📄 হযরত নূহ (আঃ) এর কিস্তি
হযরত নূহ (আঃ) এর কিস্তি
وَحَمَلْتُهُ عَلَى ذَاتِ الْوَاحِ وَدُسُرٍ. تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا جَزَاءً لِمَنْ كَانَ كُفِرَ وَلَقَدْ تَرَكْنَهَا آيَةً فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ.
But We bore him (Hazrat Nuh-A) on an ark made of planks and spikes. It floated under Our eyes, a reward for him who was rejected by them. And We left it (the Ark) as a sign for the coming generations. But is there anyone to receive lesson from it?
আমরা নূহকে কাষ্ঠ ও পেরেক নির্মিত নৌযানে আরোহণ করিয়েছি, যা চলত আমাদের দৃষ্টির সামনে। এটা ছিল তাঁর জন্য প্রতিদান, যাকে তারা (কাফেররা) প্রত্যাখ্যান করেছিল। আমরা একে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিদর্শন করে রেখেছি। অতএব, কেউ কি আছে যে, এ নিদর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে? (কমর-১৩-১৫)
১৯৫০ সালের ঘটনা। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার (NASA) স্থাপিত স্যাটেলাইট তুরস্কের একটি পর্বতের কাছাকাছি স্থান থেকে আসা মানব চক্ষুর আকৃতি বিশিষ্ট একটি বস্তুর ছবি প্রেরণ করে। ছবিটি দেখে বিজ্ঞানীদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায় এ জন্য যে, মানব চক্ষুর ন্যায় বিশাল এ ছবিটি কিসের হতে পারে? স্যাটেলাইট যে স্থান থেকে চিত্রটি তুলেছে তা হচ্ছে তুরস্কের জুদী পর্বতের কাছাকাছি স্থান। এ নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান ও গবেষণা চালিয়ে দীর্ঘদিনেও কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি।
অবশেষে মার্কিন তরুণ ভূ-তত্ত্ববিদ ডঃ ভান্দিল জোনস সফলকাম হলেন। তার প্রবল আগ্রহ এবং অনুসন্ধিৎসু মন তাকে নিয়ে গেল জুদী পর্বতের চূড়ায়। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন থেকে তিনি একটি তথ্য পেয়ে স্যাটেলাইট কর্তৃক প্রেরিত ছবির বাস্তবতা উপলব্ধি করে নিলেন। কোরআনে বর্ণিত তথ্যটি হচ্ছে, হাজার হাজার বৎসর পূর্বে আল্লাহর নবী নূহ (আঃ) মহাপ্লাবন থেকে আত্মরক্ষার জন্য একটি কিস্তি নির্মাণ করেছিলেন। প্লাবন শেষে কিস্তিটি জুদী পর্বতের চূড়ায় এসে ভিড়েছিল। ডঃ জোনস এ অনুসন্ধানের প্রথম পর্যায়ে তিনি তুরস্কে গিয়ে স্থানীয় প্রবীণ লোকজনের কাছ থেকে হযরত নূহ (আঃ) এবং তাঁর নির্মিত নৌকা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে কোরআনে বর্ণিত মহাপ্লাবন সম্পর্কে তথ্য লাভ করে জুদী পর্বতের চূড়ায় আরোহণ করেন এবং বহু কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি পেয়ে যান। সেটি হযরত নূহ (আঃ) এর কিস্তি। আবিষ্কৃত নৌকাটি ৫০ ফুটেরও অধিক চওড়া এবং দীর্ঘদিন পাহাড়ের অভ্যন্তরে থাকায় এর মূল আকারের বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছে। এখন আল-কোরআন বলছে,
وَقُضِيَ الْأَمْرُ وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِي وَقِيلَ بُعْدًا لِلْقَوْمِ الظَّلِمِينَ.
And the matter was ended. The Ark rested on the mount Judi.
এবং কাজ সমাপ্ত হল। আর নৌকাটি জুদী পর্বতের নিকট এসে ভিড়ল। (হুদ-৪৪)
📄 ইরাম শহর
ইরাম শহর
১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর সংস্করণে 'ন্যাশনাল জিওগ্রাফি' একটি তথ্য পরিবেশন করে, যাতে উল্লেখ করা হয় ১৯৭৩ সালে সিরিয়ায় 'ইবলা' শহর খনন করে আবিষ্কার করা হয়েছে। শহরটি ৩৪ শতাব্দীর পুরাতন এবং এতদিন যাবৎ মাটির নিচে চাপা পড়েছিল। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে আবিষ্কারকগণ ইবলা শহরের গ্রন্থাগারে একটি নথি খুঁজে পান, যাতে ইবলা শহরের লোকেরা যেসব শহরের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করতো তার সবকটির নাম লেখা রয়েছে। উক্ত তালিকায় 'ইরাম' শহরের নামটি ছিল। ইবলা শহরের লোকেরা ইরাম (স্তম্ভের শহর) শহরের ব্যবসায়ীদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছে, লেনদেন করেছে। মহান গ্রন্থ আল-কোরআন এ ইরাম শহরের নাম উল্লেখ করে বলেছে, সে-ই শহরের প্রথম আ'দ জাতি, যাদের দৈহিক গঠন ও শক্তি-সাহসে সব জাতি থেকে স্বতন্ত্র ছিল। এত দীর্ঘকায় জাতি আল্লাহ তা'আলা ইতিপূর্বে সৃষ্টি করেননি। কিন্তু তাদের অন্যায় কর্মের দরুন তাদেরকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছিল।
কোরআনের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে প্রত্নতত্ত্ববিদগণ ইরাম শহর সম্পর্কে কিছুই জানত না। এমন কি কোনো প্রাচীন ইতিহাসেও এ বিষয়ে কিছুই লিপিবদ্ধ ছিল না। জ্ঞানের মহান উৎস আল-কোরআন প্রত্নতত্ত্ববিদ্যার তথ্যসমূহ প্রকাশ করে বিজ্ঞানের এ শাখাটিকে বর্তমানে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে।
اَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ . إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ . الَّتِي لَمْ يُخْلَقُ مِثْلُهَا فِي الْبَلَادِ .
See you not how your Lord dealt with 'Ad of the city of Iram, with lofty pillars.
আপনি কি লক্ষ্য করেন না আপনার প্রভু আ'দ গোত্রের ইরামবাসীদের সাথে কী আচরণ করেছেন, যাদের দৈহিক গঠন ছিল স্তম্ভের ন্যায় দীর্ঘ। (ফজর-৬-৭)
কোনো কোনো তাফসীরবিদ বলেছেন, ইরাম আ'দ-তনয় শাদ্দাদ নির্মিত বেহেশতের নাম। কেননা এ অনুপম প্রাসাদটি বহু স্তম্ভের উপর দণ্ডায়মান এবং স্বর্ণ-রৌপ্য দ্বারা নির্মিত ছিল, যাতে মানুষ পরকালের বেহেশতের পরিবর্তে এ নগদ বেহেশতটির প্রতি আকৃষ্ট হয়। তাই এ বিরাট প্রাসাদের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর যখন শাদ্দাদ সভাসদসহ এ নকল বেহেশতে প্রবেশ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে, অমনি আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে কঠিন শাস্তি উপস্থিত হয়। ফলে সবাই আযাবে নিপতিত হয় এবং কৃত্রিম বেহেশতটিও মাটির গভীরে তলিয়ে যায়।
📄 Fate of those who rejected the truth
Fate of Those Who Rejected the Truth
قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِكُمْ سُنَنٌ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ.
Many were the ways of life that have passed away before you; travel through the earth and see what was the end of those who rejected truth.
জীবনের বহু পথ তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে। তোমরা পৃথিবী ভ্রমণ কর এবং তাদের পরিণতি দেখ যারা সত্যকে বর্জন করেছে। (আলে ইমরান-১৩৭)
অতীত কালের মানুষদের জীবন ধারণের বিভিন্ন পথের কথা পবিত্র কোরআন এ আয়াতে ব্যক্ত করেছে। এখানে আরো উল্লেখ করা হয়েছে মানবজাতিকে পৃথিবী ভ্রমণ করে ঐ সমস্ত লোকের কৃতকর্মের ফলাফল দেখার জন্য যারা আল্লাহর নির্ধারিত আইন-কানুন অস্বীকার করে নানা ধরনের পথ আর মত অবলম্বন করেছে।
আল কোরআনে বহু আয়াত আছে যেখানে আল্লাহপাক বিশ্বাসী লোকদের উল্লেখিত ভ্রমণের কথা বলেছেন। ঐসব আয়াতের উদ্দেশ্য অতীতকে জানা এবং ঐ সমস্ত মানুষের কৃতকর্মের ফল সম্পর্কে অবহিত হওয়া যারা আল্লাহ পাকের বাণীকে হয় মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে নতুবা ঐসব বাণী একেবারে অনুসরণ করে চলেনি।
এটা খুব লক্ষ্যণীয় ব্যাপার যে, ফারটাইল ক্রিসেন্ট (Fertile Crescent) নামে পরিচিত ভূ-খণ্ডটি বহু সভ্যতার উত্থান-পতন দেখেছে। এসব উত্থান-পতনের কিছু কিছু বিবরণ পবিত্র কোরআনে বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে যা দৃষ্টান্ত স্বরূপ তুলে ধরা হয়েছে। আরবের লোকেরা এসব দৃষ্টান্তের মর্ম সহজে অনুধাবন করতে পারে। উপরে যে Fertile Crescent এর উল্লেখ করা হয়েছে তা মিশর থেকে শুরু হয়ে ভূ-মধ্যসাগর, প্যালেস্টাইন এবং সিরিয়ার স্থলভূমির মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়ে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর পাড় ধরে মেসোপটোমিয়ার বুক মাড়িয়ে পারস্য উপসাগরে এসে ঐ ফারটাইল ক্রিসেন্ট বা বাঁকাচাঁদ সৃষ্টি করেছে। প্রায় ৮০০০ বছর আগে আরব মরুভূমি ঘিরে যে বিশাল অর্ধবৃত্ত বিদ্যমান সেই অর্ধবৃত্তকে বলা হয় ফারটাইল ক্রিসেন্ট। এ ফারটাইল ক্রিসেন্ট বহু সভ্যতার উত্থান-পতন প্রত্যক্ষ করেছে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এখানে নিহিত রয়েছে বহু সভ্যতার কেন্দ্রস্থল। এ কেন্দ্রস্থলে ঐসব সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল প্রস্তর যুগ থেকে গ্রীক-রোমীয় যুগ পর্যন্ত সময়ে। মিশরের বিশাল পিরামিড এবং স্টেজড টাওয়ারসহ (staged towers) মেসোপটোমিয়ার বিরাট মন্দির জিগুরাস (zigguras) এখানকার প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতার দৃষ্টান্ত বহন করে। প্রাচীন মিশরে রাজত্ব করতো ফারাও গোষ্ঠী (ফেরাউনরা)। আর মেসোপটোমিয়ায় রাজত্ব করতো সুমের ও আক্কাদ নরপতিরা।
পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, আল্লাহপাক পৃথিবীর সকল জাতির কাছে নবী পাঠিয়েছেন এবং তাদের সঠিক সংখ্যা এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। নবীদের দায়িত্ব ছিল একক আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা এবং আল্লাহর বাণী মানুষের সামনে পেশ করা। আল্লাহপাকের নবী কর্তৃক প্রচারিত ঐশীবাণী যারা অগ্রাহ্য করেছিল তাদের পরিণতি কি হয়েছিল তা জানার জন্য আল কোরআন বিশ্বাসীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু প্রাচীনকালের ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান খুব সীমিত ও অসম্পূর্ণ। সেই কারণে আমরা সকল বিষয় ও ঘটনাবলী সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণার অধিকারী নই। কেবল একটা বিষয় স্পষ্ট করে জানা যায়, নবীরা তাদের জাতিকে শিরক তথা দেবদেবীর পূজার বিরুদ্ধে আল্লাহর বাণী প্রচার করেছেন এবং সকল প্রকার পাপাচার থেকে মানুষকে বিরত রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। যারা প্রচারিত আল্লাহর দ্বীন অমান্য করেছে তাদের পরিচয় নিতে গিয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত যেসব জাতির কথা জানা যায় সেগুলো হলো হযরত নূহ (আঃ) এর জাতি, হযরত লূত (আঃ) এর জাতি, আদ জাতি এবং মাদিয়ান জাতি। এ জাতিগুলো বহু দেব-দেবীতে যেমন বিশ্বাসী ছিল তেমনি নানাবিধ পাপাচারে লিপ্ত ছিল। সুতরাং আল্লাহপাকের সাথে অংশী স্থাপন, পাপাচার ও নৈতিক অধঃপতনের ফলশ্রুতিই ছিল বহু জাতির ধ্বংসের কারণ।
অতীত জাতি সম্পর্কে কিছু জানতে হলে ইতিহাসের সাহায্য একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু খৃষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ৩০০০ বছর পূর্বের ইতিহাস কদাচিৎ পাওয়া যায়। অর্থাৎ ঐ সময়ের পূর্ববর্তী ঘটনাবলী ইতিহাসে তেমন উল্লেখ নাই বললেই চলে। তাই তখনকার কোনকিছু কোনভাবে জানতে হলে প্রত্নতত্ত্বের সাহায্য ছাড়া আর কোন উপায় নেই। প্রত্নতত্ত্বের (Archaeology) উদ্দেশ্য হলো মানুষের অতীত কালের বিষয় বস্তুর গবেষণা এবং ধ্বংস পরবর্তী রক্ষা পাওয়া বস্তুগুলোকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ধরে রাখা। যাতে ঐগুলো সেই সমস্ত বস্তুর সম্পূরক হিসেবে কাজ করতে পারে যে বস্তুগুলোর কথা অন্যান্য উৎস অর্থাৎ লিখিত দলীল এবং অন্যান্য বস্তুসমূহ থেকে জানা যায়।
বর্তমানে আমেরিকা, ব্রিটিশ এবং জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদগণ এক শতাব্দী ধরে 'ফারটাইল ক্রিসেন্ট' এর দেশে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন এ উদ্দেশ্যে যে এখানে প্রাপ্ত বস্তুগুলো কত জোরালোভাবে পবিত্র কোরআনের বর্ণনাতে স্পষ্ট হয়েছে। এ অনুসন্ধান কর্ম থেকে যে সুফল পাওয়া গেছে তা কোরআনের বর্ণনাকে তার যথাযথ পটভূমিতে ভালভাবে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির সহায়তায় আরো অধিক অনুসন্ধান চালালে সত্য ও সঠিক তথ্য যে উদ্ঘাটিত হবে তাতে কোন সংশয় নেই।
আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের অনুসন্ধান কাজে প্রকৃতি বিজ্ঞান ও পদার্থ বিজ্ঞানের নানাবিধ শাখার তথ্য-প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন, পদার্থ বিজ্ঞানের তেজস্ক্রিয় রশ্মির (Radio active rays) সহায়তায় প্রাপ্ত বস্তুর বয়স নির্ণয় ও এরিয়াল ফটো উঠানো, রসায়ন বিজ্ঞানের সাহায্যে বয়স নির্ধারণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক কাজে রসায়ন সুবিধা, মৃত্তিকা বিজ্ঞান, আবহাওয়া বিজ্ঞান ও প্রত্ন উদ্ভিদ বিজ্ঞান, জীবাশ্ম বিজ্ঞান (paleontology), খনিজ বিজ্ঞান (Mineralogy), Geochronology, Dendrochronology এবং অন্যান্য। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের সময় যেসব বস্তু মাটির নীচে পাওয়া যায় সেসব বস্তুর সঠিক বয়স নির্ণয়ের জন্য উল্লেখিত বিজ্ঞান বিষয়গুলোকে কাজে লাগানো হয়।
রেডিও এ্যাকটিভ কার্বন বয়স নির্ণয় পদ্ধতিতে প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় প্রাপ্ত হাড়, কাঠ ও ছাইয়ের মধ্যে যে রেডিও এ্যাকটিভ কার্বন বিদ্যমান থাকে তা হিসেব করে ঐ সবের যুগকাল প্রায় সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়। এ রেডিও এ্যাকটিভ কার্বন ডেইটিং পদ্ধতিটি আনবিক পদার্থ বিজ্ঞান গবেষণার একটি বাই প্রোডাক্ট (by product)। এ বাই প্রোডাক্টটি প্রত্নতাত্ত্বিক যুগকাল নির্ণয়ে একটি বৈপ্লবিক অবদান রেখেছে। যদিও এটা সম্পূর্ণভাবে সঠিক সময় নির্ধারণ করতে পারে না তবুও এটা প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় একটি নতুন দিক সংযোজন করেছে। এখন এ পদ্ধতির মাধ্যমে ৪০,০০০ বছর আগেকার সময়কাল নির্ধারণ করা যায়। বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিক যুগকাল নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আরও যেসব পদ্ধতি কাজে লাগানো হয় তাহলো পটাসিয়াম আরগন (potassium argon) পদ্ধতি এবং থার্মোলোমিনিসেন্স (thermoluminiscence) পদ্ধতি। পূর্ব আফ্রিকায় দুই মিলিয়ন কিংবা তারও বেশী সময় পূর্বের মানুষের দেহাবশেষের হিসেব দিয়েছে পটাসিয়াম আরগন পদ্ধতি। হাড়ের ফ্লোরিন উপাদান বিশ্লেষণের মাধ্যমেও হাড়ের যুগকাল নির্ণয়ে সহায়তা লাভ করা সম্ভব হয়েছে।
সম্প্রতি মিশর ও ইরাকের মত মুসলিম অধ্যুষিত দেশে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার কাজ গ্রহণ করা হয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগেও এ ধরনের কার্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। খলিফা মাবিয়া (৬৬১-৬৮০) সাদ্দাদের রাজপ্রাসাদ অনুসন্ধান করার জন্য বেশ কয়েক দফা প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন বলে কথিত আছে। আল কোরআনে সাদ্দাদের রাজ প্রাসাদ সম্পর্কে যে ইঙ্গিত (ফজর-৭) আছে সেখানে এ রাজপ্রাসাদকে বলা হয়েছে উচ্চ স্তম্ভের উপর স্থাপিত ইরাম শহর।
এটা খুবই দুঃখজনক যে, পবিত্র কোরআনে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান কাজে তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। অতীতকে জানা পবিত্র কোরআনেরই নির্দেশ। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে মুসলমানদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে তারা অবশ্যই অতীতকে অনুসন্ধান করবে। এ কাজ তারা বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে কিংবা প্রত্নতাত্বিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে সমাধা করতে পারে।
Say (O Mohammad-s:), "Travel in the land and see what was the end of those who rejected the truth."
বলুন (হে মুহাম্মদ-সাঃ), 'তোমরা পৃথিবী ভ্রমণ কর এবং দেখ তাদের পরিণতি যারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে। (আনআম-১১)
Have they not seen how many a generation before them we have destroyed whom We have established on the earth such as we have not established you? And We poured out on them rain from the sky in abundance and made the revers flow under them. Yet We destroyed them for their sins and We created after them other generations.
তারা কি দেখেনি যে আমরা তাদের পূর্বে কত সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দিয়েছি যাদেরকে আমরা পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যা তোমাদেরকে করিনি। আমরা আকাশ থেকে তাদের উপর পর্যাপ্ত বৃষ্টি বর্ষণ করেছি এবং তাদের তলদেশে নদী সৃষ্টি করে দিয়েছি। তবুও আমরা তাদেরকে তাদের পাপাচারের কারণে ধ্বংস করে দিয়েছি এবং তাদের পরে অন্য সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছি। (আনআম-৬)
And We sent not before you (as Apostles) any but men unto whom we revealed, from among the people ot the townships. Have they not travelled in the land and seen what was the end of those who were before them? And verily, the home of the Hereafter is the best for those who fear Allah and obey Him. Do you not then understand?
আর আমরা আপনার পূর্বে (রাসূল হিসেবে) জনপদবাসীদের মধ্য থেকে যতজনকে পাঠিয়েছি তারা সবাই মানুষ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। যাদের নিকট ওহী প্রেরণ করতাম। তারা কি ভূ-পৃষ্ঠে ভ্রমণ করে না যাতে দেখে নিতে পারত কি পরিণতি হয়েছে তাদের পূর্বে যারা এসেছিল। প্রকৃতপক্ষে পরকালের আবাসই উত্তম তাদের জন্য যারা আল্লাহপাককে ভয় করে। তারপরেও কি তারা বুঝে না? (ইউসুফ-১০৯)
📄 আলহুত-ইয়াকতিন
আলহুত-ইয়াকতিন
فَالْتَقَمَهُ الْحُوتُ وَهُوَ مُلِيمٌ. فَلَوْلَا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ. لَلَبِثَ فِي بَطْنِهِ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ. فَنَبَذْنَاهُ بِالْعَرَاءِ وَهُوَ سَقِيمُ وَأَنْبَتْنَا عَلَيْهِ شَجَرَةً من يقطين.
Then a big fish swallowed him (Hazrat Younus A:) as he had done an act worthy of blame. Had he not been of them who glorify Allah. He would have indeed remained inside its belly (the fish) till the Day of Resurrection. But We cast him forth on the naked shore while he was sick. And We caused to grow over him, a spreading plant of the gourd kind.
তারপর একটি বড় আকারের মাছ তাঁকে [হযরত ইউনুচ (আঃ)কে] গিলে ফেলল। কারণ তিনি দুর্নাম অর্জনের কাজ করেছিলেন। যদি তিনি আল্লাহপাকের মহিমা প্রকাশ না করতেন তাহলে তাকে অবশ্যই মাছের পেটের মধ্যে কেয়ামত পর্যন্ত আবদ্ধ থাকতে হতো। কিন্তু আমরা তাঁকে উন্মুক্ত সমুদ্র-তীরে নিক্ষেপ করলাম। তখন তিনি ছিলেন অসুস্থ এবং আমরা তার (তীরের) উপর একটি লতাবিশিষ্ট বৃক্ষ উদ্গত করলাম। (সাফ্ফাত- ১৪২-১৪৬)
এ পাঁচটি ধারাবাহিক আয়াতে আল্লাহপাক হযরত ইউনুচ (আঃ) এর ঘটনা বর্ণনা করেছেন। হযরত ইউনুচ (আঃ) কে আসিরিয়ার রাজধানী নিনেভে প্রেরণ করা হয়েছিল। নিনেভের অবস্থান ছিল টাইগ্রীস নদীর তীরে এবং ইরাকের বর্তমান মসুল বন্দরের বিপরীত দিকে। নিনেভবাসী তাঁকে বর্জন করায় তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে তাদের কাছ থেকে দূরে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের দুষ্কর্ম তথা পাপাচার থেকে রক্ষা করার পক্ষে দায়িত্ব পালন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অধিকতর প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার পর আল্লাহ তাআলার পরবর্তী নির্দেশ আসার অপেক্ষা না করে নিনেভ শহর ত্যাগ করেছিলেন এবং জাহাজে চড়ে বসেছিলেন জাফা বন্দরের উদ্দেশ্যে। জাফা বন্দরের অবস্থান ছিল পূর্ব-ভূমধ্যসাগরের তীরে এবং নিনেভ শহর থেকে ৬০০ মাইল পশ্চিমে। তিনি জাহাজে চড়ে বসেছিলেন খুব সম্ভব টাইগ্রীস নদীর কাছাকাছি সীমানায় যাওয়ার জন্য। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে পরে জাহাজ যখন মহাবিপদ সংকেতের সম্মুখীন হলে জাহাজের নাবিকেরা তাঁকে মন্দ লোক মনে করে অন্যান্য বস্তুর সঙ্গে তাঁকেও সাগরের পানিতে নিক্ষেপ করে দিয়েছিল। এ সময় একটি বিরাট আকারের মাছ এসে তাকে গ্রাস করে নিয়েছিল। মাছের পেটে আটকা পড়ে ভুল কৃতকর্মের জন্য হযরত ইউনুচ (আঃ) খুবই অনুতপ্ত হলেন এবং আল্লাহপাকের মহিমা প্রকাশ করতে লাগলেন এভাবে,
"None has the right to be worshipped but you, Glorified be You! Truly, I have been of the wrong doers." তুমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, আমি তোমার মহিমা প্রকাশ করছি! সত্যিকার অর্থে আমি অপরাধী। (আম্বিয়া-৮৭)
মাছের অন্ধকার পেটের ভেতর থেকে এ আবেদন পেশ করার কারণে করুণাময় আল্লাহ তাআলা মাছের পেটে বেদনা সৃষ্টি করে দিলেন। মাছ তীরে এসে হযরত ইউনুচ (আঃ)কে বমি করে নিক্ষেপ করল। মাছের পেটে থাকার ফলে তিনি যখন অসুস্থ অবস্থায় তীরে পড়ে রইলেন তখন তাকে বৃক্ষের ছায়া সরবরাহ করা হলো। এরপর তিনি ক্লান্ত-অবসন্ন অবস্থা থেকে বেশ সতেজ ও সবল হয়ে উঠলেন।
এ ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দুইটি শব্দকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে চলেছে।
১। আলহুত
২। ইয়াকতিন
আলহুতঃ আরবী 'আলহুত' শব্দের অর্থ হলো বৃহৎ আকারের মাছ। সমুদ্রে বৃহৎ আকারের মাছ বলতে তিমি মাছকে বুঝায়। এখানে বিবেচ্য বিষয়গুলো হলো, একজন মানুষকে বিনা ক্ষতিতে গিলে নিতে হলে নিশ্চয় প্রাণীটিকে দন্তহীন হতে হবে, খাদ্য গিলে খাওয়ার অভ্যাস থাকতে হবে, এ বিশেষ বিষয়ে নিনেভের নিকটবর্তী পানি অঞ্চলের বাসিন্দা হতে হবে। যদিও তিমি মাছের অন্যান্য প্রজাতি আছে যাদের আকারও অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে বৃহৎ। এসব প্রজাতি আর্কটিক, অ্যান্টার্কটিক, আটলান্টিক, ইন্ডিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরে বাস করে। কিন্তু উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যগুলো তিমি মাছের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বিধায় এ মাছের সম্ভাব্যতা বাতিল করা যায়। অপরাপর বৃহৎ আকারের মাছের মধ্যে হাঙ্গর ও সামুদ্রিক স্টারজন মাছের কথা বিবেচনা করা হলে আমরা দেখব যে, হাঙ্গর অতিশয় হিংস্র ও শয়তান প্রকৃতির মাছ। এর চোয়াল খুব ধারালো। এ মাছ তার শিকারকে প্রথমে হত্যা করে, তারপর গিলে ফেলে। অপরপক্ষে সামুদ্রিক মাছ 'স্টারজন' (sturgeon) বর্তমান সময়ে মিষ্টি পানির বৃহত্তম মাছ। এ মাছ সমুদ্রের পানিতে বাস করলেও মাঝে মধ্যে মিষ্টি পানির এলাকায় এসে ব্যাঙ, শামুকের ডিম ও পোনা খেয়ে চলে যায়। এদের মুখ-গহ্বর দন্তহীন ও শিকারকে সরাসরি গিলে নেয়। তাই এরা বহু রকম প্রাণী ও উদ্ভিদকে খাদ্য হিসেবে গ্রাস করে থাকে। এ পর্যন্ত জানা গেছে যে, স্টারজনের বিশটি প্রজাতি আছে। এগুলো ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার উভয়কূলে ছড়িয়ে রয়েছে।
রাশিয়ান স্টারজন হলো এক ধরনের প্রজাতি যার দৈর্ঘ্য ও ওজন যথাক্রমে ২৪ ফুট ও ২০০০ পাঃ (৯০০ কেজি)। এ প্রজাতির নাম অ্যাসিপেনসার হুসো (acipenser huso)। এরা কাস্পিয়ান সাগর ও কৃষ্ণসাগরে বাস করে। এ সাগরগুলোর সঙ্গে মেসোপটোমিয়ার বহু নদী ও তাদের শাখা এসে মিশেছে। জানা যায় উল্লেখিত মাপের স্টারজনগুলো হযরত ইউনুচ (আঃ) এর সময় ঘনঘন টাইগ্রীস নদী-বক্ষে আসা-যাওয়া করতো। হযরত ইউনুচ (আঃ) এর সময়কাল ছিল প্রায় ৮০০ খৃস্টপূর্ব (800 B.C.)।
স্টারজন মাছের অতি অদ্ভুত ধরনের খাদ্য গ্রহণ অভ্যাস এবং দন্তহীন মুখগহ্বর কোন ক্ষতি ব্যতিরেকে হযরত ইউনুচ (আঃ) কে গিলে ফেলার বিষয়টি নির্ভরযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এ ব্যাপারের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি হলো এ ধরনের বড় মাছের পেটে প্রচুর পরিমাণে বাতাস থাকে। যে কারণে মাছের পেটের ভেতরে আবদ্ধ শিকারটি অনায়াসে নিঃশ্বাস গ্রহণ করতে পারে। উপরন্তু মাছের পেটের ভেতরে অম্লজাতীয় তরল পদার্থ এসিডজনিত জ্বালার সৃষ্টি করে। এরূপ সুকঠিন অবস্থায় পড়ে হযরত ইউনুচ (আঃ) যেহেতু আল্লাহপাকের পবিত্রতা ঘোষণা করে তাঁরই সাহায্য কামনা করেছিলেন তাই আল্লাহপাক তাঁর প্রতি দয়াপরবশ হয়ে মাছের পেট থেকে তাঁকে (হযরত ইউনুচ (আঃ)কে) বের করে নিয়েছিলেন। এ ব্যাপারটি খুবই প্রণিধানযোগ্য।
ইয়াকতিনঃ আরবী 'ইয়াকতিন' শব্দের অর্থ কুমড়া বা লাউ জাতীয় গাছ। কুমড়া গোত্রের মধ্যে পড়ে লাউ, তরমুজ ও তাদের আরো অন্যান্য সহযোগী লতা-বৃক্ষ। এসব লতা-বৃক্ষ মূলত গ্রীষ্মমন্ডলীয় ও নাতিশীতোষ্ণ এলাকায় জন্মে। কুমড়া গাছ বা লাউ গাছ বৃক্ষের মত শক্ত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে না। তবে তাদের নরম ডাঁটা ও ডাঁটা থেকে নির্গত লতা যে কোন অবলম্বনের সাহায্যে উপর দিকে বেড়ে উঠতে পারে। এসব গাছ খুব বড় আকারের এলাকা জুড়ে বেড়ে ওঠে এবং বিশেষ করে মাচায় ভালভাবে বর্ধিত হয়ে থাকে। এদের ঘন ছায়ায় বসে যে কেউ আরামে বিশ্রাম নিতে পারে। লাউয়ের গোত্রভুক্ত গাছপালা পানি নিষ্কাশিত বালুকাবেলায় ভালভাবে জন্মে থাকে। তাই মধ্যপ্রাচ্য ও ভূ-মধ্যসাগরীয় মরু অঞ্চলে এসব গাছপালা দেখা যায়। নদীর পাড়ের বালুকাবেলায়ও এসব লতাগাছ প্রায়শ গোচরীভূত হয়ে থাকে। এটা খুবই স্মরণীয় বিষয় যে, ১৪৬ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহপাক একটি লাউ জাতীয় গাছকে বেড়ে উঠতে বাধ্য করেছিলেন। এ গাছ অসহায়ভাবে পড়ে থাকা অসুস্থ ইউনুচ নবী (আঃ)কে ছায়াদান করে সতেজ করে তুলেছিল। 'আনবাত্মা আলাইহে' আয়াতাংশটি যে অর্থ প্রকাশ করে মূলত এখানে তা-ই তুলে ধরা হয়েছে।