📘 Biggan moy quran > 📄 পরিমাপ সহায়ক

📄 পরিমাপ সহায়ক


মহাকাশে কোটি কোটি কিঃ মিঃ ব্যবধানে অবস্থিত নক্ষত্রগুলির দূরত্ব নির্ণয় করা একটি কঠিন বিষয় ছিল। শক্তিশালী টেলিস্কোপের সাহায্যে ১১০০০ মিলিয়ন আলোক বর্ষ পর্যন্ত দেখা যায়। হাবল টেলিস্কোপ দ্বারা M100 গ্যালাক্সি পর্যন্ত দূরত্ব নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু মহাবিশ্বের অন্তহীন প্রান্তে যে সকল নক্ষত্রমণ্ডলির দূরত্ব আমাদের গ্যালাক্সির থেকে ঐ সব নক্ষত্রমণ্ডলির দূরত্ব কিভাবে নির্ণয় করা যায়।

নক্ষত্রগুলি পর্যবেক্ষণ করতে করতে বিজ্ঞানীরা দেখলেন যে কোনো কোনো নক্ষত্রের উজ্জ্বলতার তারতম্য ঘটে অর্থাৎ নক্ষত্রগুলি কখনো অতি উজ্জ্বল কখনো মৃদু উজ্জ্বল চরিত্র প্রদর্শন করে থাকে। আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে 300000 কিঃ মিঃ। এ হিসেবের ভিত্তিতে তীব্র আলোক রশ্মি আর মৃদু রশ্মির গতিবেগের দূরত্বে একটি পার্থক্য ধরা পড়ল। এ পার্থক্যটুকু হিসাব করে বিজ্ঞানীরা একটি নক্ষত্র থেকে অন্য নক্ষত্রের দূরত্ব এবং আমাদের গ্যালাক্সি থেকে দূরবর্তী গ্যালাক্সির দূরত্ব পরিমাপ করার একটি সহজ কৌশল পেয়ে গেলেন। দূরত্ব মাপার এ কৌশলকে বলা হয় স্পেকট্রোস্কোপি। অর্থাৎ বর্ণালী বিশ্লেষণ (Spectroscopic Analysis) পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে নক্ষত্রসমূহের দূরত্ব পরিমাপ করা সহজ এবং নিখুঁতভাবে তা করা হয়।

অতএব নক্ষত্রের আলোক রশ্মি বিশ্লেষণ করে দূরত্ব মাপার কৌশল সম্পর্কে আল-কোরআন বলছে।

وَالسَّمَاءِ رَفَعَهَا وَوَضَعَ الْمِيزَانَ.
And the firmament has He raised it high and He has set up the balance.
অতএব, তিনি আকাশকে সুউচ্চ করেছেন এবং সেখানে পরিমাপ সহায়ক স্থাপন করেছেন। (রহমান-৭)

আরবী মিজান (میزان) শব্দের অর্থ Balance, মানদণ্ড, Measure, Metre, পরিমাপ সহায়ক ইত্যাদি। আকাশের সাথে যেহেতু মিজান শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তাহলে বুঝতে হবে এখানে চাল, ডাল, মাছ, মাংস প্রভৃতি পরিমাপ করার দাঁড়িপাল্লার কথা বলা হয়নি। নক্ষত্রের দূরত্ব নির্ণয় করার জন্য মহাকাশে যে সকল নক্ষত্র মাইলফলক হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে, নিশ্চয়ই সেসব পরিমাপ সহায়ক নক্ষত্রের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এটা স্পষ্ট।

📘 Biggan moy quran > 📄 মানব শরীর

📄 মানব শরীর


একজন সাধারণ মানুষ কখনো কি নিজের দিকে তাকায়? তার আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে সে কি চিন্তা ভাবনা করে? একটি মাত্র কোষ (Cell) থেকে কিভাবে এ বিশাল দেহ গড়ে ওঠেছে। বাহ্যিক অঙ্গসমূহের স্বয়ংক্রিয় সঞ্চালন এবং আভ্যন্তরীণ উদ্দীপনায় কেন দ্রুত সাড়া জাগে, কোন্ প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের দরুন শরীরের যে কোন অবস্থার বা পরিস্থিতির পরিবর্তন উপলব্ধি করা যায়!

জ্ঞানহীন এবং উদাসীন লোকেরা এসব বিষয়ে চিন্তা করে না বললেই চলে। কারণ তারা মনে করে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছি। শৈশব আর কৈশোর অতিক্রম করে যৌবনে পদার্পণ করব। তারপর সংসার জীবনে প্রবেশ করে আত্মীয়-স্বজন পরিবেষ্টিত পরিসরে কিছু দিন মুখরিত থাকব। সবশেষে মৃত্যু এসে টেনে নিয়ে যাবে। আল-কোরআন এ প্রকৃতির লোকদেরকে পশুর ( ) সাথে তুলনা করেছে। কেননা যে জীবন চিত্র তারা ধারণ করে পৃথিবীতে বিচরণ করে তা পশুর জীবনের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পক্ষান্তরে, জ্ঞান সমৃদ্ধ পূর্ণ ঈমান দীপ্ত মানুষ অবশ্যই নিজের শারীরিক গঠন, এর বিকাশ এবং এর কার্য নৈপুণ্যতা নিয়ে গভীর গবেষণা করে থাকে। যার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা এ শরীরের স্রষ্টা মহান আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি কৌশল উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। তাই আল-কোরআন একনিষ্ঠ বিশ্বাসী, জ্ঞানী এবং চিন্তাশীল লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছে,
وَفِي الْأَرْضِ أَيْتَ لِلْمُوْقِنِينَ . وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ
On the earth are signs for those of assured faith, as also in your own selves; will you not then see?
একনিষ্ঠ বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীতে রয়েছে যেমন অসংখ্য প্রমাণ তেমনি তোমাদের নিজেদের মধ্যেও রয়েছে অনেক নির্দেশনা। তারপরেও কি তোমরা তা দেখবে না? (যারিয়াত-২০/২১)

পৃথিবীর নিদর্শনসমূহ আমরা 'পৃথিবী অধ্যায়ে' আলোচনা করেছি। এখন মানব দেহের কি কি নিদর্শন সমগ্র দেহকে সুগঠিত করেছে তা সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

মানব শরীর তৈরী হয়েছে, কার্বন, অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন এবং অনেক ধরনের খনিজ লবণ দিয়ে। এ মৌলিক পদার্থগুলোর নানা রকম ক্রিয়া বিক্রিয়ায় তৈরী হয়েছে প্রাণরস (Protoplasm)। প্রাণরসের শতকরা ৯০% ভাগ পানি এবং বাকী অংশগুলি জৈব ও অজৈব পদার্থ। যেমন, প্রোটিন, স্নেহপদার্থ এবং নিউক্লিক এসিড।

প্রাণের সাড়া এসেছে যখন প্রাণরস দিয়ে, তখন তা দিয়ে তৈরী হয়েছে কোষ (Cell)। আর লক্ষ লক্ষ কোষ দ্বারা মানব দেহ গঠিত। শুধু গঠনগত নয় কোষ শরীরের কার্যগত একক। অর্থাৎ সমস্ত শরীরবৃত্তীয় কর্ম সম্পাদনের আসল প্রভাবক এ কোষ বা Cell।

কিছু সংখ্যক কোষ যখন একই প্রজাতি থেকে উৎপন্ন হয়, একই গঠনের হয় এবং একই কাজ সম্পন্ন করে তখন তাদেরকে এক সঙ্গে বলা হয় কলা (tissue)। কলা আবার বিভিন্ন রকমের আছে। যেমন, দেহতুক হচ্ছে আবরণী কলা (Epithelial tissue)। রক্ত, অস্থি হচ্ছে সংযোজক কলা (Connective tissue)। মস্তিষ্ক, সুষুম্না কাণ্ড হচ্ছে স্নায়ু কলা (Nervous tissue)। আবার একটি কলা মিলে গড়ে ওঠেছে একাধিক অঙ্গ। যেমন, মস্তিষ্ক, যকৃত, হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, পাকস্থলী, বৃক্ক ইত্যাদি। কয়েকটি অঙ্গ মিলে তৈরী হয়েছে তন্ত্র।

প্রত্যেকটি তন্ত্রের সুনির্দিষ্ট কাজ আছে। যেমন, রক্ত সংবহন তন্ত্র রক্তের সাহায্যে বিভিন্ন উপাদান শরীরের বিভিন্ন অংশে পরিবহন করে। শ্বসনতন্ত্র, অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড আদান-প্রদানে, পৌষ্টিকতন্ত্র খাদ্য গ্রহণ ও হজমে সাহায্য করে। আর পেশী, কঙ্কাল তন্ত্রের সাহায্যে আমরা চলাফেরা করি এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করি। স্নায়ুতন্ত্র শরীরের সকল তন্ত্রের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে।

বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, তন্ত্রগুলির কাজ আলাদা আলাদা ও সুনির্দিষ্ট। কিন্তু এরা একে অপরের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। একটি বিকল কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়লে সমগ্র তন্ত্র প্রভাবিত হয়।

সুতরাং বিভিন্ন তন্ত্রের গঠনগত ও শরীরবৃত্তীয় কাজের সমন্বয়েই তৈরি হয়েছে মানব শরীর।
الَّذِي خَلَقَكَ فَسَوَّاكَ فَعَدَلَكَ فِي أَيِّ صُورَةٍ مَّا شَاءَ رَكَبَكَ
He Who created you and fashioned you and proportioned you in just measure, In whatever form He wills does He put you together.
তিনি আল্লাহ যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুবিন্যস্ত করেছেন, সুগঠিত করেছেন এবং সম্পৃক্ত করেছেন। তাঁর ইচ্ছামত তোমার আকৃতি তৈরি করেছেন। (ইনফিতার-৭-৮)

এ আয়াতটি থেকে বুঝা যাচ্ছে, মানব দেহের বাহ্যিক আকার আকৃতি ও গঠনশৈলী নির্ধারিত পরিমাপের উপর প্রতিষ্ঠিত। সাধারণত মানুষের দৈর্ঘ্য ১ থেকে ২ মিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ দৈর্ঘ্যের আকার পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ। মানুষ যখন প্রথম পৃথিবীতে পদার্পণ করে তখন থেকেই সে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলকে নিজের মধ্যে আয়ত্ত করতে থাকে।

আমাদের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে যে, মানুষের বর্তমান দৈর্ঘ্যের চেয়ে যদি তার দৈর্ঘ্য ২-৩ গুণ বেশি হয় তাহলে কি অবস্থা দাঁড়াবে? এক্ষেত্রে এটা প্রমাণ করা যেতে পারে যে, এমতাবস্থায় পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মধ্যে হাঁটা খুবই বিপদজনক হবে। যদি মানুষের দৈর্ঘ্য বর্তমান অপেক্ষা ৩ গুণ হয় এবং দৈহিক অনুপাত একই রকম থাকে তাহলে তার ওজন হবে (3×3×3)=27 গুণ বেশি। ২৭ গুণ ভারী হওয়ার দরুন মানুষ পড়ে যাওয়ার শিকার হবে এবং তিনবার আছাড় খাবে। আছাড় খাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে যে ফল দেখা দেবে তার পরিমাণ অধিক মাত্রায় (27×3)=81 গুণ। তার দেহের হাড়গুলো ৭ গুণ শক্তিশালী হবে। যেহেতু হাড়গুলোর শক্তি নির্ভর করে ঐগুলোর জোড়া সংযোগ এলাকার উপর। এখন বিপরীতভাবে প্রশ্ন উঠতে পারে। যেমন, বর্তমানে মানুষের যে স্বাভাবিক দৈর্ঘ্য আছে তার চেয়ে যদি দৈর্ঘ্য কম হয় তাহলে কি অবস্থা দাঁড়াবে? এরূপ অবস্থা হলে মানুষ ভীষণ অসুবিধার সম্মুখীন হবে। কারণ এটা সকলে জ্ঞাত যে, দেহ থেকে যে পরিমাণ তাপশক্তি (Heat energy) নষ্ট হয় তা নির্ভর করে দেহের উপরিভাগের উপর। মানুষ যদি অতি খর্বাকার হয় তাহলে দেখা যায় তার দেহের অবয়ব তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যহীন এবং অসামঞ্জস্য হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় তার দেহের তাপশক্তি অধিক পরিমাণে নষ্ট হবে এবং তাপশক্তি বৃদ্ধি করার জন্য তাকে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করতে হবে।

পেত। করুণাময় আল্লাহ মানুষের যে দৈহিক আকার ও গঠনের পরিমাপ নির্ধারণ করে দিয়েছেন তাতে প্রজ্ঞার প্রমাণ সুস্পষ্ট।

**নিউরন (Neuron)**
বুদ্ধি ও অনুভূতির আধার মানব মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্রের প্রধান কেন্দ্রস্থল। মস্তিষ্ক (Brain) আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি কর্ম যার মধ্যে নিহিত আছে ১৪ বিলিয়ন নিউরন (Neuron)। সমগ্র জীবদেহের মূল উপাদান হচ্ছে জীবকোষ (Cell body)। এ জীবকোষের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট যে কোষ, যা দ্বারা ইন্দ্রিয়, পেশী, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুমণ্ডল গঠিত হয়েছে, তার নাম নিউরন।

অগ্রমস্তিষ্ক (Prosencephalon) অঞ্চলে অবস্থিত থ্যালামাস ও হাইপোথ্যালামাস যা সংবেদী অঙ্গ থেকে আসা যে কোন সংকেত দ্রুত গ্রহণ করে এবং বুদ্ধি অনুভূতি, চিন্তা, ইচ্ছাশক্তি, উদ্ভাবনীশক্তি, চেতনাশক্তি, প্রভৃতি মানসিক বোধের নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞানীরা হাইপোথ্যালামাসকে আবেগের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। শরীরের আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উদ্দীপনার সংকেত যখন স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে তখন নিউরন তা গ্রহণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রেরণ করে। যেমন, দেহের কোন অংশ একটুখানি স্পর্শ করলে, কিংবা গরম বা ঠান্ডা অনুভব করলে অথবা কেউ চিমটি কাটলে সংশ্লিষ্ট স্নায়ুতন্ত্র সাথে সাথে নিউরনকে সংকেত পাঠায়। Neuron অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয় হাত সরিয়ে নাও অথবা চিমটি কাটা স্থানে একটুখানি মেসেজ করে নাও। এটি কোন অধীত বিদ্যার ফসল নয় বরং নিউরন থেকে আসা সিদ্ধান্তের ফল, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগঠিত হয়। যদি কেউ পিন দ্বারা খোঁচা দেয় তখন কি ঘটে। পিনের খোঁচা বাহ্যিক উদ্দীপক (Stimulus)। ত্বকের গ্রাহক (Receptor) কোষ উদ্দীপনা গ্রহণ করে সংজ্ঞাবহ স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। সেখান থেকে নির্দেশ আসে Motor nerve এর মাধ্যমে পেশীতে। তারপর হাত সরিয়ে নেয়া হয়। চলার পথে আপনি বিপদগ্রস্ত হয়েছেন। কিংবা কোন ভয়ানক জন্তুর সামনে পড়ে গেছেন। এমতাবস্থায় Neuron সিদ্ধান্ত দেবে, কারো সাহায্যের জন্য চিৎকার কর কিংবা একটি লাঠি হাতে নাও অথবা গাছ বেয়ে উপরে ওঠে যাও। এভাবে আমাদের বুদ্ধি, বিবেচনা এবং সিদ্ধান্ত প্রদানকারী স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষুদ্রতম একক নিউরন।

অতএব নিউরন এতই বিস্ময়কর স্নায়ুকোষ যার বহুবিধ কার্যপ্রণালী বিজ্ঞানীদের আকুল পাথারে ফেলে দিয়েছে।

سَنُرِيهِمُ ابْتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنْفُسِهِمْ
We will show our signs in your own selves.
আমাদের নির্দেশনা সমূহ তোমাদের নিজেদের মধ্যে প্রতিভাত হবে। (হা-মীম ৫৩)

وَفِي الْأَرْضِ ايْتُ لِلْمُوقِنِينَ. وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ.
On the earth are signs for those of assured faith as also in your own selves, will you not then see?
পৃথিবী জুড়ে রয়েছে একান্ত বিশ্বাসীদের জন্য অনেক প্রমাণ, আরো রয়েছে তোমাদের নিজেদের মধ্যে। তারপরেও কি তোমরা প্রত্যক্ষ করবে না? (যারিয়াত ২০-২১)

মানুষের মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্রের একক নিউরনকে আল-কোরআন 'আয়াত' (Sign) হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যাতে করে জ্ঞানী লোকেরা এসব আয়াতের বিস্ময়কর তথ্যাবলী আবিষ্কার করে নেয়। আর আল্লাহ তা'আলার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

**হৃদপিণ্ড (Hearts)**
মহান আল্লাহ তা'আলার আর একটি অসাধারণ সৃষ্টি হৃদপিণ্ড (hearts)। এটি দেহের সমস্ত অংশে রক্ত সঞ্চালনের জন্য পাম্প যন্ত্রের (pumping machine) মত কাজ করে। চলমান এ যন্ত্রটি দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে শিরার (vein) মাধ্যমে আনীত রক্ত ধমনীর (artery) সাহায্যে শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রেরণ করে। হৃদপিণ্ড প্রতিটি সুস্থ মানুষের জীবদ্দশায় গড়ে ২৬০০ মিলিয়ন বার স্পন্দিত হয়ে প্রতিটি নিলয় (ventricle) থেকে প্রায় ১৫৫ মিলিয়ন লিটার (দেড় লক্ষ টন) রক্ত বের করে দেয়।

হৃদপেশী দ্বারা নির্মিত হৃদপিণ্ড, যার মধ্যে রয়েছে চারটি প্রকোষ্ঠ ও চারটি ভাল্ব। এটি সংকোচন (systole) এবং প্রসারণ (diastole) প্রক্রিয়ায় শিরার মাধ্যমে দূষিত রক্ত টেনে আনে। এরপর উক্ত রক্ত পরিশুদ্ধ করে ধমনীর সাহায্যে শরীরের বিস্তৃত অংশে ছড়িয়ে দেয়। হৃদপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণ প্রক্রিয়ায় যে ছন্দময় স্পন্দন উদগত হয় তা জীবনের গতি সচল রাখে। এ স্পন্দন বন্ধ হলে-ই জীবনের সমাপ্তি ঘটে। প্রতিবার হৃদ স্পন্দনের সময় কতগুলো পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন ঘটে এবং পরবর্তী স্পন্দনের সময় তার পুনরাবৃত্তি হয়। এটাকে বলা হয় হৃদ চক্র (cardiac cycle)। সুস্থ মানবদেহে হৃদপিণ্ড প্রতিমিনিটে ৬০-৭০ বার অর্থাৎ গড়ে ৬৫ বার স্পন্দিত হয় এবং প্রতিটি চক্রে সময় লাগে মাত্র ০.৮ সেকেন্ড।

আলিন্দের ঘটনা প্রবাহঃ নিলয়ের ঘটনা প্রবাহঃ
অলিন্দের সংকোচন = ০.১ সেঃ নিলয়ের সংকোচন = ০.৩ সেঃ
অলিন্দের প্রসারণ = ০.৭ সেঃ নিলয়ের প্রসারণ = ০.৫ সেঃ
= ০.৮ সেকেন্ড = ০.৮ সেকেন্ড
وَهُوَ الَّذِي أَنْشَأَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ قَلِيلًا مَا تَشْكُرُونَ.
It is He Who created for you ears, eyes and hearts; little thanks do you give.
তিনি সে-ই মহান সত্তা যিনি তোমাদের জন্য কান, চোখ এবং হৃদয় সৃষ্টি করেছেন, অথচ তোমরা খুব কম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (মুমিনুন-৭৮)

হৃদপিণ্ডের কার্যপ্রণালী অত্যন্ত জটিল। দেহের ভিতরে রক্ত গতিশীল রাখাই হৃদপিণ্ডের কাজ। শরীরের ঊর্ধ্বভাগ থেকে CO₂ সমৃদ্ধ দূষিত রক্ত সুপেরিয়র ভেনা ক্যাভা এবং নিম্নভাগ থেকে ইনফেরিয়র ভেনা ক্যাভার মাধ্যমে হৃদপিণ্ডের ডান অলিন্দে (Right atrium) প্রবেশ করে। সেখান থেকে দক্ষিণ নিলয়ে বাহিত হয়। ফুসফুস থেকে O₂ সমৃদ্ধ রক্ত, দু'টি ফুসফুসীয় শিরার মাধ্যমে বাম অলিন্দে পৌঁছায়। সেখান থেকে রক্ত বাম নিলয়ে চলে যায়। এটাই হার্টের আসল কর্মপ্রক্রিয়া।

ডান অলিন্দ ফুসফুস
পালমোনারী- মহাধমনী -পালমোনারী শিরা মহাশিরা- -বাম অলিন্দ ডান নিলয়- -বাম নিলয় সিস্টেমিক মহাধমনী
হৃদপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া দেহ

দক্ষিণ অলিন্দের গাত্রে এক ধরণের বিশেষ কোষ হার্টের পেসমেকার বা গতি নির্ধারক হিসেবে কাজ করে। এর নাম Sino Atrial node সংক্ষেপে S.A Node। হার্টের উপর দিয়ে প্রবাহিত বৈদ্যুতিক প্রবাহ বা ঢেউ এখান থেকে শুরু হয়। S.A. Node নষ্ট হয়ে গেলে আজকাল কৃত্রিম পেসমেকার লাগিয়ে রোগীকে কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখা হয়। হার্টের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের জন্য যে দু'টি রক্তনালী দ্বারা রক্ত পৌঁছে ঐ দু'টি রক্তনালীর নাম করোনারী ধমনী। করোনারী ধমনীর অনেক শাখা প্রশাখা হৃদপিণ্ডের পেশীর ভিতরে বিস্তার লাভ করে এবং কোষসমূহের স্বাভাবিক কাজ কর্ম ঠিক রাখে। কিন্তু হার্টের কাজকর্মে বিপত্তির কারণ করোনারী ধমনীতে জমে যাওয়া একদলা রক্ত কিংবা এক টুকরা চর্বি। এ ধমনীর অনুরূপ ধমনী মানুষের উরুতে রয়েছে, যা কেটে নিয়ে ডাক্তারেরা হার্টে লাগিয়ে থাকেন নষ্ট করোনারী ধমনীর স্থলে। করোনারী ধমনী নষ্ট হয়ে যাবে। আর মেহেরবান আল্লাহ সে ধমনীর ব্যবস্থা করে রেখেছেন মানুষের উরুতে। এরকম অনেক নিদর্শন মানুষের শরীরে বিদ্যমান যার কতকটা আবিষ্কার হয়েছে, কতকটা হয়নি।

وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
And Allah has brought you forth from the wombs of your mothers when you knew nothing and He gave you senses of hearing and sight and hearts so that you may give thanks to Allah.
আল্লাহ মাতৃগর্ভ থেকে তোমাদের বের করেছেন যখন তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের কর্ণ, চক্ষু এবং হৃদপিণ্ড দিয়েছেন যেন তোমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (নাহর-৭৮)

**চোখ (Eye)**
আমাদের চোখ আলোকের মধ্য দিয়ে দৃষ্টি সঞ্চার করে। দৃষ্টি সঞ্চারের সাথে অনেকগুলি আনুসঙ্গিক অঙ্গ জড়িত। যেমন কর্নিয়া, স্ক্লেরা, আইরিস, কোরয়েড, রেটিনা, লেন্স, পিউপিল, Ciliary bodies, কনজাংটিভা, অ্যাকুয়াস হিউমার, Eyeglands ইত্যাদি। এসব অঙ্গের আচরণ ও কার্যপ্রণালী কিছু কিছু আবিষ্কৃত হলেও বেশীর ভাগ অঙ্গের কার্যকারণ রহস্যময় রয়ে গেছে।

চোখের গঠন এবং দেখার পদ্ধতি অনুকরণে আবিষ্কার হয়েছে ক্যামেরা। আমাদের চোখের সামনে আছে একটি লেন্স। এ লেন্স কিছু বিশেষ ধরনের কোষ দিয়ে তৈরী। ক্যামেরাতেও এমনি একটি কাঁচের লেন্স থাকে। এই লেন্সের মধ্যে কোন জিনিসের উপর থেকে প্রতিফলিত আলো ঢুকে ক্যামেরার ফিল্মে পড়ে। আর তার উপরে ঐ বস্তুর একটা উল্টো প্রতিবিম্ব তৈরী হয়। চোখের মধ্যে ফিল্মের কাজ করে রেটিনা। রেটিনার চার পার্শ্বে কালো রঙের একটি স্তর আছে। এর নাম কোরয়েড (choroid)। চোখে আলো প্রবেশ করে পিউপিল (pupil) দিয়ে। আলো বাড়া-কমা নিয়ন্ত্রণ করে আইরিস (iris)। আবার রেটিনার আছে আলো গ্রহণকারী কোষ Photo receptor। এ কোষ দু'প্রকার। 'Cone' এবং 'Rod'। অধিক আলো এবং রঙিন আলোর অনুভূতি গ্রহণ করে কোন্ (cone) গ্রাহক কোষ। আর কম অনুভূতি গ্রহণ করে রড্ (rod) গ্রাহক কোষ। কোষগুলি আলোর অনুভূতি দ্রুত মস্তিষ্কের দর্শন কেন্দ্রে (visual centre) প্রেরণ করার সাথে সাথে আমরা দেখতে পাই। প্রত্যেক জিনিসের ছবি রেটিনায় গিয়ে একটি উল্টা প্রতিবিম্ব তৈরী করে। কিন্তু মস্তিষ্কের দর্শন কেন্দ্রের সাহায্যে তা সোজা হয়ে যায়। অর্থাৎ মস্তিষ্কে গিয়ে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সোজা হয়ে যায়।

মহান আল্লাহ তা'আলা দয়া করে আমাদের কপালের নিচে যে দু'টি নয়ন এঁটে দিয়েছেন তার প্রতি লক্ষ্য করে আল-কোরআন বলছে,
الَمْ نَجْعَل لَّهُ عَيْنَيْنِ. وَلِسَانًا وَشَفَتَيْنِ.
Have We not made for him a pair of eyes and a tongue and a pair of lips?
আমরা কি তাকে দু'টি চোখ, একটি জিহবা এবং দু'টি ঠোঁট দেই নি? (বালাদ ৮-৯)

অথচ চোখের কথা বলার সাথে সাথে আরো গুরুত্বপূর্ণ দু’টি অঙ্গের কথা বলা হয়েছে। একটি জিহ্বা অপরটি ঠোঁট। জিহ্বা তিনটি প্রধান কাজে অংশ গ্রহণ করে।
১। খাদ্য সঞ্চালন করাঃ জিহ্বা খাদ্যদ্রব্য সঞ্চালন করে অন্ননালী পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
২। খাদ্য সামগ্রীর স্বাদ গ্রহণ করাঃ দৈনন্দিন জীবনে আমরা নানা রকম খাদ্য গ্রহণ করি। কিন্তু এক একটি খাদ্যের স্বাদ এক এক রকম। এটা উপভোগ করার জন্য জিহ্বায় রয়েছে ৩০০০ (তিন হাজার) আস্বাদন স্তর। যেমন, আপেল, কমলা, আম তিনটাই ফল জাতীয় খাদ্য। অথচ প্রত্যেকটির ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ আমরা বুঝতে পারি। চিকেন, বীফ, মাটন প্রত্যেকটি মাংস জাতীয় খাদ্য। কিন্তু এদের আলাদা আলাদা স্বাদ পরখ করা যায়। জিহ্বার মধ্যে আস্বাদন স্তর না থাকলে সমস্ত খাদ্য দ্রব্যের এক রকম মনে হতো।
৩। কথা বলতে সাহায্য করাঃ আমাদের স্বরযন্ত্রে যে কথা তৈরী হয় তাতে জিহ্বা অংশ গ্রহণ করে থাকে। জিহ্বা না থাকলে প্রয়োজনীয় কথা তৈরী করে তা ডেলিভারী দেয়া মোটেও সম্ভব হতো না।

আর আমাদের ঠোঁট দু’টি কথা বলার সময় সঞ্চালিত হয়। খাদ্য ও পানীয় সর্ব প্রথম রিসীভ করে ঠোঁট। পরে মুখের ভেতর আবদ্ধ করে উপযোগিতা সৃষ্টি করে। মানুষের ঠোঁটদ্বয় দাঁতের উপর আবৃত থাকে, যার দরুন চেহারার সৌন্দর্য ফুটে উঠে।

**দৃষ্টি শক্তির অন্তরালে**
আমাদের চোখ কোন কিছু দেখার জন্য দৃষ্টি সঞ্চার করে। দৃষ্টি সীমায় যা কিছু দৃশ্যমান শুধু তা-ই আমরা দেখতে পাই। বাতাস অতি স্বচ্ছ পদার্থ। আমরা কি তা দেখি! পরমাণু, ইলেকট্রন, প্রোটন, ফোটন, নিউট্রন, মেসন, বেরিয়ন প্রভৃতি অতি ক্ষুদ্র কণিকা আমরা দেখি না, এরকম অনেক কিছুর অস্তিত্ব আছে। অথচ আমরা দেখি না। আবার অন্ধকারে কিংবা দূরত্বে অবস্থিত এমন জিনিসও ভালভাবে দেখা যায় না। এ সবের কারণ কি?

পূর্বেই বলেছি আমাদের রেটিনায় আছে দু’ধরনের আলো গ্রহণকারী কোষ cone এবং Rod। (বেশী আলো এবং রঙিন আলোয় সাড়া দেয় কোন্ গ্রাহক কোষ। আর কম আলোয় সাড়া দেয় রড গ্রাহক কোষ)। কোন বস্তু থেকে প্রতিফলিত আলো Cone বা Rod কোষকে উদ্দীপিত করলে তবেই আমরা দেখতে পাই। কিন্তু সব ধরনের আলোক তরঙ্গ আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। যারা ধরা পড়ে তাদের বলা হয় দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গ (Visible light wave)। বায়ু অতি স্বচ্ছ পদার্থ হওয়ায় বায়ুর কণা থেকে আলোক তরঙ্গ এসে আমাদের চোখে পড়ে না। তাই আমরা বাতাস দেখতে পাই না। এ রকম যেসব বস্তুকণা বা অন্যান্য পদার্থ যাদের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও যে কারণে আমরা ঐগুলি দেখি না তা হচ্ছে ঐ সব বস্তু থেকে আলোক- তরঙ্গ এসে আমাদের চোখে পড়ে না। তাই তাদের দেখা যায় না।

দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গ চোখে এসে পড়লে Cone এবং Rod এর মধ্যে যে রাসায়নিক পদার্থ আছে, তা আলো শোষণ করে নেয়। Cone এর আছে আয়োডোপসিন (Iodopsin) এবং Rod এর আছে রোডপসিন (Rhodopsin)। আলোর প্রভাবে রাসায়নিক পদার্থের বিক্রিয়ায় যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় তা স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে। তখনই আমরা দেখি। অন্ধকারে Cone বা Rod কোষ আলো গ্রহণ করতে পারে না বলেই অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না।

قُلْ هُوَ الَّذِي أَنْشَاكُمْ وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ قَلِيلًا مَّا تَشْكُرُونَ.
Say it is He Who has created you and made for you ears, eyes and hearts, little thanks do you give.
বলুন তিনি আল্লাহ যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের দান করেছেন শ্রবণ শক্তি, দৃষ্টি শক্তি এবং অন্তঃকরণ, অথচ তোমরা খুব কম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (মুলক-২৩)

أَمَّنْ يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ
Who is that has power over hearing and sight?
কে আছে এমন যে শ্রবণ শক্তি আর দৃষ্টি শক্তির উপর ক্ষমতা রাখে? (ইউনুচ-৩১)
এ আয়াতাংশটি উপলব্ধি করে কে না কাতর হয়! শ্রবণ শক্তি ও দর্শনশক্তি উভয়ই অতি সূক্ষ্ম ও জটিল কলাকৌশলের অঙ্গীভূত প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া সচল থাকে আল্লাহপাকের নির্ধারিত নিয়ম কানুনের ভিত্তিতে। স্বাভাবিক জীবন-যাপনের জন্য এ দু'টি শরীরবৃত্তীয় অঙ্গ একান্ত অপরিহার্য। এ দু'টি অঙ্গ বাদ দিলে কিংবা বিকল হয়ে গেলে কে আছে এমন ঐগুলোর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আনুসঙ্গিক কলা ও কোষগুলো নূতনভাবে সৃষ্টি করে দিতে পারে? সেজন্য এ দুটি অঙ্গের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে আল্লাহপাক বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষের উপর তাঁর বিশেষ করুণা অবারিত। যদি মানুষ কোন বস্তু দেখতে না পায় এবং কোন কিছু শুনতে না পায় তাহলে পার্থিব জীবন তার কাছে সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাই মানবজাতির উচিত তার প্রতি চির কৃতজ্ঞ থাকা।

**SENSES OF HEARING**
শব্দতরঙ্গ → পিনা → কর্ণকুহর → কর্ণপটহে কাঁপন → ম্যালিয়াস + ইনকাস + স্টেপিস → অন্তঃকর্ণের ডিম্বাকার পর্দায় কাঁপন → উদ্দীপনা সৃষ্টি → মস্তিষ্কে প্রেরণ ← সংবেদীকোষ → শ্রবণ।

পিনা
বহিঃ অডিটরি মিটান টিম্পানিক পর্দা
বহিঃকর্ণ মধ্যকর্ণ ফেনেস্ট্রা ওভালিস ফেনেস্ট্রা রোটান্ডা
ম্যালিয়াস ইনকাস স্টেপিস অর্ধবৃত্তাকার নালী ভেস্টিবুলো-কক্লিয়ার স্নায়ু কক্লিয়া
অন্তঃকর্ণ ইউস্টেশিয়ান নালী গলবিল
মানুষের কানের গঠন প্রণালী

মানুষের কান (Ear) এক বিশেষ ইন্দ্রিয় যা একাধারে শ্রবণ ও দেহের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। কান প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত,
১. বহিঃকর্ণ (External ear)
২. মধ্যকর্ণ (Middle ear)
৩. অন্তঃকর্ণ (Internal ear)

বহিঃকর্ণে আছে তিনটি অংশ। পিনা (pinna), কর্ণকুহর (auditory meatus) এবং কর্ণপটহ (tympanic membrane)। এসব অঙ্গ শব্দ তরঙ্গ সংগ্রহ করে তা মধ্যকর্ণে প্রেরণ করে। মধ্যকর্ণে অবস্থিত ম্যালিয়াস, ইনকাস ও স্টেপিস অস্থি তিনটি টিমপেনিক পর্দা থেকে শব্দ তরঙ্গ পেরিলিম্ফে বহন করে নিয়ে যায়। অন্তঃকর্ণ দু'টি প্রকোষ্ঠ নিয়ে গঠিত। (১) ইউট্রিকুলাস (Utriculus) (২) স্যাকুলাস (Sacculus)।
(১) ইউট্রিকুলাসকে ভারসাম্য অঙ্গ বলা হয়। এটি দেহের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে মস্তিষ্কের সেরেবেলামকে সংকেত পাঠায়। যার ফলে দেহের অবস্থানের অনুভূতি জাগ্রত হয়।
(২) স্যাকুলাস এর নাম শ্রবণ অঙ্গ। এতে রয়েছে শ্রুতি সংবেদী কোষ ‘organ of Corti’। শ্রবণ অনুভূতি সৃষ্টি করা এর অন্যতম কাজ।

إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُّطْفَةٍ أَمْشَاجِ نَبْتَلِيْهِ فَجَعَلْنُهُ سَمِيعًا بَصِيرًا .
Verily We created man from the mixture of germinal fluids in order to try him. So We gave him hearing and sight.
অবশ্যই আমরা মানুষ সৃষ্টি করেছি সংমিশ্রিত নুৎফা থেকে যেন তাকে পরীক্ষা করতে পারি। অতঃপর তাকে শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টি শক্তি দান করেছি। (দাহার-২)

পিনা গৃহীত শব্দ তরঙ্গ কর্ণকুহরে প্রবেশ করে কর্ণপটহকে আঘাত করলে তা কেঁপে ওঠে। কম্পনে মধ্যকর্ণে অবস্থিত ম্যালিয়াস, ইনকাস ও স্টেপিস অস্থি তিনটি এমনভাবে আন্দোলিত হয়, যার ফলে অন্তকর্ণের ককলিয়ার পেরিলিম্ফে কাঁপন সৃষ্টি হয়। পেরিলিম্ফে কাঁপন হলে ককলিয়ার অরগান অব কর্টি (cochlear organ of Corti) সংবেদী কোষগুলি উদ্দীপ্ত হয়ে স্নায়ু আবেগের সৃষ্টি করে। এ আবেগ স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কের শ্রবণ কেন্দ্রে পৌঁছার সাথে সাথে মানুষ শুনতে পায়।

মানুষের অন্তঃকর্ণে ইউট্রিকুলাস ও স্যাকুলাসের নানা জায়গায় কতগুলো সংবেদী কোষগুচ্ছ থাকে। কোষগুলো থেকে সংবেদী রোম বের হয়। এদের চারদিকে এন্ডোলিম্ফে ভাসমান ওটোলিথ নামের অনেকগুলো জেলির মত কণা পরিবৃত থাকে। মানুষের মাথা কোন এক তলে হেলে গেলে ঐ পাশের ওটোলিথগুলো সংবেদী রোমের সংস্পর্শে আসে। ফলে সংবেদী কোষগুলো উদ্দীপ্ত হয়। এ উদ্দীপনায় স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছলে মানুষ দেহের আপেক্ষিক অবস্থান বুঝতে পারে। তখন মস্তিষ্কের নির্দেশে প্রয়োজনীয় পেশীর সংকোচনে মাথা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। সঙ্গে সঙ্গে দেহের ভারসাম্য রক্ষিত হয়।

وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
And He gave you senses of hearing and sight and hearts so that you may give thanks to Allah.
এবং তিনি তোমাদের দান করেছেন শ্রবণ অনুভূতি, দৃষ্টি শক্তি এবং হৃদয়, যেন তোমরা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার। (নাহল ৭৮)

**ক্লোনিং**
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِّنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ
It is He who created you from a single self.
তিনি আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন একটি মাত্র নাক্স থেকে। (আরাফ-১৮৯)

স্বাভাবিকভাবে উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতে বংশ বিস্তার ঘটে যৌন মিলন প্রক্রিয়ায়। এ প্রক্রিয়ায় Sperm দ্বারা ovum নিষিক্ত (Fertilized) হলেই ভ্রূণ সৃষ্টি হয়। উদ্ভিদের ক্ষেত্রে পরাগায়ণ (pollination) পদ্ধতিতে পুংরেণু এবং স্ত্রীরেণুর মধ্যে মিলন ঘটে।

কিন্তু স্বামী-স্ত্রী বা বিপরীত লিঙ্গের মধ্যে মিলন ব্যতিরেকে প্রাণী সৃষ্টি হতে পারে কি? বিজ্ঞানের কাছে এটি ছিল এক কঠিন জিজ্ঞাসা। এ জিজ্ঞাসার জবাবে বিজ্ঞানীরা কীট-পতঙ্গের মধ্যে পার্থেনোজেনিসিস (Parthenogenesis) প্রক্রিয়ায় বংশ বিস্তারে সক্ষম হয়েছেন।

Parthenogenesis মৌমাছির মধ্যে প্রয়োগ করে সফল হওয়ার পর শশক জাতীয় (Rabbit) প্রাণীর উপর পরীক্ষা করা হয়। তাতেও সফলতা আসে। এরপর জীববিজ্ঞানীরা মানুষের ভ্রূণ (human embryo) নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করেন এবং একটি নিষিক্ত Ovum ধাই মাতার (foster mother) গর্ভে স্থাপন করে অপেক্ষা করতে থাকেন। ফলে যথা সময়ে একটি স্বাভাবিক শিশু জন্ম লাভ করে। যার নাম দেয়া হয় 'Test Tube Baby'। এ পদ্ধতিতে জন্মলাভকারী প্রথম টেস্ট টিউব বেবীর নাম লুইসা ব্রাউন। বর্তমানে পার্থেনোজেনিসিস প্রক্রিয়ায় পশু-পাখির উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে।

এরপর ১৯৯৭ সালে বিজ্ঞানীরা ক্লোনিং (cloning) পদ্ধতিতে ভেড়া-শাবক বের করে বিশ্বময় চমক সৃষ্টি করেন। স্কটল্যান্ডের রোজলিন ইন্সটিটিউটের ভ্রূণ বিজ্ঞানী ডঃ ইয়ান উইলমুট এবং তার সহকর্মীরা ভেড়ার দেহ কোষকে (cell body) ক্লোনিং করে সাতটি মেষ শাবক বের করেন যাদের শারীরিক গঠন পরস্পর একই রকম এবং এদের কোন পিতা নেই।

একটি মাত্র কোষ থেকে জীবন শুরু হলেও বিভাজনের ফলে ভ্রূণের বিভিন্ন কোষ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হয়। যেমন, কোন কোন কোষ মস্তিষ্ক গড়ে তোলে, কোন কোষ হৃদপিণ্ড গড়ে তোলে, কেউ নিয়োজিত হয় চুল, নখ, নাক, কান ইত্যাদি রূপায়নে। আর এটাকে বলা ডিফারেনশিয়েশন। ভেড়ার দেহ কোষকে ক্লোনিং এর পথে নিয়ে যাওয়ার পূর্বে বিজ্ঞানীরা কোষের ডিফারেনশিয়েশন বন্ধ করতে সক্ষম হন। অর্থাৎ কোষটির নিউক্লিয়াসের DNA তে জিনগুলি সব একই অবস্থায় থাকে। Sperm এবং ovum এর মিলনে উৎপন্ন ভ্রূণের বেলায় ঠিক এ ঘটনাই ঘটে। ডঃ উইলমুট ও তার দল প্রথমে গর্ভবতী একটি ভেড়ার স্তনের কিছু কোষ সংগ্রহ করে, কোষগুলোকে বিশেষ রাসায়নিক পদার্থে রেখে দেন এবং ক্রমশ কোষগুলির পুষ্টির উপাদান সরিয়ে নিতে থাকেন। এর ফলে কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম অর্থাৎ ডিফারেনশিয়েশন বন্ধ হয়ে যায়।

পরের ধাপে বিজ্ঞানীরা অন্য একটি ভেড়ার ডিম্বাশয় থেকে একটি অনিষিক্ত ovum সংগ্রহ করেন। সে অনিষিক্ত ovum থেকে জটিল বৈজ্ঞানিক উপায়ে DNA সমেত নিউক্লিয়াস অপসারণ করে গর্ভবতী ভেড়ার স্তন থেকে সংগৃহীত কোষ সেখানে স্থাপন করেন এবং বৈদ্যুতিক স্পার্কের মাধ্যমে DNA টি নিষিক্ত করেন। ফলে একটি নতুন ভ্রূণ সৃষ্টি হয়। এর ঠিক ছ'দিন পরে ভ্রূণটি প্রতিস্থাপন করা হয় তৃতীয় আর একটি ভেড়ার জরায়ুতে। আর প্রতিস্থাপিত ভ্রূণ থেকে জন্ম নেয় একটি মেষ শাবক যার নাম দেয়া হয় ডলি। এভাবে আরো ৬টি ভেড়া জন্ম নেয়, যাদের চেহারা, রং এবং শারীরিক গঠন হুবহু এক ও অভিন্ন। পিতা ছাড়া ডলির জন্ম হয়। অর্থাৎ ক্লোনিং প্রক্রিয়ায় Sperm এর প্রয়োজন নেই।

বিজ্ঞানীরা অতি সম্প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছেন যে, একটি দেহ কোষকে ক্লোনিং করে এভাবে মানব শিশুর কপি বের করা যাবে। কোন পুরুষের Sperm প্রয়োজন হবে না। এমনকি যদি কেউ তার ইচ্ছানুরূপ সন্তান পেতে চায় তাহলে তাও ক্লোনিং প্রক্রিয়ায় বের করা সম্ভব। যেমন, কেউ যদি পুত্র সন্তান পেতে চায় তার গায়ের রং, শারীরিক গঠন, চুল, কান, নাক, ইত্যাদি পূর্বে নির্বাচিত করেই ক্লোনিং করা যাবে। তবে এটা অত্যন্ত ব্যয় বহুল প্রক্রিয়া।

মহাবিশ্বের মহাবিস্ময় মহান আল-কোরআন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রেখেছেন গোটা মানব জাতির সামনে। তা হচ্ছে আল্লাহর বিশিষ্ট নবী হযরত ইসা (আঃ) এর জন্ম। (যার জন্ম হয়েছে পিতা ছাড়া)। ইয়াহুদী আর খৃষ্টানেরা কখনো বিশ্বাস করতে চায়না যে, পিতা ব্যতিরেকে সন্তান জন্ম হতে পারে। তারা কোরআনের দৃষ্টান্তকে তামাশা (hoax) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে (নাউজুবিল্লাহ)।

সেজন্য হযরত মরিয়ম (আঃ) এর পুত্র ইসাকে আল্লাহর সন্তান বলে দাবী করেছে। হযরত মরিয়াম (আঃ) এমন এক পুত-পবিত্র কুমারী জননী, যাঁর গর্ভে পরিপুষ্ট হয়েছেন আল্লাহ তাআলার বিশিষ্ট নবী হযরত ঈসা (আঃ)। ইয়াহুদী আর খৃষ্টানেরা বলে থাকে যে, কোন কুমারী নারীর সন্তান হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। এখন তাদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয় ক্লোনিং কি করে সম্ভব হলো, যেখানে পিতার প্রয়োজন হয় না। প্রকৃতপক্ষে যে কোষ নিয়ে ক্লোনিং করা হয় সে কোষটির (Cell) মধ্যে অবশ্যই ভ্রূণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় উপাদান ও প্রাণ থাকে। আরবীতে প্রাণকে বলা হয় রূহ। রূহ নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেক গবেষণা করেছেন। কিন্তু কোন কিছু কূল কিনারা করতে পারেননি। ভবিষ্যতেও পারবে না। কেননা এ বিষয়ে মানুষকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে খুব সামান্য। রূহ সংক্রান্ত জ্ঞান আল্লাহ তাআলার তাঁর নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। তবে বিজ্ঞানীদের গবেষণা এখনো থামেনি। জার্মান রসায়ন বিজ্ঞানী Baron Von Riechenbach বলেছেন, মানুষ, গাছপালা ও পশু-পাখির শরীর থেকে বিশেষ এক প্রকার জ্যোতি বের হয়। বৃটিশ ডাক্তার ওয়াল্টার কিলনার Dicyanin Dye রঞ্জিত কাঁচের ভেতর দিয়ে লক্ষ্য করেন, মানুষের দেহের চারপাশে ৬-৮ সেন্টিমিটার পরিমিত স্থান জুড়ে একটি উজ্জ্বল আলোর আভা মেঘের মত ভাসে। এরপর সাবেক সোভিয়েত বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার গুরভিচ আবিষ্কার করেন যে, জীবন্ত সব কিছু থেকে বিশেষ একটি শক্তি আলোর আকারে বের হয় যা খালি চোখে দেখা যায় না। কিরলিয়ান ফটোগ্রাফির মাধ্যমে প্রাণী দেহের বিচ্ছুরিত এ আলোক রশ্মির ছবি তোলা হয় যার উৎস হচ্ছে রূহ বা প্রাণ।

অতএব রূহ সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণার সীমা এখানে-ই শেষ। অর্থাৎ 'রূহ' বিষয়ক গবেষণা তেমন অগ্রসর হবে না। এখন আল-কোরআন সে বিষয়ে বলছে-

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوْحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَا أُوتِيْتُمْ مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا.
They ask you concerning the spirit, say, the spirit is a command coming from your Lord and the knowledge thereof you have been given a little.
ওরা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে আপনি জবাব দিন, রূহ হচ্ছে আমার প্রভুর পক্ষ থেকে আসা একটি আদেশ। তবে এ বিষয়ে তোমাদের খুব সামান্য জ্ঞান দান করা হয়েছে। (বনী ইসরাইল-৮৫)

অতএব আল্লাহ তাআলার আদেশ ঘটিত রূহ যখন হযরত মরিয়ম (আঃ) এর গর্ভে প্রবিষ্ট হয় তখন সাথে সাথে হযরত ঈসার ভ্রূণ সৃষ্টি হয়ে যায়। মানুষ সৃষ্টির জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ক্লোনিং প্রক্রিয়ার প্রয়োজন নেই। ঐশী আদেশ- 'কুন' বলাটাই যথেষ্ট।

১. Parthenogenesis হচ্ছে sperm (শুক্রাণু) ছাড়া ovum কে পরিপুষ্ট করে ভ্রূণ সৃষ্টি করার প্রক্রিয়া।
২. ক্লোনিং অর্থ হুবহু নকল বা কার্বন কপি অর্থাৎ একই আকার আকৃতি বিশিষ্ট, একই শারীরিক গঠন সমৃদ্ধ, একই রং এবং একই লিঙ্গের দুই বা ততোধিক প্রাণী বের করার নাম ক্লোনিং। বিজ্ঞানীরা বলেছেন এ প্রক্রিয়ায় নাকি মানুষও বের করা যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মানুষের ক্লোনিং শুরু হলে সামাজিক বিপর্যয় নেমে আসবে। একে অপরকে ব্ল্যাকমেইল, প্রতারণা, নারী নির্যাতন এবং আরও অন্যান্য জটিল সমস্যা সৃষ্টি হবে। তাই ক্লোনিং প্রক্রিয়ায় মানুষ সৃষ্টি করা একটি গর্হিত কাজ।

📘 Biggan moy quran > 📄 নিউরন

📄 নিউরন


নিউরন বুদ্ধি ও অনুভূতির আধার মানব মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্রের প্রধান কেন্দ্রস্থল। মস্তিষ্ক (Brain) আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি কর্ম যার মধ্যে নিহিত আছে ১৪ বিলিয়ন নিউরন (Neuron)। সমগ্র জীবদেহের মূল উপাদান হচ্ছে জীবকোষ (Cell body)। এ জীবকোষের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট যে কোষ, যা দ্বারা ইন্দ্রিয়, পেশী, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুমন্ডল গঠিত হয়েছে, তার নাম নিউরন।

অগ্রমস্তিষ্ক (Prosencephalon) অঞ্চলে অবস্থিত থ্যালামাস ও হাইপোথ্যালামাস যা সংবেদী অঙ্গ থেকে আসা যে কোন সংকেত দ্রুত গ্রহণ করে এবং বুদ্ধি, অনুভূতি, চিন্তা, ইচ্ছাশক্তি, উদ্ভাবনী শক্তি, চেতনা শক্তি, প্রভৃতি মানসিক বোধের নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞানীরা হাইপোথ্যালামাসকে আবেগের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। শরীরের আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উদ্দীপনার সংকেত যখন স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে তখন নিউরন তা গ্রহণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রেরণ করে। যেমন, দেহের কোন অংশ একটুখানি স্পর্শ করলে, কিংবা গরম বা ঠান্ডা অনুভব করলে অথবা কেউ চিমটি কাটলে সংশ্লিষ্ট স্নায়ুতন্ত্র সাথে সাথে নিউরনকে সংকেত পাঠায়। Neuron অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয় হাত সরিয়ে নাও অথবা চিমটি কাটা স্থানে একটুখানি মেসেজ করে নাও। এটি কোন অধীত বিদ্যার ফসল নয় বরং নিউরন থেকে আসা সিদ্ধান্তের ফল, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগঠিত হয়। যদি কেউ পিন দ্বারা খোঁচা দেয় তখন কি ঘটে। পিনের খোঁচা বাহ্যিক উদ্দীপক (Stimulus)। ত্বকের গ্রাহক (Receptor) কোষ উদ্দীপনা গ্রহণ করে সংজ্ঞাবহ স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। সেখান থেকে নির্দেশ আসে Motor nerve এর মাধ্যমে পেশীতে। তারপর হাত সরিয়ে নেয়া হয়। চলার পথে আপনি বিপদগ্রস্ত হয়েছেন। কিংবা কোন ভয়ানক জন্তুর সামনে পড়ে গেছেন। এমতাবস্থায় Neuron সিদ্ধান্ত দেবে, কারো সাহায্যের জন্য চিৎকার কর কিংবা একটি লাঠি হাতে নাও অথবা গাছ বেয়ে উপরে ওঠে যাও। এভাবে আমাদের বুদ্ধি, বিবেচনা এবং সিদ্ধান্ত প্রদানকারী স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষুদ্রতম একক নিউরন।

অতএব নিউরন এতই বিস্ময়কর স্নায়ুকোষ যার বহুবিধ কার্যপ্রণালী বিজ্ঞানীদের আকুল পাথারে ফেলে দিয়েছে।

سَنُرِيهِمُ ابْتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنْفُسِهِمْ
We will show our signs in your own selves.
আমাদের নির্দেশনা সমূহ তোমাদের নিজেদের মধ্যে প্রতিভাত হবে। (হা-মীম ৫৩)

وَفِي الْأَرْضِ ايْتُ لِلْمُوقِنِينَ. وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ.
On the earth are signs for those of assured faith as also in your own selves, will you not then see?
পৃথিবী জুড়ে রয়েছে একান্ত বিশ্বাসীদের জন্য অনেক প্রমাণ, আরো রয়েছে তোমাদের নিজেদের মধ্যে। তারপরেও কি তোমরা প্রত্যক্ষ করবে না? (যারিয়াত ২০-২১)

মানুষের মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্রের একক নিউরনকে আল-কোরআন 'আয়াত' (Sign) হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যাতে করে জ্ঞানী লোকেরা এসব আয়াতের বিস্ময়কর তথ্যাবলী আবিষ্কার করে নেয়। আর আল্লাহ তা'আলার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

📘 Biggan moy quran > 📄 হৃদপিন্ড (Hearts)

📄 হৃদপিন্ড (Hearts)


হৃদপিন্ড (Hearts)
মহান আল্লাহ তা'আলার আর একটি অসাধারণ সৃষ্টি হৃদপিন্ড (hearts)। এটি দেহের সমস্ত অংশে রক্ত সঞ্চারণের জন্য পাম্প যন্ত্রের (pumping machine) মতো কাজ করে। চলমান এ যন্ত্রটি দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে শিরার (vein) মাধ্যমে আনীত রক্ত ধমনীর (artery) সাহায্যে শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রেরণ করে। হৃদপিন্ড প্রতিটি সুস্থ মানুষের জীবদ্দশায় গড়ে ২৬০০ মিলিয়ন বার স্পন্দিত হয়ে প্রতিটি নিলয় (ventricle) থেকে প্রায় ১৫৫ মিলিয়ন লিটার (দেড় লক্ষ টন) রক্ত বের করে দেয়।

হৃদপেশী দ্বারা নির্মিত হৃদপিন্ড, যার মধ্যে রয়েছে চারটি প্রকোষ্ঠ ও চারটি ভাল্ভ। এটি সংকোচন (systole) এবং প্রসারণ (diastole) প্রক্রিয়ায় শিরার মাধ্যমে দূষিত রক্ত টেনে আনে। এরপর উক্ত রক্ত পরিশুদ্ধ করে ধমনীর সাহায্যে শরীরের বিস্তৃত অংশে ছড়িয়ে দেয়। হৃদপিন্ডের সংকোচন ও প্রসারণ প্রক্রিয়ায় যে ছন্দময় স্পন্দন উদগত হয় তা জীবনের গতি সচল রাখে। এ স্পন্দন বন্ধ হলেই জীবনের সমাপ্তি ঘটে। প্রতিবার হৃদ স্পন্দনের সময় কতগুলো পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন ঘটে এবং পরবর্তী স্পন্দনের সময় তার পুনরাবৃত্তি হয়। এটাকে বলা হয় হৃদ চক্র (cardiac cycle)। সুস্থ মানবদেহে হৃদপিন্ড প্রতিমিনিটে ৬০-৭০ বার অর্থাৎ গড়ে ৬৫ বার স্পন্দিত হয় এবং প্রতিটি চক্রে সময় লাগে মাত্র ০.৮ সেকেন্ড।

আলিন্দের ঘটনা প্রবাহঃ নিলয়ের ঘটনা প্রবাহঃ
অলিন্দের সংকোচন = ০.১ সেঃ নিলয়ের সংকোচন = ০.৩ সেঃ
অলিন্দের প্রসারণ = ০.৭ সেঃ নিলয়ের প্রসারণ = ০.৫ সেঃ
= ০.৮ সেকেন্ড = ০.৮ সেকেন্ড
وَهُوَ الَّذِي أَنْشَأَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ قَلِيلًا مَا تَشْكُرُونَ.
It is He Who created for you ears, eyes and hearts; little thanks do you give.
তিনি সেই মহান সত্তা যিনি তোমাদের জন্য কান, চোখ এবং হৃদয় সৃষ্টি করেছেন, অথচ তোমরা খুব কম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (মুমিনুন-৭৮)

হৃদপিন্ডের কার্যপ্রণালী অত্যন্ত জটিল। দেহের ভিতরে রক্ত গতিশীল রাখাই হৃদপিন্ডের কাজ। শরীরের ঊর্ধ্বভাগ থেকে CO₂ সমৃদ্ধ দূষিত রক্ত সুপেরিয়র ভেনা ক্যাভা এবং নিম্নভাগ থেকে ইনফেরিয়র ভেনা ক্যাভার মাধ্যমে হৃদপিন্ডের ডান অলিন্দে (Right atrium) প্রবেশ করে। সেখান থেকে দক্ষিণ নিলয়ে বাহিত হয়। ফুসফুস থেকে O₂ সমৃদ্ধ রক্ত, দু'টি ফুসফুসীয় শিরার মাধ্যমে বাম অলিন্দে পৌঁছায়। সেখান থেকে রক্ত বাম নিলয়ে চলে যায়। এটাই হার্টের আসল কর্মপ্রক্রিয়া।

ডান অলিন্দ ফুসফুস
পালমোনারী- মহাধমনী -পালমোনারী শিরা
মহাশিরা- -বাম অলিন্দ
ডান নিলয়- -বাম নিলয়
সিস্টেমিক মহাধমনী
হৃদপিন্ডে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া

দক্ষিণ অলিন্দের গাত্রে এক ধরনের বিশেষ কোষ হার্টের পেসমেকার বা গতি নির্ধারক হিসেবে কাজ করে। এর নাম Sino Atrial node সংক্ষেপে S.A. Node। হার্টের উপর দিয়ে প্রবাহিত বৈদ্যুতিক প্রবাহ বা ঢেউ এখান থেকে শুরু হয়। S.A. Node নষ্ট হয়ে গেলে আজকাল কৃত্রিম পেসমেকার লাগিয়ে রোগীকে কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখা হয়। হার্টের স্বাভাবিক কর্মকান্ডের জন্য যে দু'টি রক্তনালী দ্বারা রক্ত পৌঁছায় ঐ দু'টি রক্তনালীর নাম করোনারী ধমনী। করোনারী ধমনীর অনেক শাখা প্রশাখা হৃদপিন্ডের পেশীর ভিতরে বিস্তার লাভ করে এবং কোষ সমূহের স্বাভাবিক কাজ কর্ম ঠিক রাখে। কিন্তু হার্টের কাজকর্মে বিপত্তির কারণ করোনারী ধমনীতে জমে যাওয়া একদলা রক্ত কিংবা এক টুকরা চর্বি। এ ধমনীর অনুরূপ ধমনী মানুষের উরুতে রয়েছে, যা কেটে নিয়ে ডাক্তারেরা হার্টে লাগিয়ে থাকেন নষ্ট করোনারী ধমনীর স্থলে। করোনারী ধমনী নষ্ট হয়ে যাবে। আর মেহেরবান আল্লাহ সে ধমনীর ব্যবস্থা করে রেখেছেন মানুষের উরুতে। এরকম অনেক নিদর্শন মানুষের শরীরে বিদ্যমান যার কতকটা আবিষ্কার হয়েছে, কতকটা হয়নি।

وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
And Allah has brought you forth from the wombs of your mothers when you knew nothing and He gave you senses of hearing and sight and hearts so that you may give thanks to Allah.
আল্লাহ মাতৃগর্ভ থেকে তোমাদের বের করেছেন যখন তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের কর্ণ, চক্ষু এবং হৃদপিন্ড দিয়েছেন যেন তোমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (নাহর-৭৮)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00