📄 গ্যালাক্সির জন্ম
গ্যালাক্সির জন্ম
রাতের আকাশে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অগণিত তারা। আসলে কি তারারা এমন বিশৃঙ্খলভাবে মহাকাশে বিরাজ করে? মোটেই না। তারাগুলো বিশাল বিশাল জোটবদ্ধ হয়ে আছে। এ জোটবদ্ধ তারার দলকে বলা হয় গ্যালাক্সি বা নক্ষত্রমন্ডলী। গ্যালাক্সি হলো তারকাদের আবাসস্থল। মহাকর্ষ শক্তি দ্বারা বাঁধা নিয়ম। বিভিন্ন আকারের গ্যালাক্সি রয়েছে। আমাদের গ্যালাক্সির নাম Milky Way Galaxy বা ছায়াপথ গ্যালাক্সি। এর আকার পেঁচানো গোলাকার (spiral)। এরূপ অসংখ্য কোটি গ্যালাক্সি রয়েছে মহাবিশ্ব জুড়ে। একটি গ্যালাক্সিতে থাকে সূর্য, গ্রহ-উপগ্রহ, লক্ষ লক্ষ গ্রহাণু, কোটি কোটি ধূমকেতু এবং উল্কা, নীহারিকা।
অসীম অন্তরীক্ষ এখনো অপার রহস্যে পরিপূর্ণ, যার এক কণা পরিমাণ জানার গর্ব বিজ্ঞানীরা করেন না। কিছুদিন পূর্বে মহাকাশে বসানো হাবল টেলিস্কোপ থেকে নতুন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ৫০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে স্কালপটর (Sculptor) মণ্ডলে চাকার মতো একটি গ্যালাক্সি রয়েছে। আকার-আয়তনে এটি আমাদের গ্যালাক্সির মতোই। দেখা গেছে, এ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে আর একটি গ্যালাক্সি প্রচণ্ড বেগে ঢুকে যায়। ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ওখানে শক ওয়েভের সৃষ্টি হয় এবং প্রচুর পরিমাণে ধূলি ও মেঘ উৎপন্ন হয়। বিজ্ঞানীরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেন, গ্যালাক্সিটির পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ায় পরবর্তী সংকোচনের ফলে কোটি কোটি নতুন নক্ষত্রের জন্ম নেয়। এমনই একটি নক্ষত্র 'ইটা ক্যারিনা'। দক্ষিণ আকাশে এটি দেখা যায়। আকারে বিশাল এবং তীব্র জ্যোতির্ময়। সূর্যের চেয়ে ৫০ গুণ বড় এবং ৪০ লক্ষ গুণ উজ্জ্বল। এ নক্ষত্রের উজ্জ্বলতার একমাত্র কারণ বড় বড় দুটি অগ্নিগোলকের আকস্মিক বিস্ফোরণ। সুতরাং গ্যালাক্সির সাথে গ্যালাক্সির সংঘর্ষ থেকেই মহাবিশ্বে জন্ম নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ তারা, যারা নতুন গ্যালাক্সি গঠন করে মহাবিশ্বকে সমৃদ্ধ করছে। মহান গ্রন্থ আল-কোরআন মহাকাশের এসব বিস্ময়কর সৃষ্টির প্রতি জ্ঞানী লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছে:
وَسَخَّرَ لَكُمُ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومُ مُسَخَّرَاتٌ بِأَمْرِهِ ۖ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَٰتٍ لِّقَوْمٍ يَّعْقِلُونَ
He has made subject to you the night and the day, the sun and the moon and the stars are in subjection by His command. Verily in these are signs for men who are wise.
তিনি তোমাদের কাজে নিয়োজিত করেছেন রাত্রি, দিন, সূর্য এবং চন্দ্রকে এবং নক্ষত্রমন্ডলী (Galaxy) তাঁরই বিধানের কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানসমৃদ্ধ লোকদের জন্য রয়েছে অনেক নির্দেশনা। (নাহল-১২)
পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি গ্যালাক্সিতে চাঁদ, সূর্য, গ্রহ-উপগ্রহ, নক্ষত্র ইত্যাদি থাকে এবং সেখানে রাত-দিন ঘটে। আলোচ্য আয়াতে গ্যালাক্সিতে সংঘটিত ঘটনার কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
আমাদের ছায়াপথ গ্যালাক্সি
📄 তারা (Star)
তারা (Star)
তারা শব্দটি আমাদের কাছে যতটা পরিচিত এর সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে আমরা ততটা উদাসীন। কারণ আমাদের কাছে মনে হয়, যেন রাতের আকাশে কতগুলো কেরোসিনের চেরাগ মিটমিট করে জ্বলছে। অথচ আল্লাহ তাআলা আকাশে তারা প্রদর্শন করেন মানুষের চিন্তার জগতকে নাড়া দেয়ার জন্য।
তারা বিরাট বিরাট ভর বিশিষ্ট (massive) আকাশী বস্তু। সাধারণত এরা গ্যাস গঠিত এবং বিপুল শক্তির উৎস। পারমানবিক সংযোজন (atomic fusion) প্রক্রিয়ায় এরা নিজেদের দেহে শক্তি উৎপন্ন করে। এর ফলে আলো, তাপ এবং শক্তি চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
তারার জন্ম ও বিবর্তন একটি চিত্তাকর্ষক ঘটনা। তারার জীবনচক্র শুরু হয়েছিল ছায়াপথে নিজেদের মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ভেঙ্গে পড়া ঘন মেঘের হাইড্রোজেনের ও হিলিয়াম গ্যাসের ত্বরণের মাধ্যমে। এ মেঘের তাপমাত্রা ছিল প্রায় -173°C। হাইড্রোজেনের মেঘ যদি ক্ষুদ্র হয় এবং পারিপার্শ্বিক অণুগুলি যদি পরস্পরের নিকটে না থাকে তাহলে তাদের পরস্পরের মধ্যকার আকর্ষণ এমন হয় না যে, তাদের আচরণের কোন পরিবর্তন ঘটতে পারে। মেঘের আকার যদি বড় হয় তাহলে প্রতিটি অণুর মধ্যকার মহাকর্ষ বল বেশী হয়। ফলে মেঘকে ভিতরের দিকে টানে এবং নিজস্ব মহাকর্ষ বলের প্রভাবে মেঘগুলো সংকুচিত হতে থাকে একটি নাটকীয় প্রক্রিয়ায়। এরূপ সংকোচনশীল গ্যাসীয় ভরকে বলা হয় প্রোটোস্টার (protostar)।
প্রোটোস্টার যখন সংকুচিত হয় তখন গ্যাসীয় মেঘের পরমাণুগুলোর পরস্পরের সাথে সংঘর্ষ ঘটে। ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সংকোচন লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলে। যার দরুন তাপমাত্রা -173°C থেকে বৃদ্ধি পেয়ে 10^7 ডিগ্রী সেলসিয়াসে এসে দাড়ায়। এ অতি উচ্চ তাপমাত্রায় হাইড্রোজেন পরমাণু হিলিয়াম পরমাণুতে প্রবর্তিত হয় এবং চারটি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস সংযোজিত হয়ে একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরী করে। তখন যে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয় তা বিভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলোকরশ্মি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এর তাপমাত্রা ও চাপ আরও বৃদ্ধি পায়। প্রোটোস্টার জ্যোতি ছড়াতে থাকে এবং তারায় পরিণত হয়।
সৌর জগতের কেন্দ্রে অবস্থিত আমাদের কাছে অতি পরিচিত সূর্য (Sun) একটি জ্বলন্ত তারা। এটি পৃথিবীর সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় এতো উজ্জ্বল এবং বড় দেখায়। কিন্তু সূর্যের চেয়ে লক্ষগুণ উজ্জ্বল এবং বিশাল আকারের তারা মহাকাশে রয়েছে। যেমন বেটলজিযুজ (Betelgeuse) নক্ষত্র। সূর্যের ব্যাস ১৩,৯২,০০০ কিঃ মিঃ। বেটলজিযুজ এর ব্যাস সূর্যের চেয়ে ৮০০ গুণ বেশী। অর্থাৎ সূর্যের মত ৫০,০০,০০,০০০ (৫০ কোটি) তারা বেটলজিযুজের ধারণ ক্ষমতা আছে। সূর্যের ভরের ৫০ গুণ বেশী ভর বিশিষ্ট দুটি তারা আছে। এরা একে অপরের কাছাকাছি থেকে একটি যুগ্ম তারা (Binary star) গঠন করেছে। আবিষ্কারকের নাম অনুসারে এদের একযোগে নাম দেয়া হয়েছে Plaskett's Star। সূর্যের চেয়ে ৫০,০০০ গুণ উজ্জ্বল একটি তারা রাতের আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলে। যার নাম বেটেলজুস (Rigel)। গভীর দক্ষিণে আর একটি দীপ্ত নক্ষত্র, যার নাম S. Doradus (এস. ডোরাডাস)। এটি সূর্যের চেয়ে ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) গুণ উজ্জ্বল। অতএব উল্লেখিত তারা সমূহ সুবিশাল দূরত্বে থাকার দরুন কোনটাকে বিন্দুর মত দেখা যায়। কোনটা একেবারে দেখা যায় না।
وَالسَّمَاءِ وَالطَّارِقِ. وَمَا أَدْرَكَ مَا الطَّارِقِ النَّجْمُ الثَّاقِبُ.
By the sky and the night visitant, and what will explain to you what the night visitant is? It is the star of piercing brightness.
শপথ আকাশের এবং রাতে আগমনকারীর। আপনাকে বুঝিয়ে বলব রাতে আগমনকারী কি? এটি হচ্ছে অতি উজ্জ্বল তারা। (তারিক ১-৩)
📄 কোয়াসার (Quasar)
কোয়াসার (Quasar):
মহাকাশের রহস্যময় আবেগদীপ্ত জ্যোতিষ্ক- কোয়াসার। এদের দেখতে তারার মত মনে হয়। অথচ তারা নয়। "Quasar" নামটি এসেছে "Quasi-star" বা Quasi-stellar, Object" থেকে। যার অর্থ কিছুটা তারার মত কিছুটা নয়। মহাকাশের অসংখ্য তারার ভিড়ে মিশে থাকা কোয়াসার বহুকাল পূর্বে নভোচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু তাদের কৌতূহলদীপ্ত আচরণের দরুন সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়নি। একবার মহাকাশ ভ্রমণ কালে বিজ্ঞানীরা রেডিও তরঙ্গ ধরার চেষ্টা করছিলেন। এমন সময় ২-৩ টি অতি উজ্জ্বল তারা নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন যে, এরা তীব্র রেডিও তরঙ্গ পাঠাচ্ছে। যা অন্যান্য নক্ষত্রের সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
পরে ১৯৬৩ সালের 3C273 নামক একটি কোয়াসার আবিষ্কার হওয়ার পর এদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। এরা আভ্যন্তরীণ প্রচন্ড চাপ ও তাপের মাধ্যমে নিজেদের রূপান্তর ঘটায় না। তারারা যে প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন করে তা কোয়াসারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এদের উজ্জ্বলতা এতোই দীপ্তিময় যা সকল উজ্জ্বল নক্ষত্রকে ম্লান করে দেয়ার মত বলিষ্ঠ। কোয়াসারের আরও কতগুলো রহস্যজনক আচরণ প্রতিভাত হয়েছে যা বিজ্ঞানীদের জ্ঞান বুদ্ধির অগম্য।
সৌরজগতের নিকটতম কোয়াসার 3C273 থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ১৫০ কোটি বৎসর। দূরতম কোয়াসার 3C9 থেকে আলোকরশ্মি পৃথিবীতে পৌঁছতে যে সময় প্রয়োজন হবে তার পরিমাণ হচ্ছে ১০০০ কোটি (একহাজার কোটি) বৎসর। পৃথিবীর বয়স এখন ৪৬০ কোটি বৎসরের মত। তাহলে 3c9 এর আলো পৃথিবীতে পৌঁছবে আরো ৫৪০ কোটি বৎসর পরে। বর্তমান এক হাজারের মত কোয়াসার আবিষ্কৃত হয়েছে। এরা অকল্পনীয় দূরত্বে থাকার ফলে আল্লাহর অনন্য সৃষ্টি "কোয়াসার" দেখে আমাদের নয়ন জুড়াতে পারি না।
إِنَّ فِي السَّمُوتِ وَالْأَرْضِ لَآيَتِ لِلْمُؤْمِنِينَ.
Verily in the heavens and the earth are signs for those who believe.
নিশ্চয়ই নভোমন্ডলে এবং ভূ-মন্ডলে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে অনেক নিদর্শন (জাসিয়া-৩)
📄 সিরিয়াস (Sirius)
সিরিয়াস (Sirius)
দূরত্বের দ্বারা নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্য কীভাবে প্রবাহিত হচ্ছে, সে হিসাব না করলে অর্থাৎ পৃথিবী থেকে যেমন দেখায় তার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করলে রাতের আকাশে উজ্জ্বলতম তারা যেটি সেটার নাম সিরিয়াস (Sirius)। আল-কোরআনে এ তারাটির নাম এমনভাবে বিবৃত হয়েছে যা আলোচ্য তারাটির নামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি পৃথিবীর নিকটতম তারাদের মধ্যে একটি। এর উজ্জ্বল রূপ নিশি গগনে ঝলসে ওঠে।
وَإِنَّهُ هُوَ رَبَّ الشِّعْرَى
That He is the Lord of Sirius.
আর তিনি সিরিয়াস নক্ষত্রের মালিক। (নজম-৪৯)
সূর্যের পরে যে তারাটি আমাদের নিকটবর্তী তারার নাম প্রক্সিমা সেন্টরাই (Proxima Centauri)। এটি ৪.২৮ আলোক বর্ষ দূরে অবস্থিত। প্রক্সিমা সেন্টরাই থেকে অল্প কিছু দূরে আরও দুটি চিহ্ন খচিত তারা রয়েছে। তাদের নাম দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে Alpha Centauri A এবং Alpha Centauri B। পরস্পর খুব কাছাকাছি আছে বলেই এ দুটি তারার দূরত্ব প্রায় সমান। অর্থাৎ ৪.৩৮ আলোক বর্ষ। পৃথিবী থেকে এসব তারার প্রদীপ্ত রূপ নজর করা যায়।
وَلَقَدْ زَيَّنَا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ.
We have adorned the earth's sky with lamps.
আমরা পার্থিব আকাশকে তারকা প্রদীপ দিয়ে সজ্জিত করেছি। (মূলক-৫)