📄 এইট্স
এইডস (AIDS)
AIDS শব্দটির পুরো নাম Acquired immune deficiency syndrome। এ রোগের একটি সংজ্ঞা দিয়েছে CDC (Center for Disease Control, Atlanta) এবং সংজ্ঞাটি WHO (World Health Organization) অনুমোদন করেছে,
"A reliably diagnosed disease that is at least moderately indicative of an underlying cellular immune deficiency but which has had no known underlying cause of the cellular immune deficiency nor any other cause of reduced resistance reported to be associated with that disease" (অর্থাৎ এইডস নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত একটি কোষীয় রোগ, যা রোগমুক্তির অসম্ভবতার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এ রোগের জটিলতার কারণ কী তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। এ রোগের দরুন দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা কেন হ্রাস পায় তাও নির্ণিত হয়নি)
এটা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, এইডস একটি ভাইরাসঘটিত রোগ। ভাইরাস হচ্ছে রোগ ঘটাতে সক্ষম এক প্রকার ক্ষুদ্রজীব (organism)। এরা ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও ক্ষুদ্র এবং সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারা দেখা যায় না। ভাইরাস শুধু কোনো প্রাণীর জীবন্ত কোষে বংশ বিস্তার করতে পারে। একবার কোষের ভেতরে ঢুকতে পারলে সে কোষটিকে মেরে ফেলে অথবা নিষ্ক্রিয়ভাবে সেখানে লুকিয়ে থাকে বেশ কিছুদিন। পরবর্তীতে নিজের সুবিধামতো সময়ে যখন সংশ্লিষ্ট দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে তখন তাকে আক্রমণ করে।
১৯৮১ সালে সর্বপ্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এইডস রোগ ধরা পড়ে। ডাঃ Mc Gottlieb সমকামী (homosexual) কিছু রোগীর দেহে কতগুলি জটিল লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করেন। ১৯৭৯ সালেও এ ধরনের কিছু রোগী তার হাতে পড়েছিল এবং খুব দ্রুত তাদের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর ব্যাপক পরীক্ষার মাধ্যমে এ রোগ নির্ণয় করা সক্ষম হয়। ১৯৭০ সালে আফ্রিকার ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে এ রোগে বহুসংখ্যক লোক মারা যায়। তখন অজ্ঞাত রোগের কারণে মানুষ মারা যাচ্ছে মর্মে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর থেকেই চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এ রোগের পরিচয় জানার জন্য গবেষণা শুরু করেন।
এইডস রোগ সৃষ্টি করে যে ভাইরাস তার নাম HIV (Human Immunodeficiency Virus)। এ ভাইরাসটি মানবদেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থার টি-হেলপার (T-Helper) কোষে প্রবেশ করে এবং তার ভেতরের জেনেটিক পদার্থকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে ফেলে।
দেহের সকল জৈব তরলের মধ্যে T-Helper কোষ আছে। রক্ত, Sperm, Ovum ইত্যাদির মধ্যে এর ঘনত্ব বেশি। HIV ভাইরাস যার শরীরে আছে সে এর বাহক কিন্তু সে জানে না যে তার HIV রয়েছে। কারণ তার দেহে রোগটির কোনো লক্ষণ দেখা যাবে না। এভাবে বহু বছর ধরে কেউ নিজের অজান্তেই HIV বহন করতে পারে। অবশেষে যখন ভাইরাসটি তার দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকখানি ধ্বংস করে দেয়। তখন সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তার তখন বলেন, রোগী এইডস রোগে আক্রান্ত।
এইডস রোগ কীভাবে হয় তার কয়েকটি কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন,
১। সমকামী ও বহুকামী পুরুষ (Homosexual and Multisexual men):
রোগীর মধ্যে ৯০-৯৫% লোকই পুরুষ এবং এদের মধ্যে ৯০% সমকামী কিংবা দ্বি-যৌনচারী। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যে সমকামী পুরুষের সংখ্যা যথাক্রমে ১২ মিলিয়ন ও ৯.৫ মিলিয়ন। এখন এ দেশগুলিতে এইডস রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রায় ৯০% সমকামী পুরুষের বয়সসীমা ২০-৪০ বছরের মধ্যে এবং এসব সমকামী পুরুষ আমেরিকার সকল জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। সমকামী লোকেরা পারস্পরিক যৌনাচারের সময় সংক্রমিত শুক্র (infected semen) বা রক্তের মাধ্যমে এইডস রোগে আক্রান্ত হয়। এইডস রোগে আক্রান্ত রোগীদের অধিক সংখ্যক যৌন সঙ্গী থাকে। এক নিরীক্ষায় দেখা গেছে যে, ৫০% এইডস রোগী ১০ কিংবা তারও বেশি সংখ্যক যৌন সঙ্গীর সঙ্গে এক মাসে মিলিত হয়ে থাকে। সমকামী লোকের শুক্র (semen) বিপরীত শক্তি অর্থাৎ এন্টিজেন (antigen) হিসেবে কাজ করে এবং এটা শুক্র গ্রহীতার শরীরে বিপরীত প্রতিক্রিয়া ঘটায়। এ প্রক্রিয়ার ফলে ঐ গ্রহীতার শরীরের কোষগুলো আক্রান্ত হয়, যাকে T-lymphocytes বলা হয়। এর সার্বিক কার্যকারিতা হলো রোগমুক্তির অবদমন (immunosuppression)।
২। আন্তঃশিরাবাহী মাদক দ্রব্য গ্রহণ (Intravenous I.V. drug):
কোনো কোনো নারী পুরুষ এইডস রোগে আক্রান্ত কিন্তু সমকামী নয়, তাদের মধ্যে প্রায় ৬০% নর নারী আন্তঃশিরাবাহী মাদক দ্রব্য গ্রহণের ফলে আক্রান্ত হয়। একটি প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। আর যারা সমকামী তাদের মধ্যেও বহু লোক I.V. মাদক আসক্তিতে আক্রান্ত। এসব মাদক দ্রব্যের মধ্যে হিরোইন, কোকেন ও কোরেক্স অন্যতম। তবে ড্রাগ মাত্রই immunosuppressive নয়। ইনজেকশনের সুঁচের কারণে এইডস রোগের ভাইরাস হেপাটাইটিস-বি রোগের মতো বিস্তার লাভ করে থাকে। যারা I.V. ড্রাগ ব্যবহার করে তাদের এইডস রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৭৫%।
৩। বহু যৌন সঙ্গী (Heterosexual Partners):
পশ্চিমা দেশগুলোতে বিশেষ করে যৌন মিলনে বাধা নেই এমন দেশগুলোতে একজনের একাধিক যৌন সঙ্গী রয়েছে। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আমেরিকা ও বৃটেনে ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী লোকেরা ১০ জন কিংবা তারও বেশি যৌন সঙ্গীর সঙ্গে এক মাসে মিলিত হয়। এসব সঙ্গীদের সংখ্যাধিক্যের ঊর্ধ্বগতি বছরে অন্তত ১০০০ জনে উন্নীত হয়ে থাকে এবং এদের মধ্যে সমকামী, বহুকামী ও বিপরীতকামীর সংমিশ্রণ রয়েছে। সুতরাং গবেষকগণ খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন, এরূপ অসম-অবাধ যৌন কর্মকাণ্ডই এইডস রোগের উৎসস্থল।
৪। শিশুকালে এইডস রোগ (Childhood AIDS)
এইডস ভাইরাস গর্ভফুলের পথ ধরে মায়ের কাছ থেকে শিশুর মধ্যে এসে পড়ে। আবার স্তনদুগ্ধ সেবনের মাধ্যমে মায়ের কাছ থেকে শিশুর মধ্যে এইডস রোগ স্থানান্তরিত হয়। শতকরা ৭২ ভাগ শিশু এইডস রোগী একজন কিংবা পিতা-মাতা উভয় থেকে এইডস রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। শিশুদের মধ্যে শতকরা ৫০ জনের দেহে এইডস ভাইরাস প্রচ্ছন্ন থাকে। কিন্তু বাকি ৫০ জনের দেহে ঐ রোগ প্রকট অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। সুতরাং এটা খুবই বিপদজনক সংবাদ যে, পিতা-মাতার দেহে (HIV) ভাইরাস যদি থাকে তা সন্তান-সন্ততির মধ্যে স্থানান্তরিত হয়। ফলে একটি নিষ্পাপ শিশু বসুন্ধরা থেকে বিদায় নেয় বিকশিত হওয়ার পূর্বে।
চিকিৎসার দৃশ্যপট (Clinical Picture)
যেসব চিহ্ন ও লক্ষণ এইডস রোগ হয়েছে বলে নির্দেশ দিয়ে থাকে তা নিম্নরূপঃ
১। শারীরিক ও মানসিক কারণ ব্যতিরেকে প্রকট ক্লান্তির উপস্থিতি।
২। সাধারণভাবে অবিচ্ছিন্ন দেহরস বা হরমোন নির্গত হয়। হরমোনের গ্রন্থিসমূহ বেশ বড় আকার ধারণ করে।
৩। দুই মাসের মধ্যে অভাবনীয় দৈহিক ওজনের ঘাটতি ১০ পাউন্ডের চেয়ে অধিক হয়।
৪। কয়েক সপ্তাহ ধরে অবিরাম জ্বর থাকে এবং সাধারণ ডাক্তার কর্তৃক রোগীর পাইরেক্সিয়া (pyrexia) হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। (পাইরেক্সিয়া রোগের উৎস অবশ্য অজানা)
৫। রাত্রিবেলা অত্যধিক ঘামের নির্গমন নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটায়।
৬। মুখ ও কণ্ঠনালীর রোগ এবং ক্রনিক ডায়রিয়া প্রতিভাত হয়।
৭। ক্যাপোসিস সারকোমা (Kaposis sarcoma), লিম্ফোমা (Lymphoma), মুখ গহ্বর ও পয়ঃপথে স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমার (Squamous cell carcinoma) কোষের মতো ক্ষতিকর নিওপ্লাজম (Neoplasm) রোগের উদ্ভব হয়।
৮। নিউমোনিয়া ও তীব্র বক্ষ ব্যাধি যা নিউমোসাইসটিস ক্যারিনির (Pneumocystis Carinii (pcp)) সঙ্গে সম্পর্কিত তা দেখা দিয়ে থাকে।
৯। রোগের লক্ষণসমূহ এ মর্মে নির্দেশ দেয় যে, রোগীর কেন্দ্রীয় নার্ভাস সিস্টেমের মধ্যে কর্ম-অনীহা, মানসিক অবসাদ এবং চিত্ত বিষণ্ণতার উদ্ভব ঘটেছে। রোগ সংক্রমণের সময়কাল সুনির্দিষ্ট নয় এবং এ সময়কালের ব্যাপ্তি ৬ মাস থেকে ৭২ মাস বলে মনে করা হয়।
অতএব, আল্লাহ তাআলা এইডস রোগের ভয়ংকর পরিণতি থেকে আত্মরক্ষার জন্য ৭ম শতাব্দীতে সতর্ক আয়াত অবতীর্ণ করেছেন।
وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ مَا سَبَقَكُمْ بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِّنَ الْعَلَمِينَ . إِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِنْ دُونِ النِّسَاءِ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُونَ.
And Lut said to his people, "Do you commit Lewdness such as no people in creation ever committed before you? For you practise your lusts on men instead of women, you are indeed a people transgressing beyond bounds".
এবং লূত (আঃ) তার সম্প্রদায়কে বললেন, "তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ যা তোমাদের পূর্বে সারা বিশ্বে কেউ করেনি? তোমরা তো কামপ্রবণতা চরিতার্থ করার জন্য পুরুষদের কাছে গমন করছ নারীদের পরিবর্তে। প্রকৃতপক্ষে তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়। (আরাফঃ ৮০-৮১)
আল্লাহর বিশিষ্ট নবী হযরত লূত (আঃ) এর যুগে লোকেরা যখন সমকামিতায় লিপ্ত হলো তখন হযরত লূত (আঃ) তাদেরকে এ নিকৃষ্ট কাজ থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেন। কিন্তু কেউ তাঁর উপদেশ বাণী গ্রহণ করেনি। একদিন আল্লাহর আদেশে হযরত জিব্রাইল (আঃ) এসে মাটিচাপা দিয়ে গোটা সমকামী সম্প্রদায়কে বিদায় করে দেন। এরপর বহুকাল ধরে পৃথিবীবাসীরা এইডস রোগমুক্ত ছিল।
বর্তমানে আমেরিকা এবং পশ্চিমা দেশগুলো সমকামিতাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে সমগ্র বিশ্ব এইডস রোগে জর্জরিত হয়ে পড়েছে।