📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 হযরত ওসমান (রা.)-এর মক্কায় গমন

📄 হযরত ওসমান (রা.)-এর মক্কায় গমন


রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় একজন দূত পাঠিয়ে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য কোরায়শদের কাছে সুষ্ঠভাবে ব্যক্ত করার প্রয়োজন অনুভব করলেন। একাজে তিনি ওমর ইবনে খাত্তাবকে (রা.) ডাকলেন। হযরত ওমর (রা.) এটি বলে অপারগতা প্রকাশ করলেন যে, হে আল্লাহর রসূল, যদি অমুসলিমরা আমার ওপর নির্যাতন করে তবে মক্কায় বনি কা'ব গোত্রের একজন লোকও আমার সমর্থনে এসে দাঁড়াবে না। হযরত ওসমানই আমার বিবেচনায় এ কাজের উপযুক্ত। তাকে প্রেরণের আমি আবেদন জানাচ্ছি। তাঁর গোত্রের লোকেরা মক্কায় রয়েছে এবং তিনি কোরায়শদের কাছে আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন হযরত ওসমানকে ডাকলেন এবং কোরায়শদের কাছে যাওয়ার আদেশ দিয়ে বললেন, তুমি ওদের গিয়ে বলবে যে, আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি, ওমরাহ পালনের জন্যেই আমরা এসেছি। তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ওসমান (রা.)-কে একথাও বললেন যে, তিনি যেন মক্কার ঈমানদার পুরুষ ও মহিলাদের কাছে গিয়ে তাদের সান্ত্বনা দেন। তিনি যেন তাদের বলেন যে, আল্লাহ তায়ালা জাল্লা শানুহু শীঘ্রই মক্কায় ইসলামকে বিজয়ী শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। ঈমানদার হওয়ার কারণে তখন কাউকে চুপিসারে আল্লাহর এবাদাত-বন্দেগী করতে হবে না। হযরত ওসমান (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পয়গাম নিয়ে রওয়ানা হলেন। বালদাহ নামক জায়গায় কয়েকজন কোরায়শী লোকের সাথে দেখা হলো। তারা বললো, কোথায় যাচ্ছেন? হযরত ওসমান (রা.) বললেন, আল্লাহর রসূল হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে এই

বক্তব্যসহ তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। কোরায়শী লোকেরা বললো, আপনার আনীত বক্তব্য আমরা আগেই শুনেছি। আপনি নিজের কাজে যান। এদিকে সাঈদ ইবনে আস উঠে হযরত ওসমানকে (রা.) বললেন, মারহাবা। এরপর নিজের ঘোড়ায় জিন বেঁধে হযরত ওসমানকে (রা.) পিঠে তুলে মক্কায় বাসভবনে নিয়ে গেলেন। সেখানে হযরত ওসমান (রা.) কোরায়শ নেতাদের কাছে আল্লাহর রসূলের বক্তব্য ব্যাখ্যা করলেন। কোরায়শরা হযরত ওসমান (রা.)-কে কাবাঘর তওয়াফের প্রস্তাব দিলো, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগে কাবাঘর তওয়াফ করা তিনি পছন্দ করলেন না।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 হযরত ওসমান (রা.)-এর শাহাদাতের গুজব ও বাইয়াতে রেজোয়ান

📄 হযরত ওসমান (রা.)-এর শাহাদাতের গুজব ও বাইয়াতে রেজোয়ান


হযরত ওসমান (রা.) তাঁর ওপর অর্পিত কাজ সম্পন্ন করলেন। কিন্তু কোরায়শরা তাঁকে তাদের কাছেই রেখে দিলো। সম্ভবত তারা চাচ্ছিলো যে, উদ্ভুত পরিস্থিতির আলোকে পারস্পরিক পরামর্শক্রমে সুনির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হবে। এরপর তারা হযরত ওসমান (রা.)-এর আনীত বক্তব্যের জবাব পাঠাবে। দীর্ঘ সময় হযরত ওসমানের (রা.) ফিরে না আসায় মুসলমানদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে, তাকে হত্যা করা হয়েছে। আল্লাহর রসূলকে এ খবর জানানো হলে তিনি বললেন, কোরায়শদের সাথে যুদ্ধ না করে আমরা এ জায়গা থেকে যাব না। একথা বলার পর তিনি সাহাবাদের বাইয়াতের জন্যে আহ্বান জানালেন। সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত আগ্রহ দেখিয়ে এবং এ মর্মে বাইয়াত করলেন যে, যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে কেউ পলায়ন করবে না। সর্বাগ্রে বাইয়াত করলেন আবু ছানান আছাদী। হযরত সালমা ইবনে আকোয়া (রা.) তিনবার বাইয়াত করলেন। শুরু, মাঝামাঝি সময়ে এবং শেষদিকে। আল্লাহর রসূল নিজের এক হাত অন্য হাতে নিয়ে বললেন, এ হাত ওসমানের। বাইয়াত গ্রহণ শেষ হলে হযরত ওসমান (রা.) এসে হাযির হলে তিনিও বাইয়াত করলেন। বাইয়াতে জাদ ইবনে কয়েস নামক একজন লোক অংশ নেয়নি। সে ছিলো মোনাফেক।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গাছের নীচে এই বাইয়াত গ্রহণ করেন। হযরত ওমর (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত ধরে রেখেছিলেন। হযরত মা'কাল ইবনে ইয়াছার (রা.) গাছের কয়েকটি শাখা ধরে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর থেকে সরিয়ে রাখছিলেন। এই বাইয়াত সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কোরআনে করিমে এই আয়াত নাযিল করেন, 'মোমেনরা যখন বৃক্ষতলে তোমার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করলো, তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন।' (সূরা ফাতেহ, আয়াত ১৮)

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ঐতিহাসিক সন্ধির শর্তসমূহ

📄 ঐতিহাসিক সন্ধির শর্তসমূহ


কোরায়শরা পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করলো। এরপর খুব দ্রুত সোহায়েল ইবনে আমরকে সন্ধি করতে প্রেরণ করলো। সোহায়েলকে তাকিদ দিয়ে বলে দেয়া হলো, আল্লাহর রসূল যেন এ বছর ফিরে যান। কেননা আরবরা বলাবলি করতে পারে যে, তিনি আমাদের শহরে জোর করে প্রবেশ করেছেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোহায়েলকে দেখে সাহাবাদের বললেন, তোমাদের কাজ তোমাদের জন্যে সহজ করে দেয়া হয়েছে। এই লোকটিকে প্রেরণের অর্থ হচ্ছে, কোরায়শরা সন্ধি চায়। সোহায়েল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বেশ কিছুক্ষণ তাঁর সাথে আলাপ করলেন। এরপর সন্ধির শর্তাবলী প্রণয়ন করা হলো, শর্তাবলী নিম্নরূপ।
এক) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করেই ফিরে যাবেন। আগামী বছর মুসলমানরা মক্কায় আসবেন এবং তিনদিন অবস্থান করবেন। তাঁদের সঙ্গে আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র থাকবে। তলোয়ার থাকবে কোষবদ্ধ। কেউ তাদের উত্যক্ত করবে না।
দুই) উভয় পক্ষ দশ বছর যাবত যুদ্ধ বন্ধ রাখবে। এই সময়ে জনসাধারণ নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ থাকবে। কেউ কারো ওপর হাত তুলবে না।
তিন) মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতাদর্শে যারা ইচ্ছা করে, তারা প্রবেশ করতে পারবে কোরায়শদের মতাদর্শে যারা থাকতে চায়, তারা থাকতে পারবে। যে গোত্র অন্য গোত্রে প্রবেশ করবে, সে সেই গোত্রের একাংশ হিসাবে বিবেচিত হবে। কাজেই এমন কোন গোত্রের ওপর বাড়াবাড়ি করা হলে সেই প্রবিষ্ট গোত্রের লোকদের ওপরও বাড়াবাড়ি করা হয়েছে মনে করতে হবে।
চার) কোরায়শদের কোন লোক যদি নেতাদের অনুমতি ছাড়া অর্থাৎ পালিয়ে মোহাম্মদের কাছে যায় তিনি তাকে ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু মোহাম্মদের সঙ্গীদের মধ্যে কেউ যদি আশ্রয় লাভের জন্যে কোরায়শদের কাছে যায়, তবে কোরায়শরা তাকে ফেরত দেবে না।
চুক্তির খসড়া প্রণীত হওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেরে খোদা হযরত আলী (রা.)-কে ডেকে শর্তাবলী লেখালেন। শুরুতে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' লেখার জন্যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন। অর্থাৎ পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। এতে সোহায়েল বললো, আমরা তো জানি না রহমান কি? আপনি বরং এভাবে লিখতে বলুন, বি-ইসমিকা আল্লাহুম্মা। অর্থাৎ আপনার নামে হে আল্লাহ। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী (রা.)-কে তাই লিখতে বললেন। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, নিম্নোক্ত বক্তব্যসমূহের ওপর আল্লাহর রসূল মোহাম্মদ সন্ধি করেছেন। এ কথা শুনে সোহায়েল বললো, আমরা যদি জানতাম যে, আপনি আল্লাহর রসূল, তবে কাবাঘরে তওয়াফে আপনাকে বাধা দিতাম না এবং আপনার সাথে যুদ্ধও করতাম না। আপনি মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ লিখতে বলুন। তিনি বললেন, তোমরা স্বীকার না করলেও আমি আল্লাহর রসূল। এরপর হযরত আলী (রা.)-কে বললেন, মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ লেখো এবং রসূলুল্লাহ শব্দ মুছে দাও। হযরত আলী (রা.) রাযি হলেন না, আল্লাহর রসূল নিজ হাতে শব্দটি মুছে দিলেন। এরপর সন্ধির শর্তাবলী পুরোপুরি লিপিবদ্ধ করা হলো।
সন্ধি সম্পন্ন হওয়ার পর বনু খাযাআ গোত্র রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতাদর্শে প্রবেশ করলো। এই গোত্রের লোকেরা প্রকৃতপক্ষে আবদুল মোত্তালেবের সময়েও বনু হাশেমের মিত্র ছিলো। গ্রন্থের শুরুতেই এ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। মতাদর্শে প্রবেশ বা মতাদর্শ গ্রহণ করার অর্থ হচ্ছে প্রাচীন মিত্রের মিত্রতার স্বীকারোক্তি এবং মিত্রতা সম্পর্কের সুদৃঢ়করণ। অন্যদিকে বনু বকর গোত্র কোরায়শদের মতাদর্শে প্রবেশ করে।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 আবু জান্দালের প্রত্যাবর্তন

📄 আবু জান্দালের প্রত্যাবর্তন


সন্ধির শর্তাবলী লেখা হচ্ছিলো এমন সময় শেকল পরিহিত অবস্থায় শেকল টানতে টানতে সেখানে এসে হাযির হলেন সোহায়েলের পুত্র আবু জান্দাল। তিনি মক্কা থেকে এসে নিজেকে মুসলমানদের মধ্যে ফেলে দিলেন। সোহায়েল বললো, ওর সম্পর্কে সর্বপ্রথম আমি আপনার সাথে সন্ধির শর্ত বাস্তবায়ন করছি। আপনি ওকে ফিরিয়ে দিন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সন্ধির কাজ এখনো তো শেষ হয়নি। সোহায়েল বললো, আবু জান্দালকে ফেরত না দিলে আপনার সাথে আমি সন্ধিই করবো না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোহায়েলকে বললো, আচ্ছা, তুমি ওকে আমার খাতিরে ছেড়ে দাও। সোহায়েল বললো, আপনার খাতিরেও ওকে ছেড়ে দিতে পারব না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় অনুরোধ জানালেন, দাওনা ছেড়ে!
সোহায়েল বললো, না, না, দিতে পারব না। এরপর সোহায়েল আবু জান্দালের মুখে থাপ্পড় মারলো এবং মক্কায় ফিরিয়ে নেয়ার জন্যে জামার কলার ধরে টানাটানি করতে লাগলো। আবু জান্দাল তখন চিৎকার করে বললেন, হে মুসলমানরা, আমি কি পুনরায় পৌত্তলিকদের কাছে ফিরে যাব? ওরা আমার দ্বীনের ব্যাপারে আমাকে ফেতনার মধ্যে ফেলে দেবে। আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবু জান্দাল, তুমি ধৈর্যধারণ করো এবং এই ধৈর্যকেই সওয়াবের কারণ মনে করো। আল্লাহ তায়ালা তোমার এবং তোমার সঙ্গী অন্যান্য কমযোর মুসলমানদের জন্যে প্রশস্ততা এবং আশ্রয়ের জায়গা করে দেবেন। আমরা কোরায়শদের সাথে সন্ধি করেছি। আমরা তাদের সাথে এবং তারা আমাদের সাথে আল্লাহর নামে অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছি। কাজেই আমরা সন্ধির শর্ত লংঘন করতে পারি না।
হযরত ওমর (রা.) দ্রুত আবু জান্দালের কাছে গেলেন। তিনি তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলছিলেন, আবু জান্দাল ধৈর্যধারণ করো, ওরা মোশরেক, পৌত্তলিক। ওদের রক্ত কুকুরের রক্ত। একথা বলার সাথে সাথে হযরত ওমর (রা.) নিজের তলোয়ার আবু জান্দালের কাছে নিয়ে যাচ্ছিলেন। হযরত ওমর (রা.) পরে বলেছেন, আমি আশা করেছিলাম যে, আবু জান্দাল আমার কাছ থেকে তলোয়ার নিয়ে তার পিতাকে শেষ করে দেবে। কিন্তু আবু জান্দাল তা করেননি। অবশেষে সন্ধির শর্ত বাস্তবায়িত হলো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00