📄 সন্ধি নবায়নের চেষ্টা
কোরায়শ এবং তার মিত্ররা যা করেছিলো সেটা ছিলো হোদায়বিয়ায় সন্ধির সুস্পষ্ট লংঘন এবং বিশ্বাসঘাতকতা। এর কোন বৈধতার অজুহাত দেখানো যাবে না। কোরায়শরাও সন্ধির বরখেলাফ করার কথা খুব শীঘ্র বুঝতে পেরেছিলো। তারা এই বিশ্বাসঘাতকতার পরিণাম চিন্তা করে এক পরামর্শ সভা আহ্বান করলো। সেই সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো যে, তারা তাদের নেতা আবু সুফিয়ানকে হোদায়বিয়ার সন্ধির নবায়নের জন্যে মদীনায় পাঠাবে।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরায়শদের সন্ধি লংঘন পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে সাহাবাদের আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমি যেন দেখতে পাচ্ছি যে, আবু সুফিয়ান সন্ধি পোক্ত এবং মেয়াদ বাড়ানোর জন্যে মদীনায় এসে পৌঁছেছে।
এদিকে আবু সুফিয়ান মদীনার উদ্দেশ্যে ওসফান নামক জায়গায় পৌঁছার পর বুদাইল ইবনে ওরাকার সাথে তার দেখা হলো। বুদাইল মদীনা থেকে মক্কা যাচ্ছিলো।
আবু সুফিয়ান ভেবেছিলো বুদাইল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে আসছে। তবু জিজ্ঞাসা করলো, কোথা থেকে আসছো বুদাইল? বুদাইল বললেন, আমি খোযাআর সাথে ওই উপকূলে গিয়েছিলাম। আবু সুফিয়ান জিজ্ঞাসা করলো, 'তুমি কি মোহাম্মদের কাছে যাওনি?' বুদাইল বললেন, 'না তো।' বুদাইল মক্কার পথে যাওয়ার পর আবু সুফিয়ান বললো, বুদাইল যদি মদীনায় গিয়ে থাকে, তবে তো তার উটকে মদীনার খেজুর খাইয়েছে। এরপর আবু সুফিয়ান বুদাইলের উট বসানোর জায়গায় গিয়ে উটের পরিত্যক্ত মল ভেঙ্গে সেখানে মদীনার খেজুরের বীচি দেখতে পেলো। এরপর বললো, আমি আল্লাহর কসম করে বলছি যে, বুদাইল মোহাম্মদের কাছে গিয়েছিলো।
মোটকথা আবু সুফিয়ান মদীনায় গেলো এবং তার কন্যা উম্মে হাবিবার ঘরে গিয়ে উঠলো। আবু সুফিয়ান রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিছানায় বসতে যাচ্ছিলো। এটা লক্ষ্য করে হযরত উম্মে হাবিবা (রা.) সাথে সাথে বিছানা গুটিয়ে ফেললেন। আবু সুফিয়ান বললো, মা, তুমি আমাকে এ বিছানার উপযুক্ত মনে করোনি না এ বিছানাকে আমার উপযুক্ত মনে করোনি?
হযরত উম্মে হাবিবা (রা.) বললেন, এটি হচ্ছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিছানা আর আপনি হচ্ছেন একজন নাপাক মোশরেক। আবু সুফিয়ান বললেন, খোদার কসম, আমার কাছে থেকে আসার পর তুমি খারাপ হয়ে গেছো।
এরপর আবু সুফিয়ান সেখান থেকে বেরিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কোন জবাব দিলেন না। আবু সুফিয়ান হযরত আবু বকরের কাছে গিয়ে তাকে অনুরোধ করলো, তিনি যেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আলোচনা করেন। হযরত আবু বকর (রা.) অসম্মতি প্রকাশ করলেন। আবু সুফিয়ান হযরত ওমর (রা.)-এর কাছে গিয়ে তাকে বললো তিনি যেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তাদের ব্যাপারে কথা বলেন। হযরত ওমর বললেন, (রা.), আমি কেন তোমাদের জন্যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সুপারিশ করবো। আল্লাহর শপথ, যদি আমি কাঠের টুকরো ছাড়া অন্য কিছু নাও পাই তবুও সেই - কাষ্টখন্ড দিয়ে তোমাদের সাথে জেহাদ করবো। আবু সুফিয়ান এরপর হযরত আলীর (রা.) কাছে গেলেন। হযরত ফাতেমা (রা.) সেখানে ছিলেন। হযরত হাসানও ছিলেন। তিনি ছিলেন তখন ছোট। হাঁটাচলা করছিলেন। আবু সুফিয়ান বললেন, হে আলী, তোমার সাথে আমার বংশগত সম্পর্ক সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। আমি একটা প্রয়োজনে এসেছি। হতাশ হয়ে এসেছি, হতাশ হয়ে ফিরে যেতে চাই না। তুমি আমার জন্যে মোহাম্মদের কাছে একটু সুপারিশ করো। হযরত আলী (রা.) বললেন, আবু সুফিয়ান, তোমার জন্যে আফসোস হয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটা ব্যাপারে সংকল্প করেছেন, এ ব্যাপারে আমরা তাঁর সাথে কোন কথা বলতে পারি না। আবু সুফিয়ান বিবি ফাতেমার (রা.) প্রতি তাকিয়ে বললেন, তুমি কি তোমার এ সন্তানকে এ মর্মে আদেশ করতে পারো যে, সে লোকদের মধ্যে আশ্রয়দানের ঘোষণা দিয়ে সব সময়ের জন্যে আরবদের সর্দার হবে? হযরত ফাতেমা (রা.) বললেন, আল্লাহর শপথ, আমার সন্তান লোকদের মধ্যে নেতা হওয়ার মতো ঘোষণা দেয়ার যোগ্য হয়নি। তাছাড়া রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপস্থিতিতে কেউ আশ্রয় দিতে পারে না।
সকল চেষ্টার ব্যর্থতার পর আবু সুফিয়ানের দু'চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে গেলো। তিনি সংশয় দোলায়িত চিত্তে কম্পিত কণ্ঠে হযরত আলীকে (রা.) বললেন, আবুল হাসান আমি লক্ষ্য করছি যে, বিষয়টা জটিল হয়ে পড়েছে। কাজেই আমাকে একটা উপায় বলে দাও। হযরত আলী (রা.) বললেন, আল্লাহর শপথ, আমি তোমার জন্যে কল্যাণকর কিছু জানি না। তুমি বনু কেনানা গোত্রের নেতা। তুমি দাঁড়িয়ে লোকদের মধ্যে নিরাপত্তার কথা ঘোষণা করে দাও, এরপর নিজের দেশে ফিরে যাও। আবু সুফিয়ান বললেন, তুমি কি মনে করো যে, এটা আমার জন্যে কল্যাণকর হবে? হযরত আলী (রা.) বললেন না, আমি তা মনে করি না। তবে, এছাড়া অন্য কোন উপায়ও আছে বলে মনে হয় না। এরপর আবু সুফিয়ান মসজিদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, হে লোকসকল, আমি তোমাদের মধ্যে নিরাপত্তার কথা ঘোষণা করছি। এরপর নিজের উটের পিঠে চড়ে মক্কায় চলে গেলেন।
কোরায়শদের কাছে গেলে তারা তাকে ঘিরে ধরে এবং মদীনার খবর জানতে চাইল। আবু সুফিয়ান বললেন, কথা বলেছি কিন্তু তিনি কোন জবাব দেননি। আবু কোহাফার পুত্রের কাছে গেছি তার মধ্যে ভালো কিছু পাইনি। ওমর ইবনে খাত্তাবের কাছে গেছি, তাকে মনে হয়েছে সবচেয়ে কট্টর দুশমন। আলীর কাছে গেলাম, তাকে সবচেয়ে নরম মনে হলো। তিনি আমাকে একটা পরামর্শ দিলেন আমি সে অনুযায়ী কাজ করলাম। জানি না সেটা কল্যাণকর হবে কিনা। লোকেরা জানতে চাইল সেটা কি? আবু সুফিয়ান বললেন, আলী পরামর্শ দিলেন আমি যেন নিরাপত্তার কথা ঘোষণা করি, অবশেষে আমি তাই করলাম।
কোরায়শরা বললো, মোহাম্মদ কি তোমার নিরাপত্তার ঘোষণাকে কার্যকর বলে ঘোষণা করেছে? আবু সুফিয়ান বললো, না তা করেনি। কোরায়শরা বললো, তোমার সর্বনাশ হোক। আলী তোমার সাথে স্রেফ রসিকতা করেছে। আবু সুফিয়ান বললো, আল্লাহর শপথ, এছাড়া অন্য কোন উপায় ছিলো না।
📄 মক্কা অভিমুখে মুসলিম বাহিনী
অষ্টম হিজরীর ১০ই রমযান। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ১০ হাজার সাহাবা। মদীনার তত্ত্বাবধানের জন্যে আবু রাহাম গেফারীকে নিযুক্ত করা হয়।
জাহাফা বা তার আরো কিছু এগিয়ে যাওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হযরত আব্বাসের সাথে দেখা। তিনি ইসলাম গ্রহণ করে সপরিবারে মদীনায় হিজরত করে যাচ্ছিলেন। আবওয়া নামক জায়গায় পৌঁছে তাঁর চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস এবং ফুফাতো ভাই আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়ার সাথে দেখা হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এরা উভয়ে তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দিয়েছিলো এবং কবিতা রচনা করে তাঁর নিন্দা করে বেড়াতো। এ অবস্থা দেখে হযরত উম্মে সালমা (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, আপনার চাচাতো ভাই ফুফাতো ভাই আপনার কাছে সবচেয়ে খারাপ হবে এটা সমীচীন নয়।
হযরত আলী (রা.) আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস এবং আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়াকে বললেন, তোমরা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে যাও এবং হযরত ইউসুফকে তাঁর ভাইয়েরা যে কথা বলেছিলেন সেকথা বলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিশ্চয়ই এটা পছন্দ করবেন না যে, অন্য কারো জবাব তাঁর চেয়ে উত্তম হবে। হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা তাঁকে বলেছিলেন, 'আল্লাহর শপথ, আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয়ই আপনাকে আমাদের ওপর প্রাধ্যান্য দিয়েছেন এবং আমরা নিশ্চয়ই অপরাধী ছিলাম।' (সূরা ইউসুফ, আয়াত ৯১)
আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস তাই করলেন। এই আয়াত শুনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বললেন, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নাই। 'তিনি দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু।' (সূরা ইউসুফ আয়াত, ৯২)
আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস এরপর কয়েক লাইন কবিতা আবৃত্তি করলেন, তার অর্থ হচ্ছে, 'তোমার বয়সের শপথ, আমি যখন লাত-এর শাহ সওয়ারকে মোহাম্মাদের শাহ সওয়ারের ওপর বিজয়ী করার উদ্দেশ্যে পতাকা তুলেছিলাম সে সময় আমার অবস্থা ছিলো রাতের পথহারা পথিকের মত। কিন্তু এখন আমাকে হেদায়াত দেয়ার সময় এসেছে, এখন আমি হেদায়াত পাওয়ার উপযুক্ত হয়েছি। আমার প্রবৃত্তির পরিবর্তে একজন হাদী আমাকে হেদায়াত দিয়েছেন এবং তিনি আমাকে আল্লাহর পথ দেখিয়েছেন। অথচ এই পথকে আমি ইতিপূর্বে সব সময় উপেক্ষা করেছিলাম।'
একথা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবেগে আবু সুফিয়ানের বুকে চাপড় মেরে বললেন, তুমি আমাকে সব ক্ষেত্রে উপেক্ষা করেছিলে। মাররুজ যাহারানে মুসলিম সেনাদল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সফর অব্যাহত রাখলেন। তিনি এবং সাহাবায়ে কেরাম সকলেই রোযা রেখেছিলেন। আসফান ও কোদায়েদের মধ্যবর্তী কোদায়েদ জলাশয়ের কাছে পৌঁছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোযা ভেঙ্গে ফেললেন। তাঁর দেখাদেখি সাহাবায়ে কেরামও রোযা ভাঙ্গলেন।
এরপর পুনরায় তাঁরা সফর করতে শুরু করলেন। রাতের প্রথম প্রহরে তাঁরা মারুরুজ জাহারান অর্থাৎ ফাতেমা প্রান্তরে গিয়ে পৌছুলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশে সাহাবারা পৃথকভাবে আগুন জ্বালালেন। এতে দশ হাজার চুলায় রান্না হচ্ছিলো। আল্লাহর রসুল পাহারার কাজে হযরত ওমরকে (রা.) নিযুক্ত করলেন।
টিকাঃ
৭. পরবর্তীকালে আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস একজন ভালো মুসলমান হয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে ইসলাম গ্রহণের পর লজ্জার কারণে তিনি রসূলের প্রতি চোখ তুলে তাকাননি। আল্লাহর রসূলও তাকে ভালোবাসতেন এবং তাকে বেহেশতের সুসংবাদ দিতেন। তিনি বলতেন, আমি আশা করি আবু সুফিয়ান হামজার মতো হবে। ইন্তেকালের সময় উপস্থিত হলে বললেন, আমার জন্য কেঁদো না। ইসলাম গ্রহণের পর আমি পাপ হওয়ার মতো কোন কথা বলিনি। (যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃ. ১৬২-১৬৩)
৮. সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড
📄 মাররুজ যাহরানে মুসলিম সেনাদল
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সফর অব্যাহত রাখলেন। তিনি এবং সাহাবায়ে কেরাম সকলেই রোযা রেখেছিলেন। আসফান ও কোদায়েদের মধ্যবর্তী কোদায়েদ জলাশয়ের কাছে পৌঁছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোযা ভেঙ্গে ফেললেন। ৮ তাঁর দেখাদেখি সাহাবায়ে কেরামও রোযা ভাঙ্গলেন।
এরপর পুনরায় তাঁরা সফর করতে শুরু করলেন। রাতের প্রথম প্রহরে তাঁরা মারুরুজ জাহারান অর্থাৎ ফাতেমা প্রান্তরে গিয়ে পৌছুলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশে সাহাবারা পৃথকভাবে আগুন জ্বালালেন। এতে দশ হাজার চুলায় রান্না হচ্ছিলো। আল্লাহর রসুল পাহারার কাজে হযরত ওমরকে (রা.) নিযুক্ত করলেন। আল্লাহর রসূলের সমীপে আবু সুফিয়ান
মাররুজ জাহরানে অবতরণের পর হযরত আব্বাস (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাদা খচ্চরের পিঠে আরোহণ করে ঘোরাফেরা করতে বেরোলেন। তিনি চাচ্ছিলেন যে, কাউকে পেলে মক্কায় খবর পাঠাবেন, যাতে করে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কায় প্রবেশের আগেই কোরায়শরা তাঁর কাছে এসে নিজেদের নিরাপত্তার আবেদন জানায়।
এদিকে আল্লাহ তায়ালা, কোরায়শদের কাছে কোন প্রকার খবর পৌঁছা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এ কারণে মক্কাবাসীরা কিছুই জানতে পারেনি। তবে তারা ভীতি-বিহ্বলতার মধ্যে এবং আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। আবু সুফিয়ান বাইরে এসে কোন নতুন খবর জানা যায় কিনা সে চেষ্টা করছিলো। সে সময় তিনি হাকিম বিন হাজাম এবং বুদাইল বিন ওরাকাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন খবর সংগ্রহের চেষ্টায় বেরিয়েছিলেন।
হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি হযরত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খচ্চরের পিঠে সওয়ার হয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আবু সুফিয়ান এবং বুদাইল ইবনে ওরাকার কথা শুনতে পেলাম। আবু সুফিয়ান বলছিলেন, আল্লাহর শপথ, আমি আজকের মতো আগুন এবং সৈন্যবাহিনী অতীতে কখনো দেখিনি। বুদাইল ইবনে ওরাকা বললো, আল্লাহর শপথ, ওরা হচ্ছে বনু খোযাআ।
যুদ্ধ ওদের লন্ড ভন্ড করে দিয়েছে। আবু সুফিয়ান বললেন, এতো আগুন এবং এতো বিরাট বাহিনী বনু খোযাআর থাকতেই পারে না।
হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি আবু সুফিয়ানের কণ্ঠস্বর শুনে বললাম, আবু হানজালা নাকি? আবু সুফিয়ান আমার কণ্ঠস্বর চিনে বললেন, আবুল ফযল নাকি? আমি বললাম, হাঁ। আবু সুফিয়ান বললেন, কি ব্যাপার? আমার পিতামাতা তোমার জন্যে কোরবান হোন। আমি বললাম, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সদলবলে এসেছেন। হায়রে কোরায়শদের সর্বনাশা অবস্থা। আবু সুফিয়ান বললেন, এখন কি উপায়? আমার পিতামাতা তোমার জন্যে কোরবান হোক। আমি বললাম, ওরা তোমাকে পেলে তোমার গর্দান উড়িয়ে দেবে। তুমি এই খচ্চরের পিছনে উঠে বসো। আমি তোমাকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে যাবো। তোমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দেবো। আবু সুফিয়ান তখন খচ্চরে উঠে আমার পিছনে বসলেন। তার অন্য দু'জন সাথী ফিরে গেলো।
হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি আবু সুফিয়ানকে নিয়ে চললাম, কোন জটলার কাছে গেলে লোকেরা বলতো, কে যায়? কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খচ্চরের পিঠে আমাকে দেখে বলতো, ইনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা, তাঁরই খচ্চরের পিঠে রয়েছেন। ওমর ইবনে খাত্তাবের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেন, কে? একথা বলেই আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমার পিছনে আবু সুফিয়ানকে দেখে বললেন, আবু সুফিয়ান? আল্লাহর দুশমন? আল্লাহর প্রশংসা করি, কোন প্রকার সংঘাত ছাড়াই আবু সুফিয়ান আমাদের কবযায় এসে গেছে। একথা বলেই হযরত ওমর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ছুটে গেলেন। আমিও খচ্চরকে জোরে তাড়িয়ে নিলাম। খচ্চর থেকে নেমে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলাম। ইতিমধ্যে হযরত ওমর (রা.) এলেন। তিনি এসেই বললেন, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ওই দেখুন আবু সুফিয়ান। আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই। হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি বললাম, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমি সুফিয়ানকে নিরাপত্তা দিয়েছি। পরে আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথা স্পর্শ করে বললাম, আল্লাহর শপথ, আজ রাতে আমি ছাড়া আপনার সাথে কেউ গোপন কথা বলতে পারবে না। আবু সুফিয়ানকে হত্যা করার অনুমতির জন্যে হযরত ওমর বারবার আবেদন জানালে আমি বললাম, থামো ওমর। আবু সুফিয়ান যদি বনি আদী ইবনে কা'ব এর লোক হতো, তবে এমন কথা বলতে না। হযরত ওমর বললেন, আব্বাস থামো। আল্লাহর শপথ, তোমার ইসলাম গ্রহণ আমার কাছে আমার পিতা খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় এবং এর একমাত্র কারণ এই যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তোমার ইসলাম গ্রহণ আমার পিতা খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণের চেয়ে অধিক পছন্দনীয়।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আব্বাস, আবু সুফিয়ানকে তোমার ডেরায় নিয়ে যাও। সকালে আমার কাছে নিয়ে এসো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ মতো আমি আবু সুফিয়ানকে আমার তাঁবুতে নিয়ে গেলাম। সকাল বেলা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে আবু সুফিয়ানকে নিয়ে গেলাম। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবু সুফিয়ান, তোমার জন্যে আফসোস, তোমার জন্যে কি এখনো একথা বোঝার সময় আসেনি যে, আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কোন মাবুদ নেই? আবু সুফিয়ান বললো, আমার পিতামাতা আপনার জন্যে কোরবান হোন, আপনি কতো উদার, কতো মহানুভব, কতো দয়ালু। আমি ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ থাকলে এই সময়ে আমার কিছু কাজে আসতো।
টিকাঃ
৮. সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড
📄 আল্লাহর রসূলের সমীপে আবু সুফিয়ান
মাররুজ জাহরানে অবতরণের পর হযরত আব্বাস (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাদা খচ্চরের পিঠে আরোহণ করে ঘোরাফেরা করতে বেরোলেন। তিনি চাচ্ছিলেন যে, কাউকে পেলে মক্কায় খবর পাঠাবেন, যাতে করে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কায় প্রবেশের আগেই কোরায়শরা তাঁর কাছে এসে নিজেদের নিরাপত্তার আবেদন জানায়।
এদিকে আল্লাহ তায়ালা, কোরায়শদের কাছে কোন প্রকার খবর পৌঁছা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এ কারণে মক্কাবাসীরা কিছুই জানতে পারেনি। তবে তারা ভীতি-বিহ্বলতার মধ্যে এবং আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। আবু সুফিয়ান বাইরে এসে কোন নতুন খবর জানা যায় কিনা সে চেষ্টা করছিলো। সে সময় তিনি হাকিম বিন হাজাম এবং বুদাইল বিন ওরাকাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন খবর সংগ্রহের চেষ্টায় বেরিয়েছিলেন।
হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি হযরত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খচ্চরের পিঠে সওয়ার হয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আবু সুফিয়ান এবং বুদাইল ইবনে ওরাকার কথা শুনতে পেলাম। আবু সুফিয়ান বলছিলেন, আল্লাহর শপথ, আমি আজকের মতো আগুন এবং সৈন্যবাহিনী অতীতে কখনো দেখিনি। বুদাইল ইবনে ওরাকা বললো, আল্লাহর শপথ, ওরা হচ্ছে বনু খোযাআ। যুদ্ধ ওদের লন্ড ভন্ড করে দিয়েছে। আবু সুফিয়ান বললেন, এতো আগুন এবং এতো বিরাট বাহিনী বনু খোযাআর থাকতেই পারে না।
হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি আবু সুফিয়ানের কণ্ঠস্বর শুনে বললাম, আবু হানজালা নাকি? আবু সুফিয়ান আমার কণ্ঠস্বর চিনে বললেন, আবুল ফযল নাকি? আমি বললাম, হাঁ। আবু সুফিয়ান বললেন, কি ব্যাপার? আমার পিতামাতা তোমার জন্যে কোরবান হোন। আমি বললাম, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সদলবলে এসেছেন। হায়রে কোরায়শদের সর্বনাশা অবস্থা। আবু সুফিয়ান বললেন, এখন কি উপায়? আমার পিতামাতা তোমার জন্যে কোরবান হোক। আমি বললাম, ওরা তোমাকে পেলে তোমার গর্দান উড়িয়ে দেবে। তুমি এই খচ্চরের পিছনে উঠে বসো। আমি তোমাকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে যাবো। তোমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দেবো। আবু সুফিয়ান তখন খচ্চরে উঠে আমার পিছনে বসলেন। তার অন্য দু'জন সাথী ফিরে গেলো।
হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি আবু সুফিয়ানকে নিয়ে চললাম, কোন জটলার কাছে গেলে লোকেরা বলতো, কে যায়? কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খচ্চরের পিঠে আমাকে দেখে বলতো, ইনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা, তাঁরই খচ্চরের পিঠে রয়েছেন। ওমর ইবনে খাত্তাবের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেন, কে? একথা বলেই আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমার পিছনে আবু সুফিয়ানকে দেখে বললেন, আবু সুফিয়ান? আল্লাহর দুশমন? আল্লাহর প্রশংসা করি, কোন প্রকার সংঘাত ছাড়াই আবু সুফিয়ান আমাদের কবযায় এসে গেছে। একথা বলেই হযরত ওমর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ছুটে গেলেন। আমিও খচ্চরকে জোরে তাড়িয়ে নিলাম। খচ্চর থেকে নেমে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলাম। ইতিমধ্যে হযরত ওমর (রা.) এলেন। তিনি এসেই বললেন, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ওই দেখুন আবু সুফিয়ান। আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই। হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আমি বললাম, হে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমি সুফিয়ানকে নিরাপত্তা দিয়েছি। পরে আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথা স্পর্শ করে বললাম, আল্লাহর শপথ, আজ রাতে আমি ছাড়া আপনার সাথে কেউ গোপন কথা বলতে পারবে না। আবু সুফিয়ানকে হত্যা করার অনুমতির জন্যে হযরত ওমর বারবার আবেদন জানালে আমি বললাম, থামো ওমর। আবু সুফিয়ান যদি বনি আদী ইবনে কা'ব এর লোক হতো, তবে এমন কথা বলতে না। হযরত ওমর বললেন, আব্বাস থামো। আল্লাহর শপথ, তোমার ইসলাম গ্রহণ আমার কাছে আমার পিতা খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় এবং এর একমাত্র কারণ এই যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তোমার ইসলাম গ্রহণ আমার পিতা খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণের চেয়ে অধিক পছন্দনীয়।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আব্বাস, আবু সুফিয়ানকে তোমার ডেরায় নিয়ে যাও। সকালে আমার কাছে নিয়ে এসো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ মতো আমি আবু সুফিয়ানকে আমার তাঁবুতে নিয়ে গেলাম। সকাল বেলা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে আবু সুফিয়ানকে নিয়ে গেলাম। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবু সুফিয়ান, তোমার জন্যে আফসোস, তোমার জন্যে কি এখনো একথা বোঝার সময় আসেনি যে, আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কোন মাবুদ নেই? আবু সুফিয়ান বললো, আমার পিতামাতা আপনার জন্যে কোরবান হোন, আপনি কতো উদার, কতো মহানুভব, কতো দয়ালু। আমি ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ থাকলে এই সময়ে আমার কিছু কাজে আসতো।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবু সুফিয়ান, তোমার জন্যে আফসোস, তোমার জন্যে কি এখনো একথা বোঝার সময় আসেনি যে, আমি আল্লাহর রসূল? আবু সুফিয়ান বললো, আমার পিতামাতা আপনার ওপর নিবেদিত হোন। আপনি কতো মহৎ, কতো দয়ালু, আত্মীয়স্বজনের প্রতি কতো যে সমবেদনশীল। আপনি যে প্রশ্ন করলেন, এ সম্পর্কে এখানো আমার মনে কিছু না কিছু খটকা রয়েছে। হযরত আব্বাস (রা.) বললেন, আরে শিরশ্ছেদ হওয়ার মতো অবস্থা হওয়ার আগে ইসলাম কবুল করো। একথা সাক্ষী দাও যে, আল্লাহ ব্যতীত এবাদাতের যোগ্য কেউ নেই এবং হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রসূল। হযরত আব্বাস (রা.)-এর একথা বলার পর আবু সুফিয়ান ইসলাম কবুল করে এবং সত্যের সাক্ষী হলেন।
হযরত আব্বাস বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আবু সুফিয়ান মর্যাদাবান লোক, কাজেই তাকে কোন মর্যাদা দেয়ার আবেদন জানাচ্ছি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ঠিক আছে, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ। যে ব্যক্তি নিজের ঘরে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে রাখবে সে নিরাপদ যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহ শরীফে প্রবেশ করবে, সেও নিরাপদ।