📄 সায়াব ইবনে মোয়ায দূর্গ জয়
নায়েম দুর্গ জয়ের পর সায়াব দুর্গ ছিলো নিরাপত্তা ও শক্তির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দুর্ভেদ্য দুর্গ। মুসলমানরা হযরত হোবাব ইবনে মুনযের আনসারীর (রা.) নেতৃত্বে এ দুর্গে হামলা করেন এবং তিনদিন যাবত অবরোধ করে রাখেন। তৃতীয় দিনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দুর্গ জয়ের জন্যে বিশেষভাবে দোয়া করেন।
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, আসলাম গোত্রের শাখা বনু ছাহামের লোকেরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাযির হয়ে আরজ করলো যে, আমরা দূর দূর হয়ে গেছি, আমাদের কাছে কিছু নেই। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরম করুণাময়ের কাছে বললেন, হে আল্লাহ তায়ালা, তুমি ওদের অবস্থা জানো। তুমি জানো যে, ওদের মধ্যে শক্তি নেই, আর আমার কাছে এমন কিছু নেই যে ওদের দেবো। হে আল্লাহ তায়ালা, ইহুদীদের এমন দুর্গ জয় করিয়ে আমাদের সাহায্য করো যে দুর্গ জয় আমাদের জন্যে সর্বাধিক ফলপ্রসূ হয়, যে দুর্গে সবচেয়ে বেশী খাদ্য-সামগ্রী ও চর্বি পাওয়া যায়। আল্লাহর রসূলের এই দোয়ার পর সাহাবারা হামলা করলেন। আল্লাহ রব্বুল আলামীন ছা'ব ইবনে মায়া'য দুর্গ জয়ের গৌরব মুসলমানদের দান করলেন। এ দুর্গের চেয়ে অধিক খাদ্য দ্রব্য এবং চর্বি খয়বরের অন্য কোন দুর্গে ছিলো না।
দোয়া করার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদেরকে এই দুর্গের ব্যাপারে নির্দেশ দেন। নির্দেশ পালনে বনু আসলাম গোত্রের লোকেরা ছিলেন অগ্রণী। এখানে দুর্গের সামনে উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয়। তবুও সেদিনই সূর্যাস্তের আগে দুর্গ জয় করা সম্ভব হয়। মুসলমানরা সেই দুর্গে ক্ষেপণাস্ত্র এবং কাঠের তৈরী ট্যাঙ্ক লাভ করেন।
ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় এক্ষেত্রে প্রচন্ড লড়াই এর বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্গ জয়ের পর মুসলমানরা গাধা যবাই করেন এবং উনুনে কড়াই চাপিয়ে দেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ খবর পাওয়ার পর পালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেন।
টিকাঃ
১২. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ২৩২
১৩. এখানে 'দাবাবে' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এ শব্দের অর্থ হচেছ ট্যাঙ্ক। কাঠের তৈরী নিরাপদ বন্ধ গাড়ীর ভেতর দিয়ে লোক প্রবেশ করে দুর্গের দেয়ালের কাছে পৌছুতে পারে এবং শত্রুর হামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। এছাড়া দেয়ালে বড় ছিদ্র করারও ব্যবস্থা রয়েছে।
📄 যোবায়ের দুর্গ জয়
নায়েম এবং ছাবা দুর্গ জয়ের পর ইহুদীরা নাজাতের সকল দুর্গ থেকে বেরিয়ে যোবায়ের দুর্গে সমবেত হয়। এটি ছিলো একটি নিরাপদ ও সংরক্ষিত দুর্গ। পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত এই দুর্গে ওঠার পথ ছিলো খুবই বন্ধুর। কোন সওয়ারী নিয়ে ওঠাতো সম্ভবই ছিলো না পায়ে হেঁটে ওঠাও ছিলো খুবই কষ্টসাধ্য। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনদিন পর্যন্ত দুর্গ অবরোধ করে রাখেন। এরপর একজন হৃদয়বান ইহুদী এসে বললো, হে আবুল কাশেম, আপনি যদি একমাস যাবত দুর্গ অবরোধ করে রাখেন তবুও ইহুদীরা পরোয়া করবে না। তবে তাদের পানির ঝর্ণা নীচে রয়েছে। রাতের বেলা তারা এসে পানি পান করে এবং সারাদিনের প্রয়োজনীয় পানি তুলে নিয়ে যায়। আপনি যদি ওদের পানি বন্ধ করে দিতে পারেন, তবে তারা নত হবে। এ খবর পেয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওদের পানি বন্ধ করে দিলেন। ইহুদীদের তখন টনক নড়লো। তারা নীচে নেমে এসে প্রচন্ড যুদ্ধে লিপ্ত হলো। এতে কয়েকজন মুসলমানও শাহাদাত বরণ করলেন এবং দশজন ইহুদী দুর্বৃত্ত নিহত হলো। সবশেষে এ দুর্গেরও পতন হলো।
📄 উবাই দুর্গ জয় ও নেযার দুর্গ জয়
যোবায়ের দুর্গের পতনের পর ইহুদীরা উবাই দুর্গে গিয়ে সমবেত হয়। মুসলমানরা সেই দুর্গও অবরোধ করেন। এবার শক্তিগর্বে গর্বিত দুইজন ইহুদী পর্যায়ক্রমে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার আহবান জানায়। উভয়েই মুসলমানদের হাতে নিহত হয়। দ্বিতীয় ইহুদীর হত্যাকারী ছিলেন লাল পট্টিধারী বিখ্যাত যোদ্ধা সাহাবী হযরত আবু দোজানা সাম্মাক ইবনে খারশা আনসারী (রা.)। তিনি দ্বিতীয় ইহুদীকে হত্যা করে দ্রুত বেগে দুর্গে প্রবেশ করেন।
তাঁর সাথে সাহাবারাও ভেতরে গিয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে। কিছুক্ষণ তুমুল যুদ্ধের পর ইহুদীরা দুর্গ থেকে সরে যেতে শুরু করে। অবশেষে সবাই গিয়ে নেওয়ার দুর্গে সমবেত হয়। নেযার দুর্গ ছিলো খয়বরের প্রথম ভাগের সর্বশেষ দুর্গ।
নেজার দুর্গ জয়
এ দুর্গও ছিলো সুরক্ষিত ও নিরাপদ। ইহুদীদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে, মুসলমানরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেও এ দুর্গে প্রবেশ করতে পারবে না। তাই এতে তারা নারী ও শিশুদের সমবেত করেছিলো, অন্য কোন দুর্গে রাখেনি।
মুসলমানরা এ দুর্গে কঠোর অবরোধ আরোপ এবং ইহুদীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। একটি উঁচু পাহাড়ী এলাকায় অবস্থিত এ দুর্গে প্রবেশে মুসলমানরা সুবিধা করতে পারলেন না। ইহুদীরা দুর্গ থেকে বেরিয়ে মুসলমানদের সাথে মোকাবেলা করতেও সাহস পাচ্ছিলো না। তবে উপর থেকে তীর নিক্ষেপ এবং পাথর নিক্ষেপ করে তীব্র মোকাবেলা করে যাচ্ছিলো।
নেজার দুর্গ জয় কঠিন হওয়ায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের নির্দেশ দেন। কয়েকটি গোলা নিক্ষেপও করা হয়। এতে দুর্গ দেয়ালে ছিদ্র হয়ে যায়। সেই ছিদ্রপথে মুসলমানরা ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর দুর্গের ভেতরে উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ইহুদীরা পরাজিত হয়। অন্যান্য দুর্গের মতোই এ দুর্গ থেকেও ইহুদীরা চুপিসারে সটকে পড়ে। নারী ও শিশুদেরকে মুসলমানদের দয়ার ওপর ছেড়ে দিয়ে তারা নিজেদের প্রাণ রক্ষা করে।
এ মজবুত দুর্গ জয়ের মাধ্যমে মুসলমানরা খয়বরের প্রথম অর্ধেক অর্থাৎ নাজাত ও শেক এলাকা জয় করেন। এখানে ছোট ছোট অন্য কয়েকটি দুর্গও ছিলো। কিন্তু এ দুর্গের পতনের পর ইহুদীরা অন্যান্য দুর্গও খালি করে দেয় এবং খয়বরের দ্বিতীয় অংশ কাতীবার দিকে পালিয়ে যায়।
📄 খয়বরের দ্বিতীয় ভাগ জয় ও সন্ধির আলোচনা
নাতাত এবং শেক এলাকা জয়ের পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোতায়বা, অতীহ এবং সালালেম এলাকা অভিমুখে রওয়ানা হন। সালালেম ছিলো বনু নাজিরের কুখ্যাত ইহুদী আবুল হাকিকের দুর্গ। এদিকে নাতাত এবং শেক এলাকা থেকে পলায়নকারী সকল ইহুদীও এখানে এসে পৌঁছে দুর্গদ্বার বন্ধ করে দিয়েছিলো।
যুদ্ধ বিষয়ক বিবরণ সম্বলিত গ্রন্থাবলীতে মতভেদ রয়েছে যে, এখানের তিনটি দুর্গের কোন দুর্গে যুদ্ধ হয়েছিলো। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, কামুস দুর্গ জয় করতে যুদ্ধ হয়েছিলো। বর্ণনা দ্বারাও বোঝা যায় যে, এ দুর্গ যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করা হয়েছে। ইহুদীদের পক্ষ থেকে আত্মসমর্পণের জন্যে এখানে আলাপ আলোচনাও হয়নি।
ওয়াকেদী সুস্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন যে, এ এলাকার তিনটি দুর্গই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মুসলমানদের হাতে অর্পণ করা হয়। সম্ভবত কামুস দুর্গ অর্পণের জন্যে কিছুটা যুদ্ধের পর আলাপ- আলোচনা হয়। অবশ্য অন্য দুটি দুর্গ যুদ্ধ ছাড়াই মুসলমানদের হাতে দেয়া হয়।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই এলাকায় অর্থাৎ কোতায়বায় আগমনের পর সেখানের অধিবাসীদের কঠোরভাবে অবরোধ করেন। চৌদ্দদিন যাবত এ অবরোধ অব্যাহত থাকে। ইহুদীরা তাদের দুর্গ থেকে বেরোচ্ছিলো না। পরে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের নির্দেশ দেন। ইহুদীরা যখন বুঝতে পারলো যে, ক্ষেপণাস্ত্রের গোলা বর্ষণে তাদের ধ্বংস অনিবার্য, তখন তারা আল্লাহর রসূলের সাথে সন্ধির জন্যে আলোচনায় এগিয়ে আসে।
সন্ধির আলোচনা
প্রথমে ইবনে আবুল হাকিক রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পয়গাম পাঠায় যে, আমি কি আপনার কাছে এসে কথা বলতে পারি? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হাঁ। অনুমতি পাওয়ার পর আবুল হাকিক এই শর্তে সন্ধি প্রস্তাব পেশ করে যে, দুর্গে যেসকল সৈন্য রয়েছে তাদের প্রাণ ভিক্ষা দেয়া হবে এবং তাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাও তাদের কাছেই থাকবে। অর্থাৎ তারা মুসলমানদের দাস-দাসী হিসেবে বন্দী থাকবে না। তারা নিজেদের অর্থ- সম্পদ সোনা-রূপা, জায়গা-জমি, ঘোড়া, বর্ম ইত্যাদি সব কিছু আল্লাহর রসূলের কাছে অর্পণ করবে, শুধু পরিধানের পোশাক নিয়ে বেরিয়ে যাবে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ প্রস্তাব শুনে বললেন, যদি তোমরা কিছু লুকাও, তবে সে জন্যে আল্লাহ তায়ালা এবং তার রসূল দায়ী হবেন না। ইহুদীরা এ শর্ত মেনে নেয় এবং সন্ধি হয়ে যায়। এভাবে খয়বর জয় চূড়ান্তরূপ লাভ করে।
টিকাঃ
১৪. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ৩৩১, ৩৩৬, ৩৩৭
১৫. সুনানে আবু দাউদে উল্লেখ রয়েছে যে, আল্লাহর রসূল এ শর্তে রাজি হয়েছিলেন যে, ইহুদীরা তাদের সওয়ারীর ওপর যতোটা সম্ভব অর্থ-সম্পদ নিয়ে যাবে। দেখুন আবু দাউদ, ২য় খন্ড, খয়বর প্রসঙ্গ। পৃ. ৭৬।