📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 হযরত ওমর (রা.)-এর সংশয়

📄 হযরত ওমর (রা.)-এর সংশয়


হোদায়বিয়ার সন্ধির শর্তাবলী বিভিন্ন দিক থেকে আলোচনা করা হলো। এ শর্তাবলীর মধ্যে দু'টি বিষয় এমন ছিলো যে, তার কারণে মুসলমানরা মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রথমত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন যে, তিনি বায়তুল্লাহ শরীফে যাবেন এবং তওয়াফ করবেন কিন্তু তওয়াফ না করেই তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয়ত তিনি আল্লাহর রসূল এবং সত্যের ওপর ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করবেন বলে ওয়াদা করেছেন। কাজেই আল্লাহর রসূল কেন প্রভাবিত হয়ে এবং নতি স্বীকার করে সন্ধি করলেন? এ দু'টি বিষয় নানা সংশয় এবং প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছিলো এবং মুসলমানদের অনুভূতিতে এতো বেশী আঘাত লেগেছিলো যে, তারা দুঃখ-দুশ্চিন্তায় মুষড়ে পড়েছিলেন। হযরত ওমর ইবনে খাত্তাবই সম্ভবত সবচেয়ে বেশী মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। তিনি আল্লাহর রসূলের কাছে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আমরা কি হক এবং ওরা কি বাতিলের ওপর নেই? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কেন নয়? তিনি বললেন, আমাদের নিহতরা জান্নাত আর ওদের নিহতরা কি জাহান্নামের অধিবাসী নয়? আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন কেন নয়? তিনি বললেন তবে আমরা কেন দ্বীনের ব্যাপারে প্রভাবিত হলাম, এরূপ শর্ত গ্রহণ করলাম এবং এমন অবস্থায় পতিত হলাম? অথচ আল্লাহ তায়ালা এখনো আমাদের এবং ওদের মধ্যে ফয়সালা করেন নি। আল্লাহর রসুল বললেন, খাত্তাবের পুত্র ওমর, আমি আল্লাহর রসূল। কাজেই আমি আল্লাহর নাফরমানি করতে পারি না। আল্লাহ তায়ালা আমাকে সাহায্য করবেন এবং কিছুতেই আমাকে ধ্বংস করবেন না। তিনি বললেন, আপনি কি আমাদের বলেননি যে, বায়তুল্লাহ শরীফে যাবেন এবং তওয়াফ করবেন? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন কেন নয়? কিন্তু আমি কি বলেছিলাম যে, আমরা এবারই সফল হবো? তিনি বললেন জ্বী না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, শোনো তবে, অবশ্যই বায়তুল্লাহর কাছে তোমরা যাবে এবং তার তওয়াফও করবে।
কিন্তু হযরত ওমর (রা.) অসন্তুষ্ট মনে হযরত আবু বকর (রা.)-এর কাছে গিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যেসব কথা বলেছিলেন, তা তাকে বললেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ওমর (রা.)-কে যেরূপ জবাব দিয়েছিলেন, হযরত আবু বকরও সেরূপ জবাব দিলেন। পরে হযরত আবু বকর (রা.) আরো বললেন, আল্লাহর রসূলের প্রতি আনুগত্যে মৃত্যুকাল পর্যন্ত অবিচল থাকো।
পরে আল্লাহ রব্বুল আলামীন সূরা ফতেহ-এ সেসব আয়াত নাযিল করলেন, যার শুরুতে রয়েছে, 'নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে দিয়েছি সুস্পষ্ট বিজয়। এই সূরায় হোদায়বিয়ার সন্ধিকে মুসলমানদের জন্যে সুস্পষ্ট বিজয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতসমূহ নাযিল হওয়ার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ওমরকে ডেকে এনে এবং আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনালেন।
হযরত ওমর (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রসূল, এটা কি বিজয়? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হাঁ বিজয়। একথা শুনে হযরত ওমর (রা.)-এর মন শান্ত হলো এবং তিনি ফিরে এলেন।
পরবর্তীকালে হযরত ওমর (রা.) নিজের ভুল বুঝতে পেরে খুবই লজ্জিত হলেন। তিনি বলেন, সেদিন যে ভুল করেছিলাম, যে কথা বলেছিলাম, সে জন্যে ভয়ে আমি অনেক নেক আমল করেছি, নিয়মিত সদকা খয়রাত করেছি, রোযা রেখেছি, নামায আদায় করেছি, ক্রীতদাস মুক্ত করেছি। এরপর এখন আমি কল্যাণের ব্যাপারে আশাবাদী।

টিকাঃ
৩. ফতহুল বারী, সপ্তম খন্ড, পৃ. ৩৩৯-৪৩৯, সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, ৩৭৮-৪৮১, ২য় খন্ড, পৃ. ৫৯৮-৬০০, ৭১৭, সহীহ মুসলিম, ২য় খন্ড, পৃ. ১০৪, ১০৫, ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, ৩০৮-৩২২ যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, ১২২-১২৭, ও মুখতাছারুস সিরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ২০৭-৩০৫, তারীখে ওমর ইবনে খাত্তাব, ইবনে জওজী প্রণীত, পৃ. ৩৯-৪০

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 দুর্বল মুসলমানদের সমস্যার সমাধান

📄 দুর্বল মুসলমানদের সমস্যার সমাধান


রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় এসে নিশ্চিন্ততা অনুভব করলেন। এ সময় মক্কা থেকে আবু বাছির নামে একজন মুসলমান কাফেরদের অত্যাচার-নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মদীনায় পালিয়ে এলেন। ছাকিফ গোত্রের অধিবাসী ছিলেন আবু বাছির। এই গোত্র ছিলো কোরায়শদের মিত্র। কোরায়শরা আবু বাছিরের ফেরতের জন্যে দুইজন লোককে মদীনায় পাঠালো। তাদের বলে পাঠানো হলো যে, আমাদের এবং আপনাদের মধ্যে যে সন্ধি হয়েছে তার শর্ত বাস্তবায়ন করুন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবাগত আবু বাছিরকে তাদের সঙ্গে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন। ওরা তিনজন যুল হোলায়ফা নামক জায়গায় পৌঁছে খেজুর খেতে লাগলো। এমন সময় আবু বাছির ওদের দুইজনের একজনকে বললেন, আল্লাহর শপথ, তোমার তলোয়ারটা তো দেখতে বেশ সুন্দর। লোকটি খুশীতে গদগদ হয়ে বললো হাঁ, তাই। আমি একাধিকবার পরীক্ষা করে দেখেছি। হযরত আবু বাছির বললেন, আমাকে একটু দেখাও, আমিও দেখি। লোকটি আবু বাছিরের হাতে তলোয়ার তুলে দিলো। আবু বাছির সাথে সাথে লোকটিকে হত্যা করলেন।
অন্য লোকটি পালিয়ে মদীনায় এসে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখে মন্তব্য করলেন যে, এই লোকটি বিপদ দেখেছে। সেই লোক আল্লাহর রসূলের কাছে এসে বললো, আমার সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে। আর আমাকেও হত্যা করা হবে। এমন সময় আবু বাছির ফিরে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আল্লাহ তায়ালা আপনার অঙ্গীকার পূর্ণ করে দিয়েছেন। আপনি আমাকে তাদের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, এরপর আল্লাহ তায়ালা আমাকে ওদের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ওর মায়ের ক্ষতি হোক। ওর কোন সাক্ষী মিলে গেলে তো সে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দেবে। একথা শুনে আবু বাছির বুঝলেন যে, এবার তাকে কাফেরদের হাতে তুলে দেয়া হবে। এ কারণে তিনি মদীনা থেকে বেরিয়ে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় চলে গেলেন। এদিকে আবু জান্দাল ইবনে সোহায়েল মক্কা থেকে পালিয়ে আবু বাছিরের সঙ্গে মিলিত হলেন। কোরায়শদের মধ্যকার যারাই ইসলাম গ্রহণ করতো, তারাই আবু বাছিরের সাথে এসে মিলিত হতো। সেখানে একটি দল গড়ে উঠলো। এরপর এরা সিরিয়ায় যাতায়াতকারী কোরায়শদের বাণিজ্য কাফেলা লুণ্ঠন করতো এবং কাফেলার লোকদের নির্মমভাবে প্রহার করতো। কোরায়শরা অতিষ্ঠ হয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিকটাত্মীয়তার দোহাই দিয়ে আবেদন জানালো যে, আপনি ওদেরকে নিজের কাছে ডেকে নিন। এরপর থেকে মক্কার কোন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে আপনার কাছে গেলে তারা নিরাপদ থাকবে। তাদের ব্যাপারে আমরা প্রশ্ন তুলব না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর সমুদ্র উপকূলীয় মুসলমানদের মদীনায় ডেকে আনলেন।

টিকাঃ
৪. ৩ নং টীকায় উল্লেখ্য গ্রন্থাবলী দ্রষ্টব্য।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 কোরায়শদের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ইসলাম গ্রহণ

📄 কোরায়শদের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ইসলাম গ্রহণ


সন্ধির পর সপ্তম হিজরীর প্রথম দিকে হযরত আমর ইবনুল আস, খালেদ ইবনে ওলীদ ও ওসমান ইবনে তালহা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। এরা আল্লাহর রসূলের কাছে হাযির হলে তিনি বললেন, মক্কা তাদের কলিজার টুকরোদের আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে।
হোদায়বিয়ার সন্ধি ছিলো প্রকৃতপক্ষে ইসলাম এবং মুসলমানদের জীবনে পরিবর্তনের সূচনা। ইসলামের প্রতি শত্রুতায় কোরায়শরা সবচয়ে মজবুত, হঠকারি এবং যুদ্ধংদেহী ছিলো। যুদ্ধের ময়দান থেকে শান্তির ক্ষেত্রে আসার ফলে খন্দকের যুদ্ধের সময়কালের তিনবাহু অর্থাৎ কোরায়শ, গাতফান এবং ইহুদী এই তিনটির একটি বাহু ভেঙ্গে গেলো। কোরায়শরা ছিলো সমগ্র জাযিরাতুল আরবে মূর্তিপূজার একচ্ছত্র প্রতিনিধি ও পৃষ্ঠপোষক। যুদ্ধের ময়দান থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর তাদের মূর্তিপূজার উদ্দীপনাও যেন স্তিমিত হয়ে গেলো। তাদের শত্রুতামূলক আচরণের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন সূচিত হলো। এ কারণেই দেখা যায় যে, সন্ধির পর গাতফান গোত্রের পক্ষ থেকে তেমন কোন শত্রুতামূলক আচরণ করা হয়নি। তারা কিছু করলেও ইহুদীদের উস্কানিতেই করেছে।
ইহুদীরা মদীনা থেকে বহিষ্কারের পর খয়বরকেই নিজেদের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের আখড়া হিসাবে গড়ে তোলে। সেখানে তাদের শয়তান আন্ডাবাচ্চা দিচ্ছিলো। তারা ফেতনার আগুন জ্বালানোর কাজে নিয়োজিত ছিলো। ইহুদীরা মদীনার আশেপাশের বেদুইনদের উস্কানি দিচ্ছিলো এবং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুসলমানদের ধ্বংস করে দেয়া অথবা বড় ধরনের কোন ক্ষতি করার চক্রান্ত করছিলো। এসব কারণে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হোদায়বিয়ার সন্ধির পর সর্বপ্রথম ইহুদীদের দুষ্কৃতির আখড়া সমূলে উৎপাটনে মনোযোগী হন।
মোটকথা হোদায়বিয়ার সন্ধির পর শান্তির যে নবযুগ শুরু হয়েছিলো, এতে মুসলমানরা ইসলামের দাওয়াত, প্রচার এবং দ্বীনের তাবলীগ করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ লাভ করেছিলো। দাওয়াত ও তাবলীগের ময়দানে মুসলমানদের তৎপরতা এ সময়ে তাই বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিলো। যুদ্ধের তৎপরতাকে এই তাবলীগী তৎপরতা ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। সেই সময়কে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।
যুদ্ধের তৎপরতায় আগে দাওয়াত ও তাবলীগের তৎপরতার প্রতি প্রথমে আলোকপাত করাই সমীচীন। কেননা তাবলীগী কাজই অগ্রাধিকার পাওয়ার উপযুক্ত এবং ইসলামের প্রকৃত কাজও সেটাই। এই তাবলীগী কাজের প্রচার প্রসারের জন্যেই মুসলমানরা এতোবেশী বিপদ, মুসিবত, অশান্তি, যুদ্ধ, হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খলা সহ্য করেছিলেন।

টিকাঃ
৫. উল্লিখিত সাহাবাদের ইসলাম গ্রহণের সময় সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। আসমায়ে রেজালের বিভিন্ন গ্রন্থে অষ্টম হিজরীর কথা উল্লেখ রয়েছে। আমর ইবনুল আস নাজ্জাশীর দরবারে ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলে সবাই জানে। এটা হচ্ছে অষ্টম হিজরীর ঘটনা। আমর হাবশা থেকে ফেরার পথে খালেদ এবং ওসমান ইবনে তালহার সাথে তার সাক্ষাৎ হয় এবং তিনজন একত্রে আল্লাহর রসূলের কাছে হাযির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। এতে বোঝা যায় যে, এরাও সপ্তম হিজরীর প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আল্লাহ পাকই সবকিছু ভালো জানেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00