📄 সালাতের আধ্যাত্মিক বিভাগ
সালাতের আধ্যাত্মিক বিভাগ
মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, الصلوة معراج المؤمنين সালাত হচ্ছে মু'মিনের জন্য মি'রাজ স্বরূপ।
নামাজের মধ্যে আল্লাহর সাথে নামাজীর কিভাবে মি'রাজ সংঘটিত হয়? যেমন সূরা ফাতেহার অন্তত বাইশটি নামের মধ্যে একটি নাম হচ্ছে সূরাতুস্ সওয়াল বা প্রশ্ন করার কিংবা কোন কিছু চাওয়ার সূরা। নামাজী প্রশ্ন করেন, আল্লাহ তাআলা জবাব দেন। নামাজী নেয়ামত চান, আল্লাহপাক তা শর্ত সাপেক্ষে দেয়ার ওয়াদা করেন। নামাজী সাহায্য চান, আল্লাহ পাক সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন। এভাবে আল্লাহ ও নামাজীর মধ্যে কথোপকথনের মাধ্যমে নামাজ শেষ হয়।
শুরুতে নামাজী বলেন, الحمد لله (হে প্রভু, সমস্ত প্রশংসা তোমার জন্য সংরক্ষিত)
এ প্রশংসার জবাবে আল্লাহ পাক বলেন, وله الحمد في السموات والارض (হে নামাজী, প্রকৃতপক্ষে নভোমন্ডল আর ভূ-মন্ডল জুড়ে প্রতিনিয়ত আমরাই প্রশংসা গুজার হচ্ছে।)
এরপর নামাজী ঘোষণা করেন, رب العالمين (অসংখ্য সৃষ্টি জগতের রব একমাত্র তুমিই) এ ঘোষণার জবাবে রাব্বুল আলামীন বলেন, إن الذين قالوا ربنا الله ثم استقاموا فلا خوف عليهم ولاهم يحزنون. (নিশ্চয়ই যারা আল্লাহকে রব ঘোষণা করে এবং তার উপর অটল থাকে, তাদের জন্য কোন ভয় নেই এবং কোন চিন্তাও নাই।)
এবার নামাজী বলছেন, الرحمن الرحيم (তুমি পরম দয়ালু পরম করুণাময়)
আল্লাহ তাআলা জবাব দিচ্ছেন, وسعت رحمتی كُلِّ شَيْ (আমার রহমত সমগ্র সৃষ্টি জগত পরিব্যাপ্ত করে নিয়েছে। অর্থাৎ আমি এমন রহমান যার রহমত ব্যতিরেকে সৃষ্টি জগতের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে।) وَكَانَ بالمؤمنين رحيما (আমি মু'মিনদের জন্য পরম করুণাময়)
এখন নামাজী বলছেন, مالك يوم الدين (তুমি বিচার দিবসের একমাত্র অধিপতি)
আল্লাহপাক এ কথার জবাব দিচ্ছেন, وما ادرك ما يوم الدين ثُمَّ مَا ادرك مَا يَوْمُ الدِّينِ يَوْمَ لَا تَمْلِكَ نفس لنفس شيئا والامر يومئذ لله. (বিচার দিবসটি কেমন তা কি করে তোমাকে বুঝায়? আবার বলি, বিচার দিবসটি কেমন তা কি করে তোমাকে বুঝায়? সেদিন আত্মরক্ষার জন্য কারো প্রভাব কার্যকরী হবে না। সমগ্র ব্যাপার নিরংকুশভাবে আমার এখতিয়ার ভুক্ত থাকবে।)
বিচার দিবসের এ ভয়ানক অবস্থা জানার পর নামাজীর মধ্যে ভীতি আর বিনয় বৃদ্ধি পায়। সাথে সাথে মহান বিচারপতির সমীপে নিবেদন করেন, إياك نعبد واياك نستعين. (হে মা'বুদ, আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি)
মহান মা'বুদ জবাব দিচ্ছেন, وما خلقت الجن والانس إلا ليعبدون (তোমাদেরকে আর জ্বিন জাতিকে এ উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি যে, তোমরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে কেবলমাত্র আমারই ইবাদত করবে) আর আমার সাহায্য কামনা করছ? তাহলে সুসংবাদ শুন, وكان حقا علينا نصر المؤمنين. (মু'মিন বান্দাদের সাহায্য করা আমি আল্লাহর জন্য ওয়াজিব) সকল বিপদ-মুসীবতে যথাযথ পদ্ধতির মাধ্যমে আমার কাছে সাহায্য চাও। সাহায্য অবশ্যই পাবে। আমি আল্লাহই সর্বোত্তম সাহায্যকারী। অন্য কেউ নয়)
এবার নামাজী বলছেন, اهدنا الصراط المستقيم (ওগো খোদা, আমাকে সরল-সোজা পথ প্রদর্শন কর) এর জবাবে আল্লাহপাক বলেছেন, وعلى الله قصد السبيل ومنها جائر (সরল-সোজা পথ প্রদর্শন করার দায়িত্ব আমি আল্লাহর, যেখানে রয়েছে অসংখ্য বক্রপথ) সেই সোজা পথের সন্ধান পেতে চাও? তাহলে শুন, وان اعبدوني هذا صراط مستقيم. (শুধুমাত্র আমারই বন্দেগী এবং দাসত্ব কর, এটাই সরল-সোজা পথ) আল্লাহর বন্দেগী এবং দাসত্ব (ইবাদত) করার অর্থ হচ্ছে- জীবনের প্রতিটি স্তরে এবং প্রতিটি বিষয়ে তারই আদেশ-নিষেধের সীমা মেনে চলা। এর নাম ইবাদত। উপসংহারে এসে নামাজী বলছেন, হে প্রভু, তোমার বন্দেগীর পথই হচ্ছে সরল- সহজ পথ, এ কথা বুঝেছি। কিন্তু আমার হৃদয়ের সর্বশেষ তামান্না হচ্ছে; صراط الذين انْعَمْتَ عَلَيْهِمْ (সেই সফলকাম বান্দাদের পথ চাই, যাদের প্রতি তুমি নেয়ামত বর্ষণ করেছ)
নামাজীর এহেন হৃদয়-আবেদনের জবাবে আল্লাহ বলছেন, আমি বুঝতে পেরেছি তুমি কাদের পথ পেতে চাও, ومن يطع الله والرسول فأولئك مع الذين انعم اللهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النبيين والصديقين والشهداء والصالحين وحسن أولئك رفيقا . (যে কেউ আমার ও আমার রাসূলের আনুগত্য করে, সে আমার নেয়ামত প্রাপ্ত বান্দাদের সহচর হতে পারবে। আর আমার নেয়ামত প্রাপ্ত বান্দারা হচ্ছেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ, সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। তারা কতই না উত্তম সহচর।) আমার পুরস্কার প্রাপ্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হতে চাও? তাহলে আমি আল্লাহ ও আমার রাসূলের অনুগত হয়ে পার্থিব জীবন পরিচালিত কর।
অবশেষে নামাজী আল্লাহ তাআলাকে ব্যাখ্যা করে বলছেন, غير المغضوب عليهم ولا الضالين. (যাদের প্রতি তোমার অভিশম্পাত বর্ষিত হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট, তাদের পথ চাই না)
এ কথার জবাবে আল্লাহপাক বলছেন; الا لعنة الله على الظالمين الذين يصدون عن سبيل الله ويبغونها عوجا . (সেই সব জালেম আমার অভিশম্পাত লাভ করেছে এ জন্য যে, তারা আমার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং আমার দ্বীনের পথে বক্রতা অন্বেষণ করে। ومن يبتغ غير الإسلام دينا فلن يقبل مِنْهُ وَهُوَ فِي الآخِرَةِ مِن الخاسرين. (ওরা আমার দেয়া জীবন ব্যবস্থা বাদ দিয়ে অন্য জীবন ব্যবস্থা (যেমন ধর্মনিরপেক্ষবাদ, সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ ইত্যাদি) তালাশ করে অথচ তাদের কাছে থেকে সেসব জীবন ব্যবস্থা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং পরকালে ওরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।)
এভাবে আল্লাহ্ আর নামাজীর মধ্যে মি'রাজ সংঘটিত হয়। নামাজী এক একটা করে আবেদন পেশ করেন। আর মহান মা'বুদ সে আবেদনের জবাব দেন। এ কথার সমর্থন মিলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর একটি হাদীসে।
عن أبي هريرة رضى الله عنه قال سمعت رسول الله صل الله عَلَيْهِ وَسَلَّم : قال الله تعالى قسمت الصلوة بيني وبين عبدي نصفين ولعبدي ما سألني فاذا قال العبد: الحمد لله رب العلمين قال الله تعالى: حمدني عبدي، واذا قال الرحمن الرحيم قال اثنى على عبدي، واذ قال مالك يوم الدين قال الله تعالى: مجدني عبدي، واذا قَالَ: إِيَّاكَ نَعْبُدَ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ قَالَ اللهُ تعالى: هذا بيني وبين عبدي وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ - فَإذا قال: اهدنا الصراط المستقيم صراط الذين أنعمت عليهم غير المغضوب عليهم ولا الضَّالِّينَ - قَالَ هذا العبدي ولعبدي ما سأل (مسلم)
Abu Huraira reported, I heard Allah's Messenger (S.A) as saying; Allah the Exalted said: I have divided the salat between Me and My servant in two halves and My servant will received as he asks for when the servant says, 'Praise is due to Allah, the Lord of the worlds. Allah says, 'My servant praises Me highly'. And when he says. 'The Most compassionate and the Most Merciful'. Allah says. 'My servant has lauded me'. And when he says. 'The master of the Day of Judgement'. Allah says, My servant has Exalted Me'. And when the servant says, you do we worship and of you we ask for help. He says, This is between Me and him and My servant will get what he asks for. And as he says, 'Direct us to the right path, the path of those on whom you have betwed your race- not of those who have incurred displeasure, nor of those who have gone astray, He (Aalh) says, 'This is for My servant and My servant will get what he asks for.
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, নামাজ আমার ও আমার বান্দার মধ্যে আধা-আধি ভাগ করা হয়েছে। আমার বান্দার ভাগে তাই হবে যা সে চায়। বান্দা যখন ‘আল-হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ বলে, তখন আল্লাহ পাক বলেন, আমার বান্দা আমার উচ্চ প্রশংসা করেছে। যখন সে বলে "আর-রাহমানির রাহীম" তখন আল্লাহ বলেন, সে আমার গুণ বর্ণনা করেছে। যখন সে ‘মা'লিকি ইয়াও মিদ্দীন’ বলে তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা আমার শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছে। যখন সে ‘ইয়্যাকানা'বুদু ও ইয়্যাকানাছতাঈন’ বলে, তখন আল্লাহ বলেন, এটা তো আমার ও আমার বান্দার মধ্যে পারস্পরিক ব্যাপার। আমার বান্দা সবই পাবে যা কিছু সে চেয়েছে। এরপর যখন সে (সূরার শেষাংশ) ‘ইহদিনা থেকে দোয়াল্লীন’ পর্যন্ত পড়ে তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, এসব আমার বান্দার জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট এবং আমার বান্দা যা কিছু পেতে চায় তাকে সবই দেয়া হবে। (মুসলিম)
সুতরাং নামাজীকে অত্যন্ত ভীতি ও বিনয় সহকারে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে হবে। ওজুর চার ফরজ, নামাজের তের ফরজ (আহকাম ও আরবান) ওয়াজিব এবং সুন্নাতগুলো যত্নের সাথে সম্পন্ন করতে হবে। নামাজের মধ্যে মহান আল্লাহর ধ্যানে একাকার হয়ে একনিষ্ঠ মনে নামাজ আদায় করতে হবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নির্ধারিত সময়ে আদায় করতে হবে। আজান শুনার সাথে সাথে পার্থিব কাজ স্থগিত করে মসজিদের দিকে ধাবিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে নামাজ আদায় করা হলে নামাজীর মধ্যে একটি শক্তি সৃষ্টি হয়, যার নাম আধ্যাত্মিক শক্তি (spiritual power) এবং নামাজের মধ্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নামাজীর প্রত্যেক আবেদনে সাড়া দিচ্ছেন, এ অনুভূতি জাগ্রত হয়।
অধিকন্তু নামাজীকে আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জনের জন্য ৬টি অপরিহার্য শর্ত পূরণ করতে হবেঃ ১. বৈধ (হালাল) টাকায় ক্রয় করা বৈধ খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করতে হবে। ২. পরিধানের কাপড় বৈধ (হালাল) টাকায় ক্রয় করা হয়েছে- এটা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. পিতা-মাতা বেঁচে থাকলে তাঁদের যথার্থ সেবা ও সম্মান সমুন্নত করতে হবে এবং না বেঁচে থাকলে সব সময় তাদের জন্য এ দোয়া করতে হবে, رب ارحمهما كما ربياني صغيرا. ৪. আপন স্ত্রীকে পর্দা মেনে চলার উপদেশ দান এবং তার সাথে ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলতে হবে। ৫. পরের হক (যদি পাওনা থাকে) যথাযথ হিসাব করে হস্তান্তর করতে হবে।
📄 সালাতের বৈজ্ঞানিক বিভাগ
واقيموا الصلوة وبشر المؤمنين. And establish salat and give Glad Tidings to those who believe. আর আপনি নামাজ প্রতিষ্ঠা করুন এবং একনিষ্ঠ বিশ্বাসীদের সুসংবাদ দান করুন। (ইউনুসঃ ৭-৮)
মানুষের শরীর যেন এক জটিল কারখানা। যেমন এর গঠন তেমনি বিচিত্র এর অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কাজ করার ক্ষমতা। গোটা মানব দেহ ৩৬০টি জোড়া (Joint) সন্ধিতে সংযুক্ত এবং প্রতিটি জোড়া সন্ধির নিয়মিত নড়াচড়া (Movement) অপরিহার্য। দেহের সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কাজ করার ক্ষমতা সংরক্ষণের জন্য রীতিবদ্ধ শরীর চর্চা (Systematic Physical exercise) মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক বিষয়। স্বাস্থ্য রক্ষার বিজ্ঞান ভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকে পরিস্কার উপলব্ধি করা যায় যে, নিয়মিত শরীর চর্চা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। যেমন, রোগ জীবাণু থেকে আত্মরক্ষার জন্য চোখের অশ্রু গ্রন্থি (Lacrimal gland) থেকে যে অশ্রু বের হয় তাতে আছে লাইসোজাইম (Lysozyme), যা চোখকে ধুয়ে পরিস্কার করে এবং রোগ জীবাণু ধ্বংস করে। মানুষের লালা এবং পাকস্থলী থেকে নির্গত হাইড্রোক্লোরিক এসিড (HCl) খাবারের সঙ্গে রোগ জীবাণু ঢুকলে তা আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়। স্নায়ুতন্ত্র প্রতিবর্তী ক্রিয়ার সাহায্যে ক্ষতিকারক উদ্দীপক থেকে আমাদের রক্ষা করে। রক্তের শ্বেত কণিকা (White blood corpuscle) রোগ জীবাণুর সাথে যুদ্ধ করে তাদের ধ্বংস করে ফেলে। তাছাড়া যকৃৎ, প্লীহা, লসিকা গ্রন্থি, টনসিল, তাইমাস, অস্থিমজ্জা (Red bone marrow), ইত্যাদি গ্রন্থিগুলো জীবাণু ধ্বংসের কাজে সদা সতর্ক থাকে। কিন্তু রোগ প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা হিসেবে এসব গ্রন্থির কার্যকারিতা সক্রিয় রাখার জন্য বিজ্ঞান ভিত্তিক শরীর চর্চা অপরিহার্য। মুসলিম বিজ্ঞানীরা বলেছেন, মুসলমানেরা শারীরিক Movement প্রক্রিয়ায় যে দৈনিক পাঁচ বার নামাজ আদায় করে তা এক অসাধারণ বিজ্ঞান ভিত্তিক শরীর অনুশীলন পদ্ধতি, যার ফলে একটি সক্ষম দেহ গড়ে ওঠে।
সক্ষম দেহ গড়ে তোলার জন্য আরো প্রয়োজন সুষ্ঠ রক্ত সঞ্চালন, অক্সিজেন (O₂) প্রবাহ এবং বিপাক (Metabolism)। পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে নিয়মিত নামাজ আদায়ের মাধ্যমে দেহের রক্ত সঞ্চালন, অক্সিজেন প্রবাহ এবং বিপাক ক্রিয়া স্বাভাবিক ও সক্রিয় থাকে। যার দরুন দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
রক্ত সঞ্চালন অর্থাৎ হৃদপিন্ডের সংকোচন ও প্রসারণের ফলে রক্ত দেহের মধ্যে গতিশীল থাকে। রক্তের গতিশীলতার উপর শারীরিক সক্ষমতা নির্ভরশীল। বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক প্রতিরূপ থেকে দেখা যায়, রক্ত সঞ্চালন স্বচ্ছ এবং স্বাভাবিক রাখার জন্য নামাজ আদায়ের পদ্ধতির চেয়ে উত্তম শারীরিক পদ্ধতি আর হতেই পারে না। কিয়াম (দাঁড়ানো) থেকে সেজদা পর্যন্ত যে দৈহিক Movement ঘটে তাতে মহাধমনী থেকে ধমনী, শাখা ধমনী ও কৈশিক জালিকার মাধ্যমে রক্ত সারা দেহে সংবহিত হয়। এর মধ্যে শাখা ধমনী ও কৈশিক জালিকায় যদি কোথাও চর্বি জমাট বাঁধে কিংবা স্ফীত অংশ থাকে, যা রক্ত সঞ্চালনে বিঘ্ন ঘটায়, নিয়মিত সালাত আদায়ের ফলে স্ফীত ধমনী বা জমাট বাঁধা চর্বি ধীরে ধীরে মুক্ত হয় এবং সকল ধমনী তন্ত্রের স্বাভাবিক অবস্থা বজায় থাকে। আবার শরীরে যে অসংখ্য কোষ (Cell) রয়েছে, ঐসব কোষের ভেতরে অক্সিজেনের সাহায্যে খাদ্য দহন করে শক্তি তৈরী হয়। এ সময় প্রথমে খাবারের জটিল অণু ভেঙ্গে যায় সরল অণুতে। পরে তা অক্সিজেনের সাহায্যে দহনের ফলে শক্তি উৎপন্ন করে। এ প্রক্রিয়ার নাম বিপাক (metabolism)। বিপাক সংগঠিত হওয়ার জন্য দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করা জরুরী। দৈনিক পাঁচবার নামাজ আদায়ের দরুন দৈহিক Movement থেকে যখন শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে তখন বিপাকের হারও বেড়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে কোষে O₂ ঢুকার হারও বৃদ্ধি পায়।
এখন নামাজ আদায়ের শারীরিক পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে দেখি
কিয়ামঃ সক্ষম দেহের অধিকারী নামাজীকে স্থির দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে হয়। এর নাম কিয়াম। এ সময় কোরআনের আয়াত পাঠ করা হয় বলেই মস্তিস্ক Speech centre সক্রিয় থাকে। হৃদয়-মন এক আল্লাহর দিকে এবং চোখ দু'টি সেজদার স্থান বরাবর নিবদ্ধ থাকে। কিয়াম অবস্থায় অভিকর্ষ শক্তির (earth gravity) টানে বেশীর ভাগ রক্ত পায়ের দিকে নেমে যায়। ফলে হৃদপিন্ডে রক্ত ফেরৎ যাওয়া বা Venus Return বিলম্বিত হয়। যার কারণে ক্ষণিকের জন্য হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং শারীরিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর ফলে বিপাক ক্রিয়া দ্রুত ঘটে এবং কোষের ভিতর শক্তি তৈরী হয়।
রুকুঃ কিয়াম থেকে সামনের দিকে বাকা হয়ে অবনত হওয়ার নাম রুকু। রুকু করার জন্য হাত দু'টি হাঁটু-সন্ধির (knee joint) উপর এমনভাবে রাখতে হয় যেন হাতের আঙুলগুলি ছড়ানো থাকে এবং পিঠ আর মাথা ভূমির সাথে সমান্তরাল (parallel) রেখায় থাকে। এ অবস্থায় মেরুদন্ডের ৩৩টি কশেরুকা (Vertebrae) প্রভাবিত হয়। এদের মধ্যে ঘাড়ের কাছে ৭টি সার্ভাইকাল (cervical), বুকের কাছে ১২টি থোরাসিক (thoracic), কোমরের কাছে ৫টি লাম্বার (Lumbar) ও ৫টি স্যাক্রাল (sacral) এবং একদম শেষে ৪টি হাড় মিশে একটি ককসিজিয়াল (coccygeal) নিয়মিত রুকু করার দরুন এসব হাঁড়ে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে এবং বদ্ধাবস্থায়ও দেহের ভারসাম্য অটুট থাকে।
তাই আল-কোরআন বলছে,
وَاقِيمُوا الصَّلَوةَ وَاٰتُوا الزَّكٰوةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرّٰكِعِين.
And Perform the Salat and practise regular charity and bow down your heads with those who bow down.
নামাজ কায়েম কর, যাকাত আদায় কর এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু কর। (বাকারাঃ৪৩)
সেজদাঃ দু'পা, দু' হাঁটু, দু'হাত এবং নাক আর কপাল ভূমিতে ঠেকিয়ে একমাত্র প্রভু মহান আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের নাম সেজদা। তখন ভূমির উপর সাতটি অঙ্গ ক্রমান্বয়ে রাখতে হয়। প্রথমে দু'পা, তারপর দু' হাঁটু, এরপর দু'হাত। সব শেষে নাক আর কপাল। ভূমিতে হাত দু'টি এমনভাবে রাখতে হয় যেন তা কান বরাবর থাকে এবং দৃষ্টি থাকবে নাকের আগার দিকে। এ সময়ে শরীরের ৩৬০টি জয়েন্ট ও ২০৬টি হাড় সমানে প্রভাবিত হয় এবং মস্তিস্কের অতি সূক্ষ্ম কৌশিক জালিকায় রক্ত প্রবাহিত হয়। শরীরের সর্বত্র রক্ত প্রবাহিত হওয়ার অর্থ সুস্থ দেহের পূর্ব শর্ত। সেজদাবনত অবস্থায় আল্লাহপাকের তছবীহ পড়া হয়। আর দেহের অভ্যন্তরে ঘটে স্নায়ু-গঠিত প্রতিক্রিয়া। যেমন শব্দ কিংবা আলোর মত যেসব মাধ্যম বাইরের পরিবেশের খবর আমাদের জানায় তাদের বলা হয় উদ্দীপক (stimulus)। চোখ, কান, নাক, ত্বক এরা উদ্দীপকের Receptor বা গ্রাহকের কাজ করে। চোখ দিয়ে আমরা দেখি, কান দিয়ে শুনি, নাকের সাহায্যে গন্ধ নিই এবং ত্বকের সাহায্যে অনুভব করি। এসব গ্রাহক থেকে খবর সেন্সরি নার্ভ (sensory nerve) দিয়ে পৌছে যায় কেন্দ্রীয় নার্ভ তন্ত্রে, অর্থাৎ মস্তিস্কে। কেন্দ্রীয় নার্ভতন্ত্রের সংকেত মোটর নার্ভ (motor nerve) দ্বারা ফেরৎ আসে ইফেক্টর অর্গানে (effector organ)। অর্থাৎ শরীরের যে অংশে প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে সে অংশে উদ্দীপকের মাধ্যমে গ্রাহক, খবর সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় নার্ভ তন্ত্রে পাঠানো এবং কেন্দ্রীয় নার্ভ তন্ত্রের নির্দেশে চোখে দেখা, কানে শুনা এবং ত্বকে অনুভব করার কাজ চলে। নামাজের মধ্যে মনের একাগ্রতা এক আল্লাহর দিকে নিবদ্ধ থাকে যার দরুন বাইরের পরিবেশ থেকে উদ্গত উদ্দীপনা নামাজীর স্নায়ু তন্ত্রে ক্ষতিকর আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে না।
বৈঠকঃ নামাজ শেষ করার জন্য ডান পা খাড়া রেখে এবং বাম পা বিছিয়ে দিয়ে তার উপর বসে নির্দিষ্ট দোয়া-দরূদ পাঠ করতে হয়। এর নাম শেষ বৈঠক। বিশ্ব নবী জনাবে মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর পরিবার-পরিজনদের উপর যেমন দরূদ পাঠ করতে হয়, তেমনি মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর পরিবার-পরিজনদের প্রতিও দরূদ পাঠ করতে হয়। এ সময় ডান পায়ের আঙুলগুলি পশ্চিম দিকে বক্র করে রাখা হয়। হাত দু'টি দু'উরুর উপর থাকে এবং দৃষ্টি থাকে কোলের দিকে। আর এতক্ষণ কিয়াম এবং সেজদা করার ফলে দেহের যে অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় হয়েছে শেষ বৈঠকের সময় তা তৈরী হয়। এ সময় অক্সিজেনের সাহায্যে বেশী গ্লুকোজ দহন করে শক্তি উৎপাদন হতে থাকে। তখন বাড়তি অক্সিজেন জোগানোর জন্য শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বেড়ে যায়। অক্সিজেনকে বয়ে নিয়ে কোষে পৌছে দেয়ার দায়িত্ব রক্তের লোহিত রক্ত কণিকা হিমোগ্লোবিনের। হিমোগ্লোবিনের সংখ্যা নির্দিষ্ট হওয়ায় কিছুক্ষণ পরে রক্তের আর অক্সিজেন পরিবহন ক্ষমতা থাকে না। যতক্ষণ অক্সিজেনের সঙ্গে খাদ্য দহন করে শক্তি তৈরীর কাজ চলে ততক্ষণ এ পদ্ধতিকে বলে সবাত শ্বসন (aerobic respiration)। শরীর যখন আর অক্সিজেন নিতে পারে না তখন শুরু হয় অবাত শ্বসন (anaerobic respiration)। সবাত শ্বসনের সময় গ্লাইকোলিসিস (glycolysis) পদ্ধতিতে গ্লুকোজ ভেঙ্গে পাইরুভিক এসিড তৈরী হয়। অক্সিজেনের সাহায্যে এ পাইরুভিক এসিড বিপাক পদ্ধতির সাহায্যে পানি (H₂O) আর কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) তৈরী করে। সেই সঙ্গে তৈরী হয় শক্তি।
অতএব, যারা নিয়মিত দিনে পাঁচবার নামাজ আদায় করেন, তারা আল্লাহপাককে সেজদা করতে গিয়ে বিরাট দৈহিক কল্যাণ লাভ করে থাকেন, তা অনেকেই অনুধাবন করতে পারেন না। এ নামাজের ভেতরে এমন শারীরিক কল্যাণ নিহিত আছে, যা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের উন্নয়নের ফলে এখন স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু নামাজ পড়তে হবে একমাত্র আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের উদ্দেশ্যে। কেউ যদি শারীরিক কল্যাণের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়েন তাহলে তার নামাজ আল্লাহ তাআলা গ্রহণ করবেন না। কেননা নামাজ আদায়ের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সেজদা করতে গিয়ে দৈহিক কল্যাণ সাধিত হয়, যাকে বলা হয় একের ভিতর অনেক। এভাবে দেখা যায় আল্লাহ প্রদত্ত সকল বিধি-বিধান আমরা পালন করি তার আনুগত্য করার জন্য। এসব বিধানের মধ্যে যে কল্যাণ ও উপকার রয়েছে তা ঈমানদার-জ্ঞানী লোকেরাই বুঝতে পারেন, সেজন্য পরম হিতৈষী আল্লাহ তাআলা নামাজী লোকদের সুসংবাদ জানিয়ে দিয়েছেন। অধিকন্তু তাদের জন্য পরকালীন প্রতিদান তো আছেই।
واقيموا الصلوة وبشر المؤمنين.
And be steadfast in prayer and give Glad Tidings to those who believe.
নামাজের প্রতি একনিষ্ঠ হও আর বিশ্বাস স্থাপনকারীদের সুসংবাদ দান কর। (ইউনুস-৮৭)
📄 সালাতের রাজনৈতিক বিভাগ
সালাতের রাজনৈতিক বিভাগ
মহানবী (সাঃ) বলেছেন,
الصلوة عماد الدين فمن اقامها فقد اقام الدين ومن تركها فقد هدم الدين.
সালাত হচ্ছে দ্বীনের স্তম্ভ। যে ব্যক্তি সালাত কায়েম করে, সে দ্বীনকে কায়েম করে, আর যে ব্যক্তি সালাত পরিত্যাগ করে, সে দ্বীনকে পরিত্যাগ করে। (বুখারী, মুসলিম)
বিশাল একটি ভবন যেমন স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনি গোটা দ্বীন প্রতিষ্ঠিত থাকে নামাজের উপর। স্তম্ভবিহীন প্রাসাদ যেমন স্থায়ী হয় না, তেমনি নামাজবিহীন দ্বীন কল্পনাও করা যায় না। দ্বীন এমন এক জীবন ব্যবস্থার নাম যা আল্লাহপাক কর্তৃক মনোনীত এবং এ জীবন ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, বিচার নীতি এবং আন্তর্জাতিক নীতি বিধৃত আছে।
রাষ্ট্র বিজ্ঞানে বলা হয়েছে, একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য চারটি শর্ত প্রয়োজন:
১. নির্দিষ্ট একটি ভূ-খণ্ড।
২. সেই ভূ-খণ্ডের স্বাধীন সার্বভৌমত্ব।
৩. কিছু জনসাধারণ।
৪. এবং একটি নির্বাচিত সরকার।
এ চারটি শর্ত পরিপূর্ণ হলেই একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠিত হয়। নামাজের মধ্যে এ চারটি শর্ত এঁটে দেওয়া হয়েছে। তা কীভাবে এঁটে দেওয়া হয়েছে, যেমন নামাজ আদায়ের জন্য প্রয়োজন:
১. একটি নির্দিষ্ট ভূ-খণ্ড।
এটি চার দেওয়াল বিশিষ্ট হতে পারে অথবা উন্মুক্তও হতে পারে, যাকে আমরা মসজিদ বলি। (আবার অখণ্ড ভূমির গোটা পৃথিবীও আল্লাহর মসজিদ)
২. ভূ-খণ্ডটি স্বাধীন সার্বভৌম।
কেউ মসজিদের জন্য জমি দান করলে, দান করার সাথে সাথে তার মালিকানা বাতিল হয়ে যায়। এর মালিক হন আল্লাহ এবং এটি সবার জন্য অবারিত থাকে। (আবার অখণ্ড ভূমির পৃথিবী সকল নামাজীর জন্য অবারিত)
৩. কিছু জনসাধারণ:
মসজিদ রাষ্ট্রের জনসাধারণ হচ্ছে মুসল্লীবৃন্দ।
৪. এবং একটি নির্বাচিত সরকার:
মসজিদ রাষ্ট্রের সরকার গঠিত হয় খতিব, পেশ ইমাম, মুয়াজ্জিন, মুতাওয়াল্লী ইত্যাদি ব্যক্তিদের নিয়ে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার যদি ভুল-ভ্রান্তি করে, জনগণ তার প্রতিবাদ করার অধিকার রাখে। অর্থাৎ সরকারের ভুল নীতির প্রতিবাদ করার সুযোগ পায় জনগণ।
মসজিদের প্রেসিডেন্ট (ইমাম) নামাজে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় যদি আল্লাহর আয়াত ভুল পাঠ করেন কিংবা ১৩টি ফরজ অথবা ১৪টি ওয়াজিবের মধ্যে যে কোনো একটি লঙ্ঘন করেন, তখন পিছন দিক থেকে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে। অর্থাৎ আমাদের প্রভু নির্ভুল, অতি উচ্চ মহান। ইমাম সাহেব, আপনার ভুল সংশোধন করেন।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার যদি স্বৈরনীতি অবলম্বন করে, অর্থাৎ জনগণের প্রতিবাদ পরামর্শ কর্ণপাত না করে, স্বৈরাচারী (Autocracy) ভূমিকায় রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তখন গণ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়।
কী অনুপম গণতন্ত্র আল্লাহপাক নামাজের মধ্যে বেঁধে দিয়েছেন, যা অন্য কোনো জীবন ব্যবস্থায় পাওয়া যাবে না! তাই ইসলামী সরকারের জন্য কোরআন মজীদে যে চার দফা কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়েছে, তার প্রথম দফা হচ্ছে নামাজ।
الذين أن مكنهم في الأرض أقاموا الصلوة وآتوا الزكوة وأمروا بالمعروف ونهوا عن المنكر.
আমার মু'মিন বান্দারা এমন, যখন আমরা পৃথিবীতে তাদেরকে ক্ষমতা দান করি (তারা যখন কোনো দেশে ক্ষমতাসীন হয়), তখন তারা চার দফা কাজ সম্পাদন করে। প্রথম দফায় নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, দ্বিতীয় দফায় যাকাত আদায় করে, তৃতীয় দফায় সৎ কাজের আদেশ করে এবং চতুর্থ দফায় অসৎ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখে। (হজ্ব-৪১)
রাষ্ট্র ক্ষমতা লাভ করার পর ইসলামী সরকারের প্রথম কাজ হচ্ছে নামাজ প্রতিষ্ঠা করা। নামাজ ব্যতীত একটি রাষ্ট্রে শান্তি, সন্ধি, নিরাপত্তা, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। নামাজ যেমন গণতন্ত্রের গ্যারান্টি, তেমনি স্বাধীনতারও গ্যারান্টি।
তাই আমীরুল মু'মিনীন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) খেলাফতের দায়িত্ব লাভ করার পর সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি নামাজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পত্র লিখে পাঠান।
ان عمر بن الخطاب رضى الله عنه كتب الى عماله أن أهم أمركم عندي الصلوة فمن حفظها وحفظ عليها حفظ دينه ومن ضيعها فهو لما سواها اضيع.
হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) তার খেলাফতের সময় কর্মকর্তাদের প্রতি এ মর্মে লিখে পাঠান যে, তোমাদের যাবতীয় কাজের মধ্যে আমার নিকট সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে নামাজ কায়েম করা। যে ব্যক্তি নামাজকে রক্ষা করে ও তা সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করে, সে তার দ্বীনকে রক্ষা করে। আর যে ব্যক্তি নামাজ বিনষ্ট করে, সে নামাজ ছাড়াও অন্যান্য সব আদর্শ নষ্ট করে। (মুয়াত্তা মালিক)
📄 সমাজ জীবনে সালাতের প্রভাব
সমাজ জীবনে সালাতের প্রভাব
إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ Surely The Salat restrains from shameful and unjust deeds.
নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। (আনকাবুত-৪৫)
মানুষ সমাজ প্রিয় জীব। সমাজবদ্ধ জীবন যাপন মানুষের একটি সহজাত প্রবণতা। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নিবেদিত সমাজবিদরা নানারকম পথ আর মত অবলম্বন করে থাকেন। তারপরেও নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, বিপর্যয়, অন্যায়-অসত্য এবং অশ্লীলতায় গোটা সমাজ আকণ্ঠ নিমজ্জিত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সামাজিক বিপর্যয়ের সাথে একাকার হয়ে বসবাস করছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং মাস্তানি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব নেতিবাচক প্রবণতার শিকার হয়ে যুব সমাজ তিমির দিগন্তে হারিয়ে যাচ্ছে। ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা, আলো-আঁধার পার্থক্য করার বোধশক্তি এখন তাদের নেই বললেই চলে। কিন্তু এ সর্বগ্রাসী বিপর্যয় থেকে ফেরার পথ আছে কি?
ইসলামে নামাজ এমন শক্তিশালী বিধান যা অন্যায়, অসত্য এবং অশ্লীলতা থেকে বের করে এনে খাঁটি সোনার সুপ্রিয় মানুষ বানিয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করলে ব্যাপারটি উপলব্ধি করা সহজ হবে।
বাগদাদ শহরের একটি মসজিদের পেশ ইমাম, তাঁর স্ত্রী ছিল অত্যন্ত সুন্দরী, রূপসী এবং সুনয়নী। স্থানীয় এক দুর্দান্ত মাস্তান যুবক হঠাৎ একদিন ইমাম সাহেবের স্ত্রীকে দেখে তার প্রতি ভীষণ আসক্ত হয়ে পড়ে এবং এরপর রীতিমতো তাকে বিরক্ত করতে থাকে।
একদিন ইমাম সাহেবের বাড়িতে প্রবেশ করে যুবক বলল,
হে সুন্দরী মহিলা, আমি ইতিমধ্যে তোমার প্রতি খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছি। তাই আমার কামনা চরিতার্থ করার জন্য প্রস্তাব দিচ্ছি। তুমি কি আমার প্রস্তাবে রাজি?
মাস্তান যুবকের প্রস্তাব মহিলা নীরবে শুনলেন এবং ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলেন। রাতে যখন স্বামী ঘরে ফিরলেন, যুবকের প্রস্তাবিত কথাগুলো তার কাছে বর্ণনা করলেন। ইমাম সাহেব বললেন, তুমি রাজি হয়ে যাও। তবে একটি শর্তে। যদি সে একটানা চল্লিশ দিন আমার মসজিদে জামাআত সহকারে নামাজ আদায় করে এবং এ শর্ত আগে পূরণ করে, তাহলে তুমি বলবে, আমি রাজি।
পরের দিন যুবক এসে জিজ্ঞেস করল, আমার প্রস্তাবের সম্মতি পাব কি?
মহিলা বললেন, একটি শর্তের ভিত্তিতে আমি তোমার প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারি। শর্তটি হচ্ছে কোন বিরতি না দিয়ে একটানা চল্লিশ দিন আমার স্বামীর মসজিদে জামাআত সহকারে নামাজ আদায় করতে হবে। তারপর আমার কাছে আসবে।
যুবক বলল, এটা তো অতি সহজ শর্ত। এর চেয়েও কঠিন শর্ত দিলে আমি মেনে নিতাম।
এবার যুবক পাক পবিত্র সুন্দর পোশাক পরিধান করে নামাজ পড়তে লাগলো। ইমাম সাহেব মুনাজাত করে বললেন, হে আল্লাহ তাআলা 'এক পথহারা যুবককে তোমার দরবারে এনেছি। এখন পথ প্রদর্শন করার মালিক তুমি।'
যুবক শর্ত মোতাবেক জামাআত সহকারে নামাজ আদায় করে যাচ্ছে। ফজরের পর জোহরের অপেক্ষা করে। জোহরের পর আছর। এরপর মাগরিব। এরপর এশা। কোন বিরতি নেই নামাজে। এভাবে চল্লিশ দিন পার হয়ে গেল।
অতঃপর এ যুবক ইমাম সাহেবকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলো এবং বলল: আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি অন্ধকার পথে বিভ্রান্ত হয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম। আল্লাহপাক আমাকে আলোর পথ দান করেছেন। সুপথ দান করেছেন। আমাকে দয়া করে মাফ করে দিন।
এবার ইমাম সাহেব যুবককে নিয়ে মুনাজাত ধরলেন:
رَبَّنَا لاَ تُزِغْ قُلُوْبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ اَنْتَ الْوَهَّابُ.
Our Lord, let not our hearts deviate after you have guided us, and grant us mercy from You. Truly you are the granter of Bounties without measure.
হে খোদা পরওয়ারদেগার! সুপথ প্রদর্শন করার পর আমাদের অন্তরকে আর বক্র করে দিও না। আর আপনার নিকট থেকে আমাদেরকে করুণা দান করুন। কারণ আপনি অসীম করুণার আধার। (ইমরান-৮)
اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ.
Recite what is sent of the Book by revelation to you and establish regular salat, for salat restrains from shameful and unjust deeds.
(হে মুহাম্মদ) আপনার প্রতি যে গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি তা পাঠ করুন এবং সালাত কায়েম করুন। কেননা সালাত অশ্লীল এবং অশোভন কাজ থেকে বিরত রাখে। (আনকাবুত-৪৫)
অতএব, সালাত এমন একটি শক্তিশালী রুকন যা মানুষকে অন্যায়, অসত্য এবং অশোভন কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। গহীন অন্ধকার থেকে বের করে উদ্ভাসিত আলোর দিকে ধাবিত করে। যদি সালাত অন্যায়, অবিচার এবং অশ্লীল কাজ থেকে কোন নামাজীকে বিরত করেনি, তাহলে বুঝতে হবে তার নামাজ লোক দেখানো নামাজ। এ নামাজ আল্লাহর দরবারে কবুল হচ্ছে না। নামাজীর পরিধানের কাপড় যদি হালাল টাকায় কেনা না হয়, নামাজী দৈনন্দিন যে খাবার গ্রহণ করে তা যদি হালাল টাকায় ক্রয় করা না হয়, নামাজী যদি পরের হক ঠিকভাবে ফেরত না দেয়, নামাজীর ঘরের মা-বোনেরা যদি পর্দা মেনে না চলে, নামাজী যদি পিতা-মাতার অবাধ্য হয়, নামাজীর উপর যাকাত ফরজ কিন্তু যাকাত হিসাব করে আদায় করে না। তাহলে কেমন করে এ ধরনের নামাজীর নামাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে? যখন সালাত আল্লাহ তাআলা গ্রহণ করেন না তখন সালাত আদায় করা সত্ত্বেও কোন কোন নামাজী অন্যায়, অসত্য থেকে ফিরে আসে না।