📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ওমরাহ শেষ মনে করে কোরবানী করা এবং চুল কাটা

📄 ওমরাহ শেষ মনে করে কোরবানী করা এবং চুল কাটা


রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্ধির শর্তাবলী লেখানোর পর বললেন, ওঠো এবং নিজ নিজ পশু কোরবানী করো। সাহাবাদের কেউ উঠলেন না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার একই কথা বললেন, একই আদেশ করলেন। কিন্তু কেউ কোন আগ্রহ দেখালেন না। অতপর তিনি উম্মুল মোমেনীন হযরত উম্মে সালমার (রা.) কাছে একথা ব্যক্ত করলেন। নবীসহধর্মিনী বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আপনি যদি মনে করে থাকেন যে, হোদীর পশু যবাই করা প্রয়োজন, আপনি নিজেই যান, কাউকে কিছু না বলে নিজের হোদীর পশু যবাই করুন। এরপর আপনার নাপিতকে ডেকে মাথার চুল কামিয়ে ফেলুন। উম্মুল মোমেনীনের পরামর্শ অনুযায়ী রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের হোদীর পশু যবাই করলেন এবং নিজের মাথার চুল কামানোর ব্যবস্থা করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাহাবারা আল্লাহর রসূলের দেখাদেখি নিজ নিজ হোদীর পশু যবাই করলেন। এরপর একে অন্যের মাথার চুল কাটতে শুরু করলেন। কেউ সব চুল কামিয়ে ফেললেন কেউ চুল ছাঁটাই করিয়ে ছোট করালেন। সবাই গম্ভীর এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। প্রত্যেকের মনের অবস্থা এতো খারাপ ছিলো যে, মনে হয় তারা চিন্তার আতিশয্যে একে অন্যকে খুন করবেন। এ সময়ে গাভী এবং উট সাত সাতজন লোকের পক্ষ থেকে যবাই করা হয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু জেহেলের একটি উট যবাই করেন। এই উটটির নাকে একটি রূপার বালি ছিলো। এ কাজের উদ্দেশ্য ছিলো এই যে, মোশরেকরা এ খবর পাওয়ার পর যেন নিষ্ফল ক্রোধে অধীর হয়ে ওঠে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতপর যারা মাথা কামিয়েছেন, তাদের জন্যে তিনবার এবং যারা চুল কাঁচি দিয়ে ছোট করেছেন তাদের জন্যে একবার মাগফেরাতের দোয়া করেন। এই সফরে আল্লাহ রব্বুল আলামীন হযরত কা'ব ইবনে আযারার ক্ষেত্রে এ নির্দেশ নাযিল করেন, যে ব্যক্তি কষ্টের কারণে এহরাম অবস্থায় নিজের না মাথা কামায়, সে যেন রোযা, সদকা বা পশু যবাইয়ের মাধ্যমে ফিদিয়া প্রদান করে।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মোহাজের মহিলাদের ফেরত দিতে কাফেরদের অস্বীকৃতি

📄 মোহাজের মহিলাদের ফেরত দিতে কাফেরদের অস্বীকৃতি


মক্কা থেকে কিছুসংখ্যক মোমেন মহিলা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলেন। তাদের আত্মীয় স্বজন হোদায়বিয়ার সন্ধি অনুযায়ী তাদের ফেরত দাবী করলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দাবী প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি যুক্তি দেখালেন যে, এ বিষয়ে চুক্তিতে লিখিত বক্তব্য হচ্ছে এই চুক্তি এই শর্তের ওপর করা হচ্ছে যে, আমাদের যে পুরুষ আপনাদের কাছে যাবে তারা যে ধর্ম বিশ্বাসের ওপরই থাকুক না কেন তাদের অবশ্যই ফিরিয়ে দিতে হবে। এখানে মহিলাদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়নি। কাজেই মহিলারা সন্ধির এ শর্তের আওতা বহির্ভূত। আল্লাহ রব্বুল আলামীন এরপর এই আয়াত নাযিল করেন। 'হে মোমেনরা, তোমাদের কাছে মোমেন নারীরা দেশত্যাগী হয়ে এলে তাদেরকে পরীক্ষা করিও। আল্লাহ তাদের ঈমান সমন্ধে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা জানতে পারো যে, তারা মোমেন, তবে তাদের কাফেরদের কাছে ফেরত পাঠিও না। মোমেন নারীরা কাফেরদের জন্যে বৈধ নয় এবং কাফেররা মোমেন নারীদের জন্যে বৈধ নয়। কাফেররা যা ব্যয় করেছে, তা ওদের ফিরিয়ে দিও। তোমরা তাদের বিয়ে করলে তোমাদের কোন অপরাধ হবে না, যদি তোমরা তাদেরকে তাদের মোহরানা দাও। তোমরা কাফের নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না।' (সূরা মুমতাহানা, আয়াত ১০)
এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর কোন মোমেন মহিলা হিজরত করে এলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ রব্বুল আলামীন এ সম্পর্কে বলেন, 'হে নবী, মোমেন নারীরা যখন তোমার কাছে এসে বাইয়াত করে এ মর্মে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোন শরিক স্থির করবে না, চুরি করবে না, ব্যাভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানকে হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোন অপবাদ রচনা করে রটাবে না এবং সৎকাজে তোমাকে অমান্য করবে না, তখন তাদের বাইয়াত গ্রহণ করো এবং তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা মুমতাহানা, আয়াত ১২)
হিজরত করে আসা মহিলারা উক্ত আয়াতের শর্তাবলী অনুযায়ী অঙ্গীকার করতেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, আমি তোমাদের কাছ থেকে বাইয়াত নিলাম। এরপর তাদের ফেরত পাঠাতেন না।
এ নির্দেশ অনুযায়ী মুসলমানরা তাদের অমুসলিম অর্থাৎ কাফের স্ত্রীদের তালাক দিয়ে দেন। সেই সময় হযরত ওমরের (রা.) দুইজন স্ত্রী ছিলেন কাফের। তিনি তাদের তালাক দিলেন। এদের একজনকে মুয়াবিয়া, অন্যজনকে সফওয়ান ইবনে উমাইয়া বিয়ে করেন।

টিকাঃ
১. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৩০৭

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 সন্ধির শর্তাবলীর মোদ্দাকথা

📄 সন্ধির শর্তাবলীর মোদ্দাকথা


এই হচ্ছে হোদায়বিয়ার সন্ধি। এ সন্ধির শর্তাবলী গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, এটা ছিলো মুসলমানদের এক বিরাট বিজয়। কেননা এতাদিন যাবত কোরায়শরা মুসলমানদের অস্তিত্বই স্বীকার করছিলো না। তাঁদের নাস্তানাবুদ করতে তারা ছিলো সংকল্পবদ্ধ। তারা অপেক্ষায় ছিলো যে, একাদিন না একদিন এ শক্তি নিশেষ হয়ে যাবেই। এছাড়া কোরায়শরা জাযিরাতুল আরবে দ্বীনী ও দুনিয়াবী কাজকর্মে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত থাকায় ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে সর্বশক্তিতে বাধা সৃষ্টিতে সচেষ্ট থাকতো। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে সন্ধি সম্পর্কে একটুখানি চিন্তা করলেই বোঝা যায় যে, এটা ছিলো মুসলমানদের শক্তির স্বীকৃতি এবং একথার ঘোষণা যে, এখন আর কোরায়শদের পক্ষে মুসলমানদের শক্তিকে নস্যাৎ করার সাধ্য কারো নেই। সন্ধির তৃতীয় দফার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এই যে, কোরায়শরা দ্বীনী ও দুনিয়াবী ক্ষেত্রে যে দায়িত্ব লাভ করেছিলো, সে দায়িত্ব পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছে। তারা এখন শুধু নিজের স্বার্থ চিন্তায় বিভোর। অন্য লোকদের জন্যে তাদের কোন চিন্তা বা মাথা ব্যথা নেই। অর্থাৎ সমগ্র জাযিরাতুল আরবের জনসাধারণও যদি ইসলাম গ্রহণ করে, তবু কোরায়শদের ওতে কিছু আসে যায় না। এ ব্যাপারে তারা কোনরকম হস্তক্ষেপ করবে না। কোরায়শদের সঙ্কল্প এবং উদ্দেশ্যের প্রেক্ষিতে এটা কি তাদের সুস্পষ্ট পরাজয় নয়? মুসলমানদের অবস্থার প্রেক্ষিতে এটা কি তাদের সুস্পষ্ট বিজয় নয়? ইসলামের অনুসারী এবং ইসলামের শত্রুদের মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিলো, তার উদ্দেশ্য তো এটাই ছিলো যে, ধর্ম-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মানুষ যেন পূর্ণ স্বাধীনতা এবং স্বয়ং সম্পূর্ণতা লাভ করে। অর্থাৎ স্বাধীন ইচ্ছার মাধ্যমে যার খুশী মুসলমান হবে, যার খুশী কাফের থেকে যাবে। কোন শক্তি তাদের এ ইচ্ছা বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
মুসলমানদের তো এ উদ্দেশ্য কখনোই ছিলো না যে, তারা কাফেরদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেবে, তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে অথবা জোর করে তাদের মুসলমান করবে। মুসলমানদের উদ্দেশ্যে তো ছিলো সেটাই আল্লামা ইকবালের ভাষায় এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে, 'মোমেন বান্দার মকসুদ-সে তো হচ্ছে শাহাদাত চায়না সে বাহাদুরি চায় না মালে গনীমত।'
লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় যে, হোদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে মুসলমানরা তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধ জয়ের সাফল্যের চেয়ে এ সাফল্যের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক বেশী। এ স্বাধীনতার কারণে মুসলমানরা দাওয়াত ও তাবলীগের ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য লাভে সক্ষম হয়েছে। এই সন্ধির আগ পর্যন্ত মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা কখনোই তিন হাজারের বেশী ছিলো না, সেই সংখ্যা দুই বছরের মধ্যে মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে দশ হাজারে উন্নীত হয়েছে। সন্ধির দ্বিতীয় দফাও সুস্পষ্ট বিজয়ের একটি অংশ। কেননা যুদ্ধের সূচনা মুসলমানরা নয় বরং কাফেররাই করেছিলো। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'ওরাই প্রথমে তোমাদের সাথে শুরু করেছে।'
মুসলমানরা সামরিক অভিযানের মাধমে কোরায়শদেরকে নির্বুদ্ধিতামূলক আচরণ অর্থাৎ আল্লাহর পথ থেকে বিরত রাখার প্রচেষ্টা ও হঠকারিতা থেকে ফিরিয়ে রাখতে চেয়েছেন। পারস্পরিক ক্ষেত্রে সমান অধিকার লাভই ছিলো মুসলমানদের দাবী। নিজ নিজ ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ সমভাবে কাজ করবে, সমান অধিকার ভোগ করবে এবং স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করবে। কিন্তু অমুসলিমরা তা দেয়নি। অবশেষে দশ বছর যুদ্ধ বন্ধ রাখার শর্ত সন্ধিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর অর্থ হচ্ছে যে, তারা আর আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করবে না। এর অর্থ হচ্ছে যে, যুদ্ধের সূচনাকারীরা দূর্বল, নিরূপায় এবং চরয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
সন্ধির প্রথম দফায় উল্লিখিত বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এটা প্রকৃতপক্ষে মুসলমানদের সাফল্যের নিদর্শন। ব্যর্থতা কিছুতেই নয়। কেননা কাফেররা মুসলমানদের জন্যে কাবা শরীফে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছিলো, এই দফার মাধ্যমে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারেরই ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তবে কাফেরদের এ দফায় সান্ত্বনা পাওয়ার মতো বিষয় রয়েছে। সেটা এই যে, তারা এক বছরের জন্যে মুসলমানদেরকে তাদের প্রিয় বায়তুল্লাহ থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এটা যে সাময়িক এবং নিরর্থক সাফল্য, সে কথা না বললেও বোঝা যায়।
হোদায়বিয়ার সন্ধি আরো ভালোভাবে পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, কোরায়শরা মুসলমানদের তিনটি সুবিধা দিয়ে নিজেরা একটি সুবিধা লাভ করেছে। সে সুবিধার কথা সন্ধির চতুর্থ দফায় উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এই সুবিধা খুবই মামুলি এবং মূল্যহীন। এতে মুসলমানদের কোন ক্ষতি ছিলো না। কেননা এটাতো জানা কথা যে, মুসলমানরা যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলমান' থাকবে ততক্ষণ তারা মদীনা থেকে পালিয়ে মক্কায় যাবে না। একমাত্র ধর্মান্তরিত বা মোরতাদ হলেই তারা পালিয়ে যেতে পারে। সেটা প্রকাশ্য বা গোপনীয় মোরতাদ হওয়া যে কোন প্রকারই হতে পারে। কোন মুসলমান ধর্মান্তরিত হওয়ার পর মুসলমানদের কাছে তার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়। তখন তার ইসলামী সমাজে থাকার চেয়ে বেরিয়ে যাওয়াই মুসলমানদের জন্যে কল্যাণকর। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেদিকে ইঙ্গিত করেই বলেছিলেন, যে ব্যক্তি আমাদের ছেড়ে মোশরেকদের কাছে পালিয়ে গেছে, আল্লাহ তায়ালা তাকে দূর করে দিয়েছেন।
মক্কার যেসকল মানুষ মুসলমান হয়েছেন বা হবেন, তাদের বিষয়ে তো সন্ধির শর্তাবলীতে কোন সুবিধা রাখা হয়নি। কাজেই তাদের মদীনায় আশ্রয় লাভের কোন সুযোগ নেই। কিন্তু মহান আল্লাহর পৃথিবী তো অনেক প্রশস্ত। নাযুক সময়ে হাবশার যমিন কি মুসলমানদের জন্যে আশ্রয়স্থল হয়নি? সেই সময় মদীনার অধিবাসীরাতো ইসলামের নামও জানতো না। এখনো দুনিয়ার কোন না কোন অংশ মুসলমানদের জন্যে বক্ষ বিস্তার করবে। এদিকে ইঙ্গিত করেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'ওদের যে লোক আমাদের কাছে আসবে, আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্যে প্রশস্ততা এবং বেরিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেবেন।'
এ ধরনের ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যত কোরায়শরা লাভবান হয়েছিলো কিন্তু এটা প্রকৃতপক্ষে কোরায়শদের মানসিক ভয়-ভীতি, পেরেশানি, আতঙ্ক, অস্থিরতা এবং পরাজয়ের নিদর্শন। এতে বোঝা যায় যে, তারা তাদের মূর্তিনির্ভর সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে পড়েছিলো। তারা অনুভব করছিলো যে, তাদের এ সমাজদেহ এমন এক ক্ষণভঙ্গুর অন্তসারশূন্য অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, যা যে কোন মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে। কাজেই এর হেফাযতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা অপরিহার্য। অন্যদিকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেরূপ উদারচিত্তে এ শর্ত মেনে নিয়েছেন যে, কোরায়শদের কাছে আশ্রয়গ্রহণকারী কোন মুসলমানকে ফেরত চাইবেন না, এতে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী সমাজের পরিপক্কতা এবং দৃঢ়তা সম্পর্কে তার আস্থা ছিলো পূর্ণ মাত্রায়। তাই এরূপ ধরনের শর্তে কোন প্রকার ক্ষতি হবে না।

টিকাঃ
২. সহীহ মুসলিম, হোদায়বিয়ার সন্ধি ২য় খন্ড, পৃ. ১০৫

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 হযরত ওমর (রা.)-এর সংশয়

📄 হযরত ওমর (রা.)-এর সংশয়


হোদায়বিয়ার সন্ধির শর্তাবলী বিভিন্ন দিক থেকে আলোচনা করা হলো। এ শর্তাবলীর মধ্যে দু'টি বিষয় এমন ছিলো যে, তার কারণে মুসলমানরা মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রথমত রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন যে, তিনি বায়তুল্লাহ শরীফে যাবেন এবং তওয়াফ করবেন কিন্তু তওয়াফ না করেই তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয়ত তিনি আল্লাহর রসূল এবং সত্যের ওপর ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করবেন বলে ওয়াদা করেছেন। কাজেই আল্লাহর রসূল কেন প্রভাবিত হয়ে এবং নতি স্বীকার করে সন্ধি করলেন? এ দু'টি বিষয় নানা সংশয় এবং প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছিলো এবং মুসলমানদের অনুভূতিতে এতো বেশী আঘাত লেগেছিলো যে, তারা দুঃখ-দুশ্চিন্তায় মুষড়ে পড়েছিলেন। হযরত ওমর ইবনে খাত্তাবই সম্ভবত সবচেয়ে বেশী মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। তিনি আল্লাহর রসূলের কাছে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল, আমরা কি হক এবং ওরা কি বাতিলের ওপর নেই? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কেন নয়? তিনি বললেন, আমাদের নিহতরা জান্নাত আর ওদের নিহতরা কি জাহান্নামের অধিবাসী নয়? আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন কেন নয়? তিনি বললেন তবে আমরা কেন দ্বীনের ব্যাপারে প্রভাবিত হলাম, এরূপ শর্ত গ্রহণ করলাম এবং এমন অবস্থায় পতিত হলাম? অথচ আল্লাহ তায়ালা এখনো আমাদের এবং ওদের মধ্যে ফয়সালা করেন নি। আল্লাহর রসুল বললেন, খাত্তাবের পুত্র ওমর, আমি আল্লাহর রসূল। কাজেই আমি আল্লাহর নাফরমানি করতে পারি না। আল্লাহ তায়ালা আমাকে সাহায্য করবেন এবং কিছুতেই আমাকে ধ্বংস করবেন না। তিনি বললেন, আপনি কি আমাদের বলেননি যে, বায়তুল্লাহ শরীফে যাবেন এবং তওয়াফ করবেন? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন কেন নয়? কিন্তু আমি কি বলেছিলাম যে, আমরা এবারই সফল হবো? তিনি বললেন জ্বী না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, শোনো তবে, অবশ্যই বায়তুল্লাহর কাছে তোমরা যাবে এবং তার তওয়াফও করবে।
কিন্তু হযরত ওমর (রা.) অসন্তুষ্ট মনে হযরত আবু বকর (রা.)-এর কাছে গিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যেসব কথা বলেছিলেন, তা তাকে বললেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ওমর (রা.)-কে যেরূপ জবাব দিয়েছিলেন, হযরত আবু বকরও সেরূপ জবাব দিলেন। পরে হযরত আবু বকর (রা.) আরো বললেন, আল্লাহর রসূলের প্রতি আনুগত্যে মৃত্যুকাল পর্যন্ত অবিচল থাকো।
পরে আল্লাহ রব্বুল আলামীন সূরা ফতেহ-এ সেসব আয়াত নাযিল করলেন, যার শুরুতে রয়েছে, 'নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে দিয়েছি সুস্পষ্ট বিজয়। এই সূরায় হোদায়বিয়ার সন্ধিকে মুসলমানদের জন্যে সুস্পষ্ট বিজয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতসমূহ নাযিল হওয়ার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ওমরকে ডেকে এনে এবং আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনালেন।
হযরত ওমর (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রসূল, এটা কি বিজয়? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হাঁ বিজয়। একথা শুনে হযরত ওমর (রা.)-এর মন শান্ত হলো এবং তিনি ফিরে এলেন।
পরবর্তীকালে হযরত ওমর (রা.) নিজের ভুল বুঝতে পেরে খুবই লজ্জিত হলেন। তিনি বলেন, সেদিন যে ভুল করেছিলাম, যে কথা বলেছিলাম, সে জন্যে ভয়ে আমি অনেক নেক আমল করেছি, নিয়মিত সদকা খয়রাত করেছি, রোযা রেখেছি, নামায আদায় করেছি, ক্রীতদাস মুক্ত করেছি। এরপর এখন আমি কল্যাণের ব্যাপারে আশাবাদী।

টিকাঃ
৩. ফতহুল বারী, সপ্তম খন্ড, পৃ. ৩৩৯-৪৩৯, সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, ৩৭৮-৪৮১, ২য় খন্ড, পৃ. ৫৯৮-৬০০, ৭১৭, সহীহ মুসলিম, ২য় খন্ড, পৃ. ১০৪, ১০৫, ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, ৩০৮-৩২২ যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, ১২২-১২৭, ও মুখতাছারুস সিরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ২০৭-৩০৫, তারীখে ওমর ইবনে খাত্তাব, ইবনে জওজী প্রণীত, পৃ. ৩৯-৪০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00