📘 Biggan moy quran > 📄 কোরআন থেকে বিজ্ঞান

📄 কোরআন থেকে বিজ্ঞান


যুহদ বা দুনিয়াবিমুখতার অর্থ হলো, দুনিয়ার লোভ-লালসা থেকে অন্তরকে পবিত্র রাখা। দুনিয়াকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়ার নাম যুহদ নয়। সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "আশা-আকাঙ্ক্ষার স্বল্পতাই হলো যুহদ। শুকনো খাবার খাওয়া আর আলখাল্লা পরিধানের নাম যুহদ নয়।”[২৪]
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রহিমাহুল্লাহ বলেন, যুহদ তিন পর্যায়ের: ১. হারাম বস্তু পরিত্যাগ করা, এটা সাধারণ মানুষের যুহদ বা পরহেজগারিতা। ২. প্রয়োজনের অতিরিক্ত হালাল বস্তু পরিত্যাগ করা বা যতটুকু দরকার তারচেয়ে বেশি গ্রহণ না করা। এটা হলো বিশেষ ব্যক্তিদের যুহদ। ৩. যুহদের উচ্চতর পর্যায় হলো, আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর প্রেমে বিঘ্নতা সৃষ্টিকারী জিনিস-সমূহ পরিত্যাগ করা। আল্লাহর নূর দ্বারা যাদের অন্তর আলোকিত। এটা তাদের বৈশিষ্ট্য।
প্রকৃত যাহিদ বা দুনিয়াবিমুখ কে? এমন প্রশ্নের জবাবে ইমাম যুহরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "হারাম বস্তু ও অর্থ তাঁর ধৈর্যকে পরাভূত করবে না এবং হালাল বস্তুর আধিক্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন থেকে তাকে বিরত রাখবে না।[২৫] অর্থাৎ, হারাম সম্পদ যদি তাঁর পায়ের কাছে বিপুল পরিমাণেও পড়ে থাকে, তবুও তিনি ধৈর্য ধারণ করবেন এবং এসব সম্পদ দূরে সরিয়ে দেবেন। আর হালাল সম্পদ আল্লাহর নিয়ামতরূপে গ্রহণ করবেন। উপকারী ও ভালো কাজে তা ব্যয় করবেন এবং সন্তুষ্টচিত্তে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবেন। ইবনু রজব হাম্বলি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্টিই যুহদের মূলকথা।”[২৬]
ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, যাহিদের দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন। তার পোশাকে আড়ম্বর থাকবে না, তার পানাহারে বিলাস থাকবে না। তিনি যেখানেই থাকবেন এবং যে অবস্থাতেই থাকবেন, সব সময় আল্লাহর নির্দেশ পালন করবেন। যারা সত্য ও সততার ওপর রয়েছে তারা তাকে বন্ধু মনে করবেন এবং বাতিলপন্থীরা তাকে ভয় করবে। তিনি হবেন উপকারী বৃষ্টির মতো। সবাই তার থেকে উপকার গ্রহণ করবে। তিনি এমন বৃক্ষের মতো যার পাতা কখনও ঝরে পড়ে না। যার ফলমূল, ডালপালা, এমনকি কাঁটাও উপকারী। তাঁর অন্তর সব সময় আল্লাহর প্রতি অনুরক্ত থাকে। আল্লাহর স্মরণে তার আত্মা প্রশান্ত হয়। তিনি বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ তাআলা সব সময় তার সঙ্গে রয়েছেন। [২৭]
ইসলাম সম্পূর্ণরূপে দুনিয়াকে পরিত্যাগ করতে বলে না। বরং যা কিছু আল্লাহ ও তাঁর বান্দার মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, তা পরিত্যাগ করতে বলে। যুহন্দের মৌলিক তাৎপর্য হলো-সব ধরনের পাপাচার ও সন্দেহজনক কাজ থেকে বিরত থাকা। চারিত্রিক সততা ও আত্মিক পবিত্রতা যুহদের পূর্বশর্ত। পাপ ও সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থেকে যুহৃদ ও তাকওয়া অর্জন সম্ভব নয়।
আমাদের সালফে সালেহীনগণ যুহদ-বিষয়ে অসংখ্য কিতাব রচনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইমাম আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি তাঁর 'কিতাবুয যুহদ ওয়ার রাকায়িক'-এর অনুবাদ। অনুবাদের ক্ষেত্রে আমরা ড. আহমদ ফরিদ কর্তৃক সম্পাদিত 'কিতাবুয যুহদ ওয়ার রাকায়িক'-এর ওপর নির্ভরশীল থেকেছি। [২৮] মূল কিতাবে হাদীসের সংখ্যাক্রম উল্লেখ করা হয়েছে ১২১০। কিন্তু একটি হাদীস অনুপস্থিত। সে হিসেবে মূল কিতাবে হাদীসের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২০৯। পাঁচটি হাদীসের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সনদ উল্লেখ থাকায় আমরা তা ফুটনোটে উল্লেখ করেছি। পাশাপাশি একটি হাদীস জাল চিহ্নিত হওয়ায় সেটিও বাদ দিতে হয়েছে। মূল নুসখায় সকল অনুচ্ছেদের শিরোনাম ছিল না। কিন্তু পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে আমরা প্রতিটি অনুচ্ছেদের নাম যুক্ত করে দিয়েছি। পাশাপাশি প্রতিটি হাদীসের জন্য আলাদা আলাদা শিরোনামও যুক্ত করা হয়েছে।
পাঠকদের বোধগম্যতার স্বার্থে অনুবাদ মূলানুগ থেকেও সাবলীল করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। বোদ্ধা পাঠকদের নজরে যদি কোনো ভুল পরিলক্ষিত হয়, তবে আমাদের তা জানানোর জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। বইটি প্রকাশের সকল স্তরে যারা শ্রম ও প্রচেষ্টা ব্যয় করেছেন তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। আল্লাহ তাআলাই উত্তম তত্ত্বাবধায়ক।
আবদুস সাত্তার আইনী abdussattaraini@gmail.com

টিকাঃ
[২৪] জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম।
[২৫] প্রাগুক্ত।
[২৬] প্রাগুক্ত।
[২৭] প্রাগুক্ত।
[২৮] দারু ইবনিল জাওযি, কায়রো, মিসর থেকে ২০১১ সালে যে সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

আরবীতে বলা হয়: هجد الرجل লোকটি রাতে ঘুমিয়েছে। هجد রাতে সালাত আদায় করেছে আর المتهجد হচ্ছে ঘুম থেকে উঠে সালাতে দণ্ডায়মান ব্যক্তি।'

টিকাঃ
১. দেখুন: 'লিসানুল আরব', লি ইবন মানযুর, বাবুদ্দাল, ফাসলুল হা: (৩/৪৩২); 'আল- কামুসুল মুহিত' লিল ফিরুজ আবাদি, বাবুদ্দাল, ফাসলুল হা: (পৃ.৪১৮)।

আল-হামদুলিল্লাহ, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য আর সালাত ও সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। অতঃপর....
আমি ২৪/০৭/১৪০৪ হি. তারিখে প্রকাশিত রাজনৈতিক সংবাদপত্রের ৫৬৪৪ সংখ্যায় সান'আ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানের সাথে সম্পর্কিত একটি লেখার ব্যাপারে অবগত হয়েছি, যাতে তিনি বর্ণনা করেছেন, ছাত্রদের থেকে ছাত্রীদেরকে আলাদা করার দাবি উত্থাপন করাটা শরী'আত বিরোধী, আর তিনি নারী-পুরুষ একসাথ হয়ে সহশিক্ষার বৈধতার ব্যাপারে দলীল পেশ করে বলেন যে, মুসলিমগণ পুরুষ ও নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে একই মসজিদে সালাত আদায় করতেন এবং তিনি বলেন: (আর এ জন্যই শিক্ষার কাজটি একই জায়গায় হওয়া আবশ্যক)। আর একটি ইসলামী দেশের একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানের পক্ষ থেকে এ ধরনের বক্তব্য প্রকাশকে আমার কাছে উদ্ভট মনে হয়েছে, যার কাছ থেকে নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে তার জাতি এমন দিকনির্দেশনা আশা করে, যাতে দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের সৌভাগ্য ও মুক্তির ব্যবস্থা থাকবে; সুতরাং إنا لله وإنا إليه« راجعون ولا حول ولا قوة إلا بالله "আমরা তো আল্লাহরই, আর নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী, আর আল্লাহর সাহায্য ছাড়া পাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকার এবং সৎকাজ করার কেনো ক্ষমতা আমাদের নেই"।
আর কোনো সন্দেহ নেই যে, এ কথার মধ্যে ইসলামী শরী'আতের ওপর বড় ধরনের অপবাদ আরোপ করা হয়েছে। কারণ, ইসলামী শরী'আত আদৌ নারী ও পুরুষে সহাবস্থানের দিকে আহ্বান করে নি; বরং শরী'আত এটাকে নিষেধ করে এবং এ ব্যাপারে কঠোরতা আরোপ করে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى ) [الاحزاب: ٣٣]
"আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন জাহেলী যুগের প্রদর্শনীর মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না”। [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৩]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:
﴿يَأَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا ﴾ [الاحزاب: ٥٩]
"হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু"। [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৯]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:
﴿وَقُل لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ ءَابَابِهِنَّ أَوْ ءَابَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَابِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَا بِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ ﴾ [النور: ٣١]
"আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে, আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ থাকে। আর তারা তাদের গলা ও বুক যেন মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখে। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীরা ও তাদের মালিকানাধীন দাসী ছাড়া কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে”। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:
﴿وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَسْتَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَظْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ﴾ [الأحزاب: ٥٣]
“তোমরা তার পত্নীদের কাছ থেকে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এ বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য বেশি পবিত্র”। [সূরা আল- আহযাব, আয়াত: ৫৩]
আর এসব আয়াতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে নারীদেরকে সার্বক্ষণিক তাদের ঘরের মধ্যে অবস্থান করার বিধানের ব্যাপারে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জাহেলী যুগের প্রদর্শনীর মতো তাদের নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়ানোর ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন, আর জাহেলী যুগের প্রদর্শনী মানে পুরুষদের মাঝে তাদের সৌন্দর্য ও আকর্ষণীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ প্রকাশ করে বেড়ানো। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন:
﴿مَا تَرَكْتُ بَعْدِى فِي النَّاسِ فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ»
"আমি আমার পর জনগণের মাঝে পুরুষদের জন্য মেয়েদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর আর কোনো ফিতনা ছেড়ে যাচ্ছি না।"¹
হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ, উসামা ইবন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম মুসলিম রহ, তাঁর 'আস-সহীহ' গ্রন্থে হাদীসটি উসামা ইবন যায়েদ ও সা'ঈদ ইবন যায়েদ ইবন 'আমর ইবন নুফাইল রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণনা করেছেন। আর সহীহ মুসলিমে আবু সা'ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন:
إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ، وَإِنَّ اللهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا فَيَنْظُرَ كَيفَ تَعْمَلُونَ، فَاتَّقُوا الدُّنْيَا وَاتَّقُوا النِّسَاء؛ فَإِنَّ أَوَّلَ فِتْنَةِ بَنِي إسرائيلَ كَانَتْ فِي النِّسَاءِ»
"নিশ্চয় দুনিয়া মিষ্ট ও আকর্ষণীয়, আল্লাহ তোমাদেরকে দুনিয়ায় তাঁর প্রতিনিধি করেছেন, যাতে তিনি দেখে নিতে পারেন তোমরা কেমন কাজ কর। কাজেই দুনিয়া থেকে বাঁচো এবং নারীদের (ফিতনা) থেকেও বাঁচো। কারণ, বনী ইসরাঈলদের প্রথম ফিতনা নারীদের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছিল।"²
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যিই বলেছেন। কারণ, তাদের কারণেই বড় ধরনের ফিতনা হয়ে থাকে বিশেষ করে এ যুগে, যখন অধিকাংশ নারী পর্দা খুলে ফেলেছে এবং জাহেলী যুগের প্রদর্শনীর মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াচ্ছে, আর এর কারণে অশ্লীলতা ও খারাপি বহুগুণে বেড়ে গেছে, আর বহু দেশে অনেক যুবক ও যুবতী আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক শরী'আতের বিধিবদ্ধ করে দেওয়া বিবাহ থেকে বিরত থাকছে। আর আল্লাহ তা'আলা পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, 'পর্দা ব্যবস্থাপনা নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের হৃদয়ের জন্য বেশি পবিত্র।' সুতরাং এটা নির্দেশনা প্রদান করে যে, পর্দার বিধান ধ্বংস হয়ে যাওয়াটা তাদের সকলের হৃদয় কলুষিত হওয়ার এবং সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার সম্ভাব্যতর একটি উপায়, আর সর্বজনবিদিত যে, লেখাপড়ার আসনে ছাত্রের সাথে ছাত্রীর বসাটা ফিতনার অন্যতম বড় ধরনের একটি কারণ এবং সাথে সাথে পর্দাকে বর্জন করারও একটি জ্বলন্ত উদাহরণ, যে পর্দাকে আল্লাহ তা'আলা মুমিন নারীগণের জন্য শরী'আতের বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ তা'আলা সূরা আন-নূরের পূর্বে উল্লিখিত আয়াতে যাদের বর্ণনা দিয়েছেন তারা ভিন্ন অন্যান্য পরপুরুষের জন্য তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করতে তাদেরকে নিষেধ করেছেন, আর যে ব্যক্তি বলে যে, পর্দার নির্দেশটি 'উম্মুহাতুল মুমিনীন' তথা মুমিনজননীগণের জন্য খাস বা নির্দিষ্ট, সে ব্যক্তি বাস্তবতা থেকে দূরে সরে গেল এবং এমন বহু দলীল- প্রমাণের বিপরীতে অবস্থান নিল, যেসব দলীল ব্যাপকভাবে সকল যুগের সকল নারীকে (পর্দার বাধ্যতামূলক বিধানের) অন্তর্ভুক্ত করে; এমনকি সে আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণীর পরিপন্থী কথা বলল, যাতে তিনি বলেছেন: ذَلِكُمْ أَظْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ [الاحزاب: ٥٣]
"এ বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য বেশি পবিত্র”। [সূরা আল- আ'রাফ, আয়াত: ১৫৮]
সুতরাং এ কথা বলা বৈধ হবে না যে, "পর্দা মুমিনজননীগণ ও পুরুষ সাহাবীগণের হৃদয়ের জন্য বেশি পবিত্র, তাদের পরবর্তীদের জন্য নয়।” বরং কোনো সন্দেহ নেই যে, 'উম্মুহাতুল মুমিনীন' তথা মুমিনজননীগণ ও পুরুষ সাহাবী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমের চেয়ে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের লোকজনের জন্য পর্দা মেনে চলার প্রয়োজন অনেক বেশি। কারণ, ঈমানের শক্তি ও সত্য উপলব্ধির ক্ষমতার ব্যাপারে তাদেরকে সেরা প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষায় উন্মুহাতুল মুমিনীনসহ সকল পুরুষ ও মহিলা সাহাবী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা 'আনহুম হলেন নবীগণের পর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ও সর্বোত্তম প্রজন্ম, যা সহীh বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং পর্দা যখন তাদের হৃদয়ের জন্য বেশি পবিত্র, তখন তাদের পরবর্তীগণের জন্য এ পবিত্রতার প্রয়োজন আরও অনেক বেশি এবং তারা তাদের পূর্ববর্তীগণের চেয়ে পবিত্রতার অনেক বেশি অভাব বোধ করে। তাছাড়া কুরআন ও সুন্নাহ'র মধ্যে বর্ণিত বক্তব্যগুলোর দ্বারা সাব্যস্ত কোনো বিধানকে, নির্দিষ্টকরণের বিষয়টিকে প্রমাণ করে এমন কোনে সহীহ দলীল ব্যতীত, উম্মাতের কোনো একজনের জন্য নির্দিষ্ট করা বৈধ নয়। সুতরাং এ বক্তব্যগুলো ব্যাপকভাবে যেমন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের উম্মতের জন্য প্রযোজ্য, ঠিক তেমনিভাবে তাঁর পরবর্তীতে কিয়ামত পর্যন্ত সকল উম্মতের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। কারণ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর যুগের ও তাঁর পরবর্তী কিয়ামত পর্যন্ত সকল যুগের ও কালের মানুষ ও জিন্ন জাতির নিকট প্রেরণ করেছেন। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا﴾ [الاعراف: ١٥٨] "বলুন, হে মানুষ! নিশ্চয় আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসূল”। [সূরা সাবা, আয়াত: ২৮]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:
﴿وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا﴾ [سبا: ٢٨] "আর আমরা তো আপনাকে সমগ্র মানুষের জন্যই সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি"। [সূরা সাবা, আয়াত: ২৮]
অনুরূপভাবে আল-কুরআনুল কারীমও শুধু নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের মানুষের জন্য নাযিল হয় নি, বরং তা তাদের জন্য ও তাদের পরবর্তী এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই নাযিল হয়েছে, যার নিকট (কিয়ামত পর্যন্ত) আল্লাহর কিতাব পৌঁছবে, যেমনটি আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿هَذَا بَلَاغٌ لِلنَّاسِ وَلِيُنذَرُوا بِهِ، وَلِيَعْلَمُوا أَنَّمَا هُوَ إِلَهُ وَاحِدٌ وَلِيَذَّكَّرَ أُولُوا الْأَلْبَابِ﴾ [ابراهيم: ٥২]
"এটা মানুষের জন্য এক বার্তা, আর যাতে এটা দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করা হয় এবং তারা জানতে পারে যে, তিনিই কেবল এক সত্য ইলাহ, আর যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে"। [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৫২]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:
﴿وَأُوحِيَ إِلَيَّ هَذَا الْقُرْآنُ لِأُنذِرَكُم بِهِ، وَمَنْ بَلَغَ﴾ [الأنعام: ١٩] "আর এ কুরআন আমার নিকট অহী করা হয়েছে যেন তোমাদেরকে এবং যার নিকট তা পৌঁছবে তাদেরকে এর দ্বারা সতর্ক করতে পারি”। [সূরা আল- আন'আম, আয়াত: ১৯]
নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে নারীগণ পুরুষদের সাথে সহাবাস্থান করতেন না, মসজিদেও না, আর বাজারেও না, যেমন সহাবস্থান করার প্রশ্নে সংশোধনকারীগণ নিষেধ করেন এবং আল-কুরআন, সুন্নাহ ও জাতির আলেম সমাজ যার ফিতনা থেকে সতর্ক ও সাবধান করেন; বরং নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মসজিদে নারীরা পুরুষদের পেছনে পুরুষদের শেষ কাতারের পরের কাতারে সালাত আদায় করতেন এবং তিনি নারীদের প্রথম সারি বা কাতারের সাথে পুরুষদের শেষ কাতারের ফিতনার আশঙ্কা থেকে সতর্ক করার জন্য বলতেন:
«خَيْرُ صُفُوفِ النِّسَاءِ آخِرُهَا، وَشَرُّهَا أَوَّلُهَا . وَخَيْرُ صُفُوفِ الرِّجَالِ أَوَّلُهَا، وَشَرُّهَا آخِرُهَا» "নারীদের সর্বোত্তম সারি বা কাতার হলো শেষ কাতার এবং সবচেয়ে মন্দ কাতার হলো তাদের প্রথম কাতার, আর পুরুষদের সর্বোত্তম কাতার হলো প্রথম কাতার এবং সবচেয়ে মন্দ কাতার হলো তাদের শেষ কাতার।"³
আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে পুরুষদেরকে (মসজিদ থেকে) প্রস্থানের সময় বিলম্ব করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হত, যাতে নারীগণ প্রস্থান করতে পারে এবং মসজিদ থেকে তারা এমনভাবে বের হতে পারে যাতে মসজিদের দরজায় তাদের সাথে পুরুষগণ মিশতে না পারে, অথচ তাঁরা পরুষ ও নারী নির্বিশেষে সকলে ঈমান ও তাকওয়ার যে মানে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, সে হিসেবে তাদের পরবর্তীগণের অবস্থা কেমন হওয়া উচিত? আর পুরুষদের সাথে ঘষাঘষি এবং রাস্তায় পথ চলার সময় পাস্পরের মাঝে সংস্পর্শের দ্বারা ফিতনার আশঙ্কা থেকে সাবধান ও সতর্ক করার জন্য নারীদেরকে রাস্তাজুড়ে চলতে নিষেধ করা হতো এবং রাস্তার প্রান্তসীমায় চলার জন্য নির্দেশ দেওয়া হতো, আর ফিতনার আশঙ্কা থেকে সতর্ক করার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মুমিন নারীদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়; যাতে তার দ্বারা তারা তাদের সৌন্দর্যকে ঢেকে রাখতে পারে এবং তিনি তাদেরকে ঐসব ব্যক্তি ব্যতীত অন্যসব পরপুরুষের উদ্দেশ্য তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন, যাদের নাম আল্লাহ তা'আলা তাঁর মহান গ্রন্থ আল-কুরআনে উল্লেখ করেছেন, যাতে ফিতনার কারণগুলোকে নির্মূল করা যায়, আর উৎসাহিত করা যায় পবিত্রতা ও সততার উপায় অবলম্বন করার ব্যাপারে এবং আরও উৎসাহিত করা যায় ফ্যাসাদ ও নারী-পুরুষের সহাবস্থানের বাহ্যিক দৃশ্য থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে।
সুতরাং কীভাবে সান'আ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানের (আল্লাহ তাকে হিদায়াত করুন এবং এসব কিছুর পরেও তাকে তাঁর সঠিক পথের দিশা দিন) জন্য নারী-পুরুষের সহাবস্থানের দিকে আহ্বান করা বৈধ হবে এবং কীভাবে বৈধ হবে এ দাবি করা যে, ইসলাম নারী-পুরুষের সহাবস্থানের দিকে আহ্বান করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মসজিদের মতো, আর লেখাপড়ার সময়গুলো সালাতের সময়ের মত?!
আর ঐ ব্যক্তির নিকট এটা জানা কথা যে, (পুরুষের পেছনে নারীদের সালাত আদায়ের বিষয়টির সাথে তাদের একই সাথে শিক্ষার বিষয়টির তুলনা করার মধ্যে) পার্থক্য অনেক বড় এবং ব্যবধান ও দূরত্ব অনেক বেশি, যে ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের ব্যাপারে সঠিকভাবে উপলব্ধি করে এবং আল্লাহ তা'আলার হিকমত সম্পর্কে জানে। আর কীভাবে একজন মুমিনের জন্য এ কথা বলা বৈধ হবে যে, লেখাপড়ার আসনে ছাত্রের বরাবর ছাত্রীর বসাটা পুরষের পেছনে তার বোনদের সারিতে তাদের সাথে বসার মতই; এ কথা এমন কোনো ব্যক্তি বলতে পারে না, যার সামান্য পরিমাণ ঈমান আছে এবং যা বলে তা বুঝার মতো যার ন্যূনতম বুদ্ধি বা উপলব্ধি আছে। আর আমরা যদি শরী'আতসম্মত পর্দার অস্তিত্ব বা বাস্তবতাকে স্বীকার করি, তাহলে কেমন লাগে, যখন লেখাপড়ার আসনে ছাত্রের সাথে একজন প্রদর্শনকারিনী ছাত্রী বসে পড়ে? 'লা-হাওলা ওয়া লা-কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' ) لا حول ولا قوة إلا بالله(। আর আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَرُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ﴾ [الحج: ٤٦] "বস্তুত চোখ তো অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হচ্ছে বুকের মধ্যে অবস্থিত হৃদয়” [সূরা আল-হজ, আয়াত: ৪৬]
আর তার (সান'আ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানের) কথা: (আর বাস্তবতা হলো মুসলিমগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে একই মসজিদে পুরুষ ও নারী সালাত আদায় করে আসছে, আর এ জন্যই শিক্ষার কাজটি একই জায়গায় হওয়া আবশ্যক) এর জবাব হলো: এ কথা বলাটা সহীহ; কিন্তু নারীগণ মসজিদের পেছনের অংশে পর্দাসহকারে ফিতনার যাবতীয় কারণ থেকে সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করে অবস্থান করতেন এবং পুরুষগণ অবস্থান করতেন মসজিদের সামনের অংশে; অতঃপর তারা (নারীরা) উপদেশ ও খুতবা শুনতেন, সালাতে অংশগ্রহণ করতেন এবং তারা যা শুনতেন ও দেখতেন, তা থেকে তারা তাদের দীনের বিধিবিধানসমূহ শিখে নিতেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিনে পুরুষদেরকে ওয়াজ নসীহত করার পর নারীদের নিকট যেতেন, অতঃপর তাঁর খুতবা শোনা থেকে তাদের দূরে থাকার কারণে তিনি তাদেরকে (পৃথকভাবে) ওয়াজ নসীহত করতেন ও উপদেশ দিতেন। আর এসব কিছুর মধ্যে কোনো সমস্যা নেই এবং কোনো অসুবিধাও নেই; বরং শুধু সমস্যা হলো সান'আ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানের (আল্লাহ তাকে হিদায়াত করুন, তার হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে দিন এবং তাকে তাঁর দীনের সঠিক বুঝ দান করুন) এ উক্তির মধ্যে, যাতে তিনি বলেছেন: “(আর এ জন্যই শিক্ষার কাজটি একই জায়গায় হওয়া আবশ্যক)।” তার জন্য কীভাবে বৈধ হবে আমাদের বর্তমান যুগে একই মসজিদে পুরুষদের পেছনে নারীগণের সালাত আদায় করার সাথে শিক্ষার বিষয়টিকে তুলনা করা, অথচ আজকের দিনে বিদ্যমান প্রচলিত শিক্ষার মধ্যে এবং নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে পুরুষদের পেছনে নারীগণের সালাত আদায় করার ঘটনার মধ্যে অনেক পার্থক্য ও ব্যবধান রয়েছে, আর এ জন্যেই সংস্কারপন্থীগণ শিক্ষাব্যবস্থায় পুরুষদের থেকে নারীদেরকে আলাদা করার দিকে আহ্বান করেন, যাতে তারা (নারীরা) আলাদা থাকবে এবং যুবকরাও আলাদা থাকবে, এমনকি নারীগণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো প্রকার পর্দা ও অসুবিধা ছাড়া একেবারে আরামে ও অনায়াসে শিক্ষা অর্জন করতে সক্ষম হবে। কারণ, সালাতের সময়কালের বিপরীতে শিক্ষার সময়কাল হলো অনেক লম্বা। কেননা একটি বিশেষ স্থানে অবস্থান করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে জ্ঞান অর্জন করা তাদের (নারীদের) সকলের জন্য নিরাপদ, যাবতীয় ফিতনা থেকে অনেক দূরে নিশ্চিন্ত অবস্থান এবং তাদের দ্বারা ফিতনার শিকার হওয়া থেকে যুবকদের জন্যেও সবচেয়ে নিরাপদ; তাছাড়া শিক্ষাব্যবস্থায় যুবকদেরকে যুবতীদের থেকে আলাদা করে দেওয়াটা তাদের জন্য নিরাপদ হওয়ার সাথে সাথে লেখাপড়ার প্রতি তাদের মনোযোগ, নিবিড় মনোনিবেশ করা এবং শিক্ষকগণের নিকট থেকে ভালোভাবে শ্রবণ করা ও তাদের থেকে জ্ঞান অর্জন করার সবচেয়ে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে, আর সাথে সাথে তারা দূরে থাকবে যুবতীদের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া ও তাদের নিয়ে ব্যস্ত থাকা থেকে এবং দূরে থাকবে তাদের পরস্পরের প্রতি বিষাক্ত নজর বা কুদৃষ্টি দেওয়া থেকে ও পাপাচারের দিকে ধাবিত করে এমন কথাবার্তা বলা থেকে।
আর তার (আল্লাহ তাকে সংশোধন করে দিন) চিন্তাধারা ও দাবি "ছাত্রদের থেকে ছাত্রীদেরকে আলাদা করার দিকে আহ্বান করাটা গোঁড়ামি ও শরী'আত বিরোধী" এটা একটা অযৌক্তিক দাবি; বরং এ ধরনের আহ্বান করাটা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই উপদেশ, তাঁর বান্দাগণের কল্যাণ কামনা করা, তাঁর দ্বীনের সংরক্ষণ করা এবং পূর্বে উল্লিখিত আল-কুরআনের আয়াতসমষ্টি ও হাদীস শরীফদ্বয়ের প্রতি আমল করা। আর সান'আ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানের প্রতি আমার উপদেশ হলো তিনি যেন আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করেন এবং তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তার জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট তাওবা করেন, আর ফিরে আসেন সঠিক ও সত্যের দিকে। কারণ, এ দিকে ফিরে আসাটাই হলো প্রকৃতপক্ষে মর্যাদার বিষয় এবং জ্ঞান অনুসন্ধানকারী যে সত্য ও ন্যায়ের চিন্তা করে তার একটা চমকপ্রদ দলীল। আর আল্লাহ তা'আলার নিকট সবিনয় নিবেদন হলো তিনি যেন আমাদের সকলকে সঠিক সরল পথ প্রদর্শন করেন এবং আমাদেরকে ও সকল মুসলিমকে তাঁর ব্যাপারে না জেনে কথা বলা থেকে রক্ষা করেন, আরও রক্ষা করেন ফিতনার ভ্রষ্টতা ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে, অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলার নিকট আবেদন করছি, তিনি যেন মুসলিম সমাজের আলেমগণ ও প্রতিটি স্থানের নেতৃবৃন্দকে দেশ ও জাতির ইহকাল ও পরকালের মঙ্গল হয় এমন চিন্তা-চেতনা ও সিদ্ধান্ত দেওয়ার তাওফীক দান করেন এবং সকলকে তাঁর সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেন, তিনি হলেন দানশীল, মহানুভব।
صلى الله على نبينا محمد وعلى آله وصحبه والتابعين لهم بإحسان إلى يوم الدين
(আল্লাহ সালাত পেশ করুন আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর এবং তাঁর পরিবার-পরিজন, সকল সাহাবী এবং কিয়ামতের দিন পর্যন্ত তাদের যথাযথ অনুসরণকারীগণের উপর)।
শাইখ আবদুল 'আযীয ইবন আবদিল্লাহ ইবন বায শিক্ষা-গবেষণা, ফতোয়া ও দা'ওয়া ব্যবস্থাপনার মহাপরিচালক।

টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৪৮০৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৭১২২
² সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৭১২৪
³ ইবন মাজাহ, হাদীস নং- ১০০০। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

আকদ (عقد)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
আভিধানিক অর্থ হলো: বন্ধন, বাঁধন, সংযোগ, সম্পর্ক, সংশ্লিষ্টতা, ধার্যকরণ, আরোপ, শক্ত করা, সুদৃঢ় করা, কঠিন করা, জোর দেওয়া, টানা দেওয়া, জামানত, নিশ্চয়তা, গ্যারান্টি, নিরাপত্তা, বীমা, দায়-দায়িত্ব, প্রতিজ্ঞা, প্রতিশ্রুতি, শপথ, আমল, কাল ইত্যাদি। আল-কামূস গ্রন্থে 'আকদ' শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে, রশির বাঁধন এবং ব্যবসায়ের চুক্তি ও কঠিন প্রতিজ্ঞা। একাধিক বিষয় বা বস্তু একত্র করা বুঝাতেও 'আকদ' ব্যবহৃত হয়। যেমন: عقد الحبل : তখন বলা হয় যখন একটি রশির এক পার্শ্ব অপর পার্শ্বের সাথে মিলানো হয় এবং এভাবে উভয়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা হয়।

মিসবাহুল মুনীর গ্রন্থে 'আকদ'-এর অর্থে কেউ কেউ বলেন: عقدت البيع ونحوه: ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদির চুক্তি করেছি। আরও বলা হয়: وعقدت اليمين : শপথ করেছি। আর عَقَّدَها তাশদীদযুক্ত করে বলা হলে অর্থ হবে। চুক্তি বা শপথে দৃঢ়তা ব্যক্ত করা। عاقدته على كذا এবং عاقدله عليه-এর অর্থ হচ্ছে, তার সঙ্গে চুক্তি ও অঙ্গীকার করেছি। معقد الشيء শব্দটি মাজলিস (مجلس)-এর ওজনে, অর্থ হলো: চুক্তির জায়গা। عقدة النكاح وغيره -এর অর্থ হচ্ছে: বিয়ে বা এ জাতীয় চুক্তি মজবুতকরণ, দৃঢ় করা, যথার্থতা, বলিষ্ঠতা।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে পাকে নির্দেশ প্রদান করেন: يا أيها الذين آمنوا أوفوا بالعقود 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের কৃত অঙ্গীকারসমূহ পূরণ করো।' অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَا تَعْزِمُوا عُقْدَةَ النِّكَاحِ 'তার ইদ্দত (অপেক্ষার শরীয়তসম্মত সময়) শেষ হওয়ার আগে কখনো তার সাথে বিয়ের সংকল্প করো না।' عقدة-এর অর্থ যেহেতু মজবুতকরণ ও দৃঢ়তা, তাই আয়াতের অর্থ হলো, ইদ্দত পালনের সময়ে নারীদের সাথে বিবাহের চুক্তি করো না।

পরিভাষায়: عقد (আকদ)-এর দুটি অর্থ রয়েছে:
ক. সাধারণ অর্থ: وَهُوَ كُلِّ مَا يَعْقِدُهُ ( يَعْزِمُهُ ( الشَّخصُ أَنْ يَفْعَلَهُ هُوَ ، أَوْ يَعْقِدَ عَلَى غَيْرِهِ فِعْلَهُ عَلَى وَجْهِ إلزامه إِيَّاهُ প্রত্যেক ওই সঙ্কল্প, যা মানুষ করবে বলে নিজের ওপর আবশ্যক করে নেয়, অথবা অন্যের ওপর তা করার জন্যে আবশ্যিকরূপে আরোপ করে থাকে। ইমাম জাস্সাস রহ. এ সংজ্ঞা বর্ণনা করেছেন।

টিকাঃ
১. আল-কামূস।
২. ইবনে মানযূর, লিসানুল আরব।
৩. মিসবাহুল মুনীর।
৪. সূরা মায়েদা, আয়াত- ১
৫. সূরা বাকারা, আয়াত-২৩৫
৬. ইমাম কুরতুবী, তাফসীরে কুরতুবী, খ. ৩, পৃ. ১৯২
৭. আল জাস্সাস, আহকামুল কুরআন, খ. ২, পৃ. ২৯৪ ও ২৯৫

📘 Biggan moy quran > 📄 আল্-কোরআনের অলৌকিক প্রভাব

📄 আল্-কোরআনের অলৌকিক প্রভাব


দুটি নিয়ামাতকে গুরুত্ব দেওয়া
০১. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
نِعْمَتَانِ مَغْبُونُ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ
“দুটি নিয়ামাত (কাজে লাগানোর) ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকার মধ্যে রয়েছে। নিয়ামাত দুটি হলো সুস্থতা ও অবসর।"[১]

পাঁচটি বড়ো নিয়ামাত
০২. উমর ইবনু মাইমূন আওদী রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন,
اغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ: شَبَابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ، وَصِحَّتَكَ قَبْلَ سَقَمِكَ، وَغِنَاكَ قَبْلَ فَقْرِكَ، وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ، وَحَيَاتَكَ قَبْلَ مَوْتِكَ
“পাঁচটি বিষয় আসার আগে পাঁচটি বিষয়কে মূল্যায়ন করো : ১. বার্ধ্যকের পূর্বে যৌবনকে; ২. অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে; ৩. দরিদ্রতার পূর্বে স্বচ্ছলতাকে; ৪. ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে এবং ৫. মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে।”[২]

চারটি উপদেশ
০৩. গুনাইম ইবনু কাইস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “ইসলামের শুরুর দিকে একে অপরকে উপদেশ দিতে গিয়ে আমরা চারটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম। আমরা বলতাম : যৌবনে কাজ করো বার্ধ্যকের জন্য, অবসরে কাজ করো ব্যস্ত সময়ের জন্য, সুস্থ অবস্থায় কাজ করো অসুস্থকালীন সময়ের জন্য, আর জীবিত অবস্থাতেই আমল করো মৃত্যু (-পরবর্তী সময়ের) জন্য।”[৩]

দুনিয়ায় রয়েছে বিপদ-আপদ
০৪. আবূ মূসা আশআরি রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “দুনিয়ার জীবনে আমরা যন্ত্রণাদায়ক বিপদ-আপদ অথবা ফিতনার অপেক্ষায় থাকি।”[৪]

দুনিয়ার উপমা
০৫. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “দুনিয়ার উপমা দুনিয়াই।”[e]

বিপজ্জনক সচ্ছলতা
০৬. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا يَنْتَظِرُ أَحَدُكُمْ إِلَّا غِنِّى مُطْعِيًا ، أَوْ فَقْرًا مُنْسِيًا، أَوْ مَرَضًا مُفْسِدًا، أَوْ هَرَمًا مُفْنِدًا، أَوْ مَوْتًا مُجْهِرًا، أَوِ الدَّجَّالَ، فَالدَّجَّالُ شَرُّ غَابِبٍ يُنْتَظَرُ، أَوِ السَّاعَةَ، وَالسَّاعَةُ أَدْهَى وَأَمَرُّ.
“তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন সচ্ছলতা কামনা করে, যা তাকে পাপাচারে লিপ্ত করবে। অথবা এমন দরিদ্রতা (কামনা করে), যা আল্লাহকে ভুলিয়ে দেবে। অথবা এমন ব্যাধি, যা তাকে নিঃশেষ করে দেবে। অথবা এমন বার্ধক্য, যা হিতাহিত-জ্ঞান শূন্য করে ফেলবে। অথবা এমন মৃত্যু, যা হঠাৎ আগমন করবে। অথবা দাজ্জালের (ফিতনা কামনা করে)। আর দাজ্জাল তো আসন্ন অদৃশ্য বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। অথবা কিয়ামাত (কামনা করে), অথচ কিয়ামাত হলো অত্যন্ত কঠিন ও তিক্ত।”[৬]

গড়িমসি ও জীবনের প্রতি লালসা
০৭. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলতেন, “হে আদম-সন্তান, গড়িমসি কোরো না। কারণ তুমি আজ জীবিত আছ, আগামীকাল হয়তো থাকবে না। যদি আগামীকাল বেঁচে থাকো, তবে আরও বিচক্ষণ হও, যেমন আজ হয়েছ। তা না হলে আজ যে ঢিলেমি করছ তার জন্য পস্তাতে হবে।” তিনি আরও বলতেন, “আমি এমন মানুষদের সাক্ষাৎ পেয়েছি যারা দীনার দিরহামের চেয়েও নিজের হায়াতের ব্যাপারে অধিক যত্নশীল ছিলেন।”[৭]

ধৈর্য ও স্থিরতা
০৮. আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “যে ব্যক্তি (অধৈর্য হয়ে) তালাশ করে সে হারায়। আর যে ব্যক্তি বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করে না সে অক্ষম হয়ে পড়ে।”[৮]

উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি ঘৃণা
০৯. আউন ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলতেন, “কত মানুষ আজকের দিনটির অপেক্ষায় ছিল, কিন্তু তা পায়নি। কত মানুষ আগামীকালের অপেক্ষায় রয়েছে, কিন্তু হয়তো তা পাবে না। যদি মৃত্যু ও তার পরিণতি নিয়ে চিন্তা করো, তবে অবশ্যই উচ্চাশা ও তার প্রতারণাকে ঘৃণা করবে।”[১]

গড়িমসি থেকে সতর্কতা
১০. আবূ ইসহাক রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, "আবদু কাইস গোত্রের এক ব্যক্তিকে তার অসুস্থতার সময় বলা হলো, আমাদের উপদেশ দিন। লোকটি বলল, খবরদার! কখনোই গড়িমসি কোরো না।” [১০]

মৃত্যুর পূর্বেই সময়কে কাজে লাগানো
১১. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার শরীরে হাত রেখে বলেছেন,
كُنْ كَأَنَّكَ غَرِيبٌ فِي الدُّنْيَا، أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ، وَعُدَّ نَفْسَكَ فِي أَهْلِ الْقُبُورِ
"দুনিয়াতে অচেনা অথবা মুসাফিরের মতো থেকো। নিজেকে কবরবাসীদের একজন মনে কোরো।”[১১]
ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা আরও বলেছেন, "যখন ভোর হবে তখন সন্ধ্যা যাপন করার চিন্তা কোরো না এবং যখন সন্ধ্যা হবে তখন ভোর যাপন করার চিন্তা কোরো না। অসুস্থ হওয়ার পূর্বে সুস্থতাকে কাজে লাগাও, মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে কাজে লাগাও। হে আল্লাহর বান্দা, তুমি তো জানো না, আগামীকাল তোমার কী অবস্থা হবে।”

দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি থেকে উপদেশ গ্রহণ
১২. জারীর ইবনু হাযিম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “তুমি যদি এমন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কাউকে দেখতে পাও যার ধৈর্য নেই (তবে তার কাছ থেকে উপদেশ নিয়ো না)। (শুধু এমন ব্যক্তির কাছ থেকেই উপদেশ নেবে) যিনি একইসাথে ধৈর্যশীল এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। "[১২]

সাধ্যায়নুযায়ী সৎকাজ করা
১৩. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ
"তাদের যা দান করার তা দান করে।" [১৩]
জাফর ইবনু হাইয়ান বলেন, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “তাদের যা দান করার সামর্থ্য রয়েছে তা তারা দান করে।” আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ
"এবং তাদের অন্তর ভীত-সন্ত্রস্ত।" [১৪]
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “তারা সাধ্যানুযায়ী সৎকাজ ও নেক আমল করে এবং পাশাপাশি এই আশঙ্কা করে যে, এই সৎকাজ ও নেক আমল তাদেরকে প্রতিপালকের শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারবে না।" [১৫]

অহংকারবশত প্রতিশোধ নেওয়ার পরিণতি
১৪. উমর ইবনু আবদিল আযীয রহিমাহুল্লাহ ইয়াযীদ ইবনু আবদিল মালিকের উদ্দেশে লেখেন: “অবহেলা ও অহংকারের বশে প্রতিশোধ নিতে যেয়ো না। তা হলে তোমার অপরাধ ক্ষমা করা হবে না এবং জবাবদিহিও করতে পারবে না। যাকে তোমার উত্তরাধিকারী বানাবে, সে তোমার প্রশংসা করবে না। যার কাছেই যাবে, কেউই তোমার কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে কোনোরূপ আপত্তি শুনবে না। আসসালামু আলাইকুম।”[১৬]

আল্লাহর দিদারে মুমিনের সুখ
১৫. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ ব্যতীত মুমিনের কোনো প্রশান্তি নেই। আর যার প্রশান্তি আল্লাহর সাক্ষাতে, সে যেন তা পেয়েই গেল।”[১৭]

আমলে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা
১৬. জারীর ইবনু হাযিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “হে লোকসকল, তোমরা আমলের ব্যাপারে ধারাবাহিকতা বজায় রেখো। কারণ, মুমিনের আমলের সমাপ্তি হিসেবে আল্লাহ তাআলা মৃত্যু ছাড়া আর কোনো-কিছুকে নির্ধারণ করেননি।”[১৮]

আমৃত্যু ইবাদাত
১৭. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
“ইয়াকীন চলে আসা পর্যন্ত তোমার রবের ইবাদাত করো।”[১৯]
মুবারাক ইবনু ফুদালা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় (ইয়াকীন) শব্দটির অর্থ বলেছেন, মৃত্যু।” [২০]

সুযোগ দিলে শয়তান পেয়ে বসে
১৮. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, "শয়তান যখন দেখে যে, তুমি আল্লাহর আনুগত্যে (ইবাদাতে) ধারাবাহিকতা বজায় রাখছ তখন সে বারবার তোমাকে কামনা করে। আবারও যখন দেখে যে তুমি ধারাবাহিকতা বজায় রাখছ, তখন সে বিরত হয় এবং তোমাকে ত্যাগ করে। কিন্তু তুমি যদি সামান্য এদিক-সেদিক করো তবে সে তোমাকে পেয়ে বসে।”[২১]

প্রতিপালকের দরজায় কড়া নাড়া
১৯. মুররা ইবনু শুরাহবীল থেকে বর্ণিত। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “বান্দা যতক্ষণ সালাতে থাকে ততক্ষণ সে তার প্রতিপালকের দরজায় কড়া নাড়ে; আর যে বান্দা তাঁর প্রতিপালকের দরজায় অবিরত কড়া নাড়তে থাকে তার জন্য ওই দরজা খুলে দেওয়া হয়।”[২২]

আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় করার অর্থ
২০. আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় করো।”[২০]
মুররা ইবনু শুরাহবীল থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “যথার্থভাবে ভয় করার অর্থ হলো সব সময় আল্লাহর আনুগত্য করা, কখনও তাঁর অবাধ্য না হওয়া; আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, অকৃতজ্ঞ না হওয়া; আল্লাহর যিকর করা আর তাঁকে ভুলে না যাওয়া।”[২৪]

রাতের সালাতে ফজিলত বেশি
২১. মুররা ইবনু শুরাহবীল বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “প্রকাশ্যে দান করার চেয়ে গোপনে দান করার ফজিলত যেমন বেশি, দিবসের (নফল) সালাতের চেয়ে রাতের (নফল) সালাতের ফজিলত তেমনই বেশি।” [২৫]

সম্পদের প্রতি ভালোবাসার অর্থ
২২. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَآتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ
"সম্পদের ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও দান করে।” [২৬]
মুররা ইবনু শুরাহবীল বলেন, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “কৃপণ, হিসেবী, সচ্ছলতার আকাঙ্ক্ষা কিংবা দরিদ্রতার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও দান করা।” [২৭]

আল্লাহর শ্রমিকের শক্তি
২৩. তাউস তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন : আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহ আনহুমা দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার পর একবার এক গোত্রের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা তখন পাথর ভাঙছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এরা কী করছে? সঙ্গী জবাব দিলেন, পাথর ভাঙছে। ইবনু আব্বাস তখন বললেন, আল্লাহ তাআলার শ্রমিকেরা এদের চাইতেও অনেক বেশি শক্তিশালী।[২৮]

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে জান্নাত পাওয়া যাবে না
২৪. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا رَأَيْتُ مِثْلَ النَّارِ نَامَ هَارِبُهَا، وَلَا مِثْلَ الْجَنَّةِ نَامَ طَالِبُهَا
"জাহান্নাম থেকে পলায়নকারী কিংবা জান্নাত প্রত্যাশাকারী এমন কাউকেই আমি দেখিনি, যে কিনা ঘুমিয়ে আছে।”[২৯]

জান্নাত পেতে হলে
২৫. হারিম ইবনু হাইয়ান রহিমাহুল্লাহ বলেন, “জাহান্নাম থেকে পলায়নকারী কিংবা জান্নাত প্রত্যাশাকারী-এমন কাউকেই আমি দেখিনি, যে কিনা ঘুমিয়ে আছে।”[৩০]

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কান্না
২৬. ঈসা ইবনু উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমর ইবনু উতবা রহিমাহুল্লাহ একবার ঘোড়ায় চড়ে বের হলেন এবং রাতের বেলা একটি গোরস্থানের পাশে থামলেন। বললেন, হে কবরবাসীরা, সহীফার (কুরআন মাজীদের) পৃষ্ঠাগুলো গুটিয়ে ফেলা হয়েছে এবং (তোমাদের) সমস্ত আমল উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ কথা বলে তিনি কাঁদলেন। পায়ের ওপর ভর করে কাটিয়ে দিলেন সারা রাত। ভোর হলে সেখান থেকে ফিরে এসে ফজরের সালাতে অংশ নিলেন।[৩১]

জীবদ্দশাতেই আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা
২৭. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর একজন আযাদকৃত দাস থেকে বর্ণিত আছে : আবদুল্লাহ ইবনু আমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা কোথাও যাওয়ার সময় একটি গোরস্থান দেখতে পেলেন। তা দেখে বাহন থেকে নেমে দুই রাকআত সালাত আদায় করলেন। তাঁকে বলা হলো, এমন কাজ তো এর আগে কখনও আপনি করেননি। তিনি জবাব দিলেন, “কবরবাসীদের সাথে আমার কী পার্থক্য, তা নিয়ে ভাবলাম কিছুক্ষণ। তাই দুই রাকআত সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য পেতে চাইলাম।”[৩২]

মৃত্যুর আগ মুহূর্তে
২৮. ইসমাঈল ইবনু উবাইদিল্লাহ থেকে বর্ণিত, উন্মুদ দারদা বলেন, আবুদ দারদা বেহুঁশ হয়ে কিছুক্ষণ পর আবার জ্ঞান ফিরে পেলেন। তাঁর ছেলে বিলাল তাঁর কাছেই ছিল। তিনি (বিলালকে) বললেন, যাও, এখান থেকে চলে যাও। তারপর বললেন, এমন শয্যা আর কার হবে এবং সময় আর কার হবে? এরপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন—
وَنُقَلِّبُ أَفْبِدَتَهُمْ وَأَبْصَارَهُمْ كَمَا لَمْ يُؤْمِنُوا بِهِ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَنَذَرُهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ
"প্রথম বারে যেমন তারা এর প্রতি ঈমান আনেনি ঠিক তেমনিভাবেই আমি তাদের অন্তর ও দৃষ্টিকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আমি এদেরকে এদের বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার মধ্যে উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াবার জন্য ছেড়ে দিচ্ছি।”[৩৩]
তারপর বললেন, তোমরা তা অস্বীকার করছ। আবার তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে আগের কথাগুলোই বলতে লাগলেন। এসব কথা বলতে বলতেই মৃত্যুবরণ করলেন তিনি।” [৩৪]

মৃত্যুর পর সকলেই আফসোস করে
২৯. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا مِنْ أَحَدٍ يَمُوتُ إِلَّا نَدِمَ، قَالُوا: وَمَا نَدَامَتُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: إِنْ كَانَ مُحْسِنًا نَدِمَ أَنْ لَا يَكُونَ ازْدَادَ، وَإِنْ كَانَ مُسِيئًا نَدِمَ أَنْ لَا يَكُونَ نَزَعَ
“প্রত্যেকেই মৃত্যুর পর অনুতপ্ত হয়।” সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, কোন বিষয় নিয়ে সে অনুতাপ করে? রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “যদি নেক আমলকারী হয় তবে কেন আরও বেশি নেক আমল করল না তার জন্য অনুতপ্ত হয়। আর যদি বদ আমলকারী হয় তবে কেন বদ আমল থেকে বিরত থাকল না তার জন্য অনুতপ্ত হয়।”[৩৫]

অধিক আমলের আকাঙ্ক্ষা
৩০. মুহাম্মাদ ইবনু আবী উমায়রাহ রদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একজন সাহাবি। তিনি বলেন, “যদি কোনো বান্দা জন্মের পর থেকে বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে মাথা নত করে থাকে, তবুও তা কিয়ামাতের দিন তার কাছে তুচ্ছ মনে হবে। তার মনে হবে, 'ইশ! যদি দুনিয়ায় ফিরে গিয়ে আরও আমল করতে পারতাম, তা হলে আমার প্রতিদান আরও বেড়ে যেত।”[৩৬]

আগামীকালের জন্য ফেলে রেখো না
৩১. হুরাইছ ইবনু কাইস রহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো ভালো কাজ করতে চাইলে আগামীকালের জন্য তা ফেলে রেখো না; যদি আখিরাতের কাজে থাকো তবে যতক্ষণ সম্ভব তাতেই মগ্ন থাকো; দুনিয়াবি কাজে থাকলে তা দ্রুত সেরে ফেলো; সালাতরত অবস্থায় শয়তান তোমাকে ধোঁকা দিতে পারে, তাই সালাতকে দীর্ঘায়িত করো।”[৩৭]

মনোযোগসহ শোনা
৩২. আউন ইবনু আবদিল্লাহ ও মা'ন ইবনু আবদির রহমান থেকে বা তাঁদের একজন থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে বলল, আমার থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করুন।
তিনি বললেন, “যখন এই ধরনের কোনো আয়াত শুনবে—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا
“হে ঈমানদারগণ...", তখন তা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করবে; কারণ তা কল্যাণকর কাজের আদেশ দেয় অথবা অকল্যাণকর কাজ থেকে নিষেধ করে।”[৩৮]

নিজেকে কুরআনের সামনে উপস্থাপন
৩৩. সালিম মাক্কী থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “কেউ যদি জানতে চায় যে আল্লাহ তাকে পছন্দ করেন কি না, তবে সে যেন কুরআনের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করে।” [৩৯]

নিভৃতে আল্লাহ তাআলার জিজ্ঞাসাবাদ
৩৪. আবদুল্লাহ ইবনু উকাইম রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু একবার মাসজিদে বসে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। কথা শুরু করার আগে তিনি আল্লাহর নামে শপথ করে বলেন, “আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রত্যেককে নিভৃতে ডেকে নেবেন, যেভাবে তোমরা পূর্ণিমার রাতে চাঁদের সঙ্গে নিভৃতচারী হও। তারপর জিজ্ঞেস করবেন, হে আদম-সন্তান, কোন জিনিস তোমাকে ধোঁকায় ফেলে দিয়েছে? হে আদম-সন্তান, তুমি যে ইলম অর্জন করেছ সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছ? হে আদম-সন্তান, তুমি নবিগণকে কী জবাব দিয়েছ?” [৪০]

ইলম অনুযায়ী আমল করা
৩৫. হুমাইদ ইবনু হিলাল থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "পরকালে হিসেব-নিকেশের সময় আমাদের জিজ্ঞেস করা হবে, 'তুমি তোমার ইলম অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছ?' ব্যাপারটা নিয়ে আমার খুব ভয় হচ্ছে, তাই এ ব্যাপারে (তোমাদের) সতর্ক করছি।”[৪১]

নিকৃষ্ট স্তরের আলিম
৩৬. আবূ কাবশাহ সালুলি বলেন, আমি আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলতে শুনেছি: "কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাআলার কাছে নিকৃষ্ট স্তরের মানুষ হিসেবে গণ্য হবে ওই আলিম, যার ইলম দ্বারা কেউ উপকৃত হয় না।"[৪২]

ভাবিয়া করিয়ো কাজ
৩৭. আবু জাফর (আবদুল্লাহ হাশিমি) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, আল্লাহ তাআলা আপনার মাধ্যমে মুসলমানদের বরকত দান করুন। আপনার বিশেষ কল্যাণকর দিক হতে আমাকে কিছু বলুন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
مُسْتَوْصٍ أَنْتَ؟
"তুমি কি উপদেশ চাচ্ছ?” (কথাটি তিনি তিনবার বলেছেন।)
লোকটি বলল, জি। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
اجْلِسُ، إِذَا أَرَدْتَ أَمْرًا فَتَدَبَّرْ عَاقِبَتَهُ، فَإِنْ كَانَ خَيْرًا فَأَمْضِهِ، وَإِنْ كَانَ شَرًّا فَانْتَهِ
"বসো। কোনো কাজ করার সময় তার পরিণাম নিয়ে চিন্তা করবে। যদি কাজটির পরিণাম কল্যাণকর হয় তবে তা কোরো। আর অনিষ্টকর হলে তা থেকে বিরত থেকো।” [৪৩]

টিকাঃ
[১] ইবনু মাজাহ, ৪১৭০, বুখারি ও মুসলিমের শর্তে সহীহ।
[২] নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, ১৩/৩২৮, মুরসাল।
[৩] বাগাবি, আল-জা'দিয়্যাত, ১৪৫১, সহীহ।
[৪] হান্নাদ ইবনুস সারি, কিতাবুয যুহদ, ৫০৫, সহীহ, মাওকুফ।
[৫] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬] বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, ১৪/২২৪, বুখারি ও মুসলিমের শর্তে সহীহ।
[৭] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[৮] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/২৪৩, সহীহ, মাওকুফ।
[১০] ওয়াকিহ ইবনুল জাররাহ, কিতাবুয যুহদ, ২৬৩, সহীহ, মাওকুফ।
[১১] ইবনু মাজাহ, সুনান, ৪১৭০, সনদ দঈফ। কিন্তু অন্যান্য সনদে বর্ণিত হওয়ায় সহীহ।
[১২] ইসনাদটি সহীহ।
[১৩] সূরা আল মুমিনুন: ৬০।
[১৪] সূরা আল মুমিনুন: ৬০।
[১৫] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ৩/২৪৮, ইসনাদটি সহীহ।
[১৬] ইসনাদটি সহীহ।
[১৭] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ১/১৩৬, সহীহ, মাওকুফ।
[১৮] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ২৭২, ইসনাদটি সহীহ।
[১৯] সূরা হিজর: ৯৯। اليقين শব্দের অর্থ নিশ্চিত-বিশ্বাস। এই আয়াতে মৃত্যু অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে (কুরতুবি, জালালাইন) প্রভৃতি।
[২০] হাদীসটির সনদ দঈফ। কিন্তু এর সমার্থবোধক হাদীস বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
[২১] হাদীসটির সনদ দঈফ, মাকতু।
[২২] তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ৮৯৯৬, সনদটি সহীহ, মাওকুফ।
[২৩] সূরা আল ইমরান: ১০২।
[২৪] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২৯৭; সনদটি সহীহ, মাওকুফ।
[২৫] সনদটি সহীহ, মাওকুফ।
[২৬] সূরা বাকারা: ১৭৭।
[২৭] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/২৯৮; সনদটি সহীহ, মাওকুফ।
[২৮] সনদটি সহীহ, মাওকুফ।
[২৯] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/৪১২, হাসান।
[৩০] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, হাদীস নং ২৩১, মাওকুফ।
[৩১] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/১৫৮, মাওকুফ।
[৩২] সনদটি দঈফ, মাওকুফ। গোরস্থানে ও গোরস্থানের উদ্দেশে নামায পড়া নিষিদ্ধ। এই হাদীস যদি তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েই থাকে, তা হলে এটা সুনিশ্চিত যে, তিনি কবরস্থান পেরিয়ে গিয়ে নামায পড়েছেন। (অনুবাদক)
[৩৩] সূরা আনআম: ১১০।
[৩৪] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৩১৪; সনদটি সহীহ, মাওকুফ।
[৩৫] তিরমিযি, সুনান, ২৪০৩; সনদ দুর্বল।
[৩৬] আহমাদ, ৪/১৮৫; সনদটি সহীহ।
[৩৭] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৩৬০; মাওকুফ।
[৩৮] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৫৮, সনদ সহীহ।
[৩৯] সনদ দঈফ।
[৪০] সনদটি সহীহ, মাওকুফ ও মারফু।
[৪১] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ১৩৬; সনদটি সহীহ, মাওকুফ।
[৪২] হিলইয়া, ১/২২৩, সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[৪৩] ওয়াকিহ ইবনুল জাররাহ, কিতাবুয যুহদ, ১৬, মুরসাল।

তাহাজ্জুদের সালাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।' কুরআন, সুন্নাহ ও উম্মতের ইজমা দ্বারা তা প্রমাণিত। আল্লাহ তা'আলা রহমানের বান্দাদের গুণাগুণ সম্পর্কে বলেন, ﴿وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا ﴾ [الفرقان: ٦٤]
"আর যারা তাদের রবের জন্য সাজদারত ও দণ্ডায়মান হয়ে রাত্রি যাপন করে”। [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬৪)]

অন্যত্র তিনি মুত্তাকীদের গুণাগুণ আলোচনায় বলেন, ﴿كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ الَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ ﴾ [الذاريات: ۱۸ ،۱۷]
"রাতের সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটাত আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকত” [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ১৭-১৮]

আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ ইমানদার বান্দাদের সম্পর্কে বলেন, ﴿تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴾ [السجدة : ١٦، ١٧]
"তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা হয়। তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে। আর আমরা তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে। অতঃপর কোনো ব্যক্তি জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারা যা করত, তার বিনিময়স্বরূপ”। [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ১৬-১৭]

তিনি অন্যত্র বলেন, ﴿يَتْلُونَ وَانَاءَ الَّيْلِ وَهُمْ يَسْجُدُونَ ﴾ [آل عمران: ۱۱۳]
"তারা রাতের বেলায় আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তারা সাজদাহ করে"। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১৩]

তিনি আরো বলেন, ﴿وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالْأَسْحَارِ ﴾ [آل عمران: ۱۷]
"এবং শেষ রাতে ক্ষমাপ্রার্থনাকারী”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭]

আল্লাহ তা'আলা সেসব পরিপূর্ণ মুমিনদের ইলম ও মর্যাদার উচ্চ শিখরে ভূষিত করেছেন, যারা রাতে সালাত আদায় করে। তিনি বলেন,
﴿أَمَّنْ هُوَ قَانِتُ وَآنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمَا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُوا رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُوا الْأَلْبَابِ ﴾ [الزمر: ٩]
"যে ব্যক্তি রাতের প্রহরে সাজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখিরাতকে ভয় করে এবং তার রবের রহমত প্রত্যাশা করে (সে কি তার সমান যে এরূপ করে না) বল, 'যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?' বিবেকবান লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে"। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৯]

আল্লাহ তা'আলার নিকট রাতের সালাতের গুরুত্ব অধিক, তাই তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন,
﴿يَاأَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا نِصْفَهُ أَوِ انقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا ﴾ [المزمل: ١، ٤]
"হে চাদর আবৃত! রাতের সালাতে দাঁড়াও কিছু অংশ ছাড়া। রাতের অর্ধেক কিংবা তার চেয়ে কিছুটা কম। অথবা তার চেয়ে একটু বাড়াও। আর স্পষ্টভাবে ধীরে ধীরে কুরআন আবৃত্তি কর"। [সূরা আল-মুয্যাম্মিল, আয়াত: ১-৪]

তিনি আরো বলেন,
﴿وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَّكَ عَسَى أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا ﴾ [الاسراء: ٧٩]
“আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় কর তোমার অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে। আশা করা যায়, তোমার রব তোমাকে প্রশংসিত অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করবেন”। [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৭৯]

তিনি আরো বলেন,
﴿إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْءَانَ تَنزِيلًا فَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ وَلَا تُطِعْ مِنْهُمْ عَاثِمًا أَوْ كَفُورًا وَاذْكُرِ اسْمَ رَبِّكَ بُكْرَةً وَأَصِيلًا وَمِنَ الَّيْلِ فَاسْجُدْ لَهُ وَسَبِّحْهُ لَيْلًا طَوِيلًا ﴾ [ الانسان: ২৩, ২৬]
"নিশ্চয় আমরা তোমার প্রতি পর্যায়ক্রমে আল-কুরআন নাযিল করেছি। অতএব তোমার রবের হুকুমের জন্য ধৈর্য ধারণ কর এবং তাদের মধ্য থেকে কোনো পাপিষ্ঠ বা অস্বীকারকারীর আনুগত্য করো না। আর সকাল-সন্ধ্যায় তোমার রবের নাম স্মরণ কর, আর রাতের একাংশে তার উদ্দেশ্যে সাজদাবনত হও এবং দীর্ঘ রাত ধরে তাঁর তাসবীহ পাঠ কর"। [সূরা ইনসান, আয়াত: ২৩-২৬]

তিনি আরো বলেন,
﴿وَمِنَ الَّيْلِ فَسَبِّحْهُ وَأَدْبَرَ السُّجُودِ ﴾ [ق: ৪০]
"এবং রাতের একাংশেও তুমি তাঁর তাসবীহ পাঠ কর এবং সালাতের পশ্চাতেও”। [সূরা কাফ, আয়াত: ৪০]

তিনি আরো বলেন,
﴿وَمِنَ الَّيْلِ فَسَبِّحْهُ وَإِدْبَرَ النُّجُومِ ﴾ [الطور: ٤٨]
“আর রাতের কিছু অংশে এবং নক্ষত্র অস্ত যাবার পর তার তাসবীহ পাঠ কর”। [সূরা আত- তুর, আয়াত: ৪৯]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও রাতের সালাতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে বলেন, «أفضل الصيام بعد رمضان شهر الله المحرم، وأفضل الصلاة بعد الفريضة صلاة الليل».
“রমযানের পর সর্বোত্তম সিয়াম হচ্ছে মুহররমের সিয়াম, আর ফরয সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হচ্ছে রাতের সালাত”।

টিকাঃ
২. 'মজমু ফাতওয়া ওয়াল মাকালাত মুতানাওয়েয়াহ' লি ইবন বায রহ.: (১১/২৯৬)।
৩. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৬৩, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।

প্রশ্ন: এক যুবক বলে: সে ধনী পরিবারের সন্তান, লেখাপড়া করে একটা নারী-পুরুষ সহাবস্থান করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, যার সুবাদে একটা মেয়ের সাথে তার খারাপ সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং সে পাপচারের মধ্যে ডুবে যায়। সুতরাং সে তা পরিত্যাগ করার জন্য এখন কী করবে? আর তার জন্য তাওবার সুযোগ আছে কি? আর এ তাওবার জন্য শর্তগুলো কী কী?
উত্তর: এ প্রশ্নে দু'টি মাসআলা:
প্রথমত: আমাদের জন্য উচিত হলো ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর শাসকবর্গের মনোযোগ আকর্ষণ করা এ জন্য যে, তারা তাদের নাগরিকগণের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন নারী ও পুরুষের সহাবস্থানে গড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। কারণ, এ অবস্থাটি ইসলামী শরী'আতের বিরোধী এবং তার ওপর বিদ্যমান থাকাটা মুসলিমগণের জন্য উচিত নয়।
নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «خَيْرُ صُفُوفِ النِّسَاءِ آخِرُهَا، وَشَرُّهَا أَوَّلُهَا»
"নারীদের সর্বোত্তম সারি বা কাতার হলো শেষ কাতার এবং সবচেয়ে মন্দ কাতার হলো তাদের প্রথম কাতার।"4
এটা এ জন্য যে, তাদের প্রথম সারি পুরুষদের একবারে নিকটবর্তী সারি, আর শেষ সারি পুরুষদের থেকে দূরবর্তী সারি। সুতরাং যখন সালাতের মতো 'ইবাদাতের স্থানে নারী ও পুরুষদের মাঝে দূরত্ব বজায় রাখার ও তাদের মাঝে সহাবস্থান না করার জন্য উৎসাহিত করা হয়, যেখানে মুসল্লি (সালাত আদায়কারী ব্যক্তি) অনুভব করে যে, সে দুনিয়া সংশ্লিষ্ট সবকিছু থেকে দূরে।
তার রবের সামনে উপস্থিত, তখন আপনার অবস্থাটা কী হওয়া উচিত যখন নারী ও পুরুষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সহাবস্থানের মতো পরিবেশ সৃষ্টি হবে? তখন কি তার থেকে দূরুত্ব বজায় রাখা ও সহাবস্থানের বিষয়টি বর্জন করাটা আরও অধিক উত্তম হবে না? নারীদের সাথে পুরুষদের মেলামেশা ও উঠাবসার বিষয়টি একটি বড় ধরনের ফিতনা, যাকে আমাদের শত্রুগণ রংচং লাগিয়ে আকর্ষণীয় করে দিয়েছে, শেষ পর্যন্ত আমাদের অনেকে সে ফিতনার শিকার হয়েছে।
সহীহ বুখারীতে উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: «كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا سَلَّمَ قَامَ النِّسَاءُ حِينَ يَقْضِي تَسْلِيمَهُ وَيَمْكُتُ هُوَ فِي مَقَامِهِ يَسِيرًا قَبْلَ أَنْ يَقُومَ قَالَتْ: نَرَى وَاللَّهُ أَعْلَمُ أَنَّ ذَلِكَ كَانَ لِكَيْ يَنْصَرِفَ النِّسَاءُ قَبْلَ أَنْ يُدْرِكَهُنَّ أَحَدٌ مِنْ الرِّجَالِ»
"রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন (সালাতে) সালাম ফিরাতেন, তখন তাঁর সালাম ফিরানোর কাজটি শেষ হওয়ার সাথে সাথে নারীগণ দাঁড়িয়ে যেত এবং তিনি দাঁড়ানোর আগে তাঁর অবস্থানে কিছু সময় অবস্থান করতেন। তিনি (বর্ণনাকারিনী) বলেন: আমরা মনে করতাম, (আর আল্লাহই ভালো জানেন) এর উদ্দেশ্য হলো, যাতে পুরুষদের মধ্য থেকে কেউ নারীদেরকে নাগাল পাওয়ার আগেই তারা চলে যেতে পারে।"5
ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের জন্য আবশ্যকীয় কর্তব্য হলো, তারা এ বিষয়টিকে তাদের দেখাশুনার দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা এবং তাদের নাগরিকগণকে যাবতীয় খারাপি ও ফিতনার উপায়-উপকরণ বা উপলক্ষ্য থেকে রক্ষা করা। কারণ, তাদেরকে যে দায়িত্ব বা ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে, অচিরেই আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাদের কর্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। আর তাদের জেনে রাখা উচিত যে, তারা যখন আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য করবে এবং কম হউক বেশি হউক তাদের সকল কাজে তাঁর শরী'আত অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করবে, তখন আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই তাদের হৃদয়গুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে দেবেন এবং ভালোবাসা ও পারস্পরিক কল্যাণ কামনায় তাদের মনগুলো ভরে দেবেন, আর তাদের জন্য তাদের কাজসমূহ সহজ করে দেবেন এবং তাদের প্রতি তাদের নাগরিকগণ বন্ধুত্ব ও আনুগত্যের পরকাষ্ঠা প্রদর্শন করবেন।
নারী ও পুরুষের এ ধরনের সহাবস্থানের মাঝে যেসব খারাপি ও ফিতনা-ফ্যাসাদের সৃষ্টি হয়, সেসব ব্যাপারে মুসলিম মিল্লাতের শাসক ও সাধারণ নাগরিকগণের চিন্তাভাবনা করা উচিত, আর এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো এ প্রশ্নকর্তা খারাপ সম্পর্কের ব্যাপারে যা উল্লেখ করেছে, যার কু-প্রভাব ও পাপসমূহ থেকে এখন সে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করছে।
বস্তুত নারী-পুরুষে সহাবস্থানের মতো ফিতনাটিকে সঠিক পরিকল্পনা ও সংস্কারের ব্যাপারে দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার দ্বারা নির্মূল করা সম্ভব, আর এটা হবে কতগুলো বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করার মাধ্যমে, যেগুলোতে শুধু নারীরাই পড়াশুনা করবে এবং তাদের সাথে সেখানে পুরুষদের অংশগ্রহণ থাকবে না।
আর যখন নারীগণ পুরুষগণের সহোদর হয়, তখন তাদের (নারীদের) জন্য অধিকার আছে তাদের (পুরুষদের) কাছ থেকে উপকারী জ্ঞান অর্জন করার, যেমনিভাবে অধিকার আছে পুরুষদেরও; কিন্তু তাদের (নারীদের) জন্য আমাদের পুরুষদের আবশ্যকীয় করণীয় হলো তাদেরকে শিক্ষা দেওয়ার ক্যাম্পাসটি পুরুষদের শিক্ষার ক্যাম্পাস থেকে আলাদা করার ব্যবস্থা করা। সহীহ বুখারীতে আবু সা'ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
«جَاءَتِ امْرَأَةٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم ، فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ ذَهَبَ الرِّجَالُ بِحَدِيثِكَ، فَاجْعَلْ لَنَا مِنْ نَفْسِكَ يَوْمًا تَأْتِيكَ فِيهِ، تُعَلَّمُنَا مِمَّا عَلَّمَكَ اللَّهُ فَقَالَ: اجْتَمِعْنَ فِي يَوْمِ كَذَا وَكَذَا، فِي مَكَانِ كَذَا وَكَذَا فَاجْتَمَعْنَ، فَأَتَاهُنَّ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم، فَعَلَّمَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَهُ اللهُ ....»
“জনৈকা মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আপনার হাদীস তো শুধু পুরুষ লোকেরাই শুনতে পায়। সুতরাং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটি দিন নির্দিষ্ট করে দিন, যে দিন আমরা আপনার নিকট আসব, আল্লাহ আপনাকে যা কিছু শিক্ষা দিয়েছেন, তা থেকে আপনি আমাদের শিক্ষা দেবেন। তখন তিনি বললেন, তোমরা অমুক অমুক দিন অমুক অমুক স্থানে সমবেত হবে। তারপর (নির্দিষ্ট দিনে) তাঁরা সমবেত হলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে এলেন এবং আল্লাহ তাঁকে যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা থেকে তাদের শিক্ষা দিলেন....”।
আর এটা হলো শিক্ষার জন্য নারীদেরকে বিশেষ কোনো স্থানে আলাদা করে নেওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য। কেননা তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে বলেন নি যে, তোমরা পুরুষদের সাথে উপস্থিত হতে পার না?! আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রর্থনা করছি যে, তিনি যেন সকল মুসলিমকে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের সুন্নাতের উপর চলার তাওফীক দান করুন, যাতে তারা এর দ্বারা দুনিয়া ও আখিরাতে ইয্যত ও সম্মান লাভ করতে পারে।
দ্বিতীয় মাসআলা: প্রশ্নকর্তার প্রশ্ন, যা সে নিজ সম্পর্কে অবতারণা করেছে- তা হলো, সে একটা মেয়ের সাথে তার খারাপ সম্পর্ক স্থাপন করার মাধ্যমে পাপাচারে নিমজ্জিত হয়ে গেছে, এখন সে কী করবে? তার জন্য তাওবার সুযোগ আছে কি? থাকলে তার শর্তগুলো কী কী?
জবাবে আমি তাকে সুসংবাদ দিচ্ছি যে, প্রত্যেক তাওবাকারীর জন্যই তাওবার দরজা খোলা আছে, আর আল্লাহ তাওবাকারীগণকে ভালোবাসেন এবং যে ব্যক্তি গুনাহ্ থেকে তাওবা করে, তিনি তার সকল গুনাহ্ ক্ষমা করে দেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَيْهَا ءَاخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا * إِلَّا مَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُوْلَبِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا وَمَن تَابَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَإِنَّهُ يَتُوبُ إِلَى اللَّهِ مَتَابًا ﴾ [الفرقان: ٦٧, ٧١]
"এবং তারা আল্লাহর সাথে কোনো ইলাহ-কে ডাকে না। আর আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না। আর তারা ব্যভিচার করে না, যে এগুলো করে সে শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামতের দিন তার শাস্তি বর্ধিতভাবে প্রদান করা হবে এবং সেখানে সে স্থায়ী হবে হীন অবস্থায়, তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের গুণাহসমূহ নেক দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর যে তাওবা করে ও সৎকাজ করে, সে তো সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়"। [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬৭-৭১]
তাওবার শর্ত পাঁচটি:
প্রথম শর্ত: তাওবা হতে হবে খালেস তথা নির্ভেজালভাবে আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশ্যে, যাতে কোনো প্রকার প্রদর্শনী ও কোনো সৃষ্টিকে ভয় করার মত কোনো বিষয় থাকবে না; বরং তা হবে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে। কারণ, মানুষ তার রবের উদ্দেশ্য একনিষ্ঠ না হয়ে তাঁর নৈকট্য হাসিলের জন্য যে আমলই করুক না কেন, তা অর্থহীন ও বাতিল বলে গণ্য হবে। আল্লাহ তা'আলা হাদীসে কুদসীতে বলেন:
«أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشَّرْكِ ، مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ»
"আমি শির্ককারীদের (মুশরিকদের) আরোপিত শির্ক বা অংশ থেকে মুক্ত। যে ব্যক্তি এমন কোনো কাজ করল যার মধ্যে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করল, আমি তাকে এবং তার শির্ককে প্রত্যাখ্যান করি।"
দ্বিতীয় শর্ত: সে যে গুনাহের কাজ করেছে, তার জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হওয়া এবং এ ব্যাপারে নিজেকে অপরাধী মনে করা, এমনকি আল্লাহ তা'আলার কাছ থেকে ক্ষমা ও মার্জনা পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা।
তৃতীয় শর্ত: যদি গুনাহের কাজের সাথে লিপ্ত থাকে, তাহলে তা পরিত্যাগ করা। কারণ, গুনাহের কাজ অব্যাহত রাখলে কোনো তাওবাই গ্রহণযোগ্য হবে না। সুতরাং গুনাহগার ব্যক্তি যদি বলে: আমি গুনাহ থেকে তাওবা করলাম অথচ সে তা অব্যাহতভাবে সে অপরাধ করেই যাচ্ছে, তাহলে এটা আল্লাহ তা'আলার সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ বলে গণ্য হবে। যেমন, তুমি যদি কাউকে উদ্দেশ্য করে বল, আপনার সাথে আমি যে বেয়াদবি করেছি আমি তার জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত, অথচ তুমি তখনও তার সাথে বেয়াদবি করেই যাচ্ছ, তাহলে মনে হবে যেন তুমি তার সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছ, আর মহান রব আল্লাহ তা'আলা তার চেয়ে অনেক বেশি মহামহিয়ান ও গৌরবময় যে, তুমি দাবি করবে, তুমি তাঁর অবাধ্য হওয়া থেকে তাওবা করেছ, অথচ তুমি তা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছ।
চতুর্থ শর্ত: ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ পুনরায় আর করবে না বলে দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
পঞ্চম শর্ত: তাওবাটি তার সময়মতো হওয়া, যে সময়ে তাওবা করলে তাওবাকারীর তাওবা গ্রহণ করা হয় অর্থাৎ তাওবাটি হতে হবে মানুষের মৃত্যুর ঘন্টা বেজে যাওয়ার আগে এবং সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদয় হওয়ার পূর্বে।
কেননা, সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদয় হওয়ার পরে তাওবা করলে সে তাওবা কোনো উপকারে লাগবে না। কারণ, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَن تَأْتِيَهُمُ الْمَلَائِكَةُ أَوْ يَأْتِيَ رَبُّكَ أَوْ يَأْتِي بَعْضُ ءَايَاتِ رَبِّكَ يَوْمَ يَأْتِي بَعْضُ وَآيَاتِ رَبِّكَ لَا يَنفَعُ نَفْسًا إِيمَانُهَا لَمْ تَكُنْ ءَامَنَتْ مِن قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِي إِيمَانِهَا خَيْرًا قُلِ انتَظِرُوا إِنَّا مُنتَظِرُونَ ﴾ [الانعام: ١٥٨]
"তারা কি শুধু এরই প্রতীক্ষা করে যে, তাদের কাছে ফিরিশতা আসবে কিংবা আপনার রব আসবেন কিংবা আপনার রবের কোনো নিদর্শন আসবে? যেদিন আপনার রবের কোনো নিদর্শন আসবে, সেদিন তার ঈমান কোন কাজে আসবে না, যে পূর্বে ঈমান আনে নি অথবা যে ব্যক্তি ঈমানের মাধ্যমে কল্যাণ লাভ করে নি। বলুন, 'তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমরাও প্রতীক্ষায় রইলাম'।" [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৫৮]
আর সে কোনো নিদর্শন মানেই সূর্য তার অস্ত যাওয়ার স্থান (পশ্চিম দিক) থেকে উদয় হওয়া, অনুরূপভাবে আরেকটি নিদর্শন মৃত্যু উপস্থিত হওয়ার সময়টিও তাওবা কবুল না হওয়ার সময়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْتَنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ أُوْلَابِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا ﴾ [النساء: ١٨]
"তাওবা তাদের জন্য নয়, যারা আজীবন মন্দ কাজ করে, অবশেষে তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, 'আমি এখন তাওবা করছি' এবং তাদের জন্যেও নয়, যাদের মৃত্যু হয় কাফের অবস্থায়। এরাই তারা যাদের জন্য আমরা কষ্টদায়ক শাস্তির ব্যবস্থা করেছি”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৮]
সুতরাং এ পাঁচটি শর্ত যদি আপনার মধ্যে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত থাকে, তাহলে আপনার তাওবা গ্রহণযোগ্য হবে ইনশা-আল্লাহ।
শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-'উসাইমীন

টিকাঃ
4 ইবনু মাজাহ, হাদীস নং- ১০০০। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
5 সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৮৩২
° সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৮৮০
• সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৭৬৬৬

সালাম (سَلَم)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
আরবী ভাষায় السَّلَمُ (সালাম) শব্দের এক অর্থ হচ্ছে: الإعْطَاءُ وَالتَّسْلِيفُ প্রদান করা, অগ্রিম প্রদান করা। বলা হয়: أَسْلَمَ الثَّوْبَبُ لِلْخَيَّاطِ অর্থাৎ কাপড়টি সে দর্জির নিকট দিয়েছে। ইমাম মুতারযী বলেন: أَسْلَمَ فِي اثر অর্থাৎ: সে গমের মূল্য অগ্রিম পরিশোধ করেছে। এক্ষেত্রে السَّلَمُ শব্দটি السَّلِمُ থেকে নির্গত হয়েছে। উক্ত বাক্যের মূল হলো, أَسْلَمَ الثَّمَنَ فِيْهِ অতঃপর الثَّمَن শব্দ বিলুপ্ত করা হয়েছে।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: عِبَارَةٌ عَنْ " বَيْعِ مَوْصُوفَ فِي الذِّمَّة بَدَل يُعْطَى عاجلاً " দায়িত্বে আবশ্যক বস্তুকে এমন মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করা যা নগদ প্রদান করা হয়। সালামে বিবেচ্য শর্তে মতবিরোধ করার কারণে ফকীহগণ সালামের সংজ্ঞায়ও মতবিরোধ করেছেন। হানাফী এবং হাম্বলী ফকীহগণ, যারা নগদ সালাম বিক্রি পরিহার করার জন্য বিক্রয় চুক্তির বৈঠকে মূলধন হস্তগত করা এবং পণ্য বাকিতে প্রদান করার শর্ত করেছেন, তারা সালামের এমন সংজ্ঞা প্রদান করেন যা উক্ত শর্তকে অন্তর্ভুক্ত করে। এ পর্যায়ে ইবনে আবেদীন সালামের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন: هُوَ شَرَاء أجل بعাজল অর্থাৎ সালাম হলো নগদ মূল্যের বিনিময়ে বাকি পণ্য ক্রয় করা।

সালামের বৈধতা
কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমার আলোকে সালাম চুক্তির বৈধতা প্রমাণিত হয়েছে।
ক. পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنْتُمْ بِدَيْنِ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى فَاكْتُبُوهُ "হে মুমিনগণ! যখন তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদে বাকিতে লেনদেন কর তখন তোমরা তা লিখে নাও।” এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন: أَشْهَدُ أَنَّ السَّلَفَ الْمَضْمُونَ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى قَدْ أَحَلَّهُ اللهُ فِي كِتَابِهِ وَأَذِنَ فِيهِ ، ثُمَّ قَرَأَ هَذِهِ الآيَةَ "আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, মহান আল্লাহ নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বাকি ঋণ স্বীয় কিতাবের মধ্যে বৈধ ঘোষণা করেছেন এবং এ বিষয়টি অনুমোদন করেছেন। অতঃপর তিনি উক্ত আয়াতটি পাঠ করেন।"

টিকাঃ
১. লিসানুল আরব, মূলবর্ণ غرر আল মাগরাভী রচিত প্রবন্ধ, পৃ. ২১৬; কাওনাভী রচিত আনিসুল ফুকাহা, পৃ. ২১৮; কাদী ইয়ায রচিত মাশারিকুল আনওয়ার, খ. ২, পৃ. ২১৭
২. মুত্তারিযী রচিত আল মুগরিব ৪১২
৩. রদ্দুল মুহতার (বুলাক বর্ষ ১২৭২ হিজরী) ৪১২
১২. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮২
১৩. ইবনে আব্বাস রা.-এর বর্ণনা, ইমাম শাফেয়ী কর্তৃক স্বীয় মুসনাদে, খ. ২, পৃ. ১৭১; আল হাকেম খ. ২, পৃ. ২৮৬

📘 Biggan moy quran > 📄 আল-কোরআন এবং Cosmology

📄 আল-কোরআন এবং Cosmology


জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না যারা
৩৮. ইয়াহইয়া ইবনু হিব্বান রহিমাহুল্লাহ বলেন, ইরাকের একদল মুসাফির আবূ যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে হাদীস বর্ণনা করার অনুরোধ জানায়। তিনি তাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি তাদের বলেন, “তোমরা জানো যে, হাদীস শিক্ষা করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি কামনা করা হয়। তাই কেউই দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে তা শিখবে না।” অথবা তিনি বলেছেন, “কেউ যদি পার্থিব উদ্দেশ্যে হাদীস শেখে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”[৪৪]
আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ দাবি করেছেন যে, عزف শব্দের অর্থ হলো ঘ্রাণ।

খ্যাতি লাভের উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করা
৩৯. আয়িযুল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “কেউ যদি খ্যাতি লাভের উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন বা হাদীস শিক্ষা করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”[৪৫]

আল্লাহ তাআলার ভয়ই ইলম হিসেবে যথেষ্ট
৪০. কাসিম ইবনু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আল্লাহ তাআলার ভয়ই ইলম হিসেবে যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে ধোঁকায় পতিত হওয়া মূর্খতা হিসেবে যথেষ্ট।”[৪৬]

পূর্বসূরিদের পথ আঁকড়ে ধরা
৪১. ইবরাহীম নাখঈ থেকে বর্ণিত। হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “হে ক্বারীগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের পূর্বসূরিগণের পথ আঁকড়ে ধরো। আল্লাহ তাআলার কসম, যদি তাঁদের পথে অটল থাকো তবে অনেক দূর এগিয়ে যাবে; আর সে পথ ছেড়ে ডানে-বাঁয়ে চললে অবশ্যই চরমভাবে পথভ্রষ্ট হবে।”[৪৭]

আলিমের ফিতনা
৪২. ইয়াযীদ ইবনু আবী হাবীব রহিমাহুল্লাহ বলেন, “ফকীহ আলিমের একটি ফিতনা এই যে, তিনি অন্যের কথা শোনার চেয়ে নিজে বেশি কথা বলতে পছন্দ করেন, যদিও কথা বলার মতো যথেষ্ট ব্যক্তি রযেছেন। অন্যের কথা শোনাটাই নিরাপদ এবং তাতে ইলম বাড়ে। শ্রোতা বক্তার অংশীদার। আল্লাহ তাআলা যদি রক্ষা না করেন, তবে অধিক কথায় রয়েছে পেরেশানি, পরিশ্রম, অতিরঞ্জন ও ক্ষতি। এমনও আলিম আছেন যারা মনে করেন, বংশমর্যাদা ও চেহারা-সুরতের কারণে একে অন্যের চেয়ে কথা বলার বেশি অধিকার রাখে। তারা দরিদ্রদেরকে হেয়জ্ঞান করেন। তাদের কাছে গরিবদের কোনো স্থান নেই। কেউ কেউ তো ইলমকে কুক্ষিগত করে রাখতে ভালোবাসেন। তারা মনে করেন, ইলম শিক্ষা দেওয়াটা একটা অপচয়। ইলম আমার নিজের কাছেই থাকুক- এটাই তাদের পছন্দ। এমনও আলিম আছেন যারা জ্ঞানের ক্ষেত্রে স্বৈরাচারী শাসকের মতো আচরণ করেন; তাদের বক্তব্যের বিরুদ্ধমত প্রকাশ করলে বা তাদের অধিকারের ব্যাপারে অসচেতন হলে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কোনো কোনো আলিম নিজেকে মুফতির পদে বসিয়েছেন; তার জ্ঞান নেই-এমন বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে-'আমি জানি না' বলতে লজ্জাবোধ করেন। ফলে আন্দাজে ঢিল ছোড়েন এবং যারা বানিয়ে কথা বলেন তাদের কথা লিখে দেন। কেউ কেউ তো আবার যা শোনেন তা-ই বর্ণনা করেন। এমনকি মর্যাদার আশায় তারা ইয়াহুদি-নাসারাদের কথাও বর্ণনা করেন।” [৪৮]

কিচ্ছা বর্ণনাকারীদের জন্য দুর্ভোগ
৪৩. মাইমুন ইবনু মিহরান রহিমাহুল্লাহ বলেন, “কিচ্ছা-কাহিনি বর্ণনাকারীরা আল্লাহর পক্ষ থেকে দুর্যোগের অপেক্ষায় থাকে, আর শ্রোতা রহমতের প্রতীক্ষায় থাকে।” [৪৯]

দ্বীনদারি দেখিয়ে দুনিয়া অর্জন করা
৪৪. আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يَخْرُجُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ رِجَالٌ يَخْتُلُونَ الدُّنْيَا بِالدِّينِ، يَلْبَسُونَ لِلنَّاسِ جُلُودَ الضَّأْنِ مِنَ الدِّينِ، أَلْسِنَتُهُمْ أَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ، وَقُلُوبُهُمْ قُلُوبُ الذِّتَابِ، يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: أَفَبِي تَغْتَرُّونَ، أَمْ عَلَى تَجْتَرِئُونَ، فَبِي حَلَفْتُ لَأَبْعَثَنَّ عَلَى أُولَبِكَ مِنْهُمْ فِتْنَةً تَدَعُ الْحَلِيمَ مِنْهُمْ حَيْرَانَ
"শেষ জামানায় এমন-কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে যারা দ্বীনের দ্বারা দুনিয়া অর্জন করবে। (অর্থাৎ, দ্বীনদারি প্রকাশ করে মানুষকে ধোঁকায় ফেলবে।) মানুষের চোখে বিনয়ী সাজতে মেষ-দুম্বার চামড়া পরবে (অর্থাৎ, মোটা কম্বল বা পোশাক পরে দ্বীনদার সাজবে)। তাদের মুখের ভাষা হবে মধুর চেয়ে মিষ্টি; পক্ষান্তরে অন্তর হবে বাঘের মতো (হিংস্র)। আল্লাহ তাআলা এদের সম্পর্কে বলেন, এরা কি আমাকে ধোঁকা দিতে চায় নাকি আমার ওপর ধৃষ্টতা পোষণ করে? (জেনে রাখো), আমি শপথ করে বলছি, তাদের ওপর এমন বিপদ পাঠাব যাতে তাদের বিচক্ষণ-বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণও দিশেহারা হয়ে পড়বে।”[৫০]

না জানলে 'আমি জানি না' বলা
৪৫. নাফি' বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলো। জবাবে তিনি বললেন, আমি তা জানি না।”[৫১]

না বুঝে ফাতওয়া দেওয়ার ভয়াবহতা
৪৬. উকবা ইবনু মুসলিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমি তো তা জানি না। তাঁকে আবারও একই বিষয় জিজ্ঞেস করা হলো। এবার তিনি বললেন, তোমরা কি আমাদের পিঠকে তোমাদের জন্য জাহান্নামের সাঁকো বানাতে চাও? তোমরা কি বলতে চাও যে, ইবনু উমর আমাদেরকে এ ব্যাপারে ফাতওয়া দিয়েছেন?”[৫২]

হাদীস বর্ণনায় ভীতি
৪৭. ইবনু শুবরুমাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু লোকদের হাদীস শোনাচ্ছিলেন। তখন তামীম ইবনু হাযলামকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বললেন, হে তামীম ইবনু হাযলাম, তুমি নিজে যদি মুহাদ্দিস হতে পারো তবে তা-ই করো।”[৫৩]

বক্তার ফিতনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা
৪৮. হাইওয়াতা ইবনু শুরাইহ বলেন, আমি ইয়াযীদ ইবনু আবী হাবীব রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “বক্তা ফিতনার আশঙ্কায় থাকে এবং চুপ-থাকা ব্যক্তি আল্লাহর রহমতের অপেক্ষায় থাকে।”[৫৪]

আলোচনার মজলিস ছোটো হওয়া
৪৯. হাইওয়াতা ইবনু শুরাইহ বলেন, আমি উকবা ইবনু মুসলিম রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “দু-একজন কী বড়োজোর তিন-চারজনের সাথে ইলমি আলোচনা করা যায়। কিন্তু লোকসংখ্যা এর চেয়ে বেড়ে গেলেই চুপ থাকবে বা উঠে চলে আসবে।” [৫৫]

ইলমের অহংকার
৫০. ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “সম্পদের কারণে (মানুষ) যেমন সীমালঙ্ঘন করে, তেমনই ইলমের কারণেও করে থাকে।”[৫৬]

অন্যদের প্রাধান্য দেওয়া
৫১. আবদুর রহমান ইবনু আবী লাইলা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এক শ বিশজন সাহাবিকে পেয়েছি। তাদের কেউই নিজেকে মুহাদ্দিস (ভাবতেন) না, তবে মনে করতেন— তাঁর ভাই-ই হাদীস বর্ণনার জন্য যথেষ্ট। আর তাঁদের কেউই নিজেকে মুফতি (ভাবতেন) না, তবে মনে করতেন—তাঁর ভাই-ই ফাতওয়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।” (বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা তিনি বলেছেন, মাসজিদে তাদের পেয়েছি।) [৫৭]

বিশেষ বিশেষ কথা বলে দুআ করা
৫২. দাউদ ইবনু শাবূর বলেন, “আমরা তাউস রহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, আপনি এই এই কথা বলে আমাদের জন্য দুআ করুন। তিনি বললেন, তাতে কোনো সাওয়াব আছে বলে মনে করি না।”[৫৮]

হাদীস বর্ণনায় অনীহা
৫৩. সা'দ ইবনু মাসউদ বলেন, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এক সাহাবিকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি অমুক অমুক লোকের মতো হাদীস বর্ণনা করেন না কেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাঁরা যা শুনেছেন আমিও তার অনুরূপ শুনেছি এবং তাঁরা যেখানে যেখানে উপস্থিত ছিলেন আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু পরে সেসব বিষয় (আমি বর্ণনা না করলেও) গোপন থাকেনি এবং মানুষও সেগুলো (অন্যের মাধ্যমে জানার দ্বারা) আঁকড়ে ধরেছে। তাই আমি এমন ব্যক্তিদের পেয়ে গেছি যাঁরা আমার (পরিবর্তে এই কাজের) জন্য যথেষ্ট। তা ছাড়া আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীতে কম-বেশি করতে চাই না। আল্লাহর কসম, কেউ আমাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে জবাব দিতে এত আগ্রহ বোধ করি, যেন তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ঠান্ডা পানি চাইছি; কিন্তু হেরফের হওয়ার আশঙ্কায় জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকি।"[৫১]

কিয়ামাতের আলামত
৫৪. আবু উমাইয়া লাখমী[৬০] রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ ثَلَاثًا: إِحْدَاهُنَّ أَنْ يُلْتَمَسَ الْعِلْمُ عِنْدَ الْأَصَاغِرِ
"কিয়ামাতের আলামত তিনটি। তার একটি হলো মনগড়া ফাতওয়া- প্রদানকারীদের কাছ থেকে ইলম শেখা।”[৬১]

আমল ব্যতীত ইলমের প্রতিদান নেই
৫৫. ইয়াযীদ ইবনু জাবির থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআয ইবনু জাবাল রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,
اعْلَمُوا مَا شِئْتُمْ أَنْ تَعْلَمُوهَا؛ فَلَنْ يَأْجُرَكُمُ اللَّهُ بِعِلْمٍ حَتَّى تَعْمَلُوا
"যা যা চাও, শিখে নাও। কিন্তু আমল ব্যতীত আল্লাহ তাআলা কোনো ইলমের প্রতিদান দেবেন না।”[৬২]

কোনো কোনো প্রশ্ন সমস্যা বাড়িয়ে দেয়
৫৬. সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু যর গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু এক ব্যক্তিকে বললেন, “কী প্রশ্ন করেছ, ভেবে দেখো। তুমি আমাকে এমন-এক বিষয়ে প্রশ্ন করেছ যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা তোমার সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেবেন।”[৬৩]

অন্যকে তালীম দেয় অথচ নিজে করে না
৫৭. ইসমাঈল ইবনু আবী খালিদ থেকে বর্ণিত। শা'বী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "জান্নাতীদের কিছু লোক একদল জাহান্নামীকে দেখে জিজ্ঞেস করবে, আরে! তোমরা জাহান্নামে গেলে কী করে? অথচ তোমরা আমাদের যে আদব ও ইলম শিখিয়েছ তারই কল্যাণে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করেছি। তারা জবাব দেবে, আমরা সৎকাজের আদেশ দিতাম ঠিকই; কিন্তু নিজেরা তা করতাম না।”[৬৪]

নেক মজলিস
৫৮. আবদুর রহমান ইবনু রাযীন বলেন, “আমি আবদুর রহমান ইবনু আবী হিলাল রহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা একটি জানাযা দেখলাম। তিনি তখন আমাকে বললেন, এমন মজলিস খোঁজো, যেখানে অন্যের কথাই আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে। আর আমরা সেখানে বসে (কথা শুনব)।”[৬৫]

টিকাঃ
[৪৪] ইবনু মাজাহ, ২৫২, সনদ দুর্বল, মাওকুফ। তবে এর সমার্থবোধক হাসান মারফু হাদীস রয়েছে।
[৪৫] সনদ হাসান, মাকতু। তবে এর সমার্থবোধক হাদীস হাসান মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[৪৬] তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ৮৯২৭। এর সমার্থবোধক হাদীস বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে।
[৪৭] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ২/৯৭, সহীহ।
[ ৪৮] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১/১৩৬-১৩৭, মাওকুফ।
[৪৯] সনদ হাসান।
[৫০] তিরমিযি, ২৫১৫।
[৫১] আত-তাবাকাত, ৪/১৪৪, সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৫২] সনদ হাসান, মাওকুফ।
[৫৩] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ২/১৬৩, মুনকাতি। অর্থাৎ, যদি সম্ভব হয়, তবে তুমিও হাদীসচর্চা করো।
[৫৪] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১/১৩৭, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৫] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৬] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৪/৫, মাওকুফ।
[৫৭] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ২/৬৩, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৮] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[৫৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬০] অথবা, জুমাহী থেকে বর্ণিত।
[৬১] ইবনু আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম, ১/১৫৭-১৫৮, হাসান।
[৬২] ইবনু আদি, আল-কামিল ফি যুআফায়ির রিজাল, ২/২৫-২৬, মাওকুফ।
[৬৩] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[৬৪] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৪, সনদ সহীহ, মাওকুফ; তবে এর সমার্থবোধক হাদীস সহীহ সনদে মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[৬৫] সনদ সহীহ, মাওকুফ。

১. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের সালাতের জন্য খুব পরিশ্রম করতেন, এমনকি তার কদম মুবারক ফেটে যেত। তিনি রাতের কিয়ামে প্রচুর কষ্ট করতেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে এত কিয়াম করতেন যে, তার দু'পা ফেটে যেত। আয়েশা তাকে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল আপনি কেন এরূপ করেন, অথচ আল্লাহ আপনার পূর্বাপর সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন? তিনি বললেন: أفلا أحب أن أكون عبداً شكوراً
"আমি কি আল্লাহর শোকর গুজার বান্দা হতে পছন্দ করব না!"
মুগিরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, «قام النبي صلى الله عليه وسلم حتى تورمت قدماه، فقيل له: غفر الله لك ما تقدم من ذنبك وما تأخر؟ قال: «أفلا أكون عبداً شكوراً».
"নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়াম করলেন, ফলে তার দু'পা ফুলে গিয়েছিল, তাকে বলা হলো: আপনার পূর্বাপর সব গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন? তিনি বললেন: «أفلا أكون عبداً شكوراً».
"আমি কি শোকর গুজার বান্দা হবো না"।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জনৈক সাহাবী খুব সুন্দর বলেছেন:
وفينا رسول الله يتلو كتابه - إذا انشق معروف من الفجر ساطع
يبيت يجافي جنبه عن فراشه - إذا استثقلت بالكافرين المضاجع
"আমাদের মাঝে আল্লাহর রাসূল রয়েছেন, যিনি তার কিতাব তিলাওয়াত করনে যখন উজ্জ্বল ফজর উদিত হয়। তিনি বিছানা থেকে পার্শ্বদেশ পৃথক রেখে রাত যাপন করেন, যখন কাফিররা গভীর ঘুমে নিমজ্জিত থাকে"।

২. জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম উপায় রাতের সালাত। আব্দুল্লাহ ইবন সালাম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করেন, তখন লোকেরা তার দিকে ছুটে গেল। আর চারদিকে ধ্বনিত হল: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেছেন তিনবার। আমি মানুষের সাথে তাকে দেখতে আসলাম। আমি যখন তার চেহারা ভালোভাবে দেখলাম, পরিষ্কার বুঝলাম তার চেহারা কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। আমি সর্বপ্রথম তাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন:
«يا أيها الناس، أفشوا السلام، وأطعموا الطعام، وصلوا الأرحام، وصلوا بالليل والناس نيام، تدخلوا الجنة بسلام».
"হে লোকেরা, তোমরা সালামের প্রসার কর, খাদ্য দান কর, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখ ও রাতে সালাত আদায় কর যখন মানুষের ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে"। জনৈক কবি খুব সুন্দর বলেছেন:
ألهتك لذة نومة عن خير عيش - مع الخيرات في غرف الجنان
تعيش مخلدا لا موت فيها - وتنعم في الجنان مع الحسان
تيقظ من منامك إن خيرا - من النوم التهجد بالقرآن
"ঘুমের স্বাদ তোমাকে উত্তম চরিত্রবতী হুরদের সাথে জান্নাতের বালাখানার উত্তম জীবন থেকে বঞ্চিত করছে। জান্নাতে তুমি সর্বদা থাকবে, সেখানে কোনো মৃত্যু নেই, অনিন্দ্য সুন্দরীদের নিয়ে মত্ত থাকবে। অতএব, ঘুম থেকে জাগ্রত হও, নিশ্চয় কুরআন তিলাওয়াত করে তাহাজ্জুত আদায় করা ঘুম থেকে অধিক উত্তম"।

৩. রাতে সালাত আদায়কারীদের জন্য জান্নাতের উঁচু প্রাসাদসমূহ তৈরি করা হয়েছে। আবু মালেক আশা'আরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
(إِنَّ فِي الْجَنَّةِ غُرَفًا يُرَى ظَاهِرُهَا مِنْ بَاطِنِهَا، وَبَاطِنُهَا مِنْ ظَاهِرِهَا، أَعَدَّهَا اللَّهُ تَعَالَى لِمَنْ أَطْعَمَ الطَّعَامَ، وَأَلَانَ الْكَلَامَ، وَتَابَعَ الصِّيَامَ، وَأَفْشَى السَّلَامَ، وَصَلَّى بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ)
"নিশ্চয় জান্নাতে কতক বালাখানা রয়েছে, যার বাহির ভেতর থেকে ও ভেতর বাহির থেকে দেখা যাবে। যা আল্লাহ তৈরি করেছেন তাদের জন্য যারা খাদ্যদান করে, বিনয়াবনত কথা বলে, সিয়ামের পর সিয়াম পালন করে, সালামের প্রসার করে এবং রাতে সালাত আদায় করে যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে"।

৪. রাতে নিয়মিত সালাত আদায়কারীগণ আল্লাহর মুহসিন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত, যারা আল্লাহর রহমত ও জান্নাতের হকদার। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ الَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ ﴾ [الذاريات: ۱۷،۱۸]
"রাতের সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটাত আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকত” [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ১৭-১৮]

৫. আল্লাহ তা'আলা নেককার ও রহমানের বান্দাদের প্রশংসার মধ্যে রাতে সালাত আদায়কারীদেরও প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন:
﴿وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَمًا ﴾ [الفرقان: ٦٤]
"আর যারা তাদের রবের জন্য সাজদারত ও দণ্ডায়মান হয়ে রাত্রি যাপন করে” [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬৪]

৬. আল্লাহ তা'আলা সাক্ষ্য দিয়েছেন রাতে সালাত আদায়কারীগণ পূর্ণ ইমানদার। তিনি বলেছেন:
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ ﴿ إِنَّمَا يُؤْمِنُ بِنَايَتِنَا الَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُوا بِهَا خَرُّوا سُجَّدًا وَسَبِّحُوا بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ ﴾ [السجدة : ١٥، ١٦]
"আমার আয়াতসমূহ কেবল তারাই বিশ্বাস করে, যারা এর দ্বারা তাদেরকে উপদেশ দেওয়া হলে সাজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের রবের প্রশংসাসহ তাসবীহ করে। আর তারা অহঙ্কার করে না। তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা হয়। তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে। আর আমরা তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে”। [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ১৫-১৬]

৭. যারা রাতে সালাত আদায় করে ও যারা করে না তারা উভয় সমান নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿أَمَّنْ هُوَ قَانِتٌ ءَانَاءَ الَّيْلِ سَاجِدًا وَقَابِمَا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُوا رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُوا الْأَلْبَابِ ﴾ [الزمر: ٩]
"যে ব্যক্তি রাতের প্রহরে সাজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখিরাতকে ভয় করে এবং তার রব-এর রহমত প্রত্যাশা করে (সে কি তার সমান যে এরূপ করে না) বল, 'যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?' বিবেকবান লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে" [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৯]

৮. রাতের সালাত গুনাহের কাফ্ফারা ও পাপ মোচনকারী। আবু উমামা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
عَلَيْكُمْ بِقِيَامِ اللَّيْلِ فَإِنَّهُ دَأْبُ الصَّالِحِينَ قَبْلَكُمْ، وَهُوَ قُرْبَةٌ إِلَى رَبِّكُمْ، وَمَكْفَرٌ لِلسَّيِّئَاتِ، وَمَنْهَاةٌ لِلْآثَامِ».
"তোমরা রাতের সালাত আঁকড়ে ধর, কারণ এটা তোমাদের পূর্বের নেককার লোকদের অভ্যাস এবং তোমাদের রবের নৈকট্য দানকারী, গুনাহের কাফ্ফারা ও পাপ মোচনকারী"।

৯. ফরয সালাতের পর রাতের সালাত সর্বোত্তম সালাত। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ‘মারফু' হাদীসে এসেছে:
«أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ، وَأَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْمَكْتُوبَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ».
"রমযানের পর সর্বোত্তম সিয়াম মুহররম মাসের সিয়াম এবং ফরয সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত রাতের সালাত”।

১০. কিয়ামুল লাইল মুমিনদের সম্মান। সাহাল ইবন সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আগমন করলেন, অতঃপর বললেন:
يا محمد عش ما شئت فإنك ميت، وأحبب من شئت فإنك مفارقه، واعمل ما شئت فإنك مجزي به ثم قال: يا محمد شرف المؤمن قيام الليل، وعزه استغناؤه عن الناس».
“হে মুহাম্মাদ যত দিন পার বেঁচে নেও, অতঃপর অবশ্যই তুমি মারা যাবে। যাকে ইচ্ছা মহব্বত কর, অবশ্যই তার থেকে তুমি বিচ্ছেদ হবে। যা ইচ্ছা আমল কর, তার প্রতিদান অবশ্যই তোমাকে দেওয়া হবে। অতঃপর বলেন, হে মুহাম্মাদ মুমিনের সম্মান হচ্ছে রাতের সালাত, আর তার ইজ্জত হচ্ছে মানুষ থেকে অমুখাপেক্ষিতা”।

১১. রাতে সালাত আদায়কারী ঈর্ষার পাত্র, কারণ এর সাওয়াব অধিক। এ সালাত দুনিয়া ও তার মধ্যে বিদ্যমান সবকিছু থেকে উত্তম। আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
لا حسد إلا في اثنتين: رجل آتاه الله القرآن فهو يقوم به آناء الليل وآناء النهار، ورجل آتاه الله مالاً فهو ينفقه آناء الليل وآناء النهار
"দু'জন ব্যতীত কোনো ঈর্ষা নেই: এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ কুরআন দান করেছেন, সে কুরআন নিয়ে রাত ও দিনের বিভিন্ন সময় কিয়াম করে। অপর ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, সে তা রাত ও দিনের বিভিন্ন সময় খরচ করে"।
আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لا حسد إلا في اثنتين: رجل آتاه الله مالاً فسلطه على هلكته في الحق، ورجل آتاه الله الحكمة فهو يقضي بها ويعلمها».
"দু'জন ব্যতীত কোনো ঈর্ষা নেই: এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, সে তা সত্য পথে খুব খরচ করে। অপর ব্যক্তি যাকে আল্লাহ হিকমত দান করেছেন, সে তার মাধ্যমে ফয়সালা করে ও মানুষকে তা শিক্ষা দেয়”।

১২. রাতের সালাতে কুরআন তিলাওয়াত করা বড় গণিমত ও সৌভাগ্যের বিষয়। আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«من قام بعشر آيات لم يكتب من الغافلين، ومن قام بمائة آية كتب من القانتين، ومن قام بألف آية كتب من المقنطرين».
"যে ব্যক্তি দশ আয়াত দ্বারা কিয়াম করল, তাকে গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হবে না। আর যে একশত আয়াত দ্বারা কিয়াম করল, তাকে কানেতিনদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হবে। আর যে এক হাজার আয়াত দ্বারা কিয়াম করল, তাকে মুকানতিরিনদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হবে"।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: أيحب أحدكم إذا رجع إلى أهله أن يجد فيه ثلاث خلفات عظام سمان؟ قلنا: نعم، قال: «ثلاث آيات يقرأ بهن أحدكم في صلاته خير له من ثلاث خلفات عظام سمان».
"তোমাদের কেউ কি পছন্দ করে, যখন সে বাড়িতে যাবে সেখানে সে তিনটি মোটা তাজা গাভীন উট (তার মালিকানাধীন) দেখবে? আমরা বললাম: হ্যাঁ, তিনি বললেন: তোমাদের কারো নিজ সালাতে তিনটি আয়াত তিলাওয়াত করা তিনটি মোটা তাজা উট হতে উত্তম"।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন খতমের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরআন খতম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, তখন তিনি বলেন,
«في أربعين يوماً»، ثم قال: «في شهر»، ثم قال: «في خمس عشرة»، ثم قال: «في عشر»، ثم قال: «في سبع». قال: إني أقوى من ذلك، قال: «لا يفقه من قرأه في أقل من ثلاث».
"চল্লিশ দিনে, অতঃপর বলেন, এক মাসে, অতঃপর বলেন, পনেরো দিনে, অতঃপর বলেন, দশ দিনে, অতঃপর বলেন, সাত দিনে। তিনি বলেন, আমি এর চেয়ে অধিকের সামর্থ্য রাখি। তিনি বললেন: তিন দিনের কমে যে খতম করবে, সে কুরআন বুঝবে না"।

টিকাঃ
৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৮৩৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮২০)।
৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৮৩৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮১৯।
৬. বলা হয় এটা আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহুর কবিতা।
৭. ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩২৫১, ১৩৩৪; তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৮৫, ১৯৮৪); হাকিম: (৩/১৩); আহমদ: (৫/৪৫১); 'সিলসিলাতুল আহাদীসিস সাহীহা': (৫৬৯) ও 'ইরওয়াউল গালিল': (৩/২৩৯) গ্রন্থে আলবানী রহ. হাদীসটি সহীহ বলেছেন।
৮. 'কিয়ামুল লাইল' লিল ইমাম মুহাম্মদ ইবন নাসর আল-মাওয়াযি: (পৃ. ৯০), 'তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লাইল' লি ইবন আবিদ দুনিয়া: (পৃ. ৩১৭), কেউ বলেছেন: এ কবিতাগুলো মালেক ইবন দিনারের।
৯. সিয়ামের পর সিয়াম পালন করে অর্থাৎ ফরয সিয়ামের পর অধিক নফল সিয়াম পালন রাখে, একের পর এক রাখতে থাকে একেবারে ত্যাগ করে না। কেউ বলেছেন: এর সর্বনিন্ম সংখ্যা হচ্ছে প্রত্যেক মাসে কমপক্ষে তিনটি সিয়াম পালন করা। দেখুন: 'তুহফাতুল আহওয়াযি': (৬/১১৯)।
১০. আহমদ: (৫/৩৪৩); ইবন হিব্বান, হাদীস নং (৬৪১; তিরমিযী, হাদীস নং ২৫২৭, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে; আহমদ: (২/১৭৩), আব্দুল্লাহ ইবন আমর থেকে। আলবানী সহীহ সুনান তিরমিযী: (২/৩১১) ও সহীহ আল-জামে: (২/২২০), হাদীস নং (২১১৯) গ্রন্থে হাসান বলেছেন।
১১. তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৪৯; হাকেম: (১/৩০৮); বায়হাকি: (২/৫০২), আলবানী ‘ইরওয়াউল গালিল’: (২/১৯৯), হাদীস নং (৪৫২) ও সহীহ তিরমিযী: (৩/১৭৮) গ্রন্থে হাদীসটি হাসান বলেছেন।
১২. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৬৩।
১৩. হাকেম: (৪/৩২৫), তিনি হাদীসটি সহীহ বলেছেন, ইমাম যাহাবী তার সমর্থন করেছেন। ইমাম মুনযিরি 'তারগিব ও তারহিব': (১/৬৪০) গ্রন্থে এ হাদীসের সনদ হাসান বলেছেন। তিনি তাবরানির 'আল-আওসাত' গ্রন্থের সূত্রে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। হায়সামি 'মাজমাউয যাওয়ায়েদ': (২/২৫৩) গ্রন্থে তার সূত্রের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। আলবানী 'সিলসিলাতুল আহাদীসিস সাহীহা' গ্রন্থে হাদীসটি হাসান বলেছেন, হাদীস নং (৮৩১)। তিনি এর তিনটি সনদ উল্লেখ করেছেন: আলী, সাহাল ও জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে।
১৪. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮১৫।
১৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮১৬।
১৬. মুকানতিরিন: যাদের জন্য বে-হিসাব সওয়াব লেখা হয় তাদেরকে মুকানতিরিন বলা হয়। দেখুন: 'তারগিব ও তারহিব': (১/৪৯৫)।
১৭. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৩৯৮; সহীহ ইবন খুজাইমাহ: (২/১৮১), হাদীস নং (১১৪২), আলবানী সহীহ আবু দাউদ: (১/২৬৩) ও 'সিলসিলাতুল আহাদীসিস সাহীহা': (৬৪৩) গ্রন্থে হাদীসটি সহীহ বলেছেন।
১৮. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮০২।
১৯. সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৯৫, আলবানী হাদীসটি সহীহ বলেছেন। দেখুন: সহীহ সুনান আবু দাউদ: (১/২৬২)।
২০. আবু দাউদ, হাদীস নং ১৩৯০, আলবানী হাদীসটি সহীহ বলেছেন। দেখুন: সহীহ সুনান আবু দাউদ: (১/২৬১)।

প্রশ্ন: আমি বিদেশে পড়ুয়া একজন ছাত্র এবং সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়টি নারী- পুরুষ সম্মিলিত, আমার প্রশ্ন হলো: এ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করাটা আমার জন্য বৈধ হবে কিনা?
উত্তর: যে মুসলিম ব্যক্তি নিজের মুক্তি চায় আমরা তাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, সে যেন অনিষ্টতা ও ফিতনার যাবতীয় কারণ ও উপায়-উপকরণ থেকে দূরে থাকে, আর কোনো সন্দেহ নেই যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যুবতীদের সাথে মেলামেশা করাটা ফিতনা-ফ্যাসাদ সংঘটিত হওয়ার এবং যিনা-ব্যভিচার ছড়িয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। আর কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে হিফাযত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে, তার জন্য আবশ্যক হলো কঠিনভাবে সাধনা করা; কিন্তু ব্যক্তি যখন এর দ্বারা পরীক্ষার সম্মুখীন হবে, তখন তার জন্য আবশ্যকীয় করণীয় হচ্ছে সতর্ক হওয়া, এর থেকে দূরে সরে থাকা, দৃষ্টিকে অবনমিত রাখা, লজ্জাস্থানকে হিফাযত করা এবং নারীদের নিকটবর্তী না হওয়ার জন্য সাধ্যানুসারে চেষ্টা করবে, আর আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
শাইখ আবদুল্লাহ ইবন আবদির রহমান আল-জিবরীন

মুদারাবা (مُضَارَبَةٌ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
শাব্দিক অর্থ: الْمُضَارَبَةُ (মুদারাবা) শব্দটি مُفَاعَلَةٌ ওযনে মাসদার বা মূলধাতু। তা ضَرَبَ فِي الْأَرْضِ থেকে গৃহীত; এর অর্থ: ঘুরে বেড়ানো, সফর করা, ভ্রমণ করা। এ অর্থে শব্দটি পবিত্র কুরআনেও ব্যবহৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, وَآخَرُونَ يَضْرِبُونَ فِي الْأَرْضِ "একদল দেশে দেশে সফর করে।" যেহেতু মুদারাবা চুক্তির প্রেক্ষিতে একজনের পুঁজি নিয়ে অপরজন ব্যবসা উপলক্ষে দেশবিদেশ সফর করে তাই একে মুদারাবা বলে।

পারিভাষিক অর্থ: أَنْ تُعْطِيَ إِنْسَانًا مِنْ مَالِكَ مَا يَتَّجِرُ فِيهِ عَلَى أَنْ يَكُونَ الرِّبْحُ بَيْنَكُمَا ، أَوْ يَكُونَ لَهُ سَهْمٌ مَعْلُومٌ مِنَ الرِّبِّحِ 'একজনের পুঁজি অপরজনের হাতে ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে দেওয়া, তাতে যা লাভ হবে তা সমহারে অথবা চুক্তিনামায় বিবৃত হারে বণ্টন করা হবে- এ ধরনের চুক্তিকে মুদারাবা বলে।'

ইরাক এলাকায় এ চুক্তিকে মুদারাবা বলা হলেও মক্কা-মদীনা এলাকায় বলা হয় মুকারাযা (مُقَارَضَة) বা কিরায (قراض)। প্রখ্যাত ভাষাবিদ যামাখশারী এ সম্পর্কে বলেছেন, মুকারাযা বা কিরায-এর মূল শব্দ الْقَرْض। যার অর্থ: পরিভ্রমণ করা, দেশভ্রমণ করা। হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ মুদারাবা শব্দটি ব্যবহার করেছেন; অপরদিকে মালেকী ও শাফেয়ী মাযহাবের আলেমগণ ব্যবহার করেছেন কিরায বা মুকারাযা শব্দ।

মুদারাবা বৈধ হওয়ার তাৎপর্য ও গূঢ় রহস্য
মুদারাবা বৈধ ও জায়েয; প্রয়োজন তা জায়েয করেছে। দেখা যায়, একজনের হাতে প্রয়োজনীয় ব্যয়ের অধিক সম্পদ রয়েছে প্রচুর, সে তাতে কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে তা বাড়াতে চায়। কিন্তু ব্যবসা করে তা বাড়ানোর ক্ষমতা বা সুযোগ তার নেই। এ পর্যায়ে সে বাধ্য হয় তার প্রতিনিধি নির্ধারণ করতে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এ জন্যে সে ব্যবসাকাজে অভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তিকে বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসাবে রাখতে পারে না। হয়তো কেউ কর্মচারী হতে রাজি হয় না, বরং সে বেতনের পরিবর্তে লাভে অংশীদার হতে চায়। অথবা কর্মচারী পাওয়া গেলেও তাকে পুঁজির মালিক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে পারে না, যেহেতু পুঁজির অধিকারী ব্যক্তির ব্যবসা পরিচালনার ক্ষমতা বা যোগ্যতা থাকে না। এমনি পরিস্থিতিতে মানবগোষ্ঠীর মাঝে মুদারাবা পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে, শরীয়তও পরিস্থিতি বিবেচনা করে তার অনুমোদন দিয়েছে।

টিকাঃ
১. সূরা মুযযাম্মিল, আয়াত ২০
২. লিসানুল আরব -ضرب مادة
৩. লিসানুল আরব, আল-কামূসুল মুহীত।
৪. বাদায়েউস সানায়ে', খ. ৬, পৃ. ৭৯; আল-ইখতিয়ার, খ. ২, পৃ. ১৯
১৮. মাওয়াহিবুল জলীল, খ. ৫, পৃ. ৩৫৬; কাশশাফুল কিনা', খ. ৩, পৃ. ৫০৭

📘 Biggan moy quran > 📄 আল-কোরআন এবং Astronomy

📄 আল-কোরআন এবং Astronomy


আত্মপ্রশংসার নিন্দা
১৩০. ইবরাহীম নাখঈ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “হায়, (লোকেরা) একত্রে সমবেত হওয়ার সময় যদি তারা নিজেদের ব্যাপারে ভালো আলোচনা করা বা আত্মপ্রশংসার বিষয়টা অপছন্দ করত![১৪৬]

আমলের গোপনীয়তার প্রতি গুরুত্বারোপ
১৩১. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যদি এমন হতো যে, কেউ কুরআনের জ্ঞান অর্জন করলে তার প্রতিবেশী জানতে না পারত; কেউ অনেক বেশি ফিকহী ইলম অর্জন করলেও লোকেরা তা টের না পেত; কেউ নিজ বাড়িতে দীর্ঘ সালাত পড়লেও ওখানে উপস্থিত লোকেরা তা বুঝতে না পারত।
আমি একদল মানুষের কথা জানি, তারা দুনিয়ার বুকে প্রতিটা আমল গোপনীয়তার সাথে করত, কখনও তা প্রকাশ হতো না। মুসলমানগণ প্রাণপণে দুআ করতেন; কিন্তু কোনো আওয়াজ শোনা যেত না। কেবল তাদের ও তাদের রবের মধ্যে এক ধরনের গুঞ্জরণ সৃষ্টি হতো। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
'তোমরা বিনয়ের সঙ্গে ও গোপনে তোমাদের রবকে ডাকো।[১৪৭]
আর আল্লাহ তাআলা তাঁর এক সৎ বান্দার কথা উল্লেখ করেছেন এবং তার কথায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন,
إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا
'যখন (যাকারিয়্যা) তার প্রতিপালককে ডেকেছিল গোপনে।'”[১৪৮]-[১৪৯]

আমলের কথা লোকদের বলে বেড়ানোর পরিণাম
১৩২. আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন-
مَنْ سَمَّعَ النَّاسَ بعلمه، سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ سَامِعَ خَلْقِهِ، وَحَقَّرَهُ وَصَغَرَهُ
"কেউ যদি তার জ্ঞানের কথা লোকদের কাছে বলে বেড়ায়, আল্লাহও তার (গোপন) কথা মানুষকে শুনিয়ে দেন; তাকে অপমানিত ও অপদস্থ করেন।”[১৫০]
আবদুল্লাহ ইবনু আমর বলেন, এই হাদীস বর্ণনা করার পর ইবনু উমরের চোখ-দুটি ভিজে গেল।

আমলের আগে নিয়ত ঠিক করে নেওয়া
১৩৩. আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ-এর কাছে কিছু লোকের আলোচনা করে বলা হলো যে, তাঁরা আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছেন। তখন আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বললেন, “তোমরা যা বলছ ও ভাবছ, বিষয়টি তেমন নয়। যখন দুটি দল মুখোমুখি হয় তখন ফেরেশতাগণ নেমে এসে প্রত্যেক মানুষকে তাদের নিজ নিজ স্তরে লিপিবদ্ধ করেন: অমুক দুনিয়া লাভের জন্য জিহাদ করেছে; অমুক রাজত্ব লাভের জন্য জিহাদ করেছে; অমুক যশখ্যাতির জন্য জিহাদ করেছে, ইত্যাদি; আর অমুক আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য জিহাদ করেছে। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের আশায় জিহাদ করে, সে জান্নাতে যাবে।"[১৫১]

লোক-দেখানো বিনয় ও নম্রতা
১৩৪. আবূ ইয়াহইয়া থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু অথবা আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "লোক-দেখানো বিনয় ও নম্রতা থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে পানাহ চাও।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, সেটা কী জিনিস? তিনি বললেন, "দেহ বিনয়ী দেখালেও অন্তরে বিনয় নেই।"[১৫২]

আমলে কঠোরতা সত্ত্বেও পারস্পরিক সৌজন্য
১৩৫. আওযাঈ থেকে বর্ণিত, বিলাল ইবনু সা'দ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আমি তাঁদেরকে দেখেছি যে, তাঁরা নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনে (ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে) কঠোর ছিলেন। তবে তাঁরা পরস্পরকে দেখে (মুচকি) হাসতেন। রাত শুরু হলেই মগ্ন হয়ে যেতেন আল্লাহর ইবাদাতে।”[১৫৩]

মুচকি হাসি
১৩৬. উবাইদুল্লাহ ইবনুল মুগীরা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস রদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলতে শুনেছি : “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে বেশি মুচকি হাসতে আর কাউকে দেখিনি।"[১৫৪]

পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তাকানো
১৩৭. আউন ইবনু আবদিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল মুচকি হাসি হাসতেন (অট্টহাসি দিতেন না) এবং কারও দিকে তাকালে পরিপূর্ণভাবে তাকাতেন।”[১৫৫]

ধীরস্থিরভাবে কথা বলা
১৩৮. মিসআর বলেন, একজন শাইখ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি জাবির ইবনু আবদিল্লাহ রদিয়াল্লাহু আনহু অথবা আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা- কে বলতে শুনেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথাবার্তায় ধীরতা ও স্থিরতা ছিল।”[১৫৬]

দাঁত বের করে না হাসা
১৩৯. আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনও এমনভাবে হাসতেন না যে, তাঁর সামনের দাঁতগুলো বেরিয়ে যেত; বরং তিনি কেবল মুচকি হাসতেন।" [১৫৭]

রোজা রাখা অবস্থায় পরিপাটি থাকা
১৪০. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যেদিন তোমাদের কেউ সাওম রাখবে, সে যেন দিনের বেলা চুল পরিপাটি রাখে।" [১৫৮] (যাতে কেউ বুঝতে না পারে সে রোজাদার।)

মানুষকে জানতে না-দেওয়া
১৪১. হিলাল ইবনু ইয়াসাফ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম বলেছেন, “রোজা রাখা অবস্থায়ও মাথার চুল ও দাড়িতে তেল লাগিয়ো, ঠোঁট মুছে রেখো। যাতে মানুষ বুঝতে না পারে, তুমি রোজাদার। ডান হাত দিয়ে দান করলে নিজের বাম হাত থেকেও তা লুকিয়ে রেখো। আর সালাত পড়ার সময় ঘরের দরজায় পর্দা টানিয়ে রেখো। কারণ, আল্লাহ তাআলা যেভাবে রিযক বণ্টন করেন, ঠিক সেভাবে প্রশংসাও বণ্টন করেন।" [১৫৯]

গোপনে পড়ায় বেশি সাওয়াব
১৪২. খালিদ ইবনু মুহাজির থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি : “যেমনিভাবে ফরজ সালাত একাকী পড়ার চেয়ে জামাআতে পড়া উত্তম, তেমনিভাবে নফল সালাত প্রকাশ্যে পড়ার চেয়ে গোপনে পড়া উত্তম।”[১৬০]

প্রতিদানের প্রত্যাশা
১৪৩. কাসিম আবূ আবদুর রহমান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا أَجْرَ لِمَنْ لَا حِسْبَةً لَهُ
“যে ব্যক্তি (আল্লাহ তাআলার কাছে) প্রতিদান প্রত্যাশা করে না, সে কোনো প্রতিদান পায় না।”[১৬১]

বলে বেড়ালে ইবাদাত নষ্ট হয়ে যায়
১৪৪. আবূ সালামা ইবনু আবদির রহমান রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলল, “আমি চার বছর ধরে একটানা রোজা রেখেছি।” রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
لَا صُمْتَ، وَلَا أَفْطَرْتَ
“তুমি রোজা রাখোনি, রোজা ভাঙোওনি।”[১৬২] কারণ, তুমি তা বলে বেড়াচ্ছ।

আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়
১৪৫. হাবীব ইবনু সুহাইব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا تَقَرَّبَ الْعَبْدُ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى بِشَيْءٍ أَفْضَلَ مِنْ سُجُودٍ خَفِي
"বান্দা যে-সকল (আমলের) মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো গোপন সাজদা।" [১৬৩]

গোপনীয়তার সঙ্গে যিকর
১৪৬. দামরাতা ইবনু হাবীব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
اذْكُرُوا اللَّهَ تَعَالَى ذِكْرًا خَامِلًا قَالَ: فَقِيلَ: وَمَا الذِّكْرُ الْخَامِلُ؟ قَالَ: الذِّكْرُ الْخَفِيُّ
"যিকরুন খামিলের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করো।” জিজ্ঞেস করা হলো, যিকরুন খামিল কী? তিনি বললেন, “গোপনীয় যিকর।” [১৬৪]

ঘরে কান্নাকাটি করা
১৪৭. মুহাম্মাদ ইবনু যিয়াদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আবূ উমামা বাহিলি রদিয়াল্লাহু আনহু একবার মাসজিদে এসে দেখলেন, এক ব্যক্তি সাজদায় পড়ে কান্নাকাটি করছে এবং আল্লাহকে ডাকছে। তিনি তাকে বললেন, "আহ, এটা যদি তোমার ঘরে করতে!" [১৬৫]

টিকাঃ
[১৪৬] আবূ খাইসামাহ, কিতাবুল ইলম, ৩৬, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৪৭] সূরা আরাফ: ৫৫।
[১৪৮] সূরা মারইয়াম: ০৩।
[১৪৯] ওয়াকিহ ইবনুল জাররাহ, কিতাবুয যুহদ, ৩৩৮, মাকতু।
[১৫০] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৪৪, সনদ দঈফ; তবে এর সমার্থবোধক হাদীস সহীহ সনদে মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[১৫১] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১৫২] সনদ দঈফ, মাওকুফ।
[১৫৩] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/২২৪, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৫৪] তিরমিযি, ৩৬৪১, হাদীসটি হাসান। আলবানি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
[১৫৫] তিরমিযি, ৩৬৪২, মু'দাল এবং অন্য কিতাবে হাসান সনদে মাওসুলরূপেও বর্ণিত হয়েছে। আলবানি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
[১৫৬] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ৪৪, হাদীসটি দঈফ, তবে এর সমার্থবোধক হাদীস হাসান সনদেও বর্ণিত হয়েছে।
[১৫৭] সনদ দঈফ। তবে হাদীসটি অন্যান্য সনদে বর্ণিত হওয়ায় সহীহ। বুখারি, ৫৭৪১।
[১৫৮] সনদ সহীহ, মাওকুফ। ইমাম বুখারি 'সাওম' অধ্যায়ে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন।
[১৫৯] হিলাল ইবনু ইয়াসাফ পর্যন্ত হাদীসটির সনদ সহীহ। হাদীসটির বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে।
[১৬০] এখানে হাদীসটি মাকতু, তবে এর সমার্থবোধক হাদীস মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে।
[১৬১] সনদ হাসান, মুরসাল।
[১৬২] সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১৬৩] সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১৬৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৫/১৪০, সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১৬৫] সনদ সহীহ, মাওকুফ。

প্রশ্ন: আমি ঊনিশ বছর বয়সের অবিবাহিত যুবক এবং নারীর সৌন্দর্যে আমি প্রভাবিত হয়ে যাই, এখন আমি কী করব, এমনকি আমি নারী থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলি (তারপরও সমস্যা), কেননা সে তার প্রতি আমার মনোযোগ এমনভাবে আকর্ষণ করে ফেলেছে, যা আমাকে তার ব্যপারে সবসময় চিন্তায় ফেলে রাখে?
উত্তর: তোমার জন্য আবশ্যকীয় করণীয় হলো তুমি তোমার চক্ষুকে নারীদের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া থেকে অবনমিত রাখবে এবং তাদের ব্যাপারে তোমার চিন্তা করা বন্ধ করবে, আর আল্লাহ তা'আলা নিষ্পাপ পবিত্র বান্দাগণের জন্য যা প্রস্তুত করেছেন তা স্মরণ করবে এবং হারাম থেকে দূরে থাকবে, আর তোমার জন্য আরও আবশ্যক করণীয় হলো দ্রুত বিয়ের কাজ সম্পন্ন করবে। কারণ, তা দৃষ্টিকে সবচেয়ে বেশি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হিফাযত করে, আর তা চিন্তা দূর করে এবং নিজেকে বৈধ ও হালালের ওপর সীমাবদ্ধ রাখে। আর আল্লাহই সবচেয়ে বেশি জানেন।
শাইখ আবদুল্লাহ ইবন আবদির রহমান আল-জিবরীন

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00