📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 বাইয়াত

📄 বাইয়াত


আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মুসলমানদের মক্কার বিজয় দেয়ার পর মক্কার অধিবাসীদের সামনে সত্য পরিষ্কার হয়ে গেলো। তারা বুঝতে পারলো যে, ইসলাম ব্যতীত সাফল্যের কোন পথ নেই। এ কারণে ইসলামের অনুসারী হওয়ার উদ্দেশ্যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে বাইয়াতের জন্যে হাযির হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফার ওপরে বসে লোকদের কাছ থেকে বাইয়াত নিতে শুরু করলেন। হযরত ওমর (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নীচে ছিলেন এবং লোকদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করছিলেন। উপস্থিত লোকেরা এ. মর্মে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ হলো যে, তারা যতোটা সম্ভব তাঁর কথা শুনবে এবং মেনে চলবে।
তাফসীরে মাদারেকে উল্লেখ রয়েছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরুষদের কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণের পর মহিলাদের কাছ থেকেও বাইয়াত নেন। হযরত ওমর (রা.) নীচে ছিলেন এবং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশে বাইয়াত নিচ্ছিলেন, মহিলাদের তাঁর কথা শোনাচ্ছিলেন।
সে সময় আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হেন্দা ভিন্ন পোশাকে হাযির হলেন। আসলে হযরত হামযার (রা.) লাশের সাথে তিনি যে আচরণ করেছিলেন সে কারণে ভীত ছিলেন যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে চিনে ফেলেন কিনা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বলে বাইয়াত নিচ্ছিলেন যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না। হযরত ওমর (রা.) সেই কথারই পুনরাবৃত্তি করে বললেন, মহিলারা তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন তোমরা চুরি করবে না। একথা বলার পরই হেন্দা বললো, আবু সুফিয়ান আস্ত কৃপণ, আমি যদি তার ধন-সম্পদ থেকে কিছু নেই, তখন কি হবে? আবু সুফিয়ান সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তিনি বললেন, তুমি যা কিছু নেবে সেসব তোমার জন্যে হালাল। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসলেন। এরপর বললেন, আচ্ছা, তুমি কি হেন্দা? আবু সুফিয়ানের স্ত্রী বললো, হাঁ, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, যা কিছু হয়ে গেছে, সেসব মাফ করে দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহ তায়ালা তোমাকে মার্জনা করুন।'
এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা যেনা করবে না। একথা শুনে হেন্দা বললেন, স্বাধীন কোন নারী কি যেনা করতে পারে? এরপর তিনি বললেন, নিজের সন্তানকে হত্যা করবে না। হেন্দা বললেন, শৈশবে আমি তাদের লালন-পালন করেছি, বড় হওয়ার পর আপনার লোকেরা তাদের হত্যা করেছে। কাজেই তাদের বিষয়ে আপনি এবং তারা ভালো জানেন।
উল্লেখ্য, হেন্দার পুত্র হানযালা ইবনে আবু সুফিয়ান বদরের যুদ্ধের দিনে নিহত হয়েছিলো। হেন্দার কথা শুনে হযরত ওমর (রা.) হেসে কুটি কুটি হলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও হাসলেন।

টিকাঃ
১১. মাদাবেকৃত তানযিল।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মক্কায় নবী (স.)-এর অবস্থান

📄 মক্কায় নবী (স.)-এর অবস্থান


রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় ঊনিশ দিন অবস্থান করেন। এই সময়ে ইসলাম শিক্ষা, তাকওয়া ও হেদায়াত সম্পর্কে পথ নির্দেশ দিচ্ছিলেন। সেই সময়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে আবু উছায়েদ খাযায়ি (রা.) নতুন করে হরম শরীফের খুঁটি স্থাপন করলেন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উল্লিখিত সময়ে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি ছারিয়‍্যা অর্থাৎ ছোট ধরনের সেনাদল প্রেরণ করলেন। এমনি করে সকল মূর্তি ভেঙ্গে ফেলা হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে একজন ঘোষণা করলেন যে, কেউ যদি আল্লাহ তায়ালা এবং আখেরাতের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন নিজের ঘরে মূর্তি না রাখে, বরং মূর্তি যেন ভেঙ্গে ফেলে।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 সেনাদল এবং প্রতিনিধি প্রেরণ

📄 সেনাদল এবং প্রতিনিধি প্রেরণ


সেনাদল এবং প্রতিনিধি দল প্রেরণ ১. মক্কা বিজয়ের পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৮ হিজরীর রমযানের ২৫ তারিখে খালেদ ইবনে ওলীদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি ছারিয়‍্যা প্রেরণ করেন। ওযযা নির্মূল করতে এ অভিযান প্রেরণ করা হয়। ওযযা ছিলো নাখলায়। কোরায়শ এবং সমগ্র বনু কেনানা গোত্র এ মূর্তির পূজা করতো। এটি ছিলো তাদের সবেচেয়ে বড় মূর্তি। বনু শায়বান গোত্র এ মূর্তির তত্ত্বাবধান করতো। হযরত খালেদ ত্রিশ জন সওয়ারী সৈন্যসহ নাখলায় গিয়ে এ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলেন। ফিরে আসার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত খালেদকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি কিছু দেখেছ? তিনি বলেন, কই না তো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তবে তো তুমি মূর্তিই ভাঙ্গতে পারোনি?
হযরত খালেদ পুনরায় নাঙ্গা তলোয়ার উঁচিয়ে গেলেন। এবার তিনি দেখলেন তাঁর দিকে এক কালো নগ্ন মাথা ন্যাড়া মহিলা এগিয়ে আসছে। হযরত খালেদ তরবারি দিয়ে আঘাত করলেন। এতে সেই মহিলা দুই টুকরো হয়ে গেলো। হযরত খালেদ এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এসে খবর দিলেন। তিনি বললেন, হাঁ, সেই ছিলো ওযযা। এবার সে তোমাদের দেশে তার পূজার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে।
২. এরপর সেই মাসেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোয়া নামক অন্য একটি মূর্তি ধ্বংস করতে আমর ইবনুল আসকে পাঠালেন। এটা ছিলো মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে। রেহাত এলাকায় বনু হোযাইল গোত্র এর পূজা করতো। হযরত আমর সেখানে যাওয়ার পর পুরোহিত বললো, তুমি কি চাও? তিনি বললেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে এ মূর্তি

ধ্বংস করতে এসেছি। পুরোহিত বললো, তুমি সেটা পারবে না। তিনি বললেন, কেন? পুরোহিত বললো, অদৃশ্য থেকে তোমাকে বাধা দেয়া হবে। তিনি বললেন, তোমার জন্যে আফসোস। এই মূর্তি কি দেখতে পায়? শুনতে পায়? তুমি এখনো মিথ্যার ওপর রয়েছো? এরপর তিনি মূর্তি ভেঙ্গে সঙ্গীদের মূর্তিঘরে অনুসন্ধান চালাতে বললেন। কিন্তু কোন জিনিস পাওয়া গেলো না। হযরত আমরের নির্দেশে মূর্তিঘরও ধ্বংস করে দেয় হলো। এরপর তিনি পুরোহিতকে জিজ্ঞাসা করলেন কি, কেমন বুঝলে, পুরোহিত বললো, আমি লা শারিক আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম।
৩. সেই মাসেই হযরত সা'দ ইবনে যায়েদ আশহালির নেতৃত্বে বিশজন সৈন্য প্রেরণ করা হলো। এরা মানাত মূর্তি ধ্বংস করতে গেলেন। কোদায়েদের কাছে মাশাল নামক এলাকায় এ মূর্তি ছিলো। গাসসান, আওস এবং খাযরাজ গোত্রে এর পূজা করতো। হযরত সা'দ সেখানে পৌছার পর পুরোহিত বললো, কি চাও? তিনি বললেন মানাতকে ধ্বংস করতে চাই।
পুরোহিত বললো, তুমি জানো আর তোমার কাজ জানে। হযরত সা'দ লক্ষ্য করলেন, বীভৎস চেহারার কালো ন্যাড়া মাথা এক মহিলা বেরিয়ে এসেছে। সে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে সে হায় হায় করছিলো। পুরোহিত বললো, মানাত তোমার কিছু নাফরমানকে ধরো। ইত্যবসরে হযরত সা'দ তলোয়ার দিয়ে মানাতকে দ্বিখন্ডিত করে ফেললেন। এরপর মূর্তিঘর ধ্বংস করা হলো। কিন্তু সেখানে কোন কিছু পাওয়া গেলো না।
৪. ওজ্জা ধ্বংস করে ফিরে আসার পর সেই মাসেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত খালেদ (রা.)-কে বনু জাজিমার কাছে পাঠালেন। ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তাঁকে পাঠানো হয়েছিলো। হযরত খালেদ (রা.) মোহাজের আনসার এবং বনু সালিম গোত্রের সাড়ে তিন শত লোক নিয়ে রওয়ানা হলেন। বনু জাজিমা গোত্রের কাছে পৌঁছে তারা ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তারা 'আসলামনা' অর্থাৎ আমরা ইসলাম গ্রহণ করলাম বলার পরিবর্তে বললো, ছাব্বানা ছাব্বানা অর্থাৎ আমরা নিজেদের দ্বীন ত্যাগ করলাম। এতে হযরত খালেদ তাদের হত্যা এবং গ্রেফতার শুরু করলেন। তারপর একজন করে বন্দীকে নিজের প্রত্যেক সঙ্গীর কাছে দিয়ে তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর এবং তাঁর সঙ্গীরা সেনাপতির আদেশ পালনে অস্বীকৃতি জানালেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে এ ঘটনা উল্লেখ করা হলো। তিনি দুইহাত আকাশের দিকে তুলে দুই বার বললেন, 'হে আল্লাহ তায়ালা খালেদ যা কিছু করেছে, আমি তা থেকে তোমার কাছে পানাহ চাই। '১২
হযরত খালেদের নির্দেশে বনু সালিম গোত্রের লোকেরা নিজেদের বন্দীদের হত্যা করেন। আনসার এবং মোহাজেররা তাদের বন্দীদের হত্যা করেননি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ঘটনার পর হযরত আলী (রা.)-কে পাঠিয়ে নিহতদের ক্ষতিপূরণ এবং তাদের অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি পূরণের ব্যবস্থা করেন। এই ঘটনায় হযরত খালেদ এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর মধ্যে তীব্র কথা কাটাকাটি হয়েছিলো। এ খবর শোনার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, খালেদ, থামো, আমার সাথীদের কিছু বলা থেকে বিরত হও। আল্লাহর শপথ, যদি ওহুদ পাহাড় সোনা হয়ে যায় এবং তার সবটুকু তুমি আল্লাহর পথে ব্যয়

টিকাঃ
১২. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৫০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00