📄 যুদ্ধের কারণ এবং রোম ও গাসসানের প্রস্তুতির সাধারণ খবর
ওই সময়ে এমন একটি শক্তি মদীনার প্রতি দৃষ্টি দিয়েছিলো, যারা কোন প্রকার উস্কানি ছাড়াই মুসলমানদের গায়ে পড়ে বিবাদ বাধাতে চাচ্ছিলো। এরা ছিলো রোমক শক্তি। সমকালীন বিশ্বে এরা ছিলো সর্ববৃহৎ ও শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি। ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ বিবাদের ভূমিকা তৈরী হয়েছিলো শেরহাবিল ইবনে আমর গাস্সানির হাতে। এই ব্যক্তি নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দূত হারেস ইবনে ওমায়ের আযদিকে হত্যা করেছিলো। বসরার গবর্নরের কাছে সে দূত পাঠানো হয়েছিলো। এরপর হযরত যায়েদ ইবনে হারেসার নেতৃত্বে নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি সৈন্যদল প্রেরণ করেন। ফলে রোমক ভূমিতে মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিন্তু মুসলিম বাহিনী শত্রুদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম হয়নি। তবুও এ অভিযান কাছে ও দূরবর্তী আরব অধিবাসীদের মনে সুদূর প্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিলো।
কায়সারে রোম এ সকল প্রভাব প্রতিক্রিয়া এবং এর পরিণাম উপেক্ষা করতে পারেনি। মুসলিম অভিযানের ফলে আরবের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে স্বাধীনতা চেতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো। এটা ছিলো তার জন্যে একটা বিপজ্জনক অবস্থা। অথচ জনগণের স্বাধীনতার চেতনা সীমান্তবর্তী এলাকায় রোমকদের জন্যে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। বিশেষ করে সিরিয়ার সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এ কারণে কায়সারে রোম ভাবলো যে, মুসলমানদের শক্তি বিপজ্জনক হয়ে ওঠার আগেই এদের দমন ও নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। এতে করে রোমের সাথে সংশ্লিষ্ট আরব এলাকাসমূহে ফেতনা এবং হাঙ্গামা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পাবে না।
এসব কারণে মৃতার যুদ্ধের পর এক বছর যেতে না যেতেই কায়সারে রোম, রোমের অধিবাসী এবং রোমের অধীনস্থ আরব এলাকাসমূহ থেকে সৈন্য সমাবেশ শুরু করলেন। এটা ছিলো মুসলমানদের সাথে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পূর্ব প্রস্তুতি।
রোম ও গাসসানের প্রস্তুতির সাধারণ খবর
এদিকে মদীনায় পর্যায়ক্রমে খবর আসছিলো যে, রোমে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। এ খবর পেয়ে মুসলমানরা অস্বস্তি এবং উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। হঠাৎ কোন শব্দ শুনলেই তারা চমকে উঠতেন। তারা ভাবতেন, রোমকরা বুঝি এসে পড়েছে। নবম হিজরীতে একটি ঘটনা ঘটলো। এ ঘটনা থেকেই মুসলমানদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার পরিচয় পাওয়া যায়। এ সময়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের সাথে ঈলা¹ করে তাঁদের ছেড়ে একটি পৃথক ঘরে উঠেছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম প্রথম দিকে কিছু বুঝে উঠতে পারেননি। তারা ভেবেছিলেন, নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন। এতে সাহাবাদের মধ্যে গভীর চিন্তা ও মনোবেদনা ছড়িয়ে পড়েছিলো। হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এ ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আমার একজন আনসার সঙ্গী ছিলো। নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে আমি অনুপস্থিত থাকলে তিনি আমার কাছে খবর নিয়ে আসতেন, যখন তিনি অনুপস্থিত থাকতেন, তখন আমি তার কাছে খবর নিয়ে আসতাম। এরা দু'জন মদীনার উপকন্ঠে বসবাস করতেন। একজন অন্যজনের প্রতিবেশী ছিলেন। পর্যায়ক্রমে নবী (আ.)-এর খেদমতে হাযির হতেন। হযরত ওমর বলেন, সেই সময়ে গাস্সান অধিপতির ব্যাপারে আমরা আশঙ্কা করছিলাম। আমাদের বলা হয়েছিলো যে, গাস্সান রাজ আমাদের ওপর হামলা করতে পারেন। এ কারণে সব সময় উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাতাম। আমার আনসার সাথী একদিন হঠাৎ এসে দরজায় করাঘাত করে বললেন, খোলো খোলো। আমি বললাম, গাস্সানী কি এসে পড়েছে? তিনি বললেন, না, বরং তার চেয়ে বড় ঘটনা ঘটেছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের থেকে আলাদা হয়ে গেছেন।²
অপর এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত ওমর (রা.) বলেন, আমাদের মধ্যে এ মর্মে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, গাস্সান সম্রাট আমাদের ওপর হামলা করতে ঘোড়া প্রস্তুত করছেন। আমার সাথী নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে একদিন এসে দরজায় জোরে জোরে আঘাত করতে লাগলেন। তিনি বাইরে থেকে বললেন, ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি? আমি উৎকণ্ঠিতভাবে বাইরে এলাম। তিনি বললেন, বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। আমি বললাম, কি হয়েছে? গাস্সানি কি এসে পড়েছে? তিনি বললেন, না এর চেড়ে বড় ঘটনা ঘটেছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন।³
এ ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, সে সময় মুসলমানদের ওপর রোমকদের হামলার হুমকি ছিলো কতো মারাত্মক। নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় পৌছার পর মোনাফেকরা রোমকদের যুদ্ধ প্রস্তুতির অতিরঞ্জিত খবর মুসলমানদের মধ্যে প্রচার করছিলো। কিন্তু মোনাফেকরা লক্ষ্য করছিলো যে, সব ক্ষেত্রেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সফল হচ্ছেন এবং তিনি বিশ্বের কোন শক্তিকেই ভয় পান না। তাঁর সামনে যে কোন বাধা এলেই তা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। এসব সত্তেও মোনাফেকরা মনে মনে আশা করছিলো যে, মুসলমানরা এবার আর রক্ষা পাবে না, তারা নাকানি চুবানি খাবেই। সেই প্রত্যাশিত তামাশা দেখার দিন আর বেশী দূরে নয়। এরূপ চিন্তা-ভাবনার প্রেক্ষিতে তারা একটি মসজিদ তৈরী করলো, যা 'মসজিদে দেরার' নামে পরিচিত। উক্ত মসজিদে মোনাফেকরা বসে আড্ডা দিত এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে নানা প্রকার ষড়যন্ত্র করতো। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, মুসলিম উম্মার ঐক্যে ফাটল ধরানো এবং শত্রুদের সাহায্য করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার লক্ষ্যেই এটি তৈরী করা হয়েছিলো। অসৎ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত সেই মসজিদে তারা শুধু ইসলাম বিরোধী কাজে লিপ্ত থেকেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং সে মসজিদে নামায আদায়ের জন্যে নবী শ্রেষ্ঠকেও আবেদন জানিয়েছিলো। এর মাধ্যমে মোনাফেকরা সরল প্রাণ মুসলমানদের ধোঁকা দিতে চাচ্ছিল। নবী শ্রেষ্ঠ যদি একবার নামায আদায় করেন, তাহলে সাধারণ মুসলমানরা মোনাফেকদের প্রতিষ্ঠিত সেই মসজিদের ঘৃণ্য উদ্দেশ্য বুঝতে পারবে না। তাঁরা ধারণাও করতে পারবেন না যে, মসজিদ নামের এ ঘরে বসে তাদের বিরুদ্ধে কিরূপ ভয়ানক ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করা হচ্ছে। তাছাড়া এ মসজিদে কারা যাতায়াত করছে মুসলমানরা সেদিকেও লক্ষ্য রাখবে না। এ মসজিদ এমনি করে মোনাফেক এবং তাদের বাইরের মিত্রদের ষড়যন্ত্রের একটা আখড়ায় পরিণত হবে। কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই মসজিদে সাথে সাথে নামায আদায় করতে রাজি হলেন না। তিনি বললেন, ইনশাআল্লাহ যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে সেই মসজিদে নামায আদায় করবো। সে সময়ে তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু মোনাফেকরা তাদের উদ্দেশ্য সফল করতে পারেনি। আল্লাহ তায়ালা তাদের ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে নবী শ্রেষ্ঠ সেই মসজিদে নামায আদায়ের পরিবর্তে সেটি ধ্বংস করে দেন।
টিকাঃ
১. নারীর কাছে না যাওয়ার কসম করা। এই কসম চার মাস বা তার চেয়ে কম মেয়াদের জন্য হলে শরীয়ত অনুযায়ী এর জন্য কোন বিধান প্রযোজ্য হবে না। আর যদি চার মাসের বেশী মেয়াদের জন্য কসম করা হলে চার মাস পুরো হওয়ার সাথে সাথে শরয়ী আদালতে বিষয়টি রুজু হবে এবং আদালত বলবে যে, আপনি হয় স্ত্রীকে স্ত্রীর মর্যাদা দিন অথবা তাকে তালাক দিন। অবশ্য কোন কোন সাহাবার মতে চার মাস কেটে যাওয়ার পর আপনা আপনি তালাক হয়ে যায়।
২. সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড, পৃ. ৭৩০
৩. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৩৩৪
📄 রোম ও গাসসানের প্রস্তুতির বিশেষ খবর
এ সময়ে সিরিয়া থেকে তেল আনতে যাওয়া নাবেতিদের⁴ কাছে হঠাৎ জানা গেলো যে, হিরাক্লিয়াস ৪০ হাজার দুর্ধর্ষ সৈন্যের এক বাহিনী তৈরী করেছেন এবং রোমের এক বিখ্যাত যোদ্ধা সেই বাহিনীর নেতৃত্ব করছেন। সেই কমান্ডার তার অধীনে খৃষ্টান গোত্র লাখাম জাযাম প্রভৃতিকে সমবেত করেছে এবং অগ্রবর্তী বাহিনী বালকা নামক জায়গায় পৌঁছে গেছে। এমনিভাবে এক গুরুতর সমস্যা মুসলমানদের সামনে দেখা দিলো।
পরিস্থিতির নাযুকতা
সেই সময় প্রচন্ড গরম পড়েছিলো। দেশে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা এবং দুর্ভিক্ষপ্রায় অবস্থা বিরাজ করছিলো। উট ঘোড়া প্রভৃতি যানবাহনের সংখ্যা ছিলো কম। গাছের ফল পেকে আসছিলো। এ কারণে অনেকেই ছায়ায় এবং ফলের কাছাকাছি থাকতে চাচ্ছিলো। তারা তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধে যেতে চাচ্ছিলেন না। তদুপরি পথের দূরত্ব ছিলো অনেক, পথ ছিলো দুর্গম ও বন্ধুর। সব কিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিলো বড়োই নাযুক।
তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত
আল্লাহর নবী এ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, এমনি সঙ্কট সময়ে যদি রোমকদের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে শৈথিল্য ও অলসতার পরিচয় দেয়া হয় তাহলে রোমকরা মুসলিম অধিকৃত ও অধ্যুষিত এলাকাসমূহে প্রবেশ করবে। ফলে ইসলামের দাওয়াত, প্রচার এবং প্রসারে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। মুসলমানরা সামরিক শক্তির স্বাতন্ত্র হারাবে। হোনায়েনের যুদ্ধে পর্যুদস্ত, বাতিল ও কুফুরী শক্তি পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠবে। বাইরের শক্তির সাথে গোপনে যোগাযোগ রক্ষাকারী মোনাফেকরা যারা সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করছিলো তারা মুসলমানদের পিঠে ছুরিকাঘাত করবে। পেছনে থাকবে শত্রুদল মোনাফেক আর সামনে থাকবে বিধর্মী রোমক সৈন্যদল। এতে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত শ্রম-সাধনা ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়ে পড়বে। নবী এবং সাহাবাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট বিফলে যাবে। অনেক কষ্টে অর্জিত সাফল্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। অথচ এই সাফল্যের পেছনে মুসলমানদের ত্যাগ তিতিক্ষার ইতিহাস বড়োই দীর্ঘ।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব সম্ভাবনা ভালোভাবে অনুধাবন করছিলেন। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, মুসলিম অধিকৃত ও অধ্যুষিত এলাকায় বিধর্মীদের প্রবেশের সুযোগ দেয়ার তো দূরে থাক বরং ওদের এলাকায় গিয়েই আঘাত করা হবে।
টিকাঃ
৪. এরা নাবেত ইবনে ইসমাইল (আঃ)-এর বংশধর। এক সময় এরা পাটরা এবং হেজাযের উত্তরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। কিন্তু কালক্রমে শক্তিহীন হয়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়।
📄 পরিস্থিতির নাযুকতা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত
সেই সময় প্রচন্ড গরম পড়েছিলো। দেশে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা এবং দুর্ভিক্ষপ্রায় অবস্থা বিরাজ করছিলো। উট ঘোড়া প্রভৃতি যানবাহনের সংখ্যা ছিলো কম। গাছের ফল পেকে আসছিলো। এ কারণে অনেকেই ছায়ায় এবং ফলের কাছাকাছি থাকতে চাচ্ছিলো। তারা তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধে যেতে চাচ্ছিলেন না। তদুপরি পথের দূরত্ব ছিলো অনেক, পথ ছিলো দুর্গম ও বন্ধুর। সব কিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিলো বড়োই নাযুক।
তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত আল্লাহর নবী এ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, এমনি সঙ্কট সময়ে যদি রোমকদের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে শৈথিল্য ও অলসতার পরিচয় দেয়া হয় তাহলে রোমকরা মুসলিম অধিকৃত ও অধ্যুষিত এলাকাসমূহে প্রবেশ করবে। ফলে ইসলামের দাওয়াত, প্রচার এবং প্রসারে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। মুসলমানরা সামরিক শক্তির স্বাতন্ত্র হারাবে। হোনায়েনের যুদ্ধে পর্যুদস্ত, বাতিল ও কুফুরী শক্তি পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠবে। বাইরের শক্তির সাথে গোপনে যোগাযোগ রক্ষাকারী মোনাফেকরা যারা সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করছিলো তারা মুসলমানদের পিঠে ছুরিকাঘাত করবে। পেছনে থাকবে শত্রুদল মোনাফেক আর সামনে থাকবে বিধর্মী রোমক সৈন্যদল। এতে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত শ্রম-সাধনা ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়ে পড়বে। নবী এবং সাহাবাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট বিফলে যাবে। অনেক কষ্টে অর্জিত সাফল্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। অথচ এই সাফল্যের পেছনে মুসলমানদের ত্যাগ তিতিক্ষার ইতিহাস বড়োই দীর্ঘ।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব সম্ভাবনা ভালোভাবে অনুধাবন করছিলেন। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, মুসলিম অধিকৃত ও অধ্যুষিত এলাকায় বিধর্মীদের প্রবেশের সুযোগ দেয়ার তো দূরে থাক বরং ওদের এলাকায় গিয়েই আঘাত করা হবে।
রোমকদের সাথে যুদ্ধ প্রস্তুতির ঘোষণা উল্লিখিত বিষয়সমূহ পর্যালোচনার পর নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের মধ্যে যুদ্ধ প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন। মক্কাবাসী এবং আরবের বিভিন্ন গোত্রকেও যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। অন্য সময়ে নবী শ্রেষ্ঠ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধের ক্ষেত্রে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতেন গন্তব্যের কথা গোপন রাখতেন। কিন্তু এবার তা করলেন না। প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন যে, রোমকদের সাথে যুদ্ধ হবে।
মুসলমানরা যেন যুদ্ধের জন্যে ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারেন এ জন্যেই প্রকাশ্যে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো। যুদ্ধের জন্যে মুসলমানদের প্রস্তুতিতে উদ্বুদ্ধ করতে সূরা তাওবার একাংশও নাযিল হয়েছিলো। সাথে সাথে তিনি সদকা খয়রাত করার ফযিলত বর্ণনা করেন এবং আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ব্যয়ে মুসলমানদের অনুপ্রাণিত করেন।
যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্যে মুসলমানদের প্রচেষ্টা সাহাবায়ে কেরাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পাওয়ার পরই যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি শুরু করেন। মদীনার চারিদিক থেকে আগ্রহী মুসলমানরা আসতে থাকেন। যাদের মনে মোনাফেকী অর্থাৎ নেফাকের অসুখ রয়েছে, তারা ছাড়া কেউ এ যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার কথা ভাবতেই পারেননি। তবে তিন শ্রেণীর মুসলমান ছিলেন পৃথক। তাদের ঈমান ও আমলে কোন প্রকার ত্রুটি ছিলো না। গরীব ক্ষুধাতুর মুসলমানরা আসছিলেন এবং যানবাহনের ব্যবস্থা করার আবেদন জানাচ্ছিলেন কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অক্ষমতা প্রকাশ করছিলেন। সূরা তাওবায় এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'ওদের কোন অপরাধ নেই, যারা তোমার কাছে বাহনের জন্যে এলে তুমি বলেছিলে, 'তোমাদের জন্যে কোন বাহন আমি পাচ্ছি না। ওরা অর্থ ব্যয়ে অসামর্থতাজনিত দুঃখে অশ্রু বিগলিত চোখে ফিরে গেলো।'
মুসলমানরা সদকা-খয়রাতের দিক থেকে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। হযরত ওসমান (রা.) সিরিয়ায় ব্যবসার জন্যে প্রেরণের উদ্দেশ্যে একটি কাফেলা তৈরী করেছিলেন। এতে সুসজ্জিত দুইশত উট ছিলো। দুশো উকিয়া অর্থাৎ প্রায় সাড়ে উনত্রিশ কিলো রৌপ্য ছিলো। তিনি এইসবই সদকা করে দিলেন। এরপর পুনরায় একশত উট সুসজ্জিত অবস্থায় দান করলেন। তিনি এক হাজার দীনার অর্থাৎ প্রায় ৫ কিলো সোনা নিয়ে এলেন এবং তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে রাখলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেসব উল্টেপাল্টে দেখছিলেন আর বলছিলেন, আজকের পর থেকে ওসমান যা কিছুই করুক না কেন, তার কোন ক্ষতি হবে না। এরপরও হযরত ওসমান (রা.) সদকা করেন। সব মিলিয়ে দেখা গেলো যে, তাঁর সদকার পরিমাণ নগদ অর্থ ছাড়াও ছিলো নয়শত উট এবং একশত ঘোড়া।
এদিকে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) দু'শো উকিয়া অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ কিলো চাঁদি নিয়ে আসেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁর ঘরের সবকিছু নিয়ে আসেন এবং ঘরে শুধু আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূলকে রেখে আসেন। তাঁর সদকার পরিমাণ ছিলো চার হাজার দিরহাম। তিনিই প্রথমে তার সদকা নিয়ে হাযির হয়েছিলেন। হযরত ওমর (রা.) তার অর্ধেক ধন-সম্পদ নিয়ে হাযির হন। হযরত আব্বাস (রা.) তাঁর বহু ধন-সম্পদ নিয়ে আসেন। হযরত তালহা হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা এবং মোহাম্মদ ইবনে মোসলমাও অনেক ধন-সম্পদ নিয়ে হাযির হন। হযরত আসেম ইবনে আদী নব্বই ওয়াসক অর্থাৎ সাড়ে ১৩ হাজার কিলো বা সোয়া তের টন খেজুর নিয়ে আসেন। অন্যান্য সাহাবারাও সাধ্যমত সদকা নিয়ে আসেন। কেউ এক মুঠো কেউ দুই মুঠোও দেন, তাদের এর বেশী দেয়ার সামর্থ ছিলো না।
মহিলারা তাদের হার, বাজুবন্দ, ঝুমকা, পা-জেব, বালি, আংটি ইত্যাদি সাধ্যমাফিক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে প্রেরণ করেন। কেউ বিরত থাকেননি, কেউ পিছিয়ে থাকেননি। কৃপণতার চিন্তা কারো মনে আসেনি। বেশী বেশী যারা সদকা দিচ্ছিলেন, মোনাফেকরা তাদের খোঁটা দিচ্ছিলো যে, ওরা অহংকারী। যারা সামান্য কিছু দান করছিলেন, তাদের নিয়ে উপহাস করছিলো যে, ওরা একটি দু'টি খেজুর দিয়ে কায়সারের দেশ জয় করতে চলেছে। কোরআনের সূরা তাওবায় এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'মোমেনদের মধ্যে যারা স্বতস্ফূর্তভাবে সদকা দেয় এবং যারা নিজ শ্রম ব্যতীত কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ ও বিদ্রূপ করে, আল্লাহ তায়ালা তাদের বিদ্রূপ করেন, ওদের জন্যে আছে মর্মন্তুদ শাস্তি।'
টিকাঃ
৪. এরা নাবেত ইবনে ইসমাইল (আঃ)-এর বংশধর। এক সময় এরা পাটরা এবং হেজাযের উত্তরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। কিন্তু কালক্রমে শক্তিহীন হয়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়।
৫. জামে তিরিমিয, মানাকেবে ওসমান ইবনে আফফান, ২য় খন্ড, পৃ. ২১১
📄 রোমকদের সাথে যুদ্ধ প্রস্তুতির ঘোষণা
উল্লিখিত বিষয়সমূহ পর্যালোচনার পর নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের মধ্যে যুদ্ধ প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন। মক্কাবাসী এবং আরবের বিভিন্ন গোত্রকেও যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। অন্য সময়ে নবী শ্রেষ্ঠ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধের ক্ষেত্রে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতেন গন্তব্যের কথা গোপন রাখতেন। কিন্তু এবার তা করলেন না। প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন যে, রোমকদের সাথে যুদ্ধ হবে।
মুসলমানরা যেন যুদ্ধের জন্যে ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারেন এ জন্যেই প্রকাশ্যে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো। যুদ্ধের জন্যে মুসলমানদের প্রস্তুতিতে উদ্বুদ্ধ করতে সূরা তাওবার একাংশও নাযিল হয়েছিলো। সাথে সাথে তিনি সদকা খয়রাত করার ফযিলত বর্ণনা করেন এবং আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ব্যয়ে মুসলমানদের অনুপ্রাণিত করেন।
যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্যে মুসলমানদের প্রচেষ্টা সাহাবায়ে কেরাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পাওয়ার পরই যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি শুরু করেন। মদীনার চারিদিক থেকে আগ্রহী মুসলমানরা আসতে থাকেন। যাদের মনে মোনাফেকী অর্থাৎ নেফাকের অসুখ রয়েছে, তারা ছাড়া কেউ এ যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার কথা ভাবতেই পারেননি। তবে তিন শ্রেণীর মুসলমান ছিলেন পৃথক। তাদের ঈমান ও আমলে কোন প্রকার ত্রুটি ছিলো না। গরীব ক্ষুধাতুর মুসলমানরা আসছিলেন এবং যানবাহনের ব্যবস্থা করার আবেদন জানাচ্ছিলেন কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অক্ষমতা প্রকাশ করছিলেন। সূরা তাওবায় এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'ওদের কোন অপরাধ নেই, যারা তোমার কাছে বাহনের জন্যে এলে তুমি বলেছিলে, 'তোমাদের জন্যে কোন বাহন আমি পাচ্ছি না। ওরা অর্থ ব্যয়ে অসামর্থতাজনিত দুঃখে অশ্রু বিগলিত চোখে ফিরে গেলো।'
মুসলমানরা সদকা-খয়রাতের দিক থেকে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। হযরত ওসমান (রা.) সিরিয়ায় ব্যবসার জন্যে প্রেরণের উদ্দেশ্যে একটি কাফেলা তৈরী করেছিলেন। এতে সুসজ্জিত দুইশত উট ছিলো। দুশো উকিয়া অর্থাৎ প্রায় সাড়ে উনত্রিশ কিলো রৌপ্য ছিলো। তিনি এইসবই সদকা করে দিলেন। এরপর পুনরায় একশত উট সুসজ্জিত অবস্থায় দান করলেন। তিনি এক হাজার দীনার অর্থাৎ প্রায় ৫ কিলো সোনা নিয়ে এলেন এবং তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে রাখলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেসব উল্টেপাল্টে দেখছিলেন আর বলছিলেন, আজকের পর থেকে ওসমান যা কিছুই করুক না কেন, তার কোন ক্ষতি হবে না। এরপরও হযরত ওসমান (রা.) সদকা করেন। সব মিলিয়ে দেখা গেলো যে, তাঁর সদকার পরিমাণ নগদ অর্থ ছাড়াও ছিলো নয়শত উট এবং একশত ঘোড়া।
এদিকে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) দু'শো উকিয়া অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ কিলো চাঁদি নিয়ে আসেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁর ঘরের সবকিছু নিয়ে আসেন এবং ঘরে শুধু আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূলকে রেখে আসেন। তাঁর সদকার পরিমাণ ছিলো চার হাজার দিরহাম। তিনিই প্রথমে তার সদকা নিয়ে হাযির হয়েছিলেন। হযরত ওমর (রা.) তার অর্ধেক ধন-সম্পদ নিয়ে হাযির হন। হযরত আব্বাস (রা.) তাঁর বহু ধন-সম্পদ নিয়ে আসেন। হযরত তালহা হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা এবং মোহাম্মদ ইবনে মোসলমাও অনেক ধন-সম্পদ নিয়ে হাযির হন। হযরত আসেম ইবনে আদী নব্বই ওয়াসক অর্থাৎ সাড়ে ১৩ হাজার কিলো বা সোয়া তের টন খেজুর নিয়ে আসেন। অন্যান্য সাহাবারাও সাধ্যমত সদকা নিয়ে আসেন। কেউ এক মুঠো কেউ দুই মুঠোও দেন, তাদের এর বেশী দেয়ার সামর্থ ছিলো না।
মহিলারা তাদের হার, বাজুবন্দ, ঝুমকা, পা-জেব, বালি, আংটি ইত্যাদি সাধ্যমাফিক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে প্রেরণ করেন। কেউ বিরত থাকেননি, কেউ পিছিয়ে থাকেননি। কৃপণতার চিন্তা কারো মনে আসেনি। বেশী বেশী যারা সদকা দিচ্ছিলেন, মোনাফেকরা তাদের খোঁটা দিচ্ছিলো যে, ওরা অহংকারী। যারা সামান্য কিছু দান করছিলেন, তাদের নিয়ে উপহাস করছিলো যে, ওরা একটি দু'টি খেজুর দিয়ে কায়সারের দেশ জয় করতে চলেছে। কোরআনের সূরা তাওবায় এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'মোমেনদের মধ্যে যারা স্বতস্ফূর্তভাবে সদকা দেয় এবং যারা নিজ শ্রম ব্যতীত কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ ও বিদ্রূপ করে, আল্লাহ তায়ালা তাদের বিদ্রূপ করেন, ওদের জন্যে আছে মর্মন্তুদ শাস্তি।'
টিকাঃ
৫. জামে তিরিমিয, মানাকেবে ওসমান ইবনে আফফান, ২য় খন্ড, পৃ. ২১১