📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 নিকৃষ্টতম ব্যক্তির বহিষ্কারের কথা

📄 নিকৃষ্টতম ব্যক্তির বহিষ্কারের কথা


রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু মোস্তালেকের সামরিক অভিযান শেষে মোরিসিঈ জলাশয়ের পাশে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় কিছু লোক সেই জলাশয়ে পানি তোলার জন্যে গেলো। তাদের মধ্যে হযরত ওমর (রা.)-এর একটি কাজের লোকও ছিলো। তার নাম যাহজা গেফারী। পানি আনতে গিয়ে ছেনান ইবনে অবর জুহানির সাথে তার প্রথমে কথা কাটাকাটি এবং পরে উভয়ের হাতাহাতি শুরু করলো। এরপর জুহানি বললো, হে আনসাররা, সাহায্য করো। যাহজাও চিৎকার করে বললো, হে মোহাজেররা সাহায্য করো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খবর পাওয়ার সাথে সাথে সেখানে গিয়ে বললেন, আমি তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছি, অথচ তোমরা আইয়ামে জাহেলিয়াতের মতো আওয়ায দিচ্ছো? ওকে ছেড়ে দাও, সে দুর্গন্ধময়।
এ ঘটনার খবর পেয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ক্রোধে ফেটে পড়লো। সে বললো, ওরা বুঝি এমন কাজ করেছে? আমাদের এলাকায় এসে আমাদের প্রতিপক্ষ এবং শত্রু হয়ে গেছে? আমাদের এ অবস্থা দেখে তো প্রাচীনকালের প্রবাদের সত্যতাই প্রমাণিত হয়, নিজের কুকুরকে লালন-পালন করে মোটাতাজা করো যাতে, সে তোমাকেই কামড়ে ছিন্ন ভিন্ন করতে পারে। শোনো, মদীনায় পৌঁছানোর পর আমাদের মধ্যেকার সম্মানিত ব্যক্তি নিকৃষ্টতম ব্যক্তিকে মদীনা থেকে বের করবে। পরে উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে বললো, এ বিপদ তোমরাই ডেকে এনেছে। তোমরা তাকে নিজের শহরে থাকতে এবং নিজেদের ধন-সম্পদের অংশ দিয়েছ। দেখো, তোমাদের কাছে যা কিছু আছে, সেসব দেয়া যদি বন্ধ করো, তবে সে তোমাদের শহর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবে।
সেই সময় একজন উঠতি বয়সের সাহাবা হযরত যায়েদ ইবনে আরকামও সেখানে ছিলেন। তিনি এসে তার চাচার কাছে সব কথা বললেন। তার চাচা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবহিত করলেন। সেই সময় হযরত ওমরও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল, ওব্বাদ ইবনে বিশরকে বলুন, ওকে হত্যা করে ফেলুক। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ওমর এটা কি করে সম্ভব? মোহাম্মদ তার সঙ্গীদের হত্যা করবে। তুমি বরং আমাদের এখান থেকে চলে যাওয়ার কথা ঘোষণা করো। সেই সময় কখনো কোথাও রওয়ানা হওয়ার সময় নয়। এরূপ সময়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোথাও রওয়ানা হতেন না। সাহাবারা যাত্রা শুরু করলে হযরত উসাইদ ইবনে খোজাইর (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে তাঁকে সালাম জানিয়ে বললেন, আজ আপনি অসময়ে রওয়ানা হয়েছেন? তিনি বললেন, তোমাদের সঙ্গী যা কিছু বলেছে, সে সব কি তুমি জানো? হযরত উসাইদ বললেন, কি বলেছে? তিনি বললেন, সে বলেছে, মদীনায় যাওয়ার পর মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি নিকৃষ্টতম ব্যক্তিকে মদীনা থেকে বের করবে। হযরত উসাইদ বললেন, হে আল্লাহর রসূল, যদি আপনি চান তবে তাকে মদীনা থেকে বের করে দিন। আল্লাহর শপথ, সে নিকৃষ্ট এবং আপনি সম্মানিত। এরপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল, ওর সাথে নরম ব্যবহার করুন। আল্লাহর শপথ, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে আমাদের মধ্যে এমন সময় এনেছিলেন, যখন স্বজাতীয়রা ওর অভিষেক অনুষ্ঠানের জন্যে মনিমুক্তার মুকুট তৈরী করেছিলো। এ কারণে সে মনে করে যে, আপনিই তার বাদশাহী কেড়ে নিয়েছেন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতপর সেদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এবং পরদিন সূর্য অনেক ওপরে উঠে আসা পর্যন্ত একাধারে হাঁটতে চলতে লাগলেন। এরপর যাত্রা বিরতি দেয়ার সাথে সাথে সবাই মাটিতে শরীর রাখার পরই বেখবর হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটাই চেয়েছিলেন। সাহাবারা আরামে বসে গালগল্প করবেন, এটা তিনি চাননি।
এদিকে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই যখন খবর পেলো যে, যায়েদ ইবনে আরকাম সব কথা ফাঁস করে দিয়েছে, তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাযির হয়ে কসম খেতে লাগলো। সে বলতে লাগলো যে, আপনি যা শুনেছেন, তা সত্য নয়, ওসব কথা কস্মিনকালেও আমি বলিনি। আমি ওরকম কথা মুখেও আনিনি। সেই সময় উপস্থিত আনসাররা বললেন, হে আল্লাহর রসূল, যায়েদ এখনো ছেলে মানুষ। মনে হয় সে ভুল শুনেছে। আবদুল্লাহ যা বলেছে, যায়েদ তা ভালোভাবে মনে রাখতে পারেনি। তাই আপনি আবদুল্লাহ ইবনে উবাই সম্পর্কে যা শুনেছেন, সব বিশ্বাস করেছেন।
হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বলেন, এরপর আমি এতো ব্যথিত হয়েছি যে, ওরকম ব্যথিত আর কখনো হইনি। মনের দুঃখে আমি ঘরে বসে রইলাম। এরপর আল্লাহ তায়ালা সূরা মোনোফেকূন নাযিল করেন। আল্লাহ তায়ালা সেই সূরায় সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, 'ওরা বলে, আল্লাহর রসূলের সহচরদের জন্যে ব্যয় করো না, যতক্ষণ না ওরা সরে পড়ে।' আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, 'ওরা বলে, আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে সেখানে থেকে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কৃত করবো।' হযরত যায়েদ (রা.) বলেন, এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর আল্লাহর রসূল লোক পাঠিয়ে আমাকে ডেকে নিলেন এবং অবতীর্ণ আয়াত পাঠ করে শোনালেন, এরপর বললেন, আল্লাহ তায়ালা তোমার কথার সত্যতার সাক্ষী দিয়েছেন।
এই মোনাফেকের এক পুত্রের নামও ছিলো আবদুল্লাহ। তিনি ছিলেন পিতার সম্পূর্ণ বিপরীত। অত্যন্ত পুণ্যশীল, সৎস্বভাব একজন সাহাবা ছিলেন তিনি। পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে মদীনার ফটকে এসে তিনি তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার পিতা আবদুলল্লাহ ইবনে উবাই সেখানে এলে তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, যতোক্ষণ না রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দেবেন, ততক্ষণ আপনি সামনে এক পাও এগুতে পারবেন না। কেননা আল্লাহর রসূল সম্মানিত এবং আপনি অপমানিত। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে গিয়ে মোনাফেক সর্দারকে মদীনায় প্রবেশের অনুমতি দান। এই আবদুল্লাহই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছিলেন, হে আল্লাহর রসূল, আপনি যদি তাকে হত্যা করতে চান তবে আমাকে বলুন, আল্লাহর শপথ, আমি তার মাথা কেটে এনে আপনার সামনে হাযির করবো।

টিকাঃ
৮. সহীহ বোখারী, ২ম খন্ড, পৃ. ৪৯৯, ২য় খন্ড, পৃ. ২২৭, ২২৮, ২২৯, ইবনে হিশাম ২য় খন্ড, ২৯০, ২৯১, ২৯২
৯. ইবনে হিশাম, মুখতাছারুস সিরাত, শেখ আবদুল্লাহ পৃ. ২৭৭

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ইক্কের ঘটনা

📄 ইক্কের ঘটনা


দুই) ইফের ঘটনা এ অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে 'ই' অর্থাৎ চারিত্রিক অপবাদের ঘটনা। এই ঘটনার বিবরণ এই যে, আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোথাও সফরে যাওয়ার সময় সহধর্মিনীদের নাম লিখে লটারি করতেন। যার নাম উঠতো, তাকে সফরসঙ্গিনী করতেন। এ যুদ্ধে যাওয়ার সময় হযরত আয়েশার (রা.) নাম উঠেছিলো।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সঙ্গে নিয়ে যান। ফেরার পথে এক জায়গায় যাত্রাবিরতি করা হয়। হযরত আয়েশা (রা.) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে গলার একখানি হার হারিয়ে ফেলেন। এই হারখানি তিনি তার বোনের কাছ থেকে ধার হিসাবে নিয়েছিলেন। হার নেই দেখে সাথে সাথে খুঁজতে যান। ইতিমধ্যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবারা মদীনার পথে রওয়ানা হয়ে যান। হযরত আয়েশার (রা.) হাওদাজ যারা উটের পিঠে রেখে দিতেন, তারা ভেবেছিলেন যে, তিনি হাওদাজের ভেতরেই রয়েছেন। এ কারণে হাওদাজ উটের পিঠে তুলে তারা বেঁধে দেন। হাওদাজ যে বেশী ভারি ছিলো না, একথা তাঁদের মনে আসেনি। কেননা অল্পবয়স্কা হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন হালকা পাতলা। কয়েকজন ধরে হাওদাজ তুলেছিলেন, এ কারণে তারা বুঝতে পারেননি যে, ভেতরে মানুষ নেই। দুই একজন হাওদাজ তুললে হালকা হওয়ার ব্যাপারটি হয়তো বুঝতে পারতেন।

মোটকথা, হযরত আয়েশা (রা.) হার খুঁজে অবস্থান স্থলে এসে দেখেন সকলেই চলে গেছে, ময়দান খালি। তিনি তখন এই ভেবে বসে পড়লেন যে, তাকে না পেয়ে নিশ্চয়ই কেউ খুঁজতে আসবে। আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয়ই যা ইচ্ছা করেন তাই হয়ে থাকে। হযরত আয়েশা (রা.) শুয়ে পড়লেন এবং এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন। 'ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিনী?' একথা শুনে হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঘুম ভেঙ্গে গেলো। একথা বলেছিলেন, হযরত সফওয়ান ইবনে মোয়াত্তাল (রা.)। তাঁর ঘুম ছিলো বেশী। ঘুমকাতুরে এই সাহাবাও পিছিয়ে পড়েছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা (রা.)-কে দেখেই চিনে ফেললেন। কেননা পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার আগেই তিনি হযরত আয়েশা (রা.)-কে দেখেছিলেন। তিনি ইন্নালিল্লাহে পড়ে নিজের সওয়ারী হযরত আয়েশা (রা.)-এর কাছে নিয়ে বসিয়ে দিলেন। হযরত আয়েশা (রা.) সওয়ারীতে আরোহণ করলেন। হযরত সফওয়ান ইন্নালিল্লাহ ব্যতীত একটি কথাও বলেননি। তিনি হযরত আয়েশা (রা.)-কে কিছু জিজ্ঞাসাও করেননি। চুপচাপ উটের রশি ধরে হেঁটে হেঁটে কাফেলার কাছে এসে পৌঁছেন।
তখন ছিলো ঠিক দুপুর। কাফেলার সকলে সেই সময় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হযরত সফওয়ানকে এভাবে আসতে দেখে সাহাবাদের মধ্যে আলোচনা সমালোচনা হতে লাগলো। আল্লাহর দুশমন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মনের ক্লেদ প্রকাশের একটা সুযোগ পেয়ে গেলো। তার অন্তরে ঘৃণা ও হিংসার যে ধিকি ধিকি আগুন জ্বলছিলো সেই আগুন আরো উস্কে দেওয়ার সে সুযোগ পেলো। সে আল্লাহর রসূলের সহধর্মিনীর নামে অপবাদ রটাতে শুরু করলো। তার সঙ্গী- সাথীরাও তার কাছে প্রিয় হওয়ার জন্যে নানা কথা রটনা শুরু করলো। মদীনায় আসার পর ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অপবাদের পত্রপল্লব বিস্তার করা হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব শুনে চুপচাপ রইলেন। তিনি কোন কথাই এ প্রসঙ্গে বললেন না। বেশ কিছুদিন যাবত ওহীও আসেনি। এ অবস্থা দেখে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আয়েশা (রা.)-এর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ সাহাবাদের সাথে আলোচনা করলেন। হযরত আলী (রা.) ইশারা ইঙ্গিতে বললেন যে, আপনি তাঁর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে অন্য কাউকে বিয়ে করুন। হযরত উসামা (রা.) এবং অন্য কয়েকজন সাহাবা বলেন যে, হে আল্লাহর রসূল, হযরত আয়েশাকে তালাক দেবেন না, আপনি শত্রুদের কথায় কান দেবেন না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন মসজিদে নববীর মিম্বরে দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের দেয়া যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে সাহাবাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। আল্লাহর রসূলের একথা শুনে হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে হত্যা করার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা (রা.)-এর একথা ভালো লাগল না। তিনি খাযরাজ গোত্রের সর্দার। আবদুল্লাহও তাঁরই গোত্রের লোক। এ কারণে তাঁর মনে গোত্রপ্রীতি চাঙ্গা হয়ে উঠলো। এতে সা'দ ইবনে মায়া'য এবং সা'দ ইবনে ওবাদার মধ্যে কথা কাটাকাটি হলো। ফলে উভয় গোত্রের লোকেরা গর্জে উঠলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনেক বুঝিয়ে উভয় পক্ষ কে শান্ত করলেন, এরপর নিজ চুপ রইলেন।
এদিকে হযরত আয়েশা (রা.) সফর থেকে এসেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি একমাস শয্যাশায়ী রইলেন। তাঁর নামে রটনা করা অপবাদ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। তবে, মাঝে মাঝে ভাবছিলেন যে, ইতিপূর্বে অসুস্থতার সময়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে

সমবেদনাপূর্ণ ব্যবহার করতেন, এবার তা করছেন না। রোগ মুক্তির পর হযরত আয়েশা (রা.) এক রাতে উম্মে মেসতাহের সাথে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ময়দানে গিয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে উম্মে মেসতাহ নিজের চাদরে পা জড়িয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। এতে তিনি নিজের পুত্রকে বদদোয়া করলেন।
হযরত আয়েশা (রা.) এতে উম্মে মেসতাহর সমালোচনা করলে তিনি বললেন, আমার পুত্র প্রোপাগান্ডার অপরাধের অংশীদার। একথা বলেই তিনি হযরত আয়েশা (রা.)-কে তাঁর নামে রটিত অপবাদের ঘটনা শোনালেন। হযরত আয়েশা (রা.) সব কিছু ভালোভাবে জানতে আব্বা আম্মার কাছে যাওয়ার জন্যে আল্লাহর রসূলের কাছে অনুমতি চাইলেন। অনুমতি পেয়ে তিনি নিজের বাড়ীতে গেলেন। সেখানে সব কিছু শোনার পর অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। দুই রাত একদিন কেঁদে কাটালেন। এ সময়ে তিনি চোখও মুছলেন না, ঘুমুতেও গেলেন না। তিনি অনুভব করছিলেন যে, কাঁদতে কাঁদতে যেন বুক ফেটে যাবে। সেই অবস্থায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগমন করলেন। তিনি কালেমা শাহাদাত পাঠ করে এক ভাষণে বললেন, হে আয়েশা, তোমার সম্পর্কে আমার কানে এ ধরনের কথা এসেছে। যদি তুমি এসব থেকে মুক্ত থাকো তবে শীঘ্রই আল্লাহ তায়ালা সেকথা প্রকাশ করবেন। যদি আল্লাহ না করুন, তুমি কোন পাপ করে থাকো, তবে তুমি আল্লাহর কাছে মাগফেরাত চাও, তওবা করো। বান্দা যখন নিজের পাপের কথা স্বীকার করে এবং আল্লাহর কাছে তওবা করে, তখন আল্লাহ তায়ালা সেই তওবা কবুল করেন।
একথা শোনার সাথে সাথে হযরত আয়েশার কান্না থেমে গেলো। একফোটা পানিও তাঁর চোখে এলো না। তিনি তাঁর আব্বা-আম্মাকে জবাব দিতে বললেন। কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না যে, কি জবাব দেবেন। পরে হযরত আয়েশা (রা.) নিজেই বললেন, আল্লাহর শপথ, আমি জানি, শুনতে শুনতে একথা আপনাদের মনে গেঁথে গেছে। আপনারা একথা সত্য বলেই মনে করছেন। এখন যদি আমি নির্দোষ হওয়ার কথা বলি, তাহলেও আপনারা বিশ্বাস করবেন না। পক্ষান্তরে যদি আমি দোষ স্বীকার করি, তবে আপনারা সেটাই বিশ্বাস করবেন। আল্লাহ তায়ালা ভালোই জানেন যে, আমি নির্দোষ। কাজেই এমতাবস্থায় আমার এবং আপনাদের অবস্থা হচ্ছে সেই রকম, যেমন হযরত ইউসুফের (আ.) পিতা হযরত ইয়াকুব (আ.) বলেছিলেন, সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা বলছো, সে বিষয়ে আল্লাহ তায়ালাই আমার একমাত্র সাহায্যস্থল।
একথার পর হযরত আয়েশা (রা.) একপাশে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। ঠিক তখনই আল্লাহর রসূলের ওপর ওহী নাযিল হতে শুরু করলো। ওহী নাযিলের কষ্টকর অবস্থা শেষ হওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিটিমিটি হাসছিলেন। তিনি প্রথমেই বললেন, হে আয়েশা, আল্লাহ তায়ালা তোমার নির্দোষ হওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। তাঁর আম্মা খুশীর সাথে বললেন, আয়েশা, আল্লাহর রসূলের কাছে যাও। হযরত আয়েশা (রা.) কৃত্রিম অভিমানের সুরে বললেন, আমি যাব না, আমি তো শুধু আল্লাহর প্রশংসা করবো।
এই ঘটনা সম্পর্কে যেসব আয়াত নাযিল হয়েছে, সেগুলো সূরা নূর-এর অন্তর্ভুক্ত। উক্ত সূরার দশম আয়াত থেকে শুরু হয়েছে।

এরপর অপবাদ রটানোর অভিযোগে মেসতাহ ইবনে আছাছা, হাসান ইবনে ছাবেত এবং হামনা এই তিনজন সাহাবার প্রত্যেককে ৮০টি করে বেত্রাঘাত করা হয়।

টিকাঃ
১০. কারো ওপর ব্যভিচারের অভিযোগ দিয়ে তা প্রমাণ করা না গেলে তবে অপবাদ রটনাকারীকে ৮০টি বেত্রাঘাত করা ইসলামী শরীয়তের আইন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00