অলসতা প্রদর্শন করেছে কিনা সে বিষয়ে সবাই রাণীর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। মৌমাছির এ শিক্ষা আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মৌমাছির বাসায় মধু সংরক্ষণ প্রকোষ্ঠ
মধুতে দু'রকম শর্করা পাওয়া যায়। গ্লুকোজ এবং ফ্রুক্টোজ। এ দু'টি উপাদান মধুর প্রধান উপকরণ। এতে সামান্য পরিমাণে সুক্রোজ ও মল্টোজ রয়েছে।
মধুতে কার্বোহাইড্রেট ৭৯.৫%, প্রোটিন ০.৩%, আয়রন-০.৭% হারে বিদ্যমান। ডাক্তারী ভাষায় মধুকে বলা হয় ডিটারজেন্ট টু আলসার। মেডিসিন হিসেবে মধু ব্যাকটেরিয়ার এক নম্বর শত্রু। অর্থাৎ এটি অ্যান্টিবায়োটিকের মত কাজ করে। ওরাল ডিহাইড্রেশনে মধুকে চিনির পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়। যা ডায়রিয়া প্রতিকারে বিশেষ কার্যকর। কণ্ঠস্বর সবল করার জন্য মধুর শরবত অত্যন্ত উপকারী। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে, মধু রোগজীবাণু খুব কার্যকর ভাবে ধ্বংস করে।
وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِى مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا وَمِنَ الشَّجَرِ وَمِمَّا يَعْرِشُونَ . ثُمَّ كُلِى مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكِ ذُلُلًا يَخْرُجُ مِنْ بُطُونِهَا شَرَابٌ مُخْتَلِفُ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءُ لِلنَّاسِ، إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
And your Lord inspired the bees, saying: "Take your habitations in the hills, and on the trees and in what they erect. Then eat of all the fruits and follow the paths of your Lord made tractable for you; there issues forth from their bellies, a drink of varying colours, wherein is healing for men; Verily in this is indeed a sign for people who thought.
আপনার প্রভু মধুমক্ষিকাকে এ মর্মে ওহী করেছেন, তোমরা গাছের ডালে, পাহাড়ে এবং ঘরবাড়ীর ছাদে বাসা (মৌচাক) নির্মাণ কর। অতপর সর্বপ্রকার ফল থেকে ভক্ষণ কর এবং আপন প্রভুর পথে চল যা অতি সরল। তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙ্গের পানীয় (মধু) নির্গত হয়। তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নির্দেশনা। (নাহল-৬৮-৬৯)
References: 1. The Holy Quran; Abdullah Yusuf Ali 2. Scientific Indications in the Holy Quran; 2nd Edn. M. Shamsher Ali & others: Islamic Foundation Bangladesh. 3. Science Encyclopedia; first published Nov, 99 Bangla Academy; Dhaka. 4. Text Books of Botany for Colleges. 5. The Birds, Time-Life International, Nederland, R.T. Peterson.
📄 ক্লোরোফিল
বৃষ্টির সহায়ক কার্যকারিতা গাছপালা জন্মানোর ক্ষেত্রে অবদান রাখে। আরবী 'নাবাত' শব্দের সাধারণ অর্থ গাছপালা। এ গাছপালার আওতায় পড়ে সকল ধরনের বৃক্ষরাজি। এসব বৃক্ষরাজির সবুজ রং ও ক্লোরোফিল তাদের খাদ্য কার্বোহাইড্রেট তৈরীর কাজে সাহায্য করে।
ক্লোরোফিল
ক্লোরোফিল গাঢ় সবুজ বর্ণের আলোকগ্রাহী রঞ্জক যা সালোক সংশ্লেষণে আলোক শক্তি গ্রহণ করে। উদ্ভিদ ও সবুজ ফসলে বিদ্যমান ক্লোরোফিল অণু সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় শর্করা তৈরীর সময় প্রথমত এরা সূর্যের আলো শোষণকারী অ্যান্টেনা হিসেবে কাজ করে। দ্বিতীয়ত "রেজোন্যান্স ট্রান্সফার" প্রক্রিয়া দ্বারা সংগৃহীত শক্তি ক্লোরোফিলের এক অণু থেকে অন্য অণুতে স্থানান্তর করে এবং সর্বশেষে এ ক্লোরোফিল অণু এনজাইমের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় রাসায়নিক জারণ ক্রিয়া সম্পাদন করে। অর্থাৎ উচ্চ বিভব সম্পন্ন একটি ইলেকট্রন ক্লোরোফিল অণু থেকে উত্থিত হয়; এই ইলেকট্রন তখন রাসায়নিক কাজ করতে পারে অর্থাৎ অন্য যৌগকে বিজারিত করে। এভাবে আলোক শক্তি রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং এর রূপান্তর খুবই বিস্ময়কর। সুমহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর একমাত্র রূপকার, যিনি বৃক্ষরাজি ও ফসলে ক্লোরোফিল অণু সৃষ্টি করে দিয়ে তাঁর রহমতের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।
ক্লোরোফিলের গঠন
চিত্রে ক্লোরোফিলের গঠন প্রদর্শন করা হলো। এর বৈশিষ্ট্য হলো যে এটি একটি সাইক্লোপেন্টানোন বলয় (V) এর সঙ্গে ডাইহাইড্রোপোরফাইরিনের ম্যাগনেসিয়াম কিলেট (chelate) ও ফাইটোলের সঙ্গে এস্টারকৃত। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট অ্যালিসাইক্লিক বলয় V এর নবম অবস্থানে একটি কিটো (C=O) ধারণ করে যা ক্লোরোফিলের অনন্য বৈশিষ্ট্য।
বৃক্ষরাজির মধ্যে এমন কিছু গাছ আছে যাদের ক্লোরোফিল নেই। সেজন্য তারা কার্বোহাইড্রেট উৎপন্ন করতে পারে না। তারা তাদের জীবন ধারণের জন্য মৃত এবং ক্ষয়িষ্ণু জৈব পদার্থের উপর নির্ভরশীল থাকে বা পঙ্গপালের মতো জীবন্ত জীবকোষের উপর বসে তার রস চুষে নিয়ে বেঁচে থাকে। এসব অসবুজ গাছপালার বৃদ্ধিও নির্ভর করে আর্দ্রতার উপর। যে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায় বৃষ্টিপাতের কারণে।
📄 ঘন সন্নিবেশিত শস্যকণা
এ আয়াতে যেসব ফল ও শস্যকণা উদাহরণ স্বরূপ পেশ করা হয়েছে তা নিম্নে সংক্ষেপে বর্ণনা দেয়া হলো,
ঘন সন্নিবেশিত শস্যকণা (Clustered grains)
শস্যকণার চারা বা খাদ্যশস্য ঘাসের গোত্রভুক্ত (Grass family)। এগুলো মানুষ ও গৃহপালিত পশু-পাখিদের শাক জাতীয় খাদ্য শস্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এসব খাদ্যে মিশে আছে স্টার্চ (starch), প্রোটিন, কিছু খনিজদ্রব্য এবং বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন। খাদ্য শস্যের শ্রেণী বিভাগের মধ্যে পড়ে অসংখ্য রকমের খাদ্যশস্য। পৃথিবীর প্রধান খাদ্য শস্যগুলো হলো- ধান (paddy), গম (wheat), বার্লি (barley), জেয়ার/ভুট্টা (millet), যব (maize) এবং রাই (rye)। এগুলো সব একবীজ পত্রী শস্য দানা। দ্বিবীজ পত্রী বা যুগ্ম শস্য দানা হলো, শিম, মটর, শুটি, ডাল ইত্যাদি।
এসব খাদ্যের মধ্যে গম ও যব ইসলামের প্রাথমিক যুগে আরবদের কাছে পরিচিত ছিল। এগুলো শস্য ঘন সন্নিবিষ্ট। অর্থাৎ এদের মঞ্জুরিতে থাকে দুই সারি দানার ঠাসা বুননি। এ আয়াতে খাদ্য শস্যের যে ঘন সন্নিবিষ্ট ঠাসা-বুননির কথা তুলে ধরা হয়েছে তা খুবই সঙ্গত। কারণ খাদ্য শস্যের শিষে সাজানো থাকে খাদ্য দানার সঘন সমাহার।
📄 খেজুর, আঙ্গুর, যাইতুন, আনার, পাকা ফল
খেজুর (Dates):
আরব ভূ-খন্ডে খেজুর বৃক্ষের চাষ অতি প্রাচীন ঘটনা। বলতে গেলে হযরত আদম (আঃ) এর আবির্ভাবের পরেই খেজুর ফলের বাগান গড়ে ওঠে। আর পার্থিব জমিতে সর্ব প্রথম কৃষি কাজ শুরু করেন পৃথিবীর প্রথম মানব আদম (আঃ)। খেজুর বাগান সমূহ এমন সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে থাকে যেগুলো দেখলে মনে হব যেন ধূসর মরুতে সবুজের আনন্দ সম্মিলন। বৃক্ষগুলিতে যখন ফল ধরে তা নীচের দিকে ঝুলে পড়ে এবং খেজুর ফল শর্করা, ক্যালসিয়াম আর ভিটামিন A1, B1, B2 তে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ভেজা খেজুরে শর্করা থাকে ৬০% এবং শুকনা খেজুরে শর্করার পরিমাণ ৭০%। প্রাচীন আমলে খেজুরই ছিল আরব, পারস্য এবং উত্তর আফ্রিকার অধিবাসীদের প্রদান খাদ্য। মুহাম্মদ (সঃ) এর যুগেও খেজুর ছিল প্রধান খাদ্য (Staple food)।
আঙ্গুর (Grapes):
প্রায় ৬৫০০ বছর পূর্বে আঙ্গুরের চাষ শুরু হয় প্রাচীন মিশরে। অতপর এর চাষ ছড়িয়ে পড়ে আরব ভূ-খন্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে, পারস্যে (ইরান) এবং এশিয়া ও ইউরোপে। সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় এর চাহিদা এবং বারতার বেড়েই চলেছে। আঙ্গুর ফলের চাষের ঐতিহ্য অতি প্রাচীন হলেও বর্তমানে জিন প্রযুক্তির মাধ্যমে এর উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাংলাদেশেও এখন প্রচুর পরিমাণে আঙ্গুর ফল উৎপন্ন হয়। অতি সুস্বাদু ফল হিসাবে আঙ্গুর সর্বসাধারণের কাছে অতি প্রিয় ফল। মানব দেহের পুষ্টি সাধনের প্রয়োজনীয় উপাদান যথা-আয়রন, কার্বোহাইড্রেট, সাইট্রিক এসিড, ভিটামিন A,B প্রচুর পরিমাণে এতে রয়েছে।
যাইতুন (olives):
মানব সভ্যতার উন্নয়ন মানুষের ইতিহাসের সাথে যাইতুন বৃক্ষ ও যাইতুন ফল নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। যাইতুনের চেয়ে অতি প্রাচীন ঐতিহাসিক বৃক্ষ দ্বিতীয়টি নেই। সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে এটি শান্তি, সমৃদ্ধি, সৌন্দর্য ও শক্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এটি শুধু খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়না। এর তৈল ব্যবহৃত হয় নানা কাজে। যেমন, ঔষধ তৈরীতে, কসমেটিক প্রস্তুত করার জন্য, মেশিনারী এবং সাবান প্রস্তুত কার্যে। যাইতুন বৃক্ষ প্রায় এক হাজার বৎসর বাঁচে। আল্লাহ তা'আলা কোরআনে যাইতুনের শপথ করেছেন এর উপকারিতা ও ঐতিহ্য উপলব্ধি করার জন্য।
আনার (Pomegranates):
আনার ফলের চাষ শুরু হয়েছিল সর্বপ্রথম মিশর এবং মেসোপটেমিয়ায়। হযরত সোলায়মান (আঃ) সেই যুগে আনারের একটি বিরাট বাগান গড়ে তোলেছিলেন বলে জানা যায়। এ ফলটির গঠন প্রকৃতি অত্যন্ত নৈপুণ্যমন্ডিত। উপরে মোটা শক্ত আবরণ আর ভেতরে থাকে গুটি গুটি দানা। দানাগুলো গুচ্ছাকারে বিভিন্ন চেম্বারে বিভক্ত থাকে। অত্যন্ত পুষ্টিকর ফল, যার মধ্যে রয়েছে প্রচুর আয়রন, ভিটামিন, মিনারেল সল্ট, শর্করা ইত্যাদি।
পাকা ফল (Ripe fruits):
পাকা ফলের মধ্যে যে আকর্ষণীয় রঙের সমাহার দেখা যায় তা নির্ভর করে বিভিন্ন গাছের রঙের উপর কিংবা গাছের প্রাণরসবাহী কোষে যে রঙের উপাদান আছে তার আনুপাতিক উপস্থিতির উপর। ক্লোরোফিল (Chlorophyll) হচ্ছে মূল রং যা তার সবুজ রংকে বৃক্ষের পাতা ও ফলের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। এ সবুজ রং ফলের প্রাথমিক গ্রুপ হিসেবে বিবেচিত। রঙের দ্বিতীয় গ্রুপটির ৬০টির মত গঠন বস্তুর মধ্যে পাওয়া যায়। এদের রঙের ব্যাপ্তি হচ্ছে কমলা হলুদ থেকে টমেটো রাঙা লাল পর্যন্ত সীমিত। রঙের তৃতীয় পরিবারটি এ্যান্থোসাইয়ানীন (Anthocyanin) রং থেকে উদ্ভূত। মৃদু গোলাপী আস্তরণের ব্যাপ্তি থেকে রক্তিম গোলাপী রঙ পর্যন্ত বিস্তৃত। এ্যান্থোসাইয়ানীন নিয়ন্ত্রিত হয় কোষের অম্লত্বের সাহায্যে। সকল পাকা ফলের গায়ে যে লাল রং ফুটে ওঠে তা এ্যান্থোসাইয়ানীন অম্লত্বের মাধ্যমে প্রকাশ পায় এবং এ ইঙ্গিত দেয় যে এ ফল এখন খাবার পক্ষে উপযোগী। তখন পাখি, অন্যান্য প্রাণী ও মানুষ ফল খেয়ে ফলের বীজ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে বৃক্ষের বিস্তার ঘটে।
কোরআনের আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা কয়েকটি মূল্যবান বৃক্ষের নাম উল্লেখ করেছেন তাঁর অসীম রহমতের প্রতীক হিসেবে। এরূপ হাজার হাজার ফলের বৃক্ষ গোটা প্রকৃতি জুড়ে রয়েছে যা গুনে শেষ করা যাবে না।
তবে উদ্ভিদ জগত অতিশয় বিশাল। এর প্রজাতি সংখ্যা প্রায় ৩,৫০,০০০ (তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার)। এ প্রজাতিগুলোকে বিস্তৃতভাবে শ্রেণী বিন্যাস করা হয়ে থাকে। এর একটি শ্রেণী হলো সপুষ্পক গাছপালা। আর অন্য শ্রেণী ভুক্ত গাছপালাগুলো হলো অপুষ্পক। অপুষ্পক বৃক্ষরাজির ফুল হয় না। এদের বংশবৃদ্ধি ঘটে অন্যান্য বিবিধ পন্থায়। পরাগায়ন পদ্ধতিতে নয়।
وَايَةٌ لَّهُمُ الْأَرْضُ الْمَيْتَةُ أَحْيَيْنَهَا وَأَخْرَجْنَا مِنْهَا حَبًّا فَمِنْهُ يَأْكُلُونَ.
A Sign for them is the dead land. We give it life and produce grains therefrom so that they eat thereof.
তাদের জন্য একটি সংকেত হলো নিষ্প্রাণ জমি, আমরা উহাকে সজীব করি এবং তাতে শস্য উৎপন্ন করি। যেন তারা ঐগুলো ভক্ষণ করতে পারে। (ইয়াসিন-৩৩)
وَنَزَّلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً مُبَارَكًا فَأَنْبَتْنَا بِهِ جَنَّاتٍ وَحَبَّ الْحَصِيدِ.
And We send down from the sky rain which is full of blessings and We produce therewith gardens and grains for harvest.
আর আমরা আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করি যা অতি বরকতময়, অতপর তা দিয়ে বাগান রচি এবং তোলার জন্য খাদ্য শস্য উৎপন্ন করি। (ক্বাফ-৯)
وَالْأَرْضَ مَدَدْنَهَا وَأَلْقَيْنَا فِيهَا رَوَاسِيَ وَأَنْبَتْنَا فِيهَا مِنْ كُلِّ شَيْءٍ مَوْزُونِ وَجَعَلْنَا فِيهَا مَعَايِشَ وَمَنْ لَسْتُمْ لَهُ بِرَازِقِينَ.
And the earth We have spread out and have set thereon mountains firm and immovable and produced therein all kinds of things in due propotion. And We have provided for you therein means of living and also for those for whose (moving creatures, cattle, beasts and other animals) sustenance you are not responsible.
আমরা ভূ-পৃষ্ঠকে বিস্তৃত করেছি এবং তার উপর সুদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং তাতে প্রত্যেক বস্তু আনুপাতিক হারে উৎপন্ন করেছি। আমরা তোমাদের জন্য জীবিকার উপকরণ সৃষ্টি করেছি এবং তাদের জন্যও (কীট-পতঙ্গ, গবাদি পশু, বন্য প্রাণী ও অন্যান্য প্রাণী) যাদের প্রতি তোমাদের কোন দায়িত্ব নেই। (হিজর-১৯-২০)
يأَيُّهَا النَّاسُ اذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ.
O Mankind! remember the favours of Allah towards you. Is there any creator other than Allah who provides for you from the sky and the earth?
হে মানবজাতি! আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর। আল্লাহ ভিন্ন এমন কোন স্রষ্টা আছে, যে আকাশ ও জমিন থেকে তোমাদের রিজিক সরবরাহ করতে পারে? (ফাতির-৩)
এখানে আকাশ ও জমিন থেকে রিজিক দেওয়ার অর্থ হচ্ছে বৃক্ষ এবং ফসল বায়ুমণ্ডল আর জমিন থেকে পুষ্টি গ্রহণের মাধ্যমে খাদ্য উৎপন্ন করে। অনন্তর মানুষ এ খাদ্য খেয়ে জীবন রক্ষা করে। অধিকন্তু রিজিক শব্দের অর্থ জীবন ও জড় জগতের "তাবৎ চাহিদা" যা সরবরাহ করে থাকেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন।