📄 এ যুদ্ধের প্রভাব ও এ সম্পর্কে কোরআনের আয়াত
তবুক যুদ্ধ জাযিরাতুল আরবের ওপর মুসলমানদের প্রভাব বিস্তার এবং শক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো। জনসাধারণ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলো যে, এখন থেকে জাযিরাতুল আরবে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন শক্তির অস্তিত্ব থাকবে না। পৌত্তলিক এবং মোনাফেকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অব্যাহত ষড়যন্ত্র চালিয়ে নিজেদের প্রত্যাশিত যে সুযোগের স্বপ্ন দেখছিলো সে স্বপ্নও ভেঙ্গে খান খান হয়ে গিয়েছিলো। কেননা তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূল কেন্দ্র ছিলো রোমক শক্তি। এ যুদ্ধের ফলে সে আশাও ধূলিসাৎ হয়ে গেলো। এতে কাফের ও মোনাফেকদের মনোবল ভেঙ্গে যায়। তারা সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলো যে, ইসলাম থেকে পলায়ন বা নিষ্কৃতি পাওয়ার কোন উপায় নেই।
এমতাবস্থায় মোনাফেকদের সাথে নরম ব্যবহার করার কোন প্রয়োজনীয়তা মুসলমানদের ছিলো না। মোনাফেকদের সাথে কঠোর ব্যবহার করতে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিলেন। এমনকি তাদের দেয়া দান-খয়রাত গ্রহণ, তাদের জানাযার নামায আদায়, তাদের জন্যে মাগফেরাতের দোয়া এবং তাদের কবর যেয়ারত করতেও নিষেধ করা হলো। মসজিদের নামে তারা ষড়যন্ত্রের যে আখড়া তৈরী করেছিলো, সেটিও ধ্বংস করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। মোনাফেকদের সম্পর্কে এমন আয়াত নাযিল হলো যে, এতে তারা সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে পড়লো। তাদের চিনতে আর কোন অসুবিধাই রইল না। কোরআনের আয়াতের দ্বারা মোনাফেকদের যেন অঙ্গুলি নির্দেশ করে চিনিয়ে দেয়া হলো।
তবুকের যুদ্ধের প্রভাব এ থেকেও বোঝা যায় যে, মক্কা বিজয়ের পর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল মদীনায় আসতে শুরু করলেও এ যুদ্ধের পর সে সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গেলো।
এই সম্পর্কে কোরআনের আয়াত
এই যুদ্ধ সম্পর্কে সূরা তাওবায় বহুসংখ্যক আয়াত নাযিল হয়েছিলো। কিছু হয়েছে যুদ্ধে রওয়ানা হওয়ার আগে এবং কিছু কিছু মদীনায় ফিরে আসার পরে। এসব আয়াতে যুদ্ধের অবস্থা বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছিলো। মোনাফেকদের পর্দা উন্মোচন করে দেয়া হয়েছিলো। সরলপ্রাণ মোজাহেদদের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে তাদের প্রশংসা করা হয়েছিলো। মোমেনীন এবং সাদেকীন যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং যারা করেননি, তাদের তওবা কবুল করার কথা বলা হয়েছে।
টিকাঃ
১১. এ যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ যেসব গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে সেগুলোর নাম, ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৫১৫-৫৩৭, যাদুল মায়াদ ৩য় খন্ড, পৃ. ২-১৩, সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড, পৃ. ৩১৩-৩৩৭, ফতহুল বারী, ৮ম খন্ড, পৃ. ১১০-১২৬ ও তাফসীর ফী যিলালিল কোরআন, সূরা তাওবা।
📄 এই সময়ের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা
নবম হিজরীতে ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পন্ন বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছিলো। (১) তবুক থেকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফিরে আসার পর উওয়ায়মের আজলানি এবং তার স্ত্রীর মধ্যে 'লেআন' হয়েছিলো। উল্লেখ্য স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া হয় অথচ সাক্ষী নেই, তাকে লেআন বলে।
(২) যেনাকারিনী একজন মহিলা নবী মুরসালিনের দরবারে এসে নিজের পাপের কথা স্বীকার করে শাস্তির আবেদন জানিয়েছিলেন। তাকে সন্তান প্রসবের পর আসতে বলা হয়েছিলো। সন্তানের দুধ ছাড়ানোর পর তাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা অর্থাৎ রজম করা হয়।
(৩) হাবশার সম্রাট আসহামা নাজ্জাশী ইন্তেকাল করেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার গায়েবানা জানাযা আদায় করেন।
(৪) নবী নন্দিনী উম্মে কুলসুম (রা.) ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালে প্রিয় নবী শোকে কাতর হয়ে পড়েন। তিনি হযরত ওসমানকে (রা.) বলেছিলেন, যদি আমার তৃতীয় কোন মেয়ে থাকতো তবে তাকেও আমি তোমার সাথে বিয়ে দিতাম।
(৫) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তবুক থেকে ফিরে আসার পর মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। নবী তার জন্যে মাগফেরাতের দোয়া করেন এবং হযরত ওমর (রা.)-এর নিষেধ সত্তেও তার জানাযার নামায আদায় করেন। এরপর কোরআনের আয়াত নাযিল হয় তাতে এবং হযরত ওমর (রা.)-এর বক্তব্যের সমর্থনে মোনাফেকদের জানাযা করতে নিষেধ করা হয়।
📄 হযরত আবু বকরের (রা.) নেতৃত্বে হজ্জ পালন
নবম হিজরীতে যিলকদ বা যিলহজ্জ মাসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিদ্দিকে আকবর হযরত আবু বকরকে (রা.) আমিরুল হজ্জ করে মক্কায় প্রেরণ করেন।
এরপর সূরা তাওবার প্রথমাংশ নাযিল হয়। এতে মোশরেকদের সাথে কৃত অঙ্গীকার সমতার ভিত্তিতে শেষ করার নির্দেশ দেয়া হয়। এ নির্দেশ আসার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলীকে (রা.) এ ঘোষণা প্রকাশের জন্যে প্রেরণ করেন। আরবদের মধ্যে অঙ্গীকারের ক্ষেত্রে এটাই ছিলো রীতি। হযরত আবু বকরের সাথে হযরত আলীর সাক্ষাৎ হয়েছিলো দাজনান মতান্তরে আরজ প্রান্তরে। হযরত আবু বকর (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন তুমি আমীর নাকি মামুর? হযরত আলী বললেন, মামুর। এরপর উভয়ে সামনে অগ্রসর হন। হযরত আবু বকর লোকদের হজ্জ করান। ১০ই যিলহজ্জ অর্থাৎ কোরবানীর দিনে হযরত আলী (রা.) হাজীদের পাশে দাঁড়িয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ অনুযায়ী ঘোষণা দেন। অর্থাৎ সকল প্রকার অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির সমাপ্তির কথা ঘোষণা করেন। চার মাসের সময় দেয়া হয়। যাদের সাথে কোন অঙ্গীকার ছিলো না, তাদেরকেও চার মাস সময় দেয়া হয় তবে মুসলমানদের সাথে যেসব মোশরেক অঙ্গীকার পালনে ত্রুটি করেনি এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্যদের সাহায্য করেনি, তাদের চুক্তিপত্র নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বলবৎ রাখা হয়।
হযরত আবু বকর (রা.) কয়েকজন সাহাবাকে পাঠিয়ে এ ঘোষণা করান যে, ভবিষ্যতে কোন মোশরেক হজ্জ করতে এবং নগ্নাবস্থায় কেউ কাবাঘর তওয়াফ করতে পারবে না।
এ ঘোষণা ছিলো প্রকৃতপক্ষে জাযিরাতুল আরব থেকে মূর্তি পূজার অবসানের চূড়ান্ত পদক্ষেপ। অর্থাৎ এ বছরের পর থেকে মূর্তি পূজার উদ্দেশ্যে আসার জন্যে কোন সুযোগই আর থাকলো না।
টিকাঃ
১. বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্য, সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ২২০, ৪৫১, ২য় খন্ড ৬২৬, ৬৭১, যাদুল মায়াদ ৩য় খন্ড, পৃ. ৫৪৩-৫৪৬, তাফসীর গ্রন্থাবলী সূরা বারাআতের প্রথমাংশ