📄 কাবাঘরে নামায আদায় এবং কোরায়েশদের উদ্দেশ্যে ভাষণ
এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভেতর থেকে কাবাঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। হযরত উসামা এবং হযরত বেলাল ভেতরেই ছিলেন। দরজা বন্ধ করে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দরজার মুখোমুখি দেয়ালের কাছে গিয়ে দেয়াল থেকে তিন হাত দূরে দাঁড়ালেন। এ সময় দুটি খাম্বা ছিলো বাম দিকে। একটি খাম্বা ছিলো ডানদিকে। তিনটি খাম্বা ছিলো পেছনে। সেই সময়ে কাবাঘরে ছয়টি খাম্বা বা খুঁটি ছিলো। এরপর তিনি সেখানে নামায আদায় করলেন। নামায শেষে তিনি কাবাঘরের ভেতরের অংশ ঘুরলেন। সকল অংশে তকবীর এবং তওহীদের বাণী উচ্চারণ করলেন। এরপর পুনরায় কাবা ঘরের দরজা খুলে দিলেন। কোরায়শরা সামনে অর্থাৎ মসজিদে হারামে ভিড় করে দাঁড়িয়েছিলো। তারা অপেক্ষা করছিলো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি করেন। দুহাতে দরজার দুই পাল্লা ধরে তিনি কোরায়শদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। সেই ভাষণে তিনি বললেন, 'আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি তাঁর ওয়াদা সত্য করে দেখিয়েছেন। তাঁর বান্দাদের মাধ্যমে তিনি একাই সকল বিরুদ্ধ শক্তিকে পরাজিত করেছেন। শোনো, কাবাঘরের তত্ত্বাবধান এবং হাজীদের পানি পান করানো ছাড়া অন্য সকল সম্মান বা সাফল্য আমার এই দুই পায়ের নীচে। মনে রেখো, যে কোন রকমের হত্যাকান্ডের দায়িত্ব বা ক্ষতিপূরণ একশত উট। এর মধ্যে চল্লিশটি উট হতে হবে গর্ভবতী।
হে কোরায়শরা, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের মধ্য থেকে জাহেলিয়াত এবং পিতা ও পিতামহের অহংকার নিঃশেষ করে দিয়েছেন। সকল মানুষ আদমের সন্তান আর আদম মাটি থেকে তৈরী। এরপর তিনি এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন, 'হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে করে, তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক মোত্তাকী। আল্লাহ সবকিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন।
📄 আজ কোন অভিযোগ নেই
এরপর তিনি বললেন, হে কোরায়শরা, তোমাদের ধারণা, আমি তোমাদের সাথে কেমন ব্যবহার করবো? সবাই বললো, ভালো ব্যবহার করবেন, এটাই আমাদের ধারণা। আপনি দয়ালু। দয়ালু ভাইয়ের পুত্র। এরপর তিনি বলেন, তাহলে আমি তোমাদেরকে সেই কথাই বলছি, যে কথা হযরত ইউসুফ (আ.) তাঁর ভাইদের বলেছিলেন, 'লা তাছরিবা আলাইকুমুল ইয়াওমা!' আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। তোমরা সবাই মুক্ত।
📄 কাবাঘরের চাবি ও কাবার ছাদে বেলালের আযান
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর মসজিদে হারামে বসলেন। হযরত আলীর হাতে ছিলো কাবাঘরের চাবি। তিনি বললেন, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হাজীদের পানি পান করানোর মর্যাদার পাশাপাশি কাবাঘরের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বও আমাদের ওপর ন্যস্ত করুন। আল্লাহ তায়ালা আপনার ওপর রহমত করুন। অন্য এক বর্ণনা অনুযায়ী এই আবেদন হযরত আব্বাস জানিয়েছিলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ওসমান ইবনে তালহা কোথায়? তাঁকে ডাকা হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ওসমান এই নাও চাবি। আজকের দিন হচ্ছে আনুগত্যের দিন। তবাকতে ইবনে সা'দ-এর বর্ণনা অনুযায়ী রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এই চাবি সবসময়ের জন্যে নাও। তোমাদের কাছ থেকে এ চাবি সেই কেড়ে নেবে যে যালেম। হে ওসমান (রা.), আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে তার ঘরের তত্ত্বাধায়ক নিযুক্ত করেছেন। কাজেই বায়তুল্লাহ থেকে যা কিছু পাও, তা ভক্ষণ করবে।
কাবার ছাদে বেলালের আযান
নামাযের সময় হয়ে গিয়েছিলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেলালকে কাবার ছাদে উঠে আযান দেয়ার আদেশ দিলেন। সে সময় আবু সুফিয়ান ইবনে হরব, আত্তাব ইবনে আছিদ এবং হাবেছ ইবনে হেশাম কাবার আঙ্গিনায় বসেছিলো। সেখানে অন্য কেউ ছিলো না। আত্তাব বললো, আল্লাহ তায়ালা আছিদকে এ মর্যাদা দিয়েছেন যে, তাকে এই আযান শুনতে হয়নি। নতুবা তাকে এক অপ্রীতিকর জিনিস শুনতে হতো। একথা শুনে হারেস বললো শোনো, আল্লাহর শপথ, যদি আমি শুনতে পারি যে, তিনি সত্য তবে আমি তার আনুগত্যকারী হয়ে যাব। আবু সুফিয়ান বললেন, দেখো, আমি কিছু বলব না। যদি কিছু বলি আল্লাহর শপথ, তবে এই পাথরের টুকরোগুলোও আমার সম্পর্কে খবর দেবে। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সামনে হাযির হয়ে বললেন, এ মাত্র তোমরা যা বলেছ, আমি সব জানি। এরপর তিনি তাদের কথা তাদের শোনালেন। এ বিস্ময়কর ঘটনায় হারেছ এবং আত্তাব বললেন, আমরা সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি আল্লাহর রসূল। আল্লাহর শপথ, আমাদের কথা শোনার মতো কেউ আমাদের সঙ্গে ছিলো না। আমরা বলছি যে, আপনাকে আমাদের কথা জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
📄 বিজয় বা শোকরানার নামায
সেদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে হানি বিনতে আবু তালেবের ঘরে গিয়ে গোসল করলেন। এরপর সেখানে আট রাকাত নামায আদায় করলেন।
তখন ছিলো চাশত-এর সময়। এ কারণে কেউ বললো, এটা চাশত-এর নামায, কেউ বললো, ফতেহ বা বিজয়ের পর শোকরানার নামায। উম্মে হানি তার দু'জন দেবরকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, উম্মে হানি, তুমি যাদের আশ্রয় দিয়েছো, তাদের আমিও আশ্রয় দিলাম। একথা বলার কারণ ছিলো এই যে, উম্মে হানির দুই দেবরকে হযরত আলী (রা.) হত্যা করতে চাচ্ছিলেন। উম্মে হানি ছিলেন হযরত আলীর বোন। উম্মে হানি তার দুই দেবরকে লুকিয়ে রেখে দরজা বন্ধ করে রেখেছিলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে গেলে উম্মে হানি তাকে দেবরদের সমস্যা সম্পর্কে বললে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপরোক্ত মন্তব্য করেন।