📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মহা জীবনের শেষ দিন

📄 মহা জীবনের শেষ দিন


হযরত আনাস (রা.) বলেন, সেদিন ছিলো সোমবার মুসলমানরা ফযরের নামায আদায় করছিলেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ইমামতির দায়িত্বে ছিলেন। হঠাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আয়েশা সিদ্দিকার হুজরার পর্দা সরালেন এবং সাহাবাদের কাতারবাঁধা অবস্থায় নামায আদায় করতে দেখে মৃদু হাসলেন। এদিকে হযরত আবু বকর (রা.) কিছুটা পেছনে সরে গেলেন যেন নামাযের কাতারে রসূল শামিল হতে পারে। তিনি ভেবেছিলেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শামিল হতে পারেন এবং হয়তো নামাযে আসতে চান। হযরত আনাস (রা.) বলেন, হঠাৎ করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে সাহাবারা এতো আনন্দিত হলেন যে, নামাযের মধ্যেই ফেতনায় পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো অর্থাৎ তারা নামায ছেড়ে দিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শারীরিক অবস্থার খবর নিতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু রসূলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাত দিয়ে সাহাবাদের ইশারা করলেন, তারা যেন নামায পুরা করেন। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুজরার ভেতর চলে গিয়ে পর্দা ফেলে দিলেন।
এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অন্য কোন নামাযের সময় আসেনি। দিনের শুরুতে চাশত এর নামাযের সময়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রিয় কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.)-কে কাছে ডেকে কানে কানে কিছু কথা বললেন। তা শুনে হযরত ফাতেমা যোহরা কাঁদতে লাগলেন। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় ফাতেমার কানে কিছু কথা বললেন, এবারে হযরত ফাতেমা (রা.) হাসতে লাগলেন।
হ হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, পরবর্তী সময়ে আমি হযরত ফাতেমাকে তাঁর কান্না ও হাসির কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, প্রথমবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, এই অসুখেই আমার মৃত্যু হবে। একথা শুনে আমি কাঁদলাম। এরপর তিনি আমাকে কানে কানে বললেন, আমার পরিবার-পরিজনের মধ্যে সর্ব প্রথম তুমিই আমার অনুসারী হয়ে পরলোকে যাবে। একথা শুনে আমি হাসলাম।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফাতেমা (রা.)-কে এ সুসংবাদ প্রদান করেন যে, তিনি হলেন বিশ্বের সকল মহিলাদের নেত্রী।
সেই সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যন্ত্রণার তীব্রতা দেখে হযরত ফাতেমা (রা.) হঠাৎ বলে ফেললেন, হায় আব্বাজানের কষ্ট। একথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার আব্বার আজকের পরে আর কোন কষ্ট নেই।
নবী (সাঃ) হযরত হাসান ও হোসেন (রা.)-কে ডেকে চুম্বন করলেন এবং তাদের ব্যাপারে কল্যাণের ওসিয়ত করলেন। সহধর্মিনীদের ডাকলেন এবং তাদেরকেও ওয়ায-নসিয়ত করলেন।
এদিকে কষ্ট ক্রমেই বাড়ছিলো। বিষ-এর প্রভাবও প্রকাশ পাচ্ছিলো। খয়বরে তাঁকে এই বিষ খাওয়ানো হয়েছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আয়েশা (রা.)-কে বলতেন, হে আয়েশা খয়বরে আমি যে বিষ মিশ্রিত খাবার খেয়েছিলাম তার প্রতিক্রিয়ার কষ্ট সব সময় অনুভব করছি। এখন মনে হচ্ছে, সেই বিষের প্রভাবে যেন আমার প্রাণের শিরা কাটা যাচ্ছে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশ্যেও ওসিয়ত করেন। তাদের তিনি বলেন, 'আস সালাত, আস্ সালাত অমা মালাকাত আইমানুকুম। অর্থাৎ নামায নামায এবং তোমাদের অধীনস্থ দাসদাসী।' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথা কয়েকবার উচ্চারণ করলেন।
মৃত্যুকালীন অবস্থা ওফাতকালীন অবস্থা শুরু হলো। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেহে ঠেস দিয়ে ধরে রাখলেন। তিনি বলেন, আল্লাহর একটি নেয়ামত আমার ওপর এই যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ঘরে, আমার হিসেবের দিনে, আমার কোলের ওপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর ওফাতের সময়ে আল্লাহ তায়ালা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এবং আমার থুথু একত্রিত করেন। ঘটনা ছিলো এই যে, আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রা.) এসেছিলেন, সে সময় তার হাতে ছিলো মেসওয়াক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার গায়ের ওপর হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন। আমি লক্ষ্য করলাম যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মেসওয়াকের প্রতি তাকিয়ে আছেন। আমি বুঝলাম যে, তিনি মেসওয়াক চান। বললাম আপনার জন্যে নেব কি? তিনি মাথা নেড়ে ইশারা করলেন। আমি মেসওয়াক এনে তাঁকে দিলাম। কিন্তু শক্ত অনুভূত হলো। বললাম, আপনার জন্যে নরম করে দেবো? তিনি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। আমি দাঁত দিয়ে নরম করে দিলাম। এরপর তিনি বেশ ভালোভাবে মেসওয়াক করলেন। তাঁর সামনে একটি পাত্রে পানি ছিলো। তিনি হাত ভিজিয়ে চেহারা মুছছিলেন এবং বলছিলেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। মৃত্য বড় কঠিন।
মেসওয়াক শেষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাত অথবা আঙ্গুল তুললেন। এ সময় তাঁর দৃষ্টি ছিলো ছাদের দিকে। উভয় ঠোঁট তখনো নড়ছিলো। তিনি বিড় বিড় করে কি যেন বলছিলেন। হযরত আয়েশা (রা.) মুখের কাছে কান পাতলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বলছিলেন, হে আল্লাহ তায়ালা! নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎ ব্যক্তি যাদের তুমি পুরস্কৃত করেছ, আমাকে তাদের দলর্ভুক্ত কর, আমাকে ক্ষমা করে দাও। হে আল্লাহ তায়ালা আমাকে মার্জনা করো, আমার ওপর রহম করো এবং আমাকে 'রফিকে আলায়' পৌছে দাও। হে আল্লাহ তায়ালা! রফিকে আলা!
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ কথাটি তিনবার উচ্চারণ করেন। এর পরপরই তাঁর হাত ঝুঁকে পড়লো এবং তিনি পরম প্রিয়ের সন্নিদ্ধে চলে গেলেন। 'ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন।' অর্থাৎ আমরা সবাই আল্লাহর জন্যে এবং তাঁর কাছেই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।
এ ঘটনা ঘটেছিলো একাদশ হিজরীর ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার চাশত এর নামাযের শেষ সময়ে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স ছিলো তখন তেষট্টি বছর চারদিন।
চারদিকে শোকের ছায়া হৃদয়বিদারক এ শোক সংবাদ অল্পক্ষণের মধ্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। মদীনার জনগণ শোকে অভিভূত হয়ে গেলেন। চারদিকে ছেয়ে গেলো শোকের কালো ছায়া। হযরত আনাস (রা.) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেদিন আমাদের মাঝে আগমন করেছিলেন সেদিনের চেয়ে সমুজ্জল দিন আমি আর কখনো দেখিনি। আর যেদিন তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন দিন আমি আর কখনো দেখিনি। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর হযরত ফাতেমা (রা.) শোকে কাতর হয়ে বললেন, 'হায় আব্বাজান, যিনি পরওয়ারদেগারের ডাকে লাব্বায়ক বলেছিলেন। হায় আব্বাজান, যাঁর ঠিকানা হচ্ছে জান্নাতুল ফেরদাউস। হায় আব্বাজান, আমি জিবরাঈল (আ.)-কে আপনার ওফাতের খবর জানাচ্ছি।'
হযরত ওমর ও হযরত আবু বকরের প্রতিক্রিয়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের খবর শুনে হযরত ওমর (রা.) জ্ঞানহারা হয়ে পড়লেন। তিনি দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, কিছু কিছু মোনাফেক মনে করে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাত হয়েছে, কিন্তু আসলে তাঁর ওফাত হয়নি। তিনি তাঁর প্রতিপালকের কাছে ঠিক সেইভাবে গেছেন যেভাবে হযরত মূসা ইবনে এমরান (আ.) গিয়েছিলেন। হযরত মূসা (আ.) তাঁর কওমের কাছ থেকে চল্লিশ দিন অনুপস্থিত থাকার পর পুনরায় ফিরে এসেছিলেন অথচ তাঁর ফিরে আসার আগে তাঁর স্বজাতীয়রা বলাবলি করছিলো যে, মূসা (আ.)-এর ওফাত হয়েছে। আল্লাহর শপথ, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও ফিরে আসবেন এবং যারা মনে করছে তিনি মারা গেছেন তিনি তাদের হাত পা কেটে ফেলবেন।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সানহা নামক জায়গায় নিজের বাড়ীতে ছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের খবর শুনে ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত ছুটে এলেন এবং মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলেন। এরপর কাউকে কোন কথা না বলে সোজা হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঘরে গেলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেহ মোবারক তখন ডোরাকাটা ইয়েমেনী চাদরে ঢাকা ছিলো। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) পবিত্র চেহারা থেকে চাদর সরালেন, চুম্বন করলেন এবং কাঁদলেন। এরপর বললেন, আমার মা বাবা আপনার ওপর কোরবান হোক, আল্লাহ তায়ালা আপনার জন্যে দু'টি মৃত্যু একত্রিত করবেন না। যে মৃত্যু আপনার জন্যে লেখা ছিলো তা আপনার হয়েছে।
এরপর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বাইরে এলেন। হযরত ওমর (রা.) সমবেত লোকেদের সাথে কথা বলছিলেন। হযরত আবু বকর (রা.) তাঁকে বললেন, ওমর বসে পড়ো। হযরত ওমর (রা.) বসতে অস্বীকৃতি জানালেন। এদিকে সাহাবারা হযরত ওমরকে ছেড়ে হযরত আবু বকর (রা.)-এর প্রতি মনোযোগী হলেন। হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, তোমাদের মধ্যেকার যে ব্যক্তি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূজা করতো সে যেন জেনে রাখে যে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাত হয়নি। আর তোমাদের মধ্যেকার যে ব্যক্তি আল্লাহর এবাদাত করতো তারা যেন জেনে রাখে যে, আল্লাহ তায়ালা চিরঞ্জীব, তিনি কখনো, মৃত্যুবরণ করবেন না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেছেন, 'মোহাম্মদ কেবল রসূল মাত্র, তাঁর পূর্বে বহু রসূল গত হয়ে গেছে। সুতরাং যদি তিনি মারা যান বা নিহত হন তবে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? এবং কেউ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে কখনো আল্লাহর ক্ষতি করবে না বরং আল্লাহ তায়ালা শীঘ্রই কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন।' (সূরা আলে এমরান, আয়াত ১৪৪)
মানসিক যন্ত্রণায় দিশেহারা এবং অস্থির সাহাবারা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর বক্তব্য শুনে বিশ্বাস করলেন যে, রসূলে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকৃতই ইন্তেকাল করেছেন।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহর শপথ, কেউ যেন জানতোই না যে, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এই আয়াত নাযিল করে রেখেছেন। আবু বকর (রা.)-এর তেলাওয়াতের পর সবাই এই আয়াত মুখস্থ করলেন। সবার মুখে মুখে তখন এই আয়াত ফিরছিলো।
হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব (রা.) বলেন, হযরত ওমর (রা.) বলেছেন, আল্লাহর শপথ, হযরত আবু বকর (রা.)-কে পবিত্র কোরআনের এই আয়াত তেলাওয়াত করতে শুনে আমি যেন মাটি হয়ে গেলাম। আমি দাঁড়াতে পারছিলাম না। হযরত আবু বকরকে এই আয়াত তেলাওয়াত করতে শুনে আমি মাটিতে ঢলে পড়ে যাচ্ছিলাম। কেননা তখন স্পষ্টতই বুঝতে পারছিলাম যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্যি সত্যিই ইন্তেকাল করেছেন।
দাফনের প্রস্তুতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দাফনের জন্যে কাফন পরানোর আগেই তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনয়নের প্রশ্নে সাহাবাদের মধ্যে কিছুটা মতবিরোধ দেখা দিলো। ছাকিফা বনি সাআদায় মোহাজের ও আনসারদের মধ্যে বাদানুবাদ হলো। অবশেষে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর খেলাফতের ব্যাপারে সবাই একমত হলেন। একাজে সোমবারের বাকি দিন কেটে গেলো। রাত এসে গেলো। সবাই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। পরদিন সকাল হলো, সেদিন ছিলো মঙ্গলবার। তখনো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র দেহ সেই ইয়েমেনী চাদরে আবৃত ছিলো। ঘরের লোকেরা ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
পরদিন মঙ্গলবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেহ অনাবৃত না করেই তাঁকে গোসল দেয়া হলো। যারা গোসল করিয়েছিলেন তারা হলেন হযরত আব্বাস, হযরত আলী, হযরত আব্বাসের দুই পুত্র ফযল এবং ছাকাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মুক্ত করে .দেয়া দাস শাকরান, হযরত উসামা ইবনে যায়েদ এবং আওস ইবনে খাওলা (রা.)। হযরত আব্বাস ও তাঁর দুই পুত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাশ ফেরাচ্ছিলেন। হযরত উসামা এবং হযরত শাকরান পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন। হযরত আলী (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গোসল দিচ্ছিলেন। হযরত আওস (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিজের বুকের সাথে চেপে রাখছিলেন।
গোসল দেয়ার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তিনখানি ইয়েমেনী সাদা চাদর দিয়ে কাফন দেয়া হয়। এতে কোর্তা এবং পাগড়ি ছিলো না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শুধু চাদর দিয়েই জড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোথায় দাফন করা হবে, সে সম্পর্কেও সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, সকল নবীকেই যেখান থেকে তুলে নেয়া হয়েছে, সেই জায়গায় দাফন করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত হওয়ার পর হযরত আবু তালহা (রা.) সেই বিছানা ওঠালেন, যে বিছানায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেন। সেই বিছানার নীচে কবর খনন করা হয়।
এরপর দশজন দশজন করে সাহাবা হুজরায় প্রবেশ করে পর্যায়ক্রমে জানাযার নামায আদায় করেন। এ নামাযে কেউ ইমাম হননি। সর্বপ্রথম বনু হাশেম গোত্রের লোকেরা নামায আদায় করেন। এরপর মোহাজের এরপর আনসারা, এরপর অন্যান্য পুরষ এরপর মহিলা, এবং সবশেষে শিশুরা জানাযার নামায আদায় করেন।
জানাযার নামায আদায়ে মঙ্গলবার পুরো দিন অতিবাহিত হয়। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা আহমদ মুজতবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দাফন করা হয়। তাঁর পবিত্র দেহ কবরের ভেতর রাখা হয়।
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা) বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঠিক কখন দাফন করা হয় আমরা জানতে পারিনি। তবে বুধবার রাতের মাঝামাঝি সময়ে কিছু শব্দ পেয়েছিলাম।

টিকাঃ
১৪. বোখারী দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৬৩৮
১৫. কোন কোন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, আলোচনা এবং সুসংবাদ দেয়ার এ ঘটনা নবী জীবনের শেষ দিনে নয় বরং শেস সপ্তাহে ঘটেছিল। দেখুন, রহমতুল লিল আলামীন প্রথম খন্ড, পৃ. ২৮২
১৬. সহীহ বোখারী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৬৪১
১৭. সহীহ বোখারী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৬৩৭
১৮. সহীহ বোখারী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৬৩৭
১৯. সহীহ বোখারী, দ্বিীয় খন্ড, পৃ. ৬৪০
২০. সহীহ বোখারী, মরযে নবী অধ্যায় এবং নবী জীবনের শেষ কথা অধ্যায়, দ্বিতীয় খন্ড পৃ. ৬৩৮-৬৪১
২১. দারেমী, মেশকাত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৫৪৭
২২. সহীহ বোখারী, মরযে নবী অধ্যায় দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৬৪১
২৩. ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৬৫৫
২৪. সহীহ বোখারী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৬৪০-৬৪১
২৫. সহীহ বোখারী, প্রথম খন্ড, পৃ. ১৬৯, সহীহ মুসলিম প্রথম খন্ড, পৃ. ৩০৬
২৬. শেখ আবদুল্লাহ রচিত মুখতাছার সীরাতে রাদুল পৃ. ৪৭১ এ ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন বোখারী শরিফের মরজুন নবী অধ্যায়। আরো দেখুন ফতহুল বারী, সহীহ মুসলিম, মেশকাত। এছাড়া ইবনে হিশাম দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৬৪৯-৬৬৫, তালকীহ, পৃ. ৩৮-৩৯, রহমতুল লিল আলামীন প্রথম খন্ড, পৃ. ২৭৭-২৮৬

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মৃত্যুকালীন অবস্থা

📄 মৃত্যুকালীন অবস্থা


ওফাতকালীন অবস্থা শুরু হলো। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেহে ঠেস দিয়ে ধরে রাখলেন। তিনি বলেন, আল্লাহর একটি নেয়ামত আমার ওপর এই যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ঘরে, আমার হিসেবের দিনে, আমার কোলের ওপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর ওফাতের সময়ে আল্লাহ তায়ালা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এবং আমার থুথু একত্রিত করেন। ঘটনা ছিলো এই যে, আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রা.) এসেছিলেন, সে সময় তার হাতে ছিলো মেসওয়াক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার গায়ের ওপর হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন। আমি লক্ষ্য করলাম যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মেসওয়াকের প্রতি তাকিয়ে আছেন। আমি বুঝলাম যে, তিনি মেসওয়াক চান। বললাম আপনার জন্যে নেব কি? তিনি মাথা নেড়ে ইশারা করলেন। আমি মেসওয়াক এনে তাঁকে দিলাম। কিন্তু শক্ত অনুভূত হলো। বললাম, আপনার জন্যে নরম করে দেবো? তিনি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। আমি দাঁত দিয়ে নরম করে দিলাম। এরপর তিনি বেশ ভালোভাবে মেসওয়াক করলেন। তাঁর সামনে একটি পাত্রে পানি ছিলো। তিনি হাত ভিজিয়ে চেহারা মুছছিলেন এবং বলছিলেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। মৃত্য বড় কঠিন। ১৯
মেসওয়াক শেষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাত অথবা আঙ্গুল তুললেন। এ সময় তাঁর দৃষ্টি ছিলো ছাদের দিকে। উভয় ঠোঁট তখনো নড়ছিলো। তিনি বিড় বিড় করে কি যেন বলছিলেন। হযরত আয়েশা (রা.) মুখের কাছে কান পাতলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বলছিলেন, হে আল্লাহ তায়ালা! নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎ ব্যক্তি যাদের তুমি পুরস্কৃত করেছ, আমাকে তাদের দলর্ভুক্ত কর, আমাকে ক্ষমা করে দাও। হে আল্লাহ তায়ালা আমাকে মার্জনা করো, আমার ওপর রহম করো এবং আমাকে 'রফিকে আলায়' পৌছে দাও। হে আল্লাহ তায়ালা! রফিকে আলা! ২০

টিকাঃ
১৯. সহীহ বোখারী, দ্বিীয় খন্ড, পৃ. ৬৪০ ২০. সহীহ বোখারী, মরযে নবী অধ্যায় এবং নবী জীবনের শেষ কথা অধ্যায়, দ্বিতীয় খন্ড পৃ. ৬৩৮-৬৪১

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 চার দিকে শোকের ছায়া

📄 চার দিকে শোকের ছায়া


হৃদয়বিদারক এ শোক সংবাদ অল্পক্ষণের মধ্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। মদীনার জনগণ শোকে অভিভূত হয়ে গেলেন। চারদিকে ছেয়ে গেলো শোকের কালো ছায়া। হযরত আনাস (রা.) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেদিন আমাদের মাঝে আগমন করেছিলেন সেদিনের চেয়ে সমুজ্জল দিন আমি আর কখনো দেখিনি। আর যেদিন তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন দিন আমি আর কখনো দেখিনি। ২১ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর হযরত ফাতেমা (রা.) শোকে কাতর হয়ে বললেন, 'হায় আব্বাজান, যিনি পরওয়ারদেগারের ডাকে লাব্বায়ক বলেছিলেন। হায় আব্বাজান, যাঁর ঠিকানা হচ্ছে জান্নাতুল ফেরদাউস। হায় আব্বাজান, আমি জিবরাঈল (আ.)-কে আপনার ওফাতের খবর জানাচ্ছি।' ২২

টিকাঃ
২১. দারেমী, মেশকাত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৫৪৭ ২২. সহীহ বোখারী, মরযে নবী অধ্যায় দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৬৪১

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 হযরত ওমর ও হযরত আবু বকরের প্রতিক্রিয়া

📄 হযরত ওমর ও হযরত আবু বকরের প্রতিক্রিয়া


নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের খবর শুনে হযরত ওমর (রা.) জ্ঞানহারা হয়ে পড়লেন। তিনি দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, কিছু কিছু মোনাফেক মনে করে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাত হয়েছে, কিন্তু আসলে তাঁর ওফাত হয়নি। তিনি তাঁর প্রতিপালকের কাছে ঠিক সেইভাবে গেছেন যেভাবে হযরত মূসা ইবনে এমরান (আ.) গিয়েছিলেন। হযরত মূসা (আ.) তাঁর কওমের কাছ থেকে চল্লিশ দিন অনুপস্থিত থাকার পর পুনরায় ফিরে এসেছিলেন অথচ তাঁর ফিরে আসার আগে তাঁর স্বজাতীয়রা বলাবলি করছিলো যে, মূসা (আ.)-এর ওফাত হয়েছে। আল্লাহর শপথ, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও ফিরে আসবেন এবং যারা মনে করছে তিনি মারা গেছেন তিনি তাদের হাত পা কেটে ফেলবেন।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সানহা নামক জায়গায় নিজের বাড়ীতে ছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের খবর শুনে ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত ছুটে এলেন এবং মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলেন। এরপর কাউকে কোন কথা না বলে সোজা হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঘরে গেলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেহ মোবারক তখন ডোরাকাটা ইয়েমেনী চাদরে ঢাকা ছিলো। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) পবিত্র চেহারা থেকে চাদর সরালেন, চুম্বন করলেন এবং কাঁদলেন। এরপর বললেন, আমার মা বাবা আপনার ওপর কোরবান হোক, আল্লাহ তায়ালা আপনার জন্যে দু'টি মৃত্যু একত্রিত করবেন না। যে মৃত্যু আপনার জন্যে লেখা ছিলো তা আপনার হয়েছে।
এরপর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বাইরে এলেন। হযরত ওমর (রা.) সমবেত লোকেদের সাথে কথা বলছিলেন। হযরত আবু বকর (রা.) তাঁকে বললেন, ওমর বসে পড়ো। হযরত ওমর (রা.) বসতে অস্বীকৃতি জানালেন। এদিকে সাহাবারা হযরত ওমরকে ছেড়ে হযরত আবু বকর (রা.)-এর প্রতি মনোযোগী হলেন। হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, তোমাদের মধ্যেকার যে ব্যক্তি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূজা করতো সে যেন জেনে রাখে যে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাত হয়নি। আর তোমাদের মধ্যেকার যে ব্যক্তি আল্লাহর এবাদাত করতো তারা যেন জেনে রাখে যে, আল্লাহ তায়ালা চিরঞ্জীব, তিনি কখনো, মৃত্যুবরণ করবেন না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেছেন, 'মোহাম্মদ কেবল রসূল মাত্র, তাঁর পূর্বে বহু রসূল গত হয়ে গেছে। সুতরাং যদি তিনি মারা যান বা নিহত হন তবে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? এবং কেউ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে কখনো আল্লাহর ক্ষতি করবে না বরং আল্লাহ তায়ালা শীঘ্রই কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন।' (সূরা আলে এমরান, আয়াত ১৪৪)
মানসিক যন্ত্রণায় দিশেহারা এবং অস্থির সাহাবারা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর বক্তব্য শুনে বিশ্বাস করলেন যে, রসূলে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকৃতই ইন্তেকাল করেছেন।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহর শপথ, কেউ যেন জানতোই না যে, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এই আয়াত নাযিল করে রেখেছেন। আবু বকর (রা.)-এর তেলাওয়াতের পর সবাই এই আয়াত মুখস্থ করলেন। সবার মুখে মুখে তখন এই আয়াত ফিরছিলো।
হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব (রা.) বলেন, হযরত ওমর (রা.) বলেছেন, আল্লাহর শপথ, হযরত আবু বকর (রা.)-কে পবিত্র কোরআনের এই আয়াত তেলাওয়াত করতে শুনে আমি যেন মাটি হয়ে গেলাম। আমি দাঁড়াতে পারছিলাম না। হযরত আবু বকরকে এই আয়াত তেলাওয়াত করতে শুনে আমি মাটিতে ঢলে পড়ে যাচ্ছিলাম। কেননা তখন স্পষ্টতই বুঝতে পারছিলাম যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্যি সত্যিই ইন্তেকাল করেছেন।

টিকাঃ
২১. দারেমী, মেশকাত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৫৪৭
২২. সহীহ বোখারী, মরযে নবী অধ্যায় দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৬৪১
২৩. ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৬৫৫
২৪. সহীহ বোখারী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ৬৪০-৬৪১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00