📄 মুকাত্তাআতের ব্যতিক্রমধর্মী প্রয়োগ
মুকাত্তাআতের ব্যতিক্রমধর্মী প্রয়োগ
শুধু ক্বাফ অক্ষর দিয়ে শুরু হয়েছে সূরা ক্বাফ। আল্লাহ তাআলা কোরআনের বারোটি স্থানে লুত সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করেছেন এবং প্রতিবারে সম্বোধন করেছেন قوم لوط (কুওমে লুত) বাক্যাংশ দ্বারা। কিন্তু সূরা ক্বাফ এর ১৩ নং আয়াতে এসে اخوان نوط (ইখওয়ানু লুত) সম্বোধন ব্যবহার করেছেন। অর্থের দিক থেকে ক্বাওমে লুত (লুতের স্বজাতি) যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে ইখওয়ানু লুত (লুতের ভাইয়েরা বা অনুগামীরা) একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এ ব্যতিক্রম বিষয়টির কারণ হচ্ছে সূরা ক্বাফ এর ১৩ নং আয়াতে ক্বাওমুল লুত শব্দ ব্যবহার করলেও এর সংখ্যা হয় ৫৮টি, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়। সে জন্য ইখওয়ানু লুত শব্দ ব্যবহার করে এর সংখ্যা ৫৭ করা হয়েছে। যেন ১৯ দ্বারা বিভাজ্য হয়।
এবার ص বর্ণটি তিনটি সূরার মুকাত্তাআতে ব্যবহৃত হয়েছে। সূরাগুলি হচ্ছে- আ'রাফ, মরিয়াম এবং ছোয়াদ।
১। সূরা আ'রাফ-এ ص ব্যবহৃত হয় মোট = ৯৭ বার
২। সূরা মরিয়াম-এ ص ব্যবহৃত হয় মোট = ২৬ বার
৩। ছোয়াদ-এ ص ব্যবহৃত হয় মোট = ২৯ বার
যোগফল = ১৫২ বার
১৫২ ÷ ১৯ = ৮
এখন বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, আরবী 'বাছতাতান' (بسطة) শব্দের বানান (Spelling) লিখা হয় সাধারণতঃ বা, সীন, ত্বোয়া ও তা দিয়ে (بسطة)। যেমন সূরা বাকারার ২৪৭ নং আয়াতে এ শব্দটি এসেছে।
قَالَ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَةً بَسْطَةً فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
কিন্তু সূরা আ'রাফের ৬৯ নং আয়াতে বাছতাতান শব্দের বানান এসেছে, বা, ছোয়াদ, ত্বোয়া এবং তা সহকারে এবং ছোয়াদ এর উপর ছোট্ট করে একটি ছিন (س) বসানো হয়েছে।
في الخلق بَصْطَة
এতে করে 'বাছতাতান' (প্রদান করা) শব্দের অর্থের কোন তারতম্য ঘটেনি। এ প্রয়োগ বিধির তাৎপর্য হচ্ছে, সূরা আ'রাফের সংশ্লিষ্ট আয়াতে ص দ্বারা بصطة শব্দটি গঠিত না হলে আলোচ্য সূরা তিনটিতে (আ'রাফ, মরিয়াম, ছোয়াদ) একটি 'ছোয়াদ' কম হতো। ফলে উনিশের (১৯) ফর্মূলা ব্যর্থ হয়ে যেত।
এভাবে মহান আল্লাহ তাআলা সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব আল-কোরআনকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করেছেন। উপরন্তু উনিশের গাণিতিক বন্ধন এবং মুকাত্তাআত সমূহের কৌশলগত প্রয়োগ বিধি থেকে আল-কোরআনের অলৌকিকত্ব প্রমাণিত হয়। এ গ্রন্থের Purity-র নিশ্চয়তা হচ্ছে, আল-কোরআনের হুবহু কপি 'উম্মুল কিতাব' এ সংরক্ষিত আছে। উম্মুল কিতাব অর্থ আসল কিতাব। অর্থাৎ যেখান থেকে নবীদের প্রতি কিতাবে ওহী অবতীর্ণ হয়েছে। সূরা ওয়াকিয়ায় এটাকে বলা হয়েছে 'কিতাবিম্ মাকনূন' (সুরক্ষিত গ্রন্থ)। সূরা বুরুজে বলা হয়েছে, 'লওহে মাহফুজ' (সংরক্ষিত ফলক)।
وَإِنَّهُ فِي أُمِّ الْكِتَابِ لَدَيْنَا لَعَلِيٌّ حَكِيمٌ
And verily it is in safe custody with Us in the Mother Book, indeed exalted and full of wisdom.
অবশ্যই ইহা আমাদের নিকট উম্মুল কিতাবে সুরক্ষিত রয়েছে, অতীব উচ্চ মর্যাদার এবং প্রজ্ঞাময় কিতাব। (যুখরুফ-৪)
وَإِنَّهُ لَقُرْآنَ كَرِيمٌ . فِي كِتَبٍ مَكْنُونٍ
That this is indeed a Quran most honourable in a Book well guarded.
অবশ্যই ইহা অতি সম্মানিত কোরআন যা একটি সুরক্ষিত গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে। (ওয়াকিয়াঃ৭৭-৭৮)
لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَتِ اللَّهِ . ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ.
No change can there be in the words of Allah - This is indeed the supreme felicity.
আল্লাহর বাক্যসমূহ পরিবর্তন হবার নয়, ইহা এক মহা সাফল্য। (ইউনুচ-৬৪)
আল-কোরআন অধ্যয়ন করে যুগে যুগে পৃথিবীর জ্ঞানী লোকেরা এর বিশুদ্ধতা এবং অলৌকিকতার উপর যেসব মন্তব্য করেছেন তার কয়েকটি এখানে উদ্ধৃত করা হলো:
The Quran, the Bible and Science গ্রন্থের প্রণেতা, Dr. Maurice Bucaille বলেন, "There is not a single verse in the Holy Quran which is assailable from the scientific point of view". (বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাংঘর্ষিক একটি বাক্যও পবিত্র কোরআনে নেই।)
বিশ্ববিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা Gibbon বলেছেন, "The creed of Mohammad (s.a.w) is free from the suspicions of ambiguity and the Quran is a glorious testimony to the unity of God". (মুহাম্মদ (সাঃ) এর ধর্মমত সব সন্দেহ সংশয় থেকে মুক্ত এবং আল-কোরআন হচ্ছে স্রষ্টার একত্বের এক উজ্জ্বল দলিল)।
উনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ লেখক টমাস কারলাইল কোরআন অধ্যয়ন করে অভিভূত হয়ে বলেছেন- "The words of such a book is a voice from nature's own heart. Men do and must read to that, as to nothing else, all else is wind in comparison" (এমন এক গ্রন্থের কথা যেন তা প্রকৃতির অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত। মানুষ তা পড়ছে এবং অবশ্যই এটাই তাদের পড়তে হবে। অন্য কিছু নয়। এর তুলনায় অন্য সব গ্রন্থ ফুৎকার সম)।
"কেবল মাত্র কোরআনই একমাত্র গ্রন্থ যাতে ১৩০০ বৎসরের ব্যবধানেও কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ইহুদী ও খৃস্টানদের এমন কোন নির্ভরযোগ্য ধর্ম গ্রন্থ নেই যা আদৌ কোন দিক থেকে কোরআনের সমকক্ষ হতে পারে" (ঐতিহাসিক বাডলে)।
The Quran is powerful enough to conquer the hearts. (মানুষের হৃদয় জয় করার জন্য কোরআন মোহনী শক্তির অধিকারী) (O'Leary)
"আরবী ভাষায় অবতীর্ণ কোরআন শরীফ অতি মনোমুগ্ধকর এবং আকর্ষণীয়। এর বাক্য বিন্যাস পদ্ধতি ও প্রকাশভঙ্গি চমৎকার বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ। কোরআনের ভাবধারা অন্য ভাষায় যথাযথ রূপান্তর অতিশয় মুশকিল।" (The wisdom of the Quran-Jhon fash)
"আমি কোরআনের শিক্ষা সমূহের উপর গবেষণা করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, কোরআন অবশ্যই নাজিলকৃত আসমানী কিতাব এবং উহার শিক্ষা সমূহ মানব স্বভাবের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।" (গান্ধী)