📄 কোরায়শদের দ্রুত প্রেরণ
এরপর বনু কেনানা গোত্রের হালিস ইবনে আলকামা নামক এক ব্যক্তি বললো, আমাকে ওদের কাছে যেতে দাও। কোরায়শরা অনুমতি প্রদান করলো। ওকে দেখে প্রিয় নবী সাহাবাদের বললেন, এই লোকটি অমুক। সে এমন কওমের সাথে সম্পর্কিত যারা হোদীর পশুর সম্মান করে। কাজেই পশুপালকে দাঁড় করাও। সাহাবারা পশুপাল দাঁড় করালেন এবং নিজেরা লাব্বায়েক বলে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। এই লোকটি এ অবস্থা দেখে বললো, সুবহানাল্লাহ, বায়তুল্লাহ থেকে এদের ফিরিয়ে রাখা মোটেই সমীচীন নয়। অন্য কোন কথা না বলে সে সোজা কোরায়শদের কাছে চলে গেলো এবং বললো, আমি হোদীর অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যবাইয়ের জন্যে আনীত পশু দেখেছি। তাদের গলায় বস্ত্রখন্ড বাঁধা রয়েছে এবং বহু পশুর কোহান রক্তাক্ত করে চিহ্ন দেয়া হয়েছে। কাজেই ওদেরকে বায়তুল্লাহ থেকে ফিরিয়ে রাখা আমি সমীচীন মনে করি না। এরপর কোরায়শদের এবং তার মধ্যে এমন কিছু কথা হলো যে, সে ক্ষেপে গেলো।
ওরওয়া ইবনে মাসউদ ছাকাফি এ সময় হস্তক্ষেপ করে বললো, তিনি তোমাদের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। এই প্রস্তাব গ্রহণ করো এবং আমাকে তার কাছে যেতে দাও। কোরায়শরা তাকে অনুমতি দিলো। সে এসে আল্লাহর রসূলের সাথে কথা বলতে লাগলো। বুদাইল এবং তার সঙ্গীদের যেসব কথা বলেছিলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেসব কথাই পুনরায় বললেন। সেসব শুনে ওরওয়া বললো, হে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, বলুন তো আপনি যদি নিজের কওমকে নির্মূল করে দেন তবে আপনি কি আপনার আগে কোন আরব সম্পর্কে এমন কথা শুনেছেন যে, তিনি নিজের কওমকে নির্মূল নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন? যদি ভিন্নরকম পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তবে খোদার কসম, আমি এমন সব চোহারা এবং এমন সব উদভ্রান্ত লোকদের দেখেছি, যারা আপনাকে ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মতোই মনে হয়। একথা শোনার পর হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, লাত-এর লজ্জাস্থানের ঝুলন্ত চামড়া চোষো গিয়ে। আমরা আল্লাহর রসূলকে ছেড়ে পালিয়ে যাব? ওরওয়া বললো, এই লোকটি কে? সাহাবারা বললেন, এই ব্যক্তি হচ্ছেন হযরত আবু বকর (রা.)। ওরওয়া তখন হযরত আবু বকর (রা.)-কে সম্বোধন করে বললো, দেখো, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তুমি এক সময় আমাকে অনুগ্রহ করেছিলে। যদি তা না হতো এবং আমার সেই প্রতিদান না দেয়া থাকতো, তবে অবশ্যই আমি ওকথার জবাব দিতাম।
এরপর ওরওয়া রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বলতে লাগলো। সে কথা বলার সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাড়ি স্পর্শ করছিলো। মুগিরা ইবনে শোবা (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিয়রে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর হাতে ছিলো তলোয়ার। ওরওয়া আল্লাহর রসূলের দাঁড়িতে হাত দেয়া মাত্র হযরত মুগিরা তলোয়ারের বাঁট দিয়ে তার হাত সরিয়ে দিতেন এবং বলতেন, নিজের হাত আল্লাহর রসূলের দাঁড়ি থেকে দূরে রাখো। এক পর্যায়ে ওরওয়া মাথা তুলে হযরত মুগিরার পরিচয় জানতে চাইল। সাহাবারা বললেন, মুগির ইবনে শো'বা (রা.)। ওরওয়া বললো, বিশ্বসঘাতক। আমি কি তোর কাজে ছুটোছুটি করিনি? ঘটনা ছিলো এই যে, হযরত মুগিরা ইবনে শো'বা কিছু লোকের সঙ্গে ছিলেন। এরপর তাদেরকে হত্যা করে তাদের ধন-সম্পদ সঙ্গে নিয়ে মদীনায় এসেছিলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, তোমার মুসলমান হওয়া আমি মেনে নিচ্ছি কিন্তু সে ধন-সম্পদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে ওরওয়া ছুটোছুটি করেছিলো। এখন সে কথাই বলছে। উল্লেখ্য, হযরত মুগিরা ছিলেন ওরওয়ার ভ্রাতুষ্পুত্র।
এরপর ওরওয়া রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাহাবাদের বিশেষ সম্পর্ক দেখতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর মক্কায় ফিরে গিয়ে নিজের সঙ্গীদের বললেন, হে কওম, আমি কায়সার কিসরা এবং নাজ্জাশীর মতো সম্রাটদের কাছে গিয়েছি। আল্লাহর শপথ, আমি কোন বাদশাহকে দেখিনি, যিনি তার সঙ্গীদের কাছ থেকে এতো মর্যাদা লাভ করেন। যতোটা সম্মান ও মর্যাদা মোহাম্মদকে লাভ করতে দেখেছি। আল্লাহর শপথ, তিনি যখন থুথু ফেলেন, সেই থুথু কেউ না কেউ হাত বাড়িয়ে নিয়ে নেয় এবং মুখে দেহে মাখিয়ে দেয়। তিনি কোন আদেশ করলে সে আদেশ পালনে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তিনি ওজু করতে শুরু করলে তার পরিত্যক্ত পানি গ্রহণে সঙ্গীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে যায়। তিনি কথা বলতে শুরু করলে তার সঙ্গীরা কণ্ঠস্বর নীচু করে ফেলে। শ্রদ্ধার আতিশয্যে সঙ্গীরা তাঁর প্রতি পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় না। এমন একজন ব্যক্তি তোমাদের একটি ভালো প্রস্তাব দিয়েছেন। এ প্রস্তাব গ্রহণের জন্যে আমি তোমাদের অনুরোধ করছি।
কোরায়শের যুদ্ধবাজ যুবকরা যখন লক্ষ্য করলো যে, প্রবীণরা আপোস নিষ্পত্তির ফর্মুলা নিয়ে ব্যস্ত, তখন তারা যুদ্ধ বাধানোর পাঁয়তারা করলো। তারা সিদ্ধান্ত করলো যে, রাত্রিকালে চুপিসারে মুসলমানদের শিবিরে গিয়ে এমন হাঙ্গামা শুরু করবে যাতে উভয় পক্ষে যুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যে এরপর তারা অগ্রসর হয়। রাতের অন্ধকারে ৭০ অথবা ৮০ জন যুবক তানঈম পাহাড় থেকে নেমে চুপিসারে মুসলমানদের শিবিরে প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু মুসলিম সৈন্য কমান্ডার মোহাম্মদ ইবনে মোসলমা (রা.) ওদের সবাইকে গ্রেফতার করে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে হাযির করেন। দয়াল নবী সন্ধির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যে তাদের সবাইকে ক্ষমা ও মুক্ত করে দেন। এই সম্পর্কে আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, 'তিনি মক্কা উপত্যকায় ওদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত ওদের হতে নিবারিত করেছেন, ওদের ওপর তোমাদের বিজয়ী করার পর।' (সূরা ফাতেহ, আয়াত, ২৪)
📄 হযরত ওসমান (রা.)-এর মক্কায় গমন
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় একজন দূত পাঠিয়ে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য কোরায়শদের কাছে সুষ্ঠভাবে ব্যক্ত করার প্রয়োজন অনুভব করলেন। একাজে তিনি ওমর ইবনে খাত্তাবকে (রা.) ডাকলেন। হযরত ওমর (রা.) এটি বলে অপারগতা প্রকাশ করলেন যে, হে আল্লাহর রসূল, যদি অমুসলিমরা আমার ওপর নির্যাতন করে তবে মক্কায় বনি কা'ব গোত্রের একজন লোকও আমার সমর্থনে এসে দাঁড়াবে না। হযরত ওসমানই আমার বিবেচনায় এ কাজের উপযুক্ত। তাকে প্রেরণের আমি আবেদন জানাচ্ছি। তাঁর গোত্রের লোকেরা মক্কায় রয়েছে এবং তিনি কোরায়শদের কাছে আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন হযরত ওসমানকে ডাকলেন এবং কোরায়শদের কাছে যাওয়ার আদেশ দিয়ে বললেন, তুমি ওদের গিয়ে বলবে যে, আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি, ওমরাহ পালনের জন্যেই আমরা এসেছি। তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ওসমান (রা.)-কে একথাও বললেন যে, তিনি যেন মক্কার ঈমানদার পুরুষ ও মহিলাদের কাছে গিয়ে তাদের সান্ত্বনা দেন। তিনি যেন তাদের বলেন যে, আল্লাহ তায়ালা জাল্লা শানুহু শীঘ্রই মক্কায় ইসলামকে বিজয়ী শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। ঈমানদার হওয়ার কারণে তখন কাউকে চুপিসারে আল্লাহর এবাদাত-বন্দেগী করতে হবে না। হযরত ওসমান (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পয়গাম নিয়ে রওয়ানা হলেন। বালদাহ নামক জায়গায় কয়েকজন কোরায়শী লোকের সাথে দেখা হলো। তারা বললো, কোথায় যাচ্ছেন? হযরত ওসমান (রা.) বললেন, আল্লাহর রসূল হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে এই
বক্তব্যসহ তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। কোরায়শী লোকেরা বললো, আপনার আনীত বক্তব্য আমরা আগেই শুনেছি। আপনি নিজের কাজে যান। এদিকে সাঈদ ইবনে আস উঠে হযরত ওসমানকে (রা.) বললেন, মারহাবা। এরপর নিজের ঘোড়ায় জিন বেঁধে হযরত ওসমানকে (রা.) পিঠে তুলে মক্কায় বাসভবনে নিয়ে গেলেন। সেখানে হযরত ওসমান (রা.) কোরায়শ নেতাদের কাছে আল্লাহর রসূলের বক্তব্য ব্যাখ্যা করলেন। কোরায়শরা হযরত ওসমান (রা.)-কে কাবাঘর তওয়াফের প্রস্তাব দিলো, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগে কাবাঘর তওয়াফ করা তিনি পছন্দ করলেন না।
📄 হযরত ওসমান (রা.)-এর শাহাদাতের গুজব ও বাইয়াতে রেজোয়ান
হযরত ওসমান (রা.) তাঁর ওপর অর্পিত কাজ সম্পন্ন করলেন। কিন্তু কোরায়শরা তাঁকে তাদের কাছেই রেখে দিলো। সম্ভবত তারা চাচ্ছিলো যে, উদ্ভুত পরিস্থিতির আলোকে পারস্পরিক পরামর্শক্রমে সুনির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হবে। এরপর তারা হযরত ওসমান (রা.)-এর আনীত বক্তব্যের জবাব পাঠাবে। দীর্ঘ সময় হযরত ওসমানের (রা.) ফিরে না আসায় মুসলমানদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে, তাকে হত্যা করা হয়েছে। আল্লাহর রসূলকে এ খবর জানানো হলে তিনি বললেন, কোরায়শদের সাথে যুদ্ধ না করে আমরা এ জায়গা থেকে যাব না। একথা বলার পর তিনি সাহাবাদের বাইয়াতের জন্যে আহ্বান জানালেন। সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত আগ্রহ দেখিয়ে এবং এ মর্মে বাইয়াত করলেন যে, যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে কেউ পলায়ন করবে না। সর্বাগ্রে বাইয়াত করলেন আবু ছানান আছাদী। হযরত সালমা ইবনে আকোয়া (রা.) তিনবার বাইয়াত করলেন। শুরু, মাঝামাঝি সময়ে এবং শেষদিকে। আল্লাহর রসূল নিজের এক হাত অন্য হাতে নিয়ে বললেন, এ হাত ওসমানের। বাইয়াত গ্রহণ শেষ হলে হযরত ওসমান (রা.) এসে হাযির হলে তিনিও বাইয়াত করলেন। বাইয়াতে জাদ ইবনে কয়েস নামক একজন লোক অংশ নেয়নি। সে ছিলো মোনাফেক।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গাছের নীচে এই বাইয়াত গ্রহণ করেন। হযরত ওমর (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত ধরে রেখেছিলেন। হযরত মা'কাল ইবনে ইয়াছার (রা.) গাছের কয়েকটি শাখা ধরে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর থেকে সরিয়ে রাখছিলেন। এই বাইয়াত সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কোরআনে করিমে এই আয়াত নাযিল করেন, 'মোমেনরা যখন বৃক্ষতলে তোমার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করলো, তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন।' (সূরা ফাতেহ, আয়াত ১৮)
📄 ঐতিহাসিক সন্ধির শর্তসমূহ
কোরায়শরা পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করলো। এরপর খুব দ্রুত সোহায়েল ইবনে আমরকে সন্ধি করতে প্রেরণ করলো। সোহায়েলকে তাকিদ দিয়ে বলে দেয়া হলো, আল্লাহর রসূল যেন এ বছর ফিরে যান। কেননা আরবরা বলাবলি করতে পারে যে, তিনি আমাদের শহরে জোর করে প্রবেশ করেছেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোহায়েলকে দেখে সাহাবাদের বললেন, তোমাদের কাজ তোমাদের জন্যে সহজ করে দেয়া হয়েছে। এই লোকটিকে প্রেরণের অর্থ হচ্ছে, কোরায়শরা সন্ধি চায়। সোহায়েল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বেশ কিছুক্ষণ তাঁর সাথে আলাপ করলেন। এরপর সন্ধির শর্তাবলী প্রণয়ন করা হলো, শর্তাবলী নিম্নরূপ।
এক) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করেই ফিরে যাবেন। আগামী বছর মুসলমানরা মক্কায় আসবেন এবং তিনদিন অবস্থান করবেন। তাঁদের সঙ্গে আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র থাকবে। তলোয়ার থাকবে কোষবদ্ধ। কেউ তাদের উত্যক্ত করবে না।
দুই) উভয় পক্ষ দশ বছর যাবত যুদ্ধ বন্ধ রাখবে। এই সময়ে জনসাধারণ নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ থাকবে। কেউ কারো ওপর হাত তুলবে না।
তিন) মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতাদর্শে যারা ইচ্ছা করে, তারা প্রবেশ করতে পারবে কোরায়শদের মতাদর্শে যারা থাকতে চায়, তারা থাকতে পারবে। যে গোত্র অন্য গোত্রে প্রবেশ করবে, সে সেই গোত্রের একাংশ হিসাবে বিবেচিত হবে। কাজেই এমন কোন গোত্রের ওপর বাড়াবাড়ি করা হলে সেই প্রবিষ্ট গোত্রের লোকদের ওপরও বাড়াবাড়ি করা হয়েছে মনে করতে হবে।
চার) কোরায়শদের কোন লোক যদি নেতাদের অনুমতি ছাড়া অর্থাৎ পালিয়ে মোহাম্মদের কাছে যায় তিনি তাকে ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু মোহাম্মদের সঙ্গীদের মধ্যে কেউ যদি আশ্রয় লাভের জন্যে কোরায়শদের কাছে যায়, তবে কোরায়শরা তাকে ফেরত দেবে না।
চুক্তির খসড়া প্রণীত হওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেরে খোদা হযরত আলী (রা.)-কে ডেকে শর্তাবলী লেখালেন। শুরুতে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' লেখার জন্যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন। অর্থাৎ পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। এতে সোহায়েল বললো, আমরা তো জানি না রহমান কি? আপনি বরং এভাবে লিখতে বলুন, বি-ইসমিকা আল্লাহুম্মা। অর্থাৎ আপনার নামে হে আল্লাহ। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী (রা.)-কে তাই লিখতে বললেন। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, নিম্নোক্ত বক্তব্যসমূহের ওপর আল্লাহর রসূল মোহাম্মদ সন্ধি করেছেন। এ কথা শুনে সোহায়েল বললো, আমরা যদি জানতাম যে, আপনি আল্লাহর রসূল, তবে কাবাঘরে তওয়াফে আপনাকে বাধা দিতাম না এবং আপনার সাথে যুদ্ধও করতাম না। আপনি মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ লিখতে বলুন। তিনি বললেন, তোমরা স্বীকার না করলেও আমি আল্লাহর রসূল। এরপর হযরত আলী (রা.)-কে বললেন, মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ লেখো এবং রসূলুল্লাহ শব্দ মুছে দাও। হযরত আলী (রা.) রাযি হলেন না, আল্লাহর রসূল নিজ হাতে শব্দটি মুছে দিলেন। এরপর সন্ধির শর্তাবলী পুরোপুরি লিপিবদ্ধ করা হলো।
সন্ধি সম্পন্ন হওয়ার পর বনু খাযাআ গোত্র রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতাদর্শে প্রবেশ করলো। এই গোত্রের লোকেরা প্রকৃতপক্ষে আবদুল মোত্তালেবের সময়েও বনু হাশেমের মিত্র ছিলো। গ্রন্থের শুরুতেই এ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। মতাদর্শে প্রবেশ বা মতাদর্শ গ্রহণ করার অর্থ হচ্ছে প্রাচীন মিত্রের মিত্রতার স্বীকারোক্তি এবং মিত্রতা সম্পর্কের সুদৃঢ়করণ। অন্যদিকে বনু বকর গোত্র কোরায়শদের মতাদর্শে প্রবেশ করে।