📄 পৃথিবী (The Earth)
প্রশ্ন: এখানে আধুনিক সভ্যতার দাবিদারগণের কেউ কেউ ভাবির (ভাইয়ের বউ'র) চেহারার দিকে তাকানোকে বৈধ বলে প্রচার করেন এবং এর সপক্ষে কিছু বিশুদ্ধ দলীলও (তাদের দৃষ্টিতে) পেশ করেন। এর জবাবে আপনাদের মতামত কীভাবে ব্যক্ত করবেন, সবিনয়ে জানতে চাই?
উত্তর: ভাইয়ের বউ তথা ভাবি অন্যান্য নারীর মতো-ই অপরিচিত বা পরনারীদের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তার ভাইয়ের জন্য তার (ভাবির) দিকে তাকানো বৈধ নয়, যেমনিভাবে বৈধ নয় চাচী, মামী ও তাদের মত নারীদের দিকে তাকানো। আর তার জন্য বৈধ নয় সকল অপরিচিত নারীদের মত তাদের কোনো একজনের সাথে একান্ত নির্জনে সাক্ষাৎ করা, আর তাদেরও কারো জন্য বৈধ নয় তার স্বামীর ভাই তথা দেবরের সামনে বা তার (দেবরের) চাচা বা মামার সামনে বেপর্দা অবস্থায় চলাফেরা করা অথবা তাকে নিয়ে সফর করা বা একান্ত নির্জনে অবস্থান বা সাক্ষাৎ করা। কারণ, আল্লাহ তা'আলা সাধারণভাবে বলেন:
﴿وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَسْلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ﴾ [الاحزاب: ৫৩]
"তোমরা তার পত্নীদের কাছ থেকে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এ বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য বেশি পবিত্র"। [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৩]
আহলুল ইলমের বিশুদ্ধ মতে এ আয়াতটি সাধারণভাবে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ ও অন্যান্য নারীদের বেলায় সমানভাবে প্রযোজ্য। তাছাড়া আল্লাহ তা'আলা আরও বলেছেন:
قُل لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ ﴾ [النور: ٣٠ ]
"মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। এটিই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত”। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩০]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: يَأَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ [الاحزاب: ٥٩]
"হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না”। [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৯]
আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: لَا تُسَافِرُ المَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ».
"কোনো মাহরাম পুরুষের সাথে ছাড়া কোনো নারী সফর করবে না। "16 নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন: لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ».
"কোনো ব্যক্তি কখনও কোনো মহিলার সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করবে না। তবে জেনে রাখবে এমতাবস্থায় তাদের সাথে তৃতীয় জন হলো শয়তান। "17 তাছাড়া তার দেবর বা অনুরূপ কোনো পুরুষের সামনে বেপর্দা অবস্থায় চলার মধ্যে এবং ঐ পুরুষ কর্তৃক তার চেহারার দিকে তাকানোর মধ্যে ফিতনার অনেক কারণ নিহিত রয়েছে এবং আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নিষিদ্ধ কাজে জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও অনেক। আল্লাহই ভালো জানেন- এসব বিষয়ই হলো পর্দার বিষয়টি বাধ্যতামূলক হওয়ার, তাদের দিকে দৃষ্টি দেওয়া ও তার সাথে একান্ত নির্জনে সাক্ষাৎ করাটা নিষিদ্ধ ঘোষণার অন্যতম হিকমত। কেননা চেহারা হলো সৌন্দর্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু। আর আল্লাহই হলেন তাওফীক দানের একমাত্র মালিক।
শাইখ আবদুল আযীয ইবন আবদিল্লাহ ইবন বায
টিকাঃ
¹⁶ সহীহ বুখারী ও মুসলিম
¹⁷ তিরমিযী, হাদীস নং- ২১৬৫
📄 পৃথিবীর উপগ্রহ (The Moon)
প্রশ্ন: আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কোনো কোনো সময় আমি মেয়েদেরকে সালাম দেই। আমার প্রশ্ন হলো ছাত্র কর্তৃক তার সহপাঠী বান্ধবীদেরকে স্কুল-কলেজে সালাম দেয় কী বৈধ, নাকি অবৈধ?
উত্তর: প্রথমত মেয়েদের সাথে একই জায়গায় একই প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করাটাই বৈধ নয়। কেননা এটা হলো ফিতনার অন্যতম বড় একটি কারণ।
সুতরাং কোনো ছাত্র ও ছাত্রীর জন্য এ ধরনের যৌথ অংশগ্রহণমূলক কোনো কর্মকাণ্ড বৈধ নয়, যেহেতু তার মধ্যে ফিতনার আশঙ্কা রয়েছে। আর সালামের বিষয়টি হলো যে সালামের মধ্যে ফিতনার কোনো কারণ প্রদর্শিত হয় না ছাত্র কর্তৃক ছাত্রীকে এমন শরী'আত সম্মত সালাম প্রদান করাতে কোনো অসুবিধা নেই এবং ছাত্রী কর্তৃক ছাত্রকে সালাম দেওয়াতেও কোনো সমস্যা নেই, তবে কোনো অবস্থাতেই তারা মুসাফাহা (করমর্দন) করবে না। কারণ, অপরিচিত নারী পুরুষে মুসাফাহা করা বৈধ নয়; বরং সালাম হবে পর্দা রক্ষা করে দূর থেকে এবং সাথে ফিতনার উপলক্ষসমূহ থেকেও দূরে থাকতে হবে, আর কোনো অবস্থাতেই একান্ত নির্জনে এ ধরনের সালাম চলবে না। কারণ, শরী'আতসম্মত সালামের মধ্যে কোনো ফিতনা না থাকাতে তাতে কোনো দোষ নেই। তবে ছাত্র কর্তৃক ছাত্রীকে অথবা ছাত্রী কর্তৃক ছাত্রকে সালাম দেওয়ার সময় যখন এমন কোনো মানসিকতা থাকে, যা ফিতনার কারণ হিসেবে গণ্য (অর্থাৎ কামভাবের সাথে ও আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নিষিদ্ধ কোনো উদ্দীপনা নিয়ে সালাম দেওয়া), তখন এ সালাম শরী'আতের নিয়মানুযায়ী নিষিদ্ধ। আর তাওফীক দানের মালিক হলেন আল্লাহ।
শাইখ আবদুল আযীয ইবন আবদিল্লাহ ইবন বায
📄 মহাশূন্য অভিযান
প্রশ্ন: মুসলিম পুরুষের জন্য পত্রিকা বা ম্যাগাজিনে ছাপানো নারীদের ছবির দিকে তাকানো বৈধ হবে কি? আর নারীর প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হারাম হওয়ার মাত্রাটা কি একই রকম হবে- চাই তার দিকে সরাসরি দৃষ্টি দেওয়া হউক অথবা ম্যাগাজিনে ছাপানো তার ছবির দিকে তাকানো হউক? আমাদেরকে বুঝিয়ে বলবেন।
উত্তর: কোনো সন্দেহ নেই যে, সৌন্দর্য প্রদর্শনকারিনী নারীদের দিকে তাকানো এমন একটি মারাত্মক বিষয়, যা ফিতনার কারণ বা উপলক্ষ তৈরি করে এবং অশ্লীল কাজের দিকে আহ্বান করে। এ জন্য আল্লাহ তা'আলা নারীদেরকে পর্দা অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন:
وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ [النور: ٣١]
"আর তারা তাদের গলা ও বুক যেন মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখে”। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১]
আর কোনো সন্দেহ নেই যে, উলঙ্গ বা অর্ধ-উলঙ্গ নারীর ছবির দিকে তাকানোর বিষয়টি তার সাথে ফিতনায় জড়িয়ে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ, আর এর ওপর ভিত্তি করে সিনেমাতে, পত্রিকায়, ম্যাগাজিনে ও অন্য যে কোনো খানে প্রদর্শিত এমন প্রতিটি ছবির দিকে তাকানোই হারাম বলে বিবেচিত হবে, যা বিপর্যয়ের কারণ সৃষ্টি করবে অথবা ফিতনার দিকে আকর্ষণ করবে।
শাইখ আবদুল্লাহ ইবন আবদির রহমান আল-জিবরীন
📄 আল্-কোরআন এবং প্রাণের উৎপত্তি
প্রশ্ন: বিদেশ থেকে মাহরাম পুরুষ ছাড়া কাজের মেয়ে নিয়ে আসার বিধান কী, যখন সে মেয়েটি মুসলিম হয়? যেমন এ কাজটি অনেক মানুষ করে থাকে, বিশেষ করে ছাত্রগণ। আর তারা যুক্তি দেখান যে, তারা বাধ্য হয়ে এটা করেন, আবার তাদের কেউ কেউ যুক্তি পেশ করেন যে, মাহরাম পুরুষ ছাড়া সফর করার যে গুনাহ এটা তার (কাজের মেয়ের) ওপরই বর্তাবে অথবা কাজের মেয়ে নিয়ে আসার দায়িত্বে নিয়োজিত অফিস কর্তৃপক্ষের উপর বর্তাবে? আশা করি আপনি এ বিষয়টি পরিষ্কার করে বর্ণনা করবেন। আল্লাহ আপনাদেরকে হিফাযত করুন এবং উত্তম পুরস্কার দান করুন।
উত্তর: মাহরাম পুরুষ ছাড়া কাজের মেয়ে নিয়ে আসার কাজটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্যতার শামিল। কেননা তাঁর নিকট থেকে সহীহ বর্ণনা এসেছে, তিনি বলেন:
«لاَ تُسَافِرُ المَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ».
"কোনো মাহরাম পুরুষের সাথে ছাড়া কোনো নারী সফর করবে না।"27
তাছাড়া মাহরাম পুরুষের সাথে ছাড়া তার আগমন করাটা কখনও কখনও তার পক্ষ থেকে অথবা তার সাথে ফিতনার কারণ হতে পারে, আর ফিতনার সকল কারণ বা উপলক্ষ ইসলামী শরী'আতে নিষিদ্ধ। কেননা যা হারামের দিকে ধাবিত করে, তাও হারাম বলে গণ্য।
আর কোনো কোনো মানুষ কর্তৃক এ ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শন করাটা বিপজ্জনক, আর যারা বলেন: 'বিষয়টি খুবই জরুরি বিষয় (হওয়াতে তা না করার উপায় নেই)', তাদের এ কথার কেনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি ও দলীল নেই।
কারণ, আমরা যদি কাজের মেয়ের আবশ্যকতার বিষয়টি জরুরি বলে মেনেও নেই, তাহলে এটা জরুরি নয় যে, তাকে মাহরাম পুরুষ সঙ্গী ছাড়াই আসতে হবে। অনুরূপভাবে কোনো কোনো মানুষের এ কথারও কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি ও দলীল নেই, যারা বলে: 'মাহরাম পুরুষ ছাড়া সফর করার যে গুনাহ এটা তার (কাজের মেয়ের) উপরই বর্তাবে অথবা কাজের মেয়ে নিয়ে আসার দায়িত্বে নিয়োজিত অফিস কর্তৃপক্ষের উপর বর্তাবে।' কারণ, যে ব্যক্তি হারাম কাজের কর্তার জন্য দরজা উন্মুক্ত করে দেবে, সে ব্যক্তি গুনাহের সহযোগিতা করার কারণে সে ক্ষেত্রে তার অংশীদার হবে। আর আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ أَن صَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَن تَعْتَدُوا وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ ﴾ [المائدة: ٢]
"তোমাদেরকে মসজিদুল হারামে প্রবেশে বাধা দেওয়ার কারণে কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনই সীমালঙ্ঘনে প্ররোচিত না করে। নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর"। [সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ২]
আর আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার জন্য, আর মাহরাম পুরুষ ছাড়া কাজের মেয়ে নিয়ে আসার মানেই হলো অসৎকাজের স্বীকৃতি প্রদান করা, প্রতিবাদ করা নয়।
আল্লাহ তা'আলার নিকট আবেদন করছি, তিনি যেন আমাদের সকলকে তাঁর সঠিক পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকীমের পথ দেখান- তাদের পথ, যাদেরকে তিনি পুরস্কৃত করেছেন, তাঁরা হলেন নবীগণ, চরম সত্যবাদী ও শহীদগণ এবং সৎকর্মশীল ব্যক্তিগণ।
শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন
টিকাঃ
²⁷ সহীহ বুখারী ও মুসলিম。