📘 Biggan moy quran > 📄 পরিশিষ্ট-৩ সময়ের গতি

📄 পরিশিষ্ট-৩ সময়ের গতি


সময়ের গতি
সাধারণত লোকেরা পরম সময়ে (absolute time) বিশ্বাস করে। কেননা একজন লোক দু'টি ঘটনার মধ্যকার সময়ের পার্থক্যকে সঠিকভাবে পরিমাপ করতে পারে এবং যে কেউ পরিমাপ করুক না কেন এই সময়ের দৈর্ঘ্য একই থাকবে যদি সময় পরিমাপকের ঘড়ি ঠিক থাকে। আসল কথা হলো সময় স্থানীয় সচেতনতায় বিরাজ করে।

আইনস্টাইন তাঁর বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে দেখিয়েছেন, "There is no absolute time, but instead each individual has his own personal measure of time that depends on where he is and how he is moving"।

সময় এবং স্থান (time and space) হচ্ছে গতিশীল মাত্রিক। যখন কোনো বস্তু গতিশীল হয় এবং তার উপর প্রযুক্ত শক্তি ক্রিয়া করে তখন তা আপেক্ষিকভাবে বর্ণনাযোগ্য স্থান-কালের বক্রতাকে প্রভাবিত করে। পরবর্তী সময়ে স্থান-কালের গঠন ঐ পথকে প্রভাবিত করে যে পথে বস্তু চলাচল করে এবং সেখানে প্রযুক্ত বল সক্রিয় থাকে।

স্থান-কালের ধারণা ব্যতীত কেউ বিশ্বের কোনো ঘটনাকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে না। সূর্য বর্তমানে যে অবস্থানে আছে সে-ই অবস্থান থেকে পৃথিবীতে তার আলো পৌঁছতে সময় লাগে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড। তাহলে সূর্যের আলো আমরা ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড পরে দেখতে পাই। আমাদের দৃষ্টি সীমার মধ্যে দূরে সংঘটিত কোনো ঘটনা আমরা যখন অবলোকন করি তখন মনে হবে একই সময়ে ঘটনাটি যেন ঘটছে? প্রকৃত অর্থে তা ঠিক নয়। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, যে ঘটনাটি আমরা দেখি তা আলোতে বিকীর্ণ হয়ে আমাদের চোখে এসে পড়ে। ফলে ঘটনাটি দেখতে পায়। এ আলোর বিকিরণ আমাদের চোখে এসে পৌঁছতে নিশ্চিত কিছু সময় লাগে। এ সময়টুকু সাধারণত মানুষ নিজস্ব পরিমাপের মধ্যে পরিগণিত করে না। আলোর গতি আছে এবং প্রতি সেকেন্ডে তা প্রায় ৩,০০,০০০ কিঃ মিঃ পথ অতিক্রম করে। কাজেই যে মুহূর্তে কোনো ঘটনা ঘটছে বলে আমরা মনে করি সে মুহূর্তে সেটা ঘটছে তা নয়। তা পূর্বে সংঘটিত হয়। তবে কত পূর্বে সংঘটিত হয় তা নির্ভর করে দূরত্বের উপর। ৩,০০,০০০ কিঃ মিঃ দূরে ঘটলে সে ঘটনা আমরা ১ সেকেন্ড পরে দেখব। এভাবে দূরত্ব যত বৃদ্ধি পাবে ঘটনা তত পরে আমাদের কাছে প্রতিভাত হবে।

আকাশের নির্দিষ্ট বিন্দুকে কেন্দ্র করে পৃথিবী তার অক্ষে একবার আবর্তিত হতে যে সময় লাগে সেই সময়কে আমরা একদিন বলে হিসেব করি। এক বছর হিসেব করা হয় যে সময়ে পৃথিবী একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে থাকে, যা রেফারেন্স বিন্দুর সঙ্গে আপেক্ষিক। এর রেফারেন্স বিন্দুই (reference point) দিন কিংবা বছরের দৈর্ঘ্য নির্ণয় করে থাকে। এরূপ প্রত্যেক গ্রহের নিজ অক্ষে আবর্তনের সময়-কালকে ঐ গ্রহের হিসেবে 'একদিন' বলা যায়। কিন্তু এ এক দিনের কাল-দৈর্ঘ্য বিভিন্ন ধরনের হবে যখন পৃথিবী থেকে হিসেব করা হবে। অর্থাৎ কিছু গ্রহ আছে যাদের দিন পৃথিবীর এক দিনের চেয়ে ছোট। আবার কিছু গ্রহ আছে যাদের দিন পৃথিবীর দিন অপেক্ষা বড়। যেমন, বুধ গ্রহের ১ দিন সমান পৃথিবীর ৫৮ দিন। শুক্র গ্রহের ১ দিন সমান পৃথিবীর ২৪৩ দিনের সমান। ছায়াপথ গ্যালাক্সির একবার আবর্তনের সময়-কাল পৃথিবীর ২২০ মিলিয়ন বছরের সমান। অর্থাৎ ২২ কোটি বছরের সমান। পৃথিবীর বয়স এখন ৪৬০ কোটি বছর হলে ছায়াপথ গ্যালাক্সির ২১ দিন মাত্র তার কালের ব্যাপ্তি সমাপ্ত করেছে।

সময় একটি আপেক্ষিক ধারণা মাত্র যা স্থান-কালের বক্রতায় পরিব্যাপ্ত। সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বে বলা হয়েছে, আমাদের 'স্ট্যান্ডার্ড টাইম' বলতে কোনো টাইম নেই, সকল টাইমই লোকাল টাইম (Local time)। তবে প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে সময় সম্পর্কে তার নিজস্ব পরিমাপ আছে। এ নিজস্ব পরিমাপ নির্ভর করে ঐ স্থানের উপর যে স্থানে সে অবস্থান করে।

গ্যালাক্সিগুলো একে অপর থেকে পশ্চাদগামী হয়ে সরে যাচ্ছে এবং সুদূর অতীতে কোনো সময়ে এগুলোর মধ্যকার দূরত্ব অবশ্যই শূন্য ছিল। Big Bang এর সময় যখন t=0 ছিল তখন মহাবিশ্বের ঘনত্ব এবং স্থান কালের বক্রতা অসীম হতে পারতো। এ বিষয়টি আপেক্ষিক তত্ত্বের স্বয়ং একটি অচলবস্থার (breaks down) দৃষ্টান্ত। তাই এটা এককত্ব (singularity) নামে পরিচিত। আসল কথা হলো, সকল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এককত্বে এসে অচলবস্থা লাভ করে। এর অর্থ হলো এ যে, এমনকি Big Bang এর পূর্বেও বহু ঘটনা ঘটেছিল। ঐসব ঘটনা প্রয়োগ করে Big Bang এর পরের ঘটনা কেউ ব্যাখ্যা করতে পারে না। কারণ ঐ ঘটনা-প্রবাহ Big Bang এর সাথে অচলবস্থা লাভ করেছিল। Big Bang এর পরে কি ঘটেছে আমরা শুধু তাই জানতে পারি। এর আগের ঘটনাগুলো নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এটা স্পষ্ট করে বলা যায় যে মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) সাথে সাথে কালের যাত্রা শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞানের জগত চার মাত্রায় (four dimension) গঠিত। এর মধ্যে তিন মাত্রা স্থানের (space) এবং একটি মাত্রা কালের। কালের বা সময়ের মাত্রা ব্যতিরেকে ত্রি-মাত্রিক বস্তুজগতের বর্ণনা দেয়া অর্থহীন। অঙ্কশাস্ত্র ও পদার্থবিদ্যার গাণিতিক গঠন সর্বসময় স্থান-কাল সম্পর্কে একটি সুষমতা প্রদর্শন করে থাকে। অর্থাৎ গাণিতিক নিয়মগুলো ডান ও বামের মধ্যে, অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখায় না। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় স্থান-কালের গতির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। অতীত ও ভবিষ্যৎ শব্দ দু'টিকে পারস্পরিকভাবে পরিবর্তন করলে তার দ্বারা একটি চরম অবস্থার সৃষ্টি হবে এবং কোনো ঘটনায় কালের গতি দ্বারা চিহ্নিত করা বাহ্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। এছাড়া অন্যান্য জটিল পার্থক্য দেখা দিবে। তাই কালের বর্ণনাযোগ্য তিনটি গতি নির্ধারণ করা যুক্তি সংগতভাবে অপরিহার্য। প্রথমত, কালের ভবিষ্যৎ গতি স্থান-কালের অসীমতায় পরিব্যাপ্ত যা প্রসারিত মহাবিশ্বের গতিশীল পরিমাণের সাথে আপেক্ষিক। দ্বিতীয়, কালের বর্তমান গতি স্থানীয় সচেতনতায় বিরাজমান যা আমরা অনুভব করে থাকি এবং সঠিকভাবে পরিমাপ করতে পারি। তৃতীয়ত, কালের অতীত গতি স্থান-কালের বক্রতায় এককত্ব প্রাপ্ত হয়।

অতএব, সময়ের সঠিক পরিমাপের জন্য একটি স্থির বিন্দু প্রয়োজন। গতিশীল মহাজগতে স্থির বিন্দুর অবস্থান কোথায়! যেহেতু স্থির বিন্দুর অস্তিত্ব কোথাও নেই তাই এটা স্পষ্টভাবে বলা যায় "Time is relative"। পবিত্র কোরআনের ২২ঃ৪৭, ৩২ঃ৫ এবং ৭০ঃ৪ নং আয়াতে সময়ের আপেক্ষিকতার ধারণা প্রতিফলিত হয়েছে এবং সূরা আছরের ১ নং আয়াতে আল্লাহপাক কালের গতিশীলতার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। এসব আয়াতে সময়ের দৈর্ঘ্য ও গতিশীল প্রকৃতির উপর খুবই জোরালো যুক্তি দেখানো হয়েছে যা উপলব্ধি করে যে কোনো বিজ্ঞানী, দার্শনিক এবং সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষ 'সময়' সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠে। কারণ সূরা আছরে আল্লাহপাক যে কালের শপথ করেছেন সে-ই কালের দৈর্ঘ্য আমাদের জন্য অসীম। এর শুরু যদি Big Bang থেকে ধরা হয় এর শেষ নির্ধারণ করার তথ্য কারও জানা নেই। তবে এতটুকু জানা যায় Big Crunch এর পূর্বে মহাবিশ্বের সংকোচন শুরু হলে কালের দৈর্ঘ্য ক্রমান্বয়ে সংকুচিত পরিক্রমায় অচলবস্থা প্রাপ্ত হবে। আবার ১ দিন সমান ১০০০ বৎসর হলে সহজেই উপলব্ধি করা যায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মহাবিশ্বে এমনও জগত রয়েছে যার ১ দিনের দৈর্ঘ্য পৃথিবীর হিসেবে ১০০০ বৎসর অর্থাৎ ৩৬৫০০০ দিনের সমান (২২:৪৭)। উপরন্তু ১ দিনের দৈর্ঘ্য ৫০,০০০ বৎসর হলে ঐ জগতের ১ দিনের দৈর্ঘ্য সমান পৃথিবীর ১৮২৫০০০০ দিনের সমষ্টি (৭০ঃ৪)। আর এসব আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে ৭ম শতাব্দীতে।

References:
1. Scientific Indications in the Holy Quran; Islamic Foundation Bangladesh.
2. A Brief History of Time, Stephen W. Hawking.
3. The first three minutes; Steven Weinberg.

📘 Biggan moy quran > 📄 পরিশিষ্ট-৪ মানব প্রজননের ইতিহাস

📄 পরিশিষ্ট-৪ মানব প্রজননের ইতিহাস


পরিশিষ্ট-৪ মানব প্রজননের ইতিহাস

সুদূর অতীত কাল থেকে মানুষ তার নিজের জন্ম ও বংশ বৃদ্ধির কলাকৌশল সম্পর্কে জানার চেষ্টা চালিয়ে এসেছে। এ বিষয় সম্পর্কে অতীত কালের সকল তথ্য ও রচনা বলতে গেলে উপকথা ও কুসংস্কারে ভরা। সেসব কল্প-কাহিনী ও কুসংস্কার ধর্মতত্ত্ব জ্ঞান করে মানুষের মনে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। উপরন্তু এ ধরনের নীতি-ব্যবস্থা দ্বারা লিঙ্গ ভিত্তিক ধর্মতত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছে এবং লিঙ্গ পূজা করা তাদের লিঙ্গ ভিত্তিক ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করার জন্য এক গোষ্ঠী অপর বিরোধী গোষ্ঠীর সাথে বহু ঘৃণ্য কলহে লিপ্ত হয়েছিল। এমনকি আধুনিক বিজ্ঞানের এ যুগেও নিখিল ভারতের বিভিন্ন অংশে পুরুষের লিঙ্গপূজক বিদ্যমান রয়েছে, যা আমরা প্রতি বছর স্যাটেলাইট টিভিতে তাদের লিঙ্গ পূজার দৃশ্য দেখে থাকি।

যাহোক "Al-Quran and Modern Science" গ্রন্থের লেখক মোল্লা শামসুদ্দীন আহমদ মানব প্রজননের ইতিহাস থেকে একটি মজার উপখ্যান তুলে ধরেছেন। যা তামাশা আর বোকামিতে আকীর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়। পাঠকদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করার জন্য উক্ত উপখ্যানটি আমি এখানে হুবহু উদ্ধৃত করলাম যা অতি সাধারণ ইংরেজী ভাষায় লেখা।

"The people of old pagan believed that human embryo originated from menstrual blood. Indian Hindus, however, believed just the reverse. They said that since women without sexual intercourse with men do not bear any child, the human embryo must be originated from male semen only. Their holy Scriptures tell that semen of god Brahma was covered with sand, and from that sand grew 88000 Saints (Munis) named "Balakhily Munis". That semen of god Mahadev fell on earth and threw it on fire, and fire threw it in a jungle of reeds. And out of that semen was born a child in that jungle who was named "Kartik". That semen of one God-fearing king was eaten by a river fish, and that fish gave birth to a female baby who was named "Marshagondha" (daughter with odor of fish). By rubbing the two hands of King Ben, one son named "Prithu" and one daughter named "Agni-Bhagabat" were born. Due to rubbing the right hand of King Ben, Prithu Hari Bangsha was born. When King Janak was ploughing his land, the share of his plough dug out one egg from the soil. From that egg, one female baby named Sita came out. Shree Ram Chandra, the 7th incarnate god from original God Vishnu and the mythic king of Oudh (Ayodhya), married her. Regarding the birth of Ram Chandra, the Ramayana tells that King Dasharatha made an oblation of fire and cooking a porridge, a fruit was smeared in the porridge. God Vishnu entered that fruit. From that porridge, a portion having the image of God Vishnu came out. The priest gave it to Dasharatha and instructed him to give it to his wives for eating. Three wives of King Dasharatha made it into four parts and ate them. Thus, Vishnu was also divided into four parts and entered the stomachs of three queens. In due course, the three queens gave birth to four sons. The firstborn was named Ram Chandra. Thus, both Ram Chandra and his wife Sita were born without male semen. Goddess Durga, having 10 hands, originated from the mettle of some other god. She is also said to be the daughter of Himalayan Mountain, for which she is also named Parbati. Goddess Lakshmi was born thrice. Firstly, in the womb of Prasruti, wife of Dhakhya; secondly, in the womb of Khyati, wife of Bhrigu; and thirdly, in the womb of Durga, wife of Shiva. Goddess Kali came out from the forehead of Goddess Durga (Bhagavat). She is also said to have originated from the breath of her husband, Shiva."

মানব প্রজননের এসব কল্পকাহিনী পাঠ করে বেশ মজা পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে কোন বৈজ্ঞানিক সারযুক্তি নেই। আর এভাবে কোন দেব-দেবী কিংবা মানুষের উৎপত্তি একেবারে অসম্ভব। ওল্ড টেস্টামেন্টে দেখা যায় যে, স্তব-গায়করা (psalmist) এ বলে গান গেয়ে থাকেন, "অসততার মধ্যে আমি দেহ ধারণ করেছি এবং আমার মা পাপকর্মের মাধ্যমে গর্ভধারণ করেছে (psalm-Li 5)।

পৃথিবীতে মানব প্রজনন সম্পর্কে বৌদ্ধ ধর্ম শাস্ত্রে বলা হয়েছে, প্রভু বৌদ্ধের শততম পিতামহ ইকিয়াকুর জন্ম একটি ডিম থেকে যা বিকশিত হয়েছিল কণিকের জৈষ্ঠ্য পুত্র গৌতমের নোংরা বীর্যের মধ্যে।

বিজ্ঞান ভিত্তিক অনুসন্ধান শুরু

মেডিসিনের জনক হিপোক্রেটস্ (400 B.C) এর সময় থেকে এ বিষয়ে বিজ্ঞান ভিত্তিক যুক্তিসঙ্গত চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছিল। হিপোক্রেটস্ বিশ্বাস করতেন তরল বীর্যের মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী ভরপুর থাকে। এ ধরনের ভাবনা নিঃসন্দেহে শুভ অনুমান।

দার্শনিক প্লেটোরও বিশ্বাস ছিল বীর্যের মধ্যে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণীর অস্তিত্ব বিদ্যমান।

এরিস্টটল (350 B.C) একটি নবজাত শিশুর জন্মদান প্রক্রিয়ায় পিতা-মাতা উভয়ের অবদানের পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছিলেন এবং তার বিশ্বাস ছিল প্রথম মানব সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল মাটির গর্ভ (womb of the earth) থেকে।

গ্যালেন (200 A.C) এ মর্মে চিন্তা করেছিলেন, পুরুষ এবং নারী উভয়ের জনন কোষ আছে এবং উভয়ের জনন কোষ মিশ্রিত হলে একটি মানব শিশু জন্মলাভ করে। তার এ তত্ত্ব মৌলিকভাবে নির্ভুল। তবে তিনি ভেবেছিলেন শিশুর যকৃত ও হৃৎপিণ্ড মায়ের রক্ত থেকে গড়ে ওঠে। আর মস্তিষ্ক গড়ে ওঠে পুরুষের স্পার্ম থেকে।

সপ্তদশ শতাব্দী থেকে মানব প্রজনের উপর নিবিড় বৈজ্ঞানিক গবেষণা শুরু হয়। ১৬০৪ খৃস্টাব্দে ভ্রূণবিদ্যার উপর একটি পুস্তক রচিত হয় যার রচয়িতা ছিলেন Fabricius। গ্রন্থটির নাম ছিল "de Formatione ovi at pulli" (Concerning the formation of egg and the chick)। এ গ্রন্থে দেখানো হয়েছে কিভাবে ডিমের মধ্যে মুরগী ছানার ভ্রূণ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।

১৬৫১ সনে Harvey ফেব্রিসিয়াসের তত্ত্বের উন্নতি সাধন করেন এবং ডিম পর্যবেক্ষণ করে তত্ত্ব পেশ করেন যে, সকল প্রাণীর ভ্রূণের সূচনা হয় ডিম্বকোষ থেকে। De Graaf ১৬৭২ সালে শশক জাতীয় প্রাণীর ভ্রূণ পর্যবেক্ষণ করে চিন্তা করলেন, ভ্রূণটা বেরিয়ে আসে ডিম্বাশয় থেকে। ইতালীয়ান অ্যানাটমিস্ট Malpighi, De Graaf এর তত্ত্ব সমর্থন করেন। তিনি এ তত্ত্বের উপর জোর দিয়ে বলেন মানব ভ্রূণ সৃষ্টি হয় মাতৃ ডিম্বকোষ থেকে অর্থাৎ Ovum থেকে। পিতৃ জনন কোষের ভূমিকা একেবারে গৌণ।

একই সময়ে Harvey, De-Graaf ও Malpighi-র তত্ত্বের বিপরীতে আর একদল ভ্রূণবিদ দাঁড়িয়ে যান। তারা হলেন, Hamm, Leeuwenhoek এবং Swammerdan। তারা শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে Semen পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন যে, Sperm গুলো এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে। এগুলোকে ক্ষুদ্র প্রাণী বা প্রাণীকণা বলে চিহ্নিত করে দেন। এ তিনজন বিজ্ঞানী ঘোষণা দেন মানব ভ্রূণ পিতার স্পার্মের মধ্যে বিদ্যমান। Ovum এর ভূমিকা নেই বললে চলে।

এভাবে উভয় গ্রুপ দু'টি "Schools of thought" এ বিভক্ত হয়ে পড়লেন। একটি স্কুল বিশ্বাস করতেন, "Human embryos are present in mother's ovaries, the fathers playing no role"। অপরপক্ষে অন্য স্কুল বিশ্বাস করতো, "The embryos are present in father's sperms and mothers playing no role, other than only nursing the embryo till it grows into a full baby".

এ বিতর্ক একটানা ৮০ বৎসর যাবৎ অব্যাহত ছিল এমনকি sperm এবং ovum আবিষ্কার হওয়ার পরেও। মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭) এ বিষয়ে যে গ্রন্থ রচনা করেন তার নাম 'আল-কানুন ফিততিব'। এই গ্রন্থে Anatomy, Embryology, physiology এবং physiotherapy অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইবনে সিনা তাঁর গ্রন্থে দেখিয়েছেন, sperm এবং ovum এর যৌথ বিক্রিয়ায় (অর্থাৎ নিষেক) মানব ভ্রূণ গঠিত হয়। তিনি sperm এর নাম উল্লেখ করেছেন, "ajzaye manbiyat" এবং ovum এর নাম দিয়েছেন "Baizaye Unsa"। এ বইটি ইউরোপের দেশগুলোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৩০০ বৎসর যাবত পড়ানো হয়েছিল। তারা ইবনে সিনার anatomy, physiology এবং physiotherapy- র উপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর নির্ভুল ভ্রূণ তত্ত্ব সম্ভবত সমর্থন করেননি। কেননা এটা ছিল উভয় গ্রুপের বিশ্বাসের বিপরীত তত্ত্ব।

আধুনিক ভ্রূণ তত্ত্বঃ মানব ভ্রূণ নিয়ে যথাযথভাবে গবেষণা শুরু হয় ১৯৪১ সনে। আধুনিক ভ্রূণতত্ত্বে দেখানো হয়েছে, মাতৃগর্ভে ভ্রূণ সৃষ্টির প্রারম্ভে একটি sperm একটি ovum এর ভেতরে প্রবেশ করে নিষেক (fertilization) ঘটায়। নিষেক সংগঠিত হলেই একটি কোষ গঠিত হয় যার নাম জাইগোট (Zygote)। জাইগোট অতি সুরক্ষিত প্রকোষ্ঠে (uterus) স্থান লাভ করে। এ প্রকোষ্ঠটি ভ্রূণের জন্য খুবই নিরাপদ। এর গঠনশৈলী পর্যবেক্ষণ করে সবাই বিস্ময় বোধ করে। (আল কোরআন এটাকে বর্ণনা করেছে কারারিম মাকিন বা সুরক্ষিত আধার হিসেবে।) এখানে জাইগোট বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর বর্ধিত পরিবর্তিত অবস্থাকে বলা হয় blastocyst (জমাট রক্তের মতো অবয়ব) আরবীতে এটাকে বলা হয় 'আলাক', যার পারিভাষিক অর্থ জোঁক সদৃশ বস্তু। তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে Blastocyst জোঁকের মতো আকার (Leech-like appearance) ধারণ করে। ভ্রূণের এরূপ অবয়ব থেকে মাথার সম্মুখভাগ গঠিত হয়। এ পর্যায়ে হৃৎপিণ্ড অর্থাৎ Cardiovascular system এর সূচনা হয়। এ স্তরে ভ্রূণটি ১৫-১৬ দিনের মাথায় ভ্রূণ থলির দেয়ালে ঝুলন্ত দেহ-বস্তুর মত ঝুলে থাকে।

পরবর্তী স্তরে ভ্রূণ বিকাশকে বলা হয় somites বা মাংসপিন্ড। যা দেখতে চর্বন বস্তুর মত (Chewed like substance) (কোরআনে এটাকে বলা হয়েছে মুদ্‌গাহ বা মাংসপিন্ড)। এ অবস্থা চলতে থাকে ২৩-৪২ দিন পর্যন্ত। দাঁতের মত খাঁজকাটা ১৩টি মাংসপিন্ডের ব্লক Somites পর্যায়ে পরিলক্ষিত হয়। এগুলো পৃথক পৃথকভাবে ভ্রূণের নার্ভ-নালীর পাশাপাশি সাজানো থাকে।

পরবর্তী পর্যায়টি হলো skeleton বা কঙ্কাল গঠনের স্তর। (আল কোরআনে স্কেলেটনকে বলা হয়েছে 'ইযাম' বা অস্থি) এ স্তরে প্রথম দিকে যে অস্থিগুলো গঠিত হয় সেগুলো হলো উপরিভাগের কচি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। প্রাথমিক ৬ সপ্তাহে কচি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের mesenchymal tissue গুলো কোমল অস্থিতে পরিণত হয়ে কঙ্কালের একটি প্রাথমিক মডেল গঠন করে। ৬ সপ্তাহের শেষের দিকে উপরের দিকের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ একটি পূর্ণাঙ্গ কোমল মডেল প্রকাশ পায়। এভাবে ১২ সপ্তাহের মধ্যে ভ্রূণের একটি পরিপূর্ণ কঙ্কাল গঠিত হয়।

ভ্রূণ বিকাশের পরবর্তী স্তর হলো পেশী গঠন পর্যায় (formation of muscles stage)। ৭ম সপ্তাহ থেকে কঙ্কালতন্ত্র বিস্তৃতি লাভ করে এবং অস্থিগুলো পরিচিত আকার ধারণ করে। ৮ম সপ্তাহ থেকে অস্থিগুলো পেশী দ্বারা আবৃত হতে থাকে। ৮ম সপ্তাহ শেষ হলে বিভিন্ন তন্ত্র যেমন, পেশীতন্ত্র, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ খুব ভালভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এ সময় ভ্রূণ নড়াচড়াও করতে পারে।

সর্বশেষ স্তরের নাম Foetus। ফিটাস আর কিছু নয় একটি পূর্ণাঙ্গ মানব শিশু যা ভূমিষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় থাকে।

সুতরাং সংগৃহীত জৈব জ্ঞানের সঞ্চয় নিয়ে আমরা যখন আধুনিক ভ্রূণ তত্ত্ব পর্যালোচনা করি তখন দেখতে পাই সুমহান আল্লাহপাক ৭ম শতাব্দীতে কি নিখুঁতভাবে মানব ভ্রূণ সৃষ্টি ও বিকাশ সংক্রান্ত তথ্য ও তত্ত্ব অবতীর্ণ করেছেন। সূরা দাহরের ২ নং আয়াতে ভ্রূণ গঠন তথা নিষেক এবং সূরা হজ্ব এর ৫ নং আয়াতে এবং সূরা মুমিনূন-এর ১২-১৪ নং আয়াতে অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে ভ্রূণ বিকাশের তত্ত্ব বর্ণনা করা হয়েছে এবং আল্লাহপাক নিজেকে 'আহসানুল খালেকীন' ঘোষণা দিয়েছেন। এর অর্থ হলো 'সর্বোত্তম সৃষ্টিকর্তা। এ ঘোষণা খুবই যথার্থ। কেননা মানুষ অনেক কিছু উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু সে যা-ই উৎপাদন করুক না কেন তার উৎপাদনের উপজীব্য উপাদান আল্লাহরই সৃষ্টি। তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলোর মধ্যে 'মানুষই সেরা সৃষ্টি।

মানব প্রজনন সম্পর্কে পবিত্র কোরআন যেসব তথ্য তুলে ধরেছে প্রথমদিকে মানুষ সেসব আয়াতের উপর নানা রকম ভাষ্য পেশ করেছেন। এটা স্বাভাবিক। এখন বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের উন্নয়নের ফলে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ভ্রূণতত্ত্ব সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে।

References:
1. Al-Quran and Modern Science; Mullah Shamsuddin Ahmed; first edition January, 1997; Al-Falah printing press, 423 Elephant Road, Baramagh Bazar, Dhaka.
2. Scientific Indications in the Holy Quran; Islamic Foundation Bangladesh.
3. The Developing; K.L. Moore and A.M.A Azzindani; W.B. Saunders Co. philadelphia.

📘 Biggan moy quran > 📄 পরিশিষ্ট-৫ জীব কোষ

📄 পরিশিষ্ট-৫ জীব কোষ


সকল প্রাণীদেহ ও উদ্ভিদ দেহের গঠন একক হলো কোষ। কেবল অণুবীক্ষণ যন্ত্রে কোষ দেখতে পাওয়া যায়। কিছু সরল জীব একটি মাত্র যুক্ত কোষে তৈরি হলেও উন্নত জাতের সব প্রাণীদেহ এবং উদ্ভিদ দেহ কোটি কোটি কোষের সমন্বয়ে গঠিত। একটি সাধারণ কোষে মূলত দুইটি প্রধান অংশ থাকে- একটি নিউক্লিয়াস যার মধ্যে থাকে বংশগতির উপাদান বহনকারী ক্রোমোজোম এবং অপর অংশ সাইটোপ্লাজম। সাইটোপ্লাজম কেবল চারদিক থেকে নিউক্লিয়াসকেই ঘিরে রাখে না এর মধ্যে ভাসমান থাকে কোষের অতি সূক্ষ্ম কতগুলো অঙ্গাণু (organelles)।
প্রতিটি কোষের কিছু সার্বজনীন বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন, প্রায় সব কোষে থাকে বাইরের দিকে সীমা নির্ধারণকারী একটি আবরণী, ক্রোমোজোম সহ একটি নিউক্লিয়াস, মাইটোকন্ড্রিয়া, রাইবোজোম ও আভ্যন্তরীণ সাইটোপ্লাজমের কিছু আবরণী। এছাড়া আরো কিছু কোষ উপাদান যেমন, লাইসোজোম, সেন্ট্রিওল, সিলিয়া, অনুনালিকা ইত্যাদি। কোষের বাইরের দিকে যে আবরণী তা অতি সূক্ষ্ম। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে দেখা যায় এ আবরণী তিনটি স্তরে গঠিত। কোষের ভেতরের আবরণীসমূহের গঠনও প্রায় একই রকম। পর্যবেক্ষণ থেকে জানা গেছে কোষের বাইরে থেকে ভিতরে এবং ভিতর থেকে বাইরে বিভিন্ন দ্রব্যের বিনিময় এবং চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করে কোষ আবরণী। তাছাড়া স্নায়বিক উদ্দীপনা পরিচালন, সংকোচন ও কোষের পারস্পরিক ক্রিয়ায় কোষ আবরণী অতি প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে।
সাইটোপ্লাজমের মধ্যে জালের মত ছড়ানো যে এক ধরনের আবরণী তন্ত্র দেখা যায় তার নাম এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম। এটি অসংখ্য বদ্ধ নালিকা বা থলির সমন্বয়ে তৈরি। নালিকাসমূহের বাইরের গাত্রে লেগে থাকে অসংখ্য রাইবোজোম। কোষে প্রোটিন সংশ্লেষণের কাজ হয় রাইবোজোমে। তবে এ ব্যাপারে রাইবোজোমের সঙ্গে এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলামের কি সম্পর্ক তা এখনো জানা যায়নি।
কোষের অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে মাইটোকন্ড্রিয়া-অঙ্গাণু কোষের শ্বসন কেন্দ্র। সাইটোপ্লাজমের মধ্যে এদের দন্ডাকৃতির বা গোল আকৃতি বিশিষ্ট মনে হয়। অনেক সময়ে একটি কোষে এদের সংখ্যা হয় হাজারের উপর। মাইটোকন্ড্রিয়া দুটি পৃথক আবরণী দ্বারা তৈরি, ভিতরের আবরণীটি কিছু দূর পরপর ভাঁজ হয়ে ভিতরের দিকে ক্রিস্টা (cristae) নামে আঙ্গুলের মত অভিক্ষেপ তৈরি করে।

কোষের আর একটি উল্লেখযোগ্য গঠন-উপাদান হলো নিউক্লিয়াসের আবরণী। ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখা গেছে এ আবরণী তিনটি স্তরে গঠিত এবং অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত। এসব ছিদ্রের মাধ্যমে সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লিয়াসের ভেতরের দ্রব্যাদির যোগাযোগ স্থাপিত হয়। নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকে এক বা একাধিক সুতার মত ক্রোমোজোম যা বংশগতি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ক্রোমোজোম ছাড়া নিউক্লিয়াসে থাকে এক বা একাধিক নিউক্লিওলাস (nucleolus)। কোষে বিভাজন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে একে স্পষ্ট গোলাকৃতির দেখায়। নিউক্লিওলাস ক্রোমোজোমের যে বিন্দুতে সংলগ্ন থাকে তাকে বলা হয় নিউক্লিওলাস অর্গানাইজার (nucleolus organizer)। অনেক কোষে আবরণীবদ্ধ অনিয়মিত আকার ও আকৃতির কিছু অঙ্গাণু চোখে পড়ে। এদের বলা হয় লাইসোজোম (lysosome)। লাইসোজোমে থাকে কয়েক প্রকারের এনজাইম। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে লাইসোজোম আন্তঃকোষীয় পরিপাকের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মাইক্রোটিবিউলস বা অনুনালিকা নামে সূক্ষ্ম দন্ডাকৃতির বা নালিকার মত কিছু অংশ সাইটোপ্লাজমে দেখা যায়। কোষের নির্দিষ্ট আকৃতি বজায় রাখতে এরা সহায়ক বলে মনে করা হয়। কোষ বিভাজনের সময়ে তৈরি স্পিন্ডল ফাইবার (spindle fibre) মাইক্রোটিবিউলের উপস্থিতি ক্রোমোজোমকে ধারাবাহিকভাবে বিচলনে সাহায্য করে বলে ধারণা করা হয়।

কোষচক্র (cell cycle) মাতৃকোষ (stem cells) সৃষ্টি হওয়া থেকে শুরু করে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে আবার দুটি অপত্য কোষ সৃষ্টি পর্যন্ত কোষের মধ্যে যেসব ঘটনা ও পরিবর্তন ঘটে তা মিলে কোষচক্র গঠিত হয়। এ চক্র শুধু বিচ্ছিন্ন নিষিক্ত কোষের বেলায় নয়, বহুকোষী সকল প্রাণীর বর্ধনশীল কলায়ও লক্ষ্য করা যায়। কোষচক্রের সময় সবরকম কোষীয় উপাদান দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং চক্রের কোষ পর্যায়ে দুটি বিভাজন ক্রিয়া ঘটে। একটি হচ্ছে নিউক্লিয়াসের বিভাজন (mitosis) এবং অপরটি সাইটোপ্লাজমের বিভাজন (cytokinesis)। এ দুটি বিভাজন ক্রিয়া প্রায় সব কোষে একই সময়ে সংঘটিত হয়। কোষের সকল উপাদান কোষ চক্রকালে দ্বিগুণ হলেও অব্যাহতভাবে ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড সংশ্লেষণ হয় না। অর্থাৎ কোষচক্রের শুরুতে কোন DNA সংশ্লেষণ হয় না। এটা প্রথম বিরতিকাল (G1) নামে পরিচিত। এরপর DNA সংশ্লেষণ শুরু হয় এবং তা পরিমাণে দ্বিগুণ হয়ে যায়। এ পর্যায়টি সংশ্লেষণ পর্যায় নামে পরিচিত। সংশ্লেষণ পর্যায়ের পর কোষচক্র শেষ না হওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় বিরতিকাল (G2) চলে। কোষচক্রের কোন পর্যায় কতক্ষণ স্থায়ী হবে তা কোষ অনুযায়ী বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। এ ভিন্নতার কারণ এখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।

কোষ বিশেষায়ন (cell differentiation)
বহুকোষী প্রাণীর কোষসমূহ বিভিন্ন কলা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রূপায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য অর্জন করার প্রক্রিয়া কোষ বিশেষায়ন নামে পরিচিত। কোষ বিশেষায়নের সবচেয়ে উপযুক্ত প্রারম্ভিক স্থান হলো নিষিক্ত ডিম্বাণু (fertilized ovum)। ভ্রূণজনন কালে কোষের বিভিন্ন রকম পরিবর্তন ঘটে। যেমন, কোষ বিভক্ত হয়, কোষের আকার পরিবর্তন হয়ে যায়। ভ্রূণের মধ্যে কোষ বিভিন্ন স্থানে সরে যায় ইত্যাদি। ক্লিভেজের (cleavage) ফলে বড় ডিম্বকোষ বিভাজিত হয়ে ছোট ছোট কোষের একটি পিন্ড রূপে পরিণত হয়। এর মধ্যে প্রাথমিক দেহগহ্বর সৃষ্টি হয় যা এক স্তর ভ্রূণকোষ দ্বারা আবৃত থাকে। এ পর্যায়ে ভ্রূণকোষসমূহ এক জটিল সমন্বিত প্রক্রিয়ায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে যেতে থাকে এবং এভাবে এক স্তর কোষবিশিষ্ট ভ্রূণকোষ তিনটি স্তরে বিন্যস্ত হয়- বহিস্তক, মধ্যস্তক ও অন্তস্তক। প্রতিটি ভ্রূণ স্তর থেকে এক এক ধরনের বিশেষ কোষ তৈরি হয়। যেমন বহিস্তক থেকে ত্বক এবং স্নায়ু কোষ তৈরি হয়। অন্তস্তক থেকে পরিপাক নালী এবং মধ্যস্তক থেকে পেশি ও যোজক কলা তৈরি হয়। বিশেষায়িত কোষসমূহ একটি বিশেষ উপায়ে সজ্জিত থাকে যার ফলে বহুকোষী প্রাণী তার বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে পারে। এভাবে বিভিন্ন কোষ মিলে কলা এবং বিভিন্ন রকম কলা মিলে অঙ্গসমূহ গঠিত হয়।
কোন কোন কোষ এতই বিশেষায়িত যে এদের নির্ধারিত কার্যকলাপ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার প্রয়োজনে এরা আর বিভাজিত হয় না। উদাহরণ স্বরূপ স্নায়ুকোষের কথা উল্লেখ করা যায়। অন্যান্য অনেক কোষ নষ্ট হয়ে গেলে তা প্রতিস্থাপিত হয়। যেমন, ফাইব্রোব্লাস্ট ও অগ্ন্যাশয় কোষ বিভাজনের ফলে প্রতিস্থাপিত হয়। এর ফলে প্রমাণিত হয় যে, বিশেষায়িত অবস্থা উত্তরাধিকার সূত্রে বাহিত হতে পারে এবং অপত্য কোষসমূহ মাতৃকোষের মতই বিশেষ কাজ সম্পন্ন করতে পারে। প্রান্তীয় বিশেষায়িত কোষসমূহ আর বিভাজিত হতে পারে না। যেমন, ত্বকের কোষ ও রক্ত কোষ (blood cells)। এসব ক্ষেত্রে মাতৃকোষ (stem cells) বিভাজনের কাজ সম্পন্ন করে। স্টেম কোষসমূহের মৃত্যু নেই। এরা বিভাজনের ফলে প্রান্তীয় বিশেষায়িত কোষে পরিণত হতে পারে। অধিকাংশ স্টেম কোষ এক ধরনের বিশেষায়িত কোষ সৃষ্টি করতে পারে। অবশ্য রক্তের সব কোষ মূলত এক ধরনের স্টেম কোষ থেকে উৎপন্ন। এদের বহু-সম্ভাবী মাতৃকোষ (pluripotent stem cell) বলা হয়। কিন্তু নিষিক্ত ডিম্বকোষ একটি সর্ব-সম্ভাবী মাতৃকোষ (totipotent stem cell)। কারণ এর থেকে যে কোন ধরনের কোষই তৈরি হতে পারে।

কোষ বিভাজন (cell division)
কোষ বিভাজন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে জীবিত কোষ তার অনুরূপ অপর কোষের জন্ম দেয়। ব্যাপক অর্থে শারীরিক বৃদ্ধি বলতে কোষের সংখ্যা বৃদ্ধিকেই বুঝায়। কোষ বিভাজনে প্রথমত নিউক্লিয়াসের বিভাজন এবং পরে সাইটোপ্লাজমের বিভাজন ঘটে। যে সাধারণ পদ্ধতিতে কোষ বিভাজিত হয় তা মাইটোসিস নামে পরিচিত।
যেহেতু সব জীবিত বস্তুই কোষ দ্বারা গঠিত তাই কোষের বিভাজন ও বৃদ্ধি জীব জগতের যাবতীয় জৈবনিক প্রক্রিয়ার মূলে অধিষ্ঠিত। কোষ এ কাজটি সম্পন্ন করে তার মধ্যে যে অণুগুলো বর্তমান তাদের মত হুবহু নতুন অণু তৈরির মাধ্যমে। ফলে কোষের নিজের বৃদ্ধির ক্ষমতা সীমিত থাকলেও কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে। কোষ বিভাজন কোষকে তার ক্রমবৃদ্ধির জন্য সক্রিয় করে তোলে। কারণ বিভাজনের পরপরেই অপত্য কোষ বড় হবার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। স্বাভাবিক অবস্থায় একটি কোষ পূর্ণতা প্রাপ্তির পূর্বে পুনরায় বিভাজিত হতে পারে না। কোষ বিভাজন দেহের বৃদ্ধিকে সম্ভব করে তোলে। আর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত কোষ বিভাজনকে কার্যকর করে।
কোষচক্রে বংশগতির বস্তুসমূহের সংরক্ষণ নির্ভর করে কোষ বিভাজনের পূর্বে জেনেটিক দ্রব্যাদির বিভাজন এবং গুণগত ও পরিমাণগত দিক দিয়ে সমমাত্রায় অপত্য কোষের মধ্যে তার বণ্টন ব্যবস্থার উপর। সব উদ্ভিদ কোষ ও প্রাণী কোষে এ বণ্টন সম্পন্ন হয় মাইটোসিসের মাধ্যমে। কোষ বিভাজন সবসময় নিউক্লিয়াসের বিভাজনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে বিভাজন ছাড়াই কোষ বড় হয়। সেখানে কোষের বৃদ্ধির পাশাপাশি নিউক্লিয়াসের বিভাজন ঘটলেও মূল কোষ দেহের বিভাজন বাদ থেকে যায়। স্বাভাবিক দেহকোষে যে ধরনের কোষ বিভাজন হয় তাকে বলা হয় মাইটোসিস। তবে, জননকোষ তৈরির সময় এক বিশেষ ধরনের বিভাজন হয়। সেখানে অপত্য কোষে মূল ক্রোমোজোম সংখ্যা কমে অর্ধেক হয়ে যায়। এ ধরনের কোষ বিভাজন মিউসিস (meiosis) নামে পরিচিত।
সুতরাং পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় উল্লেখ আছে একটি কোষ থেকে প্রাণী সৃষ্টির তথ্য। এ কোষকে বলা হয়েছে নাক্স।
সূরা নেসার প্রথম আয়াতে আল্লাহপাক গোটা মানব জাতিকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন sperm দ্বারা ovum নিষিক্ত হওয়ার পর যে প্রথম কোষটি (জাইগোট) গঠিত হয় তা যেন গর্ভপাতের (abortion) নামে নষ্ট না করা হয়। এ ব্যাপারে আল্লাহপাককে ভয় করার নীতি অবলম্বন করার উপদেশ দেয়া হয়েছে।

📘 Biggan moy quran > 📄 পরিশিষ্ট-৬ ক্রোমোজোম

📄 পরিশিষ্ট-৬ ক্রোমোজোম


পরিশিষ্ট-৬ ক্রোমোজোম

ক্রোমোজোম বংশগতির উপাদান বা জিন বহনকারী কোষের অন্যতম অঙ্গাণু। ক্রোমোজোমে জিন উপাদানের অবস্থান তার DNA অণুতে। সারিবদ্ধ হয়ে থাকা এ উপাদান অ্যাসিড প্রোটিন ও বেসিক (Basic) প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সুতার মত এক জটিল নিউক্লিও প্রোটিনের গঠন তৈরী করে। উদ্ভিদ ও প্রাণীর সব প্রকৃত কোষের নিউক্লিয়াসের মধ্যে ক্রোমোজোম থাকে। তবে কোষ বিভাজনের সময় যখন তারা সংকুচিত হয় এবং নিউক্লিয়াসের আবরণী অদৃশ্য হয়ে যায় কেবল তখনই অণুবীক্ষণ যন্ত্রে তাদের চোখে পড়ে। এ সময় তাদের নিরেট দ্বিখন্ডে বিভক্ত দন্ডের মত গঠন বলে মনে হয় এবং প্রত্যেকে ক্রোমাটিড নামে দুইটি হুবহু একই রকমের সমান্তরাল অংশ নিয়ে গঠিত থাকে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিটি ক্রোমোজোমে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে একটি প্রাথমিক সংকোচন (primary constriction) থাকে। একে সেন্ট্রোমিয়ার (centromere) বলা হয়। কোষ বিভাজনের সময় এ অংশের মাধ্যমে ক্রোমোজোমের অর্ধাংশ দু'টি স্পিন্ডল ফাইবার (spindle fibre) এর সাথে যুক্ত হয়ে আলাদা হয়ে যায়।

জানা গেছে যে, ক্রোমোজোম থেকে নতুন ক্রোমোজোম সৃষ্টি হয়। কোষ বিভাজনের প্রাক্কালে ইন্টারফেজ পর্যায়ে (interphase stage) একটি ক্রোমোজোম লম্বালম্বি বিভাজন না হয়ে নতুন ক্রোমোজোমের উদ্ভব ঘটায়। পৃথক হবার পর ক্রোমাটিডগুলোর কুন্ডলী খুলে যায়। আয়তনে বৃদ্ধি পায় এবং দু'টি অপত্য কোষের প্রত্যেকটিতে একটি করে অপত্য নিউক্লিয়াস গঠন করে। নতুন তৈরী অপত্য নিউক্লিয়াসের ক্রোমোজোম ক্রোমাটিডের পরিবর্তিত রূপ হিসেবে প্রকাশিত হয়। অপত্য কোষগুলো বড় হলে পরবর্তী কোষ বিভাজনে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

আয়তন ও সংখ্যাঃ বিভিন্ন জীবে মেটাফেজ পর্যায়ে একটি ক্রোমোজোমের দৈর্ঘ্য সাধারণত ১৫-৩০ মাইক্রোমিটার এবং ব্যাস ০.-২.০ মাইক্রোমিটার। উদ্ভিদের ক্রোমোজোম প্রাণীদের ক্রোমোজোমের তুলনায় সাধারণত বড় হতে দেখা যায়। আবার উন্নত শ্রেণীর উদ্ভিদের মধ্যে একবীজপত্রী (monocot) উদ্ভিদসমূহের ক্রোমোজোম দ্বিবীজপত্রী (dicot) উদ্ভিদের তুলনায় বড় হয়। মানবদেহের ক্রোমোজোমের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৪০৬ মাইক্রোমিটার। বিভিন্ন জীবকোষে প্রজাতিভেদে ক্রোমোজোম সংখ্যা ২ থেকে ১৫০০ পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত এ সংখ্যা ৫০ এর বেশী হয় না। তবে প্রতিটি প্রজাতির ক্রোমোজোম সংখ্যা নির্দিষ্ট বা ধ্রুবক (constant)। প্রাণী জগতে সবচেয়ে কম সংখ্যক ক্রোমোজোম দেখা গেছে Ascaris Megacephala নামক পরজীবী নিমাটোড-এ। এদের দেহকোষের ক্রোমোজোম সংখ্যা মাত্র দুই। মানুষের বেলায় এ সংখ্যা ৪৬।

সর্বনিম্ন সংখ্যক ক্রোমোজোম বিশিষ্ট উদ্ভিদ হচ্ছে গাঁদা গোত্রীয় Haplopapus gracilis যেখানে ক্রোমোজোম সংখ্যা চার। যেসব জীবে যৌন প্রজনন ঘটে তাদের অধিকাংশের নিষিক্ত ডিমে এবং তা থেকে উদ্ভূত দেহকোষে ক্রোমোজোম নিয়মিতভাবে জোড়ায় জোড়ায় থাকে। এ জোড়ায় একটি পিতা থেকে (paternal set) এবং অপরটি মাতা থেকে (maternal set) আসে। এ ধরনের ক্রোমোজোম সংখ্যাকে ডিপ্লয়েড (diploid, 2n) সংখ্যা বলা হয়। জননকোষে প্রতি জোড়া ক্রোমোজোম থেকে একটি করে ক্রোমোজোম আসে। ডিপ্লয়েড সংখ্যার এরূপ অর্ধভাগকে হেপ্লয়েড (haploid, n) সংখ্যা বলা হয়।

সেক্স-ক্রোমোজোমঃ যেসব জিন লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য দায়ী অথবা লিঙ্গ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে তাদের অবস্থান এক জোড়া বিশেষ ক্রোমোজোমে। এ ক্রোমোজোম দু'টিকে বলা হয় সেক্স ক্রোমোজোম বা অ্যালোজোম (allosome) অন্যান্য ক্রোমোজোমকে বলা হয় অটোজোমস (autosomes)। সেক্স ক্রোমোজোম দু'টির বড়টি সাধারণত স্ত্রী-পুরুষ বৈশিষ্ট্যের জন্য প্রয়োজনীয় জিন বহন করে এবং একে X ক্রোমোজোম বলা হয়। ছোট সদস্যটি Y ক্রোমোজোম নামে পরিচিত। মানুষের ক্ষেত্রে এটি পুরুষত্বের জন্য দায়ী জিন বহন করে। অনেক প্রজাতি আছে যাদের পুরুষ চরিত্রের জন্য দায়ী জিনগুলো অটোজোমে অবস্থান করে। সেখানে Y ক্রোমোজোম অনুপস্থিত থাকতে পারে। লিঙ্গ নির্ধারণকারী জিন ছাড়াও সেক্স ক্রোমোজোমে বিশেষ করে Y ক্রোমোজোমে অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী ক্রোমোজোমও থাকতে পারে।

ক্রোমোজোম অ্যাবারেশন (Chromosomal aberration): ক্রোমোজোমের অ্যাবারেশন বলতে স্বাভাবিক ক্রোমোজোমের যে কোন ধরনের পরিবর্তনকে বুঝায়। এ পরিবর্তন হতে পারে ক্রোমোজোমের সংখ্যায়, তার গঠনে অথবা বিন্যাসে। ক্রোমোজোম সংখ্যার পরিবর্তন বলতে হয় ক্রোমোজোমের সম্পূর্ণ সেট হারানো অথবা নতুন এক সেট লাভ করার কারণে (euploidy) অথবা এক বা একাধিক ক্রোমোজোম হারানো কিংবা প্রাপ্তির কারণে (aneuploidy)।

একটি ক্রোমোজোমে অথবা একাধিক ক্রোমোজোমে গঠনগত পরিবর্তন হয় DNA অণুর ক্ষতির কারণে। আর এর ফলে ক্রোমোজোম ভেঙ্গে যায়। এতে ক্রোমোজোমের কোন অংশের হরণ বা নতুন অংশ প্রাপ্তি অথবা দু'টি ক্রোমোজোমের মধ্যে অংশের বিনিময় ঘটে। অনেক সময়ে ক্রোমোজোমের কোন অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন অংশ ১৮০০ পরিমাণ আবর্তিত হয় এবং ঐ একই ক্রোমোজোমের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হয়। গঠনগত পরিবর্তন অনেক সময় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ঘটে। যেমন মানুষের বেলায় বয়স বাড়ার কারণেও তা হতে পারে। তবে এক্স-রশ্মি (X-rays), অতিবেগুনি রশ্মি (ultraviolet rays) বা রাসায়নিক মিউটাজেনিক এজেন্ট (chemical mutagenic agents) ক্রোমোজোমে অ্যাবারেশনের হার বাড়িয়ে দেয়। ক্রোমোজোমের বিন্যাসের পরিবর্তন সাধারণ জিনতাত্ত্বিক গবেষণায় নির্ণয় করা সম্ভব। কারণ এতে জিনের বিন্যাসেও পরিবর্তন হয়। অতি কদাচিৎ অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ক্রোমোজোমের পরিবর্তনগুলো ধরা পড়ে।

নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে সূক্ষ্মসূতার মত ক্রোমোজোম সর্বোত্তম হাতের মাস্টার ডিজাইন। এ ডিজাইনের উপর ভিত্তি করে প্রত্যেক জীবের স্বাতন্ত্র স্বকীয়তা গড়ে ওঠে। আর এ ডিজাইন রূপায়নকারী হলেন সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা। মানুষের বেলায় প্রথমেই একজন শিশু-সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে হবে তা নির্ধারিত হয়ে যায় ঐ মুহূর্তে যখন একটি sperm একটি ovum এর ভেতরে প্রবেশ করে। প্রত্যেক সাধারণ মানুষের দেহকোষের ৪৬টি ক্রোমোজোমের মধ্যে ২২ জোড়া এবং দু'টি লিঙ্গ ক্রোমোজোম মিলে গঠন করে আর এক জোড়া। সর্বমোট ২৩ জোড়া। পুরুষের দু'টি লিঙ্গ নির্ধারক ক্রোমোজোমের মধ্যে একটি X এবং অপরটি Y। কিন্তু স্ত্রীলোকের থাকে ২টি X ক্রোমোজোম। যদি ovum Y ক্রোমোজোমবাহী sperm এর সাথে মিলিত হয়ে ভ্রূণ সৃষ্টি করে তখন শিশুটি হয় ছেলে (xy)। আর যদি X ক্রোমোজোমবাহী sperm এর সাথে মিলে তখন সন্তানটি হবে মেয়ে (xx)। এভাবে ক্রোমোজোমের মিলন সম্পূর্ণভাবে মানুষের কৃতিত্ব বর্হিভূত ঘটনা। একমাত্র আল্লাহপাকই ঠিক করেন সন্তানটি ছেলে হবে না মেয়ে হবে।

অতএব সূরা নজম-৪৫ নং আয়াতে x এবং y ক্রোমোজোমের প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যা এখন পবিত্র কোরআনের ভাষ্যকারগণ (Commentators) সকলে স্বীকার করে নিয়েছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00