📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 বনি মোস্তালেকের যুদ্ধের আগে মোনাফেকদের ভূমিকা

📄 বনি মোস্তালেকের যুদ্ধের আগে মোনাফেকদের ভূমিকা


ইতিপূর্বে একাধিকবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি সাধারণভাবে এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি বিশেষভাবে শত্রুতা ছিলো। আওস ও খাযরাজ গোত্র তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল হয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলো। তার অভিষেকেরও আয়োজন করা হয়েছিলো। আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মাথায় পরানোর জন্যে মুং-এর মুকুট তৈরী করা হচ্ছিলো। এমনি সময়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিপ্লবী আলোর আভা নিয়ে মদীনায় আগমন করেন। এর ফলে মদীনার সর্বস্তরের জনসাধারণের দৃষ্টি আবদুল্লাহর ওপর থেকে সরে যায়। এই লোকটি অতপর ভাবতে শুরু করে যে, আল্লাহর রসূলই তার বাদশাহী কেড়ে নিয়েছেন।

আবদুল্লাহ ইবনে উবাই-এর জিঘাংসা ও ক্রোধের প্রকাশ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের শুরুতেই ঘটেছিলো। সে তখনো ইসলামের প্রতি বাহ্যিক আনুগত্য প্রকাশ করেনি। পরবর্তী সময়ে ইসলামের প্রতি বাহ্যিক আনুগত্য প্রকাশ করলেও তার মনোভাবে কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ইসলামের প্রতি বাহ্যিক আনুগত্য প্রকাশের আগে একদিন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে হযরত সা'দ ইবনে ওবাদার সেবার জন্যে যাচ্ছিলেন।

পথে এক জনসমাবেশের কাছে দিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাচ্ছিলেন। সেই সমাবেশে ভবিষ্যতের মোনাফেক আবদুল্লাহ ইবনে উবাইও ছিলো। সে চাদরে নিজের নাক ঢেকে বললো, আমাদের উপর ধুলো উড়িও না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমাবেশের লোকদের উদ্দেশ্যে আল্লাহর পাক কালাম তেলাওয়াত করছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বললো, আপনি নিজের ঘরে বসে থাকুন, আমাদের মজলিসে এসে বিরক্ত করবেন না।⁶

এটা হচ্ছে ইসলামের প্রতি তার বাহ্যিক আনুগত্যের আগের কথা। বদরের যুদ্ধের পর বাতাসের গতিবেগ লক্ষ্য করে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পরও এই ঘৃণীত লোকটি ছিলো আল্লাহ তায়ালা, তাঁর প্রিয় রসূল এবং মুসলমানদের শত্রু। ইসলামী সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং ইসলামের আওয়ায দুর্বল করার কাজে সে বিন্দুমাত্র কসুর করেনি। সে পর্যায়ক্রমে ইসলামবিরোধী কাজ চালিয়ে যায়। ইসলামের শত্রুদের সাথে তার নির্ভেজাল ও আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। বনু কায়নুকা গোত্রের ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই অত্যন্ত আপত্তিকরভাবে নাক গলিয়েছিলো। এ সম্পর্কে পূর্বে আলোকপাত করা হয়েছে। একইভাবে এই দুর্বৃত্ত ওহুদের যুদ্ধেও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, বিশৃঙ্খলা, হতাশা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলো। এ সম্পর্কেও পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে।

এই মোনাফেক ইসলাম গ্রহণের পর প্রতি শুক্রবার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খোতবা দেয়ার আগে মসজিদে নববীতে উঠে দাঁড়িয়ে বলতো, হে লোক সকল, তিনি তোমাদের মাঝে আল্লাহর রসূল, আল্লাহ তায়ালা তাঁর মাধ্যমে তোমাদের মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করেছেন। কাজেই তাঁকে সাহায্য করো, তাঁর হাতকে শক্তিশালী করো, তাঁর কথা শোনো এবং মানো। এসব কথা বলে সে বসে পড়তো। এরপর তার বেহায়াপনা এবং হঠকারিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিলো যে, ওহুদের যুদ্ধের পর প্রথম জুমার সময়েও সে একই রকম কথা বলতে শুরু করলো। অথচ ওহুদের যুদ্ধে তার ইসলাম বিরোধী ভূমিকা সম্পর্কে সকলেই ছিলেন অবহিত। এবার কথা বলার সময়ে বিভিন্ন দিক থেকে মুসলমানরা তার কাপড় টেনে ধরে বললেন, হে আল্লাহর দুশমন বসে যাও। তুমি যে কাজ করেছ এরপর তোমার মুখে এ ধরনের কথা শোভা পায় না। এ ধরনের প্রতিকূলতার মুখে সে লম্বা লম্বা পা ফেলে উদ্ধতভাবে বাইরে বেরিয়ে গেলো। যাওয়ার সময় বিড়বিড় করে বলছিলো, আমি ওদের সহযোগিতার জন্যে দাঁড়ালাম, মনে হয় যেন অপরাধ করে ফেলেছি। আমি কি কোন দোষের কথা বলেছি? দরজায় একজন আনসারের সাথে দেখা হলো। তিনি বললেন, তোমার ধ্বংস হোক, ফিরে চলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার মাগফেরাতের জন্যে দোয়া করবেন। সে বললো, খোদর কসম, আমি চাই না যে তিনি আমার জন্যে মাগফেরাতের দোয়া করুন।⁷

এছাড়া আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বনু নাযির গোত্রের সাথেও সম্পর্ক স্থাপন করে এবং তাদের সাথে মিলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র করতে থাকে।

একইভাবে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তার বন্ধুরা খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং তাদেরকে প্রভাবিত করার নানারকম ষড়যন্ত্র করতে থাকে। আল্লাহ তায়ালা সূরা আহযাবে এ সম্পর্কে বলেন, 'এবং ওদের এক দল বলেছিলো, হে ইয়াসরেববাসী, এখানে তোমাদের কোন স্থান নেই, তোমরা ফিরে চলো এবং ওদের একদল নবীর কাছে অব্যাহতি প্রার্থনা করে বলছিলো, আমাদের বাড়ীঘর অরক্ষিত অথচ সেগুলো অরক্ষিত ছিলো না। আসলে পলায়ন করাই ছিলো ওদের উদ্দেশ্য। যদি শত্রুরা নগরীর বিভিন্ন দিক হতে প্রবেশ করে ওদের বিদ্রোহের জন্যে প্ররোচিত করতো, ওরা অবশ্যই তাই করে বসতো। ওরা এতে কালবিলম্ব করত না। এরা তো পূর্বেই আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিলো যে, এরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে। বল, তোমাদের কোন লাভ হবে না, যদি তোমরা মৃত্যু বা হত্যার ভয়ে পলায়ন কর এবং সেই ক্ষেত্রে তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেয়া হবে। বল, কে তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে রক্ষা করবে, যদি তিনি তোমাদের অমঙ্গল ইচ্ছা করেন এবং তিনি যদি তোমাদেরকে অনুগ্রহ করতে ইচ্ছা করেন, কে তোমাদের ক্ষতি করবে? ওরা আল্লাহ ব্যতীত নিজেদের কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না। আল্লাহ অবশ্যই জানেন, তোমাদের মধ্যে কারা তোমাদেরকে যুদ্ধে অংশগ্রহণে বাধা দেয় এবং তাদের ভাইদের বলে, আমাদের সঙ্গে এসো। ওরা অল্পই যুদ্ধে অংশ নেয়, (নিলেও তা নেয়) তোমাদের ব্যাপারে কৃপণতাবশত। যখন বিপদ আসে তখন তুমি দেখবে, মৃত্যুভয়ে মূর্ছাতুর ব্যক্তির মত চোখ উল্টিয়ে ওরা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু যখন বিপদ চলে যায়, তখন ওরা ধনের লালসায় তোমাদের তীক্ষ্ণ ভাষায় বিদ্ধ করে। ওরা ঈমান আনেনি, এ জন্যে আল্লাহ ওদের কার্যাবলী নিষ্ফল করেছেন এবং আল্লাহর পক্ষে এটা সহজ। ওরা মনে করে, সম্মিলিত বাহিনী চলে যায়নি। যদি সম্মিলিত বাহিনী পুনরায় এসে পড়ে, তখন ওরা কামনা করবে যে, ভালো হতো যদি ওরা যাযাবর মরুবাসীদের সঙ্গে থেকে তোমাদের সংবাদ নিত। ওরা তোমাদের সঙ্গে অবস্থান করলেও ওরা অল্পই যুদ্ধ করতো।' (সূরা আহযাব, আয়াত ১৩-২০)

উল্লিখিত আয়াতগুলোতে মোনাফেকদের ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-ভাবনা, কাজকর্ম, মানসিক অবস্থা, স্বার্থপরতা মোটকথা সুযোগ সন্ধানী চরিত্রের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।

এসব কিছু সত্তেও ইহুদী, মোনাফেক এবং পৌত্তলিক অর্থাৎ ইসলামের সকল শত্রুরা একথা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলো যে, ইসলামের বিজয়ের কারণ বস্তুগত শক্তি এবং অস্ত্রশস্ত্রের আধিক্য নয়। এই বিজয় প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আনুগত্য এবং চারিত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে নিহিত। এর দ্বারা সমগ্র ইসলামী সমাজ এবং ইসলামের সাথে সম্পর্কিত সকল মানুষই সাফল্য লাভ করে। ইসলামের এসব শত্রু একথাও জানতো যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যক্তিত্বই এ সকল সাফল্যের উৎস, যাঁর চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব হচ্ছে তুলনাবিহীন আদর্শ।

ইসলামের এ সকল শত্রু পাঁচ বছর যাবত চেষ্টা করার পর বুঝেছিলো যে, এই দ্বীনের অনুসারীদের অস্ত্রের দ্বারা নাস্তানাবুদ করা সম্ভব নয়। এ কারণে তারা সম্ভবত এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলো যে, চারিত্রিক ক্ষেত্রে কলঙ্ক আরোপের মাধ্যমে এই দ্বীনের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রোপাগান্ডা চালানো যাবে। এ উদ্দেশ্যে তারা আল্লাহর রসূলকেই বেছে নিয়েছিলো। মোনাফেকরা যেহেতু মুসলমানদের মধ্যেই থাকতো এবং মদীনায় বসবাস করতো, তাই মুসলমানদের সাথে অনায়াসে মেলামেশার সুযোগ পেতো। এ কারণে মুসলমানদের অনুভূতিতে তারা সহজেই আঘাত দিতে সক্ষম ছিলো। সুতরাং এ প্রোপাগান্ডার দায়িত্ব মোনাফেকরা নিজেদের ওপরেই নিয়েছিলো। মোনাফেক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এ প্রোপাগান্ডার দায়িত্ব নিজের ওপর তুলে নিয়েছিলো।

এ পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র একবার সেই সময় প্রকাশ পেয়েছিলো, যখন হযরত যায়েদ ইবনে হারেছা (রা.) হযরত যয়নবকে (রা.) তালাক দিলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বিয়ে করেছিলেন। আরবের নিয়ম ছিলো যে, পালক পুত্রকে তারা নিজ সন্তানের মতোই মনে করতো এবং তার স্ত্রীকে ও আপন পুত্র বধূর মতোই হারাম মনে করতো। এ কারণে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত যয়নব (রা.)-কে বিবাহ করার পর মোনাফেকরা তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারণায় লিপ্ত হয়। এতে তারা অপপ্রচারের দু'টি মোক্ষম বিষয় খুঁজে পায়।

প্রথমত হযরত যয়নব (রা.) ছিলেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পঞ্চম স্ত্রী। অথচ পবিত্র কোরআনে একজন মুসলমানের জন্যে চারজনের বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি ছিলো না। কাজেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বিবাহ কিভাবে বৈধ হতে পারে?

দ্বিতীয়ত হযরত যয়নব (রা.) ছিলেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পালক পুত্র হযরত যায়েদ (রা.)-এর স্ত্রী। এ কারণে আরবদের রীতি অনুযায়ী পালকপুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ করা ছিলো গুরুতর অপরাধ এবং মহাপাপ। অপপ্রচারকারীরা এক্ষেত্রে অনেক প্রোপাগান্ডা চালালো এবং নানারকম কথাও রটালো। তারা এমনও বলাবলি করছিলো যে, মোহাম্মদ যয়নবকে হঠাৎ দেখেছিলেন এবং তার রূপসৌন্দর্য দেখে এতোই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তখনই যয়নবকে ভালোবেসে ফেলেন। তাঁর পালকপুত্র যায়েদ একথা জানার পর যয়নবের পথ মোহাম্মদের জন্যে পরিষ্কার করে দেন।

মোনাফেকরা এ কাহিনী এমনভাবে প্রচার করেছিলো যে, এ সম্পর্কিত আলোচনা সমালোচনা তখনও অব্যাহত রয়েছে। সরল সহজ মুসলমানদের মনে এ প্রচারণা এতো প্রভাব বিস্তার করেছিলো যে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে আয়াত নাযিল করেন। তাতে এতদ বিষয়ের সমুচিত জবাব দেয়া হয়। বিষয়টির গুরুত্ব এটা থেকেই বোঝা যায় যে, সূরা আহযাবের শুরুতেই আল্লাহ রব্বুল আলামীন এ বিষয়ে উল্লেখ করে বলেন, 'হে নবী, আল্লাহকে ভয় করো এবং কাফের ও মোনাফেকদের আনুগত্য করবে না। আল্লাহতো সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' (সূরা আহযাব, আয়াত ১)

মোনাফেকদের কর্মতৎপরতার প্রতি এখানে ইঙ্গিত করে তাদের রূপরেখা সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মোনাফেকদের এসব কর্মতৎপরতা ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও নম্রতার সাথে সহ্য করছিলেন। সাধারণ মুসলমানরাও মোনাফেকদের কর্মতৎপরতা থেকে আত্মরক্ষা করে ধৈর্যের সাথে দিন কাটাচ্ছিলেন। কেননা তারা জানতেন যে, মোনাফেকদের আল্লাহ তায়ালা নানাভাবে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করবেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'ওরা কি দেখে না যে, প্রতি বছর দুই একবার বিপর্যয় হয়? এরপরও ওরা তাওবা এবং উপদেশ গ্রহণ করে না। (সূরা তাওবা, আয়াত ১২৬)

টিকাঃ
৬. ইবনে হিশাম, ২ম খন্ড, পৃ. ৫৮৪, ৫৮৭ সহীহ বোখারী ২য় খন্ড, পৃ. ৯২৪, সহীহ মুসলিম, ২য় খন্ড, পৃ. ১০৯
৭ ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃ. ১০৫

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 বনু মোস্তালেকের গোযওয়া ও মোনাফেকদের কর্মকান্ড

📄 বনু মোস্তালেকের গোযওয়া ও মোনাফেকদের কর্মকান্ড


এ অভিযান সামরিক দৃষ্টিতে বড় কিন্তু ছিলো না। তবে এ অভিযানের প্রাক্কালে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যার কারণে ইসলামী সমাজে অস্থিরতা এবং হৈ চৈ পড়ে যায়। এ কারণে একদিকে মোনাফেকদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে অন্যদিকে এমন কিছু আইন-কানুন নাযিল হয়েছে যেসব কারণে ইসলামী সমাজ মর্যাদার ক্ষেত্রে বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র লাভ করে। ইসলামী সমাজ একটি বিশেষ রূপরেখা ও অবয়ব অর্জন করে। প্রথমে আমরা গোযওয়া বা সামরিক অভিযানের কথা উল্লেখ করবো পরে বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করবো।

সীরাত রচয়িতাদের বিবরণ অনুযায়ী পঞ্চম বা ষষ্ঠ হিজরীর শাবান মাসে এ অভিযান পরিচালিত হয়।¹ ঘটনাক্রমে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে পারেন যে, বনু মোসতালিক এর সরদার হারেস বিন আবি যারার নিজ গোত্র ও অন্যান্য আরব গোত্রের সাথে নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসছে। এ খবরের সত্যতা যাচাইয়ের জন্যে হযরত বুরাইদা ইবনে হুছাইব আসলামি (রা.)-কে প্রেরণ করেন। তিনি গিয়ে হারেছ ইবনে আবি যেরারের সাথে আলোচনা করেন। ফিরে আসার পর তিনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সবকিছু অবহিত করেন।

রসূল সব কিছু জেনে নিশ্চিত হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরামকে প্রস্তুতির নির্দেশ দেন। অবিলম্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়। শাবান মাসের দুই তারিখে সাহাবারা রওয়ানা হন। এ অভিযানে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কিছু সংখ্যক মোনাফেকও ছিলো, যারা এর আগে অন্য কোন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি। মদীনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব রসূল হযরত যায়েদ ইবনে হারেছা মতান্তরে হযরত আবু যর মতান্তরে নুমাইল ইবনে আবদুল্লাহ লাইছি (রা.)-কে অর্পণ করেন। হারেছ ইবনে আবি যেরার এবং তার সঙ্গীরা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওয়ানা হওয়ার খবর পেয়ে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলো। তারা এ খবরও পেয়েছিলো যে, তাদের প্রেরিত গুপ্তচরকে হত্যা করা হয়েছে। হারেছের সঙ্গী বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মোরিসিঈ জলাশয়ের² সামনে উপস্থিত হলে বনু মুস্তালিক গোত্র যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবারাও প্রস্তুত হন।

সমগ্র ইসলামী সৈন্যের অধিনায়ক ছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)। আনসারদের পতাকা হযরত সা'দ ইবনে ওবাদার (রা.) হাতে দেয়া হয়। কিছুক্ষণ যাবত তীর বিনিময় হয়। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে সাহাবায়ে কেরাম একযোগে হামলা করে জয়লাভ করেন। পৌত্তলিকদের কিছুসংখ্যক নিহত হয়। মহিলা ও শিশুদের বন্দী করা হয়। বকরিসহ পশুপালও মুসলমানদের অধিকারে আসে। মুসলমানদের মধ্যে শুধু একজন নিহত হন। তাও একজন আনসার তাকে ভুলে শত্রুপক্ষের লোক মনে করে আঘাত করেছিলেন।

এ যুদ্ধ সম্পর্কে সীরাত রচয়িতারা এটুকুই লিখেছেন। আল্লামা ইবনে কাইয়েম এসব বিবরণ কল্পনাপ্রসূত বলে বাতিল করে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, এ অভিযানে লড়াই হয়নি বরং শত্রুদের ওপর হামলা করে নারী শিশু এবং পশুপাল অধিকার করা হয়। সহীহ বোখারীতে উল্লেখ রয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু মুস্তালেকের ওপর যখন হামলা করেন, সেই সময় তারা গাফেল ছিলো। অর্থাৎ এ ধরনের হামলার জন্যে তারা প্রস্তুত ছিলো না। হাদীস দ্রষ্টব্য।³

বন্দীদের মধ্যে হযরত জুয়াইরিয়াহও (রা.) ছিলেন। ইনি বনি মুস্তালেক গোত্রের সর্দার হারেস ইবনে আবি যেরারের কন্যা ছিলেন। তিনি ছাবেত ইবনে কয়েসের মালিকানাধীন ছিলেন। হযরত ছাবেত জুয়াইরিয়াহকে মাকাতেব করে নেন।⁴ এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে তাঁকে মুক্ত করে বিয়ে করেন। এই বিয়ের কারণে মুসলমানরা বনু মুস্তালেক গোত্রের একশত পরিবারকে মুক্ত করে দেন। এরা সবাই ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শ্বশুরকূলের লোক হিসাবে তাদের মুক্তি প্রদান করা হয়।⁵

এই হচ্ছে যুদ্ধের বিবরণ। এই যুদ্ধের সময়ের অন্যান্য ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন। সেই ঘটনাবলীর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য উফুকের ঘটনা। এই ঘটনার জন্যে মোনাফেক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই দায়ী। এই মোনাফেক এবং তার বন্ধু-বান্ধবরা এই ঘটনা রটিয়েছিলো। কাজেই প্রথমে ইসলামী সমাজে তাদের ন্যক্কারজনক ভূমিকার ওপর সংক্ষেপে আলোকপাত করে পরে ঘটনার বিবরণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হবে।

টিকাঃ
১. যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সামরিক অভিযান থেকে ফেরার পথেই 'ইফকের' ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ হযরত আয়েশা (রা.)-এর নামে মিথ্যা অপবাদ দেয়া হয়েছিলো। হযরত যয়নব (রা.)-এর সাথে আল্লাহর রসূলের বিয়ে এবং মুসলিম মহিলাদের জন্য পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার পরে এই ঘটনা ঘটেছিলো। হযরত যয়নব (রা.)-এর বিয়ে হয়েছিলো পঞ্চম হিজরীর শেষদিকে অর্থাৎ জিলকদ বা জিলহজ্জ মাসে। একথা সর্বসম্মত যে, এ সামরিক অভিয়ান শাবান মাসে পরিচালিত হয়েছিলো। কাজেই পঞ্চম হিজরীর শাবান নয় বরং ষষ্ঠ হিজরীর শাবান মাস হতে পারে। পক্ষান্তরে যারা এ সামরিক অভিযানের সময়কাল পঞ্চম হিজরীর শাবান মাস বলে উল্লেখ করেছেন, তাদের যুক্তি এই যে, 'ইফক' বিষয়ক হাদীসে এই ঘটনার বিবরণীতে হযরত সা'দ ইবনে মা'য এবং হযরত সা'দ ইবনে ওবাদার (রা.) মধ্যে উত্তপ্ত কথাকাটাকাটির উল্লেখ রয়েছে। জানা যায়, হযরত সা'দ ইবনে মা'য (রা.) পঞ্চম হিজরীর শেষদিকে বুনু কোরায়যার সামরিক অভিযানের পরে ইন্তেকাল করেন। এ কারণে 'ইফুকের' ঘটনার সময় তাঁর উপস্থিত থাকার যুক্তি এই যে, এ ঘটনা এ সামরিক অভিযান ষষ্ঠ হিজরীতে নয় বরং পঞ্চম হিজরীতে পরিচালিত হয়েছিলো।
প্রথম পক্ষ এর জবাবে বলেছেন যে, ইফুকের হাদীসে হযরত সা'দ ইবনে মা'য এর উল্লেখ রাবীর অর্থাৎ বর্ণনাকারীর ভুল। কেননা এ হাদীসই হযরত আয়েশা (রা.) থেকে ইবনে ওতবা বর্ণনা করেছেন। সনদ হচ্ছে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে আবদুল্লাহ ইবনে ওতবা এবং আবদুল্লাহ ইবনে ওতবা থেকে যুহরী। এতে সা'দ ইবনে মা'য-এর পরিবতে উছাইদ ইবনে খুযাইর-এর উল্লেখ রয়েছে। ইমাম আবু মোহাম্মদ ইবনে হাযম বলেন, নিঃসন্দেহে এটিই সহীহ, সা'দ ইবনে মা'য-এর উল্লেখ কল্পনাপ্রসূত। (দ্রষ্টব্য যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ১১৫)
২. মোরিসিঈ কাদিদ এলাকার সমুদ্র উপকূলে বনি মুস্তালিক গোত্রের একটি জলাশয়ের নাম। দেখুন সহীহ বোখারীর কিতাবুল আতাক ১ম খন্ড, পৃ. ৩৪৫, ফতহুল বারী, ৭ম খন্ড পৃ. ৪৩১
৩. সহীহ বোখারী, কিতাবুল আতাক ১ম খন্ড ১ম কনড, পৃ. ৩৪৫, ফতহুল বারী, সপ্তম খন্ড, পৃ. ৪৩১
৪. 'মাকাতের' সেই ক্রীতদাস বা দাসীকে বলা হয়, যারা মালিকের সাথে এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয় যে, নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে মুক্তি অর্জন করবে।
৫. যাদুল মায়াদ, ২য় খন্ড, পৃ. ১১২, ১১৩, ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা. ২৮৯, ২৯০, ২৯৪, ২৯৫

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 নিকৃষ্টতম ব্যক্তির বহিষ্কারের কথা

📄 নিকৃষ্টতম ব্যক্তির বহিষ্কারের কথা


রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু মোস্তালেকের সামরিক অভিযান শেষে মোরিসিঈ জলাশয়ের পাশে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় কিছু লোক সেই জলাশয়ে পানি তোলার জন্যে গেলো। তাদের মধ্যে হযরত ওমর (রা.)-এর একটি কাজের লোকও ছিলো। তার নাম যাহজা গেফারী। পানি আনতে গিয়ে ছেনান ইবনে অবর জুহানির সাথে তার প্রথমে কথা কাটাকাটি এবং পরে উভয়ের হাতাহাতি শুরু করলো। এরপর জুহানি বললো, হে আনসাররা, সাহায্য করো। যাহজাও চিৎকার করে বললো, হে মোহাজেররা সাহায্য করো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খবর পাওয়ার সাথে সাথে সেখানে গিয়ে বললেন, আমি তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছি, অথচ তোমরা আইয়ামে জাহেলিয়াতের মতো আওয়ায দিচ্ছো? ওকে ছেড়ে দাও, সে দুর্গন্ধময়।
এ ঘটনার খবর পেয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ক্রোধে ফেটে পড়লো। সে বললো, ওরা বুঝি এমন কাজ করেছে? আমাদের এলাকায় এসে আমাদের প্রতিপক্ষ এবং শত্রু হয়ে গেছে? আমাদের এ অবস্থা দেখে তো প্রাচীনকালের প্রবাদের সত্যতাই প্রমাণিত হয়, নিজের কুকুরকে লালন-পালন করে মোটাতাজা করো যাতে, সে তোমাকেই কামড়ে ছিন্ন ভিন্ন করতে পারে। শোনো, মদীনায় পৌঁছানোর পর আমাদের মধ্যেকার সম্মানিত ব্যক্তি নিকৃষ্টতম ব্যক্তিকে মদীনা থেকে বের করবে। পরে উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে বললো, এ বিপদ তোমরাই ডেকে এনেছে। তোমরা তাকে নিজের শহরে থাকতে এবং নিজেদের ধন-সম্পদের অংশ দিয়েছ। দেখো, তোমাদের কাছে যা কিছু আছে, সেসব দেয়া যদি বন্ধ করো, তবে সে তোমাদের শহর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবে।
সেই সময় একজন উঠতি বয়সের সাহাবা হযরত যায়েদ ইবনে আরকামও সেখানে ছিলেন। তিনি এসে তার চাচার কাছে সব কথা বললেন। তার চাচা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবহিত করলেন। সেই সময় হযরত ওমরও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল, ওব্বাদ ইবনে বিশরকে বলুন, ওকে হত্যা করে ফেলুক। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ওমর এটা কি করে সম্ভব? মোহাম্মদ তার সঙ্গীদের হত্যা করবে। তুমি বরং আমাদের এখান থেকে চলে যাওয়ার কথা ঘোষণা করো। সেই সময় কখনো কোথাও রওয়ানা হওয়ার সময় নয়। এরূপ সময়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোথাও রওয়ানা হতেন না। সাহাবারা যাত্রা শুরু করলে হযরত উসাইদ ইবনে খোজাইর (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে তাঁকে সালাম জানিয়ে বললেন, আজ আপনি অসময়ে রওয়ানা হয়েছেন? তিনি বললেন, তোমাদের সঙ্গী যা কিছু বলেছে, সে সব কি তুমি জানো? হযরত উসাইদ বললেন, কি বলেছে? তিনি বললেন, সে বলেছে, মদীনায় যাওয়ার পর মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি নিকৃষ্টতম ব্যক্তিকে মদীনা থেকে বের করবে। হযরত উসাইদ বললেন, হে আল্লাহর রসূল, যদি আপনি চান তবে তাকে মদীনা থেকে বের করে দিন। আল্লাহর শপথ, সে নিকৃষ্ট এবং আপনি সম্মানিত। এরপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল, ওর সাথে নরম ব্যবহার করুন। আল্লাহর শপথ, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে আমাদের মধ্যে এমন সময় এনেছিলেন, যখন স্বজাতীয়রা ওর অভিষেক অনুষ্ঠানের জন্যে মনিমুক্তার মুকুট তৈরী করেছিলো। এ কারণে সে মনে করে যে, আপনিই তার বাদশাহী কেড়ে নিয়েছেন।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতপর সেদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এবং পরদিন সূর্য অনেক ওপরে উঠে আসা পর্যন্ত একাধারে হাঁটতে চলতে লাগলেন। এরপর যাত্রা বিরতি দেয়ার সাথে সাথে সবাই মাটিতে শরীর রাখার পরই বেখবর হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটাই চেয়েছিলেন। সাহাবারা আরামে বসে গালগল্প করবেন, এটা তিনি চাননি।
এদিকে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই যখন খবর পেলো যে, যায়েদ ইবনে আরকাম সব কথা ফাঁস করে দিয়েছে, তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাযির হয়ে কসম খেতে লাগলো। সে বলতে লাগলো যে, আপনি যা শুনেছেন, তা সত্য নয়, ওসব কথা কস্মিনকালেও আমি বলিনি। আমি ওরকম কথা মুখেও আনিনি। সেই সময় উপস্থিত আনসাররা বললেন, হে আল্লাহর রসূল, যায়েদ এখনো ছেলে মানুষ। মনে হয় সে ভুল শুনেছে। আবদুল্লাহ যা বলেছে, যায়েদ তা ভালোভাবে মনে রাখতে পারেনি। তাই আপনি আবদুল্লাহ ইবনে উবাই সম্পর্কে যা শুনেছেন, সব বিশ্বাস করেছেন।
হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বলেন, এরপর আমি এতো ব্যথিত হয়েছি যে, ওরকম ব্যথিত আর কখনো হইনি। মনের দুঃখে আমি ঘরে বসে রইলাম। এরপর আল্লাহ তায়ালা সূরা মোনোফেকূন নাযিল করেন। আল্লাহ তায়ালা সেই সূরায় সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, 'ওরা বলে, আল্লাহর রসূলের সহচরদের জন্যে ব্যয় করো না, যতক্ষণ না ওরা সরে পড়ে।' আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, 'ওরা বলে, আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে সেখানে থেকে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কৃত করবো।' হযরত যায়েদ (রা.) বলেন, এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর আল্লাহর রসূল লোক পাঠিয়ে আমাকে ডেকে নিলেন এবং অবতীর্ণ আয়াত পাঠ করে শোনালেন, এরপর বললেন, আল্লাহ তায়ালা তোমার কথার সত্যতার সাক্ষী দিয়েছেন।
এই মোনাফেকের এক পুত্রের নামও ছিলো আবদুল্লাহ। তিনি ছিলেন পিতার সম্পূর্ণ বিপরীত। অত্যন্ত পুণ্যশীল, সৎস্বভাব একজন সাহাবা ছিলেন তিনি। পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে মদীনার ফটকে এসে তিনি তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার পিতা আবদুলল্লাহ ইবনে উবাই সেখানে এলে তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, যতোক্ষণ না রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দেবেন, ততক্ষণ আপনি সামনে এক পাও এগুতে পারবেন না। কেননা আল্লাহর রসূল সম্মানিত এবং আপনি অপমানিত। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে গিয়ে মোনাফেক সর্দারকে মদীনায় প্রবেশের অনুমতি দান। এই আবদুল্লাহই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছিলেন, হে আল্লাহর রসূল, আপনি যদি তাকে হত্যা করতে চান তবে আমাকে বলুন, আল্লাহর শপথ, আমি তার মাথা কেটে এনে আপনার সামনে হাযির করবো।

টিকাঃ
৮. সহীহ বোখারী, ২ম খন্ড, পৃ. ৪৯৯, ২য় খন্ড, পৃ. ২২৭, ২২৮, ২২৯, ইবনে হিশাম ২য় খন্ড, ২৯০, ২৯১, ২৯২
৯. ইবনে হিশাম, মুখতাছারুস সিরাত, শেখ আবদুল্লাহ পৃ. ২৭৭

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ইক্কের ঘটনা

📄 ইক্কের ঘটনা


দুই) ইফের ঘটনা এ অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে 'ই' অর্থাৎ চারিত্রিক অপবাদের ঘটনা। এই ঘটনার বিবরণ এই যে, আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোথাও সফরে যাওয়ার সময় সহধর্মিনীদের নাম লিখে লটারি করতেন। যার নাম উঠতো, তাকে সফরসঙ্গিনী করতেন। এ যুদ্ধে যাওয়ার সময় হযরত আয়েশার (রা.) নাম উঠেছিলো।
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সঙ্গে নিয়ে যান। ফেরার পথে এক জায়গায় যাত্রাবিরতি করা হয়। হযরত আয়েশা (রা.) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে গলার একখানি হার হারিয়ে ফেলেন। এই হারখানি তিনি তার বোনের কাছ থেকে ধার হিসাবে নিয়েছিলেন। হার নেই দেখে সাথে সাথে খুঁজতে যান। ইতিমধ্যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবারা মদীনার পথে রওয়ানা হয়ে যান। হযরত আয়েশার (রা.) হাওদাজ যারা উটের পিঠে রেখে দিতেন, তারা ভেবেছিলেন যে, তিনি হাওদাজের ভেতরেই রয়েছেন। এ কারণে হাওদাজ উটের পিঠে তুলে তারা বেঁধে দেন। হাওদাজ যে বেশী ভারি ছিলো না, একথা তাঁদের মনে আসেনি। কেননা অল্পবয়স্কা হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন হালকা পাতলা। কয়েকজন ধরে হাওদাজ তুলেছিলেন, এ কারণে তারা বুঝতে পারেননি যে, ভেতরে মানুষ নেই। দুই একজন হাওদাজ তুললে হালকা হওয়ার ব্যাপারটি হয়তো বুঝতে পারতেন।

মোটকথা, হযরত আয়েশা (রা.) হার খুঁজে অবস্থান স্থলে এসে দেখেন সকলেই চলে গেছে, ময়দান খালি। তিনি তখন এই ভেবে বসে পড়লেন যে, তাকে না পেয়ে নিশ্চয়ই কেউ খুঁজতে আসবে। আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয়ই যা ইচ্ছা করেন তাই হয়ে থাকে। হযরত আয়েশা (রা.) শুয়ে পড়লেন এবং এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন। 'ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিনী?' একথা শুনে হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঘুম ভেঙ্গে গেলো। একথা বলেছিলেন, হযরত সফওয়ান ইবনে মোয়াত্তাল (রা.)। তাঁর ঘুম ছিলো বেশী। ঘুমকাতুরে এই সাহাবাও পিছিয়ে পড়েছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা (রা.)-কে দেখেই চিনে ফেললেন। কেননা পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার আগেই তিনি হযরত আয়েশা (রা.)-কে দেখেছিলেন। তিনি ইন্নালিল্লাহে পড়ে নিজের সওয়ারী হযরত আয়েশা (রা.)-এর কাছে নিয়ে বসিয়ে দিলেন। হযরত আয়েশা (রা.) সওয়ারীতে আরোহণ করলেন। হযরত সফওয়ান ইন্নালিল্লাহ ব্যতীত একটি কথাও বলেননি। তিনি হযরত আয়েশা (রা.)-কে কিছু জিজ্ঞাসাও করেননি। চুপচাপ উটের রশি ধরে হেঁটে হেঁটে কাফেলার কাছে এসে পৌঁছেন।
তখন ছিলো ঠিক দুপুর। কাফেলার সকলে সেই সময় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হযরত সফওয়ানকে এভাবে আসতে দেখে সাহাবাদের মধ্যে আলোচনা সমালোচনা হতে লাগলো। আল্লাহর দুশমন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মনের ক্লেদ প্রকাশের একটা সুযোগ পেয়ে গেলো। তার অন্তরে ঘৃণা ও হিংসার যে ধিকি ধিকি আগুন জ্বলছিলো সেই আগুন আরো উস্কে দেওয়ার সে সুযোগ পেলো। সে আল্লাহর রসূলের সহধর্মিনীর নামে অপবাদ রটাতে শুরু করলো। তার সঙ্গী- সাথীরাও তার কাছে প্রিয় হওয়ার জন্যে নানা কথা রটনা শুরু করলো। মদীনায় আসার পর ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অপবাদের পত্রপল্লব বিস্তার করা হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব শুনে চুপচাপ রইলেন। তিনি কোন কথাই এ প্রসঙ্গে বললেন না। বেশ কিছুদিন যাবত ওহীও আসেনি। এ অবস্থা দেখে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আয়েশা (রা.)-এর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ সাহাবাদের সাথে আলোচনা করলেন। হযরত আলী (রা.) ইশারা ইঙ্গিতে বললেন যে, আপনি তাঁর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে অন্য কাউকে বিয়ে করুন। হযরত উসামা (রা.) এবং অন্য কয়েকজন সাহাবা বলেন যে, হে আল্লাহর রসূল, হযরত আয়েশাকে তালাক দেবেন না, আপনি শত্রুদের কথায় কান দেবেন না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন মসজিদে নববীর মিম্বরে দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের দেয়া যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে সাহাবাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। আল্লাহর রসূলের একথা শুনে হযরত সা'দ ইবনে মায়া'য আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে হত্যা করার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা (রা.)-এর একথা ভালো লাগল না। তিনি খাযরাজ গোত্রের সর্দার। আবদুল্লাহও তাঁরই গোত্রের লোক। এ কারণে তাঁর মনে গোত্রপ্রীতি চাঙ্গা হয়ে উঠলো। এতে সা'দ ইবনে মায়া'য এবং সা'দ ইবনে ওবাদার মধ্যে কথা কাটাকাটি হলো। ফলে উভয় গোত্রের লোকেরা গর্জে উঠলো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনেক বুঝিয়ে উভয় পক্ষ কে শান্ত করলেন, এরপর নিজ চুপ রইলেন।
এদিকে হযরত আয়েশা (রা.) সফর থেকে এসেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি একমাস শয্যাশায়ী রইলেন। তাঁর নামে রটনা করা অপবাদ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। তবে, মাঝে মাঝে ভাবছিলেন যে, ইতিপূর্বে অসুস্থতার সময়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে

সমবেদনাপূর্ণ ব্যবহার করতেন, এবার তা করছেন না। রোগ মুক্তির পর হযরত আয়েশা (রা.) এক রাতে উম্মে মেসতাহের সাথে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ময়দানে গিয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে উম্মে মেসতাহ নিজের চাদরে পা জড়িয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। এতে তিনি নিজের পুত্রকে বদদোয়া করলেন।
হযরত আয়েশা (রা.) এতে উম্মে মেসতাহর সমালোচনা করলে তিনি বললেন, আমার পুত্র প্রোপাগান্ডার অপরাধের অংশীদার। একথা বলেই তিনি হযরত আয়েশা (রা.)-কে তাঁর নামে রটিত অপবাদের ঘটনা শোনালেন। হযরত আয়েশা (রা.) সব কিছু ভালোভাবে জানতে আব্বা আম্মার কাছে যাওয়ার জন্যে আল্লাহর রসূলের কাছে অনুমতি চাইলেন। অনুমতি পেয়ে তিনি নিজের বাড়ীতে গেলেন। সেখানে সব কিছু শোনার পর অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। দুই রাত একদিন কেঁদে কাটালেন। এ সময়ে তিনি চোখও মুছলেন না, ঘুমুতেও গেলেন না। তিনি অনুভব করছিলেন যে, কাঁদতে কাঁদতে যেন বুক ফেটে যাবে। সেই অবস্থায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগমন করলেন। তিনি কালেমা শাহাদাত পাঠ করে এক ভাষণে বললেন, হে আয়েশা, তোমার সম্পর্কে আমার কানে এ ধরনের কথা এসেছে। যদি তুমি এসব থেকে মুক্ত থাকো তবে শীঘ্রই আল্লাহ তায়ালা সেকথা প্রকাশ করবেন। যদি আল্লাহ না করুন, তুমি কোন পাপ করে থাকো, তবে তুমি আল্লাহর কাছে মাগফেরাত চাও, তওবা করো। বান্দা যখন নিজের পাপের কথা স্বীকার করে এবং আল্লাহর কাছে তওবা করে, তখন আল্লাহ তায়ালা সেই তওবা কবুল করেন।
একথা শোনার সাথে সাথে হযরত আয়েশার কান্না থেমে গেলো। একফোটা পানিও তাঁর চোখে এলো না। তিনি তাঁর আব্বা-আম্মাকে জবাব দিতে বললেন। কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না যে, কি জবাব দেবেন। পরে হযরত আয়েশা (রা.) নিজেই বললেন, আল্লাহর শপথ, আমি জানি, শুনতে শুনতে একথা আপনাদের মনে গেঁথে গেছে। আপনারা একথা সত্য বলেই মনে করছেন। এখন যদি আমি নির্দোষ হওয়ার কথা বলি, তাহলেও আপনারা বিশ্বাস করবেন না। পক্ষান্তরে যদি আমি দোষ স্বীকার করি, তবে আপনারা সেটাই বিশ্বাস করবেন। আল্লাহ তায়ালা ভালোই জানেন যে, আমি নির্দোষ। কাজেই এমতাবস্থায় আমার এবং আপনাদের অবস্থা হচ্ছে সেই রকম, যেমন হযরত ইউসুফের (আ.) পিতা হযরত ইয়াকুব (আ.) বলেছিলেন, সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা বলছো, সে বিষয়ে আল্লাহ তায়ালাই আমার একমাত্র সাহায্যস্থল।
একথার পর হযরত আয়েশা (রা.) একপাশে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। ঠিক তখনই আল্লাহর রসূলের ওপর ওহী নাযিল হতে শুরু করলো। ওহী নাযিলের কষ্টকর অবস্থা শেষ হওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিটিমিটি হাসছিলেন। তিনি প্রথমেই বললেন, হে আয়েশা, আল্লাহ তায়ালা তোমার নির্দোষ হওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। তাঁর আম্মা খুশীর সাথে বললেন, আয়েশা, আল্লাহর রসূলের কাছে যাও। হযরত আয়েশা (রা.) কৃত্রিম অভিমানের সুরে বললেন, আমি যাব না, আমি তো শুধু আল্লাহর প্রশংসা করবো।
এই ঘটনা সম্পর্কে যেসব আয়াত নাযিল হয়েছে, সেগুলো সূরা নূর-এর অন্তর্ভুক্ত। উক্ত সূরার দশম আয়াত থেকে শুরু হয়েছে।

এরপর অপবাদ রটানোর অভিযোগে মেসতাহ ইবনে আছাছা, হাসান ইবনে ছাবেত এবং হামনা এই তিনজন সাহাবার প্রত্যেককে ৮০টি করে বেত্রাঘাত করা হয়।

টিকাঃ
১০. কারো ওপর ব্যভিচারের অভিযোগ দিয়ে তা প্রমাণ করা না গেলে তবে অপবাদ রটনাকারীকে ৮০টি বেত্রাঘাত করা ইসলামী শরীয়তের আইন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00