📄 মক্কা অভিমুখে মুসলিম বাহিনী
অষ্টম হিজরীর ১০ই রমযান। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ১০ হাজার সাহাবা। মদীনার তত্ত্বাবধানের জন্যে আবু রাহাম গেফারীকে নিযুক্ত করা হয়।
জাহাফা বা তার আরো কিছু এগিয়ে যাওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হযরত আব্বাসের সাথে দেখা। তিনি ইসলাম গ্রহণ করে সপরিবারে মদীনায় হিজরত করে যাচ্ছিলেন। আবওয়া নামক জায়গায় পৌঁছে তাঁর চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস এবং ফুফাতো ভাই আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়ার সাথে দেখা হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এরা উভয়ে তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দিয়েছিলো এবং কবিতা রচনা করে তাঁর নিন্দা করে বেড়াতো। এ অবস্থা দেখে হযরত উম্মে সালমা (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, আপনার চাচাতো ভাই ফুফাতো ভাই আপনার কাছে সবচেয়ে খারাপ হবে এটা সমীচীন নয়।
হযরত আলী (রা.) আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস এবং আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়াকে বললেন, তোমরা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে যাও এবং হযরত ইউসুফকে তাঁর ভাইয়েরা যে কথা বলেছিলেন সেকথা বলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিশ্চয়ই এটা পছন্দ করবেন না যে, অন্য কারো জবাব তাঁর চেয়ে উত্তম হবে। হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা তাঁকে বলেছিলেন, 'আল্লাহর শপথ, আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয়ই আপনাকে আমাদের ওপর প্রাধ্যান্য দিয়েছেন এবং আমরা নিশ্চয়ই অপরাধী ছিলাম।' (সূরা ইউসুফ, আয়াত ৯১)
আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস তাই করলেন। এই আয়াত শুনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বললেন, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নাই। 'তিনি দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু।' (সূরা ইউসুফ আয়াত, ৯২)
আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস এরপর কয়েক লাইন কবিতা আবৃত্তি করলেন, তার অর্থ হচ্ছে, 'তোমার বয়সের শপথ, আমি যখন লাত-এর শাহ সওয়ারকে মোহাম্মাদের শাহ সওয়ারের ওপর বিজয়ী করার উদ্দেশ্যে পতাকা তুলেছিলাম সে সময় আমার অবস্থা ছিলো রাতের পথহারা পথিকের মত। কিন্তু এখন আমাকে হেদায়াত দেয়ার সময় এসেছে, এখন আমি হেদায়াত পাওয়ার উপযুক্ত হয়েছি। আমার প্রবৃত্তির পরিবর্তে একজন হাদী আমাকে হেদায়াত দিয়েছেন এবং তিনি আমাকে আল্লাহর পথ দেখিয়েছেন। অথচ এই পথকে আমি ইতিপূর্বে সব সময় উপেক্ষা করেছিলাম।'
একথা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবেগে আবু সুফিয়ানের বুকে চাপড় মেরে বললেন, তুমি আমাকে সব ক্ষেত্রে উপেক্ষা করেছিলে। মাররুজ যাহারানে মুসলিম সেনাদল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সফর অব্যাহত রাখলেন। তিনি এবং সাহাবায়ে কেরাম সকলেই রোযা রেখেছিলেন। আসফান ও কোদায়েদের মধ্যবর্তী কোদায়েদ জলাশয়ের কাছে পৌঁছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোযা ভেঙ্গে ফেললেন। তাঁর দেখাদেখি সাহাবায়ে কেরামও রোযা ভাঙ্গলেন।
এরপর পুনরায় তাঁরা সফর করতে শুরু করলেন। রাতের প্রথম প্রহরে তাঁরা মারুরুজ জাহারান অর্থাৎ ফাতেমা প্রান্তরে গিয়ে পৌছুলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশে সাহাবারা পৃথকভাবে আগুন জ্বালালেন। এতে দশ হাজার চুলায় রান্না হচ্ছিলো। আল্লাহর রসুল পাহারার কাজে হযরত ওমরকে (রা.) নিযুক্ত করলেন।
টিকাঃ
৭. পরবর্তীকালে আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস একজন ভালো মুসলমান হয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে ইসলাম গ্রহণের পর লজ্জার কারণে তিনি রসূলের প্রতি চোখ তুলে তাকাননি। আল্লাহর রসূলও তাকে ভালোবাসতেন এবং তাকে বেহেশতের সুসংবাদ দিতেন। তিনি বলতেন, আমি আশা করি আবু সুফিয়ান হামজার মতো হবে। ইন্তেকালের সময় উপস্থিত হলে বললেন, আমার জন্য কেঁদো না। ইসলাম গ্রহণের পর আমি পাপ হওয়ার মতো কোন কথা বলিনি। (যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃ. ১৬২-১৬৩)
৮. সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড
📄 মাররুজ যাহরানে মুসলিম সেনাদল
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সফর অব্যাহত রাখলেন। তিনি এবং সাহাবায়ে কেরাম সকলেই রোযা রেখেছিলেন। আসফান ও কোদায়েদের মধ্যবর্তী কোদায়েদ জলাশয়ের কাছে পৌঁছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোযা ভেঙ্গে ফেললেন। ৮ তাঁর দেখাদেখি সাহাবায়ে কেরামও রোযা ভাঙ্গলেন।
এরপর পুনরায় তাঁরা সফর করতে শুরু করলেন। রাতের প্রথম প্রহরে তাঁরা মারুরুজ জাহারান অর্থাৎ ফাতেমা প্রান্তরে গিয়ে পৌছুলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশে সাহাবারা পৃথকভাবে আগুন জ্বালালেন। এতে দশ হাজার চুলায় রান্না হচ্ছিলো। আল্লাহর রসুল পাহারার কাজে হযরত ওমরকে (রা.) নিযুক্ত করলেন। আল্লাহর রসূলের সমীপে আবু সুফিয়ান
মাররুজ জাহরানে অবতরণের পর হযরত আব্বাস (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাদা খচ্চরের পিঠে আরোহণ করে ঘোরাফেরা করতে বেরোলেন। তিনি চাচ্ছিলেন যে, কাউকে পেলে মক্কায় খবর পাঠাবেন, যাতে করে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কায় প্রবেশের আগেই কোরায়শরা তাঁর কাছে এসে নিজেদের নিরাপত্তার আবেদন জানায়।
এদিকে আল্লাহ তায়ালা, কোরায়শদের কাছে কোন প্রকার খবর পৌঁছা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এ কারণে মক্কাবাসীরা কিছুই জানতে পারেনি। তবে তারা ভীতি-বিহ্বলতার মধ্যে এবং আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। আবু সুফিয়ান বাইরে এসে কোন নতুন খবর জানা যায় কিনা সে চেষ্টা করছিলো। সে সময় তিনি হাকিম বিন হাজাম এবং বুদাইল বিন ওরাকাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন খবর সংগ্রহের চেষ্টায় বেরিয়েছিলেন।
হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি হযরত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খচ্চরের পিঠে সওয়ার হয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আবু সুফিয়ান এবং বুদাইল ইবনে ওরাকার কথা শুনতে পেলাম। আবু সুফিয়ান বলছিলেন, আল্লাহর শপথ, আমি আজকের মতো আগুন এবং সৈন্যবাহিনী অতীতে কখনো দেখিনি। বুদাইল ইবনে ওরাকা বললো, আল্লাহর শপথ, ওরা হচ্ছে বনু খোযাআ।
যুদ্ধ ওদের লন্ড ভন্ড করে দিয়েছে। আবু সুফিয়ান বললেন, এতো আগুন এবং এতো বিরাট বাহিনী বনু খোযাআর থাকতেই পারে না।
হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি আবু সুফিয়ানের কণ্ঠস্বর শুনে বললাম, আবু হানজালা নাকি? আবু সুফিয়ান আমার কণ্ঠস্বর চিনে বললেন, আবুল ফযল নাকি? আমি বললাম, হাঁ। আবু সুফিয়ান বললেন, কি ব্যাপার? আমার পিতামাতা তোমার জন্যে কোরবান হোন। আমি বললাম, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সদলবলে এসেছেন। হায়রে কোরায়শদের সর্বনাশা অবস্থা। আবু সুফিয়ান বললেন, এখন কি উপায়? আমার পিতামাতা তোমার জন্যে কোরবান হোক। আমি বললাম, ওরা তোমাকে পেলে তোমার গর্দান উড়িয়ে দেবে। তুমি এই খচ্চরের পিছনে উঠে বসো। আমি তোমাকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে যাবো। তোমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দেবো। আবু সুফিয়ান তখন খচ্চরে উঠে আমার পিছনে বসলেন। তার অন্য দু'জন সাথী ফিরে গেলো।
হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি আবু সুফিয়ানকে নিয়ে চললাম, কোন জটলার কাছে গেলে লোকেরা বলতো, কে যায়? কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খচ্চরের পিঠে আমাকে দেখে বলতো, ইনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা, তাঁরই খচ্চরের পিঠে রয়েছেন। ওমর ইবনে খাত্তাবের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেন, কে? একথা বলেই আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমার পিছনে আবু সুফিয়ানকে দেখে বললেন, আবু সুফিয়ান? আল্লাহর দুশমন? আল্লাহর প্রশংসা করি, কোন প্রকার সংঘাত ছাড়াই আবু সুফিয়ান আমাদের কবযায় এসে গেছে। একথা বলেই হযরত ওমর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ছুটে গেলেন। আমিও খচ্চরকে জোরে তাড়িয়ে নিলাম। খচ্চর থেকে নেমে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলাম। ইতিমধ্যে হযরত ওমর (রা.) এলেন। তিনি এসেই বললেন, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ওই দেখুন আবু সুফিয়ান। আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই। হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি বললাম, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমি সুফিয়ানকে নিরাপত্তা দিয়েছি। পরে আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথা স্পর্শ করে বললাম, আল্লাহর শপথ, আজ রাতে আমি ছাড়া আপনার সাথে কেউ গোপন কথা বলতে পারবে না। আবু সুফিয়ানকে হত্যা করার অনুমতির জন্যে হযরত ওমর বারবার আবেদন জানালে আমি বললাম, থামো ওমর। আবু সুফিয়ান যদি বনি আদী ইবনে কা'ব এর লোক হতো, তবে এমন কথা বলতে না। হযরত ওমর বললেন, আব্বাস থামো। আল্লাহর শপথ, তোমার ইসলাম গ্রহণ আমার কাছে আমার পিতা খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় এবং এর একমাত্র কারণ এই যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তোমার ইসলাম গ্রহণ আমার পিতা খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণের চেয়ে অধিক পছন্দনীয়।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আব্বাস, আবু সুফিয়ানকে তোমার ডেরায় নিয়ে যাও। সকালে আমার কাছে নিয়ে এসো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ মতো আমি আবু সুফিয়ানকে আমার তাঁবুতে নিয়ে গেলাম। সকাল বেলা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে আবু সুফিয়ানকে নিয়ে গেলাম। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবু সুফিয়ান, তোমার জন্যে আফসোস, তোমার জন্যে কি এখনো একথা বোঝার সময় আসেনি যে, আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কোন মাবুদ নেই? আবু সুফিয়ান বললো, আমার পিতামাতা আপনার জন্যে কোরবান হোন, আপনি কতো উদার, কতো মহানুভব, কতো দয়ালু। আমি ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ থাকলে এই সময়ে আমার কিছু কাজে আসতো।
টিকাঃ
৮. সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড
📄 আল্লাহর রসূলের সমীপে আবু সুফিয়ান
মাররুজ জাহরানে অবতরণের পর হযরত আব্বাস (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাদা খচ্চরের পিঠে আরোহণ করে ঘোরাফেরা করতে বেরোলেন। তিনি চাচ্ছিলেন যে, কাউকে পেলে মক্কায় খবর পাঠাবেন, যাতে করে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কায় প্রবেশের আগেই কোরায়শরা তাঁর কাছে এসে নিজেদের নিরাপত্তার আবেদন জানায়।
এদিকে আল্লাহ তায়ালা, কোরায়শদের কাছে কোন প্রকার খবর পৌঁছা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এ কারণে মক্কাবাসীরা কিছুই জানতে পারেনি। তবে তারা ভীতি-বিহ্বলতার মধ্যে এবং আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। আবু সুফিয়ান বাইরে এসে কোন নতুন খবর জানা যায় কিনা সে চেষ্টা করছিলো। সে সময় তিনি হাকিম বিন হাজাম এবং বুদাইল বিন ওরাকাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন খবর সংগ্রহের চেষ্টায় বেরিয়েছিলেন।
হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি হযরত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খচ্চরের পিঠে সওয়ার হয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আবু সুফিয়ান এবং বুদাইল ইবনে ওরাকার কথা শুনতে পেলাম। আবু সুফিয়ান বলছিলেন, আল্লাহর শপথ, আমি আজকের মতো আগুন এবং সৈন্যবাহিনী অতীতে কখনো দেখিনি। বুদাইল ইবনে ওরাকা বললো, আল্লাহর শপথ, ওরা হচ্ছে বনু খোযাআ। যুদ্ধ ওদের লন্ড ভন্ড করে দিয়েছে। আবু সুফিয়ান বললেন, এতো আগুন এবং এতো বিরাট বাহিনী বনু খোযাআর থাকতেই পারে না।
হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি আবু সুফিয়ানের কণ্ঠস্বর শুনে বললাম, আবু হানজালা নাকি? আবু সুফিয়ান আমার কণ্ঠস্বর চিনে বললেন, আবুল ফযল নাকি? আমি বললাম, হাঁ। আবু সুফিয়ান বললেন, কি ব্যাপার? আমার পিতামাতা তোমার জন্যে কোরবান হোন। আমি বললাম, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সদলবলে এসেছেন। হায়রে কোরায়শদের সর্বনাশা অবস্থা। আবু সুফিয়ান বললেন, এখন কি উপায়? আমার পিতামাতা তোমার জন্যে কোরবান হোক। আমি বললাম, ওরা তোমাকে পেলে তোমার গর্দান উড়িয়ে দেবে। তুমি এই খচ্চরের পিছনে উঠে বসো। আমি তোমাকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে যাবো। তোমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দেবো। আবু সুফিয়ান তখন খচ্চরে উঠে আমার পিছনে বসলেন। তার অন্য দু'জন সাথী ফিরে গেলো।
হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি আবু সুফিয়ানকে নিয়ে চললাম, কোন জটলার কাছে গেলে লোকেরা বলতো, কে যায়? কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খচ্চরের পিঠে আমাকে দেখে বলতো, ইনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা, তাঁরই খচ্চরের পিঠে রয়েছেন। ওমর ইবনে খাত্তাবের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেন, কে? একথা বলেই আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমার পিছনে আবু সুফিয়ানকে দেখে বললেন, আবু সুফিয়ান? আল্লাহর দুশমন? আল্লাহর প্রশংসা করি, কোন প্রকার সংঘাত ছাড়াই আবু সুফিয়ান আমাদের কবযায় এসে গেছে। একথা বলেই হযরত ওমর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ছুটে গেলেন। আমিও খচ্চরকে জোরে তাড়িয়ে নিলাম। খচ্চর থেকে নেমে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলাম। ইতিমধ্যে হযরত ওমর (রা.) এলেন। তিনি এসেই বললেন, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ওই দেখুন আবু সুফিয়ান। আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই। হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি বললাম, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমি সুফিয়ানকে নিরাপত্তা দিয়েছি। পরে আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথা স্পর্শ করে বললাম, আল্লাহর শপথ, আজ রাতে আমি ছাড়া আপনার সাথে কেউ গোপন কথা বলতে পারবে না। আবু সুফিয়ানকে হত্যা করার অনুমতির জন্যে হযরত ওমর বারবার আবেদন জানালে আমি বললাম, থামো ওমর। আবু সুফিয়ান যদি বনি আদী ইবনে কা'ব এর লোক হতো, তবে এমন কথা বলতে না। হযরত ওমর বললেন, আব্বাস থামো। আল্লাহর শপথ, তোমার ইসলাম গ্রহণ আমার কাছে আমার পিতা খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় এবং এর একমাত্র কারণ এই যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তোমার ইসলাম গ্রহণ আমার পিতা খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণের চেয়ে অধিক পছন্দনীয়।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আব্বাস, আবু সুফিয়ানকে তোমার ডেরায় নিয়ে যাও। সকালে আমার কাছে নিয়ে এসো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ মতো আমি আবু সুফিয়ানকে আমার তাঁবুতে নিয়ে গেলাম। সকাল বেলা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে আবু সুফিয়ানকে নিয়ে গেলাম। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবু সুফিয়ান, তোমার জন্যে আফসোস, তোমার জন্যে কি এখনো একথা বোঝার সময় আসেনি যে, আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কোন মাবুদ নেই? আবু সুফিয়ান বললো, আমার পিতামাতা আপনার জন্যে কোরবান হোন, আপনি কতো উদার, কতো মহানুভব, কতো দয়ালু। আমি ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ থাকলে এই সময়ে আমার কিছু কাজে আসতো।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবু সুফিয়ান, তোমার জন্যে আফসোস, তোমার জন্যে কি এখনো একথা বোঝার সময় আসেনি যে, আমি আল্লাহর রসূল? আবু সুফিয়ান বললো, আমার পিতামাতা আপনার ওপর নিবেদিত হোন। আপনি কতো মহৎ, কতো দয়ালু, আত্মীয়স্বজনের প্রতি কতো যে সমবেদনশীল। আপনি যে প্রশ্ন করলেন, এ সম্পর্কে এখানো আমার মনে কিছু না কিছু খটকা রয়েছে। হযরত আব্বাস (রা.) বললেন, আরে শিরশ্ছেদ হওয়ার মতো অবস্থা হওয়ার আগে ইসলাম কবুল করো। একথা সাক্ষী দাও যে, আল্লাহ ব্যতীত এবাদাতের যোগ্য কেউ নেই এবং হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রসূল। হযরত আব্বাস (রা.)-এর একথা বলার পর আবু সুফিয়ান ইসলাম কবুল করে এবং সত্যের সাক্ষী হলেন।
হযরত আব্বাস বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আবু সুফিয়ান মর্যাদাবান লোক, কাজেই তাকে কোন মর্যাদা দেয়ার আবেদন জানাচ্ছি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ঠিক আছে, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ। যে ব্যক্তি নিজের ঘরে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে রাখবে সে নিরাপদ যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহ শরীফে প্রবেশ করবে, সেও নিরাপদ।
📄 মক্কা অভিমুখে ইসলামী বাহিনী
অষ্টম হিজরীর ১৭ই রমযান সকাল বেলা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাররুজ জাহারান থেকে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। তাঁর চাচা হযরত আব্বাসকে বললেন, আবু সুফিয়ানকে যেন প্রান্তরের পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড় করিয়ে রাখে। এতে সেপথ অতিক্রমকারী আল্লাহর সৈনিকদের আবু সুফিয়ান দেখতে পাবে। হযরত আব্বাস (রা.) তাই করলেন। এদিকে বিভিন্ন গোত্র তাদের পতাকা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। কোন গোত্র অতিক্রমের সময় আবু সুফিয়ান জিজ্ঞাসা করতেন, আব্বাস এরা কারা? জবাবে হযরত আব্বাস যেমন বলতেন, ওরা বনু সালিম। আবু সুফিয়ান বলতেন, বুন সালিমের সাথে আমার কি সম্পর্ক? অন্য কেউ সেই পথ অতিক্রমের সময় আবু সুফিয়ান বলতেন, এরা কারা? হযরত আব্বাস যেমন বলতেন, এরা মোযায়না গোত্র। আবু সুফিয়ান বলতেন, মাজনিয়াহ গোত্রের সাথে আমার কি সম্পর্ক? একে একে সকল গোত্র আবু সুফিয়ানের সামনে দিয়ে অতিক্রম করলো। যে কোন গোত্র যাওয়ার সময় আবু সুফিয়ান তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন এবং পরিচয় জানার পর বলতেন, ওদের সাথে আমার কি সম্পর্ক? এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মোহাজের ও আনসারদের সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে দেখা যাচ্ছিল শুধু লৌহ শিরস্ত্রাণ। আবু সুফিয়ান বললেন, সুবহানাল্লাহ, এরা কারা? হযরত আব্বাস বললেন, আনসার ও মোহাজেরদের সঙ্গে নিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাচ্ছেন। আবু সুফিয়ান বললেন, এদের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি কার আছে? আবুল ফযল, তোমার ভাতিজার বাদশাহী তো বড়ো জবরদস্ত হয়ে গেছে। হযরত আব্বাস (রা.) বললেন, আবু সুফিয়ান এটা হচ্ছে নবুয়ত। আবু সুফিয়ান বললেন, হাঁ, এখন তো তাই বলা হবে।
এ সময় আরো একটা ঘটনা ঘটলো। আনসারদের পতাকা হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা (রা.) বহন করছিলেন। আবু সুফিয়ানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হযরত সা'দ (রা.) বললেন, আজ রক্তপাত এবং মারধোর করার দিন। আজ হারামকে হালাল করা হবে। আল্লাহ তায়ালা আজ কোরায়শদেব জন্যে অবমাননা নির্ধারণ করে রেখেছেন। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাওয়ার সময় আবু সুফিয়ান বললেন, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সা'দ যা বলেছে, আপনি কি সে কথা শুনেছেন? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন যে, সা'দ কি বলেছে? আবু সুফিয়ান বললেন, এই এই কথা বলেছে। একথা শুনে হযরত ওসমান এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ বললেন, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমরা আশঙ্কা করছি যে, সা'দ কোরায়শদের মধ্যে খুন-খারাবি শুরু না করে? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, না আজতো এমন দিন যে, কাবার তাযিম করা হবে। আজ এমন দিন যে, আল্লাহ তায়ালা কোরায়শদের সম্মান দেবেন। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন সাহাবীকে পাঠিয়ে হযরত সা'দ এর হাত থেকে পতাকা নিয়ে নিলেন এবং তাঁর পুত্র কয়েস এর হাতে দিলেন। এতে মনে হলো পতাকা যেন হযরত সা'দ-এর হাতেই রয়ে গেছে। অন্য বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পতাকা হযরত যোবায়ের (রা.) এর হাতে দিয়েছিলেন।
কোরায়শদের দোরগোড়ায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সুফিয়ানের সামনে দিয়ে যাওয়ার পর হযরত আব্বাস (রা.) বললেন, আবু সুফিয়ান, এবার তুমি কওমের কাছে যাও। আবু সুফিয়ান দ্রুত মক্কায় গিয়ে পৌছালো এবং উচ্চ কণ্ঠে বললো, হে কোরায়শরা, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের কাছে এতো সৈন্য নিয়ে এসেছেন যে, মোকাবেলা করা অসম্ভব ব্যাপার। কাজেই যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপত্তা পাবে। একথা শুনে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হেন্দ বিনতে ওতবা উঠে দাঁড়িয়ে সামনে এসে আবু সুফিয়ানের গোঁফ নেড়ে বললো, তোমরা এই বুড়োকে মেরে ফেলো। খারাপ খবর নিয়ে আসা এই বুড়োর অকল্যাণ হোক।
আবু সুফিয়ান বললেন, তোমাদের সর্বনাশ হোক। দেখো তোমাদের জীবন বাঁচানোর ব্যাপারে এই মেয়েলোক তোমাদের যেন ধোঁকায় না ফেলে। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতো বিরাট বাহিনী নিয়ে এসেছেন যার মোকাবেলা করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। কাজেই, যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, তারা নিরাপদ। লোকেরা বললো, আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন। আমরা কয়জন তোমার ঘরে যেতে পারবো? আবু সুফিয়ান বললেন, যারা নিজের ঘরের দরোজা ভেতর থেকে বন্ধ করে রাখবে, তারাও নিরাপত্তা পাবে। যারা মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে, তারাও নিরাপত্তা পাবে। একথা শুনে লোকেরা নিজেদের ঘর এবং মসজিদে হারাম অর্থাৎ কাবাঘরের দিকে দৌড়াতে লাগলো। তবে মতলববাজ কোরায়শরা কিছু সংখ্যক মাস্তানজাতীয় উচ্ছৃঙ্খল লোককে লেলিয়ে দিয়ে বললো, আমরা এদের সামনে ঠেলে দিলাম। যদি কোরায়শরা কিছুটা সাফল্য লাভ করে, তবে আমরা এদের সাথে গিয়ে মিলিত হব। যদি এরা আহত হয়, তবে আমাদের কাছে তারা যা কিছু চাইবে, আমরা তাই দেবো। মুসলমানদের সাথে লড়াই করতে কোরায়শদের যেসব মাস্তান ও উচ্ছৃঙ্খল লোকেরা প্রস্তুত হলো সেসব নির্বোধ লোকের নেতা মনোনীত করা হলো একরামা ইবনে আবু জেহেল, সফওয়ান ইবনে উমাইয়া এবং সোহায়েল ইবনে আমরকে। এ তিনজনের নেতৃত্বে একদল কোরায়শ খান্দামায় সমবেত হলো। এদের মধ্যে বনু বকর গোত্রের হাম্মাস ইবনে কয়েস নামে একজন লোকও ছিলো। এর আগে সে অস্ত্র মেরামতের কাজ করতো। একদিন নিজ অস্ত্র মেরামতের সময় তার স্ত্রী বললো, তোমার এ প্রস্তুতি কিসের গো? হাম্মাস বললো, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের সাথে মোকাবেলা করার প্রস্তুতি। একথা শুনে তার স্ত্রী বললো, আল্লাহর শপথ, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের মোকাবেলা করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। হাম্মাস বললো, আল্লাহর শপথ, আমি আশা করি যে, তাঁর কয়েকজন সঙ্গীকে আমি তোমার দাস হিসাবে হাযির করতে পারব। ওরা যদি আজ মোকাবেলার জন্যে আসে, তবে ওদের মোকাবেলার জন্যে আমার কোন অজুহাত থাকবে না। পূর্ণাঙ্গ হাতিয়ার রয়েছে। ধারালো বর্শা, দু'ধারি তলোয়ার। খান্দামার যুদ্ধে এ লোকটিও উপস্থিত হয়েছিলো।
যি-তুবায় এদিকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাররাজ জাহরান থেকে রওয়ানা হয়ে যি-তুবায় পৌছুলেন। এ সময়ে আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত মর্যাদার কারণে বিনয় ও কৃতজ্ঞতায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা নীচু করে রেখেছিলেন। যি-তুবায় তিনি সৈন্য সমাবেশ করলেন। খালেদ ইবনে ওলীদকে নিজের ডানদিকে রাখলেন। এখানে আসলাম, সোলায়েম, গেফার, মোজাইনা এবং কয়েকটি আরব গোত্র ছিলো। খালেদ ইবনে ওলীদকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন মক্কার ঢালু এলাকায় প্রবেশ করেন। খালেদকে বললেন, যদি কোরায়শদের কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তাকে হত্যা করবে। এরপর তুমি সাফায় গিয়ে আমার সাথে দেখা করবে।
হযরত যোবায়ের ইবনে আওয়ামকে বামদিকে রাখলেন। তাঁর হাতে ছিলো রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পতাকা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে আদেশ দিলেন, তিনি যেন মক্কার উঁচু এলাকা অর্থাৎ কোদায় প্রবেশ করেন এবং হাজুনে তাঁর দেয়া পতাকা স্থাপন করে তাঁর আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।
পদব্রজে যারা এসেছিলেন তাদের পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছিলেন হযরত আবু ওবায়দা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদেশ দিলেন, তিনি যেন প্রান্তরের প্রান্তসীমার পথ ধরে অগ্রসর হন এবং মক্কায় তাঁরা অবতরণ করেন।
ইসলামী বাহিনীর মক্কায় প্রবেশ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ পাওয়ার পর সেনাপতিরা নিজ নিজ সৈন্যদের নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় চলে গেলেন।
হযরত খালেদ এবং তাঁর সঙ্গীদের পথে যেসব পৌত্তলিক আসছিলো, তাদের সাথে মোকাবেলা করে তাদের হত্যা করা হলো। হযরত খালেদের সাথী কারয ইবনে জাবের ফাহরি এবং খুনায়েস ইবনে খালেদ ইবনে রবিয়া শাহাদাত বরণ করেন। এরা দু'জন সেনাদল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য রাস্তায় চলে গিয়েছিলেন। সেখানে তাদের হত্যা করা হয়। খান্দামায় হযরত খালেদ এবং তাঁর সঙ্গীদের সাথে উচ্ছৃঙ্খল কোরায়শরা মুখোমুখি হলো। কিছুক্ষণ উভয় পক্ষে সংঘর্ষ হলো। এতে ১২ জন পৌত্তলিক নিহত হলো। এ ঘটনায় কোরায়শদের মনে আতঙ্ক ছেয়ে গেলো। মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতে সংকল্পবদ্ধ হাম্মাস ইবনে কয়েস দ্রুত ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। তাঁর স্ত্রীকে বললো, দরোজা বন্ধ রাখবে, খুলবে না। তার স্ত্রী বললো, আপনার সেই বাগাড়ম্বর গেলো কোথায়? হাম্মাস ইবনে কয়েস বললো, হায়রে, তুমি যদি খান্দামায় যুদ্ধের অবস্থা দেখতে, তবে এমন কথা বলতে না। তোমাকে কি আর বলবো, সফওয়ান আর একরামা ছুটে পলায়ন করলো। নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা করা হলো। সেই তলোয়ার গলা এবং মাথা এমনভাবে কাটছিলো যে, নিহতদের হৃদয়বিদায়ক চিৎকার এবং হৈহল্লা ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।
হযরত খালেদ (রা.) খান্দামায় শত্রুদের মোকাবেলার পর মক্কার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাফায় গিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মিলিত হলেন।
এদিকে হযরত যোবায়ের (রা.) সামনে অগ্রসর হয়ে হাজুল-এর মসজিদে ফতেহ-এর কাছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পতাকা স্থাপন করলেন এবং তাঁর অবস্থানের জন্যে একটি কোব্বা তৈরী করলেন। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যাওয়া পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করলেন।