📄 অনুগ্রহ
রমজান মাসের রোজার অর্থ হলো ঐ মাসেই কেবল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য, পানীয় এবং স্বামী-স্ত্রী দৈহিক মিলন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকা। কিন্তু এ নিয়মের ব্যতিক্রম আছে। যারা অসুস্থ বা ভ্রমণে বহির্গত তাদের রোজা রাখতে হবে না। তবে সুস্থতা প্রাপ্ত হলে কিংবা ভ্রমণ থেকে ফিরে আসলে যে কয়দিন রোজা রাখা হয়নি সে কয়দিন রোজা পূরণ করে দিতে হবে। উল্লেখিত দুই অবস্থায় রোজা না রাখার পক্ষে এই ছাড়টুকু করুণাময় আল্লাহর বিশেষ দয়া। তিনি এতই মেহেরবান প্রভু, বান্দার উপর কোন প্রকার কষ্টক্লেশ চাপিয়ে দেন না। বরং বান্দার জন্য শান্তি ও স্বস্তি নিশ্চিত করেন।
অসুস্থ ব্যক্তিকে রোজা রাখা থেকে বিরত রাখা হয়েছে এ কারণে যে, সারাদিন রোগী যদি খাদ্য, পানীয় গ্রহণ করতে না পারে তাহলে তার ক্ষতি হতে পারে। এমন কতগুলি অসুখ আছে সেই অসুখগুলিতে আক্রান্ত হলে রোগীকে নিয়মিতভাবে কিছু সময় পরপর খাদ্য, পানীয় ও ঔষধ গ্রহণ করতে হয়। এগুলির মধ্যে ডায়রিয়া (diarrhoea), আমাশয় (dysentery), তীব্রপ্রদাহ ব্রংকোনিউমোনিয়া (bronchopneumonia), তীব্র অ্যাপেন্ডিসাইটিস (acute appendicitis), কঠিন মেনিনজাইটিস (Acute meningitis), টাইফয়েড জ্বর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব রোগে আক্রান্ত রোগী রোজা রাখলে শরীরে পানিশূন্যতা বাড়বে এবং তাপমাত্রায় অসমতা দেখা দেবে এবং ব্যথার তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে। ডায়রিয়া শুরু হলে এবং তীব্র জ্বরে বমি হলে পানি পান করা ছাড়া কোন গত্যন্তর থাকে না। সুতরাং এরূপ রোগে অসুস্থ হলে রোজা রাখা থেকে অব্যাহতি খুবই বিজ্ঞানসম্মত এবং স্বাস্থ্যপ্রদ। আর যেসব রোগ ভয়ংকর নয় সেসব রোগে আক্রান্ত রোগীর রমজান মাসের রোজাকে না এড়িয়ে ঐ মাসেই রাখা সঙ্গত।
ভ্রমণকালে রোজা রাখা থেকে বিরত থাকা খুবই যুক্তিসঙ্গত। কারণ ভ্রমণ করার সময় মুসাফির নিয়মিত সেহরী (ভোর রাতে খাদ্য গ্রহণ) গ্রহণের যথেষ্ট সুযোগ নাও পেতে পারেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দয়াময় আল্লাহ তাআলা ভ্রমণকারীদের (মুসাফির) রোজা এড়িয়ে যাওয়ার অধিকার দিয়েছেন। আর যারা বাড়ী থেকে ৪৮ মাইল দূরে কিংবা কমপক্ষে ১৫ দিন ঘরের বাইরে অবস্থান করবে তারাও রোজার এ সুবিধা লাভ করবে। কম কষ্টদায়ী রোগের মত যে সফরে এবং বাইরে অবস্থান করার মধ্যে তেমন কোন তীব্রতর কষ্ট নেই সেই সফরে সফরকারী এবং সেরূপ ঘরের বাইরে অবস্থানকারী নিয়মিত রোজা পালন থেকে বিরত থাকার পক্ষে ঐ সুবিধা জোরালোভাবে বিবেচনা করা যাবে না। সব রকম সফরে মুসাফিরের পক্ষে রোজা রাখা না রাখার বিষয়টি তারই এখতিয়ারভুক্ত। আর আল্লাহপাক তো মানুষের অন্তরের খবর রাখেন।
শَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنَ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتِ مِنَ الْهُدَى
The month of Ramadan in which was revealed the Quran as a guide to mankind and clear proofs for the guidance and the judgment (between ritght and wrong). So every one of you who is present during that month should spend in fasting, But if any one is ill or on a journey, let him fast the same number of other days. Allah intends every facility for you, He desires not hardship for you and He desires that you should complete the period and to glorify Him in that He has guided you and perchance you may be grateful.
রমজান মাস। এ মাসে অবতীর্ণ হয়েছে মানবজাতির জীবন বিধান এবং তা এমন স্পষ্ট উপদেশাবলীতে পরিপূর্ণ যা সঠিক পদ প্রদর্শন করে এবং সত্য আর মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য সূচিত করে। কাজেই যে ব্যক্তি এ মাসের সম্মুখীন হবে তার উচিত পূর্ণ মাস রোজা পালন করা। আর যদি কেউ অসুস্থ হয় কিংবা ভ্রমণকার্যে ব্যস্ত থাকে তবে সে যেন অন্যান্য দিনে এ রোজার সংখ্যা পূরণ করে নেয়। মূলত আল্লাহ তোমাদের কাজ সহজ করে দিতে চান। কোনরূপ কঠোরতা আরোপ করা তাঁর ইচ্ছা নয়। তাঁর ইচ্ছা এ যে, তোমরা যেন রোজার সংখ্যা পূর্ণ কর এবং আল্লাহ যে তোমাদেরকে জীবন বিধান দিয়েছেন, তার জন্য যেন তোমরা তাকে মহিমান্বিত কর এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাক। (বাকারা-১৮৫)
📄 রোজার কল্যাণকর প্রভাব
রোজার কল্যাণকর ফলাফল
সিয়াম সাধনার দরুণ শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক কল্যাণ অর্জিত হয়। ত্রিশ দিন একটানা রোজা রাখার পরে অর্জিত কল্যাণগুলো অনুধাবন করা যায়। এক্ষেত্রে প্রকৃত রোজাদারেরাই ভালো ফল লাভ করেন। এটা প্রমাণিত সত্য যে, সিয়াম মানুষের অহমিকাবোধ দমন করে, ক্রোধ, মানসিক উত্তেজনা, অনিয়ন্ত্রিত আবেগ এবং অশোভন ক্রিয়া-কর্ম বহুলাংশে কমিয়ে দেয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে রোজা শরীরের ওজন ধীরে ধীরে হ্রাস করে। শরীরের ওজন হ্রাস পাওয়া খুবই উপকারী। সিয়াম মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন করে। তবে এটা একান্ত নিজস্ব বিষয়। সিয়াম থেকে যেসব ফল অর্জন করা যায় তা নিম্নরূপ:
**Fasting makes the soul shining:** রোজা আত্মার আলো। এ আলো ব্যক্তি সত্ত্বাকে প্রভাবিত করে। আল্লাহপাকের সৃষ্টি জগতে রূহ বা আত্মা একটি রহস্যময় বিস্ময়কর সত্তা। বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রকৃত যুক্তিগুলোর মধ্যে এর কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে যে, আল্লাহপাকের নবীর কাছে আত্মা (Spirit) সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। আল্লাহপাক ঐশী বাণী দ্বারা এর জবাব দিয়েছেন, "The spirit is one of the commands, coming my Lord and of knowledge you have been given only a little" (আল-ইসরা-৮৫)। কোরআন ও হাদীসে আত্মার পরিশুদ্ধির উপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং এ পরিশুদ্ধির কতগুলো পদ্ধতিও উল্লেখ করা হয়েছে। ঐগুলোর মধ্যে রোজা অন্যতম। কারণ অত্যধিক পানাহার আত্মাকে সুপ্ততার মধ্যে নিমজ্জিত করে যার কারণে মানুষের চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটে না। ক্ষুধার্থ পাকস্থলী জ্ঞানের ঝর্ণাধারা যা আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দাদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়।
**Fasting gives taste in prayer:**
একথা খুবই সত্য যে, সিয়াম সাধনার ফলে রোজাদারের মধ্যে স্বর্গীয় প্রেরণার উন্মেষ ঘটে। এ প্রেরণা আশ্চর্যজনকভাবে জাগ্রত হয়। এর ফল হিসেবে রোজাদারগণ আল্লাহপাকের ইবাদতের প্রতি একাগ্রচিত্তে নিজেদেরকে নিয়োজিত করে রাখেন। খুবই প্রশান্ত মনে ইবাদতে মশগুল হয়ে থাকলে এর স্বাদ অনুভব করা যায়। পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় ইবাদতে একনিষ্ঠ হওয়ার জন্য বিশেষ আদেশ দেওয়া হয়েছে।
قُلْ إِنِّي أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ
Say: Most Surely, I am commanded to worship Allah by obeying Him and doing religious deeds sincerely for His sake only.
(বলুন, আমি আদিষ্ট হয়েছি আল্লাহপাকের অনুগত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদতে নিয়োজিত হয়ে থাকতে। (যুমার-১১)
সবাই এ বিষয়টি অনুভব করে থাকে যে, ভরা পেটে ইবাদতের সময় অন্তরের নিবিষ্টতা থাকে না। তাই ইবাদতের স্বাদ ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায় না। কিন্তু পাকস্থলী খালি থাকলে ইবাদতে মনোনিবেশ করা সহজ। সিয়াম সাধনার সময় আমরা তা বুঝতে পারি।
**Fasting removes the sense of Arrogance:**
রোজা মানুষের অহংকার, অহমিকা ও প্রতিপত্তিবোধকে দুর্বল করে দেয়। কেননা একজন ক্ষুধার্থ লোক নিজেকে দুর্বল দেখতে পায়। কিছু সময়ের জন্য পানাহার না করার দরুন এ দুর্বলতা। তখন তার মধ্যে যদি এ উপলব্ধি কাজ করে যে, 'অল্প সময়ের জন্য পানাহার ত্যাগ করার কারণে আমি এতো দুর্বল হয়ে পড়েছি, তাহলে আমার কিসের বাহুবলের অহংকার, প্রতিপত্তির দম্ভ, আত্ম-অহমিকার গর্ব?' এরূপ অনুভূতি যখনই মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় তখন সে সর্বশক্তিমান আল্লাহপাকের দরবারে আত্মসমর্পণ করে। সব অহংকার আল্লাহ তাআলার, যাঁকে ক্ষুধা, তন্দ্রা, নিদ্রা, দুর্বলতা কোনো কিছুই স্পর্শ করতে পারে না। শাশ্বত, চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী, স্বয়ংসম্পূর্ণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন।
وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالُ طولاً .
And walk not on the earth with conceit and arrogance. Surely you can not rend the earth asunder, nor can you attain a stature like the mountains in height.
আত্মগর্ব ও দম্ভভরে ভূপৃষ্ঠে বিচরণ করো না। কারণ, তুমি তো পৃথিবী পৃষ্ঠকে কখনো পদভারে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনো পর্বত প্রমাণও হতে পারবে না। (আল-ইসরা-৩৭)
إِنَّ اللهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا.
Verily, Allah does not Love such as are proud and boastful.
অবশ্যই আল্লাহপাক ভালোবাসেন না দাম্ভিক আত্মগরবীকে। (নিসা-৩৬)
**Fasting saves time and trouble:**
সময় অমূল্য সম্পদ। দৈনন্দিন জীবনে এতটুকু সময় সঞ্চয় হলে আমরা অনেকগুলো প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারি। দিনের বেলা খাদ্য গ্রহণ করতে যে সময়টুকু লাগে রোজা আমাদের জন্য সে-ই খন্ডিত সময়গুলো সঞ্চয় করে থাকে। এর ফলে ঐ সময়গুলোতে চলমান কাজগুলো অব্যাহত রাখা যায়। কাজে বিরতি দিতে হয় না বলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এক মাসের বর্ধিত উৎপাদনে বাকী এগার মাসের বরকত হাসিল হয়। এটা সুমহান আল্লাহপাকের অশেষ করুণার প্রমাণ। উপরন্তু পানাহার থেকে বিরত থাকার কারণে প্রকৃতির ডাক (Nature's call) অনুভূত হয় না। তাই ওজু অব্যাহত রেখে কাজ করা যায়।
**Fasting saves money:**
রোজা অর্থ বাঁচায়। অর্থাৎ দিনের বেলা অফিসে, দোকানে কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাউকে এমনকি কোনো অমুসলিম জনকেও আপ্যায়ন করানোর কোনো সুযোগ থাকে না। এর ফলে মোটামুটি কিছু অর্থের সাশ্রয় ঘটে। এটা কম কথা নয়। এক্সপেন্ডিচার কম হলে তা শুধু ব্যক্তির উপকার হয় না জাতীয় অর্থনীতিরও উপকার সাধিত হয়।
**Fasting teaches democracy:**
নামাজ শুধু আমাদেরকে গণতন্ত্র শিক্ষা দেয় তা নয়। রোজাও গণতন্ত্র শিক্ষা দিয়ে থাকে। একজন দরিদ্র ব্যক্তি যেভাবে সারাদিন পানাহার ও স্ত্রী-মিলন থেকে বিরত থাকে ঠিক একইভাবে ধনী ব্যক্তিকেও এ বিধান হুবহু মেনে চলতে হয়। আরামপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী রোজা পালন করলে তার কষ্ট হবে এজন্য তার পক্ষে কোনো ছাড় মঞ্জুরি নেই। ক্ষুধার যন্ত্রণা সবাইকে সমানে উপভোগ করতে হবে এবং ঠিক ঠিক সময়ে সেহরী ও ইফতার গ্রহণ করতে হবে। এটা রোজার একটি শিক্ষা এবং এর নাম গণতন্ত্র।
**Fasting teaches sympathy for the Hungry:**
যে কখনো উপবাসে দিন কাটায়নি সে কিভাবে বুঝবে ক্ষুধার্ত মানুষের আহাজারী। আল্লাহপাক সিয়ামের বিধান দিয়েছেন যাতে ক্ষুধার্তদের প্রতি মানুষের মধ্যে সহানুভূতি সৃষ্টি হয়। মানবজাতির কল্যাণে কি ধরনের বিধি-বিধান দরকার তা মহান আল্লাহর চেয়ে আর কে ভালো জানতে পারে? খাদ্যাভাবে ক্ষুধা-ক্লিষ্ট মানুষের মর্ম বুঝতে হলে খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকার পদ্ধতিই উত্তম। রোজা রাখার বাধ্যবাধকতা ব্যতিরেকে কেউ কখনো উপবাস ব্রত পালন করবে না। আল্লাহপাক মানুষের স্বভাব-প্রবৃত্তির স্রষ্টা। মানুষ সৃষ্টি করার পেছনে তাঁর সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। এটা আমরা সকলেই বুঝতে পারি। কিন্তু মানুষের মধ্যে ধনী-দরিদ্রের সমাজ কাঠামো মানুষেরাই গঠন করেছে। দরিদ্ররা খাদ্যের অভাবে অনেক সময় উপবাসে রাত কাটায়। ধনীরা তা জেনেও স্বাভাবিক থাকে। কারণ উপবাসের যন্ত্রণা তাকে কখনো ভোগ করতে হয়নি। এমতাবস্থায় কিভাবে সে ক্ষুধার্ত লোকের মর্মার্থ অনুভব করতে সক্ষম হবে! চোখ দু'টি বন্ধ রাখলেই তো আমরা অন্ধত্বের অবিরাম কষ্ট বুঝতে পারি। প্রজ্ঞাময় আল্লাহপাক সিয়ামের বিধান দিয়ে আমাদের মধ্যে এ অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে চাই— অনাহারে থাকার কষ্ট খুবই যন্ত্রণাদায়ক।
**Fasting keeps faith in Allah:**
প্রায় সকল মুসলমান আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাস রাখে। আল্লাহপাক অস্তিত্ববিহীন নয়। মহাবিশ্বের সর্বত্র একযোগে তার অস্তিত্ব বিদ্যমান। পৃথিবীর যে অংশে আমরা বসবাস করি না কেন সেখানে তাঁর অস্তিত্বের উপস্থিতি অবধারিত। এ কথার মর্মার্থ সাধারণ জ্ঞান দ্বারা আমরা বুঝে ওঠতে পারি না। তবে এটুকু বুঝতে পারি, সৃষ্টির অস্তিত্ব কিছুতেই টিকে থাকতে পারে না স্রষ্টার উপস্থিতিগত অস্তিত্ব ব্যতিরেকে। রোজা আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাসকে আরো বর্ধিত করে দেয়। সূর্য অস্ত যাওয়ার এক মিনিট পূর্বে পানির তৃষ্ণায় বক্ষ বিদীর্ণ হয়ে যায়। তবুও রোজাদার আল্লাহ তাআলার ভয়ে পানি পান করেন না। কারো উপস্থিতি ব্যতীত কেউ কখনো এভাবে ভয় করে? আল্লাহপাক অস্তিত্বধারী সত্তা এবং তিনি সবসময় সবখানে উপস্থিত থাকেন। এ বিশ্বাসের উপর চিরকাল প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য আমাদেরকে দিয়েছেন সিয়ামের বিধান। সুতরাং আমাদের সকলেরই উচিত রমজান মাসে রোজাব্রত পালন করে পরম হিতৈষী আল্লাহপাকের উপস্থিতি অনুভব করা।
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ
And when My servants ask you concerning Me, then (Answer them) I am indeed near to them.
আর আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবে (প্রতি উত্তরে) বলবেন আমি অবশ্যই তাদের সন্নিকটে। (বাকারা-১৮৬)
📄 সিয়াম তত্ত্ব
সিয়াম তত্ত্ব (Theory of Fasting):
মানুষ যখন যৌবনে পদার্পণ করে তখন তার মধ্যে Sex tendency জাগ্রত হয়। কারণ এ সময়ে যৌনগ্রন্থি থেকে যৌন উদ্দীপক হরমোন (hormone) নিঃসৃত হয়। এ হরমোন নিঃসরণকে প্রভাবিত করে পিটুইটারী গ্রন্থি (pituitary) থেকে নির্গত আর এক ধরনের হরমোন, যার নাম মেলানোসাইট স্টিমুলেটিং হরমোন। এ হরমোন যৌনগ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে। যার ফলে যৌন আকাংক্ষা অনুভব করে। তাই এ সময় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতা, দারিদ্রতা কিংবা অন্য কোন প্রতিকূল অবস্থার কারণে বিয়ে করা অসম্ভব হলে তখন কি করা উচিত! এ সমস্যা সমাধানের কোন ফলপ্রসূ তত্ত্ব বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করতে সক্ষম হননি। কিন্তু ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এ বিষয়ে এমন একটি বিজ্ঞান ভিত্তিক তত্ত্ব দিয়েছেন যা দৈহিক ও মানসিক কল্যাণ বয়ে আনে। তত্ত্বটির নাম সিয়াম তত্ত্ব। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, দারিদ্রতা কিংবা বেকারত্বের কারণে উপরোল্লেখিত সময়ে বিয়ে করা অসম্ভব হলে সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকা। এর ফলে যৌন উদ্দীপনা ক্রমান্বয়ে সুপ্ত হয়ে যায়। তবে এ উদ্দীপনা সুপ্ত হয়ে গেলে সিয়াম সাধনায় বিরতি দেয়া যায়।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجُ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْسَنُ لِلْفَرَجِ وَمَنْ لَّمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وَجَاءَ (মুত্তফাক আলাইহি)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবীজী (সাঃ) বলেছেন, হে যুব সমাজ, তোমাদের মধ্যে যে সামর্থবান তার উচিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। কেননা এটা দৃষ্টিকে অবনত করে এবং চারিত্রিক সততা সংরক্ষণ করে। আর যে যুবক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে অক্ষম তার উচিত রোজা পালন করা। কারণ রোজা যৌন আকাংক্ষা নিবৃত্ত করে। (বুখারী, মুসলিম)
উপযুক্ত মুহুর্তে বিয়ে করতে অসমর্থ যুবক-যুবতীর যখন সিয়াম তত্ত্ব গ্রহণ করবেন। এর সাথে সাথে আরো চারটি বিশেষ কল্যাণের অধিকারী হবেন।
১. শারীরিক কল্যাণ
রোজা পালনের ফলে ডায়াবেটিস, হার্ট ডিজীজ, হাইপারটেনশন, গ্যাস্ট্রিক এসিডিটি প্রভৃতি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দেহের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠে।
২. মানসিক কল্যাণঃ
সিয়াম সাধনার দরুন মনের মধ্যে স্বর্গীয় প্রশান্তি প্রবাহিত হয়।
৩. আধ্যাত্মিক কল্যাণঃ
রোজাদার ব্যক্তির সাথে মহান আল্লাহর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠে।
৪. পরকালীন কল্যাণঃ
রোজা পালনকারী বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলা মহা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। আর এ পুরস্কার তিনি নিজেই দান করবেন।