📄 খয়বর এবং ওয়াদিউল কোরার যুদ্ধ
সপ্তম হিজরীর মহরম মাস। মদীনা থেকে ৬০ অথবা ৮০ মাইল দূরে খয়বর শহর অবস্থিত। বেশ বড় শহর। এখানে দুর্গ এবং খেত খামারও ছিলো। আবহাওয়া তেমন স্বাস্থ্যকর নয়। বর্তমানে এটি একটি জনপদ।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হোদায়বিয়ার সন্ধির ফলে খন্দকের যুদ্ধের ত্রিমুখী শক্তির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী কোরায়শদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হলেন। অন্য দু'টি শাখা ছিলো শক্তিশালী ইহুদী এবং নজদ-এর কয়েকটি গোত্র। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এদের সাথেও হিসাব-নিকাশ মিটিয়ে নেয়া প্রয়োজন মনে করলেন। এতে সব দিক থেকে নিরাপত্তা লাভ সম্ভব হবে। সমগ্র এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতার পরিবেশ কায়েম হবে। ফলে মুসলমানরা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাদ দিয়ে আল্লাহর পয়গাম পৌছাতে এবং তাঁর দ্বীনের দাওয়াতের কাজে আত্মনিয়োগ করতে সক্ষম হবে।
খয়বর ছিলো ইহুদীদের ষড়যন্ত্রের ও চক্রান্তের আখড়া। মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইহুদীদের সামরিক প্রস্তুতির কেন্দ্রস্থলও ছিলো এই স্থান। এ কারণে সর্বপ্রথম মুসলমানরা এদিকে মনোযোগী হলেন।
খয়বর প্রকৃতই কি ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের আখড়া ছিলো? এ প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে যে, খয়বরের অধিবাসীরাই খন্দকের যুদ্ধে মোশরেকদের সকল দলকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উস্কানি দিয়ে সমবেত করেছিলো। এরাই বনু কোরায়যা গোত্রের লোকদের বিশ্বাসঘাতকতায় উদ্দীপিত করেছিলো। এরাই ইসলামী সমাজের পঞ্চম বাহিনী মোনোফেকদের সাথে এবং খন্দকের যুদ্ধের সময় বনু গাতফান ও বেদুইনদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলো। এরা নিজেরাও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। মুসলমানদের তারা নানাভাবে উত্যক্ত ও বিরক্ত করেছিলো। এরাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যার ষড়যন্ত্রও করেছিলো। এ সকল কারণে বাধ্য হয়েই মুসলমানদের সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছিলো। ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে নেতৃত্বদানকারী সালাম ইবনে আবুল হাকিক এবং উসাইর ইবনে যারেমকে নিশ্চিহ্ন করতে হয়েছিলো। ইহুদীদের ব্যাপারে মুসলমানদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিলো প্রকৃতপক্ষে এর চেয়েও বেশী। কিন্তু এ কর্তব্য পালনে দেরী করা হচ্ছিলো। কেননা কোরায়শরা ছিলো ইহুদীদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী, সংগঠিত যুদ্ধবাজ এবং দুর্ধর্ষ প্রতিপক্ষ।
কোরায়শদের উপেক্ষা করে ইহুদীদের মোকাবেলা করা সম্ভব ছিলো না। কোরায়শদের সাথে সন্ধি স্থাপনের পর ইহুদীদের সাথে যোগাযোগ করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। এবার তাদের হিসাব নিকাশের দিন ঘনিয়ে এলো।
খয়বরের পথে যাত্রা ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হোদায়বিয়া থেকে ফিরে এসে জিলহজ্জ মাস পুরো এবং মহররম মাসে কয়েকদিন মদীনায় অবস্থান করেন। এরপর মহররম মাসের অবশিষ্ট দিনগুলোতে খয়বরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
তাফসীরকাররা লিখেছেন, খয়বর বিজয় ছিলো আল্লাহর ওয়াদা। তিনি বলেছেন, 'আল্লাহ তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুদ্ধেলব্ধ বিপুল সম্পদের, যার অধিকারী হবে তোমরা। তিনি তা তোমাদের জন্যে ত্বরান্বিত করেছিলেন।' (সূরা ফাতহ, আয়াত ২০)
তা তোমাদের জন্যে ত্বরান্বিত করেছেন বলে হোদায়বিয়ার সন্ধির কথা বোঝানো হয়েছে। আর যুদ্ধলভ্য বিপুল সম্পদ বলতে খয়বরের কথা বোঝানো হয়েছে।
ইসলামী সৈন্যদের সংখ্যা মোনাফেক এবং দুর্বল ঈমানের অধিকারী লোকেরা হোদায়বিয়ার সফরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে না গিয়ে নিজেদের ঘরে বসে থাকে। এ কারণে আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর রসূলকে সে সম্পর্কে আদেশ দিয়ে বলেন, 'তোমরা যখন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংগ্রহের জন্যে যাবে, তখন যারা ঘরে রয়ে গিয়েছিলো, তারা বলবে, আমাদেরকে তোমাদের সঙ্গে যেতে দাও। ওরা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি পরিবর্তন করতে চায়। বল, তোমরা কিছুতেই আমাদের সঙ্গী হতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা পূর্বেই এরূপ ঘোষণা করেছেন। ওরা বলবে, তোমরা তো আমাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করছো। বস্তুত ওদের বোধশক্তি সামান্য।' (সূরা ফাতহ, আয়াত ১৫)
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খয়বর অভিমুখে রওয়ানা হওয়ার সময় ঘোষণা করলেন যে, তাঁর সাথে শুধু ওসকল লোকই যেতে পারবে, যাদের প্রকৃতই জেহাদের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। এ ঘোষণার ফলে শুধুমাত্র যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলো, যারা হোদায়বিয়ার গাছের নীচে বাইয়াতে রেযোয়ানে অংশ নিয়েছিলো। এদের সংখ্যা ছিলো চৌদ্দশত।
এ অভিযানের সময় মদীনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছাবা ইবনে আরফাতা গেফারীর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিলো। অন্যদিকে ইবনে ইসহাক বলেছেন, নুমাইলা ইবনে আবদুল্লাহ লায়ছীর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিলো। কিন্তু গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে প্রথমোক্ত কথাই অধিক নির্ভরযোগ্য।¹
এ সময়ে হযরত আবু হোরায়রা (রা.)-ও মদীনায় আগমন করেছিলেন। হযরত ছাবা ইবনে আরাফাতা (রা.) ফযরের নামায পড়ছিলেন। নামায শেষে আবু হোরায়রা (রা.) তার কাছে যান। তিনি পাথেয় ব্যবস্থা করে দিলেন। হযরত আবু হোরায়রা (রা.) প্রিয় নবীর কাছে যাওয়ার জন্যে খয়বর রওয়ানা হলেন। সেখানে গিয়ে শুনতে পেলেন যে, খয়বর মুসলমানদের অধিকারে এসেছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের সাথে আলোচনা করে আবু হোরায়রা এবং তাঁর সঙ্গীদেরও গনীমতের অংশ দিলেন।
ইহুদীদের জন্যে মোনাফেকদের তৎপরতা
এ সময়ে ইহুদীদের সাহায্যার্থে মোনাফেকরা যথেষ্ট ছোটাছুটি করেছে। মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই আগেই খয়বরে খবর পাঠিয়েছিলো যে, মোহাম্মদ তোমাদের ওদিকে যাচ্ছেন, সতর্ক হয়ে যাও। প্রস্তুত হও, ভয় পেয়ো না যেন। তোমাদের সংখ্যা এবং অস্ত্র শস্ত্র তো অনেক। মোহাম্মদের সঙ্গীদের সংখ্যা বেশী নয়, তাও তারা নিঃস্ব, তাদের কাছে যেসব অস্ত্র রয়েছে, তাও খুব সামান্য। খয়বরের অধিবাসীরা এ খবর পাওয়ার পর বনু গাতফান গোত্রের কাছে কেনানা ইবনে আবুল হাকিক এবং হাওজা ইবনে কয়েসকে সাহায্য লাভের জন্যে প্রেরণ করলো। বনু গাতফান গোত্র ছিলো খয়বরের ইহুদীদের মিত্র এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিত্রদের মদদগার। ইহুদীরা বnu গাতফানকে এ ধরনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলো যে, মুসলমানদের ওপর জয়লাভে সক্ষম হলে খয়বরের মোট উৎপাদনের অর্ধেক বনু গাতফানকে দেয়া হবে।
পথের অবস্থার বিবরণ
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খয়বর যাওয়ার পথে 'এছর' পাহাড় অতিক্রম করলেন। এটি 'আছার' পাহাড় নামেও পরিচিত। এরপর ছাবহা প্রান্তর অতিক্রম করে রাজিঈ প্রান্তের উপনীত হলেন। কিন্তু এই রাজিঈ সেই রাজিঈ, নয় যেখানে আদল ও কারাহর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে বনু লেহইয়ানের হাতে আটজন সাহাবা শাহাদাত বরণ করেন।
রাজিঈ থেকে বনু গাতফান গোত্রের বসতি এলাকা একদিনও এক রাতের পথের দূরত্বে অবস্থিত। বনু গাতফান ইহুদীদের ডাকে সাড়া দিয়ে খয়বরের পথে রওয়ানাও হয়েছিলো। তারা চলে আসার পর পেছনের দিকে শোরগোল শোনা গেলো। তারা ভেবেছিলো যে, মুসলমানরা তাদের পরিবার-পরিজন এবং পশুপালের ওপর হামলা করেছে। এ কারণে তারা ফিরে যায় এবং খয়বরকে মুসলমানদের জন্যে খালি রেখে দেয়।
পথ-নির্দেশক দুইজন সাহাবীকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসতে বললেন। এদের একজনের নাম হুছাইল। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এদের কাছে এমন সমীচীন পথের সন্ধান জানতে চাইলেন, যে পথ ধরে খয়বরে মদীনার পরিবর্তে সিরিয়ার দিক থেকে প্রবেশ করা যায়। এতে করে ইহুদীদের সিরিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ হবে। অন্যদিকে বনু গাতফানের কাছ থেকে সম্ভাব্য সাহায্যও এদিক দিয়েই আসবে। এরূপ অবস্থায় বনু গাতফান এবং ইহুদীদের মাঝখানে মুসলমানরা থাকবেন এবং বনু গাতফানের সাহায্য এলেও তা ইহুদীদের কাছে পৌছুতে পারবে না।
একজন পথপ্রদর্শক বললো, হে আল্লাহর রসূল, আপনাকে আমি আপনার ঈপ্সিত পথেই নিয়ে যাব। সেই পথ প্রদর্শক আগে আগে যেতে লাগলেন। এক চৌরাস্তায় গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, এ চারটি পথের প্রত্যেকটিই খয়বরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। যে কোন পথ ধরেই আপনি সেখানে পৌছুতে পারেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পথগুলোর নাম জানতে চাইলেন। হুছাইল বললেন, একটি পথের নাম হাজন, দ্বিতীয়টির নাম শাশ, তৃতীয়টির নাম হাতাব এবং চতুর্থটি হলো মারহাব। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ নাম অর্থাৎ মারহাব পছন্দ করলেন। অন্য তিনটি পথের নামের অর্থের প্রতি লক্ষ্য করে সেসব পথ বাদ দিলেন। অবশেষে মারহাব পথেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
পথের কতিপয় ঘটনা এক) হযরত সালমা ইবনে আকওয়া (রা.) বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে খয়বর রওয়ানা হয়েছি। রাত্রিকালে সফরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। একজন লোক এসে আমেরকে বললেন, আমের, কিছু শোনাও তো। আমের ছিলেন কবি। তিনি সওয়ারী থেকে নীচে নেমে এসে নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন। 'তুমি যদি না থাকিতে ওগো আল্লাহ আমরাতো কেউ পেতাম না হেদায়াত নামায আদায় করতাম না, দিতাম না যাকাত। তোমার জন্যে এ জীবন কোরবান ক্ষমা করে দাও তুমি আমাদের অটল চরণ রাখবে মোকাবেলায় শত্রুদের। তুমি আমাদের শান্তি দাও ওহে আল্লাহ তায়ালা রণ হুঙ্কার দিলে দুশমন কাঁপে না তো মন এ বিষয়ে আস্থা আমরা করেছি অর্জন।'
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই কবিতা শুনে কবির পরিচয় জানতে চাইলেন। তাঁকে জানানো হলো যে, তিনি আমের ইবনে আকওয়া। আল্লাহর রসূল বললেন, আল্লাহ তায়ালা তাকে রহমত করুন। একজন সাহাবা মন্তব্য করলেন, এবার তো আমেরের শাহাদাত অনিবার্য। কিন্তু আমরা তো আরো বেশীদিন তার সাহচর্য লাভের জন্যে আগ্রহী।² সাহাবায়ে কেরাম জানতেন যে, যুদ্ধের সময়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন সাহাবার জন্যে বিশেষভাবে মাগফেরাতের দোয়া করলে তিনি শহীদ হয়ে যান।³ খয়বরের যুদ্ধে হযরত আমেরের (রা.) ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। এ কারণেই সাহাবারা বলেছেন, তাঁর দীর্ঘায়ুর জন্যে দোয়া করলেই তো আমরা আরো বেশীদিন আমাদের মধ্যে পেতাম।
দুই) খয়বরের খুব কাছে ছাবহা প্রান্তরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আছরের নামায আদায় করেন। পরে খাবার চান। শুধু ছাতু দেয়া হয়। তাঁর আদেশে ছাতু খাদ্যোপযোগী করা হয়। তারপর তিনি নিজে আহার করলেন এবং সাহাবাদেরও খেতে দিলেন। আহারের পর মাগরেবের নামাযের জন্যে উঠলেন। সে সময় তিনি নতুন করে ওযু করলেন না, শুধু কুলি করলেন। সাহাবারাও তাই করলেন।⁴ এরপর তিনি এশার নামায আদায় করলেন।
খয়বরের উপকণ্ঠে ইসলামী বাহিনী যুদ্ধ শুরুর সকালের আগের রাত মুসলমানরা খয়বরের উপকণ্ঠে যাপন করেন। ইহুদীরা তা জানতো পারেনি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিয়ম ছিলো, তিনি যখন রাতের বেলা কোন কওমের কাছে পৌছুতেন, তখন অপেক্ষা করতেন, সকাল হওয়ার আগে তাদের কাছে যেতেন না। সেদিন খুব ভোরে কিছুটা অন্ধকার থাকতে তিনি ফজরের নামায আদায় করেন। এরপর মুসলমানরা সওয়ার হয়ে খয়বরের দিকে অগ্রসর হন। খয়বরের অধিবাসীদের অনেকেই কাঁধে কোদাল নিয়ে খেতে খামারে কাজ করতে বেরিয়েছিলো। হঠাৎ মুসলিম সেনাদের দেখে চিৎকার করে পালাতে লাগলো। চিৎকার করে করে তারা বলছিলো, খোদার কসম, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সসৈন্যে হাজির হয়েছেন।⁶
এই অবস্থা দেখে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহু আকবর, খয়বর বরবাদ হয়েছে, আল্লাহু আকবর, খয়বর বরবাদ হয়েছে। আমরা যখন কোন কওমের ময়দানে নেমে পড়ি, তখন কওমের ভয়ার্ত লোকদের সকাল মন্দ হয়ে যায়।⁶
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সৈন্যদের অবতরণের জন্যে একটি জায়গা নির্ধারণ করলেন। হাব্বাব ইবনে মুনজের এসে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রসূল, আল্লাহর আদেশে আপনি এখানে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নাকি রণ-কৌশলগত কারণে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? তিনি বললেন, রণকৌশলগত কারণে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একথা শুনে হযরত হাব্বাব (রা.) বললেন, এই স্থান নাজাত দুর্গের খুব কাছে। খয়বরের সকল যোদ্ধা এই দুর্গেই থাকে। ওরা আমাদের অবস্থা সম্পর্কে পুরোপুরি জানতে পারবে, অথচ আমরা তাদের অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারব না। ফলে তারা তাদের কৌশল আমাদের ওপর প্রয়োগ করতে পারবে, তাদের নিক্ষিপ্ত তীর আমাদের কাছে পৌছুবে অথচ আমাদের নিক্ষিপ্ত তীর তাদের কাছে পৌঁছুবে না। রাতের বেলা তারা আমাদের ওপর আকস্মিক হামলা চালাতে পারে, এ আশঙ্কাও পুরোপুরি থেকে যাবে। এছাড়া এ জায়গার চারিদিকে খেজুর বাগান, জায়গাটা নিচু। কাজেই এসব সমস্যা যেখানে নেই, সেই রকম একটা জায়গায় অবস্থানের ব্যবস্থা করলে ভালো হতো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি যে অভিমত প্রকাশ করেছ, তা সঠিক। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের নিয়ে অন্য জায়গায় অবস্থান গ্রহণ করলেন।
শহর দেখা যাওয়ার কাছাকাছি এক জায়গায় পৌঁছে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের থামতে বললেন। এরপর তিনি আল্লাহ রব্বুল আলামীনের দরবারে এ মোনাজাত করলেন যে আল্লাহ তায়ালা, তুমি সাত আসমান এবং যেসব জিনিসের ওপর সেই আকাশসমূহ ছায়া বিস্তার করে রয়েছে, সেসব কিছুর প্রতিপালক। সাত যমিন এবং তার উপরে নিচে যা কিছু রয়েছে, সেসব কিছুর প্রতিপালক, শয়তানসমূহ এবং যাদেরকে তারা পথভ্রষ্ট করেছে তাদের প্রতিপালক, তোমার কাছে আমরা এই জনপদের কল্যাণ এবং জনপদের অধিবাসীদের কল্যাণ এবং এতে যা কিছু রয়েছে সেসব কিছুর কল্যাণের আবেদন জানাচ্ছি। এই জনপদের অকল্যাণ এবং এর অধিবাসীদের অকল্যাণ এবং এতে যা কিছু রয়েছে সেসব কিছুর অকল্যাণ থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই।' আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর বললেন, আল্লাহর নাম নিয়ে সামনে অগ্রসর হও।⁷
যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং খয়বরের দুর্গ খয়বরের সীমানায় যে রাতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রবেশ করেছিলেন, সে রাতে তিনি বললেন, আমি আগামীকাল এমন এক ব্যক্তির হাতে পতাকা দেব যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রসূলকে ভালোবাসে এবং আল্লাহ এবং তার রসূলও তাকে ভালোবাসেন। সকালে সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর রসূলের সামনে হাযির হলেন। সবাই পতাকা পাওয়ার জন্যে মনে মনে আকাঙ্খা করছিলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আলী ইবনে আবু তালেব কোথায়? সাহাবারা বললেন, হে আল্লাহর রসূল তার চোখ উঠেছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে নিয়ে এসো। হযরত আলী (রা.)-কে নিয়ে আসা হলো।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চোখে সামান্য থু থু লাগিয়ে দোয়া করে দিলেন। হযরত আলী (রা.) এমন সুস্থ হয়ে গেলেন যে, মনে হয় কখনো তাঁর চোখের অসুখ ছিলোই না। এরপর হযরত আলীকে (রা.) পতাকা প্রদান করা হয়। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আমি ওদের সাথে ততোক্ষণ পর্যন্ত লড়বো, যতক্ষণ তারা আমাদের মতো হয়ে যায়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, নিশ্চিন্তে যাও, যতোক্ষণ পর্যন্ত তাদের ময়দানে অবতরণ না করো। এরপর ওদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ো। ইসলামে আল্লাহর যে অধিকার ওদের ওপর ওয়াজিব হয়, সে সম্পর্কে ওদের অবহিত করো। যদি তোমার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ওদের একজনকেও হেদায়াত দেন তবে তোমার জন্যে সেটা হবে বহুসংখ্যক লাল উটের চেয়ে উত্তম।⁹
খয়বরের জনবসতি ছিলো দুইভাগে বিভক্ত। এক ভাগে নিচে উল্লেখিত পাঁচটি দুর্গ ছিলো। • হেছনে নায়েম। • হেছনে ছা'ব ইবনে মায়া'য। • হেছনে কিল্লা যোবায়ের। • হেছনে উবাই। এবং • হেছনে নাজার।
উল্লিখিত পাঁচটি দুর্গের মধ্যে প্রথম তিনটি দুর্গসম্বলিত এলাকাকে 'নাতাত' বলা হয়। অন্য দু'টি দুর্গসম্বলিত এলাকা 'শেক' নামে পরিচিত।
খয়বরের দ্বিতীয় ভাগের জনবসতি কোতায়রা নামে পরিচিত ছিলো। এর মধ্যে ছিলো তিনটি দুর্গ। এক, হেছনে কামুস। এ দুর্গের অধিবাসীরা বনু নাযির গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলো এবং বনু নাযিরের আবুল হাকিক দুর্গে তারা অবস্থান করতো। দুই, হেছনে অতীহ। তিন, হেছনে সালালেম।
উল্লিখিত আটটি দুর্গ ছাড়া খয়বরে অন্যান্য দুর্গ এবং ভবনও ছিলো। কিন্তু সেগুলো ছিলো অপেক্ষাকৃত ছোট। শক্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পূর্বোক্ত দুর্গগুলোর মতো সুরক্ষিত ছিলো না।
টিকাঃ
১. ফতহুল বারী, সপ্তম খন্ড, পৃ. ৪৬৫, যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ১৩৩
২. সহীহ বোখারী, বাবে গাজওয়ায়ে খয়বর ২য় খন্ড ৬০৩, সহীহ মুসলিম বাবে গোযওয়ায়ে যি কারদ, ২য় খন্ড পৃ. ১১৫
৩. সহীহ মুসলিম ২য় খন্ড, পৃ. ১১৫
৪. সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড, ৬০৩
৬. মাগাযি, আল ওয়াকেদী, খয়বর যুদ্ধ পৃ. ১১২ সহীহ বোখারী, খয়বরের যুদ্ধ অধ্যায় ২য় খন্ড, পৃ. ৬০৩, ৬০৪
৬. সহীহ বোখারী, খয়বরের যুদ্ধ অধ্যায়, ২য় খন্ড, পৃ. ৬০৩, ৬০৪
৭. এই চোখের অসুখের কারণে তিনি পিছিয়ে পড়েন এবং পরে সকলের সাথে মিলিত হন।
৯. সহীহ বোখারী, খয়বর যুদ্ধ অধ্যায়, পৃ. ৬০৫, ৬০৬, কোন কোন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, খয়বরের একটি দুর্গ বিজয়ে একাধিকবারের চেষ্টা ব্যর্থ হয় এরপর হযরত আলীর হাতে পতাকা প্রদান করা হয়। কিন্তু সেটা সত্য
📄 খয়বরের পথে যাত্রা ও ইসলামী সৈন্যদের সংখ্যা
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হোদায়বিয়া থেকে ফিরে এসে জিলহজ্জ মাস পুরো এবং মহররম মাসে কয়েকদিন মদীনায় অবস্থান করেন। এরপর মহররম মাসের অবশিষ্ট দিনগুলোতে খয়বরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
তাফসীরকাররা লিখেছেন, খয়বর বিজয় ছিলো আল্লাহর ওয়াদা। তিনি বলেছেন, 'আল্লাহ তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুদ্ধেলব্ধ বিপুল সম্পদের, যার অধিকারী হবে তোমরা। তিনি তা তোমাদের জন্যে ত্বরান্বিত করেছিলেন।' (সূরা ফাতহ, আয়াত ২০)
তা তোমাদের জন্যে ত্বরান্বিত করেছেন বলে হোদায়বিয়ার সন্ধির কথা বোঝানো হয়েছে। আর যুদ্ধলভ্য বিপুল সম্পদ বলতে খয়বরের কথা বোঝানো হয়েছে।
ইসলামী সৈন্যদের সংখ্যা মোনাফেক এবং দুর্বল ঈমানের অধিকারী লোকেরা হোদায়বিয়ার সফরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে না গিয়ে নিজেদের ঘরে বসে থাকে। এ কারণে আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর রসূলকে সে সম্পর্কে আদেশ দিয়ে বলেন, 'তোমরা যখন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংগ্রহের জন্যে যাবে, তখন যারা ঘরে রয়ে গিয়েছিলো, তারা বলবে, আমাদেরকে তোমাদের সঙ্গে যেতে দাও। ওরা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি পরিবর্তন করতে চায়। বল, তোমরা কিছুতেই আমাদের সঙ্গী হতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা পূর্বেই এরূপ ঘোষণা করেছেন। ওরা বলবে, তোমরা তো আমাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করছো। বস্তুত ওদের বোধশক্তি সামান্য।' (সূরা ফাতহ, আয়াত ১৫)
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খয়বর অভিমুখে রওয়ানা হওয়ার সময় ঘোষণা করলেন যে, তাঁর সাথে শুধু ওসকল লোকই যেতে পারবে, যাদের প্রকৃতই জেহাদের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। এ ঘোষণার ফলে শুধুমাত্র যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলো, যারা হোদায়বিয়ার গাছের নীচে বাইয়াতে রেযোয়ানে অংশ নিয়েছিলো। এদের সংখ্যা ছিলো চৌদ্দশত।
এ অভিযানের সময় মদীনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছাবা ইবনে আরফাতা গেফারীর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিলো। অন্যদিকে ইবনে ইসহাক বলেছেন, নুমাইলা ইবনে আবদুল্লাহ লায়ছীর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিলো। কিন্তু গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে প্রথমোক্ত কথাই অধিক নির্ভরযোগ্য।
এ সময়ে হযরত আবু হোরায়রা (রা.)-ও মদীনায় আগমন করেছিলেন। হযরত ছাবা ইবনে আরাফাতা (রা.) ফযরের নামায পড়ছিলেন। নামায শেষে আবু হোরায়রা (রা.) তার কাছে যান। তিনি পাথেয় ব্যবস্থা করে দিলেন। হযরত আবু হোরায়রা (রা.) প্রিয় নবীর কাছে যাওয়ার জন্যে খয়বর রওয়ানা হলেন। সেখানে গিয়ে শুনতে পেলেন যে, খয়বর মুসলমানদের অধিকারে এসেছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের সাথে আলোচনা করে আবু হোরায়রা এবং তাঁর সঙ্গীদেরও গনীমতের অংশ দিলেন।
ইহুদীদের জন্যে মোনাফেকদের তৎপরতা এ সময়ে ইহুদীদের সাহায্যার্থে মোনাফেকরা যথেষ্ট ছোটাছুটি করেছে। মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই আগেই খয়বরে খবর পাঠিয়েছিলো যে, মোহাম্মদ তোমাদের ওদিকে যাচ্ছেন, সতর্ক হয়ে যাও। প্রস্তুত হও, ভয় পেয়ো না যেন। তোমাদের সংখ্যা এবং অস্ত্র শস্ত্র তো অনেক। মোহাম্মদের সঙ্গীদের সংখ্যা বেশী নয়, তাও তারা নিঃস্ব, তাদের কাছে যেসব অস্ত্র রয়েছে, তাও খুব সামান্য। খয়বরের অধিবাসীরা এ খবর পাওয়ার পর বনু গাতফান গোত্রের কাছে কেনানা ইবনে আবুল হাকিক এবং হাওজা ইবনে কয়েসকে সাহায্য লাভের জন্যে প্রেরণ করলো। বনু গাতফান গোত্র ছিলো খয়বরের ইহুদীদের মিত্র এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিত্রদের মদদগার। ইহুদীরা বনু গাতফানকে এ ধরনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলো যে, মুসলমানদের ওপর জয়লাভে সক্ষম হলে খয়বরের মোট উৎপাদনের অর্ধেক বনু গাতফানকে দেয়া হবে।
পথের অবস্থার বিবরণ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খয়বর যাওয়ার পথে 'এছর' পাহাড় অতিক্রম করলেন। এটি 'আছার' পাহাড় নামেও পরিচিত। এরপর ছাবহা প্রান্তর অতিক্রম করে রাজিঈ প্রান্তের উপনীত হলেন। কিন্তু এই রাজিঈ সেই রাজিঈ, নয় যেখানে আদল ও কারাহর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে বনু লেহইয়ানের হাতে আটজন সাহাবা শাহাদাত বরণ করেন।
রাজিঈ থেকে বনু গাতফান গোত্রের বসতি এলাকা একদিনও এক রাতের পথের দূরত্বে অবস্থিত। বনু গাতফান ইহুদীদের ডাকে সাড়া দিয়ে খয়বরের পথে রওয়ানাও হয়েছিলো। তারা চলে আসার পর পেছনের দিকে শোরগোল শোনা গেলো। তারা ভেবেছিলো যে, মুসলমানরা তাদের পরিবার-পরিজন এবং পশুপালের ওপর হামলা করেছে। এ কারণে তারা ফিরে যায় এবং খয়বরকে মুসলমানদের জন্যে খালি রেখে দেয়।
পথ-নির্দেশক দুইজন সাহাবীকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসতে বললেন। এদের একজনের নাম হুছাইল। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এদের কাছে এমন সমীচীন পথের সন্ধান জানতে চাইলেন, যে পথ ধরে খয়বরে মদীনার পরিবর্তে সিরিয়ার দিক থেকে প্রবেশ করা যায়। এতে করে ইহুদীদের সিরিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ হবে। অন্যদিকে বনু গাতফানের কাছ থেকে সম্ভাব্য সাহায্যও এদিক দিয়েই আসবে। এরূপ অবস্থায় বনু গাতফান এবং ইহুদীদের মাঝখানে মুসলমানরা থাকবেন এবং বনু গাতফানের সাহায্য এলেও তা ইহুদীদের কাছে পৌছুতে পারবে না।
একজন পথপ্রদর্শক বললো, হে আল্লাহর রসূল, আপনাকে আমি আপনার ঈপ্সিত পথেই নিয়ে যাব। সেই পথ প্রদর্শক আগে আগে যেতে লাগলেন। এক চৌরাস্তায় গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, এ চারটি পথের প্রত্যেকটিই খয়বরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। যে কোন পথ ধরেই আপনি সেখানে পৌছুতে পারেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পথগুলোর নাম জানতে চাইলেন। হুছাইল বললেন, একটি পথের নাম হাজন, দ্বিতীয়টির নাম শাশ, তৃতীয়টির নাম হাতাব এবং চতুর্থটি হলো মারহাব। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ নাম অর্থাৎ মারহাব পছন্দ করলেন। অন্য তিনটি পথের নামের অর্থের প্রতি লক্ষ্য করে সেসব পথ বাদ দিলেন। অবশেষে মারহাব পথেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
টিকাঃ
১. ফতহুল বারী, সপ্তম খন্ড, পৃ. ৪৬৫, যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ১৩৩
📄 ইহুদীদের জন্যে মোনাফেকদের তৎপরতা
এ সময়ে ইহুদীদের সাহায্যার্থে মোনাফেকরা যথেষ্ট ছোটাছুটি করেছে। মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই আগেই খয়বরে খবর পাঠিয়েছিলো যে, মোহাম্মদ তোমাদের ওদিকে যাচ্ছেন, সতর্ক হয়ে যাও। প্রস্তুত হও, ভয় পেয়ো না যেন। তোমাদের সংখ্যা এবং অস্ত্র শস্ত্র তো অনেক। মোহাম্মদের সঙ্গীদের সংখ্যা বেশী নয়, তাও তারা নিঃস্ব, তাদের কাছে যেসব অস্ত্র রয়েছে, তাও খুব সামান্য। খয়বরের অধিবাসীরা এ খবর পাওয়ার পর বনু গাতফান গোত্রের কাছে কেনানা ইবনে আবুল হাকিক এবং হাওজা ইবনে কয়েসকে সাহায্য লাভের জন্যে প্রেরণ করলো। বনু গাতফান গোত্র ছিলো খয়বরের ইহুদীদের মিত্র এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিত্রদের মদদগার। ইহুদীরা বনু গাতফানকে এ ধরনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলো যে, মুসলমানদের ওপর জয়লাভে সক্ষম হলে খয়বরের মোট উৎপাদনের অর্ধেক বনু গাতফানকে দেয়া হবে।
📄 পথের অবস্থার বিবরণ
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খয়বর যাওয়ার পথে 'এছর' পাহাড় অতিক্রম করলেন। এটি 'আছার' পাহাড় নামেও পরিচিত। এরপর ছাবহা প্রান্তর অতিক্রম করে রাজিঈ প্রান্তের উপনীত হলেন। কিন্তু এই রাজিঈ সেই রাজিঈ, নয় যেখানে আদল ও কারাহর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে বনু লেহইয়ানের হাতে আটজন সাহাবা শাহাদাত বরণ করেন।
রাজিঈ থেকে বনু গাতফান গোত্রের বসতি এলাকা একদিনও এক রাতের পথের দূরত্বে অবস্থিত। বনু গাতফান ইহুদীদের ডাকে সাড়া দিয়ে খয়বরের পথে রওয়ানাও হয়েছিলো। তারা চলে আসার পর পেছনের দিকে শোরগোল শোনা গেলো। তারা ভেবেছিলো যে, মুসলমানরা তাদের পরিবার-পরিজন এবং পশুপালের ওপর হামলা করেছে। এ কারণে তারা ফিরে যায় এবং খয়বরকে মুসলমানদের জন্যে খালি রেখে দেয়।
পথ-নির্দেশক দুইজন সাহাবীকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসতে বললেন। এদের একজনের নাম হুছাইল। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এদের কাছে এমন সমীচীন পথের সন্ধান জানতে চাইলেন, যে পথ ধরে খয়বরে মদীনার পরিবর্তে সিরিয়ার দিক থেকে প্রবেশ করা যায়। এতে করে ইহুদীদের সিরিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ হবে। অন্যদিকে বনু গাতফানের কাছ থেকে সম্ভাব্য সাহায্যও এদিক দিয়েই আসবে। এরূপ অবস্থায় বনু গাতফান এবং ইহুদীদের মাঝখানে মুসলমানরা থাকবেন এবং বনু গাতফানের সাহায্য এলেও তা ইহুদীদের কাছে পৌছুতে পারবে না।
একজন পথপ্রদর্শক বললো, হে আল্লাহর রসূল, আপনাকে আমি আপনার ঈপ্সিত পথেই নিয়ে যাব। সেই পথ প্রদর্শক আগে আগে যেতে লাগলেন। এক চৌরাস্তায় গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, এ চারটি পথের প্রত্যেকটিই খয়বরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। যে কোন পথ ধরেই আপনি সেখানে পৌছুতে পারেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পথগুলোর নাম জানতে চাইলেন। হুছাইল বললেন, একটি পথের নাম হাজন, দ্বিতীয়টির নাম শাশ, তৃতীয়টির নাম হাতাব এবং চতুর্থটি হলো মারহাব। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ নাম অর্থাৎ মারহাব পছন্দ করলেন। অন্য তিনটি পথের নামের অর্থের প্রতি লক্ষ্য করে সেসব পথ বাদ দিলেন। অবশেষে মারহাব পথেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
পথের কতিপয় ঘটনা এক) হযরত সালমা ইবনে আকওয়া (রা.) বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে খয়বর রওয়ানা হয়েছি। রাত্রিকালে সফরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। একজন লোক এসে আমেরকে বললেন, আমের, কিছু শোনাও তো। আমের ছিলেন কবি। তিনি সওয়ারী থেকে নীচে নেমে এসে নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন। 'তুমি যদি না থাকিতে ওগো আল্লাহ আমরাতো কেউ পেতাম না হেদায়াত নামায আদায় করতাম না, দিতাম না যাকাত। তোমার জন্যে এ জীবন কোরবান ক্ষমা করে দাও তুমি আমাদের অটল চরণ রাখবে মোকাবেলায় শত্রুদের। তুমি আমাদের শান্তি দাও ওহে আল্লাহ তায়ালা রণ হুঙ্কার দিলে দুশমন কাঁপে না তো মন এ বিষয়ে আস্থা আমরা করেছি অর্জন।'
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই কবিতা শুনে কবির পরিচয় জানতে চাইলেন। তাঁকে জানানো হলো যে, তিনি আমের ইবনে আকওয়া। আল্লাহর রসূল বললেন, আল্লাহ তায়ালা তাকে রহমত করুন। একজন সাহাবা মন্তব্য করলেন, এবার তো আমেরের শাহাদাত অনিবার্য। কিন্তু আমরা তো আরো বেশীদিন তার সাহচর্য লাভের জন্যে আগ্রহী। সাহাবায়ে কেরাম জানতেন যে, যুদ্ধের সময়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন সাহাবার জন্যে বিশেষভাবে মাগফেরাতের দোয়া করলে তিনি শহীদ হয়ে যান। খয়বরের যুদ্ধে হযরত আমেরের (রা.) ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। এ কারণেই সাহাবারা বলেছেন, তাঁর দীর্ঘায়ুর জন্যে দোয়া করলেই তো আমরা আরো বেশীদিন আমাদের মধ্যে পেতাম।
টিকাঃ
৬. মাগাযি, আল ওয়াকেদী, খয়বর যুদ্ধ পৃ. ১১২ সহীহ বোখারী, খয়বরের যুদ্ধ অধ্যায় ২য় খন্ড, পৃ. ৬০৩, ৬০৪
৬. সহীহ বোখারী, খয়বরের যুদ্ধ অধ্যায়, ২য় খন্ড, পৃ. ৬০৩, ৬০৪
২. সহীহ বোখারী, বাবে গাজওয়ায়ে খয়বর ২য় খন্ড ৬০৩, সহীহ মুসলিম বাবে গোযওয়ায়ে যি কারদ, ২য় খন্ড পৃ. ১১৫
৩. সহীহ মুসলিম ২য় খন্ড, পৃ. ১১৫
৪. সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড, ৬০৩