📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশীর নামে

📄 হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশীর নামে


নাজ্জাশীর প্রকৃত নাম ছিলো আসহাম ইবনে আলজাবার। আল্লাহর রসূল চিঠি লেখানোর পর আমর ইবনে উসাইয়া জামরির হাতে ষষ্ঠ হিজরীর শেষে বা সপ্তম হিজরীর শুরুতে এটি প্রেরণ করেন। আল্লামা তিবরি চিঠির বক্তব্যও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু চিঠির বক্তব্য ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে, হোদায়বিয়ার সন্ধির পর লেখা চিঠি এটি নয়। মক্কায় অবস্থানকালে আল্লাহর রসূল হযরত জাফর তাইয়ারকে হাবশায় হিজরতের সময় যে চিঠি দিয়েছিলেন নাজ্জাশীকে দেয়ার জন্যে এটি মনে হয় সেই চিঠি। কেননা চিঠির শেষে মোহাজেরদের প্রসঙ্গ এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, আমি আপনার কাছে আমার চাচাতো ভাই জাফরকে মুসলমানদের একটি জামাতের সাথে পাঠিয়েছি। ওরা আপনার কাছে পৌছুলে আপনি ওদের আপনার তত্ত্বাবধানে রাখবেন এবং কোন প্রকার জবরদস্তি করবেন না।

ইমাম বায়হাকী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে আরো একখানি চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন সেটিও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাজ্জাশীর কাছে পাঠিয়েছিলেন। চিঠির বক্তব্য এরূপ: 'এই চিঠি নবী মোহাম্মদের পক্ষ থেকে হাবশার বাদশাহ আসহামের নামে। যিনি হেদায়েতের অনুসরণ করবেন এবং আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করবেন তার ওপর সালাম। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত এবাদাতের উপযুক্ত কেউ নেই। তাঁর স্ত্রী পুত্র কিছু নেই। আমি একথাও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মোহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও রসূল। আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি, কেননা আমি আল্লাহর রসূল। কাজেই ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। হে আহলে কেতাব, এমন একটি বিষয়ের প্রতি আসুন, যা আমাদের এবং আপনাদের মধ্যে সমান। আমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো এবাদাত করবো না। তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবো না, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে প্রভু হিসাবে স্বীকার করবো না। যদি কেউ এ বিশ্বাস গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তাকে বলুন যে, সাক্ষী থাকো, আমি মুসলমান। যদি আপনি এই দাওয়াত গ্রহণ না করেন, তবে আপনার ওপর আপনার কওমের নাছারাদের সমুদয় পাপ বর্তাবে।

প্যারিসের ডক্টর মোঃ হামিদুল্লাহ আরো একখানি চিঠির বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। সেটির সন্ধান পাওয়া গেছে। এ চিঠিখানি একটি শব্দের পার্থক্যসহ আল্লামা ইবনে কাইয়েমের লেখা গ্রন্থ যাদুল মায়াদ-এ উল্লেখ রয়েছে। ডক্টর সাহেব চিঠির বক্তব্যের সতত্যা নিরূপণের যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন।

বর্তমান যুগে প্রকাশিত এ চিঠির ফটোকপি ডক্টর হামিদুল্লাহ তাঁর গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছেন। এর অনুবাদ নিম্নরূপ। পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।

'আল্লাহর রসূল মোহাম্মদের পক্ষ থেকে হাবশার নাজ্জাশী আযমের প্রতি। সালাম সেই ব্যক্তির ওপর যিনি হেদায়াতের অনুসরণ করেন। আমি আপনার কাছে মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি যিনি ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। যিনি কুদ্দুস, যিনি সালাম, যিনি নিরাপত্তা ও শান্তি দেন, যিনি হেফাযতকারী ও তত্ত্বাবধায়নকারী। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ঈসা ইবনে মরিয়ম আল্লাহর রূহ এবং তাঁর কলেমা। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে পবিত্র ও সতী মরিয়মের ওপর স্থাপন করেছেন। আল্লাহর রূহ এবং ফুঁ-এর কারণে হযরত মরিয়ম (আ.) গর্ভবতী হলেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম আলাইহিস সালামকে নিজের হাতে তৈরী করেছিলেন। এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর আনুগত্যের প্রতি পরস্পরকে দাওয়াত দিচ্ছি। এছাড়া একথার প্রতিও দাওয়াত দিচ্ছি যে, আপনি আমার আনুগত্য করুন এবং আমি যা কিছু নিয়ে এসেছি, তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করুন। কেননা আমি আল্লাহর রসূল, আমি আপনাকে এবং আপনার সেনাদলকে সর্বশক্তিমান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। আমি তাবলীগ ও নসিহত করেছি। কাজেই আমার তাবলীগ ও নসিহত কবুল করুন। (পরিশেষে) সালাম সেই ব্যক্তির ওপর, যিনি হেদায়াতের আনুগত্য করেন।³

ডক্টর মোঃ হামিদুল্লাহ দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেছেন যে, এই চিঠিই সেই চিঠি, যা হোদায়বিয়ার সন্ধির পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাজ্জাশীর কাছে পাঠিয়েছিলেন। এই চিঠি সম্পর্কিত বর্ণনাসূত্রের প্রতি লক্ষ্য করলে এ বক্তব্যের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহের কোন কারণ থাকে না। কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হোদায়বিয়ার সন্ধির পর এই চিঠিই পাঠিয়েছিলেন, এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং ইমাম বায়হাকি যে চিঠি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের (রা.) বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন, তার সাথে অন্যান্য বাদশাহর চিঠির বিবরণ অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়। কেননা ইমাম বায়হাকি সঙ্কলিত চিঠিপত্রের সাথে কোরআনের 'হে আহলে কেতাবরা' সম্বোধন সম্বলিত আয়াত রয়েছে। এ ধরনের আয়াত অন্যান্য ইমামদের সংকলিত চিঠির মধ্যেও উল্লেখ রয়েছে। ইমাম বায়হাকি সঙ্কলিত চিঠিতে হাবশার বাদশাহর নাম আসহামা উল্লেখ রয়েছে। ডক্টর হামিদুল্লাহ সঙ্কলিত চিঠিতে কারো নাম উল্লেখ নেই। এমতাবস্থায় আমার ধারণা হচ্ছে যে, ডক্টর সাহেবের চিঠি প্রকৃতপক্ষে সেই চিঠি, যা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসহামের মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্তের নামে লিখেছিলেন। সম্ভবত এ কারণেই চিঠিতে কারো নাম ছিলো না।

এ বিষয়ে আমার কাছে কোন প্রমাণ নেই। বরং সেইসব অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যই হচ্ছে ভিত্তি, যা চিঠির বক্তব্য থেকে গ্রহণ করা যায়। তবে ডক্টর হামিদুল্লাহ সাহেব সম্পর্কে বিস্ময় জাগে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত বায়হাকির উদ্ধৃত চিঠিতে পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে আল্লাহর রসূলের সেই চিঠি বলে উল্লেখ করেছেন যে চিঠি আসহামার মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরীর নামে লিখা হয়েছিলো। অথবা আসহামাকে লেখা চিঠিতে সুস্পষ্টভাবে তার নাম লেখা রয়েছে।

মোটকথা, আমর ইবনে উমাইয়া জামরি আল্লাহর রসূলের চিঠি নাজ্জাশীর কাছে প্রদান করেন। নাজ্জাশী সেই চিঠি চোখে লাগান এবং সিংহাসন ছেড়ে নীচে নেমে আসেন। এরপর তিনি হযরত জাফর ইবনে আবু তালেবের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রেরিত চিঠির জবাবে তিনি একখানি চিঠি মদীনায় প্রেরণ করেন। সেই চিঠির বক্তব্য নিম্নরূপ।

পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।
আল্লাহর রসূল মোহাম্মদের নামে নাজ্জাশী আসহামার পক্ষ থেকে।

হে আল্লাহর নবী, আপনার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে ছালাম, তাঁর রহমত ও বরকত নাযিল হোক। সেই আল্লাহর পক্ষ থেকে, যিনি ব্যতীত এবাদাতের উপযুক্ত কেউ নেই। অতঃপর, হে আল্লাহর রসূল, আপনার চিঠি আমার হাতে পৌঁছেছে। এ চিঠিতে আপনি হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। আসমান ও যমিনের মালিক আল্লাহর শপথ, আপনি যা কিছু উল্লেখ করেছেন হযরত ঈসা (আ.) এর চেয়ে বেশী কিছু ছিলেন না। তিনি সেইরূপ ছিলেন আপনি যেরূপ উল্লেখ করেছেন।⁵ আপনি আমার কাছে যা কিছু লিখে পাঠিয়েছেন, আমি তা জেনেছি এবং আপনার চাচাতো ভাই এবং আপনার সাহাবাদের মেহমানদারী করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর সত্য ও খাঁটি রসূল। আমি আপনার কাছে বাইয়াত করছি, আপনার চাচাতো ভাইয়ের বাইয়াত করছি এবং তাঁর হাতে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্যে ইসলাম কবুল করেছি।⁶

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাজ্জাশীর কাছে একথাও দাবী করেছেন, তিনি যেন হযরত জাফর এবং হাবশায় অন্যান্য মোহাজেরদের পাঠিয়ে দেন। সেই অনুযায়ী নাজ্জাশী হযরত আমর ইবনে উমাইয়া জামরির সাথে দু'টি কিসতিতে করে সাহাবাদের দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। একটি কিসতিতে হযরত জাফর, হযরত আবু মূসা আশয়ারী এবং অন্য কয়েকজন সাহাবা ছিলেন। তাঁরা প্রথমে খয়বরে পৌঁছে সেখান থেকে মদীনায় হাযির হন। অন্য একটি কিসতিতে অধিকাংশ ছিলো শিশু-কিশোর, তারা হাবশা থেকে সরাসরি মদীনায় পৌঁছে।⁷

উল্লেখ্য, নাজ্জাশী তবুক যুদ্ধের পর নবম হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। আল্লাহর রসূল নাজ্জাশীর ইন্তেকালের তারিখেই তার মৃত্যু সংবাদ সাহাবাদের জানান এবং গায়েবানা জানাযার ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে নাজ্জাশীর স্থলাভিষিক্ত বাদশাহর কাছেও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একখানি চিঠি লিখেছিলেন, কিন্তু তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন কিনা, সেটা জানা যায়নি।⁸

টিকাঃ
৩. রসূলুল্লাহর রাজনৈতিক জীবন, ডক্টর মোঃ হামিদুল্লাহ। পৃ. ১০৮, ১০৯, ১২২, ১২৩, ১২৪, ১২৫, যাদুল মায়াদ গ্রন্থে শেষ শব্দ যে ব্যক্তি হেদায়াতের আনুগত্য করেন-এর পরিবর্তে রয়েছে 'যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন।' দেখুন যাদুল মায়াদ, তৃতীয় খন্ড, পৃ. ৬০।
৫. হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে নাজ্জাশীর অর্থাৎ আসহামার এই বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, তাঁর উল্লেখিত চিঠিটি আসহামার নামেই প্রেরিত হয়েছিলো।
৬. যাদুল মায়াদ, ৩য় খন্ড, পৃ. ৬১
৭. যাদুল মায়াদ, ৩য় খন্ড, পৃ. ৬১
৮. একই গ্রন্থ একই পৃষ্ঠা,

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মিসরের বাদশাহ মুকাওকিসের নামে

📄 মিসরের বাদশাহ মুকাওকিসের নামে


রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়ার শাসনকর্তা জোরাইজ ইবনে মাতা'র কাছেও একখানা চিঠি লিখেছিলেন। জুরাইজের উপাধি ছিলো মুকাওকিস। চিঠির বিবরণ নিম্নরূপ-

'পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।
আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল মোহাম্মদের পক্ষ থেকে মুকাওকিস আযম কিবতের নামে। তাঁর প্রতি সালাম, যিনি হেদায়াতের আনুগত্য করেন।

আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। ইসলাম গ্রহণ করলে আল্লাহ তায়ালা আপনাকে দু'টি পুরস্কার দেবেন। আর যদি ইসলাম গ্রহণ না করেন, তবে কিন্তের অধিবাসীদের পাপও আপনার ওপর বর্তাবে। হে কিবতিরা, 'এমন একটি বিষয়ের প্রতি এসো যা আমাদের এবং তোমাদের জন্যে সমান। সেটি এই যে, আমরা আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্য কারো এবাদাত করবো না এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবো না। আমাদের মধ্যে কেউ যেন আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্য কাউকে প্রভু হিসাবে না মানে।' যদি কেউ এই দাওয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে, তবে বলে দাও, সাক্ষী থাকো, আমরা মুসলমান।'¹⁰

এই চিঠি পৌঁছানোর জন্যে হযরত হাতেব ইবনে আবি বালতাআকে মনোনীত করা হয়। তিনি মোকাওকিসের দরবারে পৌঁছার পর বলেছিলেন, এই যমিনে আপনার আগেও একজন শাসনকর্তা ছিলেন, যে নিজেকে রব্বে আ'লা মনে করতো। আল্লাহ তায়ালা তাকে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী লোকদের জন্যে দৃষ্টান্ত করেছেন। প্রথমে তার দ্বারা অন্য লোকদের ওপর প্রতিশোধ নেয়া হয়েছে এরপর তাকে প্রতিশোধের লক্ষ্যস্থল করা হয়েছে। কাজেই অন্যের ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন। এমন যেন না হয় যে, অন্যরা আপনার ঘটনা থেকে শিক্ষা লাভ করবে।'

মুকাওকিস জবাবে বললেন, আমাদের একটি ধর্ম-বিশ্বাস রয়েছে সেই ধর্ম বিশ্বাস আমরা পরিত্যাগ করতে পারি না। যতক্ষণ পর্যন্ত তার চেয়ে উত্তম কোন ধর্ম-বিশ্বাস পাওয়া না যায়।

হযরত হাতেব (রা.) বলেন, আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। এই দ্বীনকে আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী সকল দ্বীনের পরিবর্তে যথেষ্ট মনে করেছেন। ইসলামের অর্থাৎ আল্লাহর মনোনীত দ্বীনের নবী মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার পর তার বিরুদ্ধে কোরায়শরা প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। ইহুদীরাও শত্রুতা ও ষড়যন্ত্র শুরু করে। নাছারারা ছিলো কাছে কাছে। আল্লাহর শপথ, হযরত মূসা (আ.) যেমন হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়েছিলেন একই নিয়মে আমরা আপনাকে কোরআনের দাওয়াত দিচ্ছি, যেমন আপনারা তওরাতের অনুসারীদের ইঞ্জিলের দাওয়াত দিয়ে থাকেন। যে নবী যে কওমকে পেয়ে যান, সেই কওম সেই নবীর উম্মত হয়ে যায় এরপর সেই নবীর আনুগত্য করা উক্ত কওমের জন্যে অত্যাবশ্যক হয়ে যায়।

আপনারা নবাগত নবীর যমানা পেয়েছেন, কাজেই তাঁর আনুগত্য করুন। আপনাকে আমরা দ্বীনে মসীহ থেকে ফিরে আসতে বলছি না, বরং আমরা মূলত সেই দ্বীনের দাওয়াতই দিচ্ছি:

মুকাওকিস বলেন, সেই নবী সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়ে আমি শুনেছি যে, তিনি কোন অপছন্দীয় কাজের আদেশ দেন না এবং পছন্দনীয় কোন কাজ করতে নিষেধ করেন না। তিনি পথভ্রষ্ট যাদুকর নন, মিথ্যাবাদী জ্যোতিষী নন। বরং আমি দেখেছি যে, তার সাথে নবুয়তের এ নিশানা রয়েছে যে, তিনি গোপনীয় বিষয়কে প্রকাশ করেন এবং অপ্রকাশ্য জিনিস সম্পর্কে খবর দেন। আমি তার দাওয়াত সম্পর্কে আরো চিন্তা-ভাবনা করবো।

মুকাওকিস আল্লাহর রসূলের চিঠি নিয়ে হাতীর দাঁতের একটি কৌটোয় রাখেন এরপর মুখ বন্ধ করে সীল লাগিয়ে তার এক দাসীর হাতে দেন। এরপর আরবী ভাষার কাতেবকে ডেকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিম্নোক্ত চিঠি লেখেন।

'পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নাম শুরু করছি। মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর নামে মুকাওকিস আযিম কিবত-এর পক্ষ থেকে। আপনার প্রতি সালাম। আপনার চিঠি পাঠ করেছি। আপনার চিঠির বক্তব্য এবং দাওয়াত আমি বুঝেছি। আমি জানি যে, এখনো একজন নবী আসার বাকি রয়েছে। আমি ধারণা করেছিলাম যে, তিনি সিরিয়া থেকে আবির্ভূত হবেন। আমি আপনার দূতের সম্মান করেছি। আপনার খেদমতে দুইজন দাসী পাঠাচ্ছি। কিবতিদের মধ্যে এদের যথেষ্ট মর্যাদা রয়েছে। আপনার জন্যে কিছু পোশাকও পাঠাচ্ছি। আপনার সওয়ারীর জন্যে একটি খচ্চরও হাদিয়া স্বরূপ পাঠাচ্ছি। আপনার প্রতি সালাম।'

মুকাওকিস আর কোন কথা লেখেননি। তিনি ইসলামও গ্রহণ করেননি। তাঁর প্রেরিত দাসীদের নাম ছিলো মারিয়া কিবতিয়া এবং শিরিন। খচ্চরটির নাম ছিলো দুলদুল। এটি হযরত মুয়াবিয়ার (রা.) সময় পর্যন্ত জীবিত ছিলো।¹¹ রসূলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারিয়াকে নিজের কাছে রেখেছিলেন। মারিয়ার গর্ভ থেকেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুত্র ইবরাহীম জন্ম গ্রহণ করেন। শিরিনকে কবি হাসান ইবনে ছাবেত আনসারীকে দান করা হয়।

টিকাঃ
১০. যাদুল মায়াদ গ্রন্থের ৩য় খন্ডের ৬১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, কাছে অতীতে এই চিঠি আবিষ্কৃত হয়েছে। ডক্টর হামিদুল্লাহ মুদ্রিত ফটোকপির বিবরণে এবং যাদুল মায়াদ- এর উল্লিখিত বিধির বিবরণের মধ্যে মাত্র দু'টি শব্দের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। রসূলুল্লাহর রাজনৈতিক জীবন, পৃ. ১৩৬-১৩৭ দেখন, ১০. যাদুল মায়াদ গ্রন্থের ৩য় খন্ডের ৬১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিকট অতীতে এই চিঠি আবিষ্কৃত হয়েছে। ডক্টর হামিদুল্লাহ মুদ্রিত ফটোকপির বিবরণে এবং যাদুল মায়াদ- এর উল্লিখিত বিধির বিবরণের মধ্যে মাত্র দু'টি শব্দের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। রসূলুল্লাহর রাজনৈতিক জীবন, পৃ. ১৩৬-১৩৭ দেখুন,
১১. যাদুল মায়াদ, ৩য় খন্ড, পৃ. ৬১

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের নামে

📄 পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের নামে


রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পারস্য সম্রাট কিসরার কাছেও একখানি চিঠি প্রেরণ করেন, সেটি ছিলো নিম্নরূপ — 'পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি- আল্লাহর রসুল মোহাম্মদের পক্ষ থেকে পারস্যের পারভেযের নামে।'
সালাম সেই ব্যক্তির প্রতি, যিনি হেদায়াতের আনুগত্য করেন এবং আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস-স্থাপন করেন। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শরিক নেই, মোহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রসূল। আমি আপনাকে আল্লাহর প্রতি আহবান জানাচ্ছি। কারণ আমি সকল মানুষের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত।
যারা বেঁচে আছে, তাদেরকে পরিণাম সম্পর্কে ভয় দেখানো এবং কাফেরদের ওপর সত্য কথা প্রমাণিত করাই আমার কাজ। কাজেই, আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন যদি এতে অস্বীকৃতি জানান, তবে সকল অগ্নি উপাসকের পাপও আপনার ওপরই বর্তাবে।
এ চিঠি নিয়ে যাওয়ার জন্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হোযাফা ছাহমিকে (রা.) মনোনীত করা হয়। তিনি চিঠিখানি বাহরাইনের শাসনকর্তার হাতে দেন। বাহরাইনের শাসনকর্তা কোন দূতের মাধ্যমে এ চিঠি পাঠিয়েছিলেন নাকি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হোযাফাকেই প্রেরণ করেছিলেন, সেটা জানা যায়নি। মোটকথা, চিঠিখানি পারভেযকে পড়ে শোনানোর পর সে চিঠিখানি ছিঁড়ে ফেলে অহংকারের সাথে বলে, আমার প্রজাদের মধ্যে একজন সাধারণ প্রজা নিজের নাম আমার, নামের আগে লিখেছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ খবর পাওয়ার পর বলেছিলেন, আল্লাহ তায়ালা তার বাদশাহী ছিন্ন ভিন্ন করে দিন। এরপর তাই হয়েছিলো, যা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন।
সম্রাট তার ইয়েমেনের গভর্ণর বাযানকে লিখে পাঠালো যে, তোমার ওখান থেকে তাগড়া দু'জন লোককে পাঠাও, তারা যেন হেজাজ গিয়ে সে লোককে আমার কাছে ধরে নিয়ে আসে। বাযান সম্রাটের নির্দেশ পালনের জন্যে দু'জন লোককে তার চিঠিসহ আল্লাহর রসূলের কাছে প্রেরণ করে। প্রেরিত দু'জন লোক মদীনায় আল্লাহর রসূলের কাছে গেলো। তাদের একজন বললো, শাহানশাহ একখানি চিঠি লিখে বাযানকে নির্দেশ দিয়েছে আপনাকে যেন তার দরবারে হাযির করা হয়। বাদশাহ বাযান আমাদেরকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন কাজেই, আপনি আমাদের সঙ্গে পারস্যে চলুন। সাথে সাথে উভয় আগন্তুক হুমকিপূর্ণ কিছু কথাও বললো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শান্তভাবে তাদের বললেন, তোমরা আগামীকাল দেখা করো।
এদিকে পারস্যের খসরু পারভেজের পারিবারিক বিদ্রোহ ও কলহ তীব্ররূপ ধারণ করলো। কায়সারের সৈন্যদের হাতে পারস্যের সৈন্যরা একের পর এক পরাজয় স্বীকার করে যাচ্ছিলো। পরিণামে বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ হয়ে সম্রাটের পুত্র শিরওয়াই নিজের পিতাকে হত্যা করে নিজেই ক্ষমতা দখল করলো। সময় ছিলো মঙ্গলবার রাত্রি। সপ্তম হিজরীর ১০ই জমাদিউল আউয়াল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহীর মাধ্যমে এ খবর পেলেন। পরদিন সকালে দুই প্রতিনিধি আল্লাহর রসূলের দরবারে এলে তিনি তাদের এ খবর জানালেন। তারা বললো, আপনি এসব আবোল-তাবোল কি বলছেন? এর চেয়ে ছোট কথাও আমরা আপনার অপরাধ হিসাবে গণ্য করেছি। আমরা কি আপনার এ কথা বাদশাহর কাছে লিখে পাঠাব! রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হাঁ, লিখে দাও। সাথে সাথে একথাও লিখে দাও যে, আমার দ্বীন এবং আমার হুকুমত সেখানেও পৌঁছুবে, যেখানে তোমাদের বাদশাহ পৌছেছে। শুধু তাই নয়, বরং এমন জায়গায়ও পৌঁছুবে, যার পরে উট বা ঘোড়া যেতে পারবে না। তোমরা তাকে একথাও জানিয়ে দিয়ো যে, যদি সে মুসলমান হয়ে যায়, তবে যা কিছু তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেসব তাকে দিয়ে দেয়া হবে এবং তাকেই আমরা তার কওমের বাদশাহ করে দেবো।
উভয় দূত এরপর মদীনা থেকে ইয়েমেনে বাযানের কাছে যায় এবং তাকে সবকথা জানায়। কিছুক্ষণ পরই ইয়েমেনে এক চিঠি এসে পৌঁছায় যে, শিরওয়াই তার পিতাকে হত্যা করে সিংহাসনে আরোহণ করেছেন। নতুন সম্রাট তার চিঠিতে ইয়েমেনের গবর্নর বাযানকে এ নির্দেশও দিয়েছেন যে, আমার পিতা যার সম্পর্কে লিখেছিলেন পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে বিরক্ত করবেন না।
এই ঘটনার কারণে বাযান এবং তার পারস্যের বন্ধু-বান্ধব, যারা সেই সময় ইয়েমেনে উপস্থিত ছিলেন, সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যান।

টিকাঃ
১২. ফহতুল বারী, ৮ম খন্ড, পৃ. ১২৭
১৩. মুহাদিরাতে খাযরামি, ১ম খন্ড, পৃ. ১৪৭, ফতহুল বারী, অষ্টম খন্ড, পৃ. ১২৭, ১২৮, রহমতুল লিল আলামিন

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 রোমক সম্রাট কায়সারের নামে

📄 রোমক সম্রাট কায়সারের নামে


চার) রোমক সম্রাট কায়সারের নামে- সহীহ বোখারীতে একটি দীর্ঘ হাদীসে এ চিঠির বিবরণ উল্লেখ রয়েছে। রসূল রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে যে চিঠি লিখেছিলেন, সে চিঠির বিবরণ নিম্নরূপ-
পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল মোহাম্মদের পক্ষ থেকে রোমের মহান হিরাক্লিয়াসের প্রতি।
সালাম সেই ব্যক্তির প্রতি, যিনি হেদায়াতের আনুগত্য করেন। আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে শান্তিতে থাকবেন। যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে দুই রকমের পুরস্কার পাবেন। যদি অস্বীকৃতি জানান, তবে আপনার প্রজাদের পাপও আপনার ওপর বর্তাবে। হে আহলে কিতাব, এমন একটি বিষয়ের প্রতি আসুন, যা আমাদের ও আপনাদের জন্যে একই সমান। সেটি হচ্ছে যে, আমরা আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা আনুগত্য করবো না। আল্লাহ ব্যতীত আমাদের কাউকে শরিক করবো না। আল্লাহ ব্যতীত আমাদের কেউ পরস্পরকে প্রভু হিসাবে গ্রহণ করবো না। যদি লোকেরা অমান্য করে, তবে তাদের বলে দিন যে, তোমরা সাক্ষী থাকো, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। ১৪
এই চিঠি পৌঁছানোর জন্যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত দেহিয়া ইবনে খলীফা কালবিকে মনোনীত করেন। তাকে বলা হয়, তিনি যেন এই চিঠি বসরার শাসনকর্তার হাতে দেন। বসরার শাসনকর্তা সেটি সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে পৌছে দেবেন। এরপর যা কিছু হয়েছে, তার বিবরণ সহীহ বোখারীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, আবু সুফিয়ান ইবনে হারব তাকে বলেছেন যে, সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাকে কোরায়শদের একদল লোকের সাথে তাঁর দরবারে আমন্ত্রণ জানান। হোদায়বিয়ার সন্ধির শর্তানুযায়ী এই কাফেলা ব্যবসায়ের মালামাল নিয়ে সিরিয়ার ব্যবসার জন্যে গিয়েছিলো। কাফেলা ইলিয়া অর্থাৎ বায়তুল মাকদেসে সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দরবারে হাযির হলেন। ১৫ সম্রাট তাদের কাছে ডাকলেন। সে সময় দরবারে দেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
সম্রাট হিরাক্লিয়াস মক্কার বাণিজ্য প্রতিনিধিদলকে সামনে রেখে তার দোভাষীকে তলব করেন। এরপর দোভাষীর মাধ্যমে জিজ্ঞাসা করেন যে, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবী করেন তার সাথে বংশগত সম্পর্কের দিক থেকে তোমাদের মধ্যে কে কাছাকাছি? আবু সুফিয়ান বলেন, আমি তখন বাদশাহকে জানালাম যে, আমিই তার কাছাকাছি। হিরাক্লিয়াস তখন বললেন, ওকে আমার কাছাকাছি নিয়ে এসো। আর তার সঙ্গীদের তার পেছনে বসাও। এরপর হিরাক্লিয়াস তার

দোভাষীকে বললেন, এ লোকটিকে আমি সেই নবীর দাবীদার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবো। যদি সে কোন কথার জবাবে মিথ্যা বলে, তবে তার সঙ্গীদের বলে দাও, তারা যেন সাথে সাথে প্রতিবাদ করে। আবু সুফিয়ান বলেন, আল্লাহর শপথ, যদি মিথ্যা বলার দুর্নাম হওয়ার ভয় না থাকতো, তবে আমি তাঁর সম্পর্কে অবশ্যই মিথ্যা বলতাম।
আবু সুফিয়ান বলেন, সামনে এনে বসানোর পর হিরাক্লিয়াস সর্বপ্রথম আমাকে প্রশ্ন করেন যে, তোমাদের মধ্যে সে লোকটির বংশ মর্যাদা কেমন?
আমি : তিনি উচ্চ বংশ মর্যাদার অধিকারী। হিরোক্লিয়াস : তিনি যা বলেন, এ রকম কথা কি তাঁর আগে তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ বলেছিলেন? আমি : না। হিরাক্লিয়াস: তার পিতামহের মধ্যে কেউ কি সম্রাট ছিলেন? আমি : না। হিরাক্লিয়াস: বড়লোকেরা তার আনুগত্য করেছে, না দূর্বল লোকেরা? আমি : দূর্বল লোকেরা। হিরাক্লিয়াস : তাদের সংখ্যা বাড়ছে না কমছে? আমি : বেড়েই চলেছে। হিরাক্লিয়াস : এই ধর্ম বিশ্বাস গ্রহণের পর কেউ কি ধর্মান্তরিত হয়েছে? আমি : না। হিরাক্লিয়াস : তিনি যা বলছেন এসব বলার আগে কেউ কি তাকে মিথ্যা বলার জন্যে কখনো অভিযুক্ত করেছে? আমি : না। হিরাক্লিয়াস: তিনি কি বিশ্বাসঘাতকতা করেন? আমি : জ্বী না। তবে বর্তমানে তার সাথে একটি সন্ধিসূত্রে আমরা আবদ্ধ রয়েছি। এ ব্যাপারে তিনি কি করবেন আমরা জানি না। আবু সুফিয়ান বলেন, এই একটি কথা ছাড়া আমি কোন কথা নিজে থেকে সংযোজনের সুযোগ পাইনি। হিরাক্লিয়াস : তোমরা কি তার সাথে যুদ্ধ করেছো? আমি : হাঁ। হিরাক্লিয়াস : তোমাদের এবং তার যুদ্ধ কেমন ছিলো? আমি : যুদ্ধ আমাদের এবং তার মধ্যে বালতির মতো। কখনো তিনি আমাদের পরাজিত করেন, কখনো আমরা তাকে পরাজিত করি। হিরাক্লিয়াস : তিনি তোমাদের কি কাজের আদেশ দেন? আমি : তিনি বলেন, তোমরা শুধু আল্লাহর এবাদাত করো, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না। তোমাদের পিতা-পিতামহ যা বলতেন সত্যবাদিতা, পরহেযগারি, পাক-পবিত্রতা পরিচ্ছন্নতা এবং নিকটাত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহারের আদেশ দিয়ে থাকেন।
এরপর হিরাক্লিয়াস তার দোভাষীকে বললেন, এই লোকটিকে বলো যে, আমি যখন নবুয়তের দাবীদারের বংশ মর্যাদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি, তখন সে বলেছে, তিনি উচ্চ বংশ মর্যাদা সম্পন্ন। নিয়ম হচ্ছে যে, পয়গাম্বর উচ্চ বংশ মর্যাদা সম্পন্ন লোকদের মধ্য থেকেই প্রেরিত হয়ে থাকেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছি যে, তাঁর আগে তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ এ ধরনের

কথা বলেছিলো কিনা। সে বলেছে যে, বলেনি। যদি অন্য কারো বলা কথারই সে পুনরাবৃত্তি করতো, তবে আমি বলতাম যে এই লোকটি অন্যের বলা কথারই প্রতিধ্বনি করছে। আমি জিজ্ঞাসা করেছি যে, তার বাপ-দাদাদের মধ্যে কেউ বাদশাহ ছিলো কিনা? তুমি বলেছ না, ছিলো না। যদি তার বাপ-দাদাদের মধ্যে কেউ বাদশাহ থাকতো তবে আমি বলতাম যে, এই লোক বাপ-দাদার বাদশাহী দাবী করছে। আমি জিজ্ঞাসা করেছি যে, তিনি যা বলছেন, এর আগে তোমরা তাকে মিথ্যাবাদী হিসাবে অভিযুক্ত করেছিলে কিনা? তুমি বলেছো, না, কাজেই মানুষের ব্যাপারে যিনি মিথ্যা কথা বলেন না, তিনি সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে মিথ্যা বলবেন এটা হতেই পারে না। আমি একথাও জিজ্ঞাসা করেছি যে, বড়লোকেরা তার আনুগত্য করছে নাকি দূর্বল লোকেরা? তুমি বলেছ দুর্বল লোকেরা। প্রকৃতপক্ষে দূর্বল লোকেরাই পয়গাম্বরের আগে আনুগত্য করে। আমি জিজ্ঞাসা করেছি যে, তার ধর্ম-বিশ্বাস গ্রহণের পর কেউ ধর্মান্তরিত হয়েছে কিনা, তুমি বলেছো, না। প্রকৃতপক্ষে ঈমানের সজীবতা অন্তরে প্রবেশের পর এরকমই হয়ে থকে। আমি জিজ্ঞাসা করেছি যে, তিনি তোমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন কিনা। তুমি বলেছ, না। প্রকৃতপক্ষে পয়গাম্বর এরকমই হয়ে থাকেন। তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না, বিশ্বাসঘাতকতা করেন না। আমি জিজ্ঞাসা করেছি যে, তিনি কি কি কাজের আদেশ দিয়ে থাকেন? তুমি বলেছো যে, তিনি তোমাদেরকে আল্লাহর এবাদাতের আদেশ করেন, তার সাথে কাউকে শরিক না করার আদেশ করেন, মূর্তিপূজা করতে নিষেধ করেন এবং নামায, সত্যবাদিতা, পরহেযগারি, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার আদেশ দেন। তুমি যা কিছু বলেছো, যদি এসব সত্য হয়ে থাকে তবে তিনি খুব শীঘ্রই আমার দুই পায়ের নীচের জায়গারও মালিক হয়ে যাবেন। আমি জানতাম যে, এই নবী আসবেন কিন্তু আমার ধারণা ছিলো না যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই আসবেন। আমি যদি তার কাছে পৌঁছার কষ্ট স্বীকার করতে সক্ষম হতাম, তবে তাঁর কাছে থেকে তার দুই চরণ ধুয়ে দিতাম।
এরপর হিরাক্লিয়াস রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চিঠি চেয়ে নিয়ে পাঠ করলেন। হিরাক্লিয়াস চিঠি পড়া শেষ করার পরই সেখানে শোরগোল শুরু হলো এবং উচ্চস্বরে কথা শোনা গেলো। হিরাক্লিয়াস আমাদের ব্যাপারে আদেশ দিলেন এবং আমাদেরকে বাইরে বের করে দেয়া হলো। বাইরে এসে সঙ্গীদের আমি বললাম, আবু কাবশার ১৬ পুত্রের ঘটনাতো বেশ সিরিয়াস হয়ে উঠেছে। ওকে তো দেখছি বনু আসফারের ১৭ অর্থাৎ রোমীয়দের বাদশাহও ভয় পায়। এরপর আমি সব সময় এ বিশ্বাস পোষণ করতাম যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বীন বিজয়ী হবেই। আল্লাহ রব্বুল আলামীন এরপর আমার মাঝে ইসলামের আলো জ্বেলে দিয়েছেন।
রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রতি আল্লাহর রসূলের প্রেরিত চিঠির প্রভাবই ছিলো আবু সুফিয়ানের এই বিবরণী। এ চিঠির একটি প্রভাব এটাও ছিলো যে, সম্রাট হিরাক্লিয়াস রসূল

টিকাঃ
১৪. সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড, পৃ. ৪, ৫ ১৫. সেই সময় সম্রাট হিরাক্লিয়াস হামস থেকে বায়তুল মাকদেস গিয়েছিলেন। পারস্যের সাথে যুদ্ধে জয়লাভ করায় আল্লাহ পাকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্যই সম্রাট বায়তুল মাকদেস গিয়েছিলেন। দেখুন সহীহ মুসলিম, ২য় খন্ড, পৃ. ৪-৫। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, খসরু পারভেজের হত্যাকান্ডের পর রোমকরা তাদের হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারের শর্তে পারস্য সম্রাটের সাথে সন্ধি করে। সেই ক্রুশও পারস্য ফেরত দেয় যার সম্পর্কে খৃষ্টানদের বিশ্বাস ছিলো যে, ঐ ক্রুশেই হযরত ঈসাকে (আঃ) ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিলো এই সন্ধির পর ফিরে পাওয়া ক্রুশ যথাস্থানে স্থাপন এবং বিরাট বিজয়ের প্রেক্ষিতে আল্লাহ পাকের শোকরিয়া আদায়ের জন্যই সম্রাট হিরাক্লিয়াস ৬২৯ ঈসায়ী সপ্তম হিজরীতে ইলিয়া অর্থাৎ বায়তুল মাকদেস গমন করেন। ১৬. আবু কাবশার পুত্র বলতে আল্লাহর রসূলকেই বোঝানো হয়েছে। আবু কাবশা তার দাদা বা নানাদের মধ্যে কারো কুনিয়ত ছিলো। এমনও বলা হয়ে থাকে যে, তাঁর দুধ মা হালিমার স্বামীর কুনিয়ত ছিলো আবু কাবশা। মোটকথা আবু কাবশা নাম তেমন পরিচিত নয়। আরবদের নিয়ম ছিলো যে, তারা কারো সমালোচনা করলে তাকে তার বাপদাদাদের মধ্যেকার অপরিচিত কোন লোকের সাথে সম্পৃক্ত করা হতো। ১৭. বনু আসফার। আসফারের সন্তান। আসফার অর্থ পীত। রোমীয়দের বনু আসফার বলা হতো। রোমের যে লোকের সাথে রোমীয়দের বংশগত সম্পর্ক ছিলো, সে কোন কারণে আসফার অর্থাৎ পীত উপাধিতে পরিচিত হয়েছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00