📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 রসূলের দাওয়াতের বিরাট সফলতা

📄 রসূলের দাওয়াতের বিরাট সফলতা


এবার আমরা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জীবনের শেষ দিক সম্পর্কে আলোচনা করবো। কিন্তু সেদিকে অগ্রসর হওয়ার আগে নবী জীবনের অনন্য সাধারণ কার্যাবলীর প্রতি একটুখানি আলোকপাত করা দরকার। মূলত সেটাই হচ্ছে নবী জীবনের সারকথা। সেই বৈশিষ্টের কারণেই তিনি সকল নবী-পয়গাম্বরের মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁকে সর্বপ্রথম এবং সর্বশেষ এর অনন্য মর্যাদার মুকুট দান করেছেন। নবীকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, 'হে বস্ত্রাবৃত, রাত্রি জাগরণ কর, কিছু অংশ ব্যতীত'। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, 'হে বস্ত্রাচ্ছাদিত, উঠ, সতর্ক বাণী প্রচার কর।'
এরপর কি হয়েছে? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উঠলেন, নিজ কাঁধে বিশ্বজগতের সবচেয়ে বড় আমানতের বোঝা তুলে নিলেন এবং একাধারে দাঁড়িয়ে রইলেন। সমগ্র মানবতার বোঝা সকল আকিদার বোঝা এবং বিভিন্ন ময়দানে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার বোঝা।
তিনি মানুষের বিবেকের ময়দানে জেহাদের দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন এসব বিবেক ছিলো অজ্ঞতার যুগের কল্পনা এবং নানাবিধ উদ্ভট ধারণায় নিমজ্জিত।
মানুষের বিবেক সে সময় পৃথিবীর নানা আকর্ষণীয় বস্তুর কারণে আচ্ছাদিত হয়ে পড়েছিলো। মানুষের বিবেক খাহেশাতে নফসানীর শেকল ও ফাঁদে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কতিপয় নিবেদিত প্রাণ সাহাবার সহযোগিতায় জাহেলিয়াত এবং বিশ্বজগতের আকর্ষণ থেকে মানুষের বিবেককে মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন করার পর অন্য একটি সংগ্রাম শুরু করলেন। বরং একটির পর আরকেটি সংগ্রাম শুরু হলো। অর্থাৎ দাওয়াতে এলাহীর সেসব শত্রু যারা দাওয়াত এবং তার প্রতি বিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, দাওয়াতের পবিত্র চারাগাছকে মাটির নিচে শেকড় বিস্তারের আগে শূন্যে শাখা প্রশাখা বিস্তারের এবং ফলে ফুলে সুশোভিত হবার আগেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাচ্ছিলো। দাওয়াতের এ সকল শত্রুর সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংগ্রাম শুরু করলেন। জাযিরাতুল আরবের বিভিন্ন প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রোমক সাম্রাজ্য এ নয়া জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে সীমান্তে প্রস্তুতি শুরু করে।
অবশেষে সকল সংগ্রাম শেষ হলো কিন্তু বিবেকের সংগ্রাম সংঘাত শেষ হয়নি। কারণ এটি হচ্ছে চিরস্থায়ী সংঘাতের বিষয়। এতে শয়তানের সাথে মোকাবেলা করতে হয়। শয়তান মানব মনের গভীরে প্রবেশ করে তার তৎপরতা অব্যাহত রাখে এবং মুহূর্তের জন্যেও তা বন্ধ করে না। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দাওয়াতের কাজে নিয়োজিত থেকে বিভিন্ন ময়দানে যথোচিত সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। দুনিয়া তাঁর চরণে এসে লুটিয়ে পড়েছিলো কিন্তু তিনি দুঃখকষ্ট এবং দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছিলেন। ঈমানদাররা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চারিপাশে শান্তি ও নিরাপত্তার ছায়া বিস্তার করে রেখেছিলেন। কিন্তু তিনি দুঃখ দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনের পথে সাধনা অব্যাহত রাখেন। যে কোন অবস্থায় দুঃখকষ্টের মধ্যে তিনি অভূতপূর্ব ধৈর্যধারণ করছিলেন। রাত্রিকালে তিনি নামাযে দাঁড়াতেন। প্রিয় প্রতিপালকের এবাদাত এবং পবিত্র কোরআন ধীরে ধীরে তেলাওয়াত করতেন। সমগ্র বিশ্ব থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে আল্লাহর প্রতি তিনি মনোযোগী হয়ে উঠেছিলেন। অবশ্য তাঁকে এ রকম করতে নির্দেশও প্রদান করা হয়েছিলো।
এমনিভাবে সুদীর্ঘ বিশ বছরের বেশী সময় যাবত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংগ্রাম চালিয়ে যান। এই সময়ের মধ্যে একটি কাজে আত্মনিয়োগ করে অন্য কাজ তিনি ভুলে থাকেননি। পরিশেষে ইসলামী দাওয়াত এমন ব্যাপক সাফল্য লাভ করলো যে, সবাইকে অবাক হতে হলো। সমগ্র জাযিরাতুল আরব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুগত হলো। আরবের দিগন্ত থেকে জাহেলিয়াতের মেঘ কেটে গেলো। অসুস্থ বিবেকসমূহ সুস্থ হয়ে গেলো। এমনকি মূর্তিসমূহকে তারা ছেড়ে দিল বরং ভেঙ্গে ফেলল। তওহীদের আওয়াযে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠলো। ঈমানের তেজে নতুন জীবনীশক্তি লাভ করে মরু বিয়াবান আযানের সুমধুর ধ্বনিতে প্রকম্পিত হলো। দিক দিগন্তে আল্লাহু আকবর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো। কোরআনের ক্বারীরা পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করতেন এবং আল্লাহর হুকুম আহকাম কায়েম করতে উত্তর দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়লেন।
বিচ্ছিন্ন গোত্রসমূহ একত্রিত হলো, মানুষ মানুষের দাসত্ব ছেড়ে আল্লাহর দাসত্বে আত্মনিয়োগ করলো। এখন আর কেউ শোষক নয়, কেউ শোষিত নয়, কারো রক্তচক্ষু কাউকে এখন আর ভীতসন্ত্রস্ত করে না, কেউ যালেম নয়, কেউ মযলুম নয়, কেউ মালিক নয়, কেউ গোলাম নয়, কেউ শাসক নয়, কেউ শাসিত নয় বরং সকল মানুষ আল্লাহর বান্দা এবং পরস্পর ভাই ভাই। তারা একে অন্যকে ভালোবাসে এবং আল্লাহর হুকুম আহকাম পালন করে। আল্লাহ তায়ালা তাদের মধ্য থেকে জাহেলিয়াতের সময়ের গর্ব অহঙ্কার এবং পিতা পিতামহের নামে আত্মম্ভরিতার অবসান ঘটালেন। এখন আর অনারবদের ওপর আরবদের এবং কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। এখানে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া। অন্যথায় সকল মানুষ আদমের সন্তান। আর আদম হচ্ছে মাটির তৈরী।
মোটকথা এই দাওয়াতের ফলে আরব ঐক্য মানবীয় ঐক্য সম্মিলিত ন্যায়নীতি ও সুবিচার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। মানব জাতি দুনিয়ার বিভিন্ন সমস্যা এবং আখেরাতের বিভিন্ন কাজে সৌভাগ্যের পথের সন্ধান পেলো। অন্য কথায় ইতিহাসের ধারাই পাল্টে গেলো।
এই দাওয়াতের আগে পৃথিবীতে জাহেলিয়াতের জয়-জয়াকার চলছিলো। মানুষের বিবেক অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। আত্মা দুর্গন্ধময় হয়ে পড়েছিলো। মূল্যবোধে চরম অবক্ষয় ঘটেছিলো। অত্যাচার এবং দাসত্বের প্রবল প্রতাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। উচ্ছৃঙ্খলতাপূর্ণ এবং লজ্জাকর সাচ্ছন্দ্য এবং ধ্বংসাত্মক বঞ্চনার ঢেউ বিশ্বকে অবনতির অতলে পৌঁছে দিয়েছিলো। এর ওপর কুফুরী এবং পথভ্রষ্টতার অন্ধকারে মোটা পর্দা হয়ে পড়ে গিয়েছিলো। অথচ সে সময়ও আসমানী মাযহাব এবং ধর্ম বিশ্বাস বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু মানুষ সেসবকে বিকৃত করে দিয়েছিলো। ফলে ধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে দূর্বলতা চরমে পৌছে গিয়েছিলো। ধর্মের বন্ধন ছিলো শিথিল। ধর্ম হয়ে পড়েছিলো প্রাণহীন দেহের মতো দূর্বল এবং অল্পকিছু আচার অনুষ্ঠানসর্বস্ব।
উল্লিখিত দাওয়াত যখন মানব জীবনের ওপর প্রভাব বিস্তার করলো, তখন মানবাত্মা অলীক ধ্যান-ধারণা, প্রবৃত্তির দাসত্ব নোংরামি, অন্যায়, অত্যাচার, নৈরাজ্য এবং অরাজকতা থেকে মুক্তি লাভ করলো। মানব সমাজকে যুলুম, অত্যাচার, হঠকারিতা, ঔদ্ধত্য, ধ্বংস, শ্রেণী বৈষম্য, শাসকদের অত্যাচার, জ্যোতিষীদের অবমাননাকর ও স্বেচ্ছাচারিতা থেকে মুক্তি দান করলো। বিশ্ব তখন দয়া, ক্ষমা, বিনয়, নম্রতা, আবিষ্কার, নির্মাণ, স্বাধীনতা, সংস্কার, মারেফাত, ঈমান, ন্যায়পরায়ণতা, সুবিচার এবং আমলের ভিত্তিতে জীবনের উন্নতি ও অগ্রগতি এবং হকদারের অধিকার লাভের নিশ্চয়তার কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হলো।
এসকল পরিবর্তনের কারণে জাযিরাতুল আরব এমন একটি বরকতপূর্ণ জনবসতিতে পরিণত হলো যার উদাহরণ মানব ইতিহাসের কোন যুগে অথবা কোন দেশে দেখা যায়নি এবং যাবেও না। জাযিরাতুল আরব তার ইতিহাসে এমন জৌলুসপূর্ণ এবং ঝলমলে হয়ে উঠলো যে, এর আগে কখনোই, কোথাও ওরকম দেখা যায়নি।

টিকাঃ
১. সাইয়েদ কুতুব শহীদ, তাফসীর ফি যিলালিল কোরআন, উনত্রিশতম খন্ড পৃষ্ঠা ১৬৮, ১৬৯
২. সাইয়েদ কুতুব শহীদ, তাফসীর ফী যিলালিল কোরআন, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00