📄 সূর্য চক্রাকারে আবর্তিত হয়
মহাবিশ্বের গতি: বিজ্ঞান ও কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণার বিবর্তন
দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকেরা বিশ্বাস করত যে, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে সম্পূর্ণ স্থির এবং সূর্যসহ সবকিছু পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘুরছে। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে টলেমির যুগ থেকে মহাবিশ্বের এ ভুকেন্দ্রিক ধারণা পাশ্চাত্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত সত্য হিসেবে প্রচলিত ছিল। ১৫১২ সালে নিকোলাস কোপারনিকাস তার 'সূর্যকেন্দ্রিক গ্রহসংক্রান্ত গতিতত্ত্ব' এতে বলেন যে, 'সূর্য তার চতুর্দিকে ঘূর্ণায়ন গ্রহগুলোর সৌরজগতের কেন্দ্রে গতিহীন'।
১৬০৯ খ্রিঃ জার্মান বিজ্ঞানী ইয়োহানেস কেপলার 'Astronomia Nova' নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এ বইটিতে তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, শুধুমাত্র গ্রহগুলোই সূর্যের চারদিকে ডিম্বাকৃতির কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে না, বরং গ্রহগুলো তাদের নিজস্ব অক্ষে অসম গতিতে আবর্তন করে। এ জ্ঞানের ফলে ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের পক্ষে রাত্রি ও দিনের অনুক্রমসহ সৌরজগতের অনেক কাজপদ্ধতি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়েছে।
এসব আবিষ্কারের পরেও বিশ্বাস করা হতো যে, সূর্য স্থির এবং এটি পৃথিবীর মত নিজস্ব কক্ষপথে আবর্তন করে না। আমার মনে পড়ে যখন আমি স্কুলে পড়ি, তখন ভূগোল বই পড়ে এই ভুল ধারণাটি জেনেছি।
কুরআন ও মহাকাশের বস্তুর গতি: সূরা আল-আম্বিয়া ৩৩
নিচের আয়াতটিকে মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করি:
وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ ۖ كُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ
"তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। সবাই আপন আপন কক্ষপথে বিচরণ করে।"
–সূরা আম্বিয়া: ৩৩
উপরের আয়াতে ব্যবহৃত আরবী শব্দ হচ্ছে يَسْبَحُونَ (ইয়াহবাহুন)। এই শব্দটি سبح (সাবাহা) শব্দ থেকে এসেছে। এ শব্দটি যেকোনো চলমান বস্তু থেকে উদ্ভূত গতি বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। শব্দটি যদি মাটির উপরে কোন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়, তাহলে এর অর্থ হবে না যে, সে গড়াচ্ছে বরং এটি তার হাঁটা বা দৌড়ানোর দিকে ইঙ্গিত করবে। আবার শব্দটি যদি পানিতে অবস্থানরত কোন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়, তাহলে এর অর্থ হবে না যে, সে ভাসছে বরং এটি তার সাঁতরানোর দিকে ইঙ্গিত করবে।
একইভাবে, যদি আপনি يَسْبَحُونَ (ইয়াহবাহুন) শব্দটি কোন মহাকাশের কোন বস্তু, যেমন, সূর্যের জন্য ব্যবহার করেন, তাহলে এটা শুধুমাত্র মহাশূন্যের মধ্যে দিয়ে উড়ার অর্থই বহন করে না, বরং এর অর্থ এটি এমনভাবে আবর্তিত হচ্ছে যে, এটি মহাশূন্যের ভেতর দিয়েও যাচ্ছে।
সূর্যের গতি: আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ
অনেক স্কুলের পাঠ্যক্রমে এখন এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যে, সূর্য তার কক্ষপথে আবর্তন করে। নিজের কক্ষপথে সূর্যের আবর্তন একটি যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করা যেতে পারে, যা সূর্যের ছবিটিকে একটি টেবিলের উপর প্রতিফলিত করে। এবং কেউ বিচারবুদ্ধিহীন না হলে সূর্যের ছবিটি পরীক্ষা করতে পারে। লক্ষণীয় যে, সূর্যের নিজস্ব অবস্থান অঞ্চল আছে যা প্রতি ২৫ দিনে একটি বৃত্তাকারে আবর্তন করে, অর্থাৎ নিজের কক্ষপথের চতুর্দিকে ঘুরতে সূর্যের প্রায় ২৫ দিন সময় লাগে।
সূর্য প্রায় ২৪০ কি. মি./সেকেন্ড গতিতে মহাশূন্যের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে এবং আমাদের ছায়াপথের (মহাকাশে নক্ষত্রপুঞ্জ বা নীহারিকাসৃষ্ট সুদীর্ঘ জ্যোতির্ময় বেষ্টনী) কেন্দ্রের চতুর্দিকে একটি পূর্ণ ঘূর্ণন সম্পন্ন করতে প্রায় ২০০ মিলিয়ন বছর লাগে।
কুরআন ও মহাকাশের বস্তুর গতি: সূরা ইয়াসিন ৪০
لَا الشَّمْسُ يَنبَغِي لَهَا أَن تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ ۚ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ
"সূর্য নাগাল পেতে পারে না চন্দ্রের এবং রাত্রি অগ্রে চলে না দিনের। প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে।”
–সূরা ইয়াসিনঃ ৪০
এ আয়াতটি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অতি সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে নির্দেশ করে; যেমন, সূর্য ও চন্দ্রের পৃথক পৃথক কক্ষপথের অস্তিত্ব এবং এগুলোর নিজস্ব গতিতে মহাশূন্যে ভ্রমণ।
📄 নির্দিষ্ট সময় পরে সূর্য নিষ্প্রভ হয়ে যাবে
সূর্য ও চন্দ্রের গতিপথ: বিজ্ঞান ও কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
সূর্যের নির্দিষ্ট লক্ষ্যপথ
সৌরজগতকে নিয়ে সূর্য যে নির্দিষ্ট লক্ষে চলছে, তা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান কর্তৃক সুনিশ্চিতভাবে আবিষ্কৃত সত্য। এটিকে 'সৌর শৃঙ্গ' বলা হয়। আসলে সৌরজগত মহাশূন্যে যে দিকে ধাবিত হয়, সে দিকটির অবস্থান যথার্থ ও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। আসলে সৌরজগত হারকিউলিসের কক্ষপথে অবস্থিত একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর দিকে যাচ্ছে যার অবস্থান বর্তমানে খুব জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য।
চন্দ্রের আবর্তনকাল
পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘুরতে যে সময় লাগে, একই সময়ে চন্দ্র তার নিজস্ব কক্ষপথের চতুর্দিকে একবার চক্রাকারে আবর্তন করে। চন্দ্রের একটি পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করতে সাড়ে ২৯ দিন সময় লাগে।
সূর্যের বিলুপ্তি ও কুরআনের ঘোষণা
কুরআনের আয়াত সমূহের বৈজ্ঞানিক বিশুদ্ধতায় কেউ বিস্মিত না হয়ে পারেন না। আমাদের কী প্রশ্নটির ব্যাপারে ভাবা উচিত নয় "কুরআনের জ্ঞানের উৎস কী?"
সূর্যের আলো হচ্ছে এর পৃষ্ঠের রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল যা পাঁচ বিলিয়ন বছর ধরে চলবে। কিন্তু ভবিষ্যতে এক সময়ে এর বিলুপ্তি ঘটবে যখন সূর্য ভূপৃষ্ঠের অন্যান্য সকল প্রাণীর অস্তিত্বের বিলুপ্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিষ্প্রভ হয়ে যাবে। সূর্যের অস্তিত্বের অস্থায়িত্ব সম্পর্কে কুরআন বলেঃ
وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَّهَا ۚ ذَٰلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ
"সূর্য আবর্তন করে, তার নির্দিষ্ট অবস্থানে। এটা, পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ।”
–সূরা ইয়াসীন: ৩৮
এখানে ব্যবহৃত আরবী শব্দ হচ্ছে, مُسْتَقَرّ (মুস্তাকার), যার অর্থ 'একটি নির্দিষ্ট স্থান' বা 'একটি নির্দিষ্ট সময়'। এভাবে কুরআন বলে যে, সূর্য একটা নির্দিষ্ট স্থানের দিকে আবর্তন করছে যা পূর্বনির্ধারিত সময় পর্যন্ত চলতে থাকবে এর অর্থ এই যে, এটির বিলুপ্তি ঘটবে অথবা নিষ্প্রভ হয়ে যাবে।
📄 জ্যোতির্বিজ্ঞান বিশ্ব সৃষ্টি "বিগ ব্যাঙ'
বিগ ব্যাং তত্ত্ব ও কুরআনের সাদৃশ্য
মহাবিশ্ব সৃষ্টির বিগ ব্যাং তত্ত্ব
বিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কে জ্যোতির্বিদগণ কর্তৃক প্রদত্ত যে ব্যাখ্যাটি ব্যাপকভাবে গ্রহণকৃত তা 'বিগ ব্যাঙ' তত্ত্ব হিসেবে সুপরিচিত।
যুগযুগ ধরে নভোচারী ও জ্যোতির্বিদগণ কর্তৃক সংগৃহীত পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণমূলক তথ্যের মাধ্যমে এ ধারণাটি সমর্থিত হয়েছে। 'বিগ ব্যাঙ' (মহা বিস্ফোরণ) তত্ত্ব মতে আদিতে পুরো বিশ্বটি একটা বড় পিণ্ড (রাতের আকাশে আলোর অস্পষ্ট ছোপের মতো দেখতে অতি দূরের নক্ষত্রপুঞ্জ আদি নীহারিকা) আকারে ছিল। তারপর সেখানে একটা মহা বিস্ফোরণ ঘটে (দ্বিতীয়ত পর্যায়ের বিচ্ছিন্নতা) যার ফলে ছায়াপথ (মহাকাশে নক্ষত্রপুঞ্জ বা নীহারিকাসৃষ্ট সুদীর্ঘ জ্যোতির্ময় বেষ্টনী বা Galaxy) তৈরি হয়। এগুলো পরবর্তীতে গ্রহ, তারা, সূর্য, চাঁদ, ইত্যাদিতে পরিণত হয়। বিশ্বের উৎপত্তি ছিল এক অনন্য ঘটনা এবং অলৌকিক ভাবে ইহা ঘটার সম্ভাবনা নেই।
কুরআনে মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব
বিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে কুরআনে আয়াত রয়েছে:
أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا
"কাফেররা কী দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল (সৃষ্টির একটা অংশ হিসেবে) অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম।”
–সূরা আম্বিয়া: ৩০
বিগ ব্যাং ও কুরআনের বিস্ময়কর সাদৃশ্য
কুরআনের আয়াত ও 'বিগ ব্যাঙ' এর মধ্যে বিস্ময়কর সাদৃশ্যতা সত্যিই কিছুতেই উপেক্ষণীয় নয়।
১৪০০ বছর পূর্বে আরবের মরুভূমিতে নাযিলকৃত একটা গ্রন্থ কীভাবে এই জ্ঞানগর্ভ বৈজ্ঞানিক সত্য ধারণ করতে পারে?
📄 ছায়াপথ সৃষ্টির পূর্বে প্রাথমিক গ্যাস
মহাবিশ্বের আদি অবস্থা: বিজ্ঞান ও কুরআনের প্রেক্ষাপট
মহাবিশ্বের আদি অবস্থা: বৈজ্ঞানিক ধারণা
বিজ্ঞানীরা একমত যে, বিশ্বে ছায়াপথ সৃষ্টির পূর্বে আকাশ সম্পর্কীয় বস্তুগুলি প্রাথমিকভাবে গ্যাস জাতীয় পদার্থের আকারে ছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ছায়াপথ তৈরির পূর্বে প্রচুর পরিমাণে গ্যাস পদার্থ অথবা মেঘ বিদ্যমান ছিল। আকাশ সম্পর্কীয় আদি পদার্থ বর্ণনা করতে 'ধোঁয়া' শব্দটি গ্যাসের চেয়ে বেশি উপযুক্ত। কুরআনের আয়াতে ব্যবহৃত 'দুখান' শব্দটি দ্বারা বিশ্বের এই অবস্থাকেই বুঝায় যার অর্থ ধোঁয়া।
কুরআনে মহাবিশ্বের আদি অবস্থা
আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন-
ثُمَّ اسْتَوَىٰ إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانٌ فَقَالَ لَهَا وَلِلْأَرْضِ ائْتِيَا طَوْعًا أَوْ كَرْهًا قَالَتَا أَتَيْنَا طَائِعِينَ
"তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ, তারপর তিনি তাকে এবং পৃথিবীকে বললেন, তোমরা আস ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। তারপর তারা বলল, আমরা স্বেচ্ছায় এলাম।"
–সূরা ফুসসিলাত: ১১
জ্ঞানের উৎস ও 'বিগ ব্যাঙ'
তাছাড়া 'বিগ ব্যাঙ' এর স্বাভাবিক পরিণতি হল এই ঘটনা এবং নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর পূর্বে এটি কারও কাছেই পরিচিত ছিল না। তাহলে, তখন এই জ্ঞানের উৎস কী হতে পারত?