📄 Human Embryology
Human Embryology
Sperm (n) + ovum(n) = zygote (n+n)
লক্ষ লক্ষ কোষ (cell) দ্বারা গঠিত মানব দেহ সৃষ্টি নৈপুণ্যতায় এক জটিল এবং অসাধারণ সৃষ্টি। একটি বাড়ি গঠনের একক যেমন ইট তেমনি কোষই আমাদের শরীর গঠনের একক। ইটের পর ইট সাজিয়ে যেমন একটি ভবন নির্মাণ করা হয়, তেমনি কোষের পর কোষ বিন্যাসে মানব দেহ গড়ে ওঠে। এসব কোষ কিন্তু বিস্তৃত হয়েছে একটি মাত্র কোষ থেকে। জীবনের শুরুতে একটি পুং প্রজনন কোষ, যার নাম spermatozoon (শুক্রাণু) এবং একটি স্ত্রী প্রজনন কোষ, যার নাম ovum (ডিম্বাণু), উভয় কোষের সমন্বয়ে সর্বপ্রথম যে কোষটি গঠিত হয়, তাকে বলা হয় zygote। দুই জনন কোষের মিলনকে বলা হয় নিষেক (fertilization)। বিভাজনের মাধ্যমে জাইগোট ২টি, ৪টি, ৮টি এভাবে ক্রমান্বয়ে সংখ্যায় বেড়ে চলে এবং মাতৃগর্ভে একটি থলের মত অঙ্গ, যাকে uterus (জরায়ু) বলা হয়, তাতে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। এরই নাম ভ্রূণ (embryo)। এটি মাতৃ গর্ভে কতগুলো স্তর অতিক্রম করে পূর্ণ মানব শিশুতে রূপান্তরিত হতে মোটামুটি ২৮০ দিন সময় নেয়। যে পরিচয় নিয়ে শিশু মাতৃগর্ভ থেকে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে তাকে বলা হয় 'ইনসান' যার শ্রেষ্ঠত্ব সমগ্র সৃষ্টির উপর প্রতিষ্ঠিত।
অতএব, এসব তথ্য আল্লাহ তাআলা আল-কোরআনে স্পষ্ট আয়াত দ্বারা ব্যক্ত করেছেন, যখন বিজ্ঞান আবিষ্কারের কোন আভাস পরিদৃষ্ট হয়নি।
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِّنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ
O mankind! Be dutiful to your Lord Who created you from a single self.
হে মানবজাতি! কর্তব্যনিষ্ঠ হও তোমাদের প্রভুর প্রতি যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একটি মাত্র নাক্স থেকে। (নিসা-১)
আরবী 'নাফস' শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রাণশক্তি, নিউক্লিয়াস, A cause of life, জীবন স্পন্দন, Nature, Own kind। এসব শব্দের অন্তর্নিহিত বিজ্ঞান ভিত্তিক অর্থ হচ্ছে কোষ বা cell. নাক্স এর আরো অনেক অর্থ হতে পারে। যেমন- ব্যক্তিত্ব, মন, রক্ত, মানব, ও আত্মা ইত্যাদি।
يأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْتُكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى.
O people! We created you from a single pair of male and female.
হে মানব সকল! আমরা তোমাদের সৃষ্টি করেছি পিতৃ ও মাতৃ (জনন কোষ) থেকে। (হুজুরাত-১৩)
خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ نُّطْفَةٍ
Allah created man from Nutfah. আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন নুৎফা থেকে। (নাহল-৪)
ثُمَّ جَعَلْنَهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِيْنٍ.
Then We placed him as a Nutfah in a safe custody firmly fixed. অতঃপর নুৎফাকে প্রতিস্থাপন করেছি একটি সুরক্ষিত আধারে যা দৃঢ়ভাবে সংরক্ষিত। (মু'মিনূন-১৩)
আরবী নুৎফা শব্দ দ্বারা sperm বা ovum অথবা sperm/ovum উভয়কে বুঝানো হয়। নুৎফার আরো অনেক অর্থ হতে পারে। যেমন, zygote, seminal fluid, Germinal fluid ইত্যাদি। আর বিজ্ঞানে বর্ণিত uterus কে আল-কোরআন এখানে বলেছে 'কারারিম্ মাকীন' (সুরক্ষিত আধার)। মানুষের দেহ তৈরী হয় যে কোষ (Cell) সাজিয়ে তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জৈব পদার্থ থাকে। ঐসব পদার্থকে সাধারণতঃ দু'ভাগে ভাগ করা হয়। সাইটোপ্লাজম ও তার মধ্যে ভেসে বেড়ানো বিভিন্ন অঙ্গাণু এবং নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসকে বলা যেতে পারে কোষের মস্তিষ্ক। এ নিউক্লিয়াসের মধ্যেই আছে DNA (Deoxyribonucleic Acid) আর ডি এন এ হচ্ছে বংশগতির ধারক আর বাহক। মানুষ যে দেখতে মানুষের মত, ছাগল কিংবা জিরাফের মত নয়। তার কারণ মানুষের DNA ওদের ডি এন এ থেকে আলাদা। সৃষ্টিকুলের প্রতিটি প্রাণীর রয়েছে নিজস্ব পরিচায়ক DNA। আর দু'টি মানুষ যে এক রকম হয় না তারও কারণ হচ্ছে ঐ DNA । যাহোক DNA সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আমরা এ অধ্যায়ের পরবর্তীতে পেশ করেছি।
অতএব, শরীরবৃত্তীয় কাজের তারতম্যের উপর ভিত্তি করে মানব দেহের কোষগুলোকে দু'ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
(১) দেহ কোষ (Somatic cell):- এ ধরনের কোষ দেহ গঠন করে। জনন কাজে অংশ গ্রহণ করে না।
(২) জনন কোষ (reproductive cell):- এরা শুধুমাত্র জনন কাজে অংশ গ্রহণ করে। জনন কোষ আবার দু'রকম। পুং-জনন কোষ বা sperm এবং স্ত্রী জনন কোষ বা ovum।
মাতৃগর্ভে ভ্রূণ সৃষ্টি প্রারম্ভে Sperm, Ovum এর ভিতর প্রবেশ করে নিষেক (fertilization) ঘটায়। এরপর জাইগোট গঠিত হয়। এ তত্ত্বটি সর্ব প্রথম আবিষ্কার করেন দশম শতাব্দীর বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনে সিনা। তাঁর সাড়া জাগানো গ্রন্থ "Al-Kanun Fittib" এ Sperm এর নাম দিয়েছেন 'আজযায়ে মানবিয়াত' এবং Ovum
এর নাম দিয়েছিল ‘বাইযায়ে উনসা।’
অথচ ষোড়শ শতাব্দীর অমুসলিম বিজ্ঞানীরা ভ্রূণ সৃষ্টির উপর বিভিন্ন রকম তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, যা বিষয়টিকে জটিল বিতর্কের দিকে নিয়ে যায়। তখন তাঁরা দুটি ‘Schools of thought’ এ বিভক্ত হয়ে পড়েন। একটি স্কুল মনে করতেন ভ্রূণটা sperm এর মধ্যে ধরা আছে। অন্য স্কুলের বিশ্বাস ছিল ovum থেকে ভ্রূণ সৃষ্টি হয়। ইতালীয়ান এনাটমিষ্ট Malpighi এবং তার সমর্থিত বিজ্ঞানী Hervey, De-Graaf সবাই একই মত প্রকাশ করে বললেন ‘Human embryos are present in the female unit, ova’। সমকালীন আর একদল এনাটমিষ্ট সম্পূর্ণ বিপরীত তত্ত্ব প্রকাশ করে বললেন, “বস্তুতঃ ভ্রূণ অংকুরিত হয় Male unit-sperms থেকে।
অবশেষে বিজ্ঞানীরা ইবনে সিনা কর্তৃক রচিত আল-কানুন ফিত্তিব গ্রন্থটি অধ্যয়ন করে যে চূড়ান্ত তত্ত্ব লাভ করেন তা হচ্ছে “The sperm and the ovum play joint role in the growth of an embryo”.
এরপর ভ্রূণ তত্ত্ববিদ Spallanzani উক্ত তত্ত্বের সত্যতা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন যে Sperm দ্বারা ovum নিষিক্ত হলে Zygote গঠিত হয়। অর্থাৎ sperm ও ovum এর পরস্পর মিলনে ভ্রূণ সৃষ্টি হয়। তাহলে আল-কোরআন সপ্তম শতাব্দীতে উক্ত তত্ত্ব জানিয়ে দিয়েছেন অত্যন্ত স্পষ্ট করে।
إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُّطْفَةٍ أَمْشَاجِ
Verily We created man from admixture of Nutfah (Sperm and ovum).
নিশ্চয়ই আমরা মানুষ সৃষ্টি করেছি সংমিশ্রিত নুৎফা (শুক্রাণু ও ডিম্বাণু) থেকে। (দাহর-২)
একজন ইহুদী ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে মুহাম্মদ (সাঃ), মানুষ কি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে? জবাবে নবীজি বললেন, পুরুষ এবং নারী উভয়ের নুৎফা থেকে মানুষ সৃষ্টি হয়েছে। (মাসনাদে আহমদ)। ভ্রূণ তত্ত্বের ইতিহাস আলোচনা করা হয়েছে পরিশিষ্ট ৪-এ।
জেনিটোফেমোরাল এবং ইলিও ইনগুইনাল
ইসলামের সুমহান পবিত্রতম বিধান হলো একজন পুরুষ ও একজন নারীকে যথাযথ বয়সে বিধিবদ্ধ বন্ধনে আবদ্ধ করে দেয়া। এটাকে বলা হয় বিবাহ বন্ধন। বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীর মিলনের পুরো কাজটি নিয়ন্ত্রণ করে দুইটি Nerves (স্নায়ু)। Nerves দুইটির মধ্যে একটির নাম জেনিটোফেমোরাল (Genitofemoral) এবং অপরটির নাম ইলিও
ইনগুইনাল (Ilioinguinal)। এ স্নায়ু দুইটি পুরুষের পৃষ্ঠদেশ এবং নারীর বক্ষ পিঞ্জর থেকে নির্গত হয়ে জনন তন্ত্রের সাথে মিলিত হয়েছে এবং এরা Germinal fluid স্খলিত হওয়ার ব্যাপারে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। যদি কোন কারণে উক্ত স্নায়ু দুটি প্যারালাইসিস হয়ে যায় তাহলে স্বামী-স্ত্রী যতই স্বাস্থ্যবান কিংবা বীর্যবান যুবক-যুবতী হউক না কেন সঙ্গমে আর কখনো তারা সক্ষম হবে না। এ অবস্থাকে বলা হয় Impotency বা পুরুষত্বহীনতা।
অতএব, এই Nerves দুটির উপর কোরানের তথ্য অত্যন্ত স্পষ্ট।
فَلْيَنْظُرُ الْإِنْسَانُ مِمَّ خُلِقَ - خَلَقَ مِنْ مَاءٍ دَافِقٍ يَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِب.
So, let man think from what he is created! He is created from a gushing fluid that comes from in between the loins and the ribs.
সুতরাং মানুষ চিন্তা করে দেখুক সে কি বস্তু দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে। পৃষ্ঠদেশ থেকে আর বক্ষপিঞ্জর থেকে সবেগ নিঃসৃত তরল পদার্থ দ্বারা মানুষ সৃষ্টি হয়েছে। (তারিক-৫-৭)
আরবী 'মাআ' শব্দ দ্বারা যেমন পানিকে বুঝানো হয় তেমনি তরল পদার্থকেও বুঝানো হয়। অধিকন্তু পানির রাসায়নিক সংকেত H₂O। অর্থাৎ হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের মিশ্রন। নুৎফার মধ্যে ৮০% পানি থাকে। আয়াতে বলা হয়েছে Germinal fluid বা তরল বীর্য সবেগে নিঃসৃত হয় পৃষ্ঠদেশ (সালব) থেকে এবং বক্ষ পিঞ্জর (তারায়িব) থেকে। এনাটমী অনুযায়ী Germinal fluid বের হয় যথাক্রমে শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয় থেকে। আসল ব্যাপার হলো, জেনিটোফেমোরাল এবং ইলিও ইনগুইনাল স্নায়ু দুটি যখন প্রচন্ড প্রভাব সৃষ্টি করে তখন ঝাঁকুনী খেয়ে শুক্রাশয় (Testis) ও ডিম্বাশয় (ovary) থেকে তরল বীর্য সবেগে বেরিয়ে আসে। এ ব্যাপারটিই বুঝানো হয়েছে।
Menstruation -ঋতুস্রাব
প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলাদের জরায়ু (uterus) থেকে প্রতিমাসে ৫-৭ দিন ধরে যে রক্তক্ষরণ হয় তার নাম মাসিক বা ঋতুস্রাব (Menstruation)। গর্ভবতী না হওয়া পর্যন্ত মহিলাদের এ ধরনের রক্তক্ষরণ বা ঋতুস্রাব প্রতি মাসে ঘটে থাকে। যদিও এটা দেহতাত্ত্বিক ঘটনা (Physiological phenomenon)। আল কোরআন এটাকে Hurt and pollution বলেছে যার পেছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তি রয়েছে।
একজন ব্রিটিশ মহিলা ডাক্তার, ক্যাথারিন ডালটন ১৯৫৯-১৯৬১ সন সময়কাল ধরে হাসপাতালে, রেস্তোরায় এবং জেলখানায় কাজ করে এমন বালিকাদের মাসিক রক্তক্ষরণ কার্যকারিতার উপর গবেষণা চালিয়েছিলেন। তিনি এ গবেষণায় যেসব তথ্য উপস্থাপিত করেছিলেন সেগুলি হলো মাসিক শুরু হওয়ার ঠিক আগে কিংবা মাসিক চলাকালে বালিকাদের কর্মদক্ষতা কিংবা দৈহিক উপযুক্ততা অনেকখানি কমে যায়। ডাঃ ক্যাথারিন আরও উল্লেখ করেছেন যে, এ সময়ে অবসন্নতা, অমনোযোগিতা এবং দৈনন্দিন কাজ-কর্মের প্রতি অনীহা ২৬%-৩৬% বৃদ্ধি পায়। তিনি আরো লিখেছেন যে, ৬ষ্ঠ গ্রেডের ছাত্রীদের মধ্য থেকে ১১ জনকে Class Captain বানানো হয় যাদের বয়সসীমা ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। এসব ক্লাস ক্যাপ্টেনদের ক্ষমতা দেওয়া হয় ক্লাসে দুষ্ট ছাত্রীদের শাসন করার জন্য। এটা বেশ মজার ব্যাপার যে, এসব শ্রেণী সরদাররা নিজেদের ঋতুস্রাবকালে তাদের অধীনস্ত ছাত্রীদের উপর শাস্তি প্রয়োগের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আবার মাসিক বন্ধ হয়ে গেলে স্বাভাবিক স্বভাবে ফিরে আসে। সুতরাং ডাঃ ক্যাথারিন ডালটনের গবেষণা থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, ঋতুস্রাব শরীর ও মনের উপর ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
বিখ্যাত স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ Wilfrid Shaw বলেছেন, "A feeling of uneasiness during normal menstruation, especially in the lower abdomen is quite common. Some girls get severe pain during the first period and in some, pain may last throughout life during each menstruation."
According to Dr. Joan Graham, "Since there is chance of spreading disease and getting infection during menstruation, it cannot be regarded as absolutely normal and physiological".
চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এ তথ্য প্রমাণ করেছেন যে, ঋতুস্রাব কালে স্বামী-স্ত্রীর যৌন মিলন উভয়ের স্বাস্থ্যের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি রোগ জীবাণু সংক্রমণের সম্ভাবনা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কারণ এ সময় জরায়ুর মুখ খোলা থাকে। যার ফলে বাইরে থেকে রোগ জীবাণুর দ্বারা সংক্রমণের বিশেষ অবকাশ থাকে যদি এ সময় যৌন মিলন ঘটে। জরায়ুর দু'পার্শ্বে দু'টি ফ্যালোপিয়ান নামক টিউব থাকে। যাদের মাধ্যমে জরায়ু সরাসরি
তলপেটের গহ্বরের সঙ্গে সংযুক্ত। এ সংযুক্তির কারণে সংক্রমণ-বিস্তৃতি খুবই বিপদজনক। অধিকন্তু নারীর যৌন নালীতে যদি গণোরিয়া ও সিফিলিসের মত রোগের সংক্রমণ থাকে তবে ঐ সংক্রমণ দ্রুত ভেতরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমণ এভাবে ছড়িয়ে পড়ার কারণে Endometritis, Salpingitis, peritonitis এবং এমনকি pelvic cellulitis রোগ স্ত্রীদেহে সংক্রমিত হয়।
একথা সবাই স্বীকার করবেন যে, স্বামী-স্ত্রীর যৌন মিলন একটি আবেগ তাড়িত উত্তেজনাপূর্ণ ব্যাপার। এ কারণে মাসিক কালে যৌন মিলন ঘটলে স্বাস্থ্যসম্মত বিধি-নিষেধ নিয়ন্ত্রণ সীমার মধ্যে থাকে না। তাই জরায়ুর মুখ যেহেতু খোলা থাকে তখন স্ত্রীর অংশীদার স্বামীর শরীরে রোগ সংক্রমণের অবকাশ থাকে। এটা খুবই সত্য।
ডাঃ গ্রাহামের মতে, "ঋতুকালে স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার বিষয়টি মনস্তাত্ত্বিক নয় বরং স্বাস্থ্যগত।"
সুতরাং বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ঋতুস্রাব এক ধরনের অসুস্থতা এবং অপবিত্রতা। তাই এ সময় স্বামী-স্ত্রী দৈহিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা খুবই সঙ্গত যা মহান কোরআন ১৪০০ বছর পূর্বে আমাদেরকে তথা মানব জাতিকে সতর্ক উপদেশ দিয়েছে।
يَسْتَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ ۖ قُلْ هُوَ أَذًا فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ
They ask you (O Mohammad (সাঃ):) concerning menstruation, say, it is hurt and pollution. So keep away from women during menstruation and go not unto them till they are cleansed. And when they have purified themselves, then go in unto them as Allah has enjoined upon you. Truly Allah loves those who turn unto Him and loves those who care for cleanness.
লোকেরা আপনাকে (হে মুহাম্মদ সাঃ) জিজ্ঞেস করে মহিলাদের ঋতুস্রাব সম্পর্কে। আপনি বলুন, এটা তো এক রকম অসুস্থতা ও অপবিত্রতা। সুতরাং এ সময় স্ত্রীদের কাছ থেকে পৃথক অবস্থানে থাক এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হইও না। যখন তারা পবিত্র হয়ে যাবে তখন আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক তাদের সান্নিধ্য উপভোগ কর। সত্য সত্যই আল্লাহপাক তাদের ভালবাসেন যারা তার আদেশের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। আর ভালবাসেন তাদের যারা শুচিতা সম্পর্কে যত্নবান। (বাকারা-২২২)
Yusuf Ali আরবী (আযান) শব্দের অনুবাদ করেছেন 'Hurt and pollution'। এ শব্দের আরও একটি অর্থ হলো impurity বা অপবিত্রতা। উভয় অর্থই এ আয়াতে প্রয়োগ করা হয়েছে।
সুতরাং ঋতুস্রাব কালে আল্লাহ তাআলা স্ত্রী মিলন নিষিদ্ধ করেছেন যা চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা গ্রহণ করেছেন। এছাড়া এ সময়ে স্ত্রী মিলন একজন রুচিসম্পন্ন পুরুষের কাছে
অশুচিমূলক অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়। এটা আল্লাহপাকের নির্দেশ বহির্ভূত কাজ। যারা আল্লাহর এ নির্দেশ অমান্য করে তারা নানারকম অসুখে জর্জরিত হয়ে পড়ে। তাই দাম্পত্য জীবন সুখকর হয় না।
একটি ডিম্বাণুর (ovum) ভেতর একটি শুক্রাণু (sperm) প্রবেশ করে নিষেক ঘটাতে পারলেই ভ্রূণ সৃষ্টি হয়। কিন্তু অনেক সময় দুটি ভ্রূণ সৃষ্টির ফলে দুটি শিশুর জন্ম হয়ে থাকে। এদের বলা হয় যমজ (twin) শিশু। কোন কোন যমজ শিশু দেখতে একই রকম এবং এদের চরিত্রের সমস্ত বৈশিষ্ট্যও একই রকম হয়ে থাকে। এদেরকে বলা হয় মনোজাইগোটিক যমজ (monozygotic twin)। এ যমজরা একটি মাত্র নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে জন্ম নেয়। অর্থাৎ একটি ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার পরে যে প্রথম কোষ বা জাইগোট তৈরি হয় তা ভ্রূণে পরিণত হওয়ার আগে বিভাজিত হয়ে দুটি আলাদা ভ্রূণ সৃষ্টি করে। এরা মাতৃগর্ভে পাশাপাশি একই সঙ্গে দুটি শিশুতে রূপান্তরিত হয়। এক্ষেত্রে কেবল মাত্র দুটি ছেলে বা দুটি মেয়ে যমজ হিসেবে জন্ম নেয়। এদের দেখলে মনে হয় যেন একজন আর একজনের ক্লোনিং বা কপি।
আবার সম্পূর্ণ আলাদা দেখতে যেসব যমজ শিশু, তাদের জন্ম হয় যখন দুটি ডিম্বাণু (ovum) আলাদাভাবে দুটি শুক্রাণু (sperm) দ্বারা নিষিক্ত হয়। অর্থাৎ এক্ষেত্রে দুটি পৃথক জাইগোট তৈরি হয়। তারা মাতৃগর্ভে দুটি ভ্রূণ সৃষ্টি করে।
এ ধরনের যমজদের ডাইজাইগোটিক যমজ (Dizygotic twin) বলে। এ যমজদের ক্ষেত্রে দুটি ছেলে বা দুটি মেয়ে অথবা একটি ছেলে ও একটি মেয়ে জন্ম নিতে পারে। এদের চেহারা এবং চরিত্র আলাদা হয়ে থাকে। কারণ শিশু দুটি পৃথক জাইগোট থেকে জন্ম নিয়ে থাকে।
أَلَمْ يَكُ نُطْفَةً مِنْ مَنِي يُمْنَى . ثُمَّ كَانَ عَلَقَةً فَخَلَقَ فَسَوَّى . فَجَعَلَ مِنْهُ الزَّوْجَيْنِ الذَّكَرَ وَالْأُنثَى
Was he not a nutfah emitted? then did he become a blastocyst (Alag); then He (Allah) Shaped and perfected him, then He made him in pairs males and females.
সে কি স্খলিত নুৎফা ছিল না? অতঃপর তাকে রক্তপিন্ডে পরিণত করা হয়। এরপর আল্লাহ তাকে আকার দান করেন এবং সুবিন্যস্ত করেন। এরপর তা থেকে সৃষ্টি করেন যুগল নর-নারী। (কিয়ামাহঃ ৩৭-৩৮)
ভ্রূণের ক্রমবিকাশ
وَقَدْ خَلَقَكُمْ أَطْوَارًا .
And He who created you in diverse stage. তিনি আল্লাহ, যিনি তোমাদেরকে বিভিন্ন স্তর থেকে সৃষ্টি করেছেন। (নূহ-১৪)
মাতৃগর্ভে একটি মানব শিশু পরিপূর্ণতা লাভ করে স্তরের পর স্তর অতিক্রম করে। এটি এমন একটি জটিল প্রক্রিয়া যা সংগঠিত হয় দয়াময় আল্লাহপাকের রহমতের উপস্থিতিতে। মাতৃগর্ভে ভ্রূণ সৃষ্টি হওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ Sperm এবং Ovum থেকে শুধুমাত্র একটি Sperm এবং একটি Ovum প্রয়োজন। উভয় কোষের নিষেক হওয়া মাত্রই যে কোষটি গঠিত হয় তার নাম Zygote. জাইগোট জরায়ুতে (uterus) প্রতিস্থাপিত হওয়ার পর পিটুইটারী গ্রন্থি, ডিম্বাশয় এবং অমরা (placenta) নিঃসৃত বিভিন্ন হরমোনের প্রভাবে মাতৃদেহের পরিবর্তনগুলো ক্রমান্বয়ে বিকাশ লাভ করে এবং প্রতিস্থাপিত জাইগোট ক্লিভেজ প্রক্রিয়ায় দ্রুত বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্তরের সূচনা করে। বৃটিশ ভ্রূণ তত্ত্ববিদ Von bear, ১৮২৭ সালে ভ্রূণ বিকাশের স্তর (stage) গুলো আবিষ্কার করেন।
৭ম শতাব্দীতে অবতীর্ণ আল-কোরআন ভ্রূণ বিকাশের পর্যায়গুলো বিভিন্ন সূরায়
খন্ডিতভাবে বর্ণনা দিয়েছেন। আবার সূরা মু'মিনুনের ১২-১৫ নং আয়াতে এ পর্যায়গুলো ক্রমান্বয়ে সাজিয়ে উপস্থাপন করেছেন যা বিজ্ঞানসম্মতভাবে ধারাবাহিক সামঞ্জস্যতা বিধান করে।
নিম্নে আল-কোরআন এবং বিজ্ঞানে বর্ণিত ভ্রূণ সৃষ্টির পর্যায়গুলো পাশাপাশি সাজিয়ে দেখানো হলো,
আল-কোরআন বিজ্ঞান
১। সুলালাহ (সার নির্যাস) ১। Sperm (n) + Ovum (n) (প্রজনন অণু) ২। নুৎফা (অনুবীক্ষণ যন্ত্রে দৃষ্ট প্রজনন কোষ) ২। Zygote (নিষিক্ত কোষ) ৩। আলাক (জমাট রক্তপিন্ড) ৩। Blastocyst (রক্তপিন্ড) ৪। মুদগাহ (মাংসপিন্ড) ৪। Somites (বহুকোষী মাংসপিন্ড) ৫। ইযাম (অস্থি) ৫। Skeleton (কঙ্কাল বা অস্থি তন্ত্র) ৬। লাহম (মাংসপেশী) ৬। Muscles (মাংস পেশী) ৭। রূহ (প্রাণ) ৭। Foetus (মানব শিশু)
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ طِينٍ . ثُمَّ جَعَلْنَهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَكِينٍ . ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ।
Verily, We created man from the best extraction from clay, then We placed him as a nutfah (zygote) in a safe custody (uterus) firmly fixed, then out of that nutfah, We created blastocyst (Alaq-a leech like substance), then that blastocyst, We made somites (Mudgha-a chewed like mass), then that We made out of that Somites the skeleton (izam) and clothed the Skeleton with muscles (Lahm); then We developed it into a different shape (Human baby). So, blessed be Allah the best of the creators.
প্রকৃতপক্ষে, আমরা মানুষ সৃষ্টি করেছি মাটির সার নির্যাস থেকে। পরে তা নুৎফা (জাইগোট) রূপে একটি সুরক্ষিত আধারে (জরায়ু) স্থাপন করেছি। অতঃপর তা জমাট রক্তপিন্ডে (জোঁক সদৃশ বস্তু) রূপান্তর করে লটকে দিয়েছি। তারপর লটকে যাওয়া রক্তপিন্ডকে মাংসপিন্ডে পরিণত করেছি। এরপর তাকে অস্থি বানিয়েছি। তারপর অস্থির উপর মাংসপেশী জড়িয়ে দিয়েছি। অবশেষে তাকে একটি ভিন্ন রূপ (পূর্ণশিশু) দান করেছি। সুতরাং তিনি মহামহিম আল্লাহ তা'আলা যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মহান স্রষ্টা। (মু'মিনূন-১২-১৫)
১. সুলালাহ-----sperm+ovum (n+n)
আল কোরআনে প্রথম পর্যায়কে বলা হয়েছে মাটির সার নির্যাস (سلالة من طين) অর্থাৎ মাটির সার নির্যাস থেকে মানুষ সৃষ্টির সূচনা হয়। তাহলে মাটির সার নির্যাস কি?
মাটির সার নির্যাস হচ্ছে সোডিয়াম (Na), ক্যালসিয়াম (Ca), ম্যাগনেসিয়াম (Mg), পটাসিয়াম (k), হাইড্রোজেন (H₂), অক্সিজেন (O₂), নাইট্রোজেন (N₂) ইত্যাদি। বৃক্ষরাজি এবং ক্ষেতের ফসল মূলের সাহায্যে এগুলো চুষে নেয়। তারপর বৃক্ষফল (আম, কাঁঠাল, আপেল, আঙ্গুর, কলা) দেয়। ক্ষেতে ফসল (ধান, গম, ভূট্টা যব) উৎপন্ন হয়। ফল এবং ফসলগুলো মানুষ খাদ্য রূপে গ্রহণ করার পর পাকস্থলিতে ডাইজেস্ট হয়। ডাইজেস্টিভ খাদ্যের সার নির্যাস থেকে জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পুরুষের শুক্রাশয়ে (testes) উৎপন্ন হয় Spermatozoon এবং নারীর ডিম্বাশয়ে (ovary) উৎপন্ন হয় Ovum. অতঃপর Spermatozoon এবং Ovum এর নিষেক থেকে সৃষ্টি হয় Zygote.। জাইগোট জরায়ুতে (uterus) স্থানান্তরিত হয়ে ভ্রূণ (embryo) গঠন করে। আর এ ভ্রূণ ক্রমান্বয়ে রূপান্তরের মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ মানুষ সৃষ্টি হয়।
সুতরাং 'সুলালাহ' হচ্ছে মানুষ তৈরির বেসিক উপাদান যা থেকে মানুষ সৃষ্টির মলিকুউল আহরিত হয়। অর্থাৎ পিতা মাতার পুষ্টির প্রয়োজনে মাটির সার নির্যাস থেকে যেসব উপাদান সংগৃহীত হয় সেসব উপাদান থেকে নুৎফা তৈরি হয়।
২. নুৎফা ...... জাইগোট
আরবী 'নুৎফা' শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দৃষ্ট অতি সূক্ষ্ম জনন কোষ। Sperm এবং Ovum উভয় অর্থে নুৎফা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আবার Sperm এবং Ovum এর নিষেকের ফলে গঠিত কোষ, জাইগোটকেও কোরআনে নুৎফা বলা হয়েছে এবং এক্ষেত্রে নুৎফা শব্দের পরে 'আমসাজ' (أَمْشَاج) শব্দটি এসেছে। জাইগোট গঠনের ২৪ ঘন্টার পর তা বাচ্চাথলির দেয়ালে ঘেরা প্রকোষ্ঠে স্থান লাভ করে এবং ২টি. ৪টি, ৮টি এভাবে ক্রমান্বয়ে বিভাজন হতে থাকে। এটাকে বলা হয় Morula.
৩। আলাক....... ব্লাস্টোসিস্ট
আলাক অর্থ জমাট বাধা রক্তপিন্ড। বিজ্ঞানে বলা হয় Blastocyst। এটি দেখতে জোঁকের মত (Leech like substance), একটি জোঁক রক্ত চুষে নিয়ে যে রূপ ধারণ করে আলাক সে রকম একটি বস্তু। ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে আলাক জোঁক সদৃশ রূপ লাভ করে। এর মধ্যে থাকে মাথার সম্মুখভাগের উন্নত অংশ। এ পর্যায়ে হৃদপিণ্ড অর্থাৎ Cardiovascular system এর উন্নয়ন ঘটে এবং ভ্রূণটি পুষ্টির জন্য তার মাতৃ রক্তের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে ১৫-১৬ দিনের মাথায় আলাক বাচ্চাদানির
দেয়ালে ঝুলন্ত দেহবস্তুর মত ঝুলে থাকে। তাই আরবী আলাক শব্দের তিনটি অর্থ বিজ্ঞানসম্মতভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এক- জমাট রক্তপিন্ড, দুই- জোঁক সদৃশ বস্তু এবং তিন- ঝুলন্ত দেহবস্তু।
আরবী 'মুদগাহ' শব্দের অর্থ মাংসপিন্ড। এটাকে বিজ্ঞানে বলা হয় Somites। ব্লাস্টোসিস্ট এর বাইরের স্তর ট্রফোব্লাস্ট নিঃসৃত এনজাইমের প্রভাবে প্রাচীর কলা (Tissue) বিগলিত হলে ব্লাস্টোসিস্ট নিমজ্জিত হয়। যার ফলে Blastocyst সোমাইটস এ পরিণত হয়। কোরআনে যার নাম উল্লেখ করা হয়েছে মুদগাহ। এ প্রক্রিয়া অন্তত ২০-৪২ দিন পর্যন্ত চলে। মুদগাহ অবস্থায় ভ্রূণকে প্রকৃতপক্ষে চর্বন বস্তুর মত (chewed like substance) দেখায়। তখন ১৩টি খাঁজকাটা মাংসপিন্ডের ব্লক ভ্রূণের শিরদাঁড়ায় সাজানো থাকে যেগুলোকে বলা হয় 'মেসোডার্মাল সেগ্মেন্ট (mesodermal segments)।
ইজাম অর্থ অস্থি বা কঙ্কাল। বিজ্ঞানে এটাকে Skeleton বলা হয়েছে। এ পর্যায়ে প্রথমে যে অস্থিগুলো দেখা দেয় সেগুলো হচ্ছে উপরিভাগের কচি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। প্রাথমিক ৬ সপ্তাহে কচি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মেসেনকাইমাল টিস্যুগুলো (mesenchymal tissue) কোমল অস্থিতে পরিণত হয়ে ভবিষ্যৎ অস্থির স্বচ্ছ মডেল গঠন করে। ৬ সপ্তাহের শেষের দিকে উপরের দিকের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কঙ্কালের পূর্ণাঙ্গ কোমল মডেল প্রদর্শন করে। ১২ সপ্তাহের মধ্যে ভ্রূণের একটি ক্ষুদ্র পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল গঠিত হয়। মানব কঙ্কালে মোট ৩৬০টি জোড়া থাকে। এ স্তরে ৩৬০টি জোড়া সমৃদ্ধ কঙ্কাল তন্ত্র সম্পূর্ণ হতে ১২ সপ্তাহ সময় লাগে। মানব কঙ্কাল মোট ২০৬টি হাড় দ্বারা গঠিত।
লাহম অর্থ মাংসপেশী। এটাকে বিজ্ঞানে বলা হয় Muscles stage। ৭ম সপ্তাহ থেকে কঙ্কালতন্ত্র বিস্তার লাভ করে এবং অস্থিগুলো যথাযথ আকার ধারণ করে। ৮ম সপ্তাহ থেকে অস্থির চারপাশে পেশীগুলো আবৃত হতে থাকে। ৮ম সপ্তাহ শেষ হলে নির্দিষ্ট পেশীতন্ত্র, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং মাথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ সময় ভ্রূণটি নড়াচড়া করতে সক্ষম হয়।
এটা সর্বশেষ স্তর। এ স্তরে মানব শিশু পরিপূর্ণতা লাভ করে। আরবী 'খালকান আখরা' অর্থ ভিন্ন আকার। গর্ভে থাকার পূর্ণ সময় পরে শিশু ভূমিষ্ঠ হয় অর্থাৎ আল্লাহপাকের ইচ্ছানুযায়ী শিশুটি আপন অস্তিত্বে মূর্ত হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানে এ পর্যায়কে ফিটাস (Foetus) বলা হয়েছে। ফিটাস অর্থ- "Miniature human baby"
ফَإِنَّا خَلَقْنَكُمْ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ مِنْ مُضْغَةٍ مُخَلَّقَةٍ وَغَيْرِ مُخَلَّقَةٍ لِنُبَيِّنَ لَكُمْ.
Then surely We created you from dust, then from Nutfah, then from a leech like clot (Alaq), then from a chewed like mass (Mudgah), partly formed and partly unformed so that We made our power manifest to you.
অবশ্যই আমরা তোমাদের সৃষ্টি করেছি মাটি থেকে। তারপর প্রজনন কোষ থেকে। তারপর রক্তপিন্ড থেকে, তারপর মাংসপিন্ড থেকে, যা কিছুটা আকৃতি প্রাপ্ত হয় কিছুটা আকৃতি বিহীন। যেন আমাদের ক্ষমতা তোমাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ে। (হজ্ব-৫)
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِّنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُّطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ يُخْرِجُكُمْ طِفْلًا.
It is He Who created you from earth, then from sperm and ovum (nutfah), then from blastocyst (Alaq), then does He get out as a child. তিনি আল্লাহ যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে, তারপর নুৎফা থেকে তারপর
আল্লাহ থেকে, অতঃপর তোমাদের বের করেন একটি পরিপূর্ণ মানব শিশু রূপে। (মু'মিন-৬৭)
আধুনিক ভ্রূণতত্ত্ববিদগণ নিবিড়ভাবে ভ্রূণ বিকাশের পর্যায়গুলো পর্যবেক্ষণ করে আবিষ্কার করেন যে, প্রতিটি স্তর তিনটি পর্দা (Veils) দ্বারা সুরক্ষিত এবং এ সব আবরণী ভ্রূণকে শারীরিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে। বিজ্ঞানে পর্দাগুলো যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তা নিম্নরূপ,
১। জাইগোট আবরণীঃ (a) Corona radiata (b) Uterine wall (c) Abdominal Wall.
২। ব্লাস্টোসিস্ট আবরণীঃ (a) Placental membrane (b) Uterine wall (c) Abdominal wall.
৩। ফিটাস আবরণীঃ (a) Amnion (b) Chorion (c) Trophoblast.
বিজ্ঞানের সর্বশেষ আবিষ্কার এ পর্দা বা আবরণী সম্পর্কে আল-কোরআন বলেছে,
يَخْلُقُكُمْ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ خَلْقًا مِّنْ بَعْدِ خَلْقٍ فِي ظُلُمَاتٍ ثَلَاثٍ
He Created you in the wombs of your mother from one stage to another always in three Veils of darkness.
আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাতৃগর্ভে এক স্তর থেকে অন্য স্তরে তিনটি গাঢ় পর্দার ভেতর থেকে। (যুমার-৬)
Some Anatomists do, however, differ. They say the Quranic verse might have meant as follows:
১। The three veils of a secondary Oocyte are: a) The corona radiata b) The Zona pellucida c) The Uterine wall.
২। The three veils of Uterine wall are: a) The perimetrium b) The mesometrium c) The endometrium
৩। The three veils of endometrium are: a) The basal layer b) The mid-spongy layer c) The compact layer.
দেখা যাচ্ছে প্রতিটি স্তরে তিন ধরনের কুশলী আবরণী বা পর্দা (veil) রয়েছে। যেগুলো ভ্রূণকে নিরাপদ সংরক্ষণের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে। উপরোক্ত আয়াতে বিভিন্ন স্তরে তিন প্রকার সুদৃঢ় পর্দার (Three veils) ধারণা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
Chromosome
১৮৭৯ সালে W. Flemming কোষের নিউক্লিয়াসের ভেতর অবস্থিত অতি সূক্ষ্ম সূতার মত এক প্রকার বস্তুর সন্ধান পান এবং এদের নাম দেন ক্রোমাটিন (Chromatic)। এরপর ১৮৮৮ সালে W. Waldeyer এর নামকরণ করেন ক্রোমোজোম
(Chromosome)। পরে বিজ্ঞানীরা অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেন যে, এদের গঠন অত্যন্ত জটিল। দু'ধরনের নিউক্লিক এসিড যথা, DNA ও RNA এবং দু'ধরনের প্রোটিন, হিসটোন (Histone) ও ক্রোমোজোমিন (Chromosomin) দ্বারা ক্রোমোজোম গঠিত।
ক্রোমোজোম বংশগতির উপাদান বা জিন (gene) বহনকারী কোষের অন্যতম অঙ্গাণু। ক্রোমোজোমে জিন উপাদানের অবস্থান তার ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিডে (DNA) সারিবদ্ধ হয়ে থাকা এ উপাদান এসিড-প্রোটিন এবং বেসিক-প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সুতার মত এক জটিল নিউক্লিয় প্রোটিনের গঠন তৈরি করে। উদ্ভিদ এবং প্রাণীর সব প্রকৃত কোষে নিউক্লিয়াসের মধ্যে ক্রোমোজোম থাকে। তবে দেহকোষ মাইটোসিস অথবা জনন কোষ মিওসিস বিভাজনের সময় যখন তারা সংকুচিত হয় এবং নিউক্লিয়াসের আবরণী অদৃশ্য হয়ে যায় কেবল তখনই অণুবীক্ষণ যন্ত্রে তাদের চোখে পড়ে। এ সময় তাদের নিরেট, দ্বিখন্ডিত বিভক্ত দন্ডের মতো গঠন বলে মনে হয় এবং প্রত্যেক ক্রোমাটিড (Chromatid) নামে দুটি হুবহু একই রকমের সমান্তরাল অংশ নিয়ে গঠিত থাকে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিটি ক্রোমোজোমে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে একটি প্রাথমিক সংকোচন (primary constriction) থাকে। একে সেন্ট্রোমিয়ার (Centromere) অথবা কাইনেটোকোর (kinetochore) বলা হয়। কোষ বিভাজনের সময় এ অংশের মাধ্যমে ক্রোমোজোমের অর্ধাংশ দুটি স্পিন্ডল ফাইবারের (Spindle fibre) সঙ্গে যুক্ত হয়ে আলাদা হয়ে যায়।
পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী বসবাস করে। একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির ক্ষেত্রে ক্রোমোজোমের সংখ্যাও নির্দিষ্ট থাকে। Sperm এবং Ovum-এ দু'ধরনের জনন কোষের Chromosome সংখ্যা অর্ধেক হয় বলে একে হ্যাপ্লয়েড সেট (haploid set=n) বলা হয়। প্রত্যেক মানুষের দেহ কোষে (somatic cell) ৪৬টি বা ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে। শিশুর জীবনের প্রথম কোষে (জাইগোট) ২৩টি আসে sperm থেকে এবং অন্য ২৩টি আসে Ovum থেকে। ২৩ জোড়া Chromosome এর মধ্যে ছেলে মেয়ে সকলের ক্ষেত্রে ২২ জোড়া ক্রোমোজোমের আকার ও কাজ করার ক্ষমতা এক ও অভিন্ন। অর্থাৎ এরা দেহজ বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এদের বলা হয় দেহ ক্রোমোজোম (autosome)। বাকী এক জোড়া অর্থাৎ ২৩ তম ক্রোমোজোমকে বলা হয় যৌন ক্রোমোজোম বা লিঙ্গ নির্ধারক ক্রোমোজোম (sex chromosome), যা যৌন বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে। যৌন ক্রোমোজোম আবার দু'রকম। Male Chromosome এবং Female Chromosome। মেল ক্রোমোজোমকে চিহ্নিত করা হয়েছে 'Y' দ্বারা এবং ফিমেল ক্রোমোজোমকে চিহ্নিত করা হয়েছে 'X' দ্বারা। তাই মেয়েদের যৌন
ক্রোমোজোমের সাংকেতিক চিহ্ন ‘XX’ কিন্তু ছেলেদের যৌন ক্রোমোজোমের জোড়ায় থাকে একটি ‘X’ অপরটি ‘Y’। তাই ছেলেদের যৌন ক্রোমোজোমের সাংকেতিক চিহ্ন ‘XY’। এ যৌন ক্রোমোজোম দিয়ে ছেলে মেয়েদের মধ্যে আকৃতিগত ও শারীরিক বৃত্তীয় পার্থক্য নির্দিষ্ট হয়।
মানব শিশু জন্ম নেয় পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্য নিয়ে যা ক্রোমোজোমে ধরা থাকে। বংশগতির রাসায়নিক ভিত্তি অনুসন্ধান করতে গিয়ে এ তত্ত্ব আবিষ্কার হয়।
অতএব, ক্রোমোজোমের যুগল সত্তার প্রতি ইঙ্গিত করে আল-কোরআন বলছে, وَإِنَّهُ خَلَقَ الزَّوْجَيْنِ الذَّكَرَ وَالْأُنْثَى مِنْ نُّطْفَةٍ إِذَا تُمْنَى ، وَإِنَّ عَلَيْهِ الْإِنْشَاءَ الأَخَرَ
And that He created the pairs of male and female in the Nutfah when it is emitted forth and it is for Him to bring forth the second creation.
আর তিনি নুৎফার মধ্যে পুরুষ এবং স্ত্রীলিঙ্গ জোড়া সৃষ্টি করেছেন যখন এটা স্খলিত হয় এবং দ্বিতীয় সৃষ্টি প্রবর্তন করা তাঁরই দায়িত্ব। (নাজম-৪৫)
এখানে ‘যাওজাইনিজ জাকারা ওয়াল উনথা’ আয়াতাংশ দ্বারা জোড়া ক্রোমোজোম ‘X’ ও ‘Y’ সম্পর্কে ইঙ্গিত করা হয়েছে এটা একেবারেই স্পষ্ট।
وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ مِّنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُّطْفَةٍ ثُمَّ جَعَلَكُمْ أَزْوَاجًا
Allah created you from dust, then from nutfah, then He makes you in pairs.
আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে, তারপর নুৎফা থেকে, তারপর জোড়া করে। (ফাতির-১১)
এ জোড়া এক রহস্যময় বিষয়। Chromosome এ রয়েছে জোড়া, নিউক্লিক এসিডে (DNA / RNA) রয়েছে জোড়া। প্রোটিনে রয়েছে জোড়া। ক্রোমোজোম সংক্রান্ত বিশদ আলোচনা দেখুন পরিশিষ্ট ৫-এ।
জিনতত্ত্ব (Genetics)
কোষের নিউক্লিয়াসে অবস্থিত অতি সূক্ষ্ম সুতার মত যুগল ক্রোমোজোমের কথা আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি। Chromosome বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় জিন (Gene) নামের এক প্রকার এজেন্ট যা DNA (ডি-অক্সিরাইবো নিউক্লিক এসিড) দ্বারা গঠিত।
জিন বংশগতির নিয়ন্ত্রণকারী ন্যূনতম একক। প্রতিটি জীবের বৈশিষ্ট্যাবলী জিনের মাধ্যমেই বংশ পরম্পরায় সঞ্চারিত হয়ে থাকে অর্থাৎ জিনই হলো বংশগতির একমাত্র ধারক ও বাহক। বংশগতি বিদ্যার জনক গ্রেগর মেন্ডেলের মতে জীবের প্রতিটি বৈশিষ্ট্য একটি করে ফ্যাক্টর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং এরা জোড়ায় জোড়ায় থাকে। এ ফ্যাক্টরকেই ১৯০৩ সালে জোহানসেন Gene নামে অভিহিত করেন। তাই মেন্ডেলের দেয়া নাম ফ্যাক্টর এখনকার জিন সমার্থক বলে বিবেচনা করা হয়।
পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, একটি ক্রোমোজোমে অসংখ্য জিন থাকে এবং এ জিনগুলি একটি বিশেষ রীতিতে বিন্যস্ত থাকে। প্রতিটি জিন একটি নির্দিষ্ট ক্রোমোজোমে একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে। ঐ নির্দিষ্ট স্থানকে জিনের লোকাস (Locus) বলে। যা পরিবর্তিত হয় না। একজোড়া প্রতিরূপ (homologous) ক্রোমোজোমে লোকাসের স্থান নির্দিষ্ট। প্রতিটি লোকাসে এক বা একাধিক কার্যকরী একক থাকতে পারে এবং প্রতিটি একক একটি জিন হিসেবে কাজ করে। ক্রোমোজোমের লোকাসে অবস্থিত যে কোন কার্যকরী একক, যাতে Recombination সম্ভব ও যা মিউটেশনে অংশ নিতে পারে তা-ই জিন। আধুনিক ধারণায় ক্রোমোজোমের যে অংশটি পলিপেপটাইড উৎপাদনে সংকেত বহন করে সেটাই জিন। ক্রোমোজোমের একমাত্র স্থায়ী রাসায়নিক পদার্থ হলো DNA।
সুতরাং DNA-ই বংশগতির প্রতিনিধি ও রাসায়নিক ভিত্তি এবং সরাসরি পিতামাতার বৈশিষ্ট্য তার সন্তান-সন্ততিতে বহন করে নিয়ে যায়। একটি ক্রোমোজোমে জিনগুলি পরপর একটি সারিতে সাজানো থাকে। মানব দেহে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমে জিনের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার।
জিনের তাত্ত্বিক ব্যবহার আজকাল উদ্ভিদ জগতে, শস্য জগতে এবং প্রাণী জগতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কেননা এর গুণগত মানে পরিবর্তন ঘটিয়ে কম সময়ে বৃদ্ধিশীল এবং অধিক ফলনশীল ফসল উৎপাদন করা যায়। আবার জিনের মাধ্যমে হাঁস, মুরগী, গো-মেষ প্রভৃতি প্রাণীর উন্নত প্রজাতির প্রজন্ম সৃষ্টি ছাড়াও জিন ক্লোনিং করে এসব প্রাণীর প্রতিরূপ সৃষ্টির কাজে সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা সফলকাম হয়েছেন। পৃথিবীর মানুষকে খাদ্যাভাব রোগব্যাধি থেকে মুক্তি তথা প্রজাতি রক্ষায় জিনতত্ত্ব আশীর্বাদ স্বরূপ প্রমাণিত হয়েছে। জিনগত প্রকৌশল (genetic engineering) প্রয়োগ করে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত রোগব্যাধি যথা হাঁপানি, ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন প্রভৃতি নির্মূল করে একটি সুস্থ পৃথিবী গড়ে তুলতে এখন সবাই সচেষ্ট হয়েছে। জিন (Gene) বংশগত বৈশিষ্ট্যের ধারক আর বাহক। অন্যান্য বংশগত বৈশিষ্ট্য সহ চেহারার প্রতিচ্ছবি, গায়ের রং, চোখ ও চুলের রং, উচ্চতার পরিমাণ এবং অঙ্গভঙ্গির উপস্থাপনা জিনের মধ্যে বিদ্যমান। বংশ পরম্পরায় এসব বৈশিষ্ট্য একজন থেকে আর এক জনের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়।
Gene দু'ধরনের হয়ে থাকে। প্রকট জিন (dominant gene) এবং প্রচ্ছন্ন জিন
(recessive gene)। যদি পিতার Dominant gene সন্তানের মধ্যে স্থানান্তরিত হয় তাহলে সন্তানটি হুবহু পিতার মত হয়। তাই মানুষ মন্তব্য করে "The boy takes after his father"। আর যখন মায়ের DG শিশুর মধ্যে স্থানান্তরিত হয় তখন শিশুটি মায়ের মত হয়। আবার পিতা-মাতার প্রচ্ছন্ন জিন (recessive gene) শিশুর মধ্যে প্রকাশিত হলে শিশু পিতা মাতা কারোর মতই হয় না। পরিশিষ্ট ৬-এ জিনতত্ত্বের উপর বিশদ আলোচনা করা হয়েছে এবং বিজ্ঞানময় গ্রন্থ আল-কোরআন Gene সম্পর্কে যে ধারণা পেশ করেছে তা হচ্ছে,
مِنْ نُّطْفَةٍ خَلَقَهُ فَقَدَرَةً.
Of a nutfah He (Allah) creates him and then decrees his fate.
একটি নুৎফা থেকে আল্লাহ তাকে (মানুষকে) সৃষ্টি করেছেন এবং তার শরীর বৃত্তীয় পরিণতি নির্ধারণ করেছেন।
আরবী 'ফাকাদ্দারাহ' শব্দের অর্থ হচ্ছে- পরিণতি স্বরূপ ঘটা, To become, To grow into, মানসিক ও শরীর বৃত্তীয় সাদৃশ্যের উদ্ভব হওয়া। বলাবাহুল্য এসব বৈশিষ্ট্য জিনের মধ্যে ধরা থাকে। কোন কোন অনুবাদ গ্রন্থে 'ফাকাদ্দারাহ' শব্দের অনুবাদ করা হয়েছে যথাযথ, পরিণতি, পরিমিত। এসব অর্থও জিন তত্ত্বের সমার্থক।
وَجَعَلَ لَكُمْ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا . وَمِنَ الْأَنْعَامِ أَزْوَاجًا
He has made for you pairs among yourselves and pairs among cattle. This is the means by which He multiples you.
তিনি তোমাদের মধ্যে জোড়া তৈরি করেছেন, পশুদের মধ্যেও করেছেন জোড়া ভিত্তিক নিদর্শন যাতে করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সম্প্রসারিত হয়। (শুরা-১১)
هُوَ الَّذِي يُصَوِّرُكُمْ فِي الْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَاءُ . لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الحكيم.
He it is Who fashions you in the wombs as He pleases, there is no creator except Him, the Exalted, the Wise.
তিনি সে-ই মহান সত্তা যিনি মাতৃগর্ভে তোমাদের আকৃতি গঠন করেন যেমন তিনি ইচ্ছা করেন। আল্লাহ ছাড়া আর কোন স্রষ্টা নেই, তিনি প্রবল পরাক্রান্ত-প্রজ্ঞাময়। (ইমরান-৬)
মহান আল্লাহ জোড়া সৃষ্টি করেছেন নুৎফার মধ্যে ক্রোমোজোমের মধ্যে এবং জিনের মধ্যে। অনুরূপভাবে পশু-পাখিদের মধ্যেও করেছেন জোড়াভিত্তিক নিদর্শন। অধিকন্তু Gene সৃষ্টি করে এর গুণগত মান পরিবর্তনশীল করেছেন যাতে করে প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের প্রবৃদ্ধি ঘটে এবং বংশ পরম্পরায় বংশগত বৈশিষ্ট্য অব্যাহত থাকে।
DNA (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড)
DNA জীবকোষের নিউক্লিয়াসে বিদ্যমান ক্রোমোজোমের একমাত্র স্থায়ী প্রাণরাসায়নিক যৌগ হলো Deoxyribonucleic Acid বা DNA. এটি ক্রোমোজোম তথা জিনের সাংগঠনিক উপাদানরূপে জীবনের প্রজাতি সত্তা ও বংশগতির নিয়ন্ত্রণ করে। কোষের অধিকাংশ DNA ক্রোমোজোমের উপাদান হিসেবে নিউক্লিয়াসে বিরাজ করে। অল্প পরিমাণের DNA মাইটোকন্ড্রিয়া, প্লাসটিড ও অন্যান্য সাইটোপ্লাজমীয় অঙ্গাণুতেও থাকে। DNA গঠিত হয় ৫ কার্বন বিশিষ্ট ডি অক্সিরাইবোজ শর্করা, অজৈব ফসফেট, অ্যাডেনিন (adenine), গুয়ানিন (guanin), সাইটোসিন (cytosin) এবং থাইমিন (thymine) নামক নাইট্রোজেন বেস দিয়ে।
পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, DNA জীবকোষে বিদ্যমান বৃহৎ অণুর অন্তর্ভুক্ত। DNA অণুগুলোর আনবিক ওজন দুই বিলিয়ন পর্যন্ত হতে পারে। এ অণুগুলো দীর্ঘ পলিমার যা বহুসংখ্যক নিউক্লিওটাইড মনোমার দিয়ে গঠিত। প্রতিটি নিউক্লিওটাইড একটি নাইট্রোজেন ক্ষারক, শর্করা ও ফসফরিক এসিড দিয়ে গঠিত। DNA অণুতে বিদ্যমান নাইট্রোজেন ক্ষারকগুলো হলো পিউরিন (অ্যাডেনিন ও গুয়ানিন) এবং পাইরিমিডিন (সাইটোসিন ও থাইমিন)।
DNA এর গঠন আবিষ্কারকারী James Watson এবং Francis Crick ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিডের চার প্রকার মলিকুউল (AGCT) পিউরিন ও পাইরিমিডিন অবস্থানে কিভাবে জোড়া সংযোগে সজ্জিত থাকে তা একটি মডেল উপস্থাপন করে দেখান এবং এ মডেলের নাম দেন Double Helix (দ্বি-সূত্রাকার)। এ ডবল হেলিক্স মডেল অনুযায়ী, মলিকুউলগুলোতে দুটি DNA শিকল একে অপরের সঙ্গে পাকানো থাকে এবং শিকল দুটি সঠিক অর্থে বিপরীতমুখী বা বিপরীতমুখী সমান্তরাল (antiparallel)। এ বিজ্ঞানীদ্বয়ের মডেল অনুসারে, পিউরিন ও পাইরিমিডিনের ভিন্ন আকার ও আকৃতির ফলে ডবল হেলিক্স অণুতে এদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট রীতিতে জোড়া বন্ধন ঘটে। যথা (1) AT বা TA (২) GC বা CG এবং AT, CG, GC, 3 TA এর ধারা শৃঙ্খল জিন থেকে জিনে পরিবর্তিত হয়।
ওয়াটসন ও ক্রিক আরো প্রস্তাব করেন যে, দ্বি-সূত্রাকৃতির DNA পাকানো অবস্থায় থাকে, যা একটি হেলিক্যাল (Helical) গঠন তৈরি করে।
বায়োকেমিস্টরা চিন্তা করে দেখলেন যে, কৃত্রিম উপায়ে যদি ল্যাবরেটরিতে DNA প্রস্তুত করা যায় তাহলে ক্রোমোজোম তৈরি করা সহজ হবে। কিন্তু এ পরীক্ষা চালিয়ে তারা হতাশ হলেন। যে DNA তৈরি হলো তাতে প্রাণের সাড়া আসল না। কারণ DNA এমন এক জটিল অণু যা অপত্য বংশধরে পরিবৃত্তি বা প্রকরণের (variation) উদ্ভব ঘটায়। তাই এটি কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা মানুষের পক্ষে অসাধ্য।
DNA কে বংশগতির প্রতিচিত্রের ধারক বলার কারণগুলো হচ্ছে, এটি কোষের বৃদ্ধি ও প্রজননের সময় নির্ভুল প্রতিলিপি সৃষ্টি করতে পারে। বংশগতিতে সকল প্রকার বৈশিষ্ট্য বহন করার ক্ষমতা এর আছে। এর গঠন কাঠামো অত্যন্ত স্থায়ী এবং বিশেষ কোন কারণ ছাড়া অত সহজে পরিবৃত্তি ঘটে না। সেজন্য দেখা যায় একজন মানুষের আঙ্গুলের চাপ আর একজনের সাথে কখনো মিলে না। কারণ আঙ্গুলের অগ্রভাগে যে রৈখিক বিন্যাস ফুটে উঠে তার প্রতিলিপি ধরা থাকে DNA এর মধ্যে। তাই DNA কে বলা হয় 'The Hereditary blueprint for life'।
অতএব মহামহিম আল্লাহ তাআলা DNA সম্পর্কে নিম্নোক্ত আয়াতে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন এসব তত্ত্ব আবিষ্কারের পূর্বে,
وَفِي خَلْقِكُمْ وَمَا يَبَتٌ مِنْ دَابَّةٍ ءَايَاتٌ لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ
And in your nature and in all the animals which He scatters (over the earth) there are signs for those of assured faith.
তোমাদের চরিত্র সত্তায় এবং পশুদের মধ্যে যা তিনি (পৃথিবীময়) ছড়িয়ে দিয়েছেন, এতে নিদর্শন সমূহ ইঙ্গিত করা হয়েছে বিশ্বাসকারীদের জন্য। (জাসিয়া-৪)
بَلَى قُدِرِينَ عَلَى أَنْ نُسَوّى بَنَانَهُ
Indeed, We have power to restore his very finger tips in perfect order.
নিশ্চয়, আমরা তার আঙ্গুলের অগ্রভাগ সঠিকভাবে প্রত্যার্পণ করার ক্ষমতা রাখি। (কিয়ামাহ-৪)
মানুষ বা অন্যান্য প্রাণী সৃষ্টির জৈব উপাদান Sperm, ovum, জিন, Chromosome, DNA প্রভৃতি কোন বিজ্ঞানী ল্যাবরেটরিতে উৎপন্ন (Originate) করতে পারবে কি? আজ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত বিজ্ঞানী আসবে পৃথিবীতে, সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে যাবে। DNA সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেখুন পরিশিষ্ট ৮-এ।
أَفَرَيْتُمُ مَا تُمْنُونَ . أَنتُمْ تَخْلُقُونَهُ أَمْ نَحْنُ الْخَلِقُونَ.
Do you see the Human Nutfah that you throw out? Is it you who create it or am I the creator?
আচ্ছা লক্ষ্য কর, যে নুৎফা (জনন কোষ) তোমরা নিক্ষেপ কর তা কি তোমরাই সৃষ্টি করেছ, নাকি আমিই তার স্রষ্টা? (ওয়াকিয়া-৫৮)
অতএব আল-কোরআনে আলোচ্য তত্ত্বগুলোর ইঙ্গিত করা হয়েছে ঐ সময়ে যখন বিজ্ঞানের বাতাস বিন্দুমাত্র প্রবাহিত হয়নি। বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের উন্নয়নের ফলে আমরা কোরআনের এসব আয়াতগুলোর কিছুটা মর্মার্থ বুঝতে সক্ষম হয়েছি এবং একথা সকলে উপলব্ধি করে থাকেন যে, আল্লাহপাক সীমাহীন জ্ঞানের অধিকারী। তাই আমাদের উচিত প্রজ্ঞাময় আল্লাহপাকের প্রতি সর্বদা অনুগত থাকা এবং নিয়মিত তাঁকে সেজদা করা।
প্রশ্ন: আপনাদের জ্ঞাতার্থে সবিনয়ে বলতে চাই যে, আমি এমন এক কন্যাকে বিয়ে করেছি, যার ছোট আরও তিন বোন রয়েছে, আর আমি আমার শশুরের সাথেই বসবাস করি তার বিভিন্ন কাজে তাকে সহযোগিতা করার জন্য। কিন্তু সমস্যা হলো ঘরের মধ্যে এবং আমার শ্যালিকাদের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনকালে তাদের সাথে আমার অনেক বেশি মেশামেশি হয়ে যায়, তবে শ্যালিকাদের মাথা ঢাকা থাকে এবং চেহারা খোলা থাকে, আবার কখনও কখনও আমাকে তাদের কাউকে মাদরাসা বা কলেজে বা অফিসে পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করতে হয়। সুতরাং এ ব্যাপারে শরী'আতের বিধান কী?
উত্তর: উল্লিখিত কারণে আপনার শশুরের সাথে বসবাস করাতে কোনো অসুবিধা নেই-পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অথবা অন্য কোনো কারণে তার সাথে বসবাস করাটা বৈধ ব্যাপার। তবে আপনার শ্যালিকাদের জন্য আবশ্যক হলো তারা আপনার থেকে পর্দা করবে এবং তাদের চেহারা ঢেকে রাখবে। কারণ, চেহারা হলো সবচেয়ে সৌন্দর্যপূর্ণ বস্তু। আল্লাহ তা'আলা সূরা আন-নূরে বলেন:
وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ ءَابَابِهِنَّ أَوْ ءَابَاءِ بُعُولَتِهِنَّ ...) [النور: ٣١]
"আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর....ছাড়া কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে"। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১]
আর আপনার জন্য তাদের কোনো একজনকে নিয়ে নির্জনে অবস্থান করা এবং একাকিনী অবস্থায় তাকে নিয়ে স্কুল-কলেজ বা অফিসে যাওয়া বৈধ নয়। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ».
"কোনো মাহরাম পুরুষ সাথী ছাড়া কোনো ব্যক্তি কখনও কোনো মহিলার সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করবে না।"³⁴
তিনি আরও বলেন:
«لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ ، فَإِنَّ ثَالِقَهُمَا الشَّيْطَانُ».
"কোনো ব্যক্তি কখনও কোনো মহিলার সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করবে না। কারণ, তাদের সাথে তৃতীয় জন হলো শয়তান।"³⁵
সুতরাং যখন আপনি তাদের কাউকে নিয়ে স্কুল-মাদরাসায় যাবেন, তখন আপনার জন্য আবশ্যক হলো আপনাদের সাথে তৃতীয় আরেক জনকে সাথে নেওয়া, যাতে তার দ্বারা একান্ত নির্জনতার সমস্যা দূর হয়ে যায় এবং তার উপস্থিতিতে নিরাপদ হওয়া যায় সতর্ক করা শয়তানের কুমন্ত্রণা বা প্ররোচনা থেকে। আল্লাহ আমাদেরকে এবং আপনাদেরকে তার প্ররোচনা থেকে রক্ষা করুন।
শাইখ আবদুল 'আযীয ইবন আবদিল্লাহ ইবন বায
টিকাঃ
³⁴ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৩৩৩৬
³⁵ বায়হাকী, হাদীস নং- ১১০৮৫
📄 জেনিটোফেমোরাল ও ইলিও ইনগুইনাল
জেনিটোফেমোরাল ও ইলিও ইনগুইনাল
ইসলামের সুমহান পবিত্রতম বিধান হলো একজন পুরুষ ও একজন নারীকে যথাযথ বয়সে বিধিবদ্ধ বন্ধনে আবদ্ধ করে দেয়া। এটাকে বলা হয় বিবাহ বন্ধন। বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীর মিলনের পুরো কাজটি নিয়ন্ত্রণ করে দুইটি নার্ভস (Nerves)। নার্ভস দুইটির মধ্যে একটির নাম জেনিটোফেমোরাল (Genitofemoral) এবং অপরটির নাম ইলিও ইনগুইনাল (Ilio inguinal)। এ স্নায়ু দুইটি পুরুষের পৃষ্ঠদেশ এবং নারীর বক্ষ পিঞ্জর থেকে নিঃসৃত হয়ে জনন তন্ত্রের সাথে মিলিত হয়েছে এবং এরা Germinal fluid স্খলিত হওয়ার ব্যাপারে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। যদি কোনো কারণে উক্ত স্নায়ু দুটি প্যারালাইসিস হয়ে যায় তাহলে স্বামী-স্ত্রী যতই স্বাস্থ্যবান কিংবা বীর্যবান যুবক-যুবতী হোক না কেন সঙ্গমে আর কখনো তারা সক্ষম হবে না। এ অবস্থাকে বলা হয় Impotency বা পুরুষত্বহীনতা।
অতএব, এই নার্ভস দুটির উপর কোরআনের তথ্য অত্যন্ত স্পষ্ট।
فَلْيَنْظُرُ الْإِنْسَانُ مِمَّ خُلِقَ - خُلِقَ مِنْ مَاءٍ دَافِقٍ يَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِب.
So, let man think from what he is created! He is created from a gushing fluid that comes from in between the loins and the ribs.
সুতরাং মানুষ চিন্তা করে দেখুক সে কি বস্তু দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে। পৃষ্ঠদেশ থেকে আর বক্ষপিঞ্জর থেকে সবেগ নিঃসৃত তরল পদার্থ দ্বারা মানুষ সৃষ্টি হয়েছে। (তারিক-৫-৭)
আরবী 'মাআ' শব্দ দ্বারা যেমন পানিকে বোঝানো হয় তেমনি তরল পদার্থকেও বোঝানো হয়। অধিকন্তু পানির রাসায়নিক সংকেত H₂O। অর্থাৎ হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের মিশ্রণ। নুৎফার মধ্যে ৮০% পানি থাকে। আয়াতে বলা হয়েছে Germinal fluid বা তরল বীর্য সবেগে নিঃসৃত হয় পৃষ্ঠদেশ (সালব) থেকে এবং বক্ষ পিঞ্জর (তারাইব) থেকে। অ্যানাটমি অনুযায়ী Germinal fluid বের হয় যথাক্রমে শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয় থেকে। আসল ব্যাপার হলো, জেনিটোফেমোরাল এবং ইলিও ইনগুইনাল স্নায়ু দুটি যখন প্রচণ্ড প্রভাব সৃষ্টি করে তখন ঝাঁকুনি খেয়ে শুক্রাশয় (Testes) ও ডিম্বাশয় (Ovaries) থেকে তরল বীর্য সবেগে বেরিয়ে আসে। এ ব্যাপারটিই বোঝানো হয়েছে।
প্রশ্ন: আমার বোনের জন্য কি তার চাচার ছেলে তথা চাচাতো ভাই থেকে পর্দা করা আবশ্যক, যিনি আমাদের আত্মীয় হবেন অর্থাৎ তার (চাচার) কন্যাকে অচিরেই আমার ভাইয়ের নিকট বিয়ে দেবেন, তবে জেনে রাখা দরকার যে, এখন পর্যন্ত বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয় নি। আশা করি আমাদেরকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলবেন?
উত্তর: আপনার বোনের জন্য অপরিহার্য হলো তার চাচার ছেলে তথা চাচাতো ভাই থেকে পর্দা করা, যিনি তার মাহরামদের অন্তর্ভুক্ত কেউ নন, যদিও তিনি আত্মীয় হন এবং যদিও তার (চাচার) কন্যাকে তার ভাইয়ের নিকট বিয়ে দেওয়া হয়। কারণ, বোনের স্বামী তথা দুলাভাই হলেন পরপুরুষ আর অনুরূপভাবে ভাবির পিতা এবং তাদের মত করে অন্যরাও তার জন্য পরপুরুষ বলে গণ্য হবে।
শাইখ আবদুল্লাহ ইবন আবদির রহমান আল-জিবরীন
📄 Menstruation
প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলাদের জরায়ু (uterus) থেকে প্রতিমাসে ৫-৭ দিন ধরে যে রক্তক্ষরণ হয় তার নাম মাসিক বা ঋতুস্রাব (Menstruation)। গর্ভবতী না হওয়া পর্যন্ত মহিলাদের এ ধরনের রক্তক্ষরণ বা ঋতুস্রাব প্রতি মাসে ঘটে থাকে। যদিও এটা দেহতাত্ত্বিক ঘটনা (Physiological phenomenon)। আল কোরআন এটাকে Hurt and pollution বলেছে যার পেছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তি রয়েছে।
একজন ব্রিটিশ মহিলা ডাক্তার, ক্যাথেরিন ডালটন ১৯৫৯-১৯৬১ সন সময়কাল ধরে হাসপাতালে, রেস্তোরায় এবং জেলখানায় কাজ করে এমন বালিকাদের মাসিক রক্তক্ষরণ কার্যকারিতার উপর গবেষণা চালিয়েছিলেন। তিনি এ গবেষণায় যেসব তথ্য উপস্থাপিত করেছিলেন সেগুলি হলো মাসিক শুরু হওয়ার ঠিক আগে কিংবা মাসিক চলাকালে বালিকাদের কর্মদক্ষতা কিংবা দৈহিক উপযুক্ততা অনেকখানি কমে যায়। ডাঃ ক্যাথেরিন আরও উল্লেখ করেছেন যে, এ সময়ে অবসন্নতা, অমনোযোগিতা এবং দৈনন্দিন কাজ-কর্মের প্রতি অনীহা ২৬%-৩৬% বৃদ্ধি পায়। তিনি আরো লিখেছেন যে, ৬ষ্ঠ গ্রেডের ছাত্রীদের মধ্য থেকে ১১ জনকে Class Captain বানানো হয় যাদের বয়সসীমা ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। এসব Class Captain-দের ক্ষমতা দেয়া হয় ক্লাসে দুষ্ট ছাত্রীদের শাসন করার জন্য। এটা বেশ মজার ব্যাপার যে, এসব শ্রেণী সরদাররা নিজেদের ঋতুস্রাবকালে তাদের অধীনস্ত ছাত্রীদের উপর শাস্তি প্রয়োগের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আবার মাসিক বন্ধ হয়ে গেলে স্বাভাবিক স্বভাবে ফিরে আসে। সুতরাং ডাঃ ক্যাথারিন ডালটনের গবেষণা থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, ঋতুস্রাব শরীর ও মনের উপর ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
বিখ্যাত স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ Wilfrid shaw বলেছেন, "A feeling of uneasiness during normal menstruation, specially in the lower abdomen is quite common. Some girls get severe pain during the first period and in some, pain may last throughout life during each menstruation."
According to Dr. Joan Graham, "Since there is chance of spreading disease and getting infection during menstruation, it cannot be regarded as absolutely normal and physiological".
চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এ তথ্য প্রমাণ করেছেন যে, ঋতুস্রাব কালে স্বামী-স্ত্রীর যৌন মিলন উভয়ের স্বাস্থ্যের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি রোগ জীবাণু সংক্রমণের সম্ভাবনা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কারণ এ সময় জরায়ুর মুখ খোলা থাকে। যার ফলে বাইরে থেকে রোগ জীবাণুর দ্বারা সংক্রমণের বিশেষ অবকাশ থাকে যদি এ সময় যৌন মিলন ঘটে। জরায়ুর দু'পার্শ্বে দু'টি ফ্যালোপিয়ান নামক টিউব থাকে। যাদের মাধ্যমে জরায়ু সরাসরি তলপেটের গহ্বরের সঙ্গে সংযুক্ত। এ সংযুক্তির কারণে সংক্রমণ-বিস্তৃতি খুবই বিপদজনক। অধিকন্তু নারীর যৌন নালীতে যদি গণোরিয়া ও সিফিলিসের মত রোগের সংক্রমণ থাকে তবে ঐ সংক্রমণ দ্রুত ভেতরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমণ এভাবে ছড়িয়ে পড়ার কারণে Endometritis, Salpingitis, peritonitis এবং এমনকি pelvic cellulitis রোগ স্ত্রীদেহে সংক্রমিত হয়।
একথা সবাই স্বীকার করবেন যে, স্বামী-স্ত্রীর যৌন মিলন একটি আবেগ তাড়িত উত্তেজনাপূর্ণ ব্যাপার। এ কারণে মাসিক কালে যৌন মিলন ঘটলে স্বাস্থ্যসম্মত বিধি-নিষেধ নিয়ন্ত্রণ সীমার মধ্যে থাকে না। তাই জরায়ুর মুখ যেহেতু খোলা থাকে তখন স্ত্রীর অংশীদার স্বামীর শরীরে রোগ সংক্রমণের অবকাশ থাকে। এটা খুবই সত্য।
ডাঃ গ্রাহামের মতে, "ঋতুকালে স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার বিষয়টি মনস্তাত্বিক নয় বরং স্বাস্থ্যগত।"
সুতরাং বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ঋতুস্রাব এক ধরনের অসুস্থতা এবং অপবিত্রতা। তাই এ সময় স্বামী-স্ত্রী দৈহিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা খুবই সঙ্গত যা মহান কোরআন ১৪০০ বছর পূর্বে আমাদেরকে তথা মানব জাতিকে সতর্ক উপদেশ দিয়েছে।
يَسْتَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ ۖ قُلْ هُوَ أَذًا فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ
They ask you (O Mohammad-s:) concerning menstruation, say, it is hurt and pollution. So keep away from women during menstruation and go not unto them till they are cleansed. And when they have purified themselves, then go in unto them as Allah has enjoined upon you. Truly Allah loves those who turn unto Him and loves those who care for cleanness.
লোকেরা আপনাকে (হে মুহাম্মদ সাঃ) জিজ্ঞেস করে মহিলাদের ঋতুস্রাব সম্পর্কে। আপনি বলুন, এটা তো এক রকম অসুস্থতা ও অপবিত্রতা। সুতরাং এ সময় স্ত্রীদের কাছ থেকে পৃথক অবস্থানে থাক এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হইও না। যখন তারা পবিত্র হয়ে যাবে তখন আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক তাদের সান্নিধ্য উপভোগ কর। সত্য সত্যই আল্লাহপাক তাদের ভালবাসেন যারা তার আদেশের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। আর ভালবাসেন তাদের যারা শুচিতা সম্পর্কে যত্নবান। (বাকারা-২২২)
Yusuf Ali আরবী أَذًا (আযান) শব্দের অনুবাদ করেছেন 'Hurt and pollution'। এ শব্দের আরও একটি অর্থ হলো impurity বা অপবিত্রতা। উভয় অর্থই এ আয়াতে প্রয়োগ করা হয়েছে।
সুতরাং ঋতুস্রাব কালে আল্লাহ তাআলা স্ত্রী মিলন নিষিদ্ধ করেছেন যা চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা গ্রহণ করেছেন। এছাড়া এ সময়ে স্ত্রী মিলন একজন রুচিসম্পন্ন পুরুষের কাছে অশুচিমূলক অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়। এটা আল্লাহপাকের নির্দেশ বহির্ভূত কাজ। যারা আল্লাহর এ নির্দেশ অমান্য করে তারা নানারকম অসুখে জর্জরিত হয়ে পড়ে। তাই দাম্পত্য জীবন সুখকর হয় না।
একটি ডিম্বাণুর (ovum) ভেতর একটি শুক্রাণু (sperm) প্রবেশ করে নিষেক ঘটাতে পারলেই ভ্রূণ সৃষ্টি হয়। কিন্তু অনেক সময় দু'টি ভ্রূণ সৃষ্টির ফলে দু'টি শিশুর জন্ম হয়ে থাকে। এদের বলা হয় যমজ (twin) শিশু। কোন কোন যমজ শিশু দেখতে একই রকম এবং এদের চরিত্রের সমস্ত বৈশিষ্ট্যও একই রকম হয়ে থাকে। এদেরকে বলা হয় মনোজাইগোটিক যমজ (monozygotic twin)। এ যমজরা একটি মাত্র নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে জন্ম নেয়। অর্থাৎ একটি ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার পরে যে প্রথম কোষ বা জাইগোট তৈরী হয় তা ভ্রূণে পরিণত হওয়ার আগে বিভাজিত হয়ে দু'টি আলাদা ভ্রূণ সৃষ্টি করে। এরা মাতৃগর্ভে পাশাপাশি একই সঙ্গে দু'টি শিশুতে রূপান্তরিত হয়। এক্ষেত্রে কেবল মাত্র দু'টি ছেলে বা দু'টি মেয়ে যমজ হিসেবে জন্ম নেয়। এদের দেখলে মনে হয় যেন একজন আর একজনের ক্লোনিং বা কপি।
আবার সম্পূর্ণ আলাদা দেখতে যেসব যমজ শিশু, তাদের জন্ম হয় যখন দু'টি ডিম্বাণু (ovum) আলাদাভাবে দু'টি শুক্রাণু (sperm) দ্বারা নিষিক্ত হয়। অর্থাৎ এক্ষেত্রে দু'টি পৃথক জাইগোট তৈরী হয়। তারা মাতৃগর্ভে দু'টি ভ্রূণ সৃষ্টি করে।
এ ধরনের যমজদের ডাইজাইগোটিক যমজ (Dizygotic twin) বলে। এ যমজদের ক্ষেত্রে দু'টি ছেলে বা দু'টি মেয়ে অথবা একটি ছেলে ও একটি মেয়ে জন্ম নিতে পারে। এদের চেহারা এবং চরিত্র আলাদা হয়ে থাকে। কারণ শিশু দু'টি পৃথক জাইগোট থেকে জন্ম নিয়ে থাকে।
أَلَمْ يَكُ نُطْفَةً مِنْ مَنِي يُمْنَى . ثُمَّ كَانَ عَلَقَةً فَخَلَقَ فَسَوَّى . فَجَعَلَ مِنْهُ الزَّوْجَيْنِ الذَّكَرَ وَالْأُنثَى
Was he not a nutfah emitted? then did he become a blastocyst (Alag); then He (Allah) Shaped and perfected him, then He made him in pairs males and females.
সে কি স্খলিত নুৎফা ছিল না? অতঃপর তাকে রক্তপিন্ডে পরিণত করা হয়। এরপর আল্লাহ তাকে আকার দান করেন এবং সুবিন্যস্ত করেন। এরপর তা থেকে সৃষ্টি করেন যুগল নর-নারী। (কেয়ামাহঃ ৩৭-৩৮)
প্রশ্ন: আমার এক বান্ধবী বলে যে, সে তার সমাজের মাহরাম নন এমন কিছু পুরুষের সাথে বসতে বাধ্য হয়, অথচ সে পরিপূর্ণভাবে পর্দা মেনে চলে। তারপর তারা তাকে ও তার সন্তান-সন্ততিকে সালাম প্রদান করে এমতাবস্থায় যে, তার স্বামী সেখানে অনুপস্থিত থাকে এবং সে এ ব্যাপারে জানে, কিন্তু সে (আমার বান্ধবী) এ অবস্থা বা প্রথাকে মেনে নিতে পারে না, তবে পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করেছে, (এমতাবস্থায় তার করণীয় কী)?
উত্তর: আমরা ঐ নারীকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তিনি যেন ঐসব পরপুরুষের সাথে না বসেন, যদিও তারা তার সমাজের অন্তর্ভুক্ত কেউ হয়ে থাকে, এমনকি যদিও তিনি তার চেহারা অন্যান্য অঙ্গ ঢেকে রাখেন। ক্ষমারযোগ্য হবে যখন দেয়ালের পেছন থেকে অথবা পর্দার আড়াল থেকে অথবা নারীদের মাঝে তাদের পক্ষ থেকে শুধু সালাম দেওয়া হবে, অতঃপর ঐ একসাথে বসা ও সামাজিকতার ক্ষেত্রে স্বামীর সম্মতি (শরী'আত কর্তৃক) সমর্থনযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না; তবে এ বিষয়টি একান্ত নির্জনে একসাথে বসা এবং বেপর্দা অবস্থায় খোলামেলাভাবে একসাথে বসার চেয়ে লঘু অপরাধ, আর এর থেকে দূরে থাকাটাই উত্তম, আর নারীর জন্য সবচেয়ে উত্তম হলো এমন নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করা, যাতে সে পুরুষদেরকে না দেখে এবং তারাও তাকে না দেখে।
আর একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।
শাইখ আবদুল্লাহ ইবন আবদির রহমান আল-জিবরীন
📄 ভ্রূণের ক্রমবিকাশ
ভ্রূণের ক্রমবিকাশ
وَقَدْ خَلَقَكُمْ أَطْوَارًا .
And He who created you in diverse stage.
তিনি আল্লাহ, যিনি তোমাদেরকে বিভিন্ন স্তর থেকে সৃষ্টি করেছেন। (নূহ-১৪)
মাতৃগর্ভে একটি মানব শিশু পরিপূর্ণতা লাভ করে স্তরের পর স্তর অতিক্রম করে। এটি এমন একটি জটিল প্রক্রিয়া যা সংঘটিত হয় দয়াময় আল্লাহপাকের রহমতের উপস্থিতিতে। মাতৃগর্ভে ভ্রূণ সৃষ্টি হওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ Sperm এবং Ovum থেকে শুধুমাত্র একটি Sperm এবং একটি Ovum প্রয়োজন। উভয় কোষের নিষেক হওয়া মাত্রই যে কোষটি গঠিত হয় তার নাম Zygote। জাইগোট জরায়ুতে (uterus) প্রতিস্থাপিত হওয়ার পর পিটুইটারি গ্রন্থি, ডিম্বাশয় এবং অমরা (placenta) নিঃসৃত বিভিন্ন হরমোনের প্রভাবে মাতৃদেহের পরিবর্তনগুলো ক্রমান্বয়ে বিকাশ লাভ করে এবং প্রতিস্থাপিত জাইগোট ক্লিভেজ প্রক্রিয়ায় দ্রুত বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্তরের সূচনা করে। ব্রিটিশ ভ্রূণতত্ত্ববিদ Von Baer, ১৮২৭ সালে ভ্রূণ বিকাশের স্তর (stage) গুলো আবিষ্কার করেন।
৭ম শতাব্দীতে অবতীর্ণ আল-কোরআন ভ্রূণ বিকাশের পর্যায়গুলো বিভিন্ন সূরায় খণ্ডিতভাবে বর্ণনা দিয়েছে। আবার সূরা মু’মিনুনের ১২-১৫ নং আয়াতে এ পর্যায়গুলো ক্রমান্বয়ে সাজিয়ে উপস্থাপন করেছেন যা বিজ্ঞানসম্মতভাবে ধারাবাহিক সামঞ্জস্যতা বিধান করে।
নিম্নে আল-কোরআন এবং বিজ্ঞানে বর্ণিত ভ্রূণ সৃষ্টির পর্যায়গুলো পাশাপাশি সাজিয়ে দেখানো হলো,
আল-কোরআন বিজ্ঞান
১। সুলালাহ (সার নির্যাস) ১। Sperm (n) + Ovum (n) (প্রজনন কোষ)
২। নুৎফা (অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দৃষ্ট প্রজনন কোষ) ২। Zygote (নিষিক্ত কোষ)
৩। আলাক (জমাট রক্তপিণ্ড) ৩। Blastocyst (রক্তপিণ্ড)
৪। মুদগাহ (মাংসপিণ্ড) ৪। Somites (বহুকোষী মাংসপিণ্ড)
৫। ইযাম (অস্থি) ৫। Skeleton (কঙ্কাল বা অস্থি তন্ত্র)
৬। লাহম (মাংসপেশী) ৬। Muscles (মাংসপেশী)
৭। রূহ (প্রাণ) ৭। Foetus (মানব শিশু)
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ طِينٍ . ثُمَّ جَعَلْنَهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَكِينٍ . ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ।
Verily, We created man from the best extraction from clay, then We placed him as a nutfah (zygote) in a safe custody (uterus) firmly fixed, then out of that nutfah, We created blastocyst (Alaq-a leech like substance), then that blastocyst, We made somites (Mudgha-a chewed like mass), then that We made out of that Somites the skeleton (izam) and clothed the Skeleton with muscles (Lahm); then We developed it into a different shape (Human baby). So, blessed be Allah the best of the creators.
প্রকৃতপক্ষে, আমরা মানুষ সৃষ্টি করেছি মাটির সার নির্যাস থেকে। পরে তা নুৎফা (জাইগোট) রূপে একটি সুরক্ষিত আধারে (জরায়ু) স্থাপন করেছি। অতঃপর তা জমাট রক্তপিণ্ডে (জোঁক সদৃশ বস্তু) রূপান্তর করে লটকে দিয়েছি। তারপর লটকে যাওয়া রক্তপিণ্ডকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছি। এরপর তাকে অস্থি বানিয়েছি। তারপর অস্থির উপর মাংসপেশী জড়িয়ে দিয়েছি। অবশেষে তাকে একটি ভিন্ন রূপ (পূর্ণশিশু) দান করেছি। সুতরাং তিনি মহামহিম আল্লাহ তা'আলা যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মহান স্রষ্টা। (মু'মিনুন-১২-১৫)
১. সুলালাহ্-----sperm+ovum (n+n)
আল কোরআনে প্রথম পর্যায়কে বলা হয়েছে মাটির সার নির্যাস (سلالة من طين) অর্থাৎ মাটির সার নির্যাস থেকে মানুষ সৃষ্টির সূচনা হয়। তাহলে মাটির সার নির্যাস কি?
মাটির সার নির্যাস হচ্ছে সোডিয়াম (Na), ক্যালসিয়াম (Ca), ম্যাগনেসিয়াম (Mg), পটাসিয়াম (k), হাইড্রোজেন (H₂), অক্সিজেন (02), নাইট্রোজেন (N₂) ইত্যাদি। বৃক্ষরাজি এবং ক্ষেতের ফসল মূলের সাহায্যে এগুলো চুষে নেয়। তারপর বৃক্ষফল (আম, কাঁঠাল, আপেল, আঙ্গুর, কলা) দেয়। ক্ষেতে ফসল (ধান, গম, ভুট্টা, যব) উৎপন্ন হয়। ফল এবং ফসলগুলো মানুষ খাদ্য রূপে গ্রহণ করার পর পাকস্থলিতে ডাইজেস্ট হয়। ডাইজেস্টিভ খাদ্যের সার নির্যাস থেকে জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পুরুষের শুক্রাশয়ে (testes) উৎপন্ন হয় Spermatozoon এবং নারীর ডিম্বাশয়ে (ovary) উৎপন্ন হয় Ovum। অতঃপর Spermatozoon এবং Ovum এর নিষেক থেকে সৃষ্টি হয় Zygote। জাইগোট জরায়ুতে (uterus) স্থানান্তরিত হয়ে ভ্রূণ (embryo) গঠন করে। আর এ ভ্রূণ ক্রমান্বয়ে রূপান্তরের মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ মানুষ সৃষ্টি হয়।
সুতরাং 'সুলালাহ' হচ্ছে মানুষ তৈরির বেসিক উপাদান যা থেকে মানুষ সৃষ্টির মলিকিউল আহরিত হয়। অর্থাৎ পিতা মাতার পুষ্টির প্রয়োজনে মাটির সার নির্যাস থেকে যেসব উপাদান সংগৃহীত হয় সেসব উপাদান থেকে নুৎফা তৈরি হয়।
২. নুৎফা ...... জাইগোট
আরবী 'নুৎফা' শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দৃষ্ট অতি সূক্ষ্ম জনন কোষ। Sperm এবং Ovum উভয় অর্থে নুৎফা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আবার Sperm এবং Ovum এর নিষেকের ফলে গঠিত কোষ, জাইগোটকেও কোরআনে নুৎফা বলা হয়েছে এবং এক্ষেত্রে নুৎফা শব্দের পরে 'আমসাজ' (أَمْشَاج) শব্দটি এসেছে। জাইগোট গঠনের ২৪ ঘণ্টার পর তা বাচ্চাথলির দেয়ালে ঘেরা প্রকোষ্ঠে স্থান লাভ করে এবং ২টি, ৪টি, ৮টি এভাবে ক্রমান্বয়ে বিভাজন হতে থাকে। এটাকে বলা হয় Morula।
৩। আলাক....... ব্লাস্টোসিস্ট
আলাক অর্থ জমাট বাঁধা রক্তপিণ্ড। বিজ্ঞানে বলা হয় Blastocyst। এটি দেখতে জোঁকের মতো (Leech like substance), একটি জোঁক রক্ত চুষে নিয়ে যে রূপ ধারণ করে আলাক সে রকম একটি বস্তু। ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে আলাক জোঁক সদৃশ রূপ লাভ করে। এর মধ্যে থাকে মাথার সম্মুখভাগের উন্নত অংশ। এ পর্যায়ে হৃৎপিণ্ড অর্থাৎ Cardiovascular system এর উন্নয়ন ঘটে এবং ভ্রূণটি পুষ্টির জন্য তার মাতৃ রক্তের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে ১৫-১৬ দিনের মাথায় আলাক বাচ্চাদানির দেয়ালে ঝুলন্ত দেহবস্তুর মতো ঝুলে থাকে। তাই আরবী আলাক শব্দের তিনটি অর্থ বিজ্ঞানসম্মতভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এক- জমাট রক্তপিণ্ড, দুই- জোঁক সদৃশ বস্তু এবং তিন- ঝুলন্ত দেহবস্তু।
৪। মুদগাহ....... সোমাইটস
আরবী 'মুদগাহ' শব্দের অর্থ মাংসপিণ্ড। বিজ্ঞানে এটাকে Somites বলা হয়। ব্লাস্টোসিস্ট এর বাইরের স্তর ট্রফোব্লাস্ট নিঃসৃত এনজাইমের প্রভাবে প্রাচীর কলা (Tissue) বিগলিত হলে ব্লাস্টোসিস্ট নিমজ্জিত হয়। যার ফলে Blastocyst সোমাইটস-এ পরিণত হয়। কোরআনে যার নাম উল্লেখ করা হয়েছে মুদগাহ। এ প্রক্রিয়া অন্তত ২০-৪২ দিন পর্যন্ত চলে। মুদগাহ অবস্থায় ভ্রূণকে প্রকৃতপক্ষে চর্বন বস্তুর মতো (chewed like substance) দেখায়। তখন ১৩টি খাঁজকাটা মাংসপিণ্ডের ব্লক ভ্রূণের শিরদাঁড়ায় সাজানো থাকে যেগুলোকে বলা হয় 'মেসোডার্মাল সেগমেন্ট (mesodermal segments)।
৫। ইযাম....... স্কেলেটন
ইজাম অর্থ অস্থি বা কঙ্কাল। বিজ্ঞানে এটাকে Skeleton বলা হয়েছে। এ পর্যায়ে প্রথমে যে অস্থিগুলো দেখা দেয় সেগুলো হচ্ছে উপরিভাগের কচি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। প্রাথমিক ৬ সপ্তাহে কচি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মেসেনকাইমাল টিস্যুগুলো (mesenchymal tissue) কোমল অস্থিতে পরিণত হয়ে ভবিষ্যৎ অস্থির স্বচ্ছ মডেল গঠন করে। ৬ সপ্তাহের শেষের দিকে উপরের দিকের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কঙ্কালের পূর্ণাঙ্গ কোমল মডেল প্রদর্শন করে। ১২ সপ্তাহের মধ্যে ভ্রূণের একটি ক্ষুদ্র পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল গঠিত হয়। মানব কঙ্কালে মোট ৩৬০টি জোড়া থাকে। এ স্তরে ৩৬০টি জোড়া সমৃদ্ধ কঙ্কালতন্ত্র সম্পূর্ণ হতে ১২ সপ্তাহ সময় লাগে। মানব কঙ্কাল মোট ২০৬টি হাড় দ্বারা গঠিত।
৬। লাহম....... মাসলস্
লাহম অর্থ মাংসপেশী। বিজ্ঞানে এটাকে Muscles stage বলা হয়। ৭ম সপ্তাহ থেকে কঙ্কালতন্ত্র বিস্তার লাভ করে এবং অস্থিগুলো যথাযথ আকার ধারণ করে। ৮ম সপ্তাহ থেকে অস্থির চারপাশে পেশীগুলো আবৃত হতে থাকে। ৮ম সপ্তাহ শেষ হলে নির্দিষ্ট পেশীতন্ত্র, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং মাথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ সময় ভ্রূণটি নড়াচড়া করতে সক্ষম হয়।
৭। রূহ....... ফিটাস
এটা সর্বশেষ স্তর। এ স্তরে মানব শিশু পরিপূর্ণতা লাভ করে। আরবী 'খালকান আখরা' অর্থ ভিন্ন আকার। গর্ভে থাকার পূর্ণ সময় পরে শিশু ভূমিষ্ঠ হয় অর্থাৎ আল্লাহপাকের ইচ্ছানুযায়ী শিশুটি আপন অস্তিত্বে মূর্ত হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানে এ পর্যায়কে Foetus বলা হয়েছে। Foetus অর্থ- "Miniature human baby"
Height/weight
30.00
20.00
10.00
0.00
60 80 100 120 140 160 180 200
Age in days
Development of Human Foetus in the uterus
height in cm.
weight in oz.
فَإِنَّا خَلَقْنَكُمْ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ مِنْ مُضْغَةٍ مُخَلَّقَةٍ وَغَيْرِ مُخَلَّقَةٍ لِنُبَيِّنَ لَكُمْ.
Then surely We created you from dust, then from Nutfah, then from a leech like clot (Alaq), then from a chewed like mass (Mudgah), partly formed and partly unformed so that We made our power manifest to you.
অবশ্যই আমরা তোমাদের সৃষ্টি করেছি মাটি থেকে। তারপর প্রজনন কোষ থেকে। তারপর রক্তপিণ্ড থেকে, তারপর মাংসপিণ্ড থেকে, যা কিছুটা আকৃতি প্রাপ্ত হয় কিছুটা আকৃতি বিহীন। যেন আমাদের ক্ষমতা তোমাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ে। (হজ্ব-৫)
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِّنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُّطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ يُخْرِجُكُمْ طِفْلًا.
It is He Who created you from earth, then from sperm and ovum (nutfah), then from blastocyst (Alaq), then does He get out as a child.
তিনি আল্লাহ যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে, তারপর নুৎফা থেকে, অতঃপর তোমাদের বের করেন একটি পরিপূর্ণ মানব শিশু রূপে। (মু'মিন-৬৭)
আধুনিক ভ্রূণতত্ত্ববিদগণ নিবিড়ভাবে ভ্রূণ বিকাশের পর্যায়গুলো পর্যবেক্ষণ করে আবিষ্কার করেন যে, প্রতিটি স্তর তিনটি পর্দা (Veils) দ্বারা সুরক্ষিত এবং এ সব আবরণী ভ্রূণকে শারীরিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে। বিজ্ঞানে পর্দাগুলো যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তা নিম্নরূপ:
১। জাইগোট আবরণী: (a) Corona radiata (b) Uterine wall (c) Abdominal Wall.
২। ব্লাস্টোসিস্ট আবরণী: (a) Placental membrane (b) Uterine wall (c) Abdominal wall.
৩। ফিটাস আবরণী: (a) Amnion (b) Chorion (c) Trophoblast.
বিজ্ঞানের সর্বশেষ আবিষ্কার এ পর্দা বা আবরণী সম্পর্কে আল-কোরআন বলেছে,
يَخْلُقُكُمْ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ خَلْقًا مِّنْ بَعْدِ خَلْقٍ فِي ظُلُمَاتٍ ثَلَاثٍ
He Created you in the wombs of your mother from one stage to another always in three Veils of darkness.
আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাতৃগর্ভে এক স্তর থেকে অন্য স্তরে তিনটি গাঢ় পর্দার ভেতর থেকে। (যুমার-৬)
Some Anatomists do, however, differ; they say the Quranic verse might have meant as follows:
১। The three veils of a secondary Oocyte are: a) The corona radiata b) The Zona pellucida c) The Uterine wall.
২। The three veils of Uterine wall are: a) The perimetrium b) The myometrium c) The endometrium
৩। The three veils of endometrium are: a) The basal layer b) The mid-spongy layer c) The compact layer.
দেখা যাচ্ছে প্রতিটি স্তরে তিন ধরনের কুশলী আবরণী বা পর্দা (veil) রয়েছে, যেগুলো ভ্রূণকে নিরাপদ সংরক্ষণের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে। উপরোক্ত আয়াতে বিভিন্ন স্তরে তিন প্রকার সুদৃঢ় পর্দার (Three veils) ধারণা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রশ্ন: কেন ইসলাম মাহরাম নন এমন পুরুষের সঙ্গে নারীদেরকে মুসাফাহ করতে নিষেধ করেছে? আর যে ব্যক্তি কামভাব ব্যতিরেকে (তার স্ত্রীর সাথে) মুসাফাহ করে তার অযু ভঙ্গ হয়ে যাবে কিনা?
উত্তর: ইসলাম এটাকে নিষিদ্ধ করেছে। কারণ, এটা একটা বড় ধরনের ফিতনা যে, একজন পুরুষ তার মাহরাম নন এমন একজন নারীর শরীর স্পর্শ করবে, আর ফিতনার উপলক্ষ বা কারণ এমন প্রতিটি বস্তু বা বিষয়কে ইসলাম নিষেধ করেছে, আর এ জন্যই শরী'আত এ ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী কাজটিকে প্রতিরোধ করার জন্য দৃষ্টিকে অবনমিত রাখার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে স্পর্শ করবে, তার সে স্পর্শ দ্বারা তার অযু নষ্ট হবে না, এমনকি যদিও তার স্পর্শ করার কাজটি কামভাবসহ হয়ে থাকে; তবে যখন এ স্পর্শের কারণে মযী (বীর্যের মতো পাতলা পানি) অথবা মনী (বীর্য) বের হয়ে যায়, তখন মনী (বীর্য) হলে গোসল করা আবশ্যক হয়ে যাবে এবং 'মযী' হলে যৌনাঙ্গ ধৌত করার সাথে সাথে অযু করা আবশ্যক হবে।
শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-'উসাইমীন