📄 Metter Transmission
Matter Transmission
পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে প্রোটন ও নিউট্রন কণা, যাদের সম্মিলিতভাবে বলা হয় নিউক্লিয়াস। আর ইলেকট্রন কণা নিউক্লিয়াসকে ঘিরে পাক খায়। যদি কোনোভাবে বাহির থেকে পরমাণুকে পর্যাপ্ত শক্তি জোগানো যায় তাহলে ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের আকর্ষণ থেকে মুক্ত হয়ে পড়তে পারে। যদি কাছাকাছি কোনো শক্তিশালী পজিটিভ কণা রাখা হয় তখন নেগেটিভ ইলেকট্রন সেদিকে ধাবিত হয়। এমনি করে সৃষ্টি হয় ইলেকট্রন প্রবাহ যা বিদ্যুৎ প্রবাহের নামান্তর। অর্থাৎ বিদ্যুৎ প্রবাহ মানেই হলো ইলেকট্রনের প্রবাহ।
পরমাণুর প্রবাহমান প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক। তাই "Einstein পদার্থকে রূপান্তরিত ধারায় বিশ্লেষণ করে এ তত্ত্ব দেন, Matter could be converted into power and then transmitted to a long distance and then reassembled to get back the matter"। এ প্রক্রিয়াটির নাম Matter transmission। আর Matter transmission পদ্ধতিতে পদার্থকে ভেঙে পরমাণুতে রূপান্তর করা যায়। তারপর বিদ্যুতে, এরপর বিদ্যুৎ শক্তির মাধ্যমে মানুষের ছবি এবং শব্দকে তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গে (Electromagnetic waves) পরিণত করে দূর-দূরান্তে প্রেরণ করা যায় এবং তা পুনরায় ফিরিয়ে আনা যায় এবং এ Transmission চোখের পলকে ঘটে যায়।
নিউক্লিয়ার সায়েন্স আবিষ্কার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ইসলামের সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর 'মিরাজ' (ঊর্ধ্বলোকে গমন) নিয়ে বিতর্ক ছিল। একটি রক্ত মাংসের মানব শরীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অতিক্রম করে কিভাবে ঊর্ধ্বলোকে গমন করতে পারে— এ নিয়ে ছিল বিতর্ক। বিজ্ঞান এখন এ বিতর্কের দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দিয়ে মিরাজের বাস্তবতা প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, মিরাজে আমার বাহন ছিল 'বোরাক'। নবীজী বোরাক শব্দ উল্লেখ করে মিরাজের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সহজ করে দিয়েছেন। আরবী "বারকু” (برق) শব্দের অর্থ বিদ্যুৎ এবং বারকু এর Superlative degree হচ্ছে বোরাক। অতএব, বোরাক মানে কোনো জানোয়ার নয়, খচ্চর কিংবা ঘোড়াও নয়। যেমনটি কোনো কোনো ক্যালেন্ডারে আমরা দেখি একটি ছবি, যার দেহটা ঘোড়ার এবং চেহারাটা মেয়ে লোকের এবং দু'টি পাখা যুক্ত করা হয়। ছবিটির নিচে লেখা হয়, 'হাজা বোরাকুন নবী (সঃ) (নাউজুবিল্লাহ)। এটি একটি কল্পনা প্রসূত উদ্ভট ধারণা, যা বিশ্বাস করলে ঈমান থাকবে না। সেজন্য জ্ঞান অর্জনের উপর ইসলাম খুব বেশি জোর দিয়েছে যাতে আমরা ঈমান ঠিক রাখতে পারি। সুতরাং আমরা জানলাম 'বারকু' শব্দ থেকে বোরাক শব্দটি এসেছে।
আবার আল-কোরআন মুহাম্মদ (সঃ) কে নূর বা আলো হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন।
قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورُ وَكِتُبُ مُّبِينٌ.
There has come to you from Allah a light and perspicuous book..
(হে মানব জাতি) আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট এসেছে একটি আলো এবং একখানা স্পষ্ট কিতাব। (মায়েদা-১৫)
অতএব, Matter transmission পদ্ধতি, কোরআনের আলোক তত্ত্ব এবং হাদীসের বোরাক তথ্যের নিরিখে মুসলিম বিজ্ঞানীরা মিরাজের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে,
The greatest prophet of Islam Mohammad (s), Almighty Allah might have converted his physical body first into barq (Electricity) and then into noor (light), a noor having a speed much faster than that of our ordinary noor and he (M) appeared in person before his Majesty in a twinkling of an eye.
সর্বময় শক্তিধর আল্লাহ তা'আলা তাঁর শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর শারীরিক অস্তিত্বকে প্রথমে বিদ্যুতে রূপান্তর করেন এবং পরে তা আলোতে প্রবর্তিত করেন।
সাধারণ আলো প্রতি সেকেন্ডে 300,000 km বেগে চলে কিন্তু এ আলোকে Superlative degree করায় এর গতিবেগ ছিল সর্বাধিক এবং চোখের পলকে তিনি (মুহাম্মদ-সঃ) মানব রূপে তার প্রভুর সামনে উপস্থিত হয়ে যান।
হযরত মুছা (আঃ) আল্লাহ পাকের নূরের ঝলক দর্শন করে বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলেন। মুহাম্মদ (সঃ) এর ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। কারণ আল্লাহপাক হচ্ছেন আলোর উৎস আর মুহাম্মদ (সঃ) আলোকিত পাত্র। যেমন সূর্য আলোর উৎস। আর চাঁদ সূর্যের আলো দ্বারা আলোকিত উপগ্রহ। চাঁদ যেমন সূর্যের আলোতে বেহুঁশ হয় না তেমনি আল্লাহ তা'আলার নূরের ঝলকে মুহাম্মদ (সঃ) অজ্ঞান হননি বরং স্বাভাবিক ছিলেন।
এখন, মিরাজের ঘটনা সমূহের উপর কোরআনের আয়াত
سُبْحَنَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَرَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ أَيْتِنَا .
Glory to Him Who did carry His Abed (Mohammad -S:) for a journey by night from the masjid-Al-Haram to the masjid-Al-Aksa, the environs of which We blessed so that We might show him some of our signs.
মহিমান্বিত প্রভু তিনি, যিনি তাঁর নবীকে এক রাতে সফর করিয়েছেন বাইতুল হারাম থেকে বাইতুল আকসা ব্যাপী। যার পরিবেশকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন যেন আল্লাহর নিদর্শন সমূহ তাঁকে প্রদর্শন করা যায়। (বনী ইসরাঈল-১)
وَلَقَدْ رَاهُ نَزْلَةً أُخرى . عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهى . عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَاوَى . إِذْ يَغْشَى السَّدْرَةَ مَا يَغْشَى . مَازَاغَ الْبَصْرُ وَمَا طَغَى . لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَتِ رَبِّهِ الكُبرى.
For indeed he saw him at the second time near the lote-tree, beyond which none may pass, near it is the garden of abode. Behold the Lote-tree was shrouded. His sight never swerved nor did it go wrong. For truly did he see of the signs of his Lord the greatest.
নিশ্চয়ই তিনি (মুহাম্মদ-সঃ) তাঁকে আর একবার দেখেছেন প্রান্তবর্তী বদরী বৃক্ষের নিকট, যার নিকট অবস্থিত জান্নাতুল মাওয়া। বৃক্ষটি যদ্বারা আচ্ছাদিত হবার তদ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি। লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। তিনি তাঁর মহান প্রভুর নিদর্শন সমূহ পরিদর্শন করেছেন। (নাজম-১৩-১৮)
মিরাজে নবীজী হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে দ্বিতীয় বার দেখেন বদরী বৃক্ষের নিকট তার আসল রূপে (Visible form)। প্রথমবার অনুরূপ আকৃতিতে দেখেছিলেন হেরা পর্বতে প্রথম ওহী নাযিলের সময়।
📄 মিরাজ তত্ত্ব এবং Theory of Relativity
মিরাজ তত্ত্ব এবং Theory of Relativity
এ প্রশ্ন যুগ যুগ ধরে মানুষকে আলোড়িত করেছে। এমন কোন জ্ঞানী, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী এবং সাহিত্যিক অবশিষ্ট নেই যাঁরা সময় নিয়ে চিন্তা গবেষণা করেননি। সৃষ্টির সূচনা থেকে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ও সময়ের প্রবাহ শুরু হয়েছে। যা আদি বস্তুপিণ্ডের (Primeval Atom) ভিতরে একীভূত অবস্থায় ছিল। তখন থেকে সময় প্রবাহিত ধারায় বিরাজ করছে। সময়ের প্রবাহমান বৈশিষ্ট্যের দরুন একে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। যেমন, বর্তমান কাল, অতীত কাল এবং ভবিষ্যৎ কাল। কালের এ তিনমাত্রা কিন্তু স্থানীয় সচেতনতায় সীমাবদ্ধ, যা আমাদের জীবন ধারার সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু মহাবিশ্বের অন্য সব স্থানের সাথে এর চরিত্রগত অস্তিত্ব যেমন জটিল তেমনি দুর্বোধ্য।
সময়ের বৈচিত্র্যময় চরিত্র উদঘাটন করতে গিয়ে Albert Einstein বিস্ময়কর সফলতা লাভ করেন এবং একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, যার নাম Theory of Relativity। এ তত্ত্ব অনুযায়ী সময়ের চরম ও পরম (Absolute) কোন অস্তিত্ব নেই। Time is relative in respect of duration.” সময় একটি আপেক্ষিক বিষয় যা স্থানীয় সচেতনতায় বিরাজমান। আমাদের বলয়ে পৃথিবী, চাঁদ, সূর্য প্রভৃতি আকাশী বস্তুর ঘূর্ণন প্রক্রিয়ার মাত্রা থেকে সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা এবং দিন, মাস, বৎসর ইত্যাদি সময়ের এককগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে।
পৃথিবী গ্রহের জন্য সময়ের এসব একক নির্ধারণী ধারণা কোরআন প্রকাশ করেছে এভাবে,
يَسْتَلُونَكَ عَنِ الْأَهِلَّةِ قُلْ هِيَ مَوَاقِيْتُ لِلنَّاسِ
They ask you concerning the moon, say, they are but signs to mark fixed periods of time for men.
(হে, মুহাম্মদ সঃ) ওরা আপনাকে চাঁদের হ্রাস-বৃদ্ধি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে, আপনি জবাব দিন, চাঁদের-হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে সময় নির্দেশের জন্য। (বাকারা-১৮৯)
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللهِ إِثْنَا عَشَرَ شَهْرًا
The number of months in the sight of Allah is twelve (in a year).
আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা-১২ (তাওবা-৩৬)
একই পৃথিবীর অধীনে যখন আমাদের বাংলাদেশে রাত তখন আমেরিকায় দিন। আমাদের যখন রাত দশটা তখন লন্ডনে বিকেল ৪টা। পৃথিবী তার কক্ষপথে একবার ঘুরতে সময় লাগে ২৪ ঘণ্টা। ঐ সময়ে সূর্যের আলো যে অংশে পড়ে সে অংশে দিন জাগে, অপর অংশে রাত নামে। এ রাত-দিনের আবর্তনের মধ্যে ১৪ ঘণ্টায় একদিন নির্ধারিত হয়েছে।
পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে সময় লাগে ৩৬৫ দিন। তাই আমরা ৩৬৫ দিনে বছর ধরি। এতো গেল পৃথিবী গ্রহের আভ্যন্তরীণ সময়ের বিভিন্নতার একটি প্রতিচিত্র।
কিন্তু একই সৌরজগতের অধীনে বুধ (Mercury) গ্রহে ১ বৎসর হয় ৮৮ দিনে। শুক্র (Venus) গ্রহে ২২৫ দিনে বৎসর হয়। মঙ্গল (Mars) গ্রহে ৬৮৭ দিনে এবং বৃহস্পতি (Jupiter) গ্রহে ৪৩৮০ দিনে বৎসর হয়। এসব গ্রহের সেকেন্ড মিনিট, ঘণ্টা, কখনো পৃথিবীর অনুরূপ হবে না কিংবা এক গ্রহের সময়ের একক অন্য গ্রহ থেকে অবশ্যই কম বেশী হবে। অর্থাৎ "A long time in one Planet is no time in another" আবার ছায়াপথ গ্যালাক্সির ১দিন পৃথিবীর হিসাবে ২২০ মিলিয়ন বৎসরের সমান। তাহলে মহাবিশ্বে সময়ের অবধারিত স্থিতির অস্তিত্ব কোথাও নেই। Einstein, 4th dimension theory-তে সময়কে চতুর্থ মাত্রা হিসেবে প্রদর্শন করেছেন। অর্থাৎ কোন বস্তু প্রথম মাত্রা (দৈর্ঘ্য), দ্বিতীয় মাত্রা (বিস্তার) এবং তৃতীয় মাত্রার (ভেদ) সমন্বয়ে অস্তিত্ব প্রাপ্ত হয়। কিন্তু চতুর্থ মাত্রা (সময়) ব্যতিরেকে তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। সেজন্য আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুযায়ী বস্তু যখন আলোর গতিতে চলে সময় তখন স্থির হয়ে পড়ে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, 'মিরাজে আল্লাহর দরবারে আমি ২৭ বৎসর অবস্থান করেছি।' এ কথার উপর অনেকেই তখন বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেনি। কারণ নবীজী মিরাজ থেকে ফিরে আসার পর দেখা গেছে তাঁর বিছানায় তখনো উষ্ণতা বিরাজ করছে এবং ওযুর পানি গড়াগড়ি যাচ্ছে। আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে এ সত্য প্রতিভাত হয়েছে যে সপ্তম আকাশে ঊর্ধ্বে যার দূরত্ব ২০ বিলিয়ন আলোক বৎসর। সেখানকার লক্ষ লক্ষ বৎসর পৃথিবীর জন্য Zero time। কারণ সেখানে অতীত ও ভবিষ্যৎ কালের অস্তিত্ব নেই। আদি-অন্তহীন অঞ্চল জুড়ে একটি মাত্র কাল বিদ্যমান। তা হচ্ছে বর্তমান কাল। তাই সেখান থেকে গ্রহ, উপগ্রহগুলির ঘূর্ণন গতি যেমন প্রত্যক্ষ করা যায় তেমনি পৃথিবীর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকাল অবলোকন করা যায়।
সময়ের আপেক্ষিকতা সম্পর্কে কোরআনের স্পষ্ট ধারণা হচ্ছে,
وَإِنَّ يَوْمًا عِنْدَ رَبِّكَ كَالْفِ سَنَةٍ مِمَّا تَعُدُّونَ.
Verily a day in the sight of your Lord is like a thousand years of your reckoning,
প্রকৃতপক্ষে, মহান প্রভুর দরবারে এক দিন তোমাদের হিসাবে ১০০০ বছরের সমান। (হজ্জ-৪৭)
এখন, ১০০০ বৎসর = ১ দিন
২৭ '' = ২৭ × ২৪ × ৬০ = ৩৮ মিনিট (প্রায়)।
১০০০
আবার আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ.
The angels and the spirit ascend to Him in a Day the measure thereof is (as) fifty thousand years.
ফেরেশতাগণ এবং রূহ আল্লাহপাকের নিকট পৌঁছে একদিনে। এ একদিনের পরিমাপ হলো ৫০,০০০ বছরের সমান। (মাআরিজ-৪)
তাহলে,
৫০০০০ বৎসর = ১ দিন
২৭ '' = ২৭ × ২৪ × ৬০ × ৬০ = ৪৬ সেকেন্ড।
৫০০০০
এখানে একটি বিষয় খুবই পরিষ্কার যে, রূহ বা মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর তাআলার দরবারে পৌঁছতে সময় লেগেছিল মাত্র ৪৬ সেকেন্ড এবং মহান আল্লাহর সৃষ্টি সমূহ পরিদর্শনে নবীজীর যে ২৭ বছর সময় লেগেছিল। পৃথিবীতে ফিরে এসে দেখেন তা ৩৮ মিনিটের সময়।
সময়ের যে হিসাব আমরা তুলে ধরেছি তা বলতে গেলে সংঘটিত ঘটনার আলোকে সঠিক নয়। তাহলে কোন ঘটনা ঠিক কেমন করে আমরা নির্ণয় করতে পারি? কোনটা অতীত কোনটা বর্তমান তা আমরা কিভাবে বুঝি? কোন বস্তুর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো, যে বস্তু আমরা দেখি তার থেকে আলোর বিকিরণ আমাদের চোখে এসে পড়ে। ফলে আমরা বস্তুটিকে স্পষ্টভাবে দেখি। এ আলো আমাদের চোখে এসে পৌঁছতে নিশ্চিত কিছু সময় লাগে। কারণ আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩০০০০০ কিমি। কাজেই যে মুহূর্তে কোন ঘটনা ঘটছে বলে আমরা মনে করি সে-ই মুহূর্তে সেটা ঘটছে তা কিন্তু নয়। তা পূর্বেই ঘটে গেছে। তবে কত পূর্বে ঘটেছে তা নির্ভর করে দূরত্বের উপর। ৩০০০০০ কিমি দূরে ঘটলে সে ঘটনা আমরা দেখব ১ সেকেন্ড পরে। এ হিসেবে ১৮ লক্ষ কিমি দূরে ঘটলে ১ মিনিট পর দেখব। ১০ কোটি ৮০ লক্ষ কিমি দূরে ঘটলে ১ ঘণ্টা পরে দেখব। আমরা আকাশে যে অনেক নক্ষত্র দেখি, এগুলোর মধ্যে কোন কোনটি এত বিস্তর দূরত্বে অবস্থিত যার ফলে তাদের আলো পৃথিবীতে পৌঁছতে লক্ষ লক্ষ বছর কেটে যায়। সে লক্ষ লক্ষ বছরগুলো আমাদের জন্য ভবিষ্যৎ কাল। আর নক্ষত্রদের জন্য বর্তমান কিংবা অতীত কাল। বর্তমানে আমরা যে বিশ্বজগত দেখছি তা কি এখনো বিদ্যমান আছে! এ ক্ষেত্রে আমরা কি বলব।
যেমন, আমরা সকলে অবগত আছি যে, ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে। এ যুদ্ধে যারা সামনে ছিল তারা সকলেই এ যুদ্ধ দেখেছে। অর্থাৎ যুদ্ধের আলোকচিত্র চোখের রেটিনা গ্রহণ করার ফলে তার প্রতিবিম্ব মস্তিষ্ক দ্বারা গঠিত হয়েছে। ফলে তারা সেদিন সবকিছু দেখেছিল। কিন্তু পৃথিবী থেকে কোটি কোটি কিমি দূরে যে গ্রহ আছে তাতে ২৪৩ বছরের ব্যবধানের মধ্যে এখনো আলোকচিত্র হয়ত পৌঁছেনি। কিন্তু যে গ্রহে আলোকচিত্র পৌঁছবে তারা দেখবে যে পলাশীর যুদ্ধ সংগঠিত হচ্ছে। তাহলে ঐ ঘটনাটি আমাদের কাছে বর্তমান অতিক্রম করে অতীত হয়েছে। অথচ অন্য গ্রহের জন্য এখনো ভবিষ্যৎ কাল। তাই সময় একটি আপেক্ষিক ধারণা মাত্র।
অতএব, মহান আল্লাহর সৃষ্ট জগতসমূহ পরিদর্শনে নবীজীর ২৭ বৎসর সময় লেগেছিল। পৃথিবীতে ফিরে এসে দেখলেন তা ৩৮ মিনিট কিংবা ৪৬ সেঃ এর সফর।
বস্তুত সৃষ্টিতে সময়ের চেয়ে কঠিন এবং দুর্বোধ্য বিষয় আর কিছু নেই। অনেক বিজ্ঞানী বলেছেন তাঁরা যদি সময়ের চরিত্রটাকে ভালভাবে বুঝতে পারতেন তাহলে স্রষ্টাকে আরো বেশী উপলব্ধি করতে সক্ষম হতেন। হাদিসের কুদসীতে বর্ণিত আছে "মানুষ কালকে (সময়কে) গালমন্দ করে। অথচ আমি-ই কাল" কাল হিসেবে পরিচয় দেওয়ার কারণ হচ্ছে, আল্লাহর কাছে ভবিষ্যৎ কিংবা অতীত কালের অস্তিত্ব নেই। সবসময় বর্তমান কালের ব্যাপ্তীতে তিনি বিরাজমান এবং সৃষ্টি শুরুতে যখন কিছুই ছিল না, তখন তিনিই কেবল ছিলেন। আর যখন কিছুই থাকবে না তখনও তিনিই থাকবেন, মহা সৃষ্টির বিশাল পরিধি ব্যাপী তিনি বিরাজমান। অর্থাৎ সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কাছে একটি মাত্র কালের অস্তিত্ব আছে, তা হচ্ছে বর্তমান কাল। অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ কাল তাকে স্পর্শ করে না। কেননা তার কাছে রাত-দিন নেয়, সকাল-সন্ধ্যা নেই। 'Big Bang' ঘটনাটি আমাদের জন্য অতীতকাল। আল্লাহ তা'আলার জন্য বর্তমান কাল। কেয়ামত দিবসটি আমাদের জন্য ভবিষ্যৎ কাল কিন্তু আল্লাহর জন্য বর্তমান কাল।
هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ.
He (Allah) is the first and the last, the evident and immanent and He has full knowledge of all things.
তিনি (আল্লাহ) সৃষ্টির প্রথমে ছিলেন এবং সর্বশেষে তিনিই থাকবেন, তিনি দৃশ্যমান এবং অদৃশ্যে বর্তমান। সকল বিষয়ে তিনি পূর্ণ জ্ঞানবান।
📄 মাধ্যাকর্ষণ শক্তি
মহাবিশ্বের যে কোন দু'টি বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। এর নাম মহাকর্ষ। দু'টি বস্তুর মধ্যে একটি যদি পৃথিবী হয় তখন যে আকর্ষণ সৃষ্টি হয় তার নাম মাধ্যাকর্ষণ বা অভিকর্ষ। যেমন, সূর্য ও চন্দ্রের মধ্যে যে আকর্ষণ তা মহাকর্ষ (gravitation) কিন্তু পৃথিবী ও একটি চেয়ারের মধ্যে যে আকর্ষণ তা মাধ্যাকর্ষণ (gravity)। উপরের দিকে কোন বস্তু নিক্ষেপ করলে তা পৃথিবী পৃষ্ঠে ফিরে আসে কেন? এর কারণ হচ্ছে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ঐ বস্তুটিকে পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে টানতে থাকে, যার দরুন তা পৃথিবী পৃষ্ঠে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। এ মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ব্যতীত পৃথিবীর কোন কিছু ব্যালেন্স পজিশনে থাকতে পারবে না।
বিজ্ঞান আবিষ্কারের ইতিহাস থেকে জানা যায় পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বল বা অভিকর্ষ বল সম্পর্কীয় ধারণাটি সর্বপ্রথম উপস্থাপন করেন ৯ম শতাব্দীর মুসলিম বিজ্ঞানী আল-কারাজী। তিনি সে সময়ে তত্ত্ব প্রকাশ করেছিলেন, "The earth attracts everything towards it" অর্থাৎ জীব ও জড় প্রত্যেক বস্তু পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে আকৃষ্ট হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী Isaac Newton বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে উক্ত তত্ত্বটি কনফার্ম করেন এবং গাণিতিক সূত্রের সাহায্যে তা প্রমাণ করেন।
F = G (Mm / d²)
F = মাধ্যাকর্ষণ বল G = ধ্রুবক M = পৃথিবীর ভর m = বস্তুর ভর d = দূরত্ব
অথচ পৃথিবীর অভিকর্ষ বল তত্ত্বটি নিউটন কর্তৃক আবিষ্কৃত তত্ত্ব হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা আল-কারাজীর নাম নিশানা মুছে ফেলেছে। বিজ্ঞান আবিষ্কারের ইতিহাস উল্টে দেওয়ার এ প্রয়াস শুধু বিদ্বেষ প্রসূত সংকীর্ণতা বললে কম বলা হবে বরং এর চেয়ে বেশি কিছু বলা যায়।
মহাগ্রন্থ আল-কোরআন পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে ৭ম শতাব্দীতে,
أَلَمْ نَجْعَلِ الْأَرْضَ كِفَاتًا . أَحْيَاءً وَأَمْوَاتًا
Have We not made the earth to attract for the living and dead?
আমরা কি পৃথিবীকে আকর্ষণকারী বানাইনি, জীবিত ও মৃত (জড়) প্রত্যেক বস্তু ধারণ করার জন্য? (মুরসালাত-২৫-২৬)
এখানে 'মৃত' বলতে বুঝানো হয়েছে প্রাণহীন জড় বস্তুকে। অর্থাৎ প্রাণী এবং প্রাণহীন সকল বস্তুকে পৃথিবী তার কেন্দ্রের দিকে টানে।
সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহ আমাদের পৃথিবী, নির্দিষ্ট কক্ষপথে লাটিমের মত ঘুরে। এর ফলে একটি অন্তর্মুখী শক্তির সৃষ্টি হয়। যার দরুন এর কেন্দ্রে অবস্থিত পরমাণুর আকর্ষণ ক্ষমতা প্রবল হয়ে ওঠে। সে জন্য উর্ধ্বগামী কোন বস্তু অভিকর্ষ শক্তির টানে ভূ-পৃষ্ঠে ফিরে আসে। এরূপ প্রত্যেক গ্রহ এবং উপগ্রহের আলাদা আলাদা মাধ্যাকর্ষণ বল বা অভিকর্ষ বল আছে। সুমহান আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টি কৌশল দ্বারা এ অভিকর্ষ বল সৃষ্টি করে দিয়েছেন যা না হলে পৃথিবীতে অবস্থান করা খুবই কঠিন হতো।
📄 প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে
পাখি আকাশে উড়ে ডানায় ভর করে। শুধু ডানা থাকলে কি আকাশে উড়া যায়? অবশ্যই না। ডানায় থাকতে হবে পালক। একটি পাখির দেহে চার ধরণের পালক থাকে। (১) আচ্ছাদন পালক (contour plume) (২) তুলো পালক (down plume) (৩) সুতো পালক (filo plume) এবং (৪) উড়াল পালক (flight feather)। উড়াল পালক থাকে ডানা ও লেজে। এগুলো লম্বা শক্ত বড় পালক। মূলদেশ ফাঁপা চওড়া থেকে সরু। উড়াল পালক পাখিকে উড়তে সাহায্য করে। পাখি যে কৌশলের মাধ্যমে আকাশে উড়ে তার নাম 'Lift and forward thrust' কৌশল। উড়ার সময় তাকে বায়ুর চাপ সামনের দিক থেকে বাধা প্রদান করে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তাকে ভূ-পৃষ্ঠের দিকে টানে। এমতাবস্থায় পাখি ডানা দোলিয়ে বায়ুর চাপকে বক্ষদেশে কেন্দ্রীভূত করে। সে কেন্দ্রীভূত বায়ুর একটি ভরবেগ থাকে। ভরবেগ সংরক্ষিত থাকার দরুন পাখি বিপরীত দিকে গতিপ্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ Forward thrust সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে নিউটনের তৃতীয় গতি সূত্র সক্রিয় হয়, যার ফলে পাখি শূন্যে উড়বার গতি লাভ করে। আর এটাকে বলা হয় ফ্লাপিং ফ্লাইট। এছাড়া আরো দু'টি উড়ার কৌশল পাখির আয়ত্বে আছে। এটি হচ্ছে Gliding flight। (এ পদ্ধতিতে পাখি ধীর গতিতে উড়তে সক্ষম)। অপরটি হচ্ছে Lifting flight। (Lifting flight কৌশলের মাধ্যমে পাখি ইচ্ছামত উপরে উঠে এবং নীচে নামে।)
অতএব, পাখি আকাশে উড়ার সমগ্র কৌশলের উপর বিজ্ঞানের তিনটি সূত্র কার্যকর, ১। নিউটনের ৩নং গতি সূত্রঃ Every action has equal and opposite reaction. ২। মাধ্যাকর্ষণ বলঃ The earth attracts everything towards it". ৩। বায়ুর চাপঃ প্রতি বর্গইঞ্চি জায়গার উপর বায়ুর চাপ প্রায় ১৫ পাউন্ড। তবে উচ্চতার উপর বায়ুর চাপের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে।
এ তিনটি সূত্রের সমন্বয়ে পাখিকে বিশাল আকাশে উড়ে বেড়ানোর কৌশল যিনি শিক্ষা দিয়েছেন, তিনি সমস্ত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এ জন্য যে যাতে করে তারা Aircraft, spacecraft আবিষ্কার করে নিতে পারে এবং বিস্তীর্ণ মহাশূন্যে উড়ে উড়ে আল্লাহ তা'আলার আশ্চর্যজনক জ্যোতিষ্ক সমূহ অবলোকন করতে পারে।
أَوَلَمْ يَرَوْا إِلَى الطَّيْرِ فَوْقَهُمْ صَفَتٍ وَيَقْبِضْنَ مَا يُمْسِكُهُنَّ إِلَّا الرَّحْمَنُ
Do they not observe the birds above them, spreading out their wings and folding them in? None can hold them up except Rahman (the Most Merciful).
তারা কি তাদের উপরে পাখিদের প্রতি লক্ষ্য করে না? উহারা ডানা বিস্তার করে উড়ে বেড়ায়। আবার ডানা সংকুচিত করেও উড়ে যায়। রহমান ব্যতীত কে আছে এমনি করে শূন্যের উপর রাখতে পারে। (মূলক-১৯)
أَوَلَمْ يَرَوْا إِلَى الطَّيْرِ مُسَخَّرَاتٍ فِي جَوَ السَّمَاءِ مَا يُمْسِكُهُنَّ إِلَّا اللَّهُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَا يُتٍ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
Do they not see the birds obedient in mid-air? None hold them but Allah. Verily in there are clear indications for a people who believe.
তারা কি পাখি গুলোকে দেখে না কেমন অনুগত হয়ে মধ্য আকাশে উড়ে? আল্লাহ ছাড়া কেউ তাদেরকে উড্ডীন করে রাখেনি। বস্তুতঃ বিশ্বস্ত লোকদের জন্য এখানে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। (নাহল-৭৯)
পাখির উড়ার কৌশলগত পদ্ধতি পরীক্ষা করে মানুষের মধ্যে বিমান আবিষ্কারের প্রেরণা সৃষ্টি হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞানীরা বিমান তৈরীতে পূর্ণ সফলতা লাভ করেন। এ সফলতার পেছনে পাখি ছিল নিদর্শনস্বরূপ। বর্তমানে অত্যন্ত ব্যয়বহুল spacecraft তৈরী করে নভোচারীরা গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ভ্রমণ করে চলেছেন।