📘 Biggan moy quran > 📄 পরিশিষ্ট-১ মহাবিশ্বের উৎপত্তি

📄 পরিশিষ্ট-১ মহাবিশ্বের উৎপত্তি


পরিশিষ্ট-১
মহাবিশ্বের উৎপত্তি

How did the Universe begin? And when did it begin?

এ দু'টি প্রশ্ন বহুদিন ধরে বিজ্ঞানীদের আলোড়িত করেছে। এ আলোড়ন তাই তাদেরকে অনুসন্ধানের দিকে ধাবিত করেছে। আর এ অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে অতীতে বহু কল্প কাহিনীর জন্ম হয়েছে। পৃথিবী নামক এক অপূর্ব গ্রহে মানবজাতিকে সবচেয়ে বুদ্ধি দীপ্ত সৃষ্টি (creatures) হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এটা খুবই সত্য যে, মানুষ সুমহান আল্লাহপাক থেকে বুদ্ধি ও জ্ঞান লাভ করে থাকে। আল্লাহ তাআলার বিশাল সৃষ্টি নিয়ে যারাই চিন্তা-গবেষণা করবে কেবল তারাই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের কর্তৃত্ব লাভ করবে। মহাবিশ্বের সূচনা সম্পর্কিত সঠিক তত্ত্ব উদ্‌ঘাটনের জন্য বেশ কিছু উচ্চ পর্যায়ের চিন্তাশীল ব্যক্তি গবেষণা কর্মে নিজেদের নিয়োজিত করে রেখেছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কেবলমাত্র বিংশ শতাব্দীতে এসে সফলতার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান গবেষণায় Big Bang Theory (মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব) আবিস্কার হওয়ার পর মহাবিশ্ব সৃষ্টির উৎস সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ চিত্র পাওয়া গেছে। এ তত্ত্বটি প্রায় সঠিকভাবে কিছু ঘটনার ইঙ্গিত দিয়েছে। যে ঘটনাগুলো প্রায় ১৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে ঘটেছিল।

Big Bang Theory (মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব)

এ তত্ত্বে বলা হয়েছে যে, মহাবিশ্ব একটি অসীম ঘনত্বের সংকুচিত অবস্থা থেকে শুরু হয়েছে এবং সেই বিশেষ সময় থেকে তা প্রসারিত হচ্ছে। সে সময়কে বলা হয় বিশ্ব সৃষ্টির মুহূর্ত। Big Bang তত্ত্ব হলো সাধারণভাবে সবচেয়ে বেশী স্বীকৃত বিশ্ব সৃষ্টি তত্ত্ব।

মহাবিস্ফোরণ সৃষ্টি তত্ত্বের ভিত্তি ভূমিতে দু'টি পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ রয়েছে। প্রথমত বিশ্ব সুষমভাবে প্রসারণশীল। দ্বিতীয়ত পৃথিবী একটা সবদিক সমান বিকিরণ দ্বারা স্নাত যে বিকিরণ এর বৈশিষ্ট্য এবং যা একটি উষ্ণ প্রাথমিক অগ্নিগোলকের (Primeval fireball) অবশিষ্ট বলে প্রমাণ মিলে। মহাবিশ্বের প্রসারণ সময়ের দিকে পিছিয়ে নিলে দেখা যায় প্রায় (১.৩-২) x ১০ বিলিয়ন বছর আগে মহাজগত অসীম ঘনত্বে সংকুচিত ছিল। ঐ সময়ে একটি মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) মাধ্যমে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়। তখন থেকে সময় এবং স্থানের (Time and space) সৃষ্টি এবং মহাবিস্ফোরণের পর থেকে মহাবিশ্ব সুষমগতিতে প্রসারিত হচ্ছে।

১৯১৭ সালে আইনস্টাইন তার সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে তার নিজস্ব সমীকরণের সমাধান নির্ধারণ করেন যা দিয়ে বিশ্বের প্রকৃতি নির্ধারণ করা যায়। তার বিশ্ব অস্থিতিশীল ছিল যা হয় প্রসারিত অথবা সংকুচিত হতে পারে। ১৯২২ সনে রাশিয়ার পদার্থ বিজ্ঞানী এ ফ্রিডম্যান যে সমাধান নির্ধারণ করেন তা-ই সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য মহাবিশ্ব সৃষ্টির নকশার ভিত্তি ভূমি। ফ্রিডম্যান আইনস্টাইনের সমীকরণের সমাধানরূপে দু'টি অস্থিতিশীল মডেল খুঁজে পান। এ দু'টি মডেলের একটিতে অংকিত হয়েছে সময়সহ বিশ্বজগতের প্রসারণ। অন্যটিতে চিত্রিত হয়েছে বিশ্বজগতের সংকোচন। ১৯২৭ সালে বেলজিয়াম জ্যোতির্বিজ্ঞানী G. Lemaitre স্বতন্ত্রভাবে একই ধরনের সমাধান পেয়েছিলেন। লেমাইতারের সমাধান থেকে বুঝা যায় যে, বিশ্বজগত শুরু হয়েছে একটি অতি সংকুচিত এবং অতিশত উত্তপ্ত অবস্থা থেকে।

"Creation started with the expansion of the ultra-hot, ultra-dense, ultra small clump of 'Primeval atom' Caused by a violent explosion - the Big Bang". এটাই বিশ্বজগত সৃষ্টির বর্তমান প্রচলিত ধারণা যে বিশ্বজগত একটি উষ্ণ মহাবিস্ফোরণ থেকে শুরু হয়েছিল।

আধুনিক তাত্ত্বিক গবেষণার ফলে মহাবিস্ফোরণের কয়েক মুহূর্ত পরে মহাবিশ্বের ঘটনা বুঝা সম্ভব হয়েছে। একেবারে প্রাথমিক মুহূর্তে মহাজগত অপ্রচলিত অণুকণা দিয়ে ভর্তি ছিল। হয়তো কোয়ার্কেরও উপস্থিতি ছিল। মহাবিস্ফোরণের ১ মাইক্রো সেকেন্ড পরে অপ্রচলিত অণুকণা ও কোয়ার্কগুলি অন্যান্য মৌলিক বস্তুকণায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এটা ঠিক করে জানা যায় না যে, প্রতিকণার চেয়ে কণার আপাত আধিক্য কেন ছিল? কণা পদার্থ বিজ্ঞানে (particle physics) বিদ্যুৎ চুম্বকীয় শক্তি, সবল ও দুর্বল নিউক্লিয় শক্তি একত্রিত করে কণা ও প্রতিকণা (particles and Anti-Particles) প্রতি সাম্যহীনতার উৎস ব্যাখ্যা করা হয়েছে। Big Bang সংঘটিত হওয়ার পরে প্রথম কয়েক মিলি সেকেন্ডের মধ্যে এ প্রতিসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছিল।

মহাবিস্ফোরণের ৫ সেকেন্ড পরে তাপমাত্রা 10⁹k-এ কমে যায়। তখন শুধু ইলেকট্রন, পজিট্রন, নিউট্রিনো, এন্টি নিউট্রিনো এবং ফোটন এরাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিছু ফোটন এবং নিউট্রন মিশ্রিতভাবে ছিল এবং তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এরাও আপেক্ষিকভাবে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মহাবিশ্ব এত ঘন ছিল যে, শোষিত হওয়ার পূর্বে ফোটনগুলি অল্প দূরত্বেই ভ্রমণ করতে পারত। ৮ মিনিট পার হওয়ার আগেই মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি হওয়া শুরু হয়ে গেল।

দশ লক্ষ বছর পরে যখন মহাবিশ্ব ৩০০০k তাপমাত্রায় শীতল হয়ে যায় এবং যখন ঘনত্ব কমে যায় তখন ফোটন এবং ইলেকট্রন একত্রিত হয়ে হাইড্রোজেন পরমাণু সৃষ্টি করতে থাকে, যে প্রক্রিয়াকে বলে পুনঃসংযোগ (recombination)। যেহেতু হাইড্রোজেনের বর্ণালীতে বিশেষ তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য শোষিত হয়, কিন্তু নিরবচ্ছিন্নভাবে শোষিত হয় না এবং যেহেতু মুক্ত ইলেকট্রনেরও আর উপস্থিতি ছিল না যা ফোটনের সঙ্গে বিক্রিয়া করতে পারে তাই ঐ সময়ে মহাজগত স্বচ্ছ হয়ে যায়। একটি ফোটনের গড় ভ্রমণপথ, গড় মুক্তপথ অত্যন্ত বড় হয়ে যায়। পুনঃসংযোজনের সময় গ্যাসের কৃষ্ণ বস্তুর বর্ণালী এইভাবে নিঃসৃত হয় এবং তখন থেকে তা মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিশ্বজগত প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে এ বর্ণালী যদিও তার কৃষ্ণ বস্তুর (black body) বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে তবুও তার বিশেষ তাপমাত্রা কমে যায়।

প্রাথমিক বিশ্ব যত শীতল হতে থাকে ততই তাপমাত্রা মৌলিক পদার্থ গঠনের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। প্রায় ১০০ সেকেন্ড পরে ডিউটেরিয়াম (১টি প্রোটন+১টি নিউট্রন) সৃষ্টি হয়। আর একটি নিউট্রনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা ট্রিটিয়াম সৃষ্টি করে এবং যুগ্ম পদার্থটি ভেঙ্গে গিয়ে হিলিয়ামের আইসোটোপ তৈরী করে। আর একটি নিউট্রন সংগ্রহ করে সাধারণ হিলিয়ামও সৃষ্টি হয়। মহাবিস্ফোরণ নিউক্লিয় সংশ্লেষণ (nucleosynthesis) যদিও প্রথমে মনে করা হতো যে সব মৌলিক পদার্থ তৈরী করার একটি পদ্ধতি তবুও তারা ৫ এবং ৮ এই ভর সংখ্যার ভারী মৌলিক পদার্থ তৈরী করতে ব্যর্থ। এ ভার সংখ্যার আইসোটোপ এত অস্থিতিশীল যে, তারা ভারী মৌলিক পদার্থ দ্রুত তৈরী করতে পারে না। এ ফাঁকটা শুধু তারকাতেই অতিক্রম করা সম্ভব। সুতরাং সবচেয়ে হালকা মৌলিক পদার্থগুলি মহাবিস্ফোরণের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল কিন্তু ভারী ও হালকা মৌলিক পদার্থগুলি পরবর্তী কালে তারকা ও সুপারনোভায় তৈরী হয়।

Big Bang তত্ত্বটি পবিত্র কোরআনের সূরা আম্বিয়া-৩০, সূরা বাকারা-১১৭ নং আয়াতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে এবং শুরুতে যে মহাবিস্ফোরণ ঘটেছে তার প্রমাণ মিলে সূরা আম্বিয়ার ১০৪ নং আয়াতে। আর এ মহাবিস্ফোরণ ঘটেছিল প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তাআলার ঐশী আদেশ 'কুন' (হও) ব্যক্ত করার সাথে সাথে।

গ্যালাক্সি, তারকাপুঞ্জ এবং গ্রহ-উপগ্রহ

গ্যালাক্সি, তারকা ও গ্রহ-উপগ্রহ গঠনের উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে Big Bang এর উদ্ভব। মহাবিস্ফোরণের সময় যেসব বস্তু ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে গিয়েছিল সেসব বস্তু এখন সুগঠিত হয়ে একটি সুষ্ঠু ধারায় পর্যবসিত হয়েছে।

বর্তমানে এটা চিন্তা করা হয় যে, সূর্য ও গ্রহসমূহ অতি ক্ষুদ্র গ্যাস-মেঘ ও ধূলিকণা থেকে ঘনীভূত হয়ে গড়ে ওঠেছে। প্রায় ৫ বিলিয়ন বছর পূর্বে গ্যালাক্সিগুলো গড়ে ওঠতে শুরু করেছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্যাস-মেঘ ও ধূলিকণা শুরু থেকেই ঘুরপাক খাওয়ার অবস্থা লাভ করেছে। এগুলো যত দ্রুতবেগে ঘনীভূত হয়েছে ততবেশী বেগে আবর্তন করে চলেছে। এরূপ আবর্তনের মূলে রয়েছে কৌণিক গতিবেগের সঞ্চয়ন (conservation of angular momentum)। সম্ভবত ভারী পদার্থের উদ্গীরণে সৌর নেবুলা (solar nebula) কর্তৃক পশ্চাতে পরিত্যক্ত হয়েছিল। সেই সময় ঐ বস্তু তার কেন্দ্রের দিকে সংকুচিত হয়েছিল। ঘূর্ণায়মান সৌর নেবুলার কেন্দ্রীয় অংশ সংকুচিত হয়ে প্রোটোসান (Protosun) গঠন করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত ঐ সৌর নেবুলা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে সরাসরি সূর্যের রূপ ধারণ করে। এর বাইরের চক্রবেরী আরও বেশি মহাকর্ষ শক্তির টানে ভেঙ্গে গিয়ে গ্রহ-উপগ্রহ সমূহের জন্মদান করে। সূর্য তার মাধ্যাকর্ষণ সংকোচনের মাধ্যমে যে তাপশক্তি লাভ করে তাদ্বারা সূর্য যথেষ্ট ভর অর্জন করে নিজের কেন্দ্রকে উত্তপ্ত করতে সক্ষম হয় এবং বর্তমানে সূর্য থেকে যে তাপ ও আলো পাই সেই তাপ ও আলো সূর্যের মধ্যে পারমাণবিক সংযোজন (nuclear fusion) বিক্রিয়ার ফলে সৃষ্টি হয়। গ্রহগুলো বিরাট ভর বিশিষ্ট নয় বলে পারমাণবিক সংযোজন প্রক্রিয়ায় আলো ও তাপ সৃষ্টি করতে পারে না।

পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে গ্যালাক্সি, তারাপুঞ্জ ও গ্রহ-উপগ্রহের উপর বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে যা এ গ্রন্থের Astronomy অধ্যায়ে উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেইসব আয়াতে প্রতিফলিত হয়েছে যে, আকাশী বস্তুগুলো সুমহান আল্লাহপাক কর্তৃক বেধে দেয়া বিধি-বিধান অনুসরণ করে।

মহাজাগতিক ক্ষুদ্রতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ (The Cosmic Microwave background radiation)

মহাশূন্যের সর্বত্রগামী মাইক্রো তরঙ্গ যা মহাজাগতিক বিকিরণ নামে অভিহিত। ১৯৬৫ সনে আমেরিকার বেল টেলিফোন ল্যাবরেটরীর দু'জন পদার্থবিজ্ঞানী এ. পেনজিয়াস ও আর উইলসন এ বিকিরণ আবিষ্কার করেন যার জন্য তাদেরকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয় এবং কসমিক মাইক্রোওয়েভ আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে মহাবিশ্বের প্রকৃতি ও ইতিহাস অনুধাবন করা সহজ হয়েছে। ১৯৭০ দশকের শেষ দিকে জ্যোতিঃ পদার্থবিদগণ সবাই স্বীকার করে নেন যে, মাইক্রো তরঙ্গ বিকিরণের উৎস হচ্ছে Big Bang বা মহাবিস্ফোরণের কালে উৎক্ষিপ্ত অগ্নিগোলকের (fireball) অবশেষ এবং Big Bang যে ঘটেছে তারই প্রত্যক্ষ প্রমাণ। মাইক্রো তরঙ্গ বিকিরনের বর্ণালীর একটি মাত্র কম্পাঙ্কে প্রখর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পি. জে. ই. পিবল্স, আর. এইচ. ডিক, আর. জি. রোল, ও ডি. টি. উইলকিনস সমগ্র বর্ণালী সম্পর্কে যে সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তা মহাবিশ্বের সৃষ্টি তত্ত্বের ক্ষেত্রে এক বিরাট ঘটনা। অতি উষ্ণ, সংকুচিত আদি মহাবিশ্ব ধারণার পক্ষে মহাজাগতিক মাইক্রো তরঙ্গ বিকিরণ এখনও পর্যন্ত লভ্য প্রমাণ সমূহের মধ্যে সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ। Big Bang Theory সর্বপ্রথম বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন জর্জ গ্যামো। এইচ আলফার ও আর হেরমান। তারা বলেন যে, প্রায় ১৫ x ১০⁹ বছর পূর্বে এক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সূচনা ঘটে।

আল কোরআনের একটি সুবিখ্যাত আয়াত যা কৌতূহলোদ্দীপক অথচ তুলনামূলক বর্ণনা পেশ করা হয়েছে। ডঃ মরিস বুকাইলি বলেছেন, এ আয়াতটিতে 'কাওকাব' এর ব্যাখ্যা সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আমার মনে হয় মহাশূন্যে আল্লাহপাক যেসব দৃশ্যমান ও অদৃশ্য নিদর্শন (Signs) রেখেছেন হয়তো সেসব নিদর্শনের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। যেমন, Cosmic ray, X-ray, electromagnetic ray, cosmic background radiation ইত্যাদি। যেহেতু আমাদের পৃথিবী একটি গ্রহ। আরবীতে গ্রহকে বলা হয় কাওকাব। এই গ্রহটি সূর্যের আলোক রশ্মি দ্বারা আলোকিত, Cosmic ray ও Cosmic background radiation দ্বারা সবদিক থেকে স্নাত। আয়াতটি নিম্নে উদ্ধৃত হলোঃ

Allah is the Light of the heavens and the earth. The parable of His Light is as a niche and within it a lamp, the lamp is in a glass, the glass as it were a brilliant planet, lit from a blessed tree, an olive, neither of the east, nor of the west, whose oil would almost glow forth, though no fire touched it, light upon light! Allah guides to His light whom He wills. Allah sets forth parables for mankind and He is All-knower of everything.

আল্লাহ নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের আলো। তার আলোর উপমা যেন একটি কুলঙ্গী, যাতে আছে একটি প্রদীপ। এ প্রদীপটি আছে একটি কাঁচপাত্রে, আর সেই কাঁচপাত্রটি যেন একটি উজ্জ্বল গ্রহ, তাতে পবিত্র যাইতুন বৃক্ষের তৈল প্রজ্জ্বলিত হয় যা শুধু পূর্বদিক থেকে নয় এবং পশ্চিম দিক থেকেও নয়, আগুনের স্পর্শ ব্যতিরেকে প্রজ্জ্বলিত হয়। আলোর উপর আলো! আল্লাহপাক যাকে ইচ্ছা তাকে তাঁর আলোর পথ দেখান। আল্লাহপাক মানবজাতির জন্য দৃষ্টান্ত সমূহ উপস্থাপন করেন এবং তিনি প্রত্যেক বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞাত। (নূর-৩৫)

মহাবিশ্বে মহাকর্ষ (Gravitation in the Universe):

আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব মহাকর্ষ সূত্রের যে ব্যাখ্যা দেয় তাতে দেখা যায় যে, কোন গতিহীন স্থির মহাবিশ্ব থাকা সম্ভব নয়। আপেক্ষিক তত্ত্বের সমীকরণগুলো স্থান- কালের বক্রতার কথা বর্ণনা করেছে। এক্ষেত্রে সব বস্তু ও আলোর ফোটন ত্বরণহীন পথে চলতে পারে। মহাবিশ্বকে স্থির ভেবে আইনস্টাইন মহাজাগতিক ধ্রুব (cosmological constant) বলে একটি রাশির কথা ভেবেছিলেন। এটি একটি বিকর্ষণ বল। এটি মহাকর্ষীয় বলের বিরুদ্ধে প্রযুক্ত হয়ে মহাবিশ্বকে স্থির রাখতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।

প্রসারণশীল মহাবিশ্ব (The Expanding Universe):

১৯২০ এর দশকে বিজ্ঞানীরা দেখলেন, মহাজগত গতিহীন নয়। মহাজাগতিক ধ্রুবকের মান শূন্য ধরলে আইনস্টাইনের সমীকরণগুলো প্রসারণশীল বা সংকোচনশীল মহাবিশ্বের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। ১৯১২ সালে ভি এম স্নিফার নামক জনৈক বিজ্ঞানী নীহারিকা (Nebulae) বর্ণালী নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনি ডপলার ক্রিয়ার (Doppler effect) সাহায্যে প্রমাণ করেন যে, নীহারিকা উচ্চ গতিতে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পরবর্তীকালে দেখা গেল যে, মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলো দ্রুত গতিতে একে অন্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ মহাবিশ্বের প্রসারণ ঘটছে। কোন কোন গ্যালাক্সির বেগ অন্য গ্যালাক্সির বেগের প্রায় ১৫ গুণ। এ সংক্রান্ত সূত্রের নাম হাবলের সূত্র। এ সূত্র অনুযায়ী মহাজগত সুষম অনুপাতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। যদি সময়ে দু'টি দূরবর্তী গ্যালাক্সির মধ্যকার দূরত্ব r (t) এবং বেগ (Radial বা কেন্দ্রীক বেগ) v<sub>r</sub> হয় তাহলে হাবলের সূত্রানুসারে
V<sub>r</sub> = H r (t)
এখানে H সমানুপাতিক ধ্রুব, যাকে হাবলের ধ্রুব বলা হয়। এ সূত্র প্রয়োগ করে মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ বয়স পাওয়া যায় ১-২×১০¹⁰ বছর।

মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ (The future of the Universe)

মহাবিশ্বকে মুক্ত ধরা হলে তা অনন্তকাল ধরে প্রসারিত হতে থাকবে। গ্যালাক্সি ও নক্ষত্রসমূহ আর কখনো একত্রিত হবে না। এটা প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছিলেন। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মহাজাগতিক গড় ঘনত্ব সংকট ঘনত্ব (critical value) থেকে বেশী হলে মহাকর্ষ বল যথেষ্ট পরিমাণে শক্তিশালী হবে। ফলে বিশ্বের প্রসারণ থেমে গিয়ে মহাসংকোচনের দিকে ধাবিত হবে। আমেরিকান বিজ্ঞানী ফ্রিম্যান দেখিয়েছেন বিগ ক্রাঞ্চের প্রায় ১ বিলিয়ন বছর পূর্বেই গ্যালাক্সিপুঞ্জের মধ্যকার শূন্য জায়গা (empty space) সংকোচিত হতে শুরু করবে। বিগ ক্রাঞ্চের ১০০ বিলিয়ন বছর পূর্বে একক গ্যালাক্সির মধ্যের জায়গাও কমে যাবে। এভাবে গ্রহ-নক্ষত্রগুলো একে অন্যকে আকৃষ্ট করে একসঙ্গে মিলিত হবে এবং তারা একটি অতি উষ্ণ ও অতি ঘন বস্তুপিন্ড তৈরী করবে। যা বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হবে। আর এটাই হলো Big crunch।

ঐশী গ্রন্থ আল কোরআনে মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে ব্যাপক ও বিস্তৃত তথ্য দেয়া হয়েছে বিভিন্ন আয়াতে। সূরা আম্বিয়া-১০৪, ইয়াসীন-৫৩, ইনফিতার-১/২, ইনশিকাক-১, রাহমান-২৬ প্রভৃতি আয়াতে খুবই স্পষ্ট তথ্য বিবৃত হয়েছে। এসব আয়াত নিয়ে চিন্তা গবেষণা করলে যে কেউ মহাজগতের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন।

📘 Biggan moy quran > 📄 পরিশিষ্ট-২ মৌলিক কণিকা

📄 পরিশিষ্ট-২ মৌলিক কণিকা


পরিশিষ্ট-২ মৌলিক কণিকা
অবিভাজ্য কণিকাই হচ্ছে মৌলিক কণিকা। যা দিয়ে সকল বস্তু গঠিত।

পদার্থবিজ্ঞানীরা সব সময় বস্তুর গঠনের সর্বশেষ অবিভাজ্য কণিকার অনুসন্ধান করেছেন। উনবিংশ শতাব্দীতে মনে করা হতো যে, পদার্থ গঠনের মৌলিক উপাদান অণু ও পরমাণু। পরমাণুকে (Atom) মনে করা হতো অবিভাজ্য মৌলিক কণিকা। পরে দেখা গেল পরমাণু বিভাজ্য এবং এতে রয়েছে ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াস। আবার নিউক্লিয়াস গঠিত নিউট্রন ও প্রোটন নিয়ে। এভাবে পরমাণুর গঠন উপাদান পাওয়া গেল ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন। এরপর আবিষ্কৃত হয়েছে ইলেকট্রনের প্রতিকণা পজিট্রন। আরো আবিষ্কৃত হয়েছে নিউট্রিনো, মেসন ইত্যাদি। ১৯৫৭ সনের মধ্যে ৩৪টি মৌলিক কণিকা সনাক্ত করা হয়েছিল। এখন এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ এর অধিক সংখ্যায় উত্তীর্ণ হয়েছে। কণিকার এ ধরনের সংখ্যা বৃদ্ধি এ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, পদার্থের শেষ গঠন উপাদানের ধারাবাহিকতা কোথায় গিয়ে শেষ হবে!

পদার্থ বিজ্ঞানীরা এসব অ্যাটম অধীনস্থ কণিকার মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করেছেন। এসব বৈশিষ্ট্যের নিরিখে এদেরকে বিভিন্ন দলে শ্রেণী বিন্যাস করা হয়েছে। চার প্রকৃতির মৌলিক মিথস্ক্রিয়া (fundamental interaction) স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরা হচ্ছে মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক মিথস্ক্রিয়া, সবল নিউক্লিয় মিথস্ক্রিয়া ও দুর্বল নিউক্লিয় মিথস্ক্রিয়া। মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া নিজেকে দূর পাল্লার আকর্ষণ বল হিসেবে প্রকাশ করে এবং সকল প্রাথমিক কণিকার মধ্যে তা পরিব্যাপ্ত। ইলেকট্রোম্যাগনেটিক মিথস্ক্রিয়া সমপ্রকৃতির চার্জের মধ্যে দূর পাল্লার বিকর্ষণ বল ও বিষম প্রকৃতির চার্জের মধ্যে দূর পাল্লার আকর্ষণের জন্য দায়ী। তুলনামূলক দূরত্বে মহাকর্ষ ও বিদ্যুৎ চৌম্বক- এই দুই প্রকৃতির মিথস্ক্রিয়ার অনুপাত হচ্ছে 4×10⁻³⁷। দুর্বল নিউক্লিয় মিথস্ক্রিয়া ক্ষুদ্র পাল্লার এবং বলের দূরত্ব সীমা 10⁻¹⁵cm এর চেয়েও অনেক কম। প্রোটন ও নিউট্রনের মধ্যে সবল নিউক্লিয় মিথস্ক্রিয়াও ক্ষুদ্র-পাল্লার। অবশ্য এই সীমা 10⁻¹⁵cm অপেক্ষা কম নয়। এ চার প্রকৃতির মিথস্ক্রিয়ার আবিষ্কারের পর থেকেই কণিকা পদার্থবিদগণ অবিরত চেষ্টা চালিয়ে আসছেন এদেরকে একত্রিত করে সকল বস্তুর মধ্যে ক্রিয়াশীল একটি মৌলিক শক্তি রূপে প্রকাশ করতে। দুর্বল ও ইলেকট্রোম্যাগনেটিক মিথস্ক্রিয়া দু'টির একত্রীকরণ সম্পন্ন করেছেন আব্দুস সালাম, এস. এল. গ্ল্যাশো ও ভাইনবার্গ (Weinberg)।

যে কণিকাগুলো সবল শক্তি অনুভব করে তাদেরকে বলা হয় হ্যাড্রন (hadrons)। এগুলোকে আবার দু'ভাগে ভাগ করা হয়। যথা- ব্যারিয়ন (baryons) ও মেসন (mesons)। ব্যারিয়নে অন্তর্ভুক্ত আছে প্রোটন, নিউট্রন এবং তাদের প্রতি-কণিকাসমূহ। মেসনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত পায়ন (pion) এবং কাওন (kaon)। জানা মতে একশ'রও বেশী সংখ্যক হ্যাড্রন রয়েছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই বৃহদাকৃতির এবং অস্থিতিশীল। যে কণিকাগুলো সবল মিথস্ক্রিয়া অনুভব করে না কেবল দুর্বল ক্রিয়ার প্রতিউত্তর দিতে পারে তাদের লেপটন (leptons) বলা হয়। তিন ধরনের আহিত লেপটন আছে; ইলেকট্রন, মিউওন এবং টাউ (tau)। এ তিনটি আহিত লেপটনের প্রতিটির সাথে চার্জবিহীন লেপটন নিউট্রিনো সংশ্লিষ্ট আছে। সব মিলে লেপটন পরিবারের ছয়টি সদস্য, ইলেকট্রন, ইলেকট্রন সংশ্লিষ্ট নিউট্রিনো, মিউওন, মিউওন সংশ্লিষ্ট নিউট্রিনো, টাউ ও তৎসংশ্লিষ্ট নিউট্রিনো।

বস্তুর শেষ গঠন উপাদান অনুসন্ধান করতে গিয়ে ১৯৬৩ সনে ক্যালিফোর্নিয়ার টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের Murray Gell-Mann এবং George Zweig হ্যাড্রনের বিপুল বিস্তারের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নির্ভরশীলভাবে কোয়ার্কের (quark) ধারণা উপস্থাপন করেন। এখন, এটা চিন্তা করা হয় যে, পদার্থের চূড়ান্ত গঠন-উপাদান হচ্ছে কোয়ার্ক ও অ্যান্টিকোয়ার্ক। কোয়ার্কস বিন্দুবৎ দেহধারী এবং এদের কোন আন্তঃগঠন কাঠামো নেই। এরা আবদ্ধ অবস্থায় থাকে এদের কখনো দেখা যায় না। উপরন্তু বিজ্ঞানী Glashow গ্লুওন (gluons) কণিকার ধারণার সূচনা করেছেন। এগুলো এমন কণিকা যা দু'টি কোয়ার্কের মধ্যে বন্ধন হয়ে থাকে এবং কোয়ার্ক দু'টিকে একসঙ্গে বেঁধে রাখে। ১৯৭৯ সনের পরোক্ষ সাক্ষ্য এ মর্মে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, গ্লুওন এর অস্তিত্ব রয়েছে।

কোয়ার্ক এ যাবৎ ইঙ্গিত করেছে যে, বাস্তবিকপক্ষে সে-ই হচ্ছে অবিভাজ্য মৌলিক কণিকা। কিন্তু অধুনা পদার্থ বিজ্ঞানীরা কোয়ার্কের অস্তিত্ব নিয়ে যুক্তিসঙ্গতভাবে চিন্তা করেন যে, কোয়ার্কের অধীনস্থ আরো গঠন-একক রয়েছে। কোয়ার্ক বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। অন্তত ছয়টি ফ্লেভার কোয়ার্ক আছে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। (ফ্লেভার হলো কোয়ার্কের একটি গঠন উপাদান)। এদের নাম আপ কোয়ার্ক, ডাউন কোয়ার্ক, স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক, চার্মড কোয়ার্ক, বটম কোয়ার্ক এবং টপ কোয়ার্ক। প্রতিটি ফ্লেভারে তিনটি রং রয়েছে। লাল, সবুজ এবং নীল। একটি প্রোটন কিংবা নিউট্রন তিনটি রং দ্বারা গঠিত। একটি প্রোটনে দু'টি আপ কোয়ার্ক এবং একটি ডাউন কোয়ার্ক বিদ্যমান। আবার একটি নিউট্রনে ডাউন ও একটি আপ কোয়ার্ক বিদ্যমান। তাহলে পরমাণুর গঠন-উপাদানের ধারাবাহিকতার শেষ কোথায়। গ্রীকদের সময় থেকে শুরু করে অদ্যাবধি মানুষ বস্তুর গঠন-উপাদানের ধারা আবিষ্কার করে চলেছেন। বিশ্বাস সকল বস্তুর উৎপাদক বলে বিবেচিত। মিশ্রণের উপাদান অনুকণার উপাদান, অ্যাটমের উপাদান, অ্যাটমের নিউক্লী ও ইলেকট্রন, নিউক্লীর কোয়ার্কস এবং ভবিষ্যতে কোয়ার্কের অভ্যন্তরীণ গঠন-উপাদান আবিষ্কারের প্রচেষ্টা যেন মৌলিক উপাদানের সন্ধানে পিঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর দৃশ্যপট। পিঁয়াজের উপরের খোসা ছাড়াবার পর পরবর্তী খোসার সাক্ষাৎ, পরবর্তী খোসা ছাড়াবার পর আরো একটি খোসার সাক্ষাৎ এবং এভাবে খোসা ছাড়াবার অগ্রযাত্রা অন্তহীন। এখানে আমরা ঐসব মৌলিক কণিকার উল্লেখ করেছি যেগুলোর স্থায়ীত্ব অবিচল। এছাড়া বহুসংখ্যক কণিকা ও প্রতিকণিকা রয়েছে যারা খুবই ক্ষণস্থায়ী।

অবশেষে এ কথা বলা যায় যে, এ মহাবিশ্বে সবকিছু গঠিত হয়েছে লেপটন ও কোয়ার্ক রূপী দু'টি কণিকা থেকে, যেগুলো বর্তমানে বস্তুর গঠন-উপাদানের সর্বশেষ গঠন উপাদান বলে স্বীকৃত। তাই এ মুহূর্তে বস্তুর চূড়ান্ত গঠন উপাদানের অনুসন্ধান কর্ম সাফল্য লাভ করেছে বলে মনে হয়। ঐ দুই কণিকার পরিবার তাদের ঘূর্ণন ও বর্ণের আঙ্গিকে অতীব সুন্দর সঠিক আনুপাতিক সামঞ্জস্য প্রদর্শন করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে সাব-অ্যাটমিক স্তরে প্রত্যেক অণু-কণা খুবই সুবিন্যস্ত, সুষম এবং সুন্দর। সুমহান আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনের সূরা আনআম-৭৩, সূরা মুলক-৩ নং আয়াতে নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের সবকিছু নির্ভুল ও সঠিক অনুপাতে সুবিন্যস্ত করার তথ্য আমাদেরকে অবহিত করেছেন। পদার্থের গঠন-উপাদান অণু-পরমাণু তথা মৌলিক কণিকার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন সূরা সাবা-৩ এবং সূরা ইউনুসের-৬১ নং আয়াতে।

References:
1. Science Encyclopedia, vol-2; Bangla Academy, Dhaka.
2. A Brief History of Time; Stephen W. Hawking; Toronto, New York, London, Sydney, Auckland.

📘 Biggan moy quran > 📄 পরিশিষ্ট-৩ সময়ের গতি

📄 পরিশিষ্ট-৩ সময়ের গতি


সময়ের গতি
সাধারণত লোকেরা পরম সময়ে (absolute time) বিশ্বাস করে। কেননা একজন লোক দু'টি ঘটনার মধ্যকার সময়ের পার্থক্যকে সঠিকভাবে পরিমাপ করতে পারে এবং যে কেউ পরিমাপ করুক না কেন এই সময়ের দৈর্ঘ্য একই থাকবে যদি সময় পরিমাপকের ঘড়ি ঠিক থাকে। আসল কথা হলো সময় স্থানীয় সচেতনতায় বিরাজ করে।

আইনস্টাইন তাঁর বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে দেখিয়েছেন, "There is no absolute time, but instead each individual has his own personal measure of time that depends on where he is and how he is moving"।

সময় এবং স্থান (time and space) হচ্ছে গতিশীল মাত্রিক। যখন কোনো বস্তু গতিশীল হয় এবং তার উপর প্রযুক্ত শক্তি ক্রিয়া করে তখন তা আপেক্ষিকভাবে বর্ণনাযোগ্য স্থান-কালের বক্রতাকে প্রভাবিত করে। পরবর্তী সময়ে স্থান-কালের গঠন ঐ পথকে প্রভাবিত করে যে পথে বস্তু চলাচল করে এবং সেখানে প্রযুক্ত বল সক্রিয় থাকে।

স্থান-কালের ধারণা ব্যতীত কেউ বিশ্বের কোনো ঘটনাকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে না। সূর্য বর্তমানে যে অবস্থানে আছে সে-ই অবস্থান থেকে পৃথিবীতে তার আলো পৌঁছতে সময় লাগে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড। তাহলে সূর্যের আলো আমরা ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড পরে দেখতে পাই। আমাদের দৃষ্টি সীমার মধ্যে দূরে সংঘটিত কোনো ঘটনা আমরা যখন অবলোকন করি তখন মনে হবে একই সময়ে ঘটনাটি যেন ঘটছে? প্রকৃত অর্থে তা ঠিক নয়। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, যে ঘটনাটি আমরা দেখি তা আলোতে বিকীর্ণ হয়ে আমাদের চোখে এসে পড়ে। ফলে ঘটনাটি দেখতে পায়। এ আলোর বিকিরণ আমাদের চোখে এসে পৌঁছতে নিশ্চিত কিছু সময় লাগে। এ সময়টুকু সাধারণত মানুষ নিজস্ব পরিমাপের মধ্যে পরিগণিত করে না। আলোর গতি আছে এবং প্রতি সেকেন্ডে তা প্রায় ৩,০০,০০০ কিঃ মিঃ পথ অতিক্রম করে। কাজেই যে মুহূর্তে কোনো ঘটনা ঘটছে বলে আমরা মনে করি সে মুহূর্তে সেটা ঘটছে তা নয়। তা পূর্বে সংঘটিত হয়। তবে কত পূর্বে সংঘটিত হয় তা নির্ভর করে দূরত্বের উপর। ৩,০০,০০০ কিঃ মিঃ দূরে ঘটলে সে ঘটনা আমরা ১ সেকেন্ড পরে দেখব। এভাবে দূরত্ব যত বৃদ্ধি পাবে ঘটনা তত পরে আমাদের কাছে প্রতিভাত হবে।

আকাশের নির্দিষ্ট বিন্দুকে কেন্দ্র করে পৃথিবী তার অক্ষে একবার আবর্তিত হতে যে সময় লাগে সেই সময়কে আমরা একদিন বলে হিসেব করি। এক বছর হিসেব করা হয় যে সময়ে পৃথিবী একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে থাকে, যা রেফারেন্স বিন্দুর সঙ্গে আপেক্ষিক। এর রেফারেন্স বিন্দুই (reference point) দিন কিংবা বছরের দৈর্ঘ্য নির্ণয় করে থাকে। এরূপ প্রত্যেক গ্রহের নিজ অক্ষে আবর্তনের সময়-কালকে ঐ গ্রহের হিসেবে 'একদিন' বলা যায়। কিন্তু এ এক দিনের কাল-দৈর্ঘ্য বিভিন্ন ধরনের হবে যখন পৃথিবী থেকে হিসেব করা হবে। অর্থাৎ কিছু গ্রহ আছে যাদের দিন পৃথিবীর এক দিনের চেয়ে ছোট। আবার কিছু গ্রহ আছে যাদের দিন পৃথিবীর দিন অপেক্ষা বড়। যেমন, বুধ গ্রহের ১ দিন সমান পৃথিবীর ৫৮ দিন। শুক্র গ্রহের ১ দিন সমান পৃথিবীর ২৪৩ দিনের সমান। ছায়াপথ গ্যালাক্সির একবার আবর্তনের সময়-কাল পৃথিবীর ২২০ মিলিয়ন বছরের সমান। অর্থাৎ ২২ কোটি বছরের সমান। পৃথিবীর বয়স এখন ৪৬০ কোটি বছর হলে ছায়াপথ গ্যালাক্সির ২১ দিন মাত্র তার কালের ব্যাপ্তি সমাপ্ত করেছে।

সময় একটি আপেক্ষিক ধারণা মাত্র যা স্থান-কালের বক্রতায় পরিব্যাপ্ত। সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বে বলা হয়েছে, আমাদের 'স্ট্যান্ডার্ড টাইম' বলতে কোনো টাইম নেই, সকল টাইমই লোকাল টাইম (Local time)। তবে প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে সময় সম্পর্কে তার নিজস্ব পরিমাপ আছে। এ নিজস্ব পরিমাপ নির্ভর করে ঐ স্থানের উপর যে স্থানে সে অবস্থান করে।

গ্যালাক্সিগুলো একে অপর থেকে পশ্চাদগামী হয়ে সরে যাচ্ছে এবং সুদূর অতীতে কোনো সময়ে এগুলোর মধ্যকার দূরত্ব অবশ্যই শূন্য ছিল। Big Bang এর সময় যখন t=0 ছিল তখন মহাবিশ্বের ঘনত্ব এবং স্থান কালের বক্রতা অসীম হতে পারতো। এ বিষয়টি আপেক্ষিক তত্ত্বের স্বয়ং একটি অচলবস্থার (breaks down) দৃষ্টান্ত। তাই এটা এককত্ব (singularity) নামে পরিচিত। আসল কথা হলো, সকল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এককত্বে এসে অচলবস্থা লাভ করে। এর অর্থ হলো এ যে, এমনকি Big Bang এর পূর্বেও বহু ঘটনা ঘটেছিল। ঐসব ঘটনা প্রয়োগ করে Big Bang এর পরের ঘটনা কেউ ব্যাখ্যা করতে পারে না। কারণ ঐ ঘটনা-প্রবাহ Big Bang এর সাথে অচলবস্থা লাভ করেছিল। Big Bang এর পরে কি ঘটেছে আমরা শুধু তাই জানতে পারি। এর আগের ঘটনাগুলো নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এটা স্পষ্ট করে বলা যায় যে মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) সাথে সাথে কালের যাত্রা শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞানের জগত চার মাত্রায় (four dimension) গঠিত। এর মধ্যে তিন মাত্রা স্থানের (space) এবং একটি মাত্রা কালের। কালের বা সময়ের মাত্রা ব্যতিরেকে ত্রি-মাত্রিক বস্তুজগতের বর্ণনা দেয়া অর্থহীন। অঙ্কশাস্ত্র ও পদার্থবিদ্যার গাণিতিক গঠন সর্বসময় স্থান-কাল সম্পর্কে একটি সুষমতা প্রদর্শন করে থাকে। অর্থাৎ গাণিতিক নিয়মগুলো ডান ও বামের মধ্যে, অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখায় না। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় স্থান-কালের গতির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। অতীত ও ভবিষ্যৎ শব্দ দু'টিকে পারস্পরিকভাবে পরিবর্তন করলে তার দ্বারা একটি চরম অবস্থার সৃষ্টি হবে এবং কোনো ঘটনায় কালের গতি দ্বারা চিহ্নিত করা বাহ্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। এছাড়া অন্যান্য জটিল পার্থক্য দেখা দিবে। তাই কালের বর্ণনাযোগ্য তিনটি গতি নির্ধারণ করা যুক্তি সংগতভাবে অপরিহার্য। প্রথমত, কালের ভবিষ্যৎ গতি স্থান-কালের অসীমতায় পরিব্যাপ্ত যা প্রসারিত মহাবিশ্বের গতিশীল পরিমাণের সাথে আপেক্ষিক। দ্বিতীয়, কালের বর্তমান গতি স্থানীয় সচেতনতায় বিরাজমান যা আমরা অনুভব করে থাকি এবং সঠিকভাবে পরিমাপ করতে পারি। তৃতীয়ত, কালের অতীত গতি স্থান-কালের বক্রতায় এককত্ব প্রাপ্ত হয়।

অতএব, সময়ের সঠিক পরিমাপের জন্য একটি স্থির বিন্দু প্রয়োজন। গতিশীল মহাজগতে স্থির বিন্দুর অবস্থান কোথায়! যেহেতু স্থির বিন্দুর অস্তিত্ব কোথাও নেই তাই এটা স্পষ্টভাবে বলা যায় "Time is relative"। পবিত্র কোরআনের ২২ঃ৪৭, ৩২ঃ৫ এবং ৭০ঃ৪ নং আয়াতে সময়ের আপেক্ষিকতার ধারণা প্রতিফলিত হয়েছে এবং সূরা আছরের ১ নং আয়াতে আল্লাহপাক কালের গতিশীলতার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। এসব আয়াতে সময়ের দৈর্ঘ্য ও গতিশীল প্রকৃতির উপর খুবই জোরালো যুক্তি দেখানো হয়েছে যা উপলব্ধি করে যে কোনো বিজ্ঞানী, দার্শনিক এবং সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষ 'সময়' সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠে। কারণ সূরা আছরে আল্লাহপাক যে কালের শপথ করেছেন সে-ই কালের দৈর্ঘ্য আমাদের জন্য অসীম। এর শুরু যদি Big Bang থেকে ধরা হয় এর শেষ নির্ধারণ করার তথ্য কারও জানা নেই। তবে এতটুকু জানা যায় Big Crunch এর পূর্বে মহাবিশ্বের সংকোচন শুরু হলে কালের দৈর্ঘ্য ক্রমান্বয়ে সংকুচিত পরিক্রমায় অচলবস্থা প্রাপ্ত হবে। আবার ১ দিন সমান ১০০০ বৎসর হলে সহজেই উপলব্ধি করা যায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মহাবিশ্বে এমনও জগত রয়েছে যার ১ দিনের দৈর্ঘ্য পৃথিবীর হিসেবে ১০০০ বৎসর অর্থাৎ ৩৬৫০০০ দিনের সমান (২২:৪৭)। উপরন্তু ১ দিনের দৈর্ঘ্য ৫০,০০০ বৎসর হলে ঐ জগতের ১ দিনের দৈর্ঘ্য সমান পৃথিবীর ১৮২৫০০০০ দিনের সমষ্টি (৭০ঃ৪)। আর এসব আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে ৭ম শতাব্দীতে।

References:
1. Scientific Indications in the Holy Quran; Islamic Foundation Bangladesh.
2. A Brief History of Time, Stephen W. Hawking.
3. The first three minutes; Steven Weinberg.

📘 Biggan moy quran > 📄 পরিশিষ্ট-৪ মানব প্রজননের ইতিহাস

📄 পরিশিষ্ট-৪ মানব প্রজননের ইতিহাস


পরিশিষ্ট-৪ মানব প্রজননের ইতিহাস

সুদূর অতীত কাল থেকে মানুষ তার নিজের জন্ম ও বংশ বৃদ্ধির কলাকৌশল সম্পর্কে জানার চেষ্টা চালিয়ে এসেছে। এ বিষয় সম্পর্কে অতীত কালের সকল তথ্য ও রচনা বলতে গেলে উপকথা ও কুসংস্কারে ভরা। সেসব কল্প-কাহিনী ও কুসংস্কার ধর্মতত্ত্ব জ্ঞান করে মানুষের মনে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। উপরন্তু এ ধরনের নীতি-ব্যবস্থা দ্বারা লিঙ্গ ভিত্তিক ধর্মতত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছে এবং লিঙ্গ পূজা করা তাদের লিঙ্গ ভিত্তিক ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করার জন্য এক গোষ্ঠী অপর বিরোধী গোষ্ঠীর সাথে বহু ঘৃণ্য কলহে লিপ্ত হয়েছিল। এমনকি আধুনিক বিজ্ঞানের এ যুগেও নিখিল ভারতের বিভিন্ন অংশে পুরুষের লিঙ্গপূজক বিদ্যমান রয়েছে, যা আমরা প্রতি বছর স্যাটেলাইট টিভিতে তাদের লিঙ্গ পূজার দৃশ্য দেখে থাকি।

যাহোক "Al-Quran and Modern Science" গ্রন্থের লেখক মোল্লা শামসুদ্দীন আহমদ মানব প্রজননের ইতিহাস থেকে একটি মজার উপখ্যান তুলে ধরেছেন। যা তামাশা আর বোকামিতে আকীর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়। পাঠকদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করার জন্য উক্ত উপখ্যানটি আমি এখানে হুবহু উদ্ধৃত করলাম যা অতি সাধারণ ইংরেজী ভাষায় লেখা।

"The people of old pagan believed that human embryo originated from menstrual blood. Indian Hindus, however, believed just the reverse. They said that since women without sexual intercourse with men do not bear any child, the human embryo must be originated from male semen only. Their holy Scriptures tell that semen of god Brahma was covered with sand, and from that sand grew 88000 Saints (Munis) named "Balakhily Munis". That semen of god Mahadev fell on earth and threw it on fire, and fire threw it in a jungle of reeds. And out of that semen was born a child in that jungle who was named "Kartik". That semen of one God-fearing king was eaten by a river fish, and that fish gave birth to a female baby who was named "Marshagondha" (daughter with odor of fish). By rubbing the two hands of King Ben, one son named "Prithu" and one daughter named "Agni-Bhagabat" were born. Due to rubbing the right hand of King Ben, Prithu Hari Bangsha was born. When King Janak was ploughing his land, the share of his plough dug out one egg from the soil. From that egg, one female baby named Sita came out. Shree Ram Chandra, the 7th incarnate god from original God Vishnu and the mythic king of Oudh (Ayodhya), married her. Regarding the birth of Ram Chandra, the Ramayana tells that King Dasharatha made an oblation of fire and cooking a porridge, a fruit was smeared in the porridge. God Vishnu entered that fruit. From that porridge, a portion having the image of God Vishnu came out. The priest gave it to Dasharatha and instructed him to give it to his wives for eating. Three wives of King Dasharatha made it into four parts and ate them. Thus, Vishnu was also divided into four parts and entered the stomachs of three queens. In due course, the three queens gave birth to four sons. The firstborn was named Ram Chandra. Thus, both Ram Chandra and his wife Sita were born without male semen. Goddess Durga, having 10 hands, originated from the mettle of some other god. She is also said to be the daughter of Himalayan Mountain, for which she is also named Parbati. Goddess Lakshmi was born thrice. Firstly, in the womb of Prasruti, wife of Dhakhya; secondly, in the womb of Khyati, wife of Bhrigu; and thirdly, in the womb of Durga, wife of Shiva. Goddess Kali came out from the forehead of Goddess Durga (Bhagavat). She is also said to have originated from the breath of her husband, Shiva."

মানব প্রজননের এসব কল্পকাহিনী পাঠ করে বেশ মজা পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে কোন বৈজ্ঞানিক সারযুক্তি নেই। আর এভাবে কোন দেব-দেবী কিংবা মানুষের উৎপত্তি একেবারে অসম্ভব। ওল্ড টেস্টামেন্টে দেখা যায় যে, স্তব-গায়করা (psalmist) এ বলে গান গেয়ে থাকেন, "অসততার মধ্যে আমি দেহ ধারণ করেছি এবং আমার মা পাপকর্মের মাধ্যমে গর্ভধারণ করেছে (psalm-Li 5)।

পৃথিবীতে মানব প্রজনন সম্পর্কে বৌদ্ধ ধর্ম শাস্ত্রে বলা হয়েছে, প্রভু বৌদ্ধের শততম পিতামহ ইকিয়াকুর জন্ম একটি ডিম থেকে যা বিকশিত হয়েছিল কণিকের জৈষ্ঠ্য পুত্র গৌতমের নোংরা বীর্যের মধ্যে।

বিজ্ঞান ভিত্তিক অনুসন্ধান শুরু

মেডিসিনের জনক হিপোক্রেটস্ (400 B.C) এর সময় থেকে এ বিষয়ে বিজ্ঞান ভিত্তিক যুক্তিসঙ্গত চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছিল। হিপোক্রেটস্ বিশ্বাস করতেন তরল বীর্যের মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী ভরপুর থাকে। এ ধরনের ভাবনা নিঃসন্দেহে শুভ অনুমান।

দার্শনিক প্লেটোরও বিশ্বাস ছিল বীর্যের মধ্যে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণীর অস্তিত্ব বিদ্যমান।

এরিস্টটল (350 B.C) একটি নবজাত শিশুর জন্মদান প্রক্রিয়ায় পিতা-মাতা উভয়ের অবদানের পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছিলেন এবং তার বিশ্বাস ছিল প্রথম মানব সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল মাটির গর্ভ (womb of the earth) থেকে।

গ্যালেন (200 A.C) এ মর্মে চিন্তা করেছিলেন, পুরুষ এবং নারী উভয়ের জনন কোষ আছে এবং উভয়ের জনন কোষ মিশ্রিত হলে একটি মানব শিশু জন্মলাভ করে। তার এ তত্ত্ব মৌলিকভাবে নির্ভুল। তবে তিনি ভেবেছিলেন শিশুর যকৃত ও হৃৎপিণ্ড মায়ের রক্ত থেকে গড়ে ওঠে। আর মস্তিষ্ক গড়ে ওঠে পুরুষের স্পার্ম থেকে।

সপ্তদশ শতাব্দী থেকে মানব প্রজনের উপর নিবিড় বৈজ্ঞানিক গবেষণা শুরু হয়। ১৬০৪ খৃস্টাব্দে ভ্রূণবিদ্যার উপর একটি পুস্তক রচিত হয় যার রচয়িতা ছিলেন Fabricius। গ্রন্থটির নাম ছিল "de Formatione ovi at pulli" (Concerning the formation of egg and the chick)। এ গ্রন্থে দেখানো হয়েছে কিভাবে ডিমের মধ্যে মুরগী ছানার ভ্রূণ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।

১৬৫১ সনে Harvey ফেব্রিসিয়াসের তত্ত্বের উন্নতি সাধন করেন এবং ডিম পর্যবেক্ষণ করে তত্ত্ব পেশ করেন যে, সকল প্রাণীর ভ্রূণের সূচনা হয় ডিম্বকোষ থেকে। De Graaf ১৬৭২ সালে শশক জাতীয় প্রাণীর ভ্রূণ পর্যবেক্ষণ করে চিন্তা করলেন, ভ্রূণটা বেরিয়ে আসে ডিম্বাশয় থেকে। ইতালীয়ান অ্যানাটমিস্ট Malpighi, De Graaf এর তত্ত্ব সমর্থন করেন। তিনি এ তত্ত্বের উপর জোর দিয়ে বলেন মানব ভ্রূণ সৃষ্টি হয় মাতৃ ডিম্বকোষ থেকে অর্থাৎ Ovum থেকে। পিতৃ জনন কোষের ভূমিকা একেবারে গৌণ।

একই সময়ে Harvey, De-Graaf ও Malpighi-র তত্ত্বের বিপরীতে আর একদল ভ্রূণবিদ দাঁড়িয়ে যান। তারা হলেন, Hamm, Leeuwenhoek এবং Swammerdan। তারা শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে Semen পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন যে, Sperm গুলো এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে। এগুলোকে ক্ষুদ্র প্রাণী বা প্রাণীকণা বলে চিহ্নিত করে দেন। এ তিনজন বিজ্ঞানী ঘোষণা দেন মানব ভ্রূণ পিতার স্পার্মের মধ্যে বিদ্যমান। Ovum এর ভূমিকা নেই বললে চলে।

এভাবে উভয় গ্রুপ দু'টি "Schools of thought" এ বিভক্ত হয়ে পড়লেন। একটি স্কুল বিশ্বাস করতেন, "Human embryos are present in mother's ovaries, the fathers playing no role"। অপরপক্ষে অন্য স্কুল বিশ্বাস করতো, "The embryos are present in father's sperms and mothers playing no role, other than only nursing the embryo till it grows into a full baby".

এ বিতর্ক একটানা ৮০ বৎসর যাবৎ অব্যাহত ছিল এমনকি sperm এবং ovum আবিষ্কার হওয়ার পরেও। মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭) এ বিষয়ে যে গ্রন্থ রচনা করেন তার নাম 'আল-কানুন ফিততিব'। এই গ্রন্থে Anatomy, Embryology, physiology এবং physiotherapy অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইবনে সিনা তাঁর গ্রন্থে দেখিয়েছেন, sperm এবং ovum এর যৌথ বিক্রিয়ায় (অর্থাৎ নিষেক) মানব ভ্রূণ গঠিত হয়। তিনি sperm এর নাম উল্লেখ করেছেন, "ajzaye manbiyat" এবং ovum এর নাম দিয়েছেন "Baizaye Unsa"। এ বইটি ইউরোপের দেশগুলোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৩০০ বৎসর যাবত পড়ানো হয়েছিল। তারা ইবনে সিনার anatomy, physiology এবং physiotherapy- র উপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর নির্ভুল ভ্রূণ তত্ত্ব সম্ভবত সমর্থন করেননি। কেননা এটা ছিল উভয় গ্রুপের বিশ্বাসের বিপরীত তত্ত্ব।

আধুনিক ভ্রূণ তত্ত্বঃ মানব ভ্রূণ নিয়ে যথাযথভাবে গবেষণা শুরু হয় ১৯৪১ সনে। আধুনিক ভ্রূণতত্ত্বে দেখানো হয়েছে, মাতৃগর্ভে ভ্রূণ সৃষ্টির প্রারম্ভে একটি sperm একটি ovum এর ভেতরে প্রবেশ করে নিষেক (fertilization) ঘটায়। নিষেক সংগঠিত হলেই একটি কোষ গঠিত হয় যার নাম জাইগোট (Zygote)। জাইগোট অতি সুরক্ষিত প্রকোষ্ঠে (uterus) স্থান লাভ করে। এ প্রকোষ্ঠটি ভ্রূণের জন্য খুবই নিরাপদ। এর গঠনশৈলী পর্যবেক্ষণ করে সবাই বিস্ময় বোধ করে। (আল কোরআন এটাকে বর্ণনা করেছে কারারিম মাকিন বা সুরক্ষিত আধার হিসেবে।) এখানে জাইগোট বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর বর্ধিত পরিবর্তিত অবস্থাকে বলা হয় blastocyst (জমাট রক্তের মতো অবয়ব) আরবীতে এটাকে বলা হয় 'আলাক', যার পারিভাষিক অর্থ জোঁক সদৃশ বস্তু। তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে Blastocyst জোঁকের মতো আকার (Leech-like appearance) ধারণ করে। ভ্রূণের এরূপ অবয়ব থেকে মাথার সম্মুখভাগ গঠিত হয়। এ পর্যায়ে হৃৎপিণ্ড অর্থাৎ Cardiovascular system এর সূচনা হয়। এ স্তরে ভ্রূণটি ১৫-১৬ দিনের মাথায় ভ্রূণ থলির দেয়ালে ঝুলন্ত দেহ-বস্তুর মত ঝুলে থাকে।

পরবর্তী স্তরে ভ্রূণ বিকাশকে বলা হয় somites বা মাংসপিন্ড। যা দেখতে চর্বন বস্তুর মত (Chewed like substance) (কোরআনে এটাকে বলা হয়েছে মুদ্‌গাহ বা মাংসপিন্ড)। এ অবস্থা চলতে থাকে ২৩-৪২ দিন পর্যন্ত। দাঁতের মত খাঁজকাটা ১৩টি মাংসপিন্ডের ব্লক Somites পর্যায়ে পরিলক্ষিত হয়। এগুলো পৃথক পৃথকভাবে ভ্রূণের নার্ভ-নালীর পাশাপাশি সাজানো থাকে।

পরবর্তী পর্যায়টি হলো skeleton বা কঙ্কাল গঠনের স্তর। (আল কোরআনে স্কেলেটনকে বলা হয়েছে 'ইযাম' বা অস্থি) এ স্তরে প্রথম দিকে যে অস্থিগুলো গঠিত হয় সেগুলো হলো উপরিভাগের কচি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। প্রাথমিক ৬ সপ্তাহে কচি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের mesenchymal tissue গুলো কোমল অস্থিতে পরিণত হয়ে কঙ্কালের একটি প্রাথমিক মডেল গঠন করে। ৬ সপ্তাহের শেষের দিকে উপরের দিকের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ একটি পূর্ণাঙ্গ কোমল মডেল প্রকাশ পায়। এভাবে ১২ সপ্তাহের মধ্যে ভ্রূণের একটি পরিপূর্ণ কঙ্কাল গঠিত হয়।

ভ্রূণ বিকাশের পরবর্তী স্তর হলো পেশী গঠন পর্যায় (formation of muscles stage)। ৭ম সপ্তাহ থেকে কঙ্কালতন্ত্র বিস্তৃতি লাভ করে এবং অস্থিগুলো পরিচিত আকার ধারণ করে। ৮ম সপ্তাহ থেকে অস্থিগুলো পেশী দ্বারা আবৃত হতে থাকে। ৮ম সপ্তাহ শেষ হলে বিভিন্ন তন্ত্র যেমন, পেশীতন্ত্র, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ খুব ভালভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এ সময় ভ্রূণ নড়াচড়াও করতে পারে।

সর্বশেষ স্তরের নাম Foetus। ফিটাস আর কিছু নয় একটি পূর্ণাঙ্গ মানব শিশু যা ভূমিষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় থাকে।

সুতরাং সংগৃহীত জৈব জ্ঞানের সঞ্চয় নিয়ে আমরা যখন আধুনিক ভ্রূণ তত্ত্ব পর্যালোচনা করি তখন দেখতে পাই সুমহান আল্লাহপাক ৭ম শতাব্দীতে কি নিখুঁতভাবে মানব ভ্রূণ সৃষ্টি ও বিকাশ সংক্রান্ত তথ্য ও তত্ত্ব অবতীর্ণ করেছেন। সূরা দাহরের ২ নং আয়াতে ভ্রূণ গঠন তথা নিষেক এবং সূরা হজ্ব এর ৫ নং আয়াতে এবং সূরা মুমিনূন-এর ১২-১৪ নং আয়াতে অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে ভ্রূণ বিকাশের তত্ত্ব বর্ণনা করা হয়েছে এবং আল্লাহপাক নিজেকে 'আহসানুল খালেকীন' ঘোষণা দিয়েছেন। এর অর্থ হলো 'সর্বোত্তম সৃষ্টিকর্তা। এ ঘোষণা খুবই যথার্থ। কেননা মানুষ অনেক কিছু উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু সে যা-ই উৎপাদন করুক না কেন তার উৎপাদনের উপজীব্য উপাদান আল্লাহরই সৃষ্টি। তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলোর মধ্যে 'মানুষই সেরা সৃষ্টি।

মানব প্রজনন সম্পর্কে পবিত্র কোরআন যেসব তথ্য তুলে ধরেছে প্রথমদিকে মানুষ সেসব আয়াতের উপর নানা রকম ভাষ্য পেশ করেছেন। এটা স্বাভাবিক। এখন বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের উন্নয়নের ফলে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ভ্রূণতত্ত্ব সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে।

References:
1. Al-Quran and Modern Science; Mullah Shamsuddin Ahmed; first edition January, 1997; Al-Falah printing press, 423 Elephant Road, Baramagh Bazar, Dhaka.
2. Scientific Indications in the Holy Quran; Islamic Foundation Bangladesh.
3. The Developing; K.L. Moore and A.M.A Azzindani; W.B. Saunders Co. philadelphia.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00