📄 মহাজাগতিক বিবর্তন
মহাজাগতিক বিবর্তন (Cosmological Evolution)
মহাজগত সৃষ্টির সূচনা কিভাবে হয়েছিল? কোন্ সময় থেকে মহাবিশ্বের শুরু? এসব প্রশ্ন সভ্যতার প্রারম্ভে মানুষের মনে অনুসন্ধিৎসা জাগিয়েছে। আর এসব প্রশ্নকে কেন্দ্র করে অতীতে বহু কল্প-কাহিনী জন্ম হয়েছে।
বর্তমানকালে এসব প্রশ্নের জবাব সন্ধানে বেশকিছু উচ্চ পর্যায়ের চিন্তাশীল বিজ্ঞানী গবেষণা কর্মে নিজেদের নিয়োজিত করে রেখেছেন। গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ফলাফল থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টির যে তত্ত্ব বেরিয়ে এসেছে তার নাম Big Bang theory বা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব। এ তত্ত্ব সমস্ত বিজ্ঞানীরা স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ (cosmic background radiations) থেকে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, প্রায় ১৫ বিলিয়ন বছর আগে এক ভয়ানক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাজগত সৃষ্টির সূচনা হয়।
The Big Bang: এ তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্বের সকল অংশ একসময় খুব সন্নিবিষ্ট ছিল। প্রকৃতপক্ষে এরা অতি ক্ষুদ্র (ultra-small), অতি ঘন (ultra-dense), অতি তপ্ত গুচ্ছের (ultra-hot clump) মধ্যে আঁটিবদ্ধ অবস্থায় ছিল। এগুলো সুদূর অতীতে বিগ্ ব্যাঙ নামক ভয়ংকর মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে বিস্তৃতি লাভ করতে শুরু করে এবং স্থান-কাল (time and space), পদার্থ ও শক্তিকে অস্তিত্ব দান করে। প্রথমে চারটি মৌলিক শক্তি যথা, মহাকর্ষ শক্তি (gravitation force), বিদ্যুৎ চুম্বকীয় শক্তি (electromagnetic force) সবল নিউক্লিয় শক্তি (strong nuclear force) এবং দুর্বল নিউক্লিয় শক্তি (weak nuclear force) একীভূত অবস্থায় ছিল। বিকিরণের চাপ সমাহারে সম্প্রসারণের পক্ষে সহায়ক ছিল। ফলে ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, কিছু পরিমাণ হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাসের সমন্বয়ে গঠিত বস্তুপিন্ড ঘন মেঘপুঞ্জে পরিণত হয়েছিল। এসব মেঘপুঞ্জের নিজস্ব মাধ্যাকর্ষণ শক্তি থাকার দরুন সংকুচিত হতে পারতো। কিন্তু পরস্পর দুই বিপরীত শক্তির (gravitation and expansion) মিথস্ক্রিয়ার (interaction) ফলে ঐ মেঘপুঞ্জের মধ্যে তীব্র গতির আবির্ভাব ঘটল। এদের জোরালো আবর্তন গতিও ছিল। এ গতি-আবর্তনের প্রভাবে গ্যাসীয় মেঘমালা বিভিন্ন আকার ধারণ করতে লাগলো। যেমন- গোলাকার, মোচাকার, ডিম্বাকার এবং আরও অন্যান্য আকার। এ আকৃতি বিশিষ্ট গ্যাসীয় মেঘপুঞ্জ চূড়ান্ত পর্যায়ে গ্যালাক্সিতে পরিণত হয়।
মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ এবং Big Bang তত্ত্বের সত্যতা (Cosmic Background radiation and confirmation of Big Bang Theory)
Big Bang বা মহাবিস্ফোরণ উত্তর পরিস্থিতি এবং বিগ ব্যাঙ যে ঘটেছে তার সম্ভাব্যতা জানার জন্য ১৯৪৬ সনে বিজ্ঞানী জর্জ গ্যামো আদি অগ্নিবলের (Primeval fireball) তাপমাত্রা হিসেব করার মত দূরূহ কর্মে হাত দিয়েছিলেন। এ হিসেবের সঠিক তথ্য লাভ করা খুবই কঠিন ও জটিল ব্যাপার। যে ঘটনা সুদূর অতীতে ঘটে গেছে তার সম্পর্কে কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা সম্ভব সে বিষয়ে চিন্তা করলে এটা খুবই বিস্ময়কর।
আদি বস্তুপিন্ডকে (Primeval Atom) 10¹³ ডিগ্রী K তাপমাত্রায় রেখে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করে একটি অবিশ্বাস্য মাত্রার ঘনত্বে পর্যবসিত করা যায়। এরূপ অতি উষ্ণ ও অতি ঘনত্বের আদি বস্তুপিন্ডটির মহা বিস্ফোরণের পর সমগ্র বিশ্ব ঠান্ডা হতে শুরু করছিল। বিজ্ঞানী গ্যামো প্রমাণ করেছিলেন যে, উত্তপ্ত আদি যুগের বিকিরণ যে ঠান্ডা হয়ে আজকের অবস্থায় এসে পৌঁছেছে তা এখনো দর্শনযোগ্য। এ বিকিরণই হলো মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ বা পশ্চাতের বিকিরণ যা ২ মিমি মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ-দৈর্ঘ্যের উপরে আরোহণ করে এবং ৩°K ব্লাকবডী (Black body) বিকিরণের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে চলে। মাইক্রোতরঙ্গ বিকিরণের সুষম ফ্লাক্স যা মহাশূন্যে সর্বত্রগামী বলে বিশ্বাস করা হয়।
এ বিকিরণ আবিষ্কার করেন ১৯৬৫ সনে আরনো পেনজিয়াস এবং রবার্ট ইউলসন নামক দুইজন পদার্থ বিজ্ঞানী এবং তা মহাবিশ্বের প্রকৃতি ও ইতিহাস অনুধাবনের প্রয়াসে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। ১৯৭০ দশকের শেষ দিকে জ্যোতিঃ পদার্থবিদগণ প্রায় সবাই স্বীকার করে নেন যে, মাইক্রোতরঙ্গ বিকিরণের উৎস হলো Big Bang বা মহাবিস্ফোরণ কালে উৎক্ষিপ্ত অগ্নিগোলকের অবশেষ। মাইক্রোওয়েভ বিকিরণের বর্ণালির একটি মাত্র কম্পাংশে পার্থক্য পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সমগ্র বর্ণালী সম্পর্কে যে সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তা মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্বের ক্ষেত্রে এক বিরাট ঘটনা। উত্তপ্ত, সংকুচিত আদি মহাবিশ্ব ধারণার পক্ষে মহাজাগতিক মাইক্রোতরঙ্গ বিকিরণ এখনো পর্যন্ত লভ্য প্রমাণ সমূহের মধ্যে সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ।
হাবলের সূত্র (Hubble’s Law): ১৯২৯ সনে বিজ্ঞানী হাবল ঘোষণা দেন যে, গ্যালাক্সিগুলো আমাদের দিক থেকে সকল দিকে ছুটে চলেছে। এ গ্যালাক্সিগুলোর দূরত্ব এবং এদের পশ্চাদগামী হওয়ার গতিবেগের মধ্যে একটি রৈখিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এদের এ গতিবেগ এদের দূরত্বের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। অর্থাৎ দূরত্ব যত বৃদ্ধি পায় গতিবেগও তত বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ নিয়মকেই বলা হয় Hubble's Law। মাউন্ট উইলসনে অবস্থিত বিখ্যাত জ্যোতিষ্ক সম্বন্ধীয় গবেষণাগারে গ্যালাক্সিদের Red shift সম্বন্ধে গবেষণা চালিয়ে হাবল্ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, গ্যালাক্সিদের পশ্চাদগমনের দূরত্ব যত বৃদ্ধি পায় তাদের গতিবেগও তত বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।
দূরত্বের সঙ্গে গতিবেগের সর্বোত্তম হিসেবের অনুপাতকে বলা হয় হাবলস্ কনষ্ট্যান্ট (Hubble constant)। এর অনুপাতের বিপরীত হলো হাবল্ সময় (Hubble Time) যে সময়ে একটি গ্যালাক্সি তার বর্তমান গতিবেগসহ তার বর্তমান অবস্থায় পৌছতে পারে। অন্যভাবে বলতে গেলে এভাবে বলতে হয় যে, Big Bang এর সময় থেকে তার বর্তমান সময় পর্যন্ত। এ তথ্য অনুসারে ১৫ বিলিয়ন বছর আগে, চাঁদ, সূর্য, গ্যালাক্সি কিছুই ছিল না। অর্থাৎ তখন নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের কোন অস্তিত্ব ছিল না।
গ্যালাক্সির জন্ম
রাতের আকাশে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অগণিত তারা। আসলে কি তারারা এমন বিশৃঙ্খলভাবে মহাকাশে বিরাজ করে? মোটেই না। তারা গুলো বিশাল বিশাল জোট বেধে আছে। এ জোট বদ্ধ তারার দলকে বলা হয় গ্যালাক্সি বা নক্ষত্রমন্ডলী। গ্যালাক্সি হলো তারকাদের আবাসস্থল। মহাকর্ষ শক্তি দ্বারা বাধা নিয়ম। বিভিন্ন আকারের গ্যালাক্সি রয়েছে। আমাদের গ্যালাক্সির নাম Milky Way Galaxy বা ছায়াপথ গ্যালাক্সি। এর আকার পেঁচানো গোলাকার (spiral)। এরূপ অসংখ্য কোটি গ্যালাক্সি রয়েছে মহাবিশ্ব জুড়ে। একটি গ্যালাক্সিতে থাকে সূর্য, গ্রহ-উপগ্রহ, লক্ষ লক্ষ গ্রহাণু, কোটি কোটি ধূমকেতু এবং উল্কা, নীহারিকা।
অসীম অন্তরীক্ষ এখনো অপার রহস্যে পরিপূর্ণ। যার এক কণা পরিমাণ জানার গর্ব বিজ্ঞানীরা করেন না। কিছু দিন পূর্বে মহাকাশে বসানো হাবল টেলিস্কোপ থেকে নতুন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে ৫০০ মিলিয়ন আলোক বর্ষ দূরে স্কাল্পটর (Sculptor) মন্ডলে চাকার মত একটি গ্যালাক্সি রয়েছে। আকার আয়তনে এটি আমাদের গ্যালাক্সির মতই। দেখা গেছে এ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে আর একটি গ্যালাক্সি প্রচন্ড বেগে ঢুকে যায়। ঢুকার সঙ্গে সঙ্গে ওখানে শক্ ওয়েভের সৃষ্টি হয় এবং প্রচুর পরিমাণে ধূলি ও মেঘ উৎপন্ন হয়। বিজ্ঞানীরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেন গ্যালাক্সিটির পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ায় পরবর্তী সংকোচনের ফলে কোটি কোটি নতুন নক্ষত্রের জন্ম নেয়। এমনই একটি নক্ষত্র 'ইটা ক্যারিনা'। দক্ষিণ আকাশে এটি দেখা যায়। আকারে বিশাল এবং তীব্র জ্যোতির্ময়। সূর্যের চেয়ে ৫০ গুণ বড় এবং ৪০ লক্ষগুণ উজ্জ্বল। এ নক্ষত্রের উজ্জ্বলতার একমাত্র কারণ বড় বড় দু'টি অগ্নিগোলকের আকস্মিক বিস্ফোরণ। সুতরাং গ্যালাক্সির সাথে গ্যালাক্সির সংঘর্ষ থেকেই মহাবিশ্বে জন্ম নিচ্ছে লক্ষ তারা, যারা নতুন গ্যালাক্সি গঠন করে মহাবিশ্বকে সমৃদ্ধ করছে। মহান গ্রন্থ আল-কোরআন মহাকাশের এসব বিস্ময়কর সৃষ্টির প্রতি জ্ঞানী লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছে—
وَسَخَّرَ لَكُمُ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومُ مُسَخَّرَاتٌ بِأَمْرِهِ ۖ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَٰتٍ لِّقَوْمٍ يَّعْقِلُونَ
He has made subject to you the night and the day, the sun and the moon and the stars are in subjection by His command. Verily in these are signs for men who are wise.
তিনি তোমাদের কাজে নিয়োজিত করেছেন রাত্রি, দিন, সূর্য এবং চন্দ্রকে এবং নক্ষত্রমন্ডলী (Galaxy) তাঁরই বিধানের কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানসমৃদ্ধ লোকদের জন্য রয়েছে অনেক নির্দেশনা। (নাহল-১২)
তারা (Star)
তারা শব্দটি আমাদের কাছে যতটা পরিচিত এর সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে আমরা ততটা উদাসীন। কারণ আমাদের কাছে মনে হয়, যেন রাতের আকাশে কতগুলো কেরোসিনের চেরাগ মিটমিট করে জ্বলছে। অথচ আল্লাহ তাআলা আকাশে তারা প্রদর্শন করেন মানুষের চিন্তার জগতকে নাড়া দেয়ার জন্য।
তারা বিরাট বিরাট ভর বিশিষ্ট (massive) আকাশী বস্তু। সাধারণত এরা গ্যাস গঠিত এবং বিপুল শক্তির উৎস। পারমাণবিক সংযোজন (atomic fusion) প্রক্রিয়ায় এরা নিজেদের দেহে শক্তি উৎপন্ন করে। এর ফলে আলো, তাপ এবং শক্তি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
তারার জন্ম ও বিবর্তন একটি চিত্তাকর্ষক ঘটনা। তারার জীবনচক্র শুরু হয়েছিল ছায়াপথে নিজেদের মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ভেঙ্গে পড়া ঘন মেঘের হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাসের ত্বরণের মাধ্যমে। এ মেঘের তাপমাত্রা ছিল প্রায় -173°C। হাইড্রোজেনের মেঘ যদি ক্ষুদ্র হয় এবং পারিপার্শ্বিক অণুগুলি যদি পরস্পরের নিকটে না থাকে তাহলে তাদের পরস্পরের মধ্যকার আকর্ষণ এমন হয় না যে, তাদের আচরণের কোন পরিবর্তন ঘটতে পারে। মেঘের আকার যদি বড় হয় তাহলে প্রতিটি অণুর মধ্যকার মহাকর্ষ বল বেশী হয়। ফলে মেঘকে ভিতরের দিকে টানে এবং নিজস্ব মহাকর্ষ বলের প্রভাবে মেঘগুলো সংকুচিত হতে থাকে একটি নাটকীয় প্রক্রিয়ায়। এরূপ সংকোচনশীল গ্যাসীয় ভরকে বলা হয় প্রোটোস্টার (protostar)।
প্রোটোস্টার যখন সংকুচিত হয় তখন গ্যাসীয় মেঘের পরমাণুগুলোর পরস্পরের সাথে সংঘর্ষ ঘটে। ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সংকোচন লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলে। যার দরুন তাপমাত্রা -173°C থেকে বৃদ্ধি পেয়ে 10⁷ ডিগ্রী সেলসিয়াসে এসে দাঁড়ায়। এ অতি উচ্চ তাপমাত্রায় হাইড্রোজেন পরমাণু হিলিয়াম পরমাণুতে প্রবর্তিত হয় এবং চারটি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস সংযোজিত হয়ে একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরী করে। তখন যে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয় তা বিভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলোকরশ্মি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এর তাপমাত্রা ও চাপ আরও বৃদ্ধি পায়। প্রোটোস্টার জ্যোতি ছড়াতে থাকে এবং তারায় পরিণত হয়।
সৌর জগতের কেন্দ্রে অবস্থিত আমাদের কাছে অতি পরিচিত সূর্য (Sun) একটি জ্বলন্ত তারা। এটি পৃথিবীর সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় এতো উজ্জ্বল এবং বড় দেখায়। কিন্তু সূর্যের চেয়ে লক্ষগুণ উজ্জ্বল এবং বিশাল আকারের তারা মহাকাশে রয়েছে। যেমন বেটলজিউজ (Betelgeuse) নক্ষত্র। সূর্যের ব্যাস ১৩,৯২,০০০ কিমি। বেটলজিউজ এর ব্যাস সূর্যের চেয়ে ৮০০ গুণ বেশী। অর্থাৎ সূর্যের মত ৫০,০০,০০,০০০ (৫০ কোটি) তারা বেটলজিউজের ধারণ ক্ষমতা আছে। সূর্যের ভর ২×১০³⁰ কেজি। সূর্যের ভরের ৫০ গুণ বেশী ভর বিশিষ্ট দুটি তারা আছে। এরা একে অপরের কাছাকাছি থেকে একটি যুগ্ম তারা (Binary star) গঠন করেছে। আবিষ্কারকের নাম অনুসারে এদের একযোগে নাম দেয়া হয়েছে Plasket's star। সূর্যের চেয়ে ৫০,০০০ গুণ উজ্জ্বল একটি তারা রাতের আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলে। যার নাম বেটেলজিউজ (Rigel)। গভীর দক্ষিণে আর একটি দীপ্ত নক্ষত্র, যার নাম S. Doradas (এস. ডোরাডাস)। এটি সূর্যের চেয়ে ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) গুণ উজ্জ্বল। অতএব উল্লেখিত তারা সমূহ সুবিশাল দূরত্বে থাকার দরুন কোনটাকে বিন্দুর মত দেখা যায়। কোনটা একেবারে দেখা যায় না।
وَالسَّمَاءِ وَالطَّارِقِ. وَمَا أَدْرَكَ مَا الطَّارِقِ النَّجْمُ الثَّاقِبُ.
By the sky and the night visitant, and what will explain to you what the night visitant is? It is the star of piercing brightness.
শপথ আকাশের এবং রাতে আগমনকারীর। আপনাকে বুঝিয়ে বলব রাতে আগমনকারী কি? এটি হচ্ছে অতি উজ্জ্বল তারা। (তারিক ১.২.৩)
কোয়াসার (Quasar):
মহাকাশের রহস্যময় আবেগদীপ্ত জ্যোতিষ্ক- কোয়াসার। এদের দেখতে তারার মত মনে হয়। অথচ তারা নয়। "Quasar" নামটি এসেছে "Quasi-star" বা "Quasi-stellar Object" থেকে। যার অর্থ কিছুটা তারার মত কিছুটা নয়। মহাকাশের অসংখ্য তারার ভিড়ে মিশে থাকা কোয়াসার বহুকাল পূর্বে নভোচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু তাদের কৌতূহলদীপ্ত আচরণের দরুন সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়নি। একবার মহাকাশ ভ্রমণ কালে বিজ্ঞানীরা রেডিও তরঙ্গ ধরার চেষ্টা করছিলেন। এমন সময় ২-৩ টি অতি উজ্জ্বল তারা নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন যে, এরা তীব্র রেডিও তরঙ্গ পাঠাচ্ছে। যা অন্যান্য নক্ষত্রের সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
পরে ১৯৬৩ সালের 3C273 নামক একটি কোয়াসার আবিষ্কার হওয়ার পর এদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। এরা আভ্যন্তরীণ প্রচন্ড চাপ ও তাপের মাধ্যমে নিজেদের রূপান্তর ঘটায় না। তারারা যে প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন করে তা কোয়াসারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এদের উজ্জ্বলতা এতোই দীপ্তিময় যা সকল উজ্জ্বল নক্ষত্রকে ম্লান করে দেয়ার মত বলিষ্ঠ। কোয়াসারের আরও কতগুলো রহস্যজনক আচরণ প্রতিভাত হয়েছে যা বিজ্ঞানীদের জ্ঞান বুদ্ধির অগম্য।
সৌরজগতের নিকটতম কোয়াসার 3C273 থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ১৫০ কোটি বৎসর। দূরতম কোয়াসার 3C9 থেকে আলোকরশ্মি পৃথিবীতে পৌছতে যে সময় প্রয়োজন হবে তার পরিমাণ হচ্ছে ১০০০ কোটি (একহাজার কোটি) বৎসর। পৃথিবীর বয়স এখন ৪৬০ কোটি বৎসরের মত। তাহলে 3C9 এর আলো পৃথিবীতে পৌঁছবে আরো ৫৪০ কোটি বৎসর পরে। বর্তমান এক হাজারের মত কোয়াসার আবিষ্কৃত হয়েছে। এরা অকল্পনীয় দূরত্বে থাকার ফলে আল্লাহর অনন্য সৃষ্টি "কোয়াসার" দেখে আমাদের নয়ন জুড়াতে পারি না।
إِنَّ فِي السَّمُوتِ وَالْأَرْضِ لَآيَتِ لِلْمُؤْمِنِينَ.
Verily in the heavens and the earth are signs for those who believe.
নিশ্চয়ই নভোমন্ডলে এবং ভূ-মন্ডলে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে অনেক নিদর্শন (জাসিয়া-৩)
সিরিয়াস (Sirius)
দূরত্বের দ্বারা নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্য কিভাবে প্রবাহিত হচ্ছে সে হিসেব না করলে অর্থাৎ পৃথিবী থেকে যেমন দেখায় তার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করলে রাতের আকাশে উজ্জ্বলতম তারা যেটি সেটার নাম সিরিয়াস (Sirius)। আল-কোরআনে এ তারাটির নাম এমন ভাবে বিবৃত হয়েছে যা আলোচ্য তারাটির নামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি পৃথিবীর নিকটতম তারাদের মধ্যে একটি। এর উজ্জ্বল রূপ নিশি গগণে ঝলসে ওঠে।
وَإِنَّهُ هُوَ رَبَّ الشِّعْرَى
That He is the Lord of sirius.
আর তিনি সিরিয়াস নক্ষত্রের মালিক। (নজম-৪৯)
সূর্যের পরে যে তারাটি আমাদের নিকটবর্তী তার নাম প্রক্সিমা সেন্টরাই (Proxima Centauri)। এটি ৪.২৮ আলোক বর্ষ দূরে অবস্থিত। প্রক্সিমা সেন্টরাই থেকে অল্প কিছু দূরে আর দুটি চিহ্ন খচিত তারা রয়েছে। তাদের নাম দেয়া হয়েছে যথাক্রমে Alpha Centauri A এবং Alpha Centauri B। পরস্পর খুব কাছাকাছি আছে বলেই এ দু'টি তারার দূরত্ব প্রায় সমান। অর্থাৎ ৪.৩৮ আলোক বর্ষ। পৃথিবী থেকে এসব তারার প্রদীপ্ত রূপ নজর করা যায়।
وَلَقَدْ زَيَّنَا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ.
We have adorned the earth's sky with lamps.
আমরা পার্থিব আকাশকে তারকা প্রদীপ দিয়ে সজ্জিত করেছি। (মূলক-৫)
নীহারিকা (Nebula)
মহাশূন্যে কুহেলীকার মত দেখায়। তবে কুহেলীকা নয়। এদের নাম নীহারিকা বা নেবুলা। নীহারিকা মহাকাশে অবস্থিত বিশালকার গ্যাসপিন্ড। এদের আকার আকৃতিতে সর্বপ্রকার বৈচিত্র্য লক্ষ্যণীয়। নিজস্ব আকৃতি অনুযায়ী নীহারিকাদের পৃথক পৃথক নাম দেয়া হয়েছে। যেমনঃ কালপুরুষ নীহারিকা (great nebula in Orion) উত্তর আমেরিকা নীহারিকা, কর্কট নীহারিকা (crab nebula) ইত্যাদি। আবার দীপ্তিময়তার বিচারে নীহারিকা দু'ধরনের। Bright Nebula এবং Dark Nebula। দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে গভীর অন্ধকারে একটি নীহারিকা আছে। দূরবীন দিয়ে দেখলে খুব ভালভাবে দেখা যায়। এমন কি অনুকূল ক্ষেত্রে খালি চোখেও এটি দৃষ্ট হয়। এর নাম অঙ্গারধার নীহারিকা (the coalsack nebula)। আর একটি নীহারিকার নাম দেয়া হয়েছে Horsehead Nebula। এটি এক বৃহৎ উজ্জ্বল নীহারিকা। এর অগ্রভাগ দেখতে ঘোড়ার মস্তকের মত। তাই এর নাম অশ্বমুন্ড নীহারিকা।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তত্ত্ব অনুযায়ী নীহারিকাদের উৎপত্তি একাধিক সূত্রে ঘটতে পারে। এর অন্যতম সূত্র হচ্ছে তারকার বিস্ফোরণ (explosion)। অতি পরিণত দশায় উত্তীর্ণ কিছু তারা মাঝে মধ্যে আভ্যন্তরীণ কারণে বিস্ফোরিত হয়। হঠাৎ এসব তারা বৃহৎ এবং উজ্জ্বল হয়ে ফেটে পড়ে। বিস্ফোরণের পর যে পরিবর্তন ঘটে সে পরিবর্তিত তারার পরিবর্তনের মাত্রা অনুযায়ী তাকে নোভা (nova) কিংবা অতিনোভা (Super Nova) বলা হয়। এ ঘটনার ফলে তারাটির বহিঃর্ভাগ তার কেন্দ্রীয় ঘন মধ্যভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় অংশে থেকে যায় ভরের সিংহভাগ। এ অংশটি ধীর ধীরে পূর্বের আকার এবং ঔজ্জ্বল্য লাভ করে আর উৎক্ষিপ্ত বহিঃর্ভাগ নীহারিকায় (nebula) পরিণত হয়।
একটি নীহারিকা ধীরে ধীরে মহাকাশের চতুর্দিকে বিরাজমান ক্ষীণ লঘু বস্তুর সমাহার থেকে যথেষ্ট পরিমাণ বস্তু নিজের দেহের সাথে যুক্ত করে নেয়। এভাবে নীহারিকাটি যখন যথেষ্ট ভরবিশিষ্ট হয়ে পড়ে তখন অভিকর্ষ বলের (gravity force) প্রভাবে সেটি ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। সংকোচনের এক পর্যায়ে নীহারিকাটির ভেতরে এমন প্রচন্ড চাপ ও তাপের সৃষ্টি হয় যার পরিপ্রেক্ষিতে পারমাণবিক রূপান্তর শুরু হয়। লঘু মৌলগুলো ধাপে ধাপে ভারী মৌলে পরিণত হয়। নীহারিকার ভেতর এ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেলেই সেটি নক্ষত্রে (Star) প্রবর্তিত হয় এবং আকাশের নক্ষত্র জগতে তারার আবির্ভাব ঘটে।
مَا نَنْسَحُ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنْسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِنْهَا أَوْ مِثْلِهَا
None of our signs do We abrogate or cause to be forgotten but We substitute something better or similar. Do you not know Allah is powerful over everything?
আমরা কোন নিদর্শন রদ করলে কিংবা বিস্তৃত করে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা সমপর্যায়ের নিদর্শন আনয়ন করি। আপনি কি জানেন না আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান? (বাকারা-১০৬)
গ্রহ (Planet)
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে (modern astronomy) গ্রহকেও জ্যোতিষ্কের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কেননা গ্রহদের দৃশ্য আলো নেই বটে কিন্তু এরা অদৃশ্য বিকিরণ পাঠাতে সক্ষম। যেমন রেডিও তরঙ্গ (Radio wave), X-Ray ইত্যাদি।
গ্রহগুলি মূলতঃ কঠিন পদার্থে গঠিত। বিরাট ভর বিশিষ্ট নয় বিধায় এরা পারমাণবিক সংযোজন প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন করতে পারে না। তবে নক্ষত্র থেকে শক্তি লাভ করে। গ্রহের বহুমুখী জটিল ঘূর্ণন প্রক্রিয়ার ফলে তার কেন্দ্রে একটি অন্তমুখী শক্তি সৃষ্টি হয়। এর নাম মাধ্যাকর্ষণ শক্তি (Gravity force) এ শক্তির টানে গ্রহে অবস্থিত বস্তুগুলো সমবেত থাকে। তবে একেক গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বৈশিষ্ট্য একক রকম।
মহাকাশে নক্ষত্রের চেয়ে গ্রহগুলির অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ় (rigid)। সহজে এদের আকার আকৃতির বড় ধরনের পরিবর্তন হয়না। অবিরাম ঘুরে। ঘুরার সময় কতগুলো নিয়ম-কানুন মেনে চলে। বিজ্ঞানী কেপলার সর্বপ্রথম এ নিয়মগুলো আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন গ্রহসমূহ সুনির্দিষ্ট বিধি মেনে চলতে বাধ্য।
وَمِنْ آيَتِهِ أَنْ تَقُومَ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ بِأَمْرِهِ.
And among His signs is that the heaven and the earth (planet) remain firm by His command.
আল্লাহর নিদর্শন সমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবী তাঁর আদেশে সুদৃঢ় রয়েছে। (রূম-২৫)
পৃথিবী ব্যতীত অন্য কোন গ্রহে এযাবৎ প্রাণের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়নি। প্রাণের সন্ধানে গ্রহ থেকে গ্রহে বিজ্ঞানীরা প্রাণান্তকর অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। সৌর জগতের বাইরে এখন অনেক গ্রহ আবিষ্কার হয়েছে। সে সব গ্রহে এখানো অভিযান শুরু হয়নি। অবশেষে যদি কোন গ্রহে প্রাণের সন্ধান মিলে, সেটি হবে মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়। কেননা আল-কোরআন এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে।
وَمِنْ أَيْتِهِ خَلْقُ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَثَّ فِيهِمَا مِنْ دَابَّةٍ وَهُوَ عَلَى جَمْعِهِمْ إِذَا يَشَاءُ قَدِيرٌ
And among his signs is the creation of the heavens and the earth and the living creatures that He has scattered through them and He has power to gather them together when He wills.
তাঁর ইঙ্গিত সমূহের একটি--নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সৃষ্টি এবং এতদোভয়ের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া জীব। তিনি যখন ইচ্ছা এগুলোকে একত্র করতে সক্ষম। (শুরা-২৯)
اللهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمُوتٍ وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ.
Allah is He Who created the seven heavens and the earth also in equal number.
তিনি আল্লাহ, যিনি সপ্ত আকাশ সৃষ্টি করেছেন এবং সম সংখ্যক পৃথিবীও সৃষ্টি করেছেন। (তালাক-১২)
উক্ত আয়াত দু'টি থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, পৃথিবীতে জীবন ধারণের জন্য যেমন রয়েছে উপযুক্ত পরিবেশ, বায়ুমন্ডল, অক্সিজেন এবং পানি তেমনি পৃথিবীর অনুরূপ পরিবেশ মন্ডিত আরো ৬টি গ্রহ আছে যেগুলো এখনো আবিষ্কার হয়নি। এখন সবাই খুবই আশান্বিত যে, পৃথিবীর অনুরূপ গ্রহ অবশ্যই রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তা আবিষ্কৃত হবেই।
উপগ্রহ (Satellite)
উপগ্রহগুলি অনেকাংশে গ্রহের অনুরূপ। গ্রহের মত কঠিন পদার্থে গঠিত। কিন্তু গ্রহ থেকে আকারে ছোট। উপগ্রহের নিজস্ব কোন আলো নেই। নক্ষত্র থেকে আলোক রশ্মি উপগ্রহে প্রতিফলিত হয়। চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ (satellite)। এটি সূর্য থেকে আলো প্রাপ্ত হয়ে পৃথিবীতে আলো পাঠায়। সূর্যের সাত রং থেকে হলুদ (yellow), কমলা (orange) এবং লাল (red) রং চাঁদের মাটি শোষণ করে এবং আলো তিনটির সংমিশ্রণে এমন একটি মধুর আলো সৃষ্টি করে যার নাম জ্যোৎস্স্না (moonlight)। আল্লাহ তা'আলার সৃষ্ট জ্যোৎস্নায় কার না নয়ন জুড়ায়।
এ যাবৎ সৌরজগতের গ্রহগুলির মোট ৪৮টি উপগ্রহ আবিষ্কার হয়েছে। উপগ্রহগুলি গ্রহের চারপাশে ঘুরে। তেমনি এক জটিল প্রক্রিয়ায় সূর্যকেও প্রদক্ষিণ করে।
وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيهِنَّ نُورًا .
And He has made the moon a light reflecting satellite in the heavens.
তিনি নভোমন্ডলে চাঁদকে জ্যোৎস্না সৃষ্টিকারী উপগ্রহ বানিয়েছেন। (নূহ-১৬)
وَإِذَا النُّجُومُ انْكَثَرَتُ.
By the moon as she follows him (the sun)
শপথ চন্দ্রের যখন সে সূর্যকে অনুসরণ করে (শামছ-২)
গ্রহাণু (Asteroid)
মহাকর্ষ বলের (gravitation force) প্রভাবে সৌরজগতের পরিমন্ডলে ঝাঁক বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। এসব কোন আকাশী বস্তু (heavenly bodies)? অপূর্ব শৃংখলায় সূর্যের চার পার্শ্বে নিবিড় বন্ধন রচনা করেছে এরা কি গ্রহাণু? হ্যাঁ, এদের নাম গ্রহাণু বা Asteroids। লক্ষ লক্ষ গ্রহ, উপগ্রহ এবং গ্রহাণু সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। পৃথিবী থেকে এদের সুশৃংখল পরিক্রমণ আমরা খালি চোখে পর্যবেক্ষণ করতে পারিনা বটে। কিন্তু টেলিস্কোপে এরা অবশ্যই ধরা পড়ে। তবে একটি গ্রহাণুর নাম করা যায়। সেটি হচ্ছে ভেস্টা (Vesta)। বৃহত্তর না হলেও ভেস্টা হচ্ছে গ্রহাণুদের মধ্যে উজ্জ্বলতম। পৃথিবী ঘুরছে বিধায় তার সাথে গ্রহাণুদের দূরত্বে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। সে সুবাধে ভেষ্টার সাথে পৃথিবীর দূরত্ব যখন সবচেয়ে কম হয় তখন অনুকূল পরিবেশে একে (ভেষ্টাকে) খালি চোখে দেখা যায়। তাও কিন্তু সাজ সরঞ্জামের সাহায্য নিয়ে আগে থেকে জেনে নিতে হয় আকাশে ওর সঠিক অবস্থানটা কোথায়। ভেষ্টা নিজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, এমন কখনো নয়।
অতএব, মহাকর্ষ শক্তির প্রভাবে সৌরজগতের চতুর্দিকে পাক খাচ্ছে মনোরম গ্রহাণুপুঞ্জ (Asteroids Belt)।
إِنَّا زَيَّنَا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِزِينَةِ الْكَوَاكِبِ.
We have indeed decorated the lower heaven with beauty (in) the planets (Asteroids).
বস্তুত: আমরা প্রথম আকাশকে গ্রহাণুপুঞ্জে সুশোভিত করেছি। (সাফ্ফাত-৬)
আরবী "কওকাব" (كوكب) অর্থ হতে পারে গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহাণু, নক্ষত্র, Comet shooting star ইত্যাদি।
উল্কা (Meteor)
মেঘমুক্ত রাতের আকাশে প্রায় চোখে পড়ে উজ্জ্বল আলোর রেখা হঠাৎ ফুটে ওঠে। আবার সাথে সাথে মিলিয়ে যায়। এমন ঘটনাকে বলা হয় উল্কাপাত বা তারা খসা (Shooting star)। যে বস্তু গুলোকে এভাবে আত্মপ্রকাশ হতে দেখা যায় তাদের বলা হয় উল্কা (Meteor)। উল্কাদের নিজস্ব কোন আলো নেই। তাপহীন, দীপ্তিহীন এসব বস্তুপিণ্ড মহাকাশে ইতস্ততঃ ছড়িয়ে আছে, কখনো দলবদ্ধভাবে, কখনো বা বিচ্ছিন্নভাবে।
গতিশীলতার কারণে মাঝে মধ্যে কোন কোন উল্কা পৃথিবীর ধারে কাছে এসে পড়ে। তখন আর যায় কোথায়। পৃথিবীর অভিকর্ষ বল (Gravity force) ওদের প্রচন্ডভাবে টানতে থাকে। ফলে ওরা পৃথিবীর দিকে ছুটে আসতে বাধ্য হয়। তখন পৃথিবীর বায়ু মন্ডলের বিভিন্ন স্তরে অবস্থিত গ্যাসীয় পদার্থের সাথে ধাবমান উল্কাপিন্ডগুলির সংঘর্ষ বাঁধে। যার দরুন ভীষণ উত্তপ্ত হয়ে ওরা জ্বলে উঠে। আর জ্বলন্ত উল্কাগুলি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। এটা হচ্ছে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা।
কিন্তু মহান আল্লাহ তা'আলা এই পরিকল্পনার ভিতর ইবলিসের জন্য এমন এক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পাকা করে রেখেছেন যা রীতিমত আশ্চর্যজনক। তা হচ্ছে শয়তান আড়ি পেতে যখন উর্ধ্ব জগতের কোন বিধি-বিধান শ্রবণ করার চেষ্টা করে তখন চতুর্দিক থেকে তার প্রতি উল্কা নিক্ষেপ করা হয়। কারণ ইবলিশ মহাকাশের কোন বিধান যদি জেনে নিতে পারত তাহলে এতদিনে সে নভোচারীদেরকে বিভ্রান্ত করেই ছাড়তো। অধিকন্তু নভোচারীরা তাকে দেবতা মনে করে অনুসরণ করতে গিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে যেত। আল্লাহর বিস্ময়কর নিদর্শন সমূহ আবিষ্কার করা তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। জ্ঞান বিজ্ঞান আবিষ্কারে বিরাট বাঁধা সৃষ্টি হতো।
إِنَّا زَيَّنَا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِزِينَةِ الْكَوَاكِبِ. وَحِفْظًا مِنْ كُلِّ شَيْطَنٍ مَارِدٍ. لَا يَسْمَعُونَ إِلَى الْمَلَا الْأَعْلَى وَيُقْذَفُونَ مِنْ كُلِّ جَانِبِ دُحُورًا وَلَهُمْ عَذَابٌ وَاحِبٌ. إِلَّا مَنْ خَطِفَ الْخَطْفَةَ فَأَتْبَعَهُ شِهَابٌ ثَاقِبٌ.
Verily We have adorned the near heaven with the stars. And to guard against every rebellious devil. They cannot listen to the higher group for they are pelted from every side. Outcast, and theirs is a constant torment. Except such as snatch away something by stealing and they are pursued by a flaming fire of meteorites.
নিশ্চয়ই আমি নিকটবর্তী আকাশকে তারকারাজি দিয়ে সুশোভিত করেছি এবং তাকে সংরক্ষিত করেছি প্রত্যেক অবাধ্য শয়তান থেকে। ওরা উর্ধ্ব জগতের কোন কিছু শ্রবণ করতে পারে না এবং চার দিক থেকে ওদের প্রতি উল্কা নিক্ষেপ করা হয় ওদেরকে বিতাড়নের উদ্দেশ্যে। ওদের জন্য রয়েছে বিরামহীন শান্তি। তবে কেউ ছোঁ মেরে কিছু চুরি করে শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে। (সাফ্ফাত-৬-১০)
উল্কাগুলো বায়ু মন্ডলে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায় না। ভূ-পৃষ্ঠে এসে উপনীত হয়। এদের পরিভাষাগত নাম উল্কাপিন্ড বা Meteorite। উল্কাপিন্ডদের পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করে জানা গেছে যে, উপাদানের দিক থেকে ওরা প্রধানত তিন রকমের হতে পারে- প্রস্তরময় উল্কাপিন্ড (stony meteorite), লৌহ ঘটিত উল্কাপিন্ড (Iron meteorite) এবং প্রস্তর-লৌহ ঘটিত উল্কাপিন্ড (stony Iron meteorite)। প্রস্তরময় উল্কাপিন্ড প্রধানত ম্যাগনেসিয়াম ও লোহার সিলিকেট এবং অক্সাইড দ্বারা গঠিত। লৌহ গঠিত উল্কাপিন্ড লোহা, নিকেল এবং কোবাল্ট দ্বারা ঘটিত। আর এ দু'ধরনের উল্কাপিন্ডের উপাদান মিশে তৈরি হয়েছে প্রস্তর-লৌহ ঘটিত উল্কাপিন্ড। আধুনিক বিজ্ঞানের কৌশল প্রয়োগ করে এদের বয়সও নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। হিসেব অনুসারে প্রাপ্ত উল্কাপিন্ডের বয়স প্রায় 4.7×10⁹ বা ৪৭০ কোটি বছরের মত অর্থাৎ ওরা প্রায় পৃথিবীর সমবয়সী।
ধূমকেতু (Comet)
হঠাৎ আবির্ভাব ঘটে। আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। এরূপ জ্যোতিষ্কের নাম ধূমকেতু। ধূমকেতু মহাকাশের অতি বিস্ময়কর জ্যোতিষ্ক।
শ্রেণীগত বিচারে ধূমকেতুদের সঙ্গে গ্রহদের কিছু কিছু মিল পরিলক্ষিত হয়। এদের নিজস্ব আলো নেই। সূর্যের আলোতে এরা উজ্জ্বল হয়। সৌরজগতে এদের বসবাস। ধূমকেতুর আকার এতো ব্যাপক এবং বিশাল, গ্রহ তো দূরের কথা বিরাট বিরাট নক্ষত্রের মাথাও হেঁট হয়। এক একটির ব্যাস ২৯০০০ কিমি থেকে ৩৩,০০,০০,০০০ কিমি পর্যন্ত হয়ে থাকে। যেখানে সূর্যের ব্যাস ১৩,৯২,০০০ কিমি মাত্র।
পরিক্রমণ কালের উপর ভিত্তি করে ধূমকেতুকে দু'শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। স্বল্প মেয়াদী (short period) এবং দীর্ঘ মেয়াদী (Long period)। ১৫০ বছরের কম সময়ের মধ্যে যে সব ধূমকেতু সূর্যকে সম্পূর্ণ পরিক্রমণ করে তাদেরকে স্বল্প মেয়াদী ধূমকেতু বলা হয়। যেমন এ্যাংকের ধূমকেতু (Encke's comet)। এটি ৩.৩ বৎসর সময়ে একবার সূর্যকে পরিক্রমণ করে। হ্যালির ধূমকেতুও এ শ্রেণীতে পড়ে। সূর্যকে পরিক্রমণ করতে এর সময় লাগে ৭৬ বৎসর। দীর্ঘমেয়াদী ধূমকেতুর উদাহরণ কোহাউটেক ধূমকেতু (Kohoutek Comet)। এটি ১৯৭১ সালে একবার দেখা গিয়েছিল। আবার দেখা দেবে ৭৫০০০ বৎসর পরে।
ধূমকেতু সূর্যের নিকটবর্তী হলে প্রথমে অস্পষ্ট মেঘের আকারে দেখা যায়। ধীরে ধীরে এগুলোর উজ্জ্বল কেন্দ্রবিন্দু এবং কুয়াশাচ্ছন্ন কেশের ন্যায় বস্তু দৃষ্টগোচর হয়। কেন্দ্র থেকে বের হয়ে আসে উজ্জ্বল ঝাঁটার ন্যায় দীর্ঘ বাষ্পময় পুচ্ছ।
وَكَأَيِّنْ مِنْ آيَةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَمُرُّونَ عَلَيْهَا وَهُمْ عَنْهَا مُعْرِضُونَ
And How many proofs in the heavens and the earth do they pass by? yet they turn away from them!
কত সংখ্যক প্রমাণ নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলে ভাস্বর হয়ে আছে। যদিও এ সবের পাশ দিয়ে পথ চলে? তবু নিদর্শনগুলির প্রতি এতটুকু মনোনিবেশ করে না! (ইউসুফ-১০৫)
এসব আয়াত নিয়ে চিন্তা গবেষণা করলে যে কেউ মহাজগতের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন।
📄 মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ এবং Big Bang তত্ত্বের সত্যতা
মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ এবং Big Bang তত্ত্বের সত্যতা (Cosmic Background radiation and confirmation of Big Bang Theory)
Big Bang বা মহাবিস্ফোরণ উত্তর পরিস্থিতি এবং বিগ ব্যাং যে ঘটেছে তার সম্ভাব্যতা জানার জন্য ১৯৪৬ সালে বিজ্ঞানী জর্জ গ্যামো আদি অগ্নিবলের (Primeval fireball) তাপমাত্রা হিসাব করার মত দুরূহ কর্মে হাত দিয়েছিলেন। এ হিসাবের সঠিক তথ্য লাভ করা খুবই কঠিন ও জটিল ব্যাপার। যে ঘটনা সুদূর অতীতে ঘটে গেছে তার সম্পর্কে কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা সম্ভব সে বিষয়ে চিন্তা করলে এটা খুবই বিস্ময়কর।
আদি বস্তুপিণ্ডকে (Primeval Atom) 10^13 ডিগ্রী K তাপমাত্রায় রেখে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করে একটি অবিশ্বাস্য মাত্রার ঘনত্বে পর্যবসিত করা যায়। এরূপ অতি উষ্ণ ও অতি ঘনত্বের আদি বস্তুপিণ্ডটির মহা বিস্ফোরণের পর সমগ্র বিশ্ব ঠান্ডা হতে শুরু করছিল। বিজ্ঞানী গ্যামো প্রমাণ করেছিলেন যে, উত্তপ্ত আদি যুগের বিকিরণ যে ঠান্ডা হয়ে আজকের অবস্থায় এসে পৌঁছেছে তা এখনো দর্শনযোগ্য। এ বিকিরণই হলো মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ বা পশ্চাতের বিকিরণ যা ২ মিমি মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ-দৈর্ঘ্যের উপরে আরোহণ করে এবং ৩°K ব্ল্যাকবডি (Black body) বিকিরণের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে চলে। মাইক্রোতরঙ্গ বিকিরণের সুষম ফ্লাক্স যা মহাশূন্যে সর্বত্রগামী বলে বিশ্বাস করা হয়।
এ বিকিরণ আবিষ্কার করেন ১৯৬৫ সালে আরনো পেনজিয়াস এবং রবার্ট উইলসন নামক দুইজন পদার্থ বিজ্ঞানী এবং তা মহাবিশ্বের প্রকৃতি ও ইতিহাস অনুধাবনের প্রয়াসে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। ১৯৭০ দশকের শেষ দিকে জ্যোতিঃপদার্থবিদগণ প্রায় সবাই স্বীকার করে নেন যে, মাইক্রোতরঙ্গ বিকিরণের উৎস হলো Big Bang বা মহাবিস্ফোরণ কালে উৎক্ষিপ্ত অগ্নিগোলকের অবশেষ। মাইক্রোওয়েভ বিকিরণের বর্ণালির একটি মাত্র কম্পাংশে পার্থক্য পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সমগ্র বর্ণালী সম্পর্কে যে সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তা মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্বের ক্ষেত্রে এক বিরাট ঘটনা। উত্তপ্ত, সংকুচিত আদি মহাবিশ্ব ধারণার পক্ষে মহাজাগতিক মাইক্রোতরঙ্গ বিকিরণ এখনো পর্যন্ত লভ্য প্রমাণসমূহের মধ্যে সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ।
হাবলের সূত্র (Hubble’s Law): ১৯২৯ সালে বিজ্ঞানী হাবল ঘোষণা দেন যে, গ্যালাক্সিগুলো আমাদের দিক থেকে সকল দিকে ছুটে চলেছে। এ গ্যালাক্সিগুলোর দূরত্ব এবং এদের পশ্চাদগামী হওয়ার গতিবেগের মধ্যে একটি রৈখিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এদের এ গতিবেগ এদের দূরত্বের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। অর্থাৎ দূরত্ব যত বৃদ্ধি পায় গতিবেগও তত বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ নিয়মকেই বলা হয় Hubble's Law। মাউন্ট উইলসনে অবস্থিত বিখ্যাত জ্যোতিষ্ক সম্বন্ধীয় গবেষণাগারে গ্যালাক্সিদের Red shift সম্বন্ধে গবেষণা চালিয়ে হাবল এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, গ্যালাক্সিদের পশ্চাদগমনের দূরত্ব যত বৃদ্ধি পায় তাদের গতিবেগও তত বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।
দূরত্বের সঙ্গে গতিবেগের সর্বোত্তম হিসাবের অনুপাতকে বলা হয় হাবল ধ্রুবক (Hubble constant)। এর অনুপাতের বিপরীত হলো হাবল সময় (Hubble Time) যে সময়ে একটি গ্যালাক্সি তার বর্তমান গতিবেগসহ তার বর্তমান অবস্থায় পৌঁছতে পারে। অন্যভাবে বলতে গেলে এভাবে বলতে হয় যে, Big Bang এর সময় থেকে তার বর্তমান সময় পর্যন্ত। এ তথ্য অনুসারে ১৫ বিলিয়ন বছর আগে, চাঁদ, সূর্য, গ্যালাক্সি কিছুই ছিল না। অর্থাৎ তখন নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের কোন অস্তিত্ব ছিল না।
📄 গ্যালাক্সির জন্ম
গ্যালাক্সির জন্ম
রাতের আকাশে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অগণিত তারা। আসলে কি তারারা এমন বিশৃঙ্খলভাবে মহাকাশে বিরাজ করে? মোটেই না। তারাগুলো বিশাল বিশাল জোটবদ্ধ হয়ে আছে। এ জোটবদ্ধ তারার দলকে বলা হয় গ্যালাক্সি বা নক্ষত্রমন্ডলী। গ্যালাক্সি হলো তারকাদের আবাসস্থল। মহাকর্ষ শক্তি দ্বারা বাঁধা নিয়ম। বিভিন্ন আকারের গ্যালাক্সি রয়েছে। আমাদের গ্যালাক্সির নাম Milky Way Galaxy বা ছায়াপথ গ্যালাক্সি। এর আকার পেঁচানো গোলাকার (spiral)। এরূপ অসংখ্য কোটি গ্যালাক্সি রয়েছে মহাবিশ্ব জুড়ে। একটি গ্যালাক্সিতে থাকে সূর্য, গ্রহ-উপগ্রহ, লক্ষ লক্ষ গ্রহাণু, কোটি কোটি ধূমকেতু এবং উল্কা, নীহারিকা।
অসীম অন্তরীক্ষ এখনো অপার রহস্যে পরিপূর্ণ, যার এক কণা পরিমাণ জানার গর্ব বিজ্ঞানীরা করেন না। কিছুদিন পূর্বে মহাকাশে বসানো হাবল টেলিস্কোপ থেকে নতুন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ৫০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে স্কালপটর (Sculptor) মণ্ডলে চাকার মতো একটি গ্যালাক্সি রয়েছে। আকার-আয়তনে এটি আমাদের গ্যালাক্সির মতোই। দেখা গেছে, এ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে আর একটি গ্যালাক্সি প্রচণ্ড বেগে ঢুকে যায়। ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ওখানে শক ওয়েভের সৃষ্টি হয় এবং প্রচুর পরিমাণে ধূলি ও মেঘ উৎপন্ন হয়। বিজ্ঞানীরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেন, গ্যালাক্সিটির পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ায় পরবর্তী সংকোচনের ফলে কোটি কোটি নতুন নক্ষত্রের জন্ম নেয়। এমনই একটি নক্ষত্র 'ইটা ক্যারিনা'। দক্ষিণ আকাশে এটি দেখা যায়। আকারে বিশাল এবং তীব্র জ্যোতির্ময়। সূর্যের চেয়ে ৫০ গুণ বড় এবং ৪০ লক্ষ গুণ উজ্জ্বল। এ নক্ষত্রের উজ্জ্বলতার একমাত্র কারণ বড় বড় দুটি অগ্নিগোলকের আকস্মিক বিস্ফোরণ। সুতরাং গ্যালাক্সির সাথে গ্যালাক্সির সংঘর্ষ থেকেই মহাবিশ্বে জন্ম নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ তারা, যারা নতুন গ্যালাক্সি গঠন করে মহাবিশ্বকে সমৃদ্ধ করছে। মহান গ্রন্থ আল-কোরআন মহাকাশের এসব বিস্ময়কর সৃষ্টির প্রতি জ্ঞানী লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছে:
وَسَخَّرَ لَكُمُ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومُ مُسَخَّرَاتٌ بِأَمْرِهِ ۖ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَٰتٍ لِّقَوْمٍ يَّعْقِلُونَ
He has made subject to you the night and the day, the sun and the moon and the stars are in subjection by His command. Verily in these are signs for men who are wise.
তিনি তোমাদের কাজে নিয়োজিত করেছেন রাত্রি, দিন, সূর্য এবং চন্দ্রকে এবং নক্ষত্রমন্ডলী (Galaxy) তাঁরই বিধানের কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানসমৃদ্ধ লোকদের জন্য রয়েছে অনেক নির্দেশনা। (নাহল-১২)
পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি গ্যালাক্সিতে চাঁদ, সূর্য, গ্রহ-উপগ্রহ, নক্ষত্র ইত্যাদি থাকে এবং সেখানে রাত-দিন ঘটে। আলোচ্য আয়াতে গ্যালাক্সিতে সংঘটিত ঘটনার কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
আমাদের ছায়াপথ গ্যালাক্সি
📄 তারা (Star)
তারা (Star)
তারা শব্দটি আমাদের কাছে যতটা পরিচিত এর সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে আমরা ততটা উদাসীন। কারণ আমাদের কাছে মনে হয়, যেন রাতের আকাশে কতগুলো কেরোসিনের চেরাগ মিটমিট করে জ্বলছে। অথচ আল্লাহ তাআলা আকাশে তারা প্রদর্শন করেন মানুষের চিন্তার জগতকে নাড়া দেয়ার জন্য।
তারা বিরাট বিরাট ভর বিশিষ্ট (massive) আকাশী বস্তু। সাধারণত এরা গ্যাস গঠিত এবং বিপুল শক্তির উৎস। পারমানবিক সংযোজন (atomic fusion) প্রক্রিয়ায় এরা নিজেদের দেহে শক্তি উৎপন্ন করে। এর ফলে আলো, তাপ এবং শক্তি চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
তারার জন্ম ও বিবর্তন একটি চিত্তাকর্ষক ঘটনা। তারার জীবনচক্র শুরু হয়েছিল ছায়াপথে নিজেদের মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ভেঙ্গে পড়া ঘন মেঘের হাইড্রোজেনের ও হিলিয়াম গ্যাসের ত্বরণের মাধ্যমে। এ মেঘের তাপমাত্রা ছিল প্রায় -173°C। হাইড্রোজেনের মেঘ যদি ক্ষুদ্র হয় এবং পারিপার্শ্বিক অণুগুলি যদি পরস্পরের নিকটে না থাকে তাহলে তাদের পরস্পরের মধ্যকার আকর্ষণ এমন হয় না যে, তাদের আচরণের কোন পরিবর্তন ঘটতে পারে। মেঘের আকার যদি বড় হয় তাহলে প্রতিটি অণুর মধ্যকার মহাকর্ষ বল বেশী হয়। ফলে মেঘকে ভিতরের দিকে টানে এবং নিজস্ব মহাকর্ষ বলের প্রভাবে মেঘগুলো সংকুচিত হতে থাকে একটি নাটকীয় প্রক্রিয়ায়। এরূপ সংকোচনশীল গ্যাসীয় ভরকে বলা হয় প্রোটোস্টার (protostar)।
প্রোটোস্টার যখন সংকুচিত হয় তখন গ্যাসীয় মেঘের পরমাণুগুলোর পরস্পরের সাথে সংঘর্ষ ঘটে। ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সংকোচন লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলে। যার দরুন তাপমাত্রা -173°C থেকে বৃদ্ধি পেয়ে 10^7 ডিগ্রী সেলসিয়াসে এসে দাড়ায়। এ অতি উচ্চ তাপমাত্রায় হাইড্রোজেন পরমাণু হিলিয়াম পরমাণুতে প্রবর্তিত হয় এবং চারটি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস সংযোজিত হয়ে একটি হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরী করে। তখন যে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয় তা বিভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলোকরশ্মি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এর তাপমাত্রা ও চাপ আরও বৃদ্ধি পায়। প্রোটোস্টার জ্যোতি ছড়াতে থাকে এবং তারায় পরিণত হয়।
সৌর জগতের কেন্দ্রে অবস্থিত আমাদের কাছে অতি পরিচিত সূর্য (Sun) একটি জ্বলন্ত তারা। এটি পৃথিবীর সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় এতো উজ্জ্বল এবং বড় দেখায়। কিন্তু সূর্যের চেয়ে লক্ষগুণ উজ্জ্বল এবং বিশাল আকারের তারা মহাকাশে রয়েছে। যেমন বেটলজিযুজ (Betelgeuse) নক্ষত্র। সূর্যের ব্যাস ১৩,৯২,০০০ কিঃ মিঃ। বেটলজিযুজ এর ব্যাস সূর্যের চেয়ে ৮০০ গুণ বেশী। অর্থাৎ সূর্যের মত ৫০,০০,০০,০০০ (৫০ কোটি) তারা বেটলজিযুজের ধারণ ক্ষমতা আছে। সূর্যের ভরের ৫০ গুণ বেশী ভর বিশিষ্ট দুটি তারা আছে। এরা একে অপরের কাছাকাছি থেকে একটি যুগ্ম তারা (Binary star) গঠন করেছে। আবিষ্কারকের নাম অনুসারে এদের একযোগে নাম দেয়া হয়েছে Plaskett's Star। সূর্যের চেয়ে ৫০,০০০ গুণ উজ্জ্বল একটি তারা রাতের আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলে। যার নাম বেটেলজুস (Rigel)। গভীর দক্ষিণে আর একটি দীপ্ত নক্ষত্র, যার নাম S. Doradus (এস. ডোরাডাস)। এটি সূর্যের চেয়ে ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) গুণ উজ্জ্বল। অতএব উল্লেখিত তারা সমূহ সুবিশাল দূরত্বে থাকার দরুন কোনটাকে বিন্দুর মত দেখা যায়। কোনটা একেবারে দেখা যায় না।
وَالسَّمَاءِ وَالطَّارِقِ. وَمَا أَدْرَكَ مَا الطَّارِقِ النَّجْمُ الثَّاقِبُ.
By the sky and the night visitant, and what will explain to you what the night visitant is? It is the star of piercing brightness.
শপথ আকাশের এবং রাতে আগমনকারীর। আপনাকে বুঝিয়ে বলব রাতে আগমনকারী কি? এটি হচ্ছে অতি উজ্জ্বল তারা। (তারিক ১-৩)