📄 মহাকাশ
পৃথিবীর চারদিকে ঘিরে আছে অসীম আকাশ। সৃষ্টির পর থেকে মানুষ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়েছে আকাশ পানে। যার পরিসীমায় অসংখ্য উজ্জ্বল বস্তু ও শক্তির সমাহার ঘটেছে। আদি অন্তহীন মহাবিশ্বের (Whole universe) যাবতীয় বস্তু ও শক্তি যে অঞ্চলে বিন্যস্ত বা ভাসমান তাকে আমরা মহাকাশ বলি।
পূর্বে একথা মনে করা হতো যে, আকাশ পৃথিবীর উপরে খিলানে নির্মিত একটি কঠিন গম্বুজ (Solid dome) যার গাত্রে এঁটে আছে চন্দ্র, সূর্য, তারকা ও অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহ। কিন্তু পূর্বের এ ধারণায় বিজ্ঞানসম্মত কোন যুক্তি নেই। গ্রহ-উপগ্রহগুলি কোন গম্বুজে দৃঢ়ভাবে আটকানো নেই। এদের উৎপত্তি, বিকাশ ও আবর্তন মহাশূন্যের গোলাকার আবেষ্টনীতে সংঘটিত হয় এবং কিভাবে তা সংঘটিত হয় তা-ই আলোচনার বিষয়।
আলোচনা শুরু করার পূর্বে সৃষ্টির শুরুতে সংঘটিত ঘটনাবলীর দিকে আমাদের এগুতে হবে। যেমন, Big Bang ঘটার পর আদি অগ্নিবল বিস্ফোরিত হয়ে দ্রুতবেগে বর্ধিত হতে থাকে এবং শীতল হয়ে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাসের অণুকণার ঘন মেঘপুঞ্জ সৃষ্টি করে। মহাকর্ষ বলের ক্রিয়া বিক্রিয়ায় হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাসের ঘন মেঘপুঞ্জ ক্ষুদ্র মেঘ খণ্ডে ভেঙ্গে পড়ে এবং ব্যাপক আকারে ঘূর্ণন শুরু করে। ভেঙ্গে পড়া গ্যাসীয় মেঘের আকার এমন ছিল যে, তাদের মধ্যকার মহাকর্ষ বলও বেশী ছিল। ফলে নিজস্ব মহাকর্ষ বলের প্রভাবে মেঘগুলি সংকুচিত হতে থাকে এবং গ্যাসীয় মেঘ নক্ষত্রে পরিণত হয়ে জ্যোতি বিকিরণ শুরু করে। নক্ষত্রের ভেতরকার ক্রমবর্ধমান চাপ গ্যাসীয় বস্তুর আরও ভেঙ্গে পড়াকে এগিয়ে দেয়। নক্ষত্রটি এ অবস্থায় দু'টি পরস্পর বিপরীত অভিমুখী বলের প্রভাবে সাম্যাবস্থায় থাকে। এ দু'টি বলের মধ্যে একটি হচ্ছে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ যা সংকুচিত করার চেষ্টা চালায় এবং পারমাণবিক সংযোজন (Atomic fusion) বিক্রিয়াকে প্রজ্জ্বোলিত করে। অপরটি Atomic fusion এর ফলে নির্গত শক্তি দ্বারা উৎপন্ন আভ্যন্তরীণ চাপ। আমাদের সূর্য এখন তার বিকাশের এ রকম সাম্যাবস্থায় আছে। এর সৃষ্টি হয়েছিল ৫০০০ মিলিয়ন বৎসর পূর্বে। এভাবে সৃষ্ট নক্ষত্রগুলি পারস্পরিক মহাকর্ষ শক্তির টানে গ্যালাক্সি ও গুচ্ছ গ্যালাক্সি গঠন করে। আবার ঘটনা প্রবাহে কোন কোন নক্ষত্রের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের প্রচন্ড চাপ ও তাপের দরুণ বিস্ফোরণ ঘটে। এর ফলে সৃষ্টি হয় নীহারিকা (Nebula), অতি নোভা (Super Nova) ইত্যাদি। পরিণত দশায় সোপার নোভার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে সংকোচন শুরু হলে তা থেকে ভারী মৌল উৎক্ষিপ্ত হতে থাকে এবং ব্যাপক আকারে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া মৌলিক পদার্থগুলো ধাপে ধাপে, গ্রহ, উপগ্রহ ও গ্রহাণুতে পরিণত হয় এবং নির্দিষ্ট নক্ষত্রের চতুর্দিকে ঘুরতে থাকে।
তবে এ সকল আকাশী বস্তু (Heavenly bodies) তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়নি।
250 মিলিয়ন বৎসর ব্যাপী নক্ষত্রমন্ডল অর্থাৎ গ্যালাক্সি ও গুচ্ছ গ্যালাক্সিগুলো গঠিত হয়। 750 মিলিয়ন সময়ের ব্যবধানে গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহাণুপুঞ্জ এবং ধূমকেতু সহ আমাদের সৌরজগত গড়ে ওঠে।
অতএব বিশাল মহাকাশ সৃষ্টির ক্রিয়া প্রক্রিয়াগুলি যার আদেশে সংগঠিত হয়েছে তিন প্রচন্ড ক্ষমতার মালিক আল্লাহ তাআলা।
أَفَلَمْ يَنْظُرُوا إِلَى السَّمَاءِ فَوْقَهُمْ كَيْفَ بَنَيْنَا وَزَيَّنَّهَا وَمَا لَهَا مِنْ فُرُوجٍ. Do they not look at the sky above them? How We made it and adorned it and there is no flaw in it.
তারা কি তাদের শির উপরে আকাশ পানে তাকায় না? আমরা কিভাবে তা নির্মাণ করেছি এবং কিভাবে তা (গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, নেবুলা দ্বারা) সজ্জিত করেছি এবং কোন ত্রুটির অবকাশ রাখিনি। (ক্বাফ-৬)
الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَوَاتٍ طِبَاقًا . مَا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ مِنْ تَفُوتٍ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَى مِنْ فُطُورٍ . He It is Who created the seven heavens one above another. No incongruity you will see in the creation of Rahman (Most Gracious). So turn your vision again and again, can you find any flaw?
তিনি আল্লাহ যিনি সপ্ত আকাশ সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে। রহমানের সৃষ্টি নৈপুণ্যতায় কোন কিছু অসামঞ্জস্য দৃষ্ট হবে না। অতঃপর আকাশ পানে তাকাও; বার বার তাকাও। কোন ত্রুটি দেখতে পাও কি? (মূলক-৩)
أَأَنْتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاءُ بَنَهَا . رَفَعَ سَمْكَهَا فَسَوَّهَا সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সপ্ত আকাশ এবং আকাশী বস্তু সমূহের সৃষ্টি অতিশয় কঠিন কাজ।
Are you more difficult to create or the heaven He created? On high has He raised its canopy and He has given it order and perfection.
তোমাদের সৃষ্টি অধিক কঠিন না আকাশের? যা তিনিই নির্মাণ করেছেন এবং সমুন্নত করেছেন এবং যথার্থ আদেশ (মহাকর্ষ শক্তি) প্রদান করেছেন। (নাযিয়াত-২৭-২৮)
দুনিয়াতে ভয়, আখিরাতে স্বস্তি
১৪৮. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: وَعِزَّتِي لَا أَجْمَعُ عَلَى عَبْدِى خَوْفَيْنِ، وَلَا أَجْمَعُ لَهُ أَمْنَيْنِ، إِذَا أَمِنَنِي فِي الدُّنْيَا أَخَفْتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَإِذَا خَافَنِي فِي الدُّنْيَا أَمَّنْتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"আল্লাহ তাআলা বলেন: আমার ইজ্জতের কসম, আমি আমার কোনো বান্দাকে দুটি ভীতি অথবা দুটি স্বস্তি একসাথে দেব না। সে যদি দুনিয়াতে আমার ব্যাপারে নির্ভয় হয়ে পড়ে, তবে কিয়ামাতের দিন আমি তাকে ভীতসন্ত্রস্ত করব। আর দুনিয়াতে যদি আমাকে ভয় করে চলে, তবে কিয়ামাতের দিন তাকে নিরাপদে রাখব।" [১৬৬]
মুক্তি না-পাওয়ার আশঙ্কা
১৪৯. কা'ব আহবার রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কেউ যদি সত্তর-জন নবির সমপরিমাণ আমলও করে, তারপরও কিয়ামাত-দিবসের আযাব থেকে মুক্তি না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”[১৬৭]
কিয়ামাত-দিবসের ভয়াবহতা
১৫০. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “অতীতে এমন-একদল মানুষ গত হয়েছেন যাঁরা এই প্রস্তর-খণ্ডের পরিমাণ সম্পদ দান করার পরও, কিয়ামাত-দিবসের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাবেন না বলে আশঙ্কা করতেন।”[১৬৮]
গুনাহ সত্ত্বেও আল্লাহভীরুতা
১৫১. উরওয়া ইবনু আমির রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “কিয়ামতের দিন বান্দার সামনে তার সব গুনাহ উপস্থিত করা হবে। সে তার গুনাহ বহন করে নিয়ে যেতে থাকবে এবং বলবে, (হে আল্লাহ, দুনিয়াতে) আমি তোমার ব্যাপারে ভীত ছিলাম। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ক্ষমা করে দেবেন।”[১৬৯]
পাপকাজ করেও জান্নাতী
১৫২. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الْعَبْدَ لَيُذْنِبُ الذَّنْبَ فَيَدْخُلُ بِهِ الْجَنَّةَ، قِيلَ : كَيْفَ؟ قَالَ: يَكُونُ نُصْبَ عَيْنَيْهِ ثابتًا، قَارًا، حَتَّى يَدْخُلَ الْجَنَّةَ
“বান্দা পাপ করবে; কিন্তু ওই পাপের কারণেই সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, তা কীভাবে? তিনি বললেন, “ওই পাপকাজ তার চোখের সামনে স্থির হয়ে থাকবে, (আর সে পাপ স্বীকার করবে ও তাওবা করবে।) ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”[১৭০]
নেই ভরসা
১৫৩. আবূ ইমরান থেকে বর্ণিত আছে, আবু আইয়ুব আনসারি রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "কেউ কেউ নেক আমলের ওপর ভরসা করে ছোটো ছোটো পাপ কাজ করতে থাকে। এর ফলে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময়ে, তার ওই (পাপকাজগুলো) তাকে ঘিরে ধরবে। আর কেউ কেউ পাপকাজ করে বটে, তবে সে (তওবা করে) ওই পাপ থেকে দূরে সরে যায়। ফলে সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে নিরাপদে।" [১৭১]
অনুশোচনার গুরুত্ব
১৫৪. আবূ মূসা থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “কোনো কোনো বান্দা গুনাহ করে বটে, তবে তার জন্য তাদের মন দুঃখভারাক্রান্ত থাকে। ফলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করে।" আবূ হাযিম রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “কারও কারও গুনাহ তার নেক আমলের চেয়ে উপকারী হয়ে যায়, আবার কারও কারও নেক আমল তার গুনাহের চেয়ে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।" [১৭৩]
পাপের স্বীকারোক্তি এবং ক্ষমা
১৫৫. আবূ ওয়াইল রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলা কিয়ামাতের দিন বান্দার গুনাহ গোপন করে রেখে তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি যে গুনাহের কাজ করেছ, তা কি তুমি স্বীকার করো? সে বলবে, জি, স্বীকার করি। ফলে আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।" [১৭৪]
আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার গোপন কথা
১৫৬. সাফওয়ান ইবনু মুহাররায রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে হাঁটছিলাম। এ সময় একজন লোক এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ইবনু উমর, আপনি (কিয়ামাতের দিন আল্লাহ ও বান্দার মাঝে) গোপনীয় কথা সম্পর্কে রাসূল থেকে কিছু শুনেছেন? ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
يَدْنُو الْمُؤْمِنُ مِنْ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ حَتَّى يَضَعَ عَلَيْهِ كَنَفَهُ، فَذَكَرَ صَحِيفَتَهُ ، قَالَ: فَيُقَرِّرُهُ ذُنُوبَهُ، هَلْ تَعْرِفُ فَيَقُولُ: رَبِّ أَعْرِفُ، فَيَقُولُ: هَلْ تَعْرِفُ؟ فَيَقُولُ: نَعَمْ، رَبِّ أَعْرِفُ، حَتَّى يَبْلُغَهُ بِهِ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَبْلُغَ، ثُمَّ يَقُولُ: إِنِّي سَتَرْتُهَا عَلَيْكَ، وَأَنَا أَغْفِرُهَا لَكَ الْيَوْمَ، قَالَ: فَيُعْطَى كِتَابَ حَسَنَاتِهِ، وَأَمَّا الْكَافِرُ فَيُنَادَى عَلَى رُءُوسِ الْأَشْهَادِ، قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: وَيَقُولُ الْأَشْهَادُ هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ
“(কিয়ামাতের দিন) মুমিন বান্দা তার রবের নিকটবর্তী হবে। তখন আল্লাহ তাআলা তার ওপর একটি পর্দা ফেলে দেবেন। বান্দার আমলনামা তার সামনে পেশ করবেন এবং তার গুনাহের ব্যাপারে স্বীকারোক্তি নেবেন। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কি তোমার গুনাহের কথা স্বীকার করো? সে বলবে, জি, হে আমার রব, স্বীকার করি। আবার জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কি তোমার গুনাহের কথা স্বীকার করো? সে বলবে, জি, হে আমার রব, স্বীকার করি। এরপর আল্লাহ তাআলা (তার প্রশ্নোত্তর) যতটুকু নিতে চাইবেন, ততটুকু নেবেন। আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তোমার গুনাহ গোপন করে রেখেছিলাম। আজ আমি সেসব গুনাহ ক্ষমা করে দিলাম। এরপর তাকে নেক আমালনামা দেওয়া হবে। পক্ষান্তরে কাফিরদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সাক্ষীদের উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,
وَيَقُولُ الْأَشْهَادُ هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ
“এরাই তাদের প্রতিপালকের বিরুদ্ধে মিথ্যা আরোপ করেছিল। সাবধান! জালিমদের ওপর আল্লাহর লানত।” [১৭৫]-[১৭৬]
একটি আয়াতের ব্যাখ্যা
১৫৭. আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَا يَحْزُنُهُمُ الْفَزَعُ الْأَكْبَرُ
“সেই চরম ভীতিকর অবস্থা তাদেরকে একটুও পেরেশান করবে না।”[১৭৭]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "যখন তাদেরকে জাহান্নাম বেষ্টন করে ফেলবে।” [১৭৮]
আল্লাহভীরুতার অর্থ
১৫৮. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ
“তারা আমাকে ডাকত আশা ও ভীতি নিয়ে এবং তারা ছিল আমার কাছে বিনীত।”[১৭৯]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ 'ভীতি'-এর অর্থ বলেছেন, “অন্তরে সদা জাগ্রত ভীতি।"[১৮০]
খুশু-খুযুর অর্থ
১৫৯. আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ
“যারা নিজেদের সালাতে বিনয়াবত।”[১৮১]
মানসুর ইবনু মু'তামার থেকে বর্ণিত, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "ধীরস্থিরতা।”[১৮২]
যারা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে
১৬০. আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ
“এবং যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ থেকে বিরত থাকে।”[১৮৩]
সাঈদ ইবনু আবী আরুবা থেকে বর্ণিত, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কাতাদা রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যাদের কাছে আল্লাহর নির্দেশ এলেও বাতিল ও অহেতুক কাজ থেকে বিরত থাকে না, তারা এমন নয়।”[১৮৪]
বুদ্ধিমান ব্যক্তি কে?
১৬১. শাদ্দাদ ইবনু আউস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ، وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا، وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
“যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তিকে আয়ত্তে রেখেছে এবং মৃত্যুপরবর্তী সময়ের জন্য নেক আমল করেছে, সে-ই প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধিমান। আর যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেও আল্লাহর প্রতি (ক্ষমার) আশা পোষণ করে সে নির্বোধ।”[১৮৫]
আমানত ও বিনম্রতা উঠে যাওয়া
১৬২. দামরাতা ইবনু হাবীব রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ أَوَّلَ شَيْءٍ يُرْفَعُ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ الْأَمَانَةُ وَالْخُشُوعُ، حَتَّى لَا تَكَادَ تَرَى خَاشِعًا
“সর্বপ্রথম এই উম্মত থেকে যে জিনিস উঠিয়ে নেয়া হবে, তা হলো আমানত ও বিনয়। এমনকি একজনও বিনয়ী খুঁজে পাওয়া যাবে না।”[১৮৬]
বিনম্রতা ও একাগ্রতার চিহ্ন
১৬৩. আল্লাহ তাআলা বলেন,
سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ
"তাদের চেহারায় সাজদার চিহ্ন থাকবে।”[১৮৭]
মানসুর ইবনু মু'তামার থেকে বর্ণিত, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, "তা হলো বিনম্রতা ও একাগ্রতার চিহ্ন।”[১৮৮]
ললাটে বিনয় নম্রতার চিহ্ন
১৬৪. হুমাইদ আ'রাজ থেকে বর্ণিত, মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “(কপালে সাজদার চিহ্ন) হলো বিনয় ও নম্রতার চিহ্ন।” [১৮৯]
সবার আগে যা উঠিয়ে নেওয়া হবে
১৬৫. জারীর ইবনু আবী হাযিম বলেন, আমি আবূ ইয়াযীদ মাদানী রহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি: "বলা হতো যে, এই উম্মত থেকে বিনম্রতা সবার আগে উঠিয়ে নেওয়া হবে।" [১৯০]
বিনীতদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ
১৬৬. আবূ আবদুল্লাহ রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু যখনই রবী' ইবনু খুসাইমকে দেখতেন, তখনই এই আয়াত পাঠ করতেন:
وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ
"এবং সুসংবাদ দাও বিনয়ীদের।”[১৯১]
চির-অটল
১৬৭. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আল্লাহর কসম, আমি এমন-একদল মানুষকে (অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরামকে) দেখেছি যারা জীবনেও তৃপ্তি-ভরে খেতেন না। স্রেফ বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকু খেতেন। গড়নে তাঁরা ছিলেন হালকা-পাতলা, আর নিজের সংকল্প ও হিম্মতের ওপর ছিলেন চির-অটল।”[১৯২]
সালফে সালিহীনের বৈশিষ্ট্য
১৬৮. হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কসম, এমনও দেখেছি যে, তাঁদের একেকজন গোটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন; কিন্তু কখনও তাঁদের জন্য নতুন কাপড় সেলাই করেননি, পরিবারকে তাঁদের জন্য খাবার তৈরির নির্দেশ দেননি এবং নিজেদের মধ্যে ও জমিনের মধ্যে কোনো আড়াল রাখেননি (জুতা পরেননি)।”[১৯৩]
শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার
১৬৯. রবীআ ইবনু ইয়াযীদ থেকে বর্ণিত, তিনি আবূ ইদরিস খাওলানি রহিমাহুল্লাহ- কে বলতে শুনেছেন: মানুষের শ্রেষ্ঠ অলংকার হলো ধীরস্থিরতা। [১৯৪]
টিকাঃ
[১৬৬] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/৩০৮, সনদ হাসান, মুরসাল। অন্য কিতাবে মাওসুলরূপেও বর্ণিত হয়েছে।
[১৬৭] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১৬৮] বুখারি, আত-তারিখুল কাবীর, ১/১৫, মাকতু।
[১৬৯] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১৭০] আহমাদ ইবনু হাম্বল, কিতাবুয যুহদ, ২৭৭, মুরসাল।
[১৭১] সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৭২] ইবনু হায়াওয়াইহ বর্ণনা করেছেন, কোনো কোনো লোক।
[১৭৩] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[১৭৪] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[১৭৫] সূরা হুদ: ১৮।
[১৭৬] বুখারি, ৪৪০৮; মুসলিম, ২৭৬৮।
[১৭৭] সূরা আম্বিয়া: ১০৩।
[১৭৮] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ১৭/৭৮, মাওকুফ।
[১৭৯] সূরা আম্বিয়া: ৯০।
[১৮০] হাদীসটি মাকতুরূপে বর্ণিত।
[১৮১] সূরা মুমিনুন: ২।
[১৮২] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ১৮/৩, মাকতু।
[১৮৩] সূরা মুমিনুন: ৩।
[১৮৪] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ২/৩৩৯, মাওকুফ।
[১৮৫] তিরমিযি, ৪২৬০, সনদ দঈফ।
[১৮৬] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ২/১৩৬, সনদ দঈফ, মুরসাল।
[১৮৭] সূরা ফাতহ: ২৯।
[১৮৮] আবু জাফর তাবারি, জামিউল বায়ান, ২৬/৭০, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৮৯] জালালুদ্দিন সুয়ুতি, আদ-দুররুল মানসুর, ৬/৮২, সনদ সহীহ, মাওকুফ।
[১৯০] হাদীসটি মাওকুফরূপে বর্ণিত।
[১৯১] আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ২/১০৬, সনদ মুনকাতি, মাকতু।
[১৯২] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৫২৭, মাওকুফ।
[১৯৩] ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, ১৩/৫০৮, মাওকুফ।
[১৯৪] সনদ সহীহ, মাকতু।
প্রশ্ন: আমি ও আমার ভাইসব একই বাসায় বসবাস করি, আর আমরা ‘আল- হামদুলিল্লাহ’ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশসমূহ পালন করে থাকি; কিন্তু আমরা কষ্ট অনুভব করি আমাদের মাঝে প্রচলিত একটি প্রথার কারণে, যা আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে আমাদের বাপ-দাদাদের নিকট থেকে পেয়েছি, আর তা হলো পুরুষগণ সরাসরি নারীদের সাথে বসে অর্থাৎ ভাইগণ তাদের স্ত্রীদের সাথে সবাই মিলেমিশে বসে যায়, আর আল্লাহর দীনের ব্যাপারে আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের কেউ কেউ আমাদেরকে উপদেশ দিয়েছেন, কিন্তু আমরা তাতে সাড়া দেই নি। কারণ, দীনের অনুসরণের দিক থেকে আমরা নতুন, আর কোনো একদিন আমি আমার পিতার সাথে আলাপ আলোচনা করলাম এবং তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললাম: আমাদের জন্য এ মন্দ কাজটির উপর বদ্ধমূল না থাকাই আবশ্যক; বরং আমাদের জন্য আবশ্যক হলো তা বর্জন করা, তখন আমার বাবা বললেন: আল্লাহর কসম! যদি তোমরা এ কাজ কর, তাহলে অচিরেই আমি তোমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো এবং আর কখনও তোমাদের সাথে বসব না, আর অনুরূপভাবে আমার ভাইগণের মধ্যে কোনো কোনো ভাই এ ব্যাপারে আমার পিতার সাথে একমত পোষণ করেন। সুতরাং আপনাদের নিকট এ ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি ও উপদেশ কামনা করছি, আর আমার অবস্থানের ব্যাপারে আমি কি সঠিক পথে আছি?
উত্তর: হ্যাঁ, শরী‘আতের বক্তব্যসমূহের পরিপন্থী এ মন্দ প্রথা থেকে নিষেধ করার প্রশ্নে আপনি সঠিক পথেই আছেন। কারণ, স্ত্রীগণের জন্য আবশ্যক হলো তারা তাদের স্বামীর ভাই তথা দেবরদের থেকে পর্দা করবে এবং তাদের জন্য তাদের দেবরগণের সামনে তাদের চেহারা খোলা রাখা বৈধ নয়, যেমনিভাবে বৈধ নয় বাজারে বা অন্য কোথাও পরপুরুষগণের সামনে তাদের চেহারা উন্মুক্ত।
রাখা; বরং দেবরগণের সামনে তাদের চেহারা খোলা রাখা আরও বেশি বিপজ্জনক। কারণ, স্বামীর ভাই তথা দেবর ঘরের মধ্যেই থাকে, হয় বসবাসকারী হিসেবে, নতুবা আগত মেহমান হিসেবে অথবা অনুরূপ অন্য কেনোভাবে, আর যখন সে ঘরে প্রবেশ করে অনুমোদিত পন্থায় ও যৌক্তিকভাবে, তখন তার পক্ষ থেকে বিপদের আশঙ্কাটাও অনেক বড় ধরনের।
আর এ জন্যই নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের নিকট অনুপ্রবেশ করা থেকে (পুরুষদেরকে) সতর্ক করেছেন; তিনি বলেন: إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ . قَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ, أَرَأَيْتَ الْحَمْوَ ؟ قَالَ : الْحَمْوُ الْمَوْتُ».
"তোমরা পরনারীদের নিকট অনুপ্রবেশ করা থেকে বিরত থাক। সাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! দেবরের (অনুপ্রবেশের) ব্যাপারে আপনার মতামত কী? জবাবে তিনি বললেন: দেবর তো মৃত্যুর মতো ভয়ঙ্কর."10 অর্থাৎ তার থেকে এমনভাবে পালিয়ে বেড়ানো উচিত, যেমনিভাবে মানুষ মৃত্যু থেকে পলায়ন করে।
আর এ কথাটি, অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: الْحَمْوُ »الْمَوْتُ )দেবর তো মৃত্যুর মতো ভয়ঙ্কর) হলো সবচেয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তা, এ জন্য আমি বলি: আপনার কাজটি সঠিক অর্থাৎ যে কাজে (অনৈতিকভাবে) জনগণ অভ্যস্ত হয়ে গেছে, সে কাজ থেকে আপনার নিষেধ করাটা যথাযথ হয়েছে। আর আপনার পিতার উক্তি: 'যদি তোমরা এ কাজ কর' অর্থাৎ যদি তোমরা নারীদের মধ্যে তাদের স্বামীর ভাই তথা দেবরদের থেকে পর্দা করার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত কর, তাহলে আমি তোমাদের সাথে থাকব না।' আমি তাঁর নিকট উপদেশ প্রেরণ করছি, আর তা হলো- তিনি তো সত্যের অনুসারী হবেন, সত্যের বিপরীত কোনো রীতিনীতি ও প্রথাকে পাত্তা দেবেন না, তাঁর জন্য আবশ্যক হলো আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করা এবং তিনিই হবেন (পরিবারের) প্রথম ব্যক্তি, যিনি এ কাজের নির্দেশ দিবেন, অর্থাৎ মাহরাম নন এমন পুরুষদের থেকে নারীদেরকে পর্দা করার নির্দেশ দিবেন, এমনকি তিনি এ ব্যাপারে যথাযথ দায়িত্বশীলের ভূমিকা পালন করবেন। কারণ, পুরুষ ব্যক্তি হলেন তার ঘরের ব্যাপারে দায়িত্বশীল এবং তাকে তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।
শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-'উসাইমীন
টিকাঃ
¹⁰ সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
📄 আকাশের সংখ্যা
আদি অন্তহীন মহাকাশ মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সাতটি অঞ্চলে বিভক্ত হয়েছে। এ সাতটি অঞ্চলকে আমরা সপ্ত আকাশ বলে থাকি। নবম শতাব্দীর বিশিষ্ট মুসলিম বিজ্ঞানী আল্ কারেজমী সর্বপ্রথম আকাশের স্তর সাতটি সম্পর্কে ধারণা পেশ করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা এ তথ্যের ভিত্তিতে মহাকাশে অভিযান চালিয়ে তা কনফার্ম করেন।
১ম আকাশঃ আমাদের সৌরজগতের চারটি গ্রহ এ আকাশে অবস্থিত। এগুলো হচ্ছে বুধ (Mercury), শুক্র (Venus), পৃথিবী (Earth), মঙ্গল (Mars)। সূর্য থেকে এর ব্যাসার্ধ 13 আলোক-মিনিট (13 Light minutes)। (আলোক-মিনিট হচ্ছে আলো প্রতি মিনিটে যে দূরত্ব অতিক্রম করে। উল্লেখ্য ১ সেকেন্ডে আলো 3,00,000 কিঃ মিঃ পথ অতিক্রম করে থাকে।)
২য় আকাশঃ এখানে সৌরজগতের পাঁচটি গ্রহ সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। গ্রহগুলি (৫) বৃহস্পতি (Jupiter) (৬) শনি (Saturn) (৭) ইউরেনাস (৮) নেপচুন (৯) প্লুটো। এর ব্যাসার্ধ ৫ আলোক-ঘন্টা।
৩য় আকাশঃ এ আকাশ আঞ্চলিক নক্ষত্ররাজি দ্বারা সমৃদ্ধ। নক্ষত্রসমূহ হচ্ছে, Alpha Centauri, Sun, Tau ceti, Barnard star, Sirius, Procyon, 61 Cygni, ব্যাসার্ধ 20 আলোক-বর্ষ।
৪র্থ আকাশঃ আমাদের ছায়াপথ গ্যালাক্সি (Milky Way galaxy) এ আকাশ ব্যাপী বিস্তৃত এবং এর ব্যাসার্ধ 50,000 আলোক-বর্ষ। পূর্বে এটাকে মহাবিশ্ব মনে করা হতো। এখন এরূপ ২০,০০০ কোটি গ্যালাক্সির সন্ধান পাওয়া গেছে। আমাদের ছায়াপথ গ্যালাক্সি মহাকর্ষ বলের বাধ্যবাধকতায় ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র সাথে নিয়ে আবর্তিত হচ্ছে।
৫ম আকাশঃ আঞ্চলিক গ্যালাক্সি মন্ডলী এ আকাশে অবস্থিত। এগুলি হচ্ছে, ARGO, URSA MINOR, ANDROMEDA, LEO -1, LEO - 11 ইত্যাদি। এর ব্যাসার্ধ 20,00,000 আলোক-বর্ষ।
৬ষ্ঠ আকাশঃ এখানে রয়েছে আঞ্চলিক সুপার গ্যালাক্সি গুচ্ছ। এদের নাম Sculptor, Virgo, NGC 5128, URSA ইত্যাদি। এগুলো শূন্য রাজ্যের সবচেয়ে বিশাল আকাশী বস্তু (Celestial bodies)। মহাশূন্যে এসব আকাশী বস্তুর মধ্যকার ব্যবধান তুলনামূলকভাবে ব্যাপক। এর ব্যাসার্ধ 750,00,000 আলোক-বর্ষ।
৭ম আকাশঃ আদি অন্তহীন বিশাল মহাবিশ্ব, যার সীমা-পরিসীমা কারো জানা নেই। এখানে ছায়াপথের সর্বোত্তম গুচ্ছগুলো অবস্থিত আছে। আর আছে কোয়াসার (Quasars)। জ্যোতিষ্কসমূহের মধ্যে কোয়াসার এক রহস্যময় অদ্ভুত ধরনের আকাশী বস্তু। এর দূরত্ব 20,000,000,000 আলোক-বর্ষ।
সপ্ত আকাশের সুবিশাল ব্যবস্থাপনা যা দর্শন করে নভোচারীদের শিহরণ জাগে। প্রত্যেক আকাশে অবস্থিত গ্রহ, নক্ষত্রসহ গ্যালাক্সিমন্ডলী, নেবুলা, সুপার নোভা প্রভৃতির সুশৃঙ্খল সুনিয়ন্ত্রিত আবর্তন দেখে মহান স্রষ্টার প্রতি কে না অবনত হয়? সপ্ত আকাশের মালিক মহান আল্লাহ বলেছেন,
ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ فَسَوْهُنَّ سَبْعَ سَمُوتٍ.
Then He turned to the heaven and gave order and perfection to the seven firmaments.
অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন এবং যথাযথভাবে সপ্ত আকাশ নির্মাণ করলেন। (বাকারা-২৯)
الَمْ تَرَوْا كَيْفَ خَلَقَ اللهُ سَبْعَ سَمُوتٍ طِبَاقًا .
Have you not seen how Allah created the seven skies in perfect harmony?
তোমরা লক্ষ্য করে দেখ না, কিভাবে আল্লাহ সপ্ত আকাশ নির্মাণ করেছেন স্তরে স্তরে। (নূহ-১৫)
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمُوتٍ
Allah is He Who created over you seven heavens.
তিনি আল্লাহ যিনি তোমাদের উপর সাত আকাশ নির্মাণ করেছেন। (তালাক-১২)
الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمُوتٍ طِبَاقًا
He Who created seven heavens one above another.
তিনি আল্লাহ যিনি স্তরে স্তরে সপ্ত আকাশ নির্মাণ করেছেন। (মুলক-৩)
قُلْ مَنْ رَّبُّ السَّمُوتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ.
Say, Who is the Lord of seven skies and the Lord of Arsh-Al-Ajim (Tremendous Throne).
বল, সপ্ত আকাশ আর আরশের মালিক কে? (মু'মিনূন-৮৬)
এটা খুবই লক্ষণীয় বিষয় যে, সাত (সাবআ) সংখ্যাটি রহস্যজনকভাবে মহাবিশ্বের সাথে সম্পর্কযুক্ত। মহাকাশে সাত ধরনের আকাশী বস্তু বিদ্যমান, এগুলো হলো (১) নক্ষত্র (stars) (২) গ্রহ (planets) (৩) উপগ্রহ (satellites) (৪) ধূমকেতু (comets) (৫) নীহারিকা (nebula) (৬) ছায়াপথ (galaxies) (৭) কোয়াসার (Quasars) ইত্যাদি। আবার সাত ধরনের নক্ষত্র রয়েছে। যথা (১) বাদামী বর্ণের বামন তারকা (brown dwarf stars) (২) প্রধান অণুক্রমিক তারকা (main sequence stars) (৩) লাল বর্ণের দৈত্যাকৃতির তারকা (red giant stars) (৪) পালসেটিং তারকা (pulsating stars) (৫) শুভ্র বামন তারকা (white dwarf stars) (৬) নিউট্রন তারকা (neutron stars) এবং কৃষ্ণবিবর (black holes)।
কোন কোন ভাষ্যকার (Commentators) সাত (৭) সংখ্যার অর্থ করেছেন 'বহু' (Many)। কারণ সূরা ফাতেহার শুরুতে বলা হয়েছে, "সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি বহু সৃষ্টিজগতের রব।" তাহলে মহাবিশ্বে বহু জগত (Worlds) আছে। প্রত্যেক জগতের উপর সাত আকাশ আছে। সেখানে সাত ধরনের নক্ষত্র আছে। সাত প্রকার জ্যোতিষ্কও আছে। প্রত্যেক জগতে সূর্য আছে। সূর্যের আলোতে সাত প্রকার রং আছে।
সুতরাং আল্লাহপাক কর্তৃক ব্যবহৃত সাত (৭) এক রহস্যময় সংখ্যা যা নিয়ে এখনো নিবিড় গবেষণা চলছে।
প্রশ্ন: আমাদের মাঝে একটি খারাপ প্রথা দেখতে পাওয়া যায়, আর তা হলো নারীদের সাথে পুরুষদের অবাধ মেলামেশা। কারণ হলো আমরা তাদের সাথে অধিকাংশ কাজ করি এবং তাদের দিকে তাকাই, আর তারাও তাদের কাজসমূহ করে চেহারা খোলা রাখা অবস্থায়, আর আমরা বলি যে, আমাদের নিয়ত ভালো, আর আমাদের মধ্যে কোনো কোনো ব্যক্তি তার সহোদর ভাইয়ের স্ত্রী'র দিকে তাকায় এবং তাকে (ভাইয়ের বউকে) তার মাহরাম সহোদর বোনের মতো মনে করে, আর তার প্রতিবেশীগণের স্ত্রীদেরকে (যাদের সাথে বিবাহ হারাম এমন পর্যায়ের) মাহরামদের মতো বলে গণ্য করে; সুতরাং আমাদের মাঝে এমন পুরুষ ব্যক্তি আছেন, যিনি তার সহোদর ভাইয়ের সাথে, তার চাচাতো ভাইয়ের সাথে এবং তার শ্রেণীভুক্ত লোকজনের সাথে বসবাস করেন, আর তারা পুরুষ ও নারীগণ একসাথে পানাহার করেন। অতএব, এর বিধান কী হবে?
উত্তর: এ কাজগুলো প্রথম শ্রেণির জাহেলী প্রথার অন্তর্ভুক্ত, আর শরী'আত সম্মতভাবে আবশ্যক হলো নারী কর্তৃক তার মাহরাম পুরুষের সামনে ব্যতীত অন্য কারও সামনে তার মুখমণ্ডল বা চেহারা খোলা না রাখা, ঠিক অনুরূপভাবে নারীর জন্য বাধ্যতামূলক হলো চেহারা খোলা অবস্থায় সে অপরিচিত বা পরপুরুষের সাথে উঠাবসা করবে না এবং তার ওপর আরও ওয়াজিব হলো এমন কোনো স্থানে সে পরপুরুষের সাথে একান্ত নির্জনে সাক্ষাৎ করবে না, যেখানে তার কোনো মাহরাম পুরুষের উপস্থিতি নেই। কেননা এর কারণে অগণিত ফিতনা-ফ্যাসাদের সৃষ্টি হতে পারে। আর আল্লাহই হলেন তাওফীক দানের একমাত্র মালিক।
শাইখ আবদুল আযীয ইবন আবদিল্লাহ ইবন বায
📄 Gravitation and Centrifugal force
Gravitation and Centrifugal force
মহাবিশ্বের প্রত্যেক বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে। এর নাম মহাকর্ষ শক্তি (Gravitation energy)। বৃটিশ বিজ্ঞানী নিউটন কর্তৃক বর্ণিত মহাকর্ষ তত্ত্বটি হচ্ছে "Every particle in the universe attracts every other particle with a force directly proportional to the product of their masses and inversely proportional to the square of the distance between them"। তত্ত্বটির গাণিতিক ফর্মুলা নিম্নরূপ:
F ---- m₁ m₂ ----- d²
F = force m₁ m₂ = আকৃষ্ট বস্তুদ্বয়। d = distance.
মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু কণা একে অপরকে সজোরে আকর্ষণ করে। এ আকর্ষণ শক্তি প্রত্যক্ষভাবে তাদের ভরের গুণফলের উপর এবং পরোক্ষভাবে দূরত্বের বর্গের উপর নির্ভর করে। দু'টি বস্তুর মধ্যে যার ভর বেশী, সেটি যার ভার কম তাকে কাছে টানে। দূরত্ব কম হলে আকর্ষণ শক্তি বৃদ্ধি পায়। আর দূরত্ব বেশী হলে আকর্ষণ শক্তি হ্রাস পায়।
মহাকাশের গ্রহ, নক্ষত্রগুলি মহাকর্ষ শক্তির প্রভাবে ব্যালেন্স পজিশনে কায়েম রয়েছে। পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, গ্রহ, নক্ষত্রগুলি মহাকর্ষীয় টানে পরস্পর পরস্পরের কাছে আসতে চায়। কিন্তু মহাশূন্যের অবিরাম সম্প্রসারণ গতির (force of expansion) দরুন পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যায়।
উপরন্তু গ্রহ, নক্ষত্রগুলোর অবিরাম ঘূর্ণনের ফলে তাদের কক্ষীয় গতি থেকে উত্থিত হয় একটি বল যার নাম কেন্দ্রাতিগ বল (Centrifugal force)। অর্থাৎ এটি একটি বহির্মুখী বল যা একটি অক্ষের সাপেক্ষে ঘূর্ণনশীল বস্তুর উপর সক্রিয় এবং নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী কেন্দ্রাভিমুখী বলের সমান ও বিপরীত। যেমন M ভর বিশিষ্ট একটি বস্তু যা R দৈর্ঘ্যের একটি সূতা দিয়ে একটি অনুভূমিক টেবিলের কেন্দ্রে একটি পিনের সঙ্গে যুক্ত এবং পিনের চারিদিকে প্রতি সেকেন্ডে W ভর বেগে ঘূর্ণনশীল। বস্তুটি বৃত্তাকৃতি পথে ঘুরে। যার ফলে কেন্দ্রাতিগ বল বস্তুটির উপর প্রযুক্ত হয় (Fc=Mw²R)। আর মহাকর্ষ সূত্র থেকে আমরা জানতে পেরেছি প্রত্যেক জ্যোতিষ্ক বা বস্তুদেহ (Material body) একে অপরকে আকর্ষণ করে চলেছে। এ শক্তি বস্তুর ভরের গুণফলের আনুপাতিক এবং বিপরীতভাবে বস্তু থেকে বস্তুর পৃথক হয়ে থাকার দূরত্বের বর্গের সামানুপাতিক। গ্রহ নক্ষত্রগুলো খসে পড়ে না বা একটার সাথে আর একটা ধাক্কাও খায় না যে কারণে তাহলো মহাকর্ষ ও কেন্দ্রাতিগ শক্তির সুষম প্রভাব। স্বভাবতই কেন্দ্রাতিগ শক্তি দ্বারা মহাকর্ষ শক্তির সুষমতা অদৃশ্য স্তম্ভ (Invisible pillar) তৈরী করে।
সুতরাং আল-কোরআন Gravitation and Centrifugal force সম্পর্কে যেভাবে তথ্য পেশ করেছে তা হলো,
اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمُوتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ.
Allah is He Who raised the heavens without any pillars that you can see, is firmly established on the Arsh (The throne).
তিনি আল্লাহ যিনি স্তম্ভ ব্যতীত আকাশমন্ডলীকে সুউচ্চ করেছেন তোমরা তো তা দেখতে পারছ। অতঃপর তিনি আরশে অধিষ্ঠিত হয়েছে।
وَسَخَّرَ لَكُمُ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومُ مُسَخَّرَاتٌ بِأَمْرِهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ.
He has subjected to you the night and the day; the sun and the moon and the stars are subjected by His command; Verily in these are proofs for men who are wise.
তিনি তোমাদের কাজে নিয়োজিত করেছেন রাত, দিন, সূর্য এবং চন্দ্রকে। তারকা সমূহ তাঁরই বিধানের প্রতি অনুগত রয়েছে। নিশ্চয় এতে জ্ঞানী লোকদের জন্য রয়েছে অনেক প্রমাণ। (নাহল-১২)
خَلَقَ السَّمُوتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا .
He created the heavens without any pillars that you can see.
তিনি স্তম্ভ ব্যতীত নভোমন্ডলকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তোমরা তো তা দেখছ। (লোকমান-১০)
إِنَّ اللَّهَ يُمْسِكُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ أَنْ تَزُولَا.
Surely, Allah holds the heavens and the earth lest they should move away from their places.
নিশ্চয় আল্লাহ নভোমন্ডল এবং ভূ-মন্ডলকে এমনভাবে ধারণ করে রেখেছেন যার ফলে ওগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পতিত হয় না। (ফাতির-৪১)
মুসলিম বিজ্ঞানী আল-বেরুনী ১১ শতকে Gravitation and Centrifugal force সম্পর্কিত তত্ত্বের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ কোরআন নাজিল হওয়ার ১২০০ বছর পরে বিজ্ঞানী নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। সুতরাং মহাকর্ষ ও কেন্দ্রাতিগ বল আবিস্কারের মাধ্যমে এটা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, অদৃশ্য স্তম্ভের অস্তিত্ব অবশ্যই আছে, যা উপরোল্লেখিত আয়াতসমূহে প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রশ্ন: পারিবারিক ড্রাইবারের সাথে সে পরিবারের নারী ও যুবতীদের সহাবস্থান করা এবং তাদের সাথে তার বিভিন্ন বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার বিধান কী?
উত্তর: হাদীসে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ».
"কোনো ব্যক্তি কখনও কোনো মহিলার সাথে একান্তে নির্জনে সাক্ষাৎ করবে না, তবে জেনে রাখবে এমতাবস্থায় তাদের সাথে তৃতীয় জন হলো শয়তান। "11 সুতরাং 'একান্তে নির্জনে সাক্ষাৎ'-এর বিষয়টি ব্যাপক অর্থবোধক, যা বাড়িতে, গাড়িতে, বাজারে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ও অনুরূপ যে কোনো স্থানের বেলায় সমভাবে প্রযোজ্য, আর তারা একান্ত নির্জনে নিরাপদ নয়। কেননা তাদের কথাটাও লজ্জার বস্তুর মধ্যে গণ্য এবং যা কামভাবকে উস্কিয়ে দেয়। তাছাড়া কোনো কোনো নারী অথবা পুরুষকে পাওয়া যায়, যারা আল্লাহকে ভয় করেন এবং পাপাচারিতা ও খিয়ানত করাকে অপছন্দ করেন, তাদের মাঝেও শয়তান অনুপ্রবেশ করে, তাদের জন্য গুনাহের কাজটিকে হালকা করে দেখায় এবং তাদের জন্য কুটকৌশলের দরজাগুলো খুলে দেয়; সুতরাং এর থেকে দূরে থাকাটাই সবচেয়ে নিরাপদ।
শাইখ আবদুল্লাহ ইবন আবদির রহমান আল-জিবরীন
টিকাঃ
¹¹ তিরমিযী, হাদীস নং- ২১৬৫
📄 দুই পর্বে সপ্ত আকাশ সৃষ্টি
দুই পর্বে সপ্ত আকাশ সৃষ্টি
১৯২৯ সালে G. Lemaitre এবং Hubble কর্তৃক আবিষ্কৃত তথ্য থেকে জানা যায়, মহাকাশের সাতটি স্তর এবং জ্যোতিষ্ক সমূহ দু'পর্বে (two phases) সৃষ্টি হয়েছে।
বিরাট বিস্ফোরণের (Big Bang) পর আদি অগ্নিবল বিস্ফোরিত হয়ে দ্রুত গতিতে প্রসারিত হতে থাকে এবং শীতল হয়ে ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন কণাগুলো গ্যাস-মেঘের সৃষ্টি করে। এগুলো আলোর বিচ্ছুরণের সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়। প্রথম দিকে বিকিরণের চাপের দ্বারা স্বাভাবিক বিস্তৃতি বজায় ছিল। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে কিছু হিলিয়াম সহ হাইড্রোজেন পরমাণু দ্বারা বস্তু কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। গ্যাসের এ কেন্দ্রীভূত পিণ্ড বিচ্ছিন্নভাবে একে অপর থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ছুটে বেড়ায়। যদিও বস্তুর একটি একক পিণ্ড যা তার নিজস্ব অভিকর্ষ শক্তি দ্বারা সংকুচিত হতে পারে তবুও এ সময় দু'টি বিপরীত শক্তি এ পিণ্ডের উপর ক্রিয়া করে। একটি হলো Force of Gravitation যা সংকুচিত করার চেষ্টা করে, অপরটি Force of Expansion, যা দূরত্ব সৃষ্টি করে।
কিন্তু সম্প্রসারণ শক্তির উন্মত্ত গতিবেগের জন্য সংকোচনশীল গ্যাসপিণ্ড (gas blob) বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করল। যথা- বৃত্তাকার, উপবৃত্তাকার ও সর্পিলাকার বা পেঁচানো ইত্যাদি। এগুলোর নাম গ্যালাক্সি। অর্থাৎ সৃষ্টির প্রথম পর্যায়ে বিভিন্ন আকৃতির গ্যালাক্সি গঠিত হয় এবং আকাশ সৃষ্টির কাজ সম্পন্ন হয়। সৃষ্টির এ পর্বে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন বছর সময় অতিবাহিত হয়। কোরআনে এ ১৫০ মিলিয়ন বছর সময়ের ব্যাপ্তিকে 'ইওম' বলা হয়েছে। অর্থাৎ ১ দিন।
দ্বিতীয় পর্যায়ে গ্যালাক্সিপুঞ্জ বা সংকোচনশীল গ্যাস বলয়গুলো ভেঙ্গে গিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ল। এ অংশগুলো যতবেশী সংকুচিত হলো তত দ্রুত গতিতে আবর্তিত হতে লাগল। এভাবে আবর্তিত হতে হতে চ্যাপ্টা আকার ধারণ করল এবং জমাট বেঁধে আরও ছোট ছোট বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ল। ধীর গতিতে পরিবর্তনের মাধ্যমে নক্ষত্র ও সৌরজগৎ (solar system) গঠিত হলো। গ্যাস ও ধূলিকণার গোলাকার মেঘপুঞ্জকে বলা হয় নীহারিকা (nebulae)। নীহারিকাসমূহ ঘূর্ণন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংকুচিত হতে লাগল এবং তাদের পশ্চাতে রেখে গেল গোলাকার বস্তুপিন্ড। এ গোলাকার বস্তুপিন্ডগুলো অবশেষে গ্রহ, উপগ্রহ ও গ্রহাণুতে রূপান্তরিত হলো। সুতরাং সৌরজগৎ, গ্রহ-উপগ্রহগুলো দ্বিতীয় পর্বে সৃষ্টি হয়েছিল এবং এরপর মহাবিশ্বের গোলাকার আবেষ্টনীতে আকাশের সাতটি বলয় গড়ে উঠল। দুই পর্বের সময়কালকে কোরআনের আয়াতে বলা হয়েছে ‘ইওমাইনে’।
فَقَضَهُنَّ سَبْعَ سَمُوتٍ فِي يَوْمَيْنِ وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاءِ أَمْرَهَا
So, He completed them as seven firmaments in two phases and assigned to each heaven its duty and command.
অতএব তিনি দুই পর্বে সপ্ত আকাশের সব কাজ সম্পন্ন করেন এবং প্রত্যেক আকাশে যথার্থ বিধান নির্দিষ্ট করে দেন। (হা-মীম-১২)
আরবী 'ইওম' অর্থ দিন। এ আয়াতে দ্বিবচন 'ইওমাইনে' ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু যে আয়াতে সৃষ্টি তত্ত্ব আলোচনা করা হয় সেখানে পৃথিবীর নিজ অক্ষে আবর্তনের সময়কালকে নির্দেশ করে না। যেমন সূরা হজ্বের ৪৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে ১ দিন = ১০০০ বছর। সূরা মা'আরেজের ৪ নং আয়াতে ১ দিন= ৫০,০০০ বছর বলা হয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ তাআলার নিকট ১ দিনের অর্থ একটি সময়কাল (A period of time) এ সময়কাল দীর্ঘ হতে পারে অথবা ক্ষুদ্রও হতে পারে। অর্থাৎ একটি সৃষ্টিকর্মকে পূর্ণতা দান করতে যতটুকু সময় লাগে 'দিন' বলতে সে সময়কে বুঝিয়েছেন। তাই 'ইওম' এর আরও অর্থ হতে পারে। যেমন, দিন, কাল, কালের ব্যাপ্তি, Era, phase ইত্যাদি।
প্রশ্ন: ব্রিটেনে কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকদের নিয়ে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে পুরুষ ও মহিলারা উপস্থিত হয়; সুতরাং মুসলিম নারীর জন্য মাহরাম পুরুষ ব্যতীত এ সমাবেশে পুরুষদের পাশাপাশি উপস্থিত হওয়া জায়েয হবে কিনা? আপনার জানার জন্য বলছি যে, এক ভাই এটাকে জায়েয বলেছেন এবং তিনি সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসকে এর পক্ষে দলীল হিসেবে পেশ করেছেন, তাতে আছে- জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন, তারপর তিনি অনুসন্ধান করলেন, কে তার মেহমানদারি করবে, তারপর আনসারদের মধ্য থেকে জনৈক ব্যক্তি তাকে মেহমান হিসেবে দাওয়াত করলেন এবং তিনি উল্লেখ করেন যে, আনসার সাহাবী ও তাঁর স্ত্রী ঐ পুরুষ ব্যক্তিটির বসলেন এবং তার কাছে এমনভাব প্রকাশ করলেন যে, তাঁরা দু'জন খাচ্ছেন; আমরা এ মাসআলাটির প্রকৃত ব্যাখ্যা আশা করছি?
উত্তর: প্রশ্ন থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, তাতে পুরুষ ও নারীদের মাঝে মেলামেশা বা সহাবস্থানের বিষয় রয়েছে, আর পুরুষ ও নারীদের মাঝে মেলামেশা বা সহাবস্থানের বিষয়টি ফিতনা ও অশ্লীলতার দিকে নিয়ে যায়, আর এটাকে আমি অবৈধ মনে করি; কিন্তু যখন জরুরি প্রয়োজন দাবি করে পুরষদের সাথে নারীদের উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি, তখন আবশ্যকীয় কর্তব্য হলো নারীদেরকে এক পাশে বসার ব্যবস্থা করা এবং অপর পাশে পুরুষদের জন্য বসার ব্যবস্থা করা, আর নারীগণ কর্তৃক শরী'আত নির্ধারিত পর্দা পরিপূর্ণভাবে মেনে চলা, যেখানে নারী তার চেহারাসহ পুরো শরীর ঢেকে রাখবে।
আর যে হাদীসের দিকে প্রশ্নকর্তা ইঙ্গিত করেছেন, তাতে নারী-পুরুষে সহাবস্থান ছিল না; বরং আনসার সাহাবী ও তার স্ত্রী তার ঘরের এক পাশে ছিলেন, আর মেহমান ছিলেন আতিথিয়তা তথা মেহমানদারির জায়গায়।
তাছাড়া পর্দার বিষয়টির ব্যাপারে যেমন সর্বজন বিদিত যে, শরী'আতের প্রথম দিকে পর্দার বিষয়টি বাধ্যতামূলক ছিল না। কারণ, পর্দার বিষয়টিকে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের প্রায় পাঁচ বা ছয় বছর পরে শরী'আতে বাধ্যতামূলক করা হয়, আর যেসব হাদীসে পর্দা না করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেসব হাদীস পর্দার আয়াতসমূহ নাযিল হওয়ার পূর্বের বর্ণনা বলে ধরে নিতে হবে।
শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-'উসাইমীন