📄 কোয়াসার (Quasar)
কোয়াসার (Quasar):
মহাকাশের রহস্যময় আবেগদীপ্ত জ্যোতিষ্ক- কোয়াসার। এদের দেখতে তারার মত মনে হয়। অথচ তারা নয়। "Quasar" নামটি এসেছে "Quasi-star" বা Quasi-stellar, Object" থেকে। যার অর্থ কিছুটা তারার মত কিছুটা নয়। মহাকাশের অসংখ্য তারার ভিড়ে মিশে থাকা কোয়াসার বহুকাল পূর্বে নভোচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু তাদের কৌতূহলদীপ্ত আচরণের দরুন সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়নি। একবার মহাকাশ ভ্রমণ কালে বিজ্ঞানীরা রেডিও তরঙ্গ ধরার চেষ্টা করছিলেন। এমন সময় ২-৩ টি অতি উজ্জ্বল তারা নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন যে, এরা তীব্র রেডিও তরঙ্গ পাঠাচ্ছে। যা অন্যান্য নক্ষত্রের সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
পরে ১৯৬৩ সালের 3C273 নামক একটি কোয়াসার আবিষ্কার হওয়ার পর এদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। এরা আভ্যন্তরীণ প্রচন্ড চাপ ও তাপের মাধ্যমে নিজেদের রূপান্তর ঘটায় না। তারারা যে প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন করে তা কোয়াসারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এদের উজ্জ্বলতা এতোই দীপ্তিময় যা সকল উজ্জ্বল নক্ষত্রকে ম্লান করে দেয়ার মত বলিষ্ঠ। কোয়াসারের আরও কতগুলো রহস্যজনক আচরণ প্রতিভাত হয়েছে যা বিজ্ঞানীদের জ্ঞান বুদ্ধির অগম্য।
সৌরজগতের নিকটতম কোয়াসার 3C273 থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ১৫০ কোটি বৎসর। দূরতম কোয়াসার 3C9 থেকে আলোকরশ্মি পৃথিবীতে পৌঁছতে যে সময় প্রয়োজন হবে তার পরিমাণ হচ্ছে ১০০০ কোটি (একহাজার কোটি) বৎসর। পৃথিবীর বয়স এখন ৪৬০ কোটি বৎসরের মত। তাহলে 3c9 এর আলো পৃথিবীতে পৌঁছবে আরো ৫৪০ কোটি বৎসর পরে। বর্তমান এক হাজারের মত কোয়াসার আবিষ্কৃত হয়েছে। এরা অকল্পনীয় দূরত্বে থাকার ফলে আল্লাহর অনন্য সৃষ্টি "কোয়াসার" দেখে আমাদের নয়ন জুড়াতে পারি না।
إِنَّ فِي السَّمُوتِ وَالْأَرْضِ لَآيَتِ لِلْمُؤْمِنِينَ.
Verily in the heavens and the earth are signs for those who believe.
নিশ্চয়ই নভোমন্ডলে এবং ভূ-মন্ডলে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে অনেক নিদর্শন (জাসিয়া-৩)
📄 সিরিয়াস (Sirius)
সিরিয়াস (Sirius)
দূরত্বের দ্বারা নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্য কীভাবে প্রবাহিত হচ্ছে, সে হিসাব না করলে অর্থাৎ পৃথিবী থেকে যেমন দেখায় তার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করলে রাতের আকাশে উজ্জ্বলতম তারা যেটি সেটার নাম সিরিয়াস (Sirius)। আল-কোরআনে এ তারাটির নাম এমনভাবে বিবৃত হয়েছে যা আলোচ্য তারাটির নামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি পৃথিবীর নিকটতম তারাদের মধ্যে একটি। এর উজ্জ্বল রূপ নিশি গগনে ঝলসে ওঠে।
وَإِنَّهُ هُوَ رَبَّ الشِّعْرَى
That He is the Lord of Sirius.
আর তিনি সিরিয়াস নক্ষত্রের মালিক। (নজম-৪৯)
সূর্যের পরে যে তারাটি আমাদের নিকটবর্তী তারার নাম প্রক্সিমা সেন্টরাই (Proxima Centauri)। এটি ৪.২৮ আলোক বর্ষ দূরে অবস্থিত। প্রক্সিমা সেন্টরাই থেকে অল্প কিছু দূরে আরও দুটি চিহ্ন খচিত তারা রয়েছে। তাদের নাম দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে Alpha Centauri A এবং Alpha Centauri B। পরস্পর খুব কাছাকাছি আছে বলেই এ দুটি তারার দূরত্ব প্রায় সমান। অর্থাৎ ৪.৩৮ আলোক বর্ষ। পৃথিবী থেকে এসব তারার প্রদীপ্ত রূপ নজর করা যায়।
وَلَقَدْ زَيَّنَا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ.
We have adorned the earth's sky with lamps.
আমরা পার্থিব আকাশকে তারকা প্রদীপ দিয়ে সজ্জিত করেছি। (মূলক-৫)
📄 নীহারিকা (Nebula)
মহাশূন্যে কুহেলিকার মত দেখায়। তবে কুহেলিকা নয়। এদের নাম নীহারিকা বা নেবুলা। নীহারিকা মহাকাশে অবস্থিত বিশালকার গ্যাসপিন্ড। এদের আকার আকৃতিতে সর্বপ্রকার বৈচিত্র্য লক্ষ্যণীয়। নিজস্ব আকৃতি অনুযায়ী নীহারিকাদের পৃথক পৃথক নাম দেয়া হয়েছে। যেমনঃ কালপুরুষ নীহারিকা (great nebula in orion) উত্তর আমেরিকা নীহারিকা, কর্কট নীহারিকা (crab nebula) ইত্যাদি। আবার দীপ্তিময়তার বিচারে নীহারিকা দু'ধরনের। Bright Nebula এবং Dark Nebula। দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে গভীর অন্ধকারে একটি নীহারিকা আছে। দূরবীন দিয়ে দেখলে খুব ভালভাবে দেখা যায়। এমন কি অনুকূল ক্ষেত্রে খালি চোখেও এটি দৃষ্ট হয়। এর নাম অঙ্গারধার নীহারিকা (the coalsack nebula)। আর একটি নীহারিকার নাম দেয়া হয়েছে Horsehead Nebula। এটি এক বৃহৎ উজ্জ্বল নীহারিকা। এর অগ্রভাগ দেখতে ঘোড়ার মস্তকের মত। তাই এর নাম অশ্বমুন্ড নীহারিকা।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তত্ত্ব অনুযায়ী নীহারিকাদের উৎপত্তি একাধিক সূত্রে ঘটতে পারে। এর অন্যতম সূত্র হচ্ছে তারকার বিস্ফোরণ (explosion)। অতি পরিণত দশায় উত্তীর্ণ কিছু তারা মাঝে মধ্যে আভ্যন্তরীণ কারণে বিস্ফোরিত হয়। হঠাৎ এসব তারা বৃহৎ এবং উজ্জ্বল হয়ে ফেটে পড়ে। বিস্ফোরণের পর যে পরিবর্তন ঘটে সে পরিবর্তিত তারার পরিবর্তনের মাত্রা অনুযায়ী তাকে নোভা (nova) কিংবা অতিনোভা (Supernova) বলা হয়। এ ঘটনার ফলে তারাটির বহিঃর্ভাগ তার কেন্দ্রীয় ঘন মধ্যভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় অংশে থেকে যায় ভরের সিংহভাগ। এ অংশটি ধীর ধীরে পূর্বের আকার এবং ঔজ্জ্বল্য লাভ করে আর উৎক্ষিপ্ত বহিঃর্ভাগ নীহারিকায় (nebula) পরিণত হয়।
একটি নীহারিকা ধীরে ধীরে মহাকাশের চতুর্দিকে বিরাজমান ক্ষীণ লঘু বস্তুর সমাহার থেকে যথেষ্ট পরিমাণ বস্তু নিজের দেহের সাথে যুক্ত করে নেয়। এভাবে নীহারিকাটি যখন যথেষ্ট ভরবিশিষ্ট হয়ে পড়ে তখন অভিকর্ষ বলের (gravity force) প্রভাবে সেটি ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। সংকোচনের এক পর্যায়ে নীহারিকাটির ভেতরে এমন প্রচন্ড চাপ ও তাপের সৃষ্টি হয় যার পরিপ্রেক্ষিতে পারমাণবিক রূপান্তর শুরু হয়। লঘু মৌলগুলো ধাপে ধাপে ভারী মৌলে পরিণত হয়। নীহারিকার ভেতর এ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেলেই সেটি নক্ষত্রে (Star) প্রবর্তিত হয় এবং আকাশের নক্ষত্র জগতে তারার আবির্ভাব ঘটে।
مَا نَنْسَحُ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنْسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِنْهَا أَوْ مِثْلِهَا
None of our signs do We abrogate or cause to be forgotten but We substitute something better or similar. Do you not know Allah is powerful over everything?
আমরা কোন নিদর্শন রদ করলে কিংবা বিস্তৃত করে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা সমপর্যায়ের নিদর্শন আনয়ন করি। আপনি কি জানেন না আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান? (বাকারা-১০৬)
অশ্বমুন্ড নীহারিকা (The Horsehead Nebula)
📄 গ্রহ (Planet)
গ্রহ (Planet)
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে (modern astronomy) গ্রহকেও জ্যোতিষ্কের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কেননা গ্রহদের দৃশ্য আলো নেই বটে কিন্তু এরা অদৃশ্য বিকিরণ পাঠাতে সক্ষম। যেমন রেডিও তরঙ্গ (Radio wave), x-Ray ইত্যাদি।
গ্রহগুলি নির্দিষ্ট নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট নক্ষত্র থেকে আলো (Light) লাভ করে উজ্জ্বল হয়। উদাহরণ স্বরূপ সৌরজগতের (solar system) ১১ টি গ্রহ সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। আমাদের পৃথিবী সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহ, সূর্যের আলো দ্বারা আলোকিত।
গ্রহগুলি মূলতঃ কঠিন পদার্থে গঠিত। বিরাট ভর বিশিষ্ট নয় বিধায় এরা পারমাণবিক সংযোজন প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন করতে পারে না। তবে নক্ষত্র থেকে শক্তি লাভ করে। গ্রহের বহুমুখী জটিল ঘূর্ণন প্রক্রিয়ার ফলে তার কেন্দ্রে একটি অন্তর্মুখী শক্তি সৃষ্টি হয়। এর নাম মাধ্যাকর্ষণ শক্তি (Gravity force) এ শক্তির টানে গ্রহে অবস্থিত বস্তুগুলো সমবেত থাকে। তবে একেক গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বৈশিষ্ট্য একক রকম।
মহাকাশে নক্ষত্রের চেয়ে গ্রহগুলির অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ় (rigid)। সহজে এদের আকার আকৃতির বড় ধরনের পরিবর্তন হয় না। অবিরাম ঘুরে। ঘুরার সময় কতগুলো নিয়ম-কানুন মেনে চলে। বিজ্ঞানী কেপলার সর্বপ্রথম এ নিয়মগুলো আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন গ্রহসমূহ সুনির্দিষ্ট বিধি মেনে চলতে বাধ্য।
وَمِنْ آيَتِهِ أَنْ تَقُومَ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ بِأَمْرِهِ.
And among His signs is that the heaven and the earth (planet) remain firm by His command.
আল্লাহর নিদর্শন সমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবী তাঁর আদেশে সুদৃঢ় রয়েছে। (রূম-২৫)
পৃথিবী ব্যতীত অন্য কোন গ্রহে এযাবৎ প্রাণের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়নি। প্রাণের সন্ধানে গ্রহ থেকে গ্রহে বিজ্ঞানীরা প্রাণান্তকর অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। সৌর জগতের বাইরে এখন অনেক গ্রহ আবিষ্কার হয়েছে। সে সব গ্রহে এখনো অভিযান শুরু হয়নি। অবশেষে যদি কোন গ্রহে প্রাণের সন্ধান মিলে, সেটি হবে মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়। কেননা আল-কোরআন এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে।
وَمِنْ أَيْتِهِ خَلْقُ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَثَّ فِيهِمَا مِنْ دَابَّةٍ وَهُوَ عَلَى جَمْعِهِمْ إِذَا يَشَاءُ قَدِيرٌ
And among his signs is the creation of the heavens and the earth and the living creatures that He has scattered through them and He has power to gather them together when He wills.
তাঁর ইঙ্গিত সমূহের একটি--নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সৃষ্টি এবং এতদোভয়ের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া জীব। তিনি যখন ইচ্ছা এগুলোকে একত্র করতে সক্ষম। (শুরা-২৯)
اللهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمُوتٍ وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ.
Allah is He Who created the seven heavens and the earth also in equal number.
তিনি আল্লাহ, যিনি সপ্ত আকাশ সৃষ্টি করেছেন এবং সম সংখ্যক পৃথিবী ও সৃষ্টি করেছেন। (তালাক-১২)
উক্ত আয়াত দু'টি থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, পৃথিবীতে জীবন ধারণের জন্য যেমন রয়েছে উপযুক্ত পরিবেশ, বায়ুমন্ডল, অক্সিজেন এবং পানি তেমনি পৃথিবীর অনুরূপ পরিবেশ মন্ডিত আরো ৬টি গ্রহ আছে যেগুলো এখনো আবিষ্কার হয়নি। এখন সবাই খুবই আশান্বিত যে, পৃথিবীর অনুরূপ গ্রহ অবশ্যই রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তা আবিষ্কৃত হবেই।