📘 Biggan moy quran > 📄 আলহুত-ইয়াকতিন

📄 আলহুত-ইয়াকতিন


আলহুত-ইয়াকতিন
فَالْتَقَمَهُ الْحُوتُ وَهُوَ مُلِيمٌ. فَلَوْلَا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ. لَلَبِثَ فِي بَطْنِهِ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ. فَنَبَذْنَاهُ بِالْعَرَاءِ وَهُوَ سَقِيمُ وَأَنْبَتْنَا عَلَيْهِ شَجَرَةً من يقطين.
Then a big fish swallowed him (Hazrat Younus A:) as he had done an act worthy of blame. Had he not been of them who glorify Allah. He would have indeed remained inside its belly (the fish) till the Day of Resurrection. But We cast him forth on the naked shore while he was sick. And We caused to grow over him, a spreading plant of the gourd kind.
তারপর একটি বড় আকারের মাছ তাঁকে [হযরত ইউনুচ (আঃ)কে] গিলে ফেলল। কারণ তিনি দুর্নাম অর্জনের কাজ করেছিলেন। যদি তিনি আল্লাহপাকের মহিমা প্রকাশ না করতেন তাহলে তাকে অবশ্যই মাছের পেটের মধ্যে কেয়ামত পর্যন্ত আবদ্ধ থাকতে হতো। কিন্তু আমরা তাঁকে উন্মুক্ত সমুদ্র-তীরে নিক্ষেপ করলাম। তখন তিনি ছিলেন অসুস্থ এবং আমরা তার (তীরের) উপর একটি লতাবিশিষ্ট বৃক্ষ উদ্‌গত করলাম। (সাফ্ফাত- ১৪২-১৪৬)

এ পাঁচটি ধারাবাহিক আয়াতে আল্লাহপাক হযরত ইউনুচ (আঃ) এর ঘটনা বর্ণনা করেছেন। হযরত ইউনুচ (আঃ) কে আসিরিয়ার রাজধানী নিনেভে প্রেরণ করা হয়েছিল। নিনেভের অবস্থান ছিল টাইগ্রীস নদীর তীরে এবং ইরাকের বর্তমান মসুল বন্দরের বিপরীত দিকে। নিনেভবাসী তাঁকে বর্জন করায় তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে তাদের কাছ থেকে দূরে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের দুষ্কর্ম তথা পাপাচার থেকে রক্ষা করার পক্ষে দায়িত্ব পালন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অধিকতর প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার পর আল্লাহ তাআলার পরবর্তী নির্দেশ আসার অপেক্ষা না করে নিনেভ শহর ত্যাগ করেছিলেন এবং জাহাজে চড়ে বসেছিলেন জাফা বন্দরের উদ্দেশ্যে। জাফা বন্দরের অবস্থান ছিল পূর্ব-ভূমধ্যসাগরের তীরে এবং নিনেভ শহর থেকে ৬০০ মাইল পশ্চিমে। তিনি জাহাজে চড়ে বসেছিলেন খুব সম্ভব টাইগ্রীস নদীর কাছাকাছি সীমানায় যাওয়ার জন্য। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে পরে জাহাজ যখন মহাবিপদ সংকেতের সম্মুখীন হলে জাহাজের নাবিকেরা তাঁকে মন্দ লোক মনে করে অন্যান্য বস্তুর সঙ্গে তাঁকেও সাগরের পানিতে নিক্ষেপ করে দিয়েছিল। এ সময় একটি বিরাট আকারের মাছ এসে তাকে গ্রাস করে নিয়েছিল। মাছের পেটে আটকা পড়ে ভুল কৃতকর্মের জন্য হযরত ইউনুচ (আঃ) খুবই অনুতপ্ত হলেন এবং আল্লাহপাকের মহিমা প্রকাশ করতে লাগলেন এভাবে,
"None has the right to be worshipped but you, Glorified be You! Truly, I have been of the wrong doers." তুমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, আমি তোমার মহিমা প্রকাশ করছি! সত্যিকার অর্থে আমি অপরাধী। (আম্বিয়া-৮৭)

মাছের অন্ধকার পেটের ভেতর থেকে এ আবেদন পেশ করার কারণে করুণাময় আল্লাহ তাআলা মাছের পেটে বেদনা সৃষ্টি করে দিলেন। মাছ তীরে এসে হযরত ইউনুচ (আঃ)কে বমি করে নিক্ষেপ করল। মাছের পেটে থাকার ফলে তিনি যখন অসুস্থ অবস্থায় তীরে পড়ে রইলেন তখন তাকে বৃক্ষের ছায়া সরবরাহ করা হলো। এরপর তিনি ক্লান্ত-অবসন্ন অবস্থা থেকে বেশ সতেজ ও সবল হয়ে উঠলেন।

এ ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দুইটি শব্দকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে চলেছে।
১। আলহুত
২। ইয়াকতিন

আলহুতঃ আরবী 'আলহুত' শব্দের অর্থ হলো বৃহৎ আকারের মাছ। সমুদ্রে বৃহৎ আকারের মাছ বলতে তিমি মাছকে বুঝায়। এখানে বিবেচ্য বিষয়গুলো হলো, একজন মানুষকে বিনা ক্ষতিতে গিলে নিতে হলে নিশ্চয় প্রাণীটিকে দন্তহীন হতে হবে, খাদ্য গিলে খাওয়ার অভ্যাস থাকতে হবে, এ বিশেষ বিষয়ে নিনেভের নিকটবর্তী পানি অঞ্চলের বাসিন্দা হতে হবে। যদিও তিমি মাছের অন্যান্য প্রজাতি আছে যাদের আকারও অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে বৃহৎ। এসব প্রজাতি আর্কটিক, অ্যান্টার্কটিক, আটলান্টিক, ইন্ডিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরে বাস করে। কিন্তু উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যগুলো তিমি মাছের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বিধায় এ মাছের সম্ভাব্যতা বাতিল করা যায়। অপরাপর বৃহৎ আকারের মাছের মধ্যে হাঙ্গর ও সামুদ্রিক স্টারজন মাছের কথা বিবেচনা করা হলে আমরা দেখব যে, হাঙ্গর অতিশয় হিংস্র ও শয়তান প্রকৃতির মাছ। এর চোয়াল খুব ধারালো। এ মাছ তার শিকারকে প্রথমে হত্যা করে, তারপর গিলে ফেলে। অপরপক্ষে সামুদ্রিক মাছ 'স্টারজন' (sturgeon) বর্তমান সময়ে মিষ্টি পানির বৃহত্তম মাছ। এ মাছ সমুদ্রের পানিতে বাস করলেও মাঝে মধ্যে মিষ্টি পানির এলাকায় এসে ব্যাঙ, শামুকের ডিম ও পোনা খেয়ে চলে যায়। এদের মুখ-গহ্বর দন্তহীন ও শিকারকে সরাসরি গিলে নেয়। তাই এরা বহু রকম প্রাণী ও উদ্ভিদকে খাদ্য হিসেবে গ্রাস করে থাকে। এ পর্যন্ত জানা গেছে যে, স্টারজনের বিশটি প্রজাতি আছে। এগুলো ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার উভয়কূলে ছড়িয়ে রয়েছে।

রাশিয়ান স্টারজন হলো এক ধরনের প্রজাতি যার দৈর্ঘ্য ও ওজন যথাক্রমে ২৪ ফুট ও ২০০০ পাঃ (৯০০ কেজি)। এ প্রজাতির নাম অ্যাসিপেনসার হুসো (acipenser huso)। এরা কাস্পিয়ান সাগর ও কৃষ্ণসাগরে বাস করে। এ সাগরগুলোর সঙ্গে মেসোপটোমিয়ার বহু নদী ও তাদের শাখা এসে মিশেছে। জানা যায় উল্লেখিত মাপের স্টারজনগুলো হযরত ইউনুচ (আঃ) এর সময় ঘনঘন টাইগ্রীস নদী-বক্ষে আসা-যাওয়া করতো। হযরত ইউনুচ (আঃ) এর সময়কাল ছিল প্রায় ৮০০ খৃস্টপূর্ব (800 B.C.)।

স্টারজন মাছের অতি অদ্ভুত ধরনের খাদ্য গ্রহণ অভ্যাস এবং দন্তহীন মুখগহ্বর কোন ক্ষতি ব্যতিরেকে হযরত ইউনুচ (আঃ) কে গিলে ফেলার বিষয়টি নির্ভরযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এ ব্যাপারের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি হলো এ ধরনের বড় মাছের পেটে প্রচুর পরিমাণে বাতাস থাকে। যে কারণে মাছের পেটের ভেতরে আবদ্ধ শিকারটি অনায়াসে নিঃশ্বাস গ্রহণ করতে পারে। উপরন্তু মাছের পেটের ভেতরে অম্লজাতীয় তরল পদার্থ এসিডজনিত জ্বালার সৃষ্টি করে। এরূপ সুকঠিন অবস্থায় পড়ে হযরত ইউনুচ (আঃ) যেহেতু আল্লাহপাকের পবিত্রতা ঘোষণা করে তাঁরই সাহায্য কামনা করেছিলেন তাই আল্লাহপাক তাঁর প্রতি দয়াপরবশ হয়ে মাছের পেট থেকে তাঁকে (হযরত ইউনুচ (আঃ)কে) বের করে নিয়েছিলেন। এ ব্যাপারটি খুবই প্রণিধানযোগ্য।

ইয়াকতিনঃ আরবী 'ইয়াকতিন' শব্দের অর্থ কুমড়া বা লাউ জাতীয় গাছ। কুমড়া গোত্রের মধ্যে পড়ে লাউ, তরমুজ ও তাদের আরো অন্যান্য সহযোগী লতা-বৃক্ষ। এসব লতা-বৃক্ষ মূলত গ্রীষ্মমন্ডলীয় ও নাতিশীতোষ্ণ এলাকায় জন্মে। কুমড়া গাছ বা লাউ গাছ বৃক্ষের মত শক্ত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে না। তবে তাদের নরম ডাঁটা ও ডাঁটা থেকে নির্গত লতা যে কোন অবলম্বনের সাহায্যে উপর দিকে বেড়ে উঠতে পারে। এসব গাছ খুব বড় আকারের এলাকা জুড়ে বেড়ে ওঠে এবং বিশেষ করে মাচায় ভালভাবে বর্ধিত হয়ে থাকে। এদের ঘন ছায়ায় বসে যে কেউ আরামে বিশ্রাম নিতে পারে। লাউয়ের গোত্রভুক্ত গাছপালা পানি নিষ্কাশিত বালুকাবেলায় ভালভাবে জন্মে থাকে। তাই মধ্যপ্রাচ্য ও ভূ-মধ্যসাগরীয় মরু অঞ্চলে এসব গাছপালা দেখা যায়। নদীর পাড়ের বালুকাবেলায়ও এসব লতাগাছ প্রায়শ গোচরীভূত হয়ে থাকে। এটা খুবই স্মরণীয় বিষয় যে, ১৪৬ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহপাক একটি লাউ জাতীয় গাছকে বেড়ে উঠতে বাধ্য করেছিলেন। এ গাছ অসহায়ভাবে পড়ে থাকা অসুস্থ ইউনুচ নবী (আঃ)কে ছায়াদান করে সতেজ করে তুলেছিল। 'আনবাত্মা আলাইহে' আয়াতাংশটি যে অর্থ প্রকাশ করে মূলত এখানে তা-ই তুলে ধরা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00