📄 গনীমতের সম্পদ বন্টন
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদীদের খয়বর থেকে বহিষ্কারের ইচ্ছা করেন। চুক্তির মধ্যেও এটা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু ইহুদীরা বললো, হে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আপনি আমাদের এই যমিনেই থাকতে দিন আমরা এর তত্ত্বাবধান করবো। এই ভূখন্ড সম্পর্কে আমরা আপনাদের চেয়ে বেশী অবগত।
এদিকে আল্লাহর রসূলের কাছে পর্যাপ্তসংখ্যক দাস ছিলো না, যারা এ জমি আবাদ এবং দেখাশোনা করতে পারে। এ কাজ করার মতো সময় সাহাবায়ে কেরামেরও ছিলো না। এসব কারণে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদীদের কাছে খয়বরের জমি বর্গা হিসেবে দেন। উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক মুসলমানরা পাবেন এ শর্ত দেয়া হয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যতোদিন চাইবেন, ততোদিন ইহুদীদের এ সুযোগ দেবেন। আবার যখন ইচ্ছা করবেন তাদের বহিষ্কার করবেন। এরপর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রওয়াহাকে খয়বরের জমির তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করা হয়।
খয়বরের বন্টন এভাবে করা হয়েছিলো যে, মোট জমি ৩৬ ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতি অংশ ছিলো একশত ভাগের সমন্বয়। এভাবে মোট জমি তিন হাজার ছয়শত অংশে ভাগ করা হয়। এর অর্ধেক অর্থাৎ আঠারশ ভাগ ছিলো মুসলমানদের। সাধারণ মুসলমানদের মতোই আল্লাহর রসূলেরও শুধু একটিমাত্র অংশ ছিলো। বাকি আঠারশ ভাগ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের জাতীয় প্রয়োজন এবং আকস্মিক কোন সমস্যা মোকাবেলার জন্যে পৃথক করে রেখেছিলেন। আঠারশত ভাগে বিভক্ত করার উদ্দেশ্য ছিলো এই যে, খয়বরের জমি ছিলো হোদায়বিয়ায় অংশগ্রহণকারীদের জন্যে আল্লাহর একটি বিশেষ দান।
উপস্থিত অনুপস্থিত সকলের জন্যেই এ দান ছিলো প্রযোজ্য। হোদায়বিয়ায় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ছিলো চৌদ্দশত। খয়বর আসার সময় তারা দুইশত ঘোড়া সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। সওয়ার ছাড়া ঘোড়ার জন্যেও একাংশ বরাদ্দ থাকে। ঘোড়ার অংশ একজন সৈনিকের দ্বিগুণ। এ কারণে খয়বরকে আঠারশ ভাগে ভাগ করা হয়। এর ফলে প্রত্যেক ঘোড় সওয়ার তিনভাগ হিসেবে ছয়শত ভাগ পান। আর বারোশত পদব্রজের সৈনিক বারোশত অংশ পান।
খয়বরে প্রাপ্ত গনীমতের প্রাচুর্যের বিবরণ বোখারী শরীফের একটি হাদীসে পাওয়া যায়। মারবি ইবনে ওমর (রা.) বলেন, খয়বর জয়ের আগ পর্যন্ত আমরা পরিতৃপ্ত হতে পারিনি। হযরত আয়শা (রা.) বলেন, খয়বর বিজয়ের পর আমরা বলাবলি করলাম যে, এখন থেকে আমরা পেটভরে খেজুর খেতে পারবো।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় ফিরে আসার পর মোহাজেররা তাদেরকে আনসারদের প্রদত্ত খেজুর গাছ ফিরিয়ে দেন। কেননা খয়বরে তারা ধন-সম্পদ এবং খেজুর গাছের মালিকানা লাভ করেছিলো।
টিকাঃ
১৭. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ১৩৭-১৩৮
১৮. সহীহ বোখারী, ৩য় খন্ড, পৃ. ৬০৯
১৯. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ১২৮ সহীহ মুসলিম, ২য় খন্ড, পৃ. ৯৬
📄 কতিপয় সাহাবার আগমন
এই যুদ্ধে হযরত জাফর ইবনে আবু তালেব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাযির হন। তাঁর সাথে আশআরি মুসলমান অর্থাৎ হযরত আবু মূসা আশআরি (রা.) এবং তাঁর বন্ধু-বান্ধবও ছিলেন।
হযরত আবু মূসা আশআরি (রা.) বলেন, ইয়েমেনে থাকার সময়ে আমি আল্লাহর রসূলের আবির্ভাবের খবর পেয়েছিলাম। আমি এবং আমার দুই ভাই আমাদের গোত্রের ৫০ জন সহ একটি নৌকায় আরোহণ করে আল্লাহর রসূলের কাছে হাযির হওয়ার জন্যে রওয়ানা হলাম। কিন্তু নৌকা আমাদেরকে হাবশায় নিয়ে পৌঁছাল। সেখানে হযরত জাফর (রা.) এবং তাঁর বন্ধুদের সাথে দেখা হলো। তারা জানালেন যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের পাঠিয়েছেন এবং হাবশায় থাকতে বলেছেন, আপনারাও আমার সাথে থাকুন। আমরা তখন সেখানে থাকলাম। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খয়বর জয় করার পর তাঁর কাছে হাযির হলাম। তিনি আমাদেরকেও অংশ দিলেন। আমরা ব্যতীত খয়বরে অনুপস্থিত অন্য কোন মুসলমান খয়বরের অংশ পাননি। যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীরাই শুধু গনীমতের মালের অংশ পেয়েছিলেন। হযরত জাফর এবং তাঁর সঙ্গীদের সাথে আমাদের নৌকার মাঝিরাও ভাগ পেয়েছিলেন। এদের সকলের মধ্যেই গনীমতের মাল বন্টন করা হয়েছিলো।
টিকাঃ
২০. বোখারী, ১ম খন্ড, ফতহুল বারী, ৪র্থ খন্ড।
📄 হযরত সফিয়ার সাথে বিয়ে
ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বামীকে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে হত্যা করার পর হযরত সফিয়্যা বন্দী মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত হন। বন্দী মহিলাদের একত্রিত করার পর হযরত দেহইয়া ইবনে খলিফা কালবী (রা.) আল্লাহর রসূলের কাছে একজন দাসী চান। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যাও একজনকে পছন্দ করো। হযরত দেহিয়া হযরত সফিয়্যাকে পছন্দ করলেন। এরপর একজন লোক এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আপনি বনু কোরায়যা এবং বনু নাযির গোত্রের নেত্রীকে দেহিয়্যার জন্যে মনোনীত করেছেন অথচ তিনি একমাত্র আপনারই উপযুক্ত। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, উভয়কে ডেকে নিয়ে এসো। উভয়ে হাযির হলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত দেহইয়াকে বললেন, অন্য কোন দাসীকে তুমি পছন্দ করো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সফিয়্যাকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি হৃষ্ট চিত্তে ইসলাম কবুল করেন। এরপর তিনি হযরত সফিয়্যাকে আযাদ করে দেন এবং তার আযাদীকে মোহরানা নির্ধারণ করে তাকে বিবাহ করেন। মদীনায় পৌছার পথে হযরত উম্মে ছুলাইই (রা.) হযরত সফিয়্যাকে সজ্জিত করেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরদিন সকালে খেজুর, ঘি এবং ছাতু দিয়ে সাহাবাদের মেহমানদারী করেন। হযরত সফিয়্যার চেহারায় দাগ দেখে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কারণ জানত চান। হযরত সফিয়্যা বলেন, হে আল্লাহর রসূল আপনার খয়বরে যাওয়ার আগে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম যে, চাঁদ আকাশ থেকে আমার কোলে এসে পড়েছে। আমার স্বামীর কাছে সকালে এই স্বপ্নের কথা বললে তিনি আমাকে চড় দিয়ে বললেন, তুমি কি মদীনার বাদশাহকে পেতে চাও।
টিকাঃ
২০. বোখারী, ১ম খন্ড, ফতহুল বারী, ৪র্থ খন্ড।
২৩. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৪, যাদুল মায়াদ ২য় খন্ড, পৃ. ১'৩৭
২৪. সহীহ বোখারী, যাদুল মায়াদ ইবনে হিশাম।
📄 বিষ মিশ্রিত গোশতের ঘটনা
খয়বর বিজয়ের পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিশ্চিত হলেন। এ সময় সালাম ইবনে মুশকিম এর স্ত্রী যয়নব বিনতে হারেছ তাঁর কাছে বকরির ভুনা গোশত উপঢৌকন হিসেবে পাঠায়। সেই মহিলা আগেই খবর নিয়েছিলো যে, আল্লাহর রসূল বকরির কোন অংশ বেশী পছন্দ করেন। শোনার পর পছন্দনীয় অংশে বেশী করে বিষ মেশায়। অন্যান্য অংশেও বিষ মেশায়। এরপর আল্লাহর রসূলের সামনে এনে সেই বিষ মিশ্রিত গোশত রেখে দেয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পছন্দনীয় অংশের একটুকরো মুখে দেন। কিন্তু চিবিয়েই তিনি ফেলে দেন। তিনি এরপর বললেন, এই যে হাড় দেখছো এই হাড় আমাকে বলছে যে, আমার মধ্যে বিষ মেশানো রয়েছে। যয়নবকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করা হলো, সে স্বীকার করলো। তিনি বললেন, তুমি কেন একাজ করেছ? মহিলা বললো, আমি ভেবেছিলাম যদি এই ব্যক্তি বাদশাহ হন, তবে আমরা তার শাসন থেকে মুক্তি পাবো, আর যদি এই ব্যক্তি নবী হন, তবে আমার বিষ মেশানোর খবর তাকে জানিয়ে দেয়া হবে। এ নির্জলা স্বীকারোক্তি শুনে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই মহিলাকে ক্ষমা করে দিলেন।
এ ঘটনার সময় আল্লার রসূলের সাথে হযরত বাশার ইবনে বারা ইবনে মারুরও ছিলেন। তিনি এক লোকমা খেয়েছিলেন। এতে তিনি বিষক্রিয়ায় ইন্তেকাল করেন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই মহিলাকে ক্ষমা না হত্যা করেছিলেন, এ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। একাধিক বর্ণনার সমন্বয় এভাবে করা হয়েছে যে, প্রথমে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ক্ষমা করলেও, হযরত বাশার-এর ইন্তেকালের পর কেসাসস্বরূপ তাকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
টিকাঃ
২৫. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ১৩৯, ফতহুল বারী, সপ্তম খন্ড, পৃ. ৪৯৭ ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৩৩৭