📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 রোম ও গাসসানের প্রস্তুতির বিশেষ খবর

📄 রোম ও গাসসানের প্রস্তুতির বিশেষ খবর


এ সময়ে সিরিয়া থেকে তেল আনতে যাওয়া নাবেতিদের⁴ কাছে হঠাৎ জানা গেলো যে, হিরাক্লিয়াস ৪০ হাজার দুর্ধর্ষ সৈন্যের এক বাহিনী তৈরী করেছেন এবং রোমের এক বিখ্যাত যোদ্ধা সেই বাহিনীর নেতৃত্ব করছেন। সেই কমান্ডার তার অধীনে খৃষ্টান গোত্র লাখাম জাযাম প্রভৃতিকে সমবেত করেছে এবং অগ্রবর্তী বাহিনী বালকা নামক জায়গায় পৌঁছে গেছে। এমনিভাবে এক গুরুতর সমস্যা মুসলমানদের সামনে দেখা দিলো।

পরিস্থিতির নাযুকতা
সেই সময় প্রচন্ড গরম পড়েছিলো। দেশে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা এবং দুর্ভিক্ষপ্রায় অবস্থা বিরাজ করছিলো। উট ঘোড়া প্রভৃতি যানবাহনের সংখ্যা ছিলো কম। গাছের ফল পেকে আসছিলো। এ কারণে অনেকেই ছায়ায় এবং ফলের কাছাকাছি থাকতে চাচ্ছিলো। তারা তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধে যেতে চাচ্ছিলেন না। তদুপরি পথের দূরত্ব ছিলো অনেক, পথ ছিলো দুর্গম ও বন্ধুর। সব কিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিলো বড়োই নাযুক।

তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত
আল্লাহর নবী এ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, এমনি সঙ্কট সময়ে যদি রোমকদের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে শৈথিল্য ও অলসতার পরিচয় দেয়া হয় তাহলে রোমকরা মুসলিম অধিকৃত ও অধ্যুষিত এলাকাসমূহে প্রবেশ করবে। ফলে ইসলামের দাওয়াত, প্রচার এবং প্রসারে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। মুসলমানরা সামরিক শক্তির স্বাতন্ত্র হারাবে। হোনায়েনের যুদ্ধে পর্যুদস্ত, বাতিল ও কুফুরী শক্তি পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠবে। বাইরের শক্তির সাথে গোপনে যোগাযোগ রক্ষাকারী মোনাফেকরা যারা সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করছিলো তারা মুসলমানদের পিঠে ছুরিকাঘাত করবে। পেছনে থাকবে শত্রুদল মোনাফেক আর সামনে থাকবে বিধর্মী রোমক সৈন্যদল। এতে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত শ্রম-সাধনা ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়ে পড়বে। নবী এবং সাহাবাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট বিফলে যাবে। অনেক কষ্টে অর্জিত সাফল্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। অথচ এই সাফল্যের পেছনে মুসলমানদের ত্যাগ তিতিক্ষার ইতিহাস বড়োই দীর্ঘ।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব সম্ভাবনা ভালোভাবে অনুধাবন করছিলেন। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, মুসলিম অধিকৃত ও অধ্যুষিত এলাকায় বিধর্মীদের প্রবেশের সুযোগ দেয়ার তো দূরে থাক বরং ওদের এলাকায় গিয়েই আঘাত করা হবে।

টিকাঃ
৪. এরা নাবেত ইবনে ইসমাইল (আঃ)-এর বংশধর। এক সময় এরা পাটরা এবং হেজাযের উত্তরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। কিন্তু কালক্রমে শক্তিহীন হয়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 পরিস্থিতির নাযুকতা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত

📄 পরিস্থিতির নাযুকতা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত


সেই সময় প্রচন্ড গরম পড়েছিলো। দেশে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা এবং দুর্ভিক্ষপ্রায় অবস্থা বিরাজ করছিলো। উট ঘোড়া প্রভৃতি যানবাহনের সংখ্যা ছিলো কম। গাছের ফল পেকে আসছিলো। এ কারণে অনেকেই ছায়ায় এবং ফলের কাছাকাছি থাকতে চাচ্ছিলো। তারা তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধে যেতে চাচ্ছিলেন না। তদুপরি পথের দূরত্ব ছিলো অনেক, পথ ছিলো দুর্গম ও বন্ধুর। সব কিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিলো বড়োই নাযুক।
তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত আল্লাহর নবী এ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, এমনি সঙ্কট সময়ে যদি রোমকদের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে শৈথিল্য ও অলসতার পরিচয় দেয়া হয় তাহলে রোমকরা মুসলিম অধিকৃত ও অধ্যুষিত এলাকাসমূহে প্রবেশ করবে। ফলে ইসলামের দাওয়াত, প্রচার এবং প্রসারে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। মুসলমানরা সামরিক শক্তির স্বাতন্ত্র হারাবে। হোনায়েনের যুদ্ধে পর্যুদস্ত, বাতিল ও কুফুরী শক্তি পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠবে। বাইরের শক্তির সাথে গোপনে যোগাযোগ রক্ষাকারী মোনাফেকরা যারা সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করছিলো তারা মুসলমানদের পিঠে ছুরিকাঘাত করবে। পেছনে থাকবে শত্রুদল মোনাফেক আর সামনে থাকবে বিধর্মী রোমক সৈন্যদল। এতে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত শ্রম-সাধনা ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়ে পড়বে। নবী এবং সাহাবাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট বিফলে যাবে। অনেক কষ্টে অর্জিত সাফল্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। অথচ এই সাফল্যের পেছনে মুসলমানদের ত্যাগ তিতিক্ষার ইতিহাস বড়োই দীর্ঘ।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব সম্ভাবনা ভালোভাবে অনুধাবন করছিলেন। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, মুসলিম অধিকৃত ও অধ্যুষিত এলাকায় বিধর্মীদের প্রবেশের সুযোগ দেয়ার তো দূরে থাক বরং ওদের এলাকায় গিয়েই আঘাত করা হবে।
রোমকদের সাথে যুদ্ধ প্রস্তুতির ঘোষণা উল্লিখিত বিষয়সমূহ পর্যালোচনার পর নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের মধ্যে যুদ্ধ প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন। মক্কাবাসী এবং আরবের বিভিন্ন গোত্রকেও যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। অন্য সময়ে নবী শ্রেষ্ঠ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধের ক্ষেত্রে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতেন গন্তব্যের কথা গোপন রাখতেন। কিন্তু এবার তা করলেন না। প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন যে, রোমকদের সাথে যুদ্ধ হবে।
মুসলমানরা যেন যুদ্ধের জন্যে ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারেন এ জন্যেই প্রকাশ্যে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো। যুদ্ধের জন্যে মুসলমানদের প্রস্তুতিতে উদ্বুদ্ধ করতে সূরা তাওবার একাংশও নাযিল হয়েছিলো। সাথে সাথে তিনি সদকা খয়রাত করার ফযিলত বর্ণনা করেন এবং আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ব্যয়ে মুসলমানদের অনুপ্রাণিত করেন।
যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্যে মুসলমানদের প্রচেষ্টা সাহাবায়ে কেরাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পাওয়ার পরই যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি শুরু করেন। মদীনার চারিদিক থেকে আগ্রহী মুসলমানরা আসতে থাকেন। যাদের মনে মোনাফেকী অর্থাৎ নেফাকের অসুখ রয়েছে, তারা ছাড়া কেউ এ যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার কথা ভাবতেই পারেননি। তবে তিন শ্রেণীর মুসলমান ছিলেন পৃথক। তাদের ঈমান ও আমলে কোন প্রকার ত্রুটি ছিলো না। গরীব ক্ষুধাতুর মুসলমানরা আসছিলেন এবং যানবাহনের ব্যবস্থা করার আবেদন জানাচ্ছিলেন কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অক্ষমতা প্রকাশ করছিলেন। সূরা তাওবায় এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'ওদের কোন অপরাধ নেই, যারা তোমার কাছে বাহনের জন্যে এলে তুমি বলেছিলে, 'তোমাদের জন্যে কোন বাহন আমি পাচ্ছি না। ওরা অর্থ ব্যয়ে অসামর্থতাজনিত দুঃখে অশ্রু বিগলিত চোখে ফিরে গেলো।'
মুসলমানরা সদকা-খয়রাতের দিক থেকে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। হযরত ওসমান (রা.) সিরিয়ায় ব্যবসার জন্যে প্রেরণের উদ্দেশ্যে একটি কাফেলা তৈরী করেছিলেন। এতে সুসজ্জিত দুইশত উট ছিলো। দুশো উকিয়া অর্থাৎ প্রায় সাড়ে উনত্রিশ কিলো রৌপ্য ছিলো। তিনি এইসবই সদকা করে দিলেন। এরপর পুনরায় একশত উট সুসজ্জিত অবস্থায় দান করলেন। তিনি এক হাজার দীনার অর্থাৎ প্রায় ৫ কিলো সোনা নিয়ে এলেন এবং তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে রাখলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেসব উল্টেপাল্টে দেখছিলেন আর বলছিলেন, আজকের পর থেকে ওসমান যা কিছুই করুক না কেন, তার কোন ক্ষতি হবে না। এরপরও হযরত ওসমান (রা.) সদকা করেন। সব মিলিয়ে দেখা গেলো যে, তাঁর সদকার পরিমাণ নগদ অর্থ ছাড়াও ছিলো নয়শত উট এবং একশত ঘোড়া।
এদিকে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) দু'শো উকিয়া অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ কিলো চাঁদি নিয়ে আসেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁর ঘরের সবকিছু নিয়ে আসেন এবং ঘরে শুধু আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূলকে রেখে আসেন। তাঁর সদকার পরিমাণ ছিলো চার হাজার দিরহাম। তিনিই প্রথমে তার সদকা নিয়ে হাযির হয়েছিলেন। হযরত ওমর (রা.) তার অর্ধেক ধন-সম্পদ নিয়ে হাযির হন। হযরত আব্বাস (রা.) তাঁর বহু ধন-সম্পদ নিয়ে আসেন। হযরত তালহা হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা এবং মোহাম্মদ ইবনে মোসলমাও অনেক ধন-সম্পদ নিয়ে হাযির হন। হযরত আসেম ইবনে আদী নব্বই ওয়াসক অর্থাৎ সাড়ে ১৩ হাজার কিলো বা সোয়া তের টন খেজুর নিয়ে আসেন। অন্যান্য সাহাবারাও সাধ্যমত সদকা নিয়ে আসেন। কেউ এক মুঠো কেউ দুই মুঠোও দেন, তাদের এর বেশী দেয়ার সামর্থ ছিলো না।
মহিলারা তাদের হার, বাজুবন্দ, ঝুমকা, পা-জেব, বালি, আংটি ইত্যাদি সাধ্যমাফিক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে প্রেরণ করেন। কেউ বিরত থাকেননি, কেউ পিছিয়ে থাকেননি। কৃপণতার চিন্তা কারো মনে আসেনি। বেশী বেশী যারা সদকা দিচ্ছিলেন, মোনাফেকরা তাদের খোঁটা দিচ্ছিলো যে, ওরা অহংকারী। যারা সামান্য কিছু দান করছিলেন, তাদের নিয়ে উপহাস করছিলো যে, ওরা একটি দু'টি খেজুর দিয়ে কায়সারের দেশ জয় করতে চলেছে। কোরআনের সূরা তাওবায় এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'মোমেনদের মধ্যে যারা স্বতস্ফূর্তভাবে সদকা দেয় এবং যারা নিজ শ্রম ব্যতীত কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ ও বিদ্রূপ করে, আল্লাহ তায়ালা তাদের বিদ্রূপ করেন, ওদের জন্যে আছে মর্মন্তুদ শাস্তি।'

টিকাঃ
৪. এরা নাবেত ইবনে ইসমাইল (আঃ)-এর বংশধর। এক সময় এরা পাটরা এবং হেজাযের উত্তরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। কিন্তু কালক্রমে শক্তিহীন হয়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়।
৫. জামে তিরিমিয, মানাকেবে ওসমান ইবনে আফফান, ২য় খন্ড, পৃ. ২১১

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 রোমকদের সাথে যুদ্ধ প্রস্তুতির ঘোষণা

📄 রোমকদের সাথে যুদ্ধ প্রস্তুতির ঘোষণা


উল্লিখিত বিষয়সমূহ পর্যালোচনার পর নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের মধ্যে যুদ্ধ প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন। মক্কাবাসী এবং আরবের বিভিন্ন গোত্রকেও যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। অন্য সময়ে নবী শ্রেষ্ঠ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধের ক্ষেত্রে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতেন গন্তব্যের কথা গোপন রাখতেন। কিন্তু এবার তা করলেন না। প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন যে, রোমকদের সাথে যুদ্ধ হবে।
মুসলমানরা যেন যুদ্ধের জন্যে ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারেন এ জন্যেই প্রকাশ্যে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো। যুদ্ধের জন্যে মুসলমানদের প্রস্তুতিতে উদ্বুদ্ধ করতে সূরা তাওবার একাংশও নাযিল হয়েছিলো। সাথে সাথে তিনি সদকা খয়রাত করার ফযিলত বর্ণনা করেন এবং আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ব্যয়ে মুসলমানদের অনুপ্রাণিত করেন।
যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্যে মুসলমানদের প্রচেষ্টা সাহাবায়ে কেরাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পাওয়ার পরই যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি শুরু করেন। মদীনার চারিদিক থেকে আগ্রহী মুসলমানরা আসতে থাকেন। যাদের মনে মোনাফেকী অর্থাৎ নেফাকের অসুখ রয়েছে, তারা ছাড়া কেউ এ যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার কথা ভাবতেই পারেননি। তবে তিন শ্রেণীর মুসলমান ছিলেন পৃথক। তাদের ঈমান ও আমলে কোন প্রকার ত্রুটি ছিলো না। গরীব ক্ষুধাতুর মুসলমানরা আসছিলেন এবং যানবাহনের ব্যবস্থা করার আবেদন জানাচ্ছিলেন কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অক্ষমতা প্রকাশ করছিলেন। সূরা তাওবায় এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'ওদের কোন অপরাধ নেই, যারা তোমার কাছে বাহনের জন্যে এলে তুমি বলেছিলে, 'তোমাদের জন্যে কোন বাহন আমি পাচ্ছি না। ওরা অর্থ ব্যয়ে অসামর্থতাজনিত দুঃখে অশ্রু বিগলিত চোখে ফিরে গেলো।'
মুসলমানরা সদকা-খয়রাতের দিক থেকে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। হযরত ওসমান (রা.) সিরিয়ায় ব্যবসার জন্যে প্রেরণের উদ্দেশ্যে একটি কাফেলা তৈরী করেছিলেন। এতে সুসজ্জিত দুইশত উট ছিলো। দুশো উকিয়া অর্থাৎ প্রায় সাড়ে উনত্রিশ কিলো রৌপ্য ছিলো। তিনি এইসবই সদকা করে দিলেন। এরপর পুনরায় একশত উট সুসজ্জিত অবস্থায় দান করলেন। তিনি এক হাজার দীনার অর্থাৎ প্রায় ৫ কিলো সোনা নিয়ে এলেন এবং তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে রাখলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেসব উল্টেপাল্টে দেখছিলেন আর বলছিলেন, আজকের পর থেকে ওসমান যা কিছুই করুক না কেন, তার কোন ক্ষতি হবে না। এরপরও হযরত ওসমান (রা.) সদকা করেন। সব মিলিয়ে দেখা গেলো যে, তাঁর সদকার পরিমাণ নগদ অর্থ ছাড়াও ছিলো নয়শত উট এবং একশত ঘোড়া।
এদিকে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) দু'শো উকিয়া অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ কিলো চাঁদি নিয়ে আসেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁর ঘরের সবকিছু নিয়ে আসেন এবং ঘরে শুধু আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূলকে রেখে আসেন। তাঁর সদকার পরিমাণ ছিলো চার হাজার দিরহাম। তিনিই প্রথমে তার সদকা নিয়ে হাযির হয়েছিলেন। হযরত ওমর (রা.) তার অর্ধেক ধন-সম্পদ নিয়ে হাযির হন। হযরত আব্বাস (রা.) তাঁর বহু ধন-সম্পদ নিয়ে আসেন। হযরত তালহা হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা এবং মোহাম্মদ ইবনে মোসলমাও অনেক ধন-সম্পদ নিয়ে হাযির হন। হযরত আসেম ইবনে আদী নব্বই ওয়াসক অর্থাৎ সাড়ে ১৩ হাজার কিলো বা সোয়া তের টন খেজুর নিয়ে আসেন। অন্যান্য সাহাবারাও সাধ্যমত সদকা নিয়ে আসেন। কেউ এক মুঠো কেউ দুই মুঠোও দেন, তাদের এর বেশী দেয়ার সামর্থ ছিলো না।
মহিলারা তাদের হার, বাজুবন্দ, ঝুমকা, পা-জেব, বালি, আংটি ইত্যাদি সাধ্যমাফিক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে প্রেরণ করেন। কেউ বিরত থাকেননি, কেউ পিছিয়ে থাকেননি। কৃপণতার চিন্তা কারো মনে আসেনি। বেশী বেশী যারা সদকা দিচ্ছিলেন, মোনাফেকরা তাদের খোঁটা দিচ্ছিলো যে, ওরা অহংকারী। যারা সামান্য কিছু দান করছিলেন, তাদের নিয়ে উপহাস করছিলো যে, ওরা একটি দু'টি খেজুর দিয়ে কায়সারের দেশ জয় করতে চলেছে। কোরআনের সূরা তাওবায় এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'মোমেনদের মধ্যে যারা স্বতস্ফূর্তভাবে সদকা দেয় এবং যারা নিজ শ্রম ব্যতীত কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ ও বিদ্রূপ করে, আল্লাহ তায়ালা তাদের বিদ্রূপ করেন, ওদের জন্যে আছে মর্মন্তুদ শাস্তি।'

টিকাঃ
৫. জামে তিরিমিয, মানাকেবে ওসমান ইবনে আফফান, ২য় খন্ড, পৃ. ২১১

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্যে মুসলমানদের প্রচেষ্টা

📄 যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্যে মুসলমানদের প্রচেষ্টা


সাহাবায়ে কেরাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পাওয়ার পরই যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি শুরু করেন। মদীনার চারিদিক থেকে আগ্রহী মুসলমানরা আসতে থাকেন। যাদের মনে মোনাফেকী অর্থাৎ নেফাকের অসুখ রয়েছে, তারা ছাড়া কেউ এ যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার কথা ভাবতেই পারেননি। তবে তিন শ্রেণীর মুসলমান ছিলেন পৃথক। তাদের ঈমান ও আমলে কোন প্রকার ত্রুটি ছিলো না। গরীব ক্ষুধাতুর মুসলমানরা আসছিলেন এবং যানবাহনের ব্যবস্থা করার আবেদন জানাচ্ছিলেন কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অক্ষমতা প্রকাশ করছিলেন। সূরা তাওবায় এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'ওদের কোন অপরাধ নেই, যারা তোমার কাছে বাহনের জন্যে এলে তুমি বলেছিলে, 'তোমাদের জন্যে কোন বাহন আমি পাচ্ছি না। ওরা অর্থ ব্যয়ে অসামর্থতাজনিত দুঃখে অশ্রু বিগলিত চোখে ফিরে গেলো।'
মুসলমানরা সদকা-খয়রাতের দিক থেকে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। হযরত ওসমান (রা.) সিরিয়ায় ব্যবসার জন্যে প্রেরণের উদ্দেশ্যে একটি কাফেলা তৈরী করেছিলেন। এতে সুসজ্জিত দুইশত উট ছিলো। দুশো উকিয়া অর্থাৎ প্রায় সাড়ে উনত্রিশ কিলো রৌপ্য ছিলো। তিনি এইসবই সদকা করে দিলেন। এরপর পুনরায় একশত উট সুসজ্জিত অবস্থায় দান করলেন। তিনি এক হাজার দীনার অর্থাৎ প্রায় ৫ কিলো সোনা নিয়ে এলেন এবং তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে রাখলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেসব উল্টেপাল্টে দেখছিলেন আর বলছিলেন, আজকের পর থেকে ওসমান যা কিছুই করুক না কেন, তার কোন ক্ষতি হবে না। এরপরও হযরত ওসমান (রা.) সদকা করেন। সব মিলিয়ে দেখা গেলো যে, তাঁর সদকার পরিমাণ নগদ অর্থ ছাড়াও ছিলো নয়শত উট এবং একশত ঘোড়া।
এদিকে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) দু'শো উকিয়া অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ কিলো চাঁদি নিয়ে আসেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁর ঘরের সবকিছু নিয়ে আসেন এবং ঘরে শুধু আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূলকে রেখে আসেন। তাঁর সদকার পরিমাণ ছিলো চার হাজার দিরহাম। তিনিই প্রথমে তার সদকা নিয়ে হাযির হয়েছিলেন। হযরত ওমর (রা.) তার অর্ধেক ধন-সম্পদ নিয়ে হাযির হন। হযরত আব্বাস (রা.) তাঁর বহু ধন-সম্পদ নিয়ে আসেন। হযরত তালহা হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা এবং মোহাম্মদ ইবনে মোসলমাও অনেক ধন-সম্পদ নিয়ে হাযির হন। হযরত আসেম ইবনে আদী নব্বই ওয়াসক অর্থাৎ সাড়ে ১৩ হাজার কিলো বা সোয়া তের টন খেজুর নিয়ে আসেন। অন্যান্য সাহাবারাও সাধ্যমত সদকা নিয়ে আসেন। কেউ এক মুঠো কেউ দুই মুঠোও দেন, তাদের এর বেশী দেয়ার সামর্থ ছিলো না।
মহিলারা তাদের হার, বাজুবন্দ, ঝুমকা, পা-জেব, বালি, আংটি ইত্যাদি সাধ্যমাফিক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে প্রেরণ করেন। কেউ বিরত থাকেননি, কেউ পিছিয়ে থাকেননি। কৃপণতার চিন্তা কারো মনে আসেনি। বেশী বেশী যারা সদকা দিচ্ছিলেন, মোনাফেকরা তাদের খোঁটা দিচ্ছিলো যে, ওরা অহংকারী। যারা সামান্য কিছু দান করছিলেন, তাদের নিয়ে উপহাস করছিলো যে, ওরা একটি দু'টি খেজুর দিয়ে কায়সারের দেশ জয় করতে চলেছে। কোরআনের সূরা তাওবায় এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'মোমেনদের মধ্যে যারা স্বতস্ফূর্তভাবে সদকা দেয় এবং যারা নিজ শ্রম ব্যতীত কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ ও বিদ্রূপ করে, আল্লাহ তায়ালা তাদের বিদ্রূপ করেন, ওদের জন্যে আছে মর্মন্তুদ শাস্তি।'
তবুকের পথে মুসলিম সেনাদল বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে ইসলামী বাহিনী প্রস্তুত হলো। প্রিয় নবী এরপর মোহাম্মদ ইবনে মোসলমা মতান্তরে ছাবা ইবনে আরফাতাকে মদীনার গবর্নর নিযুক্ত করেন এবং পরিবার পরিজনের তত্ত্বাবধানের জন্যে হযরত আলীকে (রা.) মদীনায় অবস্থানের নির্দেশ দেন। কিন্তু মোনাফেকরা সমালোচনা করে। এর ফলে হযরত আলী (রা.) মদীনা থেকে বেরিয়ে পড়েন এবং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মিলিত হন। নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে পুনরায় মদীনায় ফেরত পাঠান তিনি বলেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমার সাথে আমার সম্পর্ক মূসা এবং হারুনের সম্পর্কের মতো। অবশ্য, আমার পরে কোন নবী আসবে না।
আল আমিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ব্যবস্থাপনার পর উত্তরদিকে রওয়ানা হন। নার্সাঈ-এর বর্ণনা অনুযায়ী সেদিন ছিলো শনিবার। গন্তব্য ছিলো তবুক। মুসলিম সৈন্যদের সংখ্যা ছিলো ত্রিশ হাজার। ইতিপূর্বে এতো বড় সেনাদল তৈরী হয়নি। এতো বড় সৈন্যদলের জন্যে মুসলমানদের সর্বাত্মক চেষ্টা সত্তেও পুরো সাজ-সজ্জা সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। যানবাহন এবং পাথেয় ছিলো অপ্রতুল। প্রতি আঠার জন সৈন্যের জন্যে ছিলো একটি উট, সেই উটে উক্ত আঠারো জন পর্যায়ক্রমে সওয়ার হতেন। খাদ্য সামগ্রীর অপ্রতুলতার কারণে অনেক সময় গাছের পাতা খেতে হচ্ছিলো এবং উটের সংখ্যা কম হওয়া সত্তেও ক্ষুধার প্রয়োজনে উট যবাই করতে হচ্ছিলো। এ সব কারণে এ বাহিনীর নাম হয়েছিলো 'জায়শে উছরত' অর্থাৎ অভাব অনটনের বাহিনী।
তবুক যাওয়ার পথে ইসলামী বাহিনী 'হেজ' অর্থাৎ সামুদ জাতির অবস্থান এলাকাটিয়ে যাচ্ছিলেন। সামুদ জাতি 'ওয়াদিউল কোরার' ভেতরে পাথর খুঁড়ে বাড়ী তৈরী করেছিলো। সাহাবায়ে কেরাম সেখানে কূপ থেকে পানি উত্তোলন করেন। পানি তুলে রওয়ানা হওয়ার সময় নবী আল আমিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা এ জায়গার পানি পান করো না এবং সে পানি ওযুর জন্যেও ব্যবহার করো না। এখানে পানি দিয়ে যে আটা মাখিয়েছো সেসব পশুদের খেতে দাও, নিজেরা খেয়ো না। তোমরা সেই কূপ থেকে পানি নাও, যে কূপে হয়ত সালেহ (আ.)-এর উটনী পান করতো।'
বোখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী আল আমিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেজর অর্থাৎ দিয়ারে সামুদ অতিক্রমের সময় বললেন, সে যালিমদের অবস্থান স্থলে প্রবেশ করো না, তাদের ওপর যে বিপদ এসেছিলো সে বিপদ তোমাদের ওপর যেন না আসে। তবে হাঁ, কাঁদতে কাঁদতে প্রবেশ করতে পারো। এরপর তিনি নিজের মাথা আবৃত করে দ্রুত সেই স্থান অতিক্রম করে গেলেন।
পথে পানির ভীষণ সমস্যা দেখা দিল। শেষ পর্যন্ত সাহাবারা নবী আল আমিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আবেদন জানালেন। তিনি দোয়া করলেন। আল্লাহ তায়ালা মেঘ পাঠিয়ে দিলেন। প্রচুর বৃষ্টি হলো। সাহাবারা তৃপ্তির সাথে পানি পান করলেন এবং প্রয়োজনীয় পানি সংরক্ষণও করলেন।
তবুকের কাছাকাছি পৌছার পর নবী আল আমিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইনশাআল্লাহ আগামীকাল তোমরা তবুকের জলাশয়ের কাছে পৌঁছে যাবে। তবে চাশত-এর সময়ের আগে পৌঁছুতে পারবে না। যারা আগে পৌছুবে তারা যেন আমি না যাওয়া পর্যন্ত ওখানের পানিতে হাত না দেয়।
হযরত মায়া'য (রা.) বলেন, তবুকে আমরা পৌঁছে দেখি আমাদের দু'জন সঙ্গী আগেই সেখানে পৌঁছেছেন। ঝর্ণা থেকে অল্প অল্প পানি উঠছিলো। নবী আল আমিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এখানের পানিতে হাত লাগিয়েছো? তারা বললো, হাঁ। নবী একথা শুনে আল্লাহ তায়ালা যা চেয়েছিলেন তাই বললেন। এরপর ঝর্ণা থেকে আজলার সামান্য পানি নিলেন। ধীরগতিতে আসা পানি হাতের তালুতে জমা হওয়ার পর তিনি সে পানি দিয়ে হাতমুখ ধুলেন তারপর সেই পানিও ঝর্ণায় ফেলে দিলেন। এরপর ঝর্ণায় প্রচুর পানি উঠতে লাগলো। সাহাবারা তৃপ্তির সাথে সে পানি পান করলেন। এরপর নবী আমাকে বললেন, হে মায়া'য, যদি তুমি দীর্ঘজীবী হও, তবে দেখতে পাবে যে, এখানে বাগান সজীব হয়ে উঠেছে।
তবুক যাওয়ার পথে, মতান্তরে তবুক পৌছার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আজ রাতে প্রচন্ড ঝড় হবে, তোমরা কেউ উঠে দাঁড়াবে না। যাদের কাছে উট থাকবে, তারা উটের রশি শক্ত করে ধরে রাখবে। রাতে প্রচন্ড ঝড় হলো। একজন সাহাবী উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, ঝড়ের তান্ডব তাকে উড়িয়ে নিয়ে দুই পাহাড়ের মাঝখানে ফেলে দিয়েছিলো।
এই সফরের সময় নবী যোহর ও আছরের নামায একত্রে এবং মাগরেবের ও এশার নামায একত্রে আদায় করতেন। জমে তাকদিম জমে তাখির দু'টোই করেছিলেন। জমে তাকদিম অর্থাৎ কখনো যোহর ও আছরের নামায যোহরের সময়েই আদায় করতেন এবং মাগরেব এশার নামায মাগরেবের সময়েই আদায় করতেন। জমে তাখির অর্থ কখনো যোহর ও আছরের নামায আছরের সময় আদায় করতেন। কখনো মাগরেব ও এশার নামায এশার সময়ে আদায় করতেন।

টিকাঃ
৫. জামে তিরিমিয, মানাকেবে ওসমান ইবনে আফফান, ২য় খন্ড, পৃ. ২১১
৬. সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড, পৃ. ৬৩৭
৭. মুসলিম শরীফ, ২য় খন্ড, পৃ. ২৪৬
১.ঐ

সাহাবায়ে কেরাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পাওয়ার পরই যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি শুরু করেন। মদীনার চারিদিক থেকে আগ্রহী মুসলমানরা আসতে থাকেন। যাদের মনে মোনাফেকী অর্থাৎ নেফাকের অসুখ রয়েছে, তারা ছাড়া কেউ এ যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার কথা ভাবতেই পারেননি। তবে তিন শ্রেণীর মুসলমান ছিলেন পৃথক। তাদের ঈমান ও আমলে কোন প্রকার ত্রুটি ছিলো না। গরীব ক্ষুধাতুর মুসলমানরা আসছিলেন এবং যানবাহনের ব্যবস্থা করার আবেদন জানাচ্ছিলেন কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অক্ষমতা প্রকাশ করছিলেন। সূরা তাওবায় এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'ওদের কোন অপরাধ নেই, যারা তোমার কাছে বাহনের জন্যে এলে তুমি বলেছিলে, 'তোমাদের জন্যে কোন বাহন আমি পাচ্ছি না। ওরা অর্থ ব্যয়ে অসামর্থতাজনিত দুঃখে অশ্রু বিগলিত চোখে ফিরে গেলো।'
মুসলমানরা সদকা-খয়রাতের দিক থেকে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। হযরত ওসমান (রা.) সিরিয়ায় ব্যবসার জন্যে প্রেরণের উদ্দেশ্যে একটি কাফেলা তৈরী করেছিলেন। এতে সুসজ্জিত দুইশত উট ছিলো। দুশো উকিয়া অর্থাৎ প্রায় সাড়ে উনত্রিশ কিলো রৌপ্য ছিলো। তিনি এইসবই সদকা করে দিলেন। এরপর পুনরায় একশত উট সুসজ্জিত অবস্থায় দান করলেন। তিনি এক হাজার দীনার অর্থাৎ প্রায় ৫ কিলো সোনা নিয়ে এলেন এবং তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে রাখলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেসব উল্টেপাল্টে দেখছিলেন আর বলছিলেন, আজকের পর থেকে ওসমান যা কিছুই করুক না কেন, তার কোন ক্ষতি হবে না। এরপরও হযরত ওসমান (রা.) সদকা করেন। সব মিলিয়ে দেখা গেলো যে, তাঁর সদকার পরিমাণ নগদ অর্থ ছাড়াও ছিলো নয়শত উট এবং একশত ঘোড়া।
এদিকে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) দু'শো উকিয়া অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ কিলো চাঁদি নিয়ে আসেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁর ঘরের সবকিছু নিয়ে আসেন এবং ঘরে শুধু আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূলকে রেখে আসেন। তাঁর সদকার পরিমাণ ছিলো চার হাজার দিরহাম। তিনিই প্রথমে তার সদকা নিয়ে হাযির হয়েছিলেন। হযরত ওমর (রা.) তার অর্ধেক ধন-সম্পদ নিয়ে হাযির হন। হযরত আব্বাস (রা.) তাঁর বহু ধন-সম্পদ নিয়ে আসেন। হযরত তালহা হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা এবং মোহাম্মদ ইবনে মোসলমাও অনেক ধন-সম্পদ নিয়ে হাযির হন। হযরত আসেম ইবনে আদী নব্বই ওয়াসক অর্থাৎ সাড়ে ১৩ হাজার কিলো বা সোয়া তের টন খেজুর নিয়ে আসেন। অন্যান্য সাহাবারাও সাধ্যমত সদকা নিয়ে আসেন। কেউ এক মুঠো কেউ দুই মুঠোও দেন, তাদের এর বেশী দেয়ার সামর্থ ছিলো না।
মহিলারা তাদের হার, বাজুবন্দ, ঝুমকা, পা-জেব, বালি, আংটি ইত্যাদি সাধ্যমাফিক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে প্রেরণ করেন। কেউ বিরত থাকেননি, কেউ পিছিয়ে থাকেননি। কৃপণতার চিন্তা কারো মনে আসেনি। বেশী বেশী যারা সদকা দিচ্ছিলেন, মোনাফেকরা তাদের খোঁটা দিচ্ছিলো যে, ওরা অহংকারী। যারা সামান্য কিছু দান করছিলেন, তাদের নিয়ে উপহাস করছিলো যে, ওরা একটি দু'টি খেজুর দিয়ে কায়সারের দেশ জয় করতে চলেছে। কোরআনের সূরা তাওবায় এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'মোমেনদের মধ্যে যারা স্বতস্ফূর্তভাবে সদকা দেয় এবং যারা নিজ শ্রম ব্যতীত কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ ও বিদ্রূপ করে, আল্লাহ তায়ালা তাদের বিদ্রূপ করেন, ওদের জন্যে আছে মর্মন্তুদ শাস্তি।'
তবুকের পথে মুসলিম সেনাদল বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে ইসলামী বাহিনী প্রস্তুত হলো। প্রিয় নবী এরপর মোহাম্মদ ইবনে মোসলমা মতান্তরে ছাবা ইবনে আরফাতাকে মদীনার গবর্নর নিযুক্ত করেন এবং পরিবার পরিজনের তত্ত্বাবধানের জন্যে হযরত আলীকে (রা.) মদীনায় অবস্থানের নির্দেশ দেন। কিন্তু মোনাফেকরা সমালোচনা করে। এর ফলে হযরত আলী (রা.) মদীনা থেকে বেরিয়ে পড়েন এবং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মিলিত হন। নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে পুনরায় মদীনায় ফেরত পাঠান তিনি বলেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমার সাথে আমার সম্পর্ক মূসা এবং হারুনের সম্পর্কের মতো। অবশ্য, আমার পরে কোন নবী আসবে না।
আল আমিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ব্যবস্থাপনার পর উত্তরদিকে রওয়ানা হন। নার্সাঈ-এর বর্ণনা অনুযায়ী সেদিন ছিলো শনিবার। গন্তব্য ছিলো তবুক। মুসলিম সৈন্যদের সংখ্যা ছিলো ত্রিশ হাজার। ইতিপূর্বে এতো বড় সেনাদল তৈরী হয়নি। এতো বড় সৈন্যদলের জন্যে মুসলমানদের সর্বাত্মক চেষ্টা সত্তেও পুরো সাজ-সজ্জা সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। যানবাহন এবং পাথেয় ছিলো অপ্রতুল। প্রতি আঠার জন সৈন্যের জন্যে ছিলো একটি উট, সেই উটে উক্ত আঠারো জন পর্যায়ক্রমে সওয়ার হতেন। খাদ্য সামগ্রীর অপ্রতুলতার কারণে অনেক সময় গাছের পাতা খেতে হচ্ছিলো এবং উটের সংখ্যা কম হওয়া সত্তেও ক্ষুধার প্রয়োজনে উট যবাই করতে হচ্ছিলো। এ সব কারণে এ বাহিনীর নাম হয়েছিলো 'জায়শে উছরত' অর্থাৎ অভাব অনটনের বাহিনী।
তবুক যাওয়ার পথে ইসলামী বাহিনী 'হেজ' অর্থাৎ সামুদ জাতির অবস্থান এলাকাটিয়ে যাচ্ছিলেন। সামুদ জাতি 'ওয়াদিউল কোরার' ভেতরে পাথর খুঁড়ে বাড়ী তৈরী করেছিলো। সাহাবায়ে কেরাম সেখানে কূপ থেকে পানি উত্তোলন করেন। পানি তুলে রওয়ানা হওয়ার সময় নবী আল আমিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা এ জায়গার পানি পান করো না এবং সে পানি ওযুর জন্যেও ব্যবহার করো না। এখানে পানি দিয়ে যে আটা মাখিয়েছো সেসব পশুদের খেতে দাও, নিজেরা খেয়ো না। তোমরা সেই কূপ থেকে পানি নাও, যে কূপে হয়ত সালেহ (আ.)-এর উটনী পান করতো।'
বোখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী আল আমিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেজর অর্থাৎ দিয়ারে সামুদ অতিক্রমের সময় বললেন, সে যালিমদের অবস্থান স্থলে প্রবেশ করো না, তাদের ওপর যে বিপদ এসেছিলো সে বিপদ তোমাদের ওপর যেন না আসে। তবে হাঁ, কাঁদতে কাঁদতে প্রবেশ করতে পারো। এরপর তিনি নিজের মাথা আবৃত করে দ্রুত সেই স্থান অতিক্রম করে গেলেন।
পথে পানির ভীষণ সমস্যা দেখা দিল। শেষ পর্যন্ত সাহাবারা নবী আল আমিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আবেদন জানালেন। তিনি দোয়া করলেন। আল্লাহ তায়ালা মেঘ পাঠিয়ে দিলেন। প্রচুর বৃষ্টি হলো। সাহাবারা তৃপ্তির সাথে পানি পান করলেন এবং প্রয়োজনীয় পানি সংরক্ষণও করলেন।
তবুকের কাছাকাছি পৌছার পর নবী আল আমিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইনশাআল্লাহ আগামীকাল তোমরা তবুকের জলাশয়ের কাছে পৌঁছে যাবে। তবে চাশত-এর সময়ের আগে পৌঁছুতে পারবে না। যারা আগে পৌছুবে তারা যেন আমি না যাওয়া পর্যন্ত ওখানের পানিতে হাত না দেয়।
হযরত মায়া'য (রা.) বলেন, তবুকে আমরা পৌঁছে দেখি আমাদের দু'জন সঙ্গী আগেই সেখানে পৌঁছেছেন। ঝর্ণা থেকে অল্প অল্প পানি উঠছিলো। নবী আল আমিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এখানের পানিতে হাত লাগিয়েছো? তারা বললো, হাঁ। নবী একথা শুনে আল্লাহ তায়ালা যা চেয়েছিলেন তাই বললেন। এরপর ঝর্ণা থেকে আজলার সামান্য পানি নিলেন। ধীরগতিতে আসা পানি হাতের তালুতে জমা হওয়ার পর তিনি সে পানি দিয়ে হাতমুখ ধুলেন তারপর সেই পানিও ঝর্ণায় ফেলে দিলেন। এরপর ঝর্ণায় প্রচুর পানি উঠতে লাগলো। সাহাবারা তৃপ্তির সাথে সে পানি পান করলেন। এরপর নবী আমাকে বললেন, হে মায়া'য, যদি তুমি দীর্ঘজীবী হও, তবে দেখতে পাবে যে, এখানে বাগান সজীব হয়ে উঠেছে।
তবুক যাওয়ার পথে, মতান্তরে তবুক পৌছার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আজ রাতে প্রচন্ড ঝড় হবে, তোমরা কেউ উঠে দাঁড়াবে না। যাদের কাছে উট থাকবে, তারা উটের রশি শক্ত করে ধরে রাখবে। রাতে প্রচন্ড ঝড় হলো। একজন সাহাবী উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, ঝড়ের তান্ডব তাকে উড়িয়ে নিয়ে দুই পাহাড়ের মাঝখানে ফেলে দিয়েছিলো।
এই সফরের সময় নবী যোহর ও আছরের নামায একত্রে এবং মাগরেবের ও এশার নামায একত্রে আদায় করতেন। জমে তাকদিম জমে তাখির দু'টোই করেছিলেন। জমে তাকদিম অর্থাৎ কখনো যোহর ও আছরের নামায যোহরের সময়েই আদায় করতেন এবং মাগরেব এশার নামায মাগরেবের সময়েই আদায় করতেন। জমে তাখির অর্থ কখনো যোহর ও আছরের নামায আছরের সময় আদায় করতেন। কখনো মাগরেব ও এশার নামায এশার সময়ে আদায় করতেন।

টিকাঃ
৫. জামে তিরিমিয, মানাকেবে ওসমান ইবনে আফফান, ২য় খন্ড, পৃ. ২১১
৬. সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড, পৃ. ৬৩৭
৭. মুসলিম শরীফ, ২য় খন্ড, পৃ. ২৪৬
১.ঐ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00