📄 মক্কা অভিমুখে ইসলামী বাহিনী
অষ্টম হিজরীর ১৭ই রমযান সকাল বেলা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাররুজ জাহারান থেকে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। তাঁর চাচা হযরত আব্বাসকে বললেন, আবু সুফিয়ানকে যেন প্রান্তরের পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড় করিয়ে রাখে। এতে সেপথ অতিক্রমকারী আল্লাহর সৈনিকদের আবু সুফিয়ান দেখতে পাবে। হযরত আব্বাস (রা.) তাই করলেন। এদিকে বিভিন্ন গোত্র তাদের পতাকা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। কোন গোত্র অতিক্রমের সময় আবু সুফিয়ান জিজ্ঞাসা করতেন, আব্বাস এরা কারা? জবাবে হযরত আব্বাস যেমন বলতেন, ওরা বনু সালিম। আবু সুফিয়ান বলতেন, বুন সালিমের সাথে আমার কি সম্পর্ক? অন্য কেউ সেই পথ অতিক্রমের সময় আবু সুফিয়ান বলতেন, এরা কারা? হযরত আব্বাস যেমন বলতেন, এরা মোযায়না গোত্র। আবু সুফিয়ান বলতেন, মাজনিয়াহ গোত্রের সাথে আমার কি সম্পর্ক? একে একে সকল গোত্র আবু সুফিয়ানের সামনে দিয়ে অতিক্রম করলো। যে কোন গোত্র যাওয়ার সময় আবু সুফিয়ান তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন এবং পরিচয় জানার পর বলতেন, ওদের সাথে আমার কি সম্পর্ক? এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মোহাজের ও আনসারদের সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে দেখা যাচ্ছিল শুধু লৌহ শিরস্ত্রাণ। আবু সুফিয়ান বললেন, সুবহানাল্লাহ, এরা কারা? হযরত আব্বাস বললেন, আনসার ও মোহাজেরদের সঙ্গে নিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাচ্ছেন। আবু সুফিয়ান বললেন, এদের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি কার আছে? আবুল ফযল, তোমার ভাতিজার বাদশাহী তো বড়ো জবরদস্ত হয়ে গেছে। হযরত আব্বাস (রা.) বললেন, আবু সুফিয়ান এটা হচ্ছে নবুয়ত। আবু সুফিয়ান বললেন, হাঁ, এখন তো তাই বলা হবে।
এ সময় আরো একটা ঘটনা ঘটলো। আনসারদের পতাকা হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা (রা.) বহন করছিলেন। আবু সুফিয়ানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হযরত সা'দ (রা.) বললেন, আজ রক্তপাত এবং মারধোর করার দিন। আজ হারামকে হালাল করা হবে। আল্লাহ তায়ালা আজ কোরায়শদেব জন্যে অবমাননা নির্ধারণ করে রেখেছেন। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাওয়ার সময় আবু সুফিয়ান বললেন, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সা'দ যা বলেছে, আপনি কি সে কথা শুনেছেন? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন যে, সা'দ কি বলেছে? আবু সুফিয়ান বললেন, এই এই কথা বলেছে। একথা শুনে হযরত ওসমান এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ বললেন, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমরা আশঙ্কা করছি যে, সা'দ কোরায়শদের মধ্যে খুন-খারাবি শুরু না করে? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, না আজতো এমন দিন যে, কাবার তাযিম করা হবে। আজ এমন দিন যে, আল্লাহ তায়ালা কোরায়শদের সম্মান দেবেন। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন সাহাবীকে পাঠিয়ে হযরত সা'দ এর হাত থেকে পতাকা নিয়ে নিলেন এবং তাঁর পুত্র কয়েস এর হাতে দিলেন। এতে মনে হলো পতাকা যেন হযরত সা'দ-এর হাতেই রয়ে গেছে। অন্য বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পতাকা হযরত যোবায়ের (রা.) এর হাতে দিয়েছিলেন।
কোরায়শদের দোরগোড়ায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সুফিয়ানের সামনে দিয়ে যাওয়ার পর হযরত আব্বাস (রা.) বললেন, আবু সুফিয়ান, এবার তুমি কওমের কাছে যাও। আবু সুফিয়ান দ্রুত মক্কায় গিয়ে পৌছালো এবং উচ্চ কণ্ঠে বললো, হে কোরায়শরা, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের কাছে এতো সৈন্য নিয়ে এসেছেন যে, মোকাবেলা করা অসম্ভব ব্যাপার। কাজেই যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপত্তা পাবে। একথা শুনে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হেন্দ বিনতে ওতবা উঠে দাঁড়িয়ে সামনে এসে আবু সুফিয়ানের গোঁফ নেড়ে বললো, তোমরা এই বুড়োকে মেরে ফেলো। খারাপ খবর নিয়ে আসা এই বুড়োর অকল্যাণ হোক।
আবু সুফিয়ান বললেন, তোমাদের সর্বনাশ হোক। দেখো তোমাদের জীবন বাঁচানোর ব্যাপারে এই মেয়েলোক তোমাদের যেন ধোঁকায় না ফেলে। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতো বিরাট বাহিনী নিয়ে এসেছেন যার মোকাবেলা করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। কাজেই, যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, তারা নিরাপদ। লোকেরা বললো, আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন। আমরা কয়জন তোমার ঘরে যেতে পারবো? আবু সুফিয়ান বললেন, যারা নিজের ঘরের দরোজা ভেতর থেকে বন্ধ করে রাখবে, তারাও নিরাপত্তা পাবে। যারা মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে, তারাও নিরাপত্তা পাবে। একথা শুনে লোকেরা নিজেদের ঘর এবং মসজিদে হারাম অর্থাৎ কাবাঘরের দিকে দৌড়াতে লাগলো। তবে মতলববাজ কোরায়শরা কিছু সংখ্যক মাস্তানজাতীয় উচ্ছৃঙ্খল লোককে লেলিয়ে দিয়ে বললো, আমরা এদের সামনে ঠেলে দিলাম। যদি কোরায়শরা কিছুটা সাফল্য লাভ করে, তবে আমরা এদের সাথে গিয়ে মিলিত হব। যদি এরা আহত হয়, তবে আমাদের কাছে তারা যা কিছু চাইবে, আমরা তাই দেবো। মুসলমানদের সাথে লড়াই করতে কোরায়শদের যেসব মাস্তান ও উচ্ছৃঙ্খল লোকেরা প্রস্তুত হলো সেসব নির্বোধ লোকের নেতা মনোনীত করা হলো একরামা ইবনে আবু জেহেল, সফওয়ান ইবনে উমাইয়া এবং সোহায়েল ইবনে আমরকে। এ তিনজনের নেতৃত্বে একদল কোরায়শ খান্দামায় সমবেত হলো। এদের মধ্যে বনু বকর গোত্রের হাম্মাস ইবনে কয়েস নামে একজন লোকও ছিলো। এর আগে সে অস্ত্র মেরামতের কাজ করতো। একদিন নিজ অস্ত্র মেরামতের সময় তার স্ত্রী বললো, তোমার এ প্রস্তুতি কিসের গো? হাম্মাস বললো, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের সাথে মোকাবেলা করার প্রস্তুতি। একথা শুনে তার স্ত্রী বললো, আল্লাহর শপথ, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের মোকাবেলা করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। হাম্মাস বললো, আল্লাহর শপথ, আমি আশা করি যে, তাঁর কয়েকজন সঙ্গীকে আমি তোমার দাস হিসাবে হাযির করতে পারব। ওরা যদি আজ মোকাবেলার জন্যে আসে, তবে ওদের মোকাবেলার জন্যে আমার কোন অজুহাত থাকবে না। পূর্ণাঙ্গ হাতিয়ার রয়েছে। ধারালো বর্শা, দু'ধারি তলোয়ার। খান্দামার যুদ্ধে এ লোকটিও উপস্থিত হয়েছিলো।
যি-তুবায় এদিকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাররাজ জাহরান থেকে রওয়ানা হয়ে যি-তুবায় পৌছুলেন। এ সময়ে আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত মর্যাদার কারণে বিনয় ও কৃতজ্ঞতায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা নীচু করে রেখেছিলেন। যি-তুবায় তিনি সৈন্য সমাবেশ করলেন। খালেদ ইবনে ওলীদকে নিজের ডানদিকে রাখলেন। এখানে আসলাম, সোলায়েম, গেফার, মোজাইনা এবং কয়েকটি আরব গোত্র ছিলো। খালেদ ইবনে ওলীদকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন মক্কার ঢালু এলাকায় প্রবেশ করেন। খালেদকে বললেন, যদি কোরায়শদের কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তাকে হত্যা করবে। এরপর তুমি সাফায় গিয়ে আমার সাথে দেখা করবে।
হযরত যোবায়ের ইবনে আওয়ামকে বামদিকে রাখলেন। তাঁর হাতে ছিলো রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পতাকা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে আদেশ দিলেন, তিনি যেন মক্কার উঁচু এলাকা অর্থাৎ কোদায় প্রবেশ করেন এবং হাজুনে তাঁর দেয়া পতাকা স্থাপন করে তাঁর আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।
পদব্রজে যারা এসেছিলেন তাদের পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছিলেন হযরত আবু ওবায়দা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদেশ দিলেন, তিনি যেন প্রান্তরের প্রান্তসীমার পথ ধরে অগ্রসর হন এবং মক্কায় তাঁরা অবতরণ করেন।
ইসলামী বাহিনীর মক্কায় প্রবেশ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পাওয়ার পর সেনাপতিরা নিজ নিজ সৈন্যদের নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় চলে গেলেন।
হযরত খালেদ এবং তাঁর সঙ্গীদের পথে যেসব পৌত্তলিক আসছিলো, তাদের সাথে মোকাবেলা করে তাদের হত্যা করা হলো। হযরত খালেদের সাথী কারয ইবনে জাবের ফাহরি এবং খুনায়েস ইবনে খালেদ ইবনে রবিয়া শাহাদাত বরণ করেন। এরা দু'জন সেনাদল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য রাস্তায় চলে গিয়েছিলেন। সেখানে তাদের হত্যা করা হয়। খান্দামায় হযরত খালেদ এবং তাঁর সঙ্গীদের সাথে উচ্ছৃঙ্খল কোরায়শরা মুখোমুখি হলো। কিছুক্ষণ উভয় পক্ষে সংঘর্ষ হলো। এতে ১২ জন পৌত্তলিক নিহত হলো। এ ঘটনায় কোরায়শদের মনে আতঙ্ক ছেয়ে গেলো। মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতে সংকল্পবদ্ধ হাম্মাস ইবনে কয়েস দ্রুত ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। তাঁর স্ত্রীকে বললো, দরোজা বন্ধ রাখবে, খুলবে না। তার স্ত্রী বললো, আপনার সেই বাগাড়ম্বর গেলো কোথায়? হাম্মাস ইবনে কয়েস বললো, হায়রে, তুমি যদি খান্দামায় যুদ্ধের অবস্থা দেখতে, তবে এমন কথা বলতে না। তোমাকে কি আর বলবো, সফওয়ান আর একরামা ছুটে পলায়ন করলো। নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা করা হলো। সেই তলোয়ার গলা এবং মাথা এমনভাবে কাটছিলো যে, নিহতদের হৃদয়বিদায়ক চিৎকার এবং হৈহল্লা ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।
হযরত খালেদ (রা.) খান্দামায় শত্রুদের মোকাবেলার পর মক্কার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাফায় গিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মিলিত হলেন।
এদিকে হযরত যোবায়ের (রা.) সামনে অগ্রসর হয়ে হাজুল-এর মসজিদে ফতেহ-এর কাছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পতাকা স্থাপন করলেন এবং তাঁর অবস্থানের জন্যে একটি কোব্বা তৈরী করলেন। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যাওয়া পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করলেন।
📄 কোরায়শদের দোরগোড়ায়
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সুফিয়ানের সামনে দিয়ে যাওয়ার পর হযরত আব্বাস (রা.) বললেন, আবু সুফিয়ান, এবার তুমি কওমের কাছে যাও। আবু সুফিয়ান দ্রুত মক্কায় গিয়ে পৌছালো এবং উচ্চ কণ্ঠে বললো, হে কোরায়শরা, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের কাছে এতো সৈন্য নিয়ে এসেছেন যে, মোকাবেলা করা অসম্ভব ব্যাপার। কাজেই যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপত্তা পাবে। একথা শুনে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হেন্দ বিনতে ওতবা উঠে দাঁড়িয়ে সামনে এসে আবু সুফিয়ানের গোঁফ নেড়ে বললো, তোমরা এই বুড়োকে মেরে ফেলো। খারাপ খবর নিয়ে আসা এই বুড়োর অকল্যাণ হোক।
আবু সুফিয়ান বললেন, তোমাদের সর্বনাশ হোক। দেখো তোমাদের জীবন বাঁচানোর ব্যাপারে এই মেয়েলোক তোমাদের যেন ধোঁকায় না ফেলে। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতো বিরাট বাহিনী নিয়ে এসেছেন যার মোকাবেলা করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। কাজেই, যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, তারা নিরাপদ। লোকেরা বললো, আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন। আমরা কয়জন তোমার ঘরে যেতে পারবো? আবু সুফিয়ান বললেন, যারা নিজের ঘরের দরোজা ভেতর থেকে বন্ধ করে রাখবে, তারাও নিরাপত্তা পাবে। যারা মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে, তারাও নিরাপত্তা পাবে। একথা শুনে লোকেরা নিজেদের ঘর এবং মসজিদে হারাম অর্থাৎ কাবাঘরের দিকে দৌড়াতে লাগলো। তবে মতলববাজ কোরায়শরা কিছু সংখ্যক মাস্তানজাতীয় উচ্ছৃঙ্খল লোককে লেলিয়ে দিয়ে বললো, আমরা এদের সামনে ঠেলে দিলাম। যদি কোরায়শরা কিছুটা সাফল্য লাভ করে, তবে আমরা এদের সাথে গিয়ে মিলিত হব। যদি এরা আহত হয়, তবে আমাদের কাছে তারা যা কিছু চাইবে, আমরা তাই দেবো। মুসলমানদের সাথে লড়াই করতে কোরায়শদের যেসব মাস্তান ও উচ্ছৃঙ্খল লোকেরা প্রস্তুত হলো সেসব নির্বোধ লোকের নেতা মনোনীত করা হলো একরামা ইবনে আবু জেহেল, সফওয়ান ইবনে উমাইয়া এবং সোহায়েল ইবনে আমরকে। এ তিনজনের নেতৃত্বে একদল কোরায়শ খান্দামায় সমবেত হলো। এদের মধ্যে বনু বকর গোত্রের হাম্মাস ইবনে কয়েস নামে একজন লোকও ছিলো। এর আগে সে অস্ত্র মেরামতের কাজ করতো। একদিন নিজ অস্ত্র মেরামতের সময় তার স্ত্রী বললো, তোমার এ প্রস্তুতি কিসের গো? হাম্মাস বললো, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের সাথে মোকাবেলা করার প্রস্তুতি। একথা শুনে তার স্ত্রী বললো, আল্লাহর শপথ, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের মোকাবেলা করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। হাম্মাস বললো, আল্লাহর শপথ, আমি আশা করি যে, তাঁর কয়েকজন সঙ্গীকে আমি তোমার দাস হিসাবে হাযির করতে পারব। ওরা যদি আজ মোকাবেলার জন্যে আসে, তবে ওদের মোকাবেলার জন্যে আমার কোন অজুহাত থাকবে না। পূর্ণাঙ্গ হাতিয়ার রয়েছে। ধারালো বর্শা, দু'ধারি তলোয়ার। খান্দামার যুদ্ধে এ লোকটিও উপস্থিত হয়েছিলো।
📄 যি তুবায় ও ইসলামী বাহিনীর মক্কায় প্রবেশ
এদিকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাররাজ জাহরান থেকে রওয়ানা হয়ে যি-তুবায় পৌছুলেন। এ সময়ে আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত মর্যাদার কারণে বিনয় ও কৃতজ্ঞতায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা নীচু করে রেখেছিলেন। যি-তুবায় তিনি সৈন্য সমাবেশ করলেন। খালেদ ইবনে ওলীদকে নিজের ডানদিকে রাখলেন। এখানে আসলাম, সোলায়েম, গেফার, মোজাইনা এবং কয়েকটি আরব গোত্র ছিলো। খালেদ ইবনে ওলীদকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন মক্কার ঢালু এলাকায় প্রবেশ করেন। খালেদকে বললেন, যদি কোরায়শদের কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তাকে হত্যা করবে। এরপর তুমি সাফায় গিয়ে আমার সাথে দেখা করবে।
হযরত যোবায়ের ইবনে আওয়ামকে বামদিকে রাখলেন। তাঁর হাতে ছিলো রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পতাকা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে আদেশ দিলেন, তিনি যেন মক্কার উঁচু এলাকা অর্থাৎ কোদায় প্রবেশ করেন এবং হাজুনে তাঁর দেয়া পতাকা স্থাপন করে তাঁর আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।
পদব্রজে যারা এসেছিলেন তাদের পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছিলেন হযরত আবু ওবায়দা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদেশ দিলেন, তিনি যেন প্রান্তরের প্রান্তসীমার পথ ধরে অগ্রসর হন এবং মক্কায় তাঁরা অবতরণ করেন।
ইসলামী বাহিনীর মক্কায় প্রবেশ
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পাওয়ার পর সেনাপতিরা নিজ নিজ সৈন্যদের নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় চলে গেলেন।
হযরত খালেদ এবং তাঁর সঙ্গীদের পথে যেসব পৌত্তলিক আসছিলো, তাদের সাথে মোকাবেলা করে তাদের হত্যা করা হলো। হযরত খালেদের সাথী কারয ইবনে জাবের ফাহরি এবং খুনায়েস ইবনে খালেদ ইবনে রবিয়া শাহাদাত বরণ করেন। এরা দু'জন সেনাদল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য রাস্তায় চলে গিয়েছিলেন। সেখানে তাদের হত্যা করা হয়। খান্দামায় হযরত খালেদ এবং তাঁর সঙ্গীদের সাথে উচ্ছৃঙ্খল কোরায়শরা মুখোমুখি হলো। কিছুক্ষণ উভয় পক্ষে সংঘর্ষ হলো। এতে ১২ জন পৌত্তলিক নিহত হলো। এ ঘটনায় কোরায়শদের মনে আতঙ্ক ছেয়ে গেলো। মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতে সংকল্পবদ্ধ হাম্মাস ইবনে কয়েস দ্রুত ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। তাঁর স্ত্রীকে বললো, দরোজা বন্ধ রাখবে, খুলবে না। তার স্ত্রী বললো, আপনার সেই বাগাড়ম্বর গেলো কোথায়? হাম্মাস ইবনে কয়েস বললো, হায়রে, তুমি যদি খান্দামায় যুদ্ধের অবস্থা দেখতে, তবে এমন কথা বলতে না। তোমাকে কি আর বলবো, সফওয়ান আর একরামা ছুটে পলায়ন করলো। নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা করা হলো। সেই তলোয়ার গলা এবং মাথা এমনভাবে কাটছিলো যে, নিহতদের হৃদয়বিদায়ক চিৎকার এবং হৈহল্লা ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।
হযরত খালেদ (রা.) খান্দামায় শত্রুদের মোকাবেলার পর মক্কার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাফায় গিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মিলিত হলেন।
এদিকে হযরত যোবায়ের (রা.) সামনে অগ্রসর হয়ে হাজুল-এর মসজিদে ফতেহ-এর কাছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পতাকা স্থাপন করলেন এবং তাঁর অবস্থানের জন্যে একটি কোব্বা তৈরী করলেন। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যাওয়া পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করলেন।
📄 বায়তুল্লায় প্রবেশ এবং মূর্তি অপসারণ
এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনসার ও মোহাজেরদের সঙ্গে নিয়ে মসজিদে হারাম- বায়তুল্লাহ শরীফে প্রবেশ করলেন। প্রথমে তিনি হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন। এরপর কাবাঘর তওয়াফ করলেন। সে সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে একটি ছড়ি ছিলো।
কাবাঘরের আশেপাশে এবং ছাদের ওপর সেই সময় তিনশত ষাটটি মূর্তি ছিলো। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে সেসব মূর্তিকে গুঁতো দিচ্ছিলেন আর উচ্চারণ করছিলেন, সত্য এসেছে, অসত্য চলে গেছে, নিশ্চয়ই অসত্য চলে যাওয়ার মতো।
পবিত্র কোরআনের এই আয়াতও তিনি উচ্চারণ করছিলেন, 'সত্য এসেছে এবং অসত্যের চলাফেরা শেষ হয়ে গেছে।'
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উটনীর উপর বসে তওয়াফ করলেন এবং এহরাম অবস্থায় না থাকার কারণে শুধু তওয়াফই করলেন। তওয়াফ শেষ করার পর হযরত ওসমান ইবনে তালহা (রাঃ)-কে ডেকে তাঁর কাছ থেকে কাবা ঘরের চাবি নিলেন। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে কাবাঘর খোলা হলো। ভেতরে প্রবেশ করে তিনি দেখলেন অনেকগুলো ছবি। এ সব ছবির মধ্যে হযরত ইবরাহীম এবং হযরত ইসমাইলের ছবিও ছিলো। তাঁদের হাতে ছিলো ভাগ্য গননার তীর। এ দৃশ্য দেখে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ তায়ালা এই সব পৌত্তলিককে ধ্বংস করুন। আল্লাহর শপথ, এই দুইজন পয়গাম্বর কখনোই গণনায়-এর তীর ব্যবহার করেননি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবাঘরের ভেতর কাঠের তৈরী একটি কবুতরও দেখলেন। নিজ হাতে তিনি সেটি ভেঙ্গে ফেললেন। তাঁর নির্দেশে ছবিগুলো নষ্ট করে ফেলা হলো।