📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 সংঘাতের সূচনা এবং নায়েম দুর্গ বিজয়

📄 সংঘাতের সূচনা এবং নায়েম দুর্গ বিজয়


প্রথম ভাগের দুর্গগুলোতেই যুদ্ধ হয়েছে। অন্যান্য দুর্গের তিনটি দুর্গ যোদ্ধা থাকা সত্তেও যুদ্ধ ছাড়াই মুসলমানদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিলো।
সংঘাতের সূচনা এবং নায়েম দুর্গ বিজয়
উল্লিখিত আটটি দুর্গের মধ্যে প্রথমে নায়েম দুর্গের ওপর হামলা করা হয়। এ সকল দুর্গ অবস্থান এবং কৌশলগত দিক থেকে ইহুদীদের প্রথম লাইনের প্রতিরক্ষাব্যূহ হিসেবে বিবেচিত হতো। এ দুর্গের মালিক ছিলো মারহাব নামে এক দুর্ধর্ষ ইহুদী তাকে এক হাজার পুরুষের শক্তি- সামর্থসম্পন্ন বীর মনে করা হতো।
হযরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা.) মুসলমান সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে এ দুর্গের সামনে গিয়ে ইহুদীদের ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তারা ইসলামের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলো। নিজেদের বাদশাহ মারহাবের নেতৃত্বে তারা মুসলমানদের মোকাবেলায় এসে দাঁড়ালো।
রণাঙ্গনে এসে মারহাব নামের এক বীর এককভাবে মুখোমুখি যুদ্ধের আহ্বান জানালো। সালমা ইবনে আকওয়ার বর্ণনায় এভাবে উল্লেখ রয়েছে, আমরা খয়বরে পৌঁছার পর খয়বরের অধিবাসীদের বাদশাহ মারহাব তলোয়ার নিয়ে অহংকার প্রকাশ করতে করতে এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠে ছিলো স্পর্ধিত আবৃত্তিসম্বলিত এ কবিতা, 'খয়বর জানে মারহাব আমি অস্ত্র সাজে সজ্জিত অনন্য আমি বীর রণকৌশলে অভিজ্ঞতা কাজে লাগাই যুদ্ধের আগুন উঠলে জ্বলে।' তা মোকাবেলায় আমার চাচা হযরত আমের (রা.) এগিয়ে গেলেন। তিনি আবৃত্তি করলেন, 'খয়বর জানে আমার নাম আমের অস্ত্র সাজে সজ্জিত বীর সেনানী যুদ্ধের।'
মুখোমুখি হওয়ার পর একজন অন্যজনের ওপর আঘাত হানলো। মারহাবের শাণিত তলোয়ার আমার চাচা আমেরের ঢালের ওপর আঘাত করলো। ইহুদী মারহাবকেও আমার চাচা নীচের দিকে আঘাত করতে চাইলেন কিন্তু তার তলোয়ার ছিলো ছোট। তিনি মারহাবের উরুতে আঘাত করতে চাইলে তলোয়ার ধাক্কা খেয়ে তাঁর নিজের হাঁটুতে লাগলো। অবশেষে এই আঘাতেই তিনি ইন্তেকাল করেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দু'টি পবিত্র আঙ্গুল তুলে বললেন, ওর জন্যে রয়েছে দুই রকমের পুরস্কার। হযরত আমের (রা.) ছিলেন অনন্য রণকুশল মোজাহিদ। তার মতো আরব বীর পৃথিবীতে কমই এসেছেন।
হযরত আমের (রা.) আহত হওয়ার পর মারহাবের মোকাবেলায় এগিয়ে গেলেন হযরত আলী (রা.)। তিনি আবৃত্তি করছিলেন এ কবিতা, 'জানো আমি কে, আমার নাম আমার মা রেখেছেন হায়দর বনের বাঘের মতোই আমি ভয়ঙ্কর হানবো আমি আঘাত পূর্ণতর।'
এরপর হযরত আলী (রা.) মারহাবের ঘাড় লক্ষ্য করে এমন আঘাত করলেন যে, কমিনা ইহুদী সেখানেই শেষ হলো। হযরত আলীর (রা.) হাতেই বিজয় অর্জিত হলো।
যুদ্ধের সময় হযরত আলী (রা.) ইহুদীদের একটি দুর্গের কাছে গেলে একজন ইহুদী দুর্গের ওপর থেকে জিজ্ঞাসা করলো যে, তুমি কে? হযরত আলী (রা.) বললেন, আমি আলী ইবনে আবু তালেব। ইহুদী বললো, হযরত মূসার ওপর অবতীর্ণ কেতাবের শপথ, তোমরা বুলন্দ হয়েছ। এরপর মারহাবের ভাই ইয়াসের এগিয়ে এসে বললো, কে আছো যে আমার মোকাবেলা করবে? এ চ্যালেঞ্জে সাড়া দিলেন হযরত যোবায়ের (রা.)।
এ দৃশ্য দেখে হযরত যোবায়েরের (রা.) মা হযরত ছফিয়া (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আমার পুত্র কি নিহত হবে? আল্লাহর রসূল বললেন, না বরং তোমার পুত্র তাকে হত্যা করবে। অবশেষে হযরত যোবায়ের (রা.) ইয়াসেরকে হত্যা করলেন।
এরপর হেছনে নায়েমের কাছে তুমুল যুদ্ধ হলো। অন্য ইহুদীরা মুসলমানদের মোকাবেলায় সাহসী হলো না। কোন কোন গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, এ যুদ্ধ কয়েকদিনব্যাপী চলেছিলো এবং মুসলমানদের যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছিলো। তবুও ইহুদীরা মুসলমানদের পরাস্ত করতে ব্যর্থ হলো। ফলে চুপিসারে তারা দুর্গ ছেড়ে ছা'ব দুর্গে পালিয়ে গেলো। মুসলমানরা তখন সহজেই নায়েম দুর্গ অধিকার করলেন।

টিকাঃ
১০. সহীহ মুসলিম, খয়বর যুদ্ধ অধ্যায়, ২য় খন্ড, পৃ. ১২২- গাজওয়া জিকারদ, ২য় কন্ড, পৃ. ১১৫, সহীহ বোখারী, খয়বর যুদ্ধ অধ্যায় ২য় খন্ড, ৬০৩
১১. মারহাবের হত্যাকারী সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। সে কত তারিখে নিহত হয়েছিলো এবং সে দুর্গ কত তারিখে জয় হয়েছিলো সে সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। বোখারী ও মুসলিম শরীফের বর্ণনার প্রক্রিয়ায় পার্থক্য বিদ্যমান। উপরোল্লিখিত বিবরণ সহীহ বোখারী অনুযায়ী উল্লেখ করা হয়েছে।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 সায়াব ইবনে মোয়ায দূর্গ জয়

📄 সায়াব ইবনে মোয়ায দূর্গ জয়


নায়েম দুর্গ জয়ের পর সায়াব দুর্গ ছিলো নিরাপত্তা ও শক্তির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দুর্ভেদ্য দুর্গ। মুসলমানরা হযরত হোবাব ইবনে মুনযের আনসারীর (রা.) নেতৃত্বে এ দুর্গে হামলা করেন এবং তিনদিন যাবত অবরোধ করে রাখেন। তৃতীয় দিনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দুর্গ জয়ের জন্যে বিশেষভাবে দোয়া করেন।
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, আসলাম গোত্রের শাখা বনু ছাহামের লোকেরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাযির হয়ে আরজ করলো যে, আমরা দূর দূর হয়ে গেছি, আমাদের কাছে কিছু নেই। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরম করুণাময়ের কাছে বললেন, হে আল্লাহ তায়ালা, তুমি ওদের অবস্থা জানো। তুমি জানো যে, ওদের মধ্যে শক্তি নেই, আর আমার কাছে এমন কিছু নেই যে ওদের দেবো। হে আল্লাহ তায়ালা, ইহুদীদের এমন দুর্গ জয় করিয়ে আমাদের সাহায্য করো যে দুর্গ জয় আমাদের জন্যে সর্বাধিক ফলপ্রসূ হয়, যে দুর্গে সবচেয়ে বেশী খাদ্য-সামগ্রী ও চর্বি পাওয়া যায়। আল্লাহর রসূলের এই দোয়ার পর সাহাবারা হামলা করলেন। আল্লাহ রব্বুল আলামীন ছা'ব ইবনে মায়া'য দুর্গ জয়ের গৌরব মুসলমানদের দান করলেন। এ দুর্গের চেয়ে অধিক খাদ্য দ্রব্য এবং চর্বি খয়বরের অন্য কোন দুর্গে ছিলো না।
দোয়া করার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদেরকে এই দুর্গের ব্যাপারে নির্দেশ দেন। নির্দেশ পালনে বনু আসলাম গোত্রের লোকেরা ছিলেন অগ্রণী। এখানে দুর্গের সামনে উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয়। তবুও সেদিনই সূর্যাস্তের আগে দুর্গ জয় করা সম্ভব হয়। মুসলমানরা সেই দুর্গে ক্ষেপণাস্ত্র এবং কাঠের তৈরী ট্যাঙ্ক লাভ করেন।
ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় এক্ষেত্রে প্রচন্ড লড়াই এর বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্গ জয়ের পর মুসলমানরা গাধা যবাই করেন এবং উনুনে কড়াই চাপিয়ে দেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ খবর পাওয়ার পর পালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেন।

টিকাঃ
১২. ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ২৩২
১৩. এখানে 'দাবাবে' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এ শব্দের অর্থ হচেছ ট্যাঙ্ক। কাঠের তৈরী নিরাপদ বন্ধ গাড়ীর ভেতর দিয়ে লোক প্রবেশ করে দুর্গের দেয়ালের কাছে পৌছুতে পারে এবং শত্রুর হামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। এছাড়া দেয়ালে বড় ছিদ্র করারও ব্যবস্থা রয়েছে।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 যোবায়ের দুর্গ জয়

📄 যোবায়ের দুর্গ জয়


নায়েম এবং ছাবা দুর্গ জয়ের পর ইহুদীরা নাজাতের সকল দুর্গ থেকে বেরিয়ে যোবায়ের দুর্গে সমবেত হয়। এটি ছিলো একটি নিরাপদ ও সংরক্ষিত দুর্গ। পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত এই দুর্গে ওঠার পথ ছিলো খুবই বন্ধুর। কোন সওয়ারী নিয়ে ওঠাতো সম্ভবই ছিলো না পায়ে হেঁটে ওঠাও ছিলো খুবই কষ্টসাধ্য। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনদিন পর্যন্ত দুর্গ অবরোধ করে রাখেন। এরপর একজন হৃদয়বান ইহুদী এসে বললো, হে আবুল কাশেম, আপনি যদি একমাস যাবত দুর্গ অবরোধ করে রাখেন তবুও ইহুদীরা পরোয়া করবে না। তবে তাদের পানির ঝর্ণা নীচে রয়েছে। রাতের বেলা তারা এসে পানি পান করে এবং সারাদিনের প্রয়োজনীয় পানি তুলে নিয়ে যায়। আপনি যদি ওদের পানি বন্ধ করে দিতে পারেন, তবে তারা নত হবে। এ খবর পেয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওদের পানি বন্ধ করে দিলেন। ইহুদীদের তখন টনক নড়লো। তারা নীচে নেমে এসে প্রচন্ড যুদ্ধে লিপ্ত হলো। এতে কয়েকজন মুসলমানও শাহাদাত বরণ করলেন এবং দশজন ইহুদী দুর্বৃত্ত নিহত হলো। সবশেষে এ দুর্গেরও পতন হলো।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 উবাই দুর্গ জয় ও নেযার দুর্গ জয়

📄 উবাই দুর্গ জয় ও নেযার দুর্গ জয়


যোবায়ের দুর্গের পতনের পর ইহুদীরা উবাই দুর্গে গিয়ে সমবেত হয়। মুসলমানরা সেই দুর্গও অবরোধ করেন। এবার শক্তিগর্বে গর্বিত দুইজন ইহুদী পর্যায়ক্রমে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার আহবান জানায়। উভয়েই মুসলমানদের হাতে নিহত হয়। দ্বিতীয় ইহুদীর হত্যাকারী ছিলেন লাল পট্টিধারী বিখ্যাত যোদ্ধা সাহাবী হযরত আবু দোজানা সাম্মাক ইবনে খারশা আনসারী (রা.)। তিনি দ্বিতীয় ইহুদীকে হত্যা করে দ্রুত বেগে দুর্গে প্রবেশ করেন।
তাঁর সাথে সাহাবারাও ভেতরে গিয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে। কিছুক্ষণ তুমুল যুদ্ধের পর ইহুদীরা দুর্গ থেকে সরে যেতে শুরু করে। অবশেষে সবাই গিয়ে নেওয়ার দুর্গে সমবেত হয়। নেযার দুর্গ ছিলো খয়বরের প্রথম ভাগের সর্বশেষ দুর্গ।
নেজার দুর্গ জয়
এ দুর্গও ছিলো সুরক্ষিত ও নিরাপদ। ইহুদীদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে, মুসলমানরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেও এ দুর্গে প্রবেশ করতে পারবে না। তাই এতে তারা নারী ও শিশুদের সমবেত করেছিলো, অন্য কোন দুর্গে রাখেনি।
মুসলমানরা এ দুর্গে কঠোর অবরোধ আরোপ এবং ইহুদীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। একটি উঁচু পাহাড়ী এলাকায় অবস্থিত এ দুর্গে প্রবেশে মুসলমানরা সুবিধা করতে পারলেন না। ইহুদীরা দুর্গ থেকে বেরিয়ে মুসলমানদের সাথে মোকাবেলা করতেও সাহস পাচ্ছিলো না। তবে উপর থেকে তীর নিক্ষেপ এবং পাথর নিক্ষেপ করে তীব্র মোকাবেলা করে যাচ্ছিলো।
নেজার দুর্গ জয় কঠিন হওয়ায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের নির্দেশ দেন। কয়েকটি গোলা নিক্ষেপও করা হয়। এতে দুর্গ দেয়ালে ছিদ্র হয়ে যায়। সেই ছিদ্রপথে মুসলমানরা ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর দুর্গের ভেতরে উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ইহুদীরা পরাজিত হয়। অন্যান্য দুর্গের মতোই এ দুর্গ থেকেও ইহুদীরা চুপিসারে সটকে পড়ে। নারী ও শিশুদেরকে মুসলমানদের দয়ার ওপর ছেড়ে দিয়ে তারা নিজেদের প্রাণ রক্ষা করে।
এ মজবুত দুর্গ জয়ের মাধ্যমে মুসলমানরা খয়বরের প্রথম অর্ধেক অর্থাৎ নাজাত ও শেক এলাকা জয় করেন। এখানে ছোট ছোট অন্য কয়েকটি দুর্গও ছিলো। কিন্তু এ দুর্গের পতনের পর ইহুদীরা অন্যান্য দুর্গও খালি করে দেয় এবং খয়বরের দ্বিতীয় অংশ কাতীবার দিকে পালিয়ে যায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00